মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

শাঁওলি দে।। পারক গল্পপত্র



(১)

  

টোটোপাড়া নামটা শুনেই গলার কাছটা আর বুকটাও কেমন যেন করে উঠল। কোনোক্রমে ঢোঁক গিলে শোভনদার দিকে তাকাল মানস। বার্ষিক হিসেবনিকেশের খাতায় ফাঁকা ঘরগুলো পেনসিল দিয়ে পূরণ করছিল শোভনসুন্দর বসু। উলটোদিকের চেয়ারে বসে আছে মানস। হাতে একটা ফাইলের ওপর আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতেই কথাগুলো শুনছিল সে। 


অফিস বলতে এই দশ বাই বারোর এক টুকরো ঘর, সামনে একচিলতে বারান্দা। ঘরের ভেতর একটা ঢাউস মাপের আলমারি, তাতেই যাবতীয় দরকারী ফাইলপত্র রাখা। মধ্যিখানে একটা কাঠের টেবিল ও চার-পাঁচটে চেয়ার। টেবিলে খাতাপত্র, দু-একটা বই, কলম, পেনসিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা। এখান থেকেই শোভনসুন্দর বসুর এনজিওর সব কাজ হয়। সুকান্ত, মানস, লিপি আর পুষ্পক কাজের লোক বলতে এই চারজন। খুব সামান্য টাকার বিনিময়েই এরা কাজ করে শোভনসুন্দর বসুর সঙ্গে। কী আর করবে ? এই নেই চাকরির বাজারে যা পাওয়া যায় তাই বেশি। তবে সকলের প্রিয় শোভনদা কথা দিয়েছে ভালো কাজ দেখাতে পারলে বাইরে থেকে অনুদানও আসবে বেশি। তখন কাজ করেও একটা ভালো টাকা থেকে যাবে। বেতনও ভালো দিতে পারবে তখন। শোভনসুন্দর বসুর উদ্যোগে তৈরি হওয়া এই এনজিওর বয়স প্রায় দুই, নাম ‘স্বপ্ন’। 


মানসের সাড়া না পেয়ে সামনের দিকে তাকালেন তিনি। চশমাটা কপালে তুলে বললেন, ’কী হে চুপ মেরে গেলে যে একেবারে ! যাবে তো নাকি ?’

মানস এই এনজিওর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাসদুয়েকও হয়নি। বন্ধু পুষ্পক ওকে এখানে নিয়ে আসে। ইংরাজীতে এম.এ পাশ করে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছিল ও। বি.এড যে করবে তারও টাকা নেই। বাবার কাছে চাইতেও লজ্জা লাগছিল খুব। যে দু’চারটে টিউশনি পেয়েছিল তারও টাকা মিলছিল না ঠিকঠাক। তাই এই এনজিওর চাকরিটা প্রায় লুফেই নিয়েছিল ও। টাকাটা কম যদিও, কিন্তু কাজে যদি বাইরে কোথাও যাওয়ার সুযোগ মেলে দু’পয়সা বাড়তি আয়ও হয়। কিন্তু টোটোপাড়া শুনে মনটা বেশ দমেই গেল ওর। গলাটা সামান্য পরিষ্কার করে নিয়ে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই শোভনদাই বলে উঠল আবার, ’না গেলে বলো পুষ্পক, সুকান্ত একপায়ে খাঁড়া। তোমারই বেতন এখন কম, তাই ভাবলাম গেলে টাকাও ভালোই ...’

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মানস বলে উঠল,’আমি যাব শোভনদা, টোটোপাড়া আমি যাব।’


(২)  


টোটো জাতি ভারতের প্রায় বিলুপ্ত জনজাতির একটি। পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ারের অদূরে ভূটানের সীমান্ত ঘেঁষে ছোট্ট গ্রাম টোটোপাড়া। বাইরের লোক নেই এখানে। খুব কম পরিবারেরই বাস এখানে, অবশ্য এর বাইরেও যে তেমন থাকে কেউ তা নয়। ইদানিং পড়াশোনার দৌলতে কেউ কেউ বাইরে বেরোলেও ফেরে সেই এখানেই। 


জলপাইগুড়ি থেকে মাদারিহাট পর্যন্ত বাসে এসে তারপর টোটো পাড়ার জন্য অন্য ছোট গাড়ি ধরতে হয়। মানস এই প্রথম আসছে টোটো পাড়ায়, সঙ্গে একটা পিঠব্যাগ। সারাদিন কাজ মিটিয়ে তবে মাদারিহাটে ফেরার কথা বলে দিয়েছে শোভনদা। পরেরদিন আবার যেতে হবে। টোটোদের সুবিধে অসুবিধে নিয়ে একটি সমীক্ষাপত্র তৈরি করছে ওদের এনজিও। বড় কাজ। পাঠাতে হবে দিল্লিতে। সেইমতো উন্নয়নের অনুদান পাওয়া যাবে। সব কিছু ঠিকঠাক পর্যবেক্ষণ করে লিখে, ছবি তুলে নিয়ে যাওয়াই মানসের কাজ। দুতিনদিনও লাগতে পারে। তবে শোভনদা বারবার বলে দিয়েছে মাদারিহাটের ওদের এনজিওর সস্তার হোটেলে থাকতে। টোটো পাড়ায় এইসময় হাতি বের হয়, ব্যবস্থা করতে পারলেও ওখানে যেন কিছুতেই না থাকে মানস। 


বাস থেকে নেমে ম্যাজিক গাড়িগুলোর জন্য যখন দাঁড়ালো মানস, এগারোটা বেজে গিয়েছে। যাতায়াতের সমস্যা এখানে খুব বেশি। সরকারী বাস ছিল দুটো, তাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেই কবে ! স্ট্যান্ডেই ভারি জলখাবার খেয়ে অপেক্ষা করতে করতেই একটা সাদা ম্যাজিক এসে দাঁড়ালো, ভিড় দেখে মানসের চক্ষু চড়কগাছ। কিন্তু কিছু করারও নেই, পরের গাড়ি আবার বিকেলে। উপায় না দেখে সেটাতেও চেপেচুপে কোনক্রমে বসল মানস। ছাদে, সিটে লোকের কমতি নেই মোটেও। মাদারিহাট থেকে টোটো পাড়ার দূরত্ব বাইশ কিলোমিটার। পথে বেশ কয়েকটি নদীও পড়ে। জানালার ফাঁক দিয়ে যেটুকু দেখা যায়, তাতেই দেখছিল মানস। ওর পাশে একটি বছর বাইশ তেইশের ছেলে বসা। টোটো জাতির বলে মনে হল না মানসের। সামান্য হেলে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা এই নদীগুলোর নাম কী ?’

ছেলেটির মুখের তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা গেল না, গম্ভীর গলায় বলে উঠল, অনেকগুলোই নদী পড়ে রাস্তায়, তবে এতক্ষণে আমরা বাঙরি, তিতি ও হাওড়ি নদী পেরোলাম।‘ ছেলেটির অনাগ্রহী গলায় মানসকে আর কিছু জানতে চাওয়া থেকে বিরত থাকতে হল। 


ধুকতে ধুকতে গাড়িটা চলছে, রাস্তার অবস্থা বেহাল। এইটুকুতেই ঘাড়, কোমর ব্যথা হয়ে গেল ওর। তবু যেতে মন্দ লাগছিল না। একটা অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছিল ভেতর ভেতর।যার জন্য টোটো পাড়া যাওয়া মানসের কাছে একটা বিরাট পাওয়া তার সঙ্গে প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেল দেখা হয় না। শেষ দেখা হয়েছিল কলেজের মার্কশিট নেওয়ার দিন। আচ্ছা, এখন কেমন আছে ও ? এই জানার আগ্রহই ওকে এখানে প্রায় টেনে নিয়ে আসল। নইলে আসার কীইবা কারণ থাকতে পারে এখন ? সব তো শেষই হয়ে গিয়েছিল। নিজের মনেই হেসে উঠল মানস। শেষ ? শুরুই কি কিছু হয়েছিল কোনোদিন ?    

 

(৩)


পাথুরে পথ, রুক্ষ্মতা অথচ সবুজে মোড়া রাস্তা এগিয়ে চলছিল একটু একটু করে। খাড়া চড়াই টপকাতে টপকাতে কোনোক্রমে মানসদের ম্যাজিক গাড়িটা ঘ্যাচ করে ব্রেক কষে দাঁড়ালো। এই পথে ঘুম আসা মুশকিল, তবু চোখ বুজে কলেজে পড়ার দিনগুলোর কথাই ভাবছিল মানস। ব্রেক কষে দাঁড়াতেই সম্বিত ফিরল যেন। ঘাড়টা সামনের দিকে এগিয়ে দেখতে পেল একটা জায়গায় বড় বড় করে ইংরাজিতে লেখা, ‘ওয়েল-কাম টু টোটোপাড়া।’ 


গাড়ি থেকে নেমে এক পা এক পা করে সামনের দিকে এগোতে লাগল ও, কিছু পরই চোখে পড়ল একটা অঙ্গনওয়ারী শিশু শিক্ষা কেন্দ্র। অদ্ভুত একটা বাতাস বইছে, না গরম, না ঠান্ডা। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে শোভনদার বলে দেওয়া নম্বরে ফোন করল ও। একটি ছেলের আসার কথা, ওর সঙ্গেই বাকিটা পথ যেতে হবে। ছেলেটিই সাহায্য করবে সব তথ্য জোগাড় করে দিতে, কিম্বা যদি কারো কাছে যাওয়ার দরকার পড়ে। মানস ফোনে নিজের আসার খবর জানিয়ে ছেলেটির অপেক্ষা করতে লাগল। 


দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই চোখে পড়ল কিছু মহিলা হেঁটে চলেছে সামনের দিকে, ওদের পিঠে চা-পাতা তোলা টুকরির মতো জিনিস, সেটার এক অংশ কোমরে, আর অন্য অংশ মাথায় ফিতের মতো আটকে রাখা। অনেকের পিঠে আবার শুকনো কাঠের বস্তা, দেখেই মনে হচ্ছে বেশ ভারি। অথচ মহিলাগুলো হাসিমুখেই কথা বলতে বলতে এই পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। কান পেতে ওদের কথা শোনার চেষ্টা করল ও, নাহ বোঝার উপায় নেই। ওরা স্থানীয় ভাষায় কথা বলছে। এমনিতে মানস জানেই টোটোদের নিজস্ব কোনো লিপি নেই, এই ভাষা বৃহত্তর ভোট-বার্মা ভাষার মধ্যেই পড়ে। তবে এই প্রজন্ম বাংলা ও নেপালী ভাষায় দিব্য কথা বলতে পারে, স্থানীয় স্কুলগুলোতেও তাই-ই পড়ানো হয়, ফলে এদের সঙ্গে কথা বলতে তেমন কোনো অসুবিধেই হয় না। 


পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাবে কিনা ভাবতে ভাবতেই পেছন থেকে একজন ডেকে উঠল পরিষ্কার বাংলা ভাষায়, ‘মানসবাবু আপনি ?’

মানস ঘুরে তাকালো, বেঁটেখাটো একটা ছেলে সামনে দাঁড়িয়ে, বছর পঁচিশ বয়স। ঝাঁকড়া চুল, অনেকটা মঙ্গোলয়েড মুখ। চট করে দেখলে নেপালিই মনে হয়। মানস হেসে হাত বাড়ালো, বলল, ‘হ্যাঁ, তুমিই বিকাশ ?’

ছেলেটি লাজুক মুখে হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, আমিই বিকাশ টোটো। আপনাকে আমার সঙ্গেই এই দুই তিনদিন ঘুরতে হবে।’


দু’জনে হাঁটতে লাগল, কথায় কথায় টোটোদের বহু কথা জেনে নিচ্ছিল মানস। পরে লিখে নিলেই হবে। জানতে পারল বিকাশ এম. এ পড়ছে, দূরশিক্ষার মাধ্যমে। বাবা মুনিরাম টোটো আলিপুরদুয়ারের অনগ্রসর কল্যাণ বিভাগের অস্থায়ী কর্মী। মা অসুস্থ তাই ইচ্ছে থাকলেও বাইরে পড়ার উপায় হয়নি। সকলেরই প্রায় একই হাল। সরকারি সাহায্য না পেলে বেশিদূর এগোতে পারে না কেউই। জিজ্ঞেস করব করব করেও একটা কথা কিছুতেই বলতে পারছিল না ও। বিকাশ এদিকে কত কথাই যে বলে চলেছে, তার ইয়ত্তা নেই।  


বিকাশের সাইকেল আছে, মানস তার সামনে বসে একটা বড় মাঠের কাছে এসে দাঁড়ালো। পাকা একটা ঘর চোখে পড়ল মানসের, তার গায়ে লেখা ‘অতিথিদের বিশ্রামস্থান।’ বিকাশ হেসে বলল, ওখানে যেতে হবে না, আমার ঘরে বসেই কথা বলি, আমা খাওয়ার বানাবে। মানস ঘাড় নাড়ে, বিকাশ বলে, ‘সামনেই আমার ঘর, চলেন যাই।’

মানস বুঝল বিকাশ নেপালি ভাষায় মাকে আমা বলে সম্বোধন করলো।  


(৪)


বিকাশদের ঘরগুলো সব বাঁশের তৈরি। মেঝে বলতে বাঁশের মাচা আর পাট শোলার বেড়া। দিনের বেলায় ঘরে ওঠার জন্য লম্বা কাঠের গুঁড়ি, রাতে তা তুলে রাখে ওরা। একেকটি বাড়ি থেকে অন্যটি বেশ দূরে। গুঁড়ি বেয়ে ঘরে উঠল ওরা, ছিমছাম ঘরে যত্নের ছাপ রয়েছে। এই ঘরগুলোকেই তাহলে ‘নাকো-শা’ বলে, মনে মনে ভাবল মানস, গুগল করে দেখেছে সে।  


ঘরের ভেতর ঢুকে মায়ের সঙ্গে পরিচয় করে দিল বিকাশ। তারপর মাদুর পেতে আরাম করে বসল দুজনে। টুকটাক প্রশ্ন করছে মানস, বিকাশের উত্তর শুনে চটপট লিখে নিচ্ছে খাতায়। মানস জানতে পারল এই টোটোরা আসলে হিন্দু এবং প্রকৃতিকেই এরা ভগবানরূপে পূজা করে। মানস জানতে চায়, ‘তোমাদের প্রধান দেবতা কে?’

-‘ইশপা, মহাকাল ও মহাকালী আমাদের প্রধান দেবতা, আমরা একখন্ড পাথরকে এবং দুটো ঢোলককে মহাকালীরূপে পূজা করি। জানো তো দাদা এই পুজোতেই আমরা ইউ নামের এক ধরনের পানীয় দেবতাদের উদ্দেশে দান করি। ইউ কী জানো তো ?’ 

-‘নাহ’ মাথা নেড়ে মানস জানালো যে সে জানে না। 

বিকাশ বলতে লাগল, ‘আমরা দিনের পর দিন শষ্য পচাই, শষ্য বলতে চালের গুঁড়ো, মারউয়া এইসব। সেটা পচতে পচতে তবেই একধরনের পানীয় তৈরি হয়, সেটাই ইউ। আমরা ইশপা ছাড়াও সিইমা নামে এক দেবতারও পূজা করি, বিশ্বাস করি তিনিই আমাদের সবরকম অসুখ ও বাইরের বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেন।‘


হঠাৎই প্রসঙ্গ পালটে দেয় মানস, জানতে চায়, ‘আচ্ছা, এখনও তোমাদের মধ্যে একই ধর্মের মানে একই জাতিতে বিয়ে করতে হয় না ? অসবর্ণ বিয়ে তো হয় না ?’

-‘আগে তো একেবারেই হত না, যদি কেউ বিয়ে করতও তবে তাকে গ্রামছাড়া হতে হত। তবে ইদানিং বাইরে থেকে এই তোমাদের মতো এনজিওর কিম্বা সরকারি লোকজন এসে আমাদের গ্রামের সবাইকে বোঝাতে শুরু করেছে, যে এইভাবে চলতে থাকলে খুব শিগগিরিই এমন দিন আসবে যেদিন টোটো বলে আর কিছুই থাকবে না। তাই গ্রামের বয়স্করা আজকাল অনিচ্ছে থাকলেও অসবর্ণ বিয়ে দিচ্ছে। এই তো সেদিনই গ্রামের এক দাদার এক নেপালি মেয়েকে বিয়ে করল‘, এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল বিকাশ। হয়ত নিজের অনাগত ভবিষ্যতের কথা ভেবে চোখমুখ চকচক করে উঠল ওর, তাই টের পেল না উল্টোদিকের বসা মানুষটার মুখ কালো ছায়ায় ঢেকে গিয়েছে কখন !     

একটু থেমে বিকাশ আবার বলতে শুরু করে, ‘২০০১ সালের গণনা অনুযায়ী আমরা ১১৮৪জন। এখন অবশ্য সংখ্যাটা একটু বেড়েইছে।’ 


কিছুক্ষণ থেমে ধীর গলায় জানতে চাইল মানস, এখানকার স্কুল্গুলোর কথা কিছু বলো বিকাশ ! বিকাশ হাসল এবার, বলল, ’হ্যাঁ, স্কুলের কথাটথার জন্য এক দিদিকে আসতে বলেছি। ওই ভালো বলতে পারবে। ততক্ষণে আমরা খেয়ে নিই চলো। 

মানস ঘাড় নাড়ল, বলল, ‘তোমার দিদি ?’

বিকাশ বলল,‘ওই দিদির মতোই, পাশের সুব্বাগাঁওতে থাকে। পড়াশোনায় দারুণ। পেপারে নাম উঠেছিল তো ! এখন আলিপুর দুয়ারের কাছে একটা স্কুলে চাকরি করে, আমাদের গ্রামের ভালোমন্দ সব ওই দেখে। দিল্লিতে চিঠিপত্র দিয়ে দিদিই তো তোমাদের...‘

মানস ঢোঁক গিলল একটা, জানতে চাইল,’কী নাম তোমার দিদির ?’

মাদুর থেকে উঠে খাবার দেওয়ার জায়গা পরিষ্কার করতে করতে বিকাশ বলে উঠল, ’রীনা টোটো, বইপত্র- জার্নালও তো আছে ওর আমাদের এই জাতি নিয়ে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় দারুণ রেজাল্ট করেছিল, নাম শুনেছ তো দাদা ?’

মানস বিকাশের কৌতুহলী গলার উত্তরে কোনোমতে বলতে পারল, ‘হ্যাঁ, শুনেছিলাম।’


(৫)


মোটা বেশ অন্যরকম খেতে চালের ভাত, ছাগলের মাংস, দই আর একটা কিরকম অজানা স্বাদের ডাল দিয়ে খাওয়া সেরে বাড়ির সামনে পায়চারি করছিল মানস। ঘড়িতে তিনটে বাজে। সাড়ে চারটের সময় শেষ ম্যাজিক ছাড়বে এখান থেকে, তার আগেই যা জানার জেনে নিতে হবে। শোভনদাও ফোন করেছিলেন বারদুয়েক। যা বাকি থাকবে সেসব আবার কাল। কিন্তু মানস আর কাল আসতে চায় না। যা জানার আজই জেনে নেওয়া যেত, তবে কালকে আর আসতে হত না। কিন্তু বিকাশের সেই দিদি এখনো আসেনি। আচ্ছা, সে কি বুঝতে পেরেছে কে এসেছে ? ওর নাম বলেছে বিকাশ রীনাকে ? মানস নামে তো অন্য কেউও আসতে পারে, তাই না ? কী জানি, সে আদৌ আসবে কিনা ? রীনা স্কুলে চাকরি করে, আর ও এখনো লড়াই করছে, পায়ের তলার মাটির শক্ত হতে এখনও অনেক বাকী। শক্ত হবে কিনা তাইবা কে জানে ? কলেজের শেষের দিন নিজের বলা কথাগুলোর জন্য নিজেরই এখন খুব লজ্জা লাগছে। কিভাবে চোখাচোখি হবে ও রীনার ? 


এসব ভাবতে ভাবতেই বিকাশের গলা শুনতে পেল ও, ‘দাদা, রীনাদিদি এসেছে। এবার তোমায় ওই সব বলবে।’

ঘাড় ঘোরাতেই রীনা টোটোকে দেখতে পেল মানস। কলেজের সেই মেধাবী, লাজুক, ছিপছিপে চেহারার মেয়েটিকে চেনাই যাচ্ছে না। লাজুক মুখে এগিয়ে গেল ও, হেসে বলল, ‘কেমন আছ ?’

রীনা স্বভাবতই অবাক। মুখ দিয়ে কথা সরছে না ওর। এক দৃষ্টিতে দেখে যাচ্ছে মানসকে। মানসই আবার কথা বলল, ‘আমি একটা এনজিওর সঙ্গে যুক্ত, সেই ব্যাপারেই এখানে আসা...’

সম্বিত ফেরে রীনার, হালকা হাসি মুখে ঝুলিয়ে রেখে বলে, চলো সামনের চাতালে গিয়ে বসে কথা বলি। বিকাশকে হাত দেখিয়ে দু’জনে হাঁটতে থাকে, কারো মুখেই কোনো কথা নেই। পায়ে পায়ে চাতালে গিয়ে পৌঁছায় ওরা, বাঁশের তৈরি বেঞ্চে বসে। মানস কথা হাতড়াতে থাকে, রীনাই তখন বলে ওঠে, ‘বিকাশ বলেছিল মানস বলে কেউ আসবে, কিন্তু তুমি যে বুঝিনি।‘ পাঁচ বছর পর দেখা হল দুজনের, কেউই খেয়াল করেনি কখন ওরা তুইয়ের বদলে তুমি বলে সম্বোধন করেছে পরস্পর পরস্পরকে। 


কলেজের তিনবছর একসঙ্গে পড়েছে মানস আর রীনা, দু’জনেরই ইংলিশ অনার্স। মেসটাও পাশাপাশি ছিল। কলেজ থেকে ফেরার সময়টা একসঙ্গেই হয়ে যেত প্রায়ই। সেকেন্ড ইয়ার থেকে টিউশনটাও একজন স্যরের কাছেই পড়তে শুরু করে ওরা। খুব বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। বন্ধুরা পেছনে খেপাতেও ছাড়ত না। মানস মনে মনে উপভোগই করত বিষয়টা, চেহারায় চাকচিক্য না থাকলেও মেধাবী রীনার প্রজ্ঞা, বুদ্ধি সবটাই খুব পছন্দের ছিল ওর। কিন্তু স্বল্পভাষী ও পড়ুয়া রীনাকে বলে উঠতে পারছিল না ও। তাছাড়া রীনা একটা সম্পূর্ণ অন্য পরিবেশ থেকে লড়াই করে উঠে আসা মেয়ে। স্বপ্ন শুধু বড় হওয়া আর নিজের গ্রামের জন্য কিছু করা। এসব কিছু ছাপিয়ে নিজের কথা তিনবছরে আর বলা হয়নি ওর। রীনা হয়ত আঁচ পেয়েছিল কিছু, তাই ফাইনাল ইয়ারের আগে কেমন যেন এড়িয়ে যেত ওঁকে, যেন দেখেও দেখছে না। 


রেজাল্ট বের হতে দেখা গেল ফার্স্ট ক্লাসই পেয়েছে রীনা, মানসের অনার্স টিকেছে কোনোমতে। তবু সাহসে ভর করে মার্কশিট নেওয়ার দিন রীনার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল ও। বলেছিল মনের কথা, যা তিনবছর ধরে বুকে জমিয়ে রেখেছে।


(৬)


-‘বোলো, আমাদের টোটো পাড়া নিয়ে কী জানতে চাও ? যেটুকু জানি সাহায্য করব।‘ মানসের চোখের দিকে তাকিয়েই কথাগুলো বলল রীনা। 

মানস কিছুক্ষণের জন্য কোথায় যেন হারিয়েই গিয়েছিল, রীনার গলায় নিজেকে খুঁজতে খুঁজতে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, বিকাশ কিছু সাহায্য করেছে, আমি আসলে স্কুল্গুলোর কথা, সুবিধে-অসুবিধের কথা...’

রীনা বলল,’দ্যাখো, স্কুল বলতে তো ঢোকার মুখে একটা অঙ্গনওয়ারি শিশু শিক্ষা নিকেতন দেখেইছ, আর রয়েছে একটা প্রাইমারি ও হাইস্কুল। ইন্টারনেটে সব তথ্যই তুমি পাবে, এই যেমন ১৯৯০ সালে প্রাইমারি আর ১০৯৫ সালে উচ্চমাধ্যমিক স্কুলটি তৈরি হয়, হোস্টেলও আছে। আমি নিজেই এই দুটো স্কুলেই পড়েছি। কিন্তু সমস্যা অন্যখানে’, বলে থামল একটু রীনা টোটো। 

মানস বলল, ‘কী ?’ 

রীনা বলল, ‘বর্ষা কাল। তখন রাস্তাঘাটের যা অবস্থা হয়, যে কোত্থাও যাওয়া যায় না। আশপাশের গ্রাম থেকে ছেলেমেয়েরা ওইকিছু দিন একেবারেই আসতে পারে না। আর হাতির উপদ্রব তো আছেই, একবার দাঁতালের খবর বের হলে স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। বাইরের যে ক’জন মাস্টারমসাই দিদিমণি আছেন তারাও আসতে চায় না। এখন তো কার্যত বন্ধই থাকে স্কুলগুলো ওইসব সময়।’ 

-‘আশেপাশে ক’টা গ্রাম আছে ?’ জানতে চায় মানস। 

-‘ওই তো ছয়টি, পঞ্চায়েতগাঁও, সুব্বাগাঁও, মন্ডলগাঁও, মিত্রঙগাঁও, ধুমচিগাঁও আর পূজাগাঁও। আমি সুব্বাগাঁওয়ে থাকি’, উত্তর দেয় রীনা। 

-‘হাসপাতাল বা স্বাস্থকেন্দ্র আছে ?’  খাতায় লিখতে লিখতে জানতে চায় মানস। 

-‘হ্যাঁ, সদ্য একটা স্বাস্থকেন্দ্র হয়েছে। সুবিধে হয়েছে আমাদের। বিশেষ করে সাপে কাটা কিম্বা গর্ভবতী মহিলাদের জন্য প্রাথমিক ব্যবস্থাটা তো করা যাচ্ছে, নইলে এই তো ক’দিন আগেও ছুটতে হত সেই মাদারিহাট কিম্বা আলিপুরদুয়ার।’ রীনা হাসে। 

-‘আরও কিছু বলো তোমাদের সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে ?’ মানস রীনার দিকে তাকায়। 

-‘জানো তো তাদিং পাহাড়ের ঢালেই আমাদের এই গ্রাম। কৃষিকাজ ও পশুপালনই বেশিরভাগ মানুষ করেন। তবে চাকরিজীবীও আছেন, এই তো আমাদের বিকাশের বাবাই চাকরি করে। আমাদের সমাজ কিন্তু পুরুষপ্রধান। গ্রাম শাসনের জন্য একটা সাধারণ সভাও আছে, আমরা বলি লাচি-জাং ওয়া।’

মানস নোট করে নিতে থাকে, ‘আমাদের সভার ধর্মীয় সভার প্রধান হলেন কাজি আর অ-ধর্মীয় সভার প্রধান গাপু। এই যে আমরা যেখানে বসে আছি সেখানেই সভার কাজকর্ম হয়।‘ 

-‘বিয়ের ব্যপারটা জানো ?’ রীনা জানতে চায়। 

-‘ওই সামান্যই,’ গলাটা পরিষ্কার করে বলে মানস। 

-‘একটা বিয়েই প্রচলিত, তবে বহুবিবাহও নিষিদ্ধ নয় জানো ? যদি কারো স্ত্রী মারা যায় তবে সে তাঁর স্ত্রীর বোনকে বিয়ে করতে পারে, কিন্তু মহিলারা আবার ওর স্বামীর ভাইকে বিয়ে করতে পারে না।স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যুর একবছর অন্যজনকে একা থাকতেই হবে। দেখাশোনা করে, পালিয়ে, তুলে নিয়ে গিয়ে আর প্রেম করেও বিয়ে হয় আমাদের মধ্যে, তবে ডিভোর্স বলে কিচ্ছু নেই।‘ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামে রীনা। 

মানস যতটা পারে লিখে নেয়। 

-‘তোমার তো প্রায় যাওয়ার সময় হয়ে এল, চলো হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি,’ রীনা মানসের দিকে তাকিয়ে বলল। 

উঠে দাঁড়াল মানস, রীনাকে একেবারে অপরিচিত লাগছে ওর, কত ম্যাচিওর, কত শান্ত সিগ্ধ। দু’জনে হাঁটতে লাগল। রীনাই কথা বলছে টুকটাক, ‘আমাদের একটা বার্ষিক উৎসব হয় নায়ু, মন্দির আছে একটা ডেমশা মন্দির, ওখানেই হয়। এখন তো বাইরে থেকেও কত লোক আসে দেখতে।’

-‘কি হয় ওই উৎসবে ?’ মানস প্রশ্ন করে। 

-‘ফোক নাচ, গান, নাটক সবই হয় তবে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষায়। এবারই তো বাঁশি বাজানোর প্রতিযোগিতা হল। বিকাশ আর ওর বন্ধুদের একটা দল আছে, যা ভালো নাটক করে ওরা। আর বিকাশ তো দারুণ বাঁশি বাজায়। কানে লেগে থাকে’, বলে হাসল রীনা। 

-‘তোমার ফোন নম্বর তো আছেই বিকাশের কাছে, সবকিছুর ছবি পাঠিয়ে দেব।’ তুমি বরং রাস্তাঘাটের ছবিগুলো...’ রীনা আগ্রহের সঙ্গে তাকালো মানসের দিকে। 

-‘হ্যাঁ, ওগুলো তুলেছি কিছু কিছু। তোমার ফোন নম্বরটা ?’ মানস এবারে সরাসরি তাকালো রীনার দিকে। 

রীনা হেসে বলল,‘আছে তো বিকাশেরটা, ওকে জানালেই হবে।’ বলেই অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল রীনা, ‘ওই যে দূরে টিনের ছাউনি দেওয়া ঘর দেখছো, ওটা আমাদের এডুকেশন সেন্টার। রাতে পড়ানো হয়, দিনেও অবশ্য আসে ছেলেরা।’

মানস একটু চুপ থেকে বলল, ‘এর পেছনে নিশ্চয়ই তুমি ?’

রীনা হাসল, বলল, ‘তুমি তো আমার স্বপ্ন জানোই, যা পারি, যতটুকু পারি সবটাই করব টোটো পাড়ার জন্য। এর বাইরে আমার কোনো অস্তিত্ত্ব নেই।’

-‘বুঝেছি’, ম্লান হাসল মানস। 

-‘তোমায় সেদিনই বলেছিলাম বিয়ে, সংসার আমার জন্য নয়। হয়ত করব কোনোদিন, জানি না। তবে আগে আমার এই প্রায় বিলুপ্ত গ্রামের কাজ আমায় করতেই হয়। জানো তো কয়েকটি ছেলে মেয়ে পড়াশোনায় খুব ভালো, কয়েকজন আবার ভালো খেলে। কিন্তু টাকা পয়সার অভাবে আর ঠিকমতো যোগাযোগ করতে না পারায় এগুতেই পারছে না। ওদের জন্য আমায় যা করতে হয় করব।‘ 

মানস শোনে, সে এখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি সেভাবে, অথচ এই প্রত্যন্ত এলাকার মেয়েটি সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে কিভাবে সবার জন্য লড়ছে। ওর স্বপ্নের কাছে নিজের স্বপ্নগুলো আজ ছোট বলে মনে হচ্ছে মানসের

(৭)


তাদিং পাহাড়ের ঢালে সন্ধ্যা নেমে আসছে তাড়াতাড়ি, ম্যাজিক স্ট্যান্ডের কাছে এসে দাঁড়ালো দু’জন। লোক ভরে এসেছে, জায়গা রেখে নিচে নামল মানস। রীনার মাথার পেছন থেকে লাল সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে একটু একটু করে। কেমন মায়াবী লাগছে চারপাশ। মনের থেকে সব গ্লানি মুছে যাচ্ছে মানসেরও। 


মার্কশিট নেওয়ার দিন রীনাকে ভালোবাসার কথা জানিয়েছিল ও, বদলে রীনা মুখ ঘুরিয়ে চলে গিয়েছিল দূরে, আরও দূরে। কোনো যোগাযোগই রাখেনি মানসের সঙ্গে। দৃঢ গলায় মানসকে বলেছিল,‘মানসের সঙ্গে কোনো স্বপ্নই মিলবে না ওর কোনোদিন। ঘর সংসারের বাইরে একটা অন্য পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে রীনা।’  ওর কথা বুঝে ওঠেনি তখন মানস। অভিমান হয়েছিল, ভেবেছিল বড় চাকরি পেয়ে দেখিয়ে দেবে অহংকারি রীনাকে স্বপ্ন আসলে কী ! 


কিন্তু এখানে এসে সব এলোমেলো হয়ে গেল। রীনার জীবন জুড়ে রয়েছে ওর প্রায় নিঃশেষ হয়ে যাওয়া জনজাতি। এই মানুষগুলোর জন্য কিছু করাই এখন ওর একমাত্র উদ্দেশ্য। মানসের চিন্তার থেকে কত আলাদা ও। ব্যাগ থেকে একটা মোটা বাঁধাইয়ের বই বের করে রীনা মানসের হাতে দিল। বলল, ‘পড়ে দেখো, আমার লেখা, অবশ্য গবেষোনামূলক কাজ। আর একটা কাজ করছি আমাদের অরিজিনাল লিপির, দেখা যাক পারি কিনা !’

মানস বইটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে হেসে বলল, ‘নিশ্চয়ই পারবে, তোমার চোখে সেই প্রত্যয়ই দেখছি যে !

রীনা বলল, ‘দেখলে তবে !’

মানস বলল, ‘বইটায় কিছু লিখে দেবে না ?’

রীনা বইয়ের প্রথম পাতায় যত্ন করে কিছু লিখে দিল। মানস ম্যাজিকে উঠে বসতেই ধূলো উড়িয়ে টোটো পাড়া ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল গাড়িটা। রীনা আবছা আলোয় বাড়ির পথ ধরল, দু’চোখে স্বপ্ন, কিছু করার অঙ্গীকার। 

মানস গাড়িতে বসে বইটার পাতা উল্টালো, দেখল, রীনা গোটা গোটা অক্ষরে লিখেছে, ‘প্রিয় বন্ধুকে, যে নিজেও এখন বড় স্বপ্ন দেখে।’

মানস নিজের মনেই হেসে উঠল। সত্যি তো ও তো এখন শোভনদার স্বপ্নটা নিজেও দেখতে শুরু করেছে। বুক ভরে একটা লম্বা শ্বাস নিল ও। 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন