শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

নবনীতা সান্যাল।। পারক গল্পপত্র



(এক) 


".......শোভনাদি ঘুমাবেন না, স্টপেজ এসে গেল ..এরপরেই আমরা নামব । উঠে পড়ুন, রেডি হোন ..শোভনা দি ...শোভো .."

.... হঠাৎই ব্রেক কষে গাড়িটা থেমে গেল । মাথাটা একটু ঠুকে গেল  গাড়ির ছাদে । একটা ঘোর লাগা বিকেল বাইরে তখন ।রোদ মরে এসেছে,এমন  বিকেল । জয়াবতীর তবু মনে  হচ্ছিল যেন কোনো একটা অন্ধকার টানেলে ঢুকে বসে আছে ।চাপা...  অন্ধকার   সব..  দমবন্ধ হয়ে আসছিল ওর ।


এ অবস্থা থেকে জয়াকে ফিরিয়ে আনল দুটো উদ্বিগ্ন মুখ ।ড্রাইভারের পাশের  সিটে বসে ওর দিকে তাকিয়ে সমানে কথা বলে যাচ্ছিল একমাত্র  ছেলে  ঋক ..."মা. মা ..ও মা, ওফফ ..মা, আবার আবার! "ওর পাশে বসে   স্বামী সমরেশ হাত দুটো ধরে ঝাঁকুনি  দিয়ে যাচ্ছিল .".কী হলো, কী হলো?" 

জয়ার  হুঁশ ফেরে "...আরে, ঠিক আছি, ঠিক আছি রে ,  ঠিক আছি আমি ।"


এক ঝলকে আবার মনে পড়ে গেল সে দিনটার কথা ।কী দুঃসহ গরমের দিন ছিল সেদিন ।ঝড়ের পূর্বাভাস ছিলই ..তাই  তো স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছিল । সে  ঝড় কী বাইরেই ছিল কেবল? ভেতরেও তো ঝড়ই এসেছিল সেদিন ।


(দুই)


'ব্রেকিং নিউজ, ব্রেকিং নিউজ.....'  ইন্দিরা ছুটে এসে হাজির হলো কমনরুমে । অসংখ্য প্রশ্নের ঝড়ের মধ্যে যে কথাগুলো  দুলতে থাকল, তা দেখে  জয়াবতীর কান  মাথা  ঝাঁঝা করছিল--


"আরে, আজ একেবারে হাতে নাতে ।"

"বলো কী?  একেবারে বামাল সমেত "

"ইয়েস ডিয়ার , তবে আর বলছি কী ..একেবারে "কট উইথ রেড হ‍্যাণ্ডেড "

"সত্যিই যা তা একেবারে "

"যাহ্ বাবা, যা তা বলছো কেন? একি আজ নতুন নাকি? গত বছর আমার নতুন বোতল টা কীভাবে হাওয়া হল মনে নেই!একেবারে নতুন  ছিল সেলোর বোতলটা ।অক্সি ব্লু কালারের ছিল বোতলটা, মাত্র এক দুদিন ইউজ করে যেই স্কুলে আনলাম ..অমনি হাওয়া হয়ে গেল ।"

"আর ..আমার বইগুলো? পাবলিশার্স থেকে দিয়ে গেল, টেবিলে রেখে ক্লাসে গেলাম, এসে দেখি নেই ..সত্যি বাবা "

"হূমম, আর এবার বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা ..পড়বি তো পড় মালির ঘাড়েই ""


 "প্লিজ, থামো না তোমরা ।বাদ দাও "...জয়া   বলে ফেলল।

"জয়াদি  সবসময় তোমার এই ভালো মানুষি ফলাবে না তো  ...কেন থামব বলো তো? শোভনাদির কেসটা কী নতুন? তবু তুমি কখনো তাকে কিছু বলেছো? কেন বলো না, বলো তো? তুমি না স্টাফ সেক্রেটারি...."ইন্দিরা ঝামটা মারে ।

তানিয়া বলে, "কেন বলবে, পেয়ারের লোক তো .."

দীপা বলে,  "সব দিক সামলে ..সব নৌকায় পা দিয়ে চলছো   জয়া দি"...এটা   চলে  না  সবসময়।"

 "সত্যি তো সত্যিই জয়াদি " পিয়ালি বলে । 


জয়ার প্রতিবাদ ঝড়ের মুখে খড়কুটোর মতো উড়ে যায় । কেন  যে  কিছুই বলা হয় না শোভনাদিকে ?সেকী  শুধুই দুর্বলতা? শোভনাদির  জন্য  বড়  মায়া যে  জয়ার! সব হারিয়ে ফেলা  একটা  নিঃসঙ্গ মানুষ।  অজস্র  কথা বলা  অপমানে  জর্জরিত মানুষ একটা। আজ  নয় বহুকাল ধরেই জয়াকে  সাপটে ধরে আছেন মানুষটা।ক্লাস  না করা   নিয়ে সমস্যা ছিলই এখন এসব  নতুন যোগ  হয়েছে।   

 

    এসব   ভাবতে ভাবতেই   ডাক আসে এইচ এম এর চেম্বার থেকে ।  জয়া হাঁটতে শুরু করে....অনেক  ঝোড়ো মন্তব্য পেছনে  ফেলে ।


(তিন)


বড়দির ঘরে ঢুকে দেখে, শোভনাদি দাঁড়িয়ে আছে মাথা নিচু করে ।একটু পরেই এইচ এম   শুরু করেন "দেখুন...., শোভনা দির কাণ্ড!  আমি কী করব বলুন তো দেখি? আপনার তো বয়স কম হলো না শোভনাদি..এসব কাজ কেউ করে? কেউ মানবে এরপর আপনাকে?  "  

পিন পড়ার মতো সময় কেটে গেলে মুখ তুলে শোভনাদি বলেন, "আমি নেই নাই ।কইলাম তো কি কইরা বেগে গেলো তা আমি জানি না ।"


এবার সশব্দে বোমা ফাটল যেন ..টেবিল চাপড়ে এইচ এম বললেন, "তার মানে? আপনি নেন নি, তো কে নিয়েছে, ?আপনি জানেন না, কে জানে? একদম মিথ্যে  বলবেন না ।লজ্জা করে না আপনার ।এতো বয়স হয়েছে ..যান,যান আপনি.....আমার হয়েছে যত জ্বালা ।কী হলো দাড়িয়ে আছেন কেন ..যান "

....শেষ কথাগুলো যেন আদেশের মতো শোনায় ।মাথাটা তুলে একবার জয়ার দিকে তাকান শোভনাদি, যেন সমর্থন আশা করছেন... তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে যান ।

এইচ এম আবার শুরু করে দেন, "কী মুশকিল বলুন তো, রোগ তো বেড়েই যাচ্ছে এনার । সবে দু বোতল ফিনাইল আনিয়ে ঘরে রাখতে বলে ওদিকে গেছি, আর একটু বাদেই ফিরে দেখি সব হাওয়া । ভাগ্যিস  দীপা বলল, আর উনি ব‍্যাগটা  রেখে সরে  গিয়েছিলেন, তাই সার্চ করে পাওয়া গেল । কী কাণ্ড, ওফফ ..আপনি কী বলেন?" 


মৃদু অন্যমনস্ক   গলায় জয়া বলে, "ছেড়ে দিন"।এমন করে বলে যেন নিজেওশুনতে পাচ্ছে না, নিজের গলা ।কিন্তু, এইচ, এম শোনেন -"আপনি তো বলেই খালাস, কী অবস্থা হচ্ছে দেখতে পাচ্ছেন তো !....।আজ টিচার দের মধ্যে আছে, কাল স্টুডেন্টদের মধ্যে গিয়ে পডলে, কেউ ছেড়ে দেবে ভাবছেন?.....  একটু  কথা  বলতে পারেন তো ..!ওর ফ্যামিলির সঙ্গে কথা বলে দেখুন না।  আপনার পাড়াতেই তো বাড়ি " ..মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে বেরিয়ে আসে জয়া ।


ভাবে, কথা তো বলবে, কিন্তু কার সঙ্গে ?  ছেলেমেয়ে তো  নেই।   আর  স্বামী তো চিররুগ্ন  একজন মানুষ,  একসময়ের    রাজনীতি করা  মানুষটা    সেই কবে থেকে চাকরি ছেড়ে বাড়িতেই বসা ..আর  আছে কে  ?

শোভনাদি যদি অসুস্থই  হয়ে থাকে তাহলে প্রতিদিন স্কুলেই বা কেন আসে?  আর   প্রায়ই না খেয়ে আসে...  বাসে  জায়গা  রাখে   আগে আগে এসে আর  মাঝে মাঝেই  বলে  "   ছাতু খায়‍্যা    আইলাম  ...ভাত   খাওনের   দিশা  পাইলাম  না।  টিফিনে   মিড  মিল  চালায়‍্যা   দিমুনে...".

মিড   ডে   মিলের  দায়িত্বে   ইন্দিরা...  বড়দিও আছেন  । জানে   শোভনাদি।তবু..... এদিকে  ডিম  হলে  প্রায়ই তা  কম  পড়ে...অন্তত    চার  পাঁচখানা  হিসেবের  বাইরে  চলে  যেতে  থাকে। আর  তা  নিয়ে তুলকালাম  করে  ইন্দিরা।    কিন্তু   ডিম  বেমালুম   হাপিস   হয়ে কোথায় যায় তার  খবর কেউ   জানে  না।    হেড মিস্ট্রেসের   কাছে এর মাঝেই   নাকি  কে  বা  কারা   অভিযোগ জানিয়েছে   শোভনাদি  ক্লাসে  ঘুমিয়ে পড়েন।   মেয়েরা  হাসাহাসি  করে  শোভনাদিকে  নিয়ে  এ তো  নিজের  কানেই শুনেছে  জয়া।


    হঠাৎই খুব বিরক্ত লাগতে থাকে জয়াবতীর ।ভাবে শোভনাদির সঙ্গেই কথা বলবে। ডাক্তার দেখানোর কথা বলবে ।যতই অসুবিধা থাক নিজেই জয়া ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে ।

পরক্ষণেই মনে হল কেন? এ দায় জয়ার হবে কেন?  দীর্ঘদিন একসঙ্গে যাতায়াত করেছে বলে?..   প্রতিদিন   নিয়ম করে  জয়ার   খোঁজ  নেন তাই?   অথবা   স্ক‍ুলে  আর  কেউ   এভাবে তাকে   জড়িযে   থাকে না  বলেই ? কেন?  

    

কেন  দায়িত্ব নিতে হবে জয়াকে? নির্বিবাদী ভালোমানুষ শোভনাদি জয়া কে অসম্ভব ভালোবাসেন  আর নির্ভর করেন   বলেই  শোভনাদির সব দায়িত্ব জয়া নেবে? কেন? 


(চার) 


কমনরুমে ফিরে জয়া দেখল, শোভনাদি একাই বসে আছেন, ঘর ফাঁকা --"তর লগেই বইসা আছি ।একলগে যামু কইরা ।বাকি বেকটি চইলা গেছে গিয়া ।  বাস টাস কী পামু আইজ কেডা   জানে ।চল অহন , দেরি করিস না ".....

বিহ্বল জয়া  কাঁধে  ব্যাগ    ঝুলিয়ে হাঁটতে থাকে,পাশে শোভনাদি । 

স্কুল পেরিয়ে রাস্তায় নেমে এসে  শোভনাদি বারবার ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে থাকে, "  "দেখলি, কী কইরা অপদস্থ করল এইচ  এম ।।আমি নিমু কিয়েরে? মাতাই নষ্ট ..কেডায়  থুইল বেগটায় ..এর উত্তর কী দিবার পারতাম না, খুব পারতাম ।দেই নাই, শুধু পরমান নাই দেইখা ।আমারে অপমান করলি ..কর গিয়া ..তর কী বেতন বাড়বো এর লিগ‍্যা  ।"

 এবার আর সহ্য হয় না..জয়া  বলে, "কেন করেন এসব? কী লাভ আপনার? এই অসুখ এবার সারিয়ে ফেলতে হবে আপনাকে ।ডাক্তার দেখাতে হবে .." " বিশ্বাস করস না তুই আমারে ..তুইও বিশ্বাস করস না? " শোভনাদি যেন ফুঁপিয়ে   কেঁদে ওঠে । 


(পাঁচ)


খারাপ লাগে,খুব  খারাপ লাগে জয়ার।   আজ  নয় চাকরি শুরুর  দিন  থেকে এই যাতায়াত। বাসেই  আলাপ.. প্রথম দিন  যেচেই  আলাপ করেন  শোভনাদি  "আরে,আমাগো ইসকুলের  নূতন  দিদিমণি!আয় আয়"...

    জয়া কোনোমতে  বাসে ওঠে ।অনেকক্ষণ নীরবে কান্নাকাটি  করে হঠাৎই থেমে যান শোভনাদি , যেন ঘুমিয়ে পড়েন ।   জয়া তবু কিছু বলে না । ষ্টপেজ এসে গেলেও ঘুম ভাঙে না শোভনা দির ।জয়া ডাকে,প্রতিদিনের মতোই  "শোভনাদি ষ্টপেজ আসছে, শোভনা দি. রেডি হন উঠে পড়ুন এবার "--তবু শোভনাদি ওঠেন না ।এবার জয়া গায়ে হাত দিয়ে ডাকে ।আর  ডাকতেই  জয়ার গায়ে ঢলে পড়েন শোভনাদি ।জয়া চিৎকারে  বাস থামে ।হসপিটালে যেতে হয়   ..


(ছয়)

 

     কয়েক  মিনিটে  সব শেষ ।.. 

যেন একটা  নাটক   চলছিল..হঠাৎ শেষ হয়ে গেল  সেটা।  

পরদিন স্কুলে  যেতে  পারে  না জয়া ,তার পরদিনও  না।

দুদিন পরে  গেলে   সবাই জেরা করে.."..কী হলো... কী  হয়েছিল?  মানুষটা  বড্ড সরল ছিলেন..".এইসব  কথায় জয়া  বিহবল তাকায়।   শোকসভা  হয় একটা  হেরে  যাওয়া ..একটা   আজীবন   অবহেলার   পাত্রীর  জন্য।  দুদিন সেসব হয়    নি     শুধুমাত্র জয়া  আসতে   পারে নি  বলে।   কিন্তু  জয়া  আর  নিতে পারে না...শোকসভার  আগেই   হাউহাউ  কঁদে......।   

     এইচ  এম বলেন" ,বাড়ি   চলে  যান   আপনি..।  আর   শুনুন   চিন্তা করবেন না ওসব নিয়ে বেশি।  একটা ইনসিডৈণ্ট..ভুলে  যাওয়াই ভালো।"


(সাত)


ভুলতে পারে নি   জয়া।

 কোথাও একটা কষ্ট, কুরে কুরে খেযেছে জয়াকে  বাকি চাকরি জীবনে  ।কাউকে আর বলা হয়   না  সমস্তটা ।   একটু   সময় কেন  যে     দেওয়া   হল  না    নির্ভরতার  মানুষকে?  একটু   তো  সময়..একটু   সহানুভূতি   এই  তো..এইটুকুই    তো   দরকার ছিল! কেন  পারল  না  জয়া?    কোনোদিন যা  বলেনি   তাই  বলে  ফেলল কীভাবে?  কেন  বলল?কেন?

 

          অবসরের পরও....এখন ঘুরে ফিরে আসে এই স্বপ্ন।সবাই একইভাবে ডাক্তার কন্সাল্ট্ করতে বলে । উদ্বিগ্ন হয় স্বামী, ছেলে ।  জয়ার   অবশ্য   এরপরে কিছু আর  মনেটনে। থাকে না. ..এরপরে কাজে কর্মে তার  সময় এগিয়ে যেতে থাকে ।

শুধু  কোথায়  যেন একটা জার্নি ..অবহেলিত সময়ের একটা যাত্রা......মাঝে মাঝে এসে একটু একটু নাড়া দিয়ে যায় জয়াকে।  কখন  কবে   সে   আসবে  ...  জয়া  নিজেও  খুব আগে থেকে সেটা   বুঝতে পারে না ....।



1 টি মন্তব্য: