মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

দীপক আঢ্য।। পারক গল্পপত্র



আজগে ত তুমার দিন।

কথাটা বলেই সোজাসুজি তাকালো নলিনী। দা দিয়ে নারকেলের ছোবড়া কাটছিল ম্যানেজার। কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের দা যেন থমকে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার নলিনীর দিকে তাকালো সে। সে তাকানো বড়ই শীতল। যেন মরা পুঁটির চোখ। সে দিকে তাকিয়ে মুহূর্তে নিজের চোখ সরিয়ে নিল নলিনী। আর কিছু বলার সাহস হল না। হাত-ঝাড়ু দিয়ে প্যান্ডেলের কালী প্রতিমার সামনে থেকে এটা-ওটা যা পড়ে ছিল তা জড়ো করতে লাগল সন্তর্পণে।

আজ বাদে কাল এই বনানী ইটভাটায় ফায়ারিং। ফি বছর ফায়ারিং-এর আগের রাতে কালী পুজো হয় এ ভাটায়। সেটঘরে ওঠা হিন্দুলোক ও দু-চার জন মেয়েছেলে জেগে থাকে প্রথম-রাত। মাঝরাত না হতেই চলে যায় যে যার সেটঘরে। কালী পুজো হয়ে যায় কালী পুজোর মত। কেবল সারারাত জেগে থাকে পুরোহিত, ঢাকি আর এই ম্যানেজার। বিকেল বিকেলে পাঁচ- কড়া খিচুড়ি রান্না হয়ে গেছে। সকালের আলো ফুটতে না ফুটতেই সে খিচুড়ি প্রসাদ হয়ে বাঁটোয়ারা হবে সেটঘরের পাতাইদার আর ইট ভাটায় কাজ করতে আসা জনমজুরদের মধ্যে। 

বিশ-শেয়ারের ভাটা এই বনানী ইটভাটা। মালিক পক্ষের দেখা মেলে ক্বচিৎ কখনো। তা-ও সে বিকেল বিকেল মিটিঙয়ে। তা না হলে এই ইটভাটা চলে মূলত মুহুরি আর ম্যানেজারের নির্দেশে। মুহুরিমশাই রাত জাগার লোক নন। কাজেই পুজোর আসল ভার- দায়দায়িত্ব সবই এই ম্যানেজারের উপর। 

দ্বিতীয় প্রহরের পুজো শুরু হবে এবার। ঢাকির দশ বছরের ছেলেটা চেয়ারে ঘাড় এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ। তাকে ঠেলেঠুলে জাগাবার জন্যে আস্তে আস্তে ডেকে চলেছে ঢাকি। ডাকছে সে অনেকক্ষণ ধরেই। কাঁসির বাজনদার সে। তাকে না হলে তো কেবল ঢাকের কাঠিতে জাগানো সম্ভব হবে না মা-কে। ঢাকির অস্বস্তি কাটিয়ে তার সামনে প্লাস্টিকের গ্লাসে একটুখানি জল এনে ধরল নলিনী। বলল, ওর চোখে একটুকানি ছিটিয়ে দ্যান দেকি। ছেলেমানুষ। তালি উটি পড়বেন্‌। নলিনীর হাত থেকে জলের পাত্রটা নেয় ঢাকি। সেদিকে আড় চোখে তাকিয়ে কী যেন বিড়বিড় করে ম্যানেজার। চোখ এড়ায় না নলিনীর। শাড়ির আঁচলটা কোমরের কাছে আর একটু কষে গুঁজে ম্যানেজারের কাছে এগিয়ে যায় সে। বলে, এ কাম তোমার দ্যে হবে না-গো ম্যানেজার। তুমি সরো। আমি কেটি দিচ্চি। বলতে বলতে সেখানে উবু হয়ে বসে পড়ে নলিনী।এক ঝটকায় ম্যানেজারের হাত থেকে দা-টাকে কেড়ে নেয় সে। টুকরো করতে থাকে নারকেলের ছোবড়া। 

অগ্রহায়ণের রাত। ঢাক আর কাঁসির শব্দে আঁধারের নিস্তব্ধতা ভেঙে যাচ্ছে সহজেই। বাইরে হিমেল বাতাস। ত্রিপল দিয়ে ঘেরা তিনদিক আটকানো প্যান্ডেল। সামনের অংশ খোলা। সেখান দিয়ে হিমেল বাতাস গায়ে লাগতেই শিরশির ক’রে ওঠে সারা শরীর। নলিনী লক্ষ করেছে তার কাছ থেকে উঠে গিয়ে সেই যে ম্যানেজারে লঘু পায়ে প্যান্ডেলের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে, দীর্ঘক্ষণ তার আর কোনও সাক্ষাৎ নেই। পুরোহিত উচ্চারণ করতে শুরু করেছে মাতৃ-মন্ত্র। মাঝেমধ্যে তার হাতের ঘণ্টার সঙ্গে জেগে উঠছে ঢাকের বোল, কাঁসির বোল। সে বোলের শব্দ যেন রাতের অন্ধকার পার হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে পাড়ন ছাড়িয়ে, ডক ছাড়িয়ে, স্রোতস্বিনী ইছামতীর এপার ছাড়িয়ে ওপারে -- আরও সুদূরে। 

কী মনে হতেই মা-র সমনে থেকে উঠে এল নলিনী। এতক্ষণ চার হাত-পা কোলের মধ্যে নিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে ছিল সে পুরোহিতের পিছনে। নিজের শরীরের ওম্‌ ভেঙে উঠতেই যেন কেঁপে উঠল এক মুহূর্ত। তারপর পায়ে পায়ে ইটভাটার অফিস ঘরের সামনে। নলিনী জানে, এই রাতে ওই অফিস ঘর ছাড়া অন্য কোথাও যাবে না ম্যানেজার। এই ঠাণ্ডা রাতে অফিস ঘরের চাইতে আর ভালো জায়গা তার কী বা হতে পারে। অফিসের উপর তলায় ম্যানেজারের থাকার ঘর। রাত গভীর হলে একবার সে ঘরে ঢুকলে সারারাত আর সে ঘর থেকে বের হবে না ও লোক। কিন্তু আজ মায়ের পুজো। এই সময় নিজের ঘরে গিয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে থাকার মানুষ নয় সে।

আজগে ত তুমার দিন। মনে মনে আবার আওড়ায় নলিনী। বিড়াল পায়ে অফিস ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। এই উপযুক্ত সময়। সন্ধে বেলা ঘর থেকে আসার মুহূর্তে সে ঠিক করে নিয়েছিল, এবছর ম্যানেজারকে হাত করতেই হবে। কেবল কয়লা ভেঙে তিনজনের পেট চালানো বড় দায়। তাও যদি তার মেয়ের বাপ শশীর হাঁপের টান না আসতো। লোকটা এই শীত পড়লি কেমন যুবুথুবু হয়ি থাকে। দু-পা হাঁটলেই বসি পড়ে মাটিতে। হাসপাতালের দেওয়া ওষুধে রোগের উপশম হয় না। প্রত্যেকদিন তিন বেলা তিনটে ট্যাবলেট। তা-ও দশটাকা! ঘরে সঞ্চয়ের কথা তো ছাড়! মুদির দোকান রাত পোহালি আর চাল-ডাল বাকিতে দেবে কিনা সন্দেহ। সেখানে কমপক্ষে হাজার দেড়েক ছাড়িয়েছে ইতিমধ্যে। আশেপাশের কেউ বাকি নেই, যার কাছে হাত পাতেনি নলিনী। এখন বাকি একটাই পথ। ম্যানেজার। তারে বশ করতি পারলিই যদি কিছু আসে। ইটভাটা মানেই কাঁচা টাকার খনি। সে খনির দারোয়ান এই ম্যানেজার। তার মন যোগাতি পারলিই ঘরে উঠে আসপে পোড়া কয়লা। হাতে আসপে কাঁচা কয়লা ভাঙার উপরি মজুরি। এমনকি একটুখানি মুখ দেখিয়ে গেলেও হপ্তা অন্তে বাঁধ সারাইয়ের রোজ। রাস্তায় ইট পাতানোর রোজ। গোলাইয়ের দেওয়াল লেপার রোজ। সব-সব। 

আজ সন্ধে থেকে মনে মনে তৈরিই ছিল নলিনী। নিজের মনে কতবার ভেবেছে, কী হবে যদি দুবেলা পেট পুরি খেতি না পাই? পাঁচ বছরের বুকের মেয়িটারে যদি খাবার সময় মুখি কিছু তুলি না দিতি পারি? ইজ্জত নিয়ি কি ধুয়ি জল খাবো? নাকি এর পরে ভিক্ষে করি খাবো? আর সেটা করলিই কি বড়সুনামের কাজ হবে? তার চে বরং শরীর যখন আছ্‌... এই করিই তো সুলেখা, আসমারা বেশ আছে। লোকে আড়ালে কত কথা না হয় বলে! তাই বলে ত আড়ালে ডেকি দু-কেজি চাল দেয় না কেউ। নিজের ভিতরের দ্বন্দ্বে নিজেকেই ভাঙতে থাকে নলিনী। পেট যে বড় দায়!

অফিস ঘরের দরজা খোলাই ছিল। তবে ভেজানো। নিঃশব্দে দরজার পাল্লা খুলে ঘরের ভিতরে পা রাখে নলিনী। অফিসের চেয়ারের সামনে রাখা বড় বেঞ্চে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে আছে ম্যানেজার। সামনের দেওয়ালে টাঙানো আদ্যাকালীর ফটো। সেদিকে পলকহীন চোখে তাকিয়ে যেন ধ্যানস্থ ম্যানেজার। তাকে দেখে একটু অবাকই হয় নলিনী। তার ধারণা ছিল একা একা কারণ-সুধা নিয়ে এই সময় ঘরে বসে থাকবে ম্যানেজার। চোখে থাকবে রঙিন নেশা। সেই নেশাতে আরও একটু আগুনের ছিটে দেবে সে। আর ম্যানেজার উন্মুখ হয়ে থাকবে তার শরীরের নেশায়। আর একটু একটু ক’রে নিজেরটা বুঝে নিয়ে সে নেশার রসদ যোগাবে নলিনী। ধীরে ধীরে। যতক্ষণ না পর্যন্ত পূরণ হয় তার অভীষ্ট। কিন্তু ম্যানেজারকে এই অবস্থায় বসে থাকতে দেখে মনে মনে একটু যেন দমে গেল নলিনী। তবুও হাল ছাড়ল না।  মৃদু স্বরে স্বগতোক্তি করল সে, আজগে ত তুমার দিন। তারপরে একটু জোরেই গলা খাঁখাঁরি দিয়ে বলল, এ-কি ম্যানেজার, ওদিকি মা-র পুজো হতেচ্‌, আর তুমি একলা ঘরে। একদম একলা। 

নলিনীর গলার স্বরে যেন চমকে উঠল ম্যানেজার। আদ্যাকালীর ছবি থেকে নিজের চোখ সরিয়ে নলিনীর দিকে তাকিয়ে নিজের মেজাজ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে সে। একটু ইতস্তত ক’রে বলে, না-আ, ওই যে, বাইরে একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছিল তাই চলে এলাম আর কি। তা তুই এখানে কেন? পুজোর ওখানে কিছু লাগবে নাকি?

-না-না। আমারও ওই ওখানে বেশ ঠাণ্ডা লাগছিল। তাই ভাবলাম...

-অ। তাহলি তুই বোস এখানে। আমি না হয় উপরে যাই। আসনপিঁড়ির ভঙ্গী ছেড়ে মাটিতে পা ম্যানেজারের। 

সে কি। আমি আলাম তুমার সঙ্গে দুটো কথা বলতি, আর তুমি চলি যাবা? তালি আমার আর থাকার কি-ই দরকার? ঘরে যাই। আমিও ঘুমুই গে যাই। নলিনীর গলায় যেন অভিমান। চোখে তীব্র ব্যঙ্গ। ললনার ছলাকলা। 

নলিনীর দিকে একপলক তাকিয়ে গুটিয়েপড়া  কেন্নোর মতো নিজেকে সম্বরণ ক’রে নেয় ম্যানেজার । সে ভাব এড়ায় না নলিনীর চোখে। নিজের বুকের আঁচলটাকে এক ঝটকায় ডান হাতে নিয়ে কাঁধের উপর দিয়ে আরও একটু জোরে টেনে গুঁজে নেয় কোমরে। তারই মধ্যে এক ঝলক কচি লাউয়ের মতো বুক নজর কাড়ে ম্যানেজারের। মুহূর্তে শরীরের রক্ত যেন চনমন ক’রে ওঠে তার। তবুও চুপচাপ বসে থাকে সে নিজের জায়গায়। কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। 

ম্যানেজারের সে নজর এড়ায় না নলিনীর চোখ। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসির ঢেউ তুলে সে বলে, আজ মা-র পুজো হচ্চে। ঠাকুরির থানের পাশে অপ্রয়োজনে দুটো বাংলা দেখি এলাম। সে কি এমনিই থাকপে নাকি ম্যানেজারমশাই? পুজোয় তো আর দুটো বাংলা লাগবে না। ঠাকুরির পেসাদ ছাড়া এমন রাত কি তুমি এমনি এমনি কাটাবা? আবার হাসি নলিনীর। এবারের হাসি অনেক বেশি খর। শব্দের দ্যুতি তার প্রত্যেক অনুরণনে। 

ম্যানেজারের উত্তরের প্রত্যাশা করেনা নলিনী। নিজের শরীর ঘুরিয়ে ম্যানেজারের মুখের কাছে মুখ নিয়ে যায় সে। আস্তে আস্তে বলে, তুমি বসো। আমি যাব আর আসপো। আমিই নে আসতিচি বাবার পেসাদ। তুমারে ঢেলি দেবান্‌।

চুপ ক’রে এক জায়গায় বসে থাকে ম্যানেজার। যেন সে বিষ দাঁত ভাঙা বিষধর। সাপুড়ে নলিনী। নলিনীর চলার পথে তাকিয়ে থাকে সে। তার উচ্ছল হাসি, বাঁকা ঠোঁট,কচি লাউয়ের মত বুক, ভরা পাছা তাকে যেন সম্মোহিত করে রেখেছে নলিনী। ভারি পিপাসা অনুভব করে ম্যানেজার। নলিনীর মুখে ‘বাংলা’ শব্দ শুনে তার মাথার ভিতর আনচান ক’রে ওঠে। উদ্দীপ্ত হয় নিজে নিজেই। 

নলিনীর দরজা খুলে চলে যাওয়াতে ঢাক আর কাঁসির শব্দ আরও চড়া হয়ে ফিরে আসে তার কাছে। তারই মধ্যে কানে আসে পুরোহিতের মন্ত্র উচ্চারণ। দু-হাত জোড় ক’রে মাথার উপর তোলে ম্যানেজার। গলার স্বর সপ্তমে তুলে মা- মা ক’রে যেন নিজেকে সঁপে দেয় ঈশ্বরের কাছে। অফিস ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে দরজা ভেজিয়ে। সিঁড়ি দিয়ে চলে যায় উপর তলায় নিজের ঘরে। 

প্রতিমার পাশে রাখা বাংলার একটা বোতল ঢাকি, কাঁসি আর পুরোহিতের চোখের আড়ালে তুলে নিয়ে আঁচলের আড়ালে চালান করে নলিনী। একটু এদিক ওদিক খুটখাট ক’রে আবার অফিস ঘরের ফিরে আসে সে। অফিস ঘরের ভেজানো দরজা খুলে থতমত খায় নলিনী। ঘর ফাঁকা। ঘরে জ্বলতে থাকা ইলেকট্রিকের শাদা আলো নিদারুণ ভাবে যেন খাঁখাঁ করছে। কয়েক মিনিট সেখানে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়ায় সে। ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণায় ফুটে ওঠে লাস্যময়ী হাসি। মনে মনে ভাবে, বুড়ো শের। শিকার ধরপে তার নিজের গুহায়। অস্ফুটে উচ্চারণ করে, আজগে ত তুমার দিন।

আর অপেক্ষা করে না নলিনী। ত্রস্ত পদক্ষেপে সিঁড়ি ভেঙে উঠে যায় দোতলায়। অপ্রশস্ত বারান্দা পার হয়ে ম্যানেজারের ঘর। নামেই ঘর। আসলে মাল রাখার জায়গা। সিজিন শেষে এই ঘরেই স্থান পায় ইটভাটার বেলচা, পাশ কোদাল, দেড়কো কোদাল, ফড়ুই আরও কত কি। ঘরের এক কোণে ছোট একটা চৌকি। পাশে হাতলবিহীন একটা কাঠের বসার চেয়ার। আগেও সে কতবার কত প্রয়োজনে এখানে এসেছে। সব বারই মজুরের ভূমিকায়। আর আজ? ম্যানেজারের শিকার হয়ে। নিজেই নিজেকে টোপ তৈরি করে তুলেছে নলিনী। শরীরের টোপ। লোভের টোপ। এ টোপ তার নিজের বেঁচে থাকার জন্যেও বটে। প্রাণ পিপাসার টোপ। 

খোলা দরজা। ঠোটের কোণায় অকৃত্রিম লাস্যময়ী হাসি ঝুলিয়ে রেখে ঘরে ঢোকে নলিনী। চৌকির সামনে হাতলবিহীন চেয়ারে বসে যেন বিষাদে ডুবে আছে ম্যানেজার। নলিনী আঁচলের আড়াল থেকে বের ক’রে দিশি মদের বোতল। ম্যানেজারের মুখের সামনে বোতলতা ধরে বলে, এর ছিপিটা খুলে দাও দিকি। মায়ের পোসাদ। খেলি লোভ মুক্তি হবে। সঙ্গে সঙ্গে সেই খিলখিলে হাসি। আরও একটু ম্যানেজারের শরীরের নিকটবর্তী হয় সে। হাত বাড়িয়ে টেবিলের উপরে রাখা কাঁচের গ্লাস নিতে হাত বাড়ায় নিলিনী। বুকের আঁচল সরে তার শরিরের আনাচকানাচ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ম্যানেজারের চোখের সামনে। কোমরের ভাঁজ হাতছানি দেয়। সম্মোহিত ম্যানেজার হাত বাড়িয়ে তাকে গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে সাহায্য করতেই আঁচল খসে পড়ে নলিনীর। ম্যানেজারের হাত ছুঁয়ে যায় নলিনীর কোমর। সে স্পর্শে বিদ্যুৎ খেলে যায় ম্যানেজারের শরীরে। আরও একটু এগিয়ে আসে নলিনী। ডান হাতের কোমল স্পর্শ অনুভূত হয় ম্যানেজারের ঘাড়ে, গলায়। বাঁ হাত দিয়ে ইলেকট্রিকের সুইচ নিভিয়ে দেয় সে। আলতো ক’রে ঠেলে দেয় দরজার একটা পাল্লা। ম্যানেজারের গরম শ্বাস উপলব্ধ হয় তার চোখ, ঠোঁট গলা পার হয়ে ক্রমশ আরও নিচে। 

-এবার কিন্তু কয়লা ভাঙার কাজ, গোবর লেপার কাজ আমারেই দিতি হবে। 

ক্ষুধার্ত বাঘ হরিণ শিকারের পরে যেমন যে আহ্লাদে ধীরে সুস্থে তার মাংস ছাড়াতে থাকে, তেমনি ধীরে সুস্থে চৌকির উপরে আধশোয়া নলিনীর স্বাদ গ্রহণ করতে থাকে ম্যানেজার। এরই মধ্যে দিশি বোতলের ছিপি খুলে গলায় ঢেলেছে তার কিছু অংশ। নলিনী অপেক্ষা করে আরও কিছু চাওয়ার জন্যে উপযুক্ত সময়ের।

ম্যানেজারের সচল আঙুল। লকলকে জিভ। বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় না নলিনীকে। আজগে ত তুমার দিন। ফিসফিসিয়ে ওঠে সে। তা আমারে কিছু দাও তুমি। তা না হলি যে আর চলতেচ্‌ না। 

-আমি আর তোরে কী দিতি পারি বল? আমার আছেটাই বা কী?

-অন্তত এখন শ’ পাঁচেক টাকা। তা না হলি যে সকাল হ’লি সকলে ছিঁড়ে খাবেন। ধারদেনা সক্কল জাগায়।

-পাঁচ শ’! সে তো অনেক। সকাল হ’লিই ঢাকিরে দিতে হবে, পুরোহিতেরে দিতে হবে। 

তাহলি থাক। আমারে যেতি দাও। তড়াশ ক’রে আধশোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসে নলিনী। এক ঝটকায় বুকের উপর থেকে ম্যানেজারের হাত সরিয়ে দেয় সে।  ধাক্কা খেয়ে আহত বাঘের মতো শ্বাস ছাড়ে ম্যানেজার। যেন পৌরুষে ঘা লাগে তার। ডান হাত দিয়ে দিশির বোতলটা ধরে আর একবার ঢকঢক করে গলর্ধি করে তরল পানীয়। আস্তিনে মুখ মোছে। বাঁ হাত দিয়ে হ্যাঁচকা টান দিয়ে চৌকির উপরে শুইয়ে ফেলে নলিনীকে। প্যান্টের পিছনের পকেটে হাত দিয়ে একটা কড়কড়ে পাঁচশ টাকা গুঁজে দেয় নলিনীর হাতে। আবছা অন্ধকারে সে টাকা চিনতে ভুল হয় না নলিনীর। 

গলায় সোহাগ এনে নলিনী বলে, আমি কি তুমারে এক্ষুনি দিতি বললাম। তার ডান হাতের মুঠে টাকা। বাঁ হাত দিয়ে ম্যানেজারকে টানে নেয় শরীরের কাছে। 

‘আজগে ত তুমার দিন’। ঠিক নলিনীর কায়দায় সুস্পষ্ট উচারণ ম্যানেজারের। ম্যানেজারের মুখে নিজের মুখের ভাষা শুনে থতমত খায় নলিনী। আজকে আমারই দিন। জোর দিয়ে বলে ম্যানেজার। আজগেই আমার দিন। নলিনী উপলব্ধি করে তার শরীরের উপরে একটু আগের মতো সচল নয় তার হাত। শরীরী উষ্ণতা যেন ধিকিধিকি। ম্যানেজার বিড়বিড় ক’রে বলতে থাকে,  আজগেই শেষ। এ ভাটায় আর নাহ্‌! অনেক দিয়িচি বাবুদের। নিজের জন্যি রাখিনি কিছুই। সারা দিন সারা রাত পড়ে থেকেছি। চৌকি দিয়েছি। লাখ লাখ টাকা ফেরা ক’রে এনে হপ্তা মিটিয়েছি। আর এরও পরে বাবুদের অবিশ্বাস। টাকা সরানোর মিথ্যে অভিযোগ। 

ম্যানেজারের কথা শুনে তড়িতাহতের মত ছিটকে পিছিয়ে যায় নলিনী। চৌকির কোণায় হাঁটু মুড়ে বসে। হুক খোলা ব্লাউজ। স্খলিত বাস। অস্ফুট স্বরে বলে, তুমি আর থাকপানা ম্যানেজার?

বাবুরা চায় না আমি থাকি। আমিও চায় নে। সোলাদানায় কথা হয়ে গেছে। এই সিজিন থেকে ওখানেই থাকবো। আজ নেহাত মায়ের পুজো। গত দশ-বারো বছর ধরে তো আমিই ক’রে আসছি। তাই এবারও থেকে গেলাম। ভোর হলেই খাতা-চাবি দিয়ে চলে যাব চিরকালের মত এ ভাটা ছেড়ে। বলতে বলতে গলা যেন ধরে আসে ম্যানেজারের। নলিনীর পাশ কেটে চেয়ারে গিয়ে বসে। বিস্রস্ত বাস গুছিয়ে নিয়েছে নলিনীও। ধীরে ধীরে চৌকি থেকে নেমে আসে সে। ঘরের লাইট জ্বালে। শাদা আলোয় ভরে ওঠে আবছা অন্ধকার ঘর। যদিও সে আলো যেন অন্ধকারের নামান্তর নলিনীর কাছে। ম্যানেজারের কাছে প্রত্যাশার আশ উবে গেছে তার। নিচে পুজোর ঢাক  আর কাঁসির শব্দ কানে আসে। মুহূর্তে তার মনে হয়, মা-ও চায়না সে নষ্ট হোক। নষ্ট হোক তার ...। কপালে হাত ঠেকায় সে। সে হাতের মুঠোয় এখনও ধরা পাঁচশ টাকা। মনে মনে বলে নলিনী, এরকম ক’রে তো আর প্রতিদিন টাকা জোগাড় করা সম্ভব না। ক’জনের কাছে গিয়ে এই ছেনালী মারবো? এই আধপোড়া শরীলডা নিয়ে কটা রাতই বাঁ জাগপো? কোথায় গে জাগপো? আর যাই হোক বেবুশ্যি হ’তি পারবো না। মেয়িডারে ছেড়ি—তার রুগ্ন বাপডারে ছেড়ি নাম লেখাতি পারবো না লাইনে গ্যে। তবুও বাঁচতি হবে- বাঁচতি-ই হবে। এই পাঁচশ টাকা আর গতর দিয়ে নতুন ক’রে বাঁচতি হবে। সুলেখা, আসমারা যেমন ক’রে বাঁচে তেমন ক’রে নয়। রীতিমতো পরিশ্রম ক’রে, আরও মেহনত ক’রে বাঁচতি হবে- বাঁচাতি হবে আরও দুটো মুখ। 

কৃত্রিম আলো ছেড়ে নক্ষত্রের আলোর দিকে পা বাড়ায় নলিনী। যেতে যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বাংলার বোতলের শেষ নির্যাশটুকু চেটেপুটে নিচ্ছে ম্যানেজারের।

                                       


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন