শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সঙ্গীতা এম সাংমা।। পারক গল্পপত্র



কিছুদিন ধরে মনটা ভীষণ ছটফট করছিল বেড়াতে যাবার জন্য, শেষমেশ সুযোগটা হল। আমার দিদাকে দেখভাল করে সেংচি দিদি, তার ভাইয়ের বিয়ে। তাঁদের গ্রামটি আসামে হলেও খুব একটা দূরে নয় , বারবিশা পেড়িয়ে ঘণ্টা তিনেকের রাস্তা। নির্দিষ্ট দিনে বেড়িয়ে পরলাম মল্লামডুবির দিকে, গন্তব্যস্থল- ফুলঝোড়া গ্রাম, উদ্দেশ্য- বিয়ের নিমন্ত্রন রক্ষা। মল্লামডুবি পর্যন্ত রাস্তা খুব একটা খারাপ নয় কিন্তু এর পরেই জঙ্গল শুরু এবং জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চরাই উতরাই রাস্তা। একটা সময় বড় একটি মাঠের কাছে পৌঁছে রাস্তা হারিয়ে ফেললাম। মোবাইল ফোনে নেটওয়ার্কও নেই যে যোগাযোগ করে নেব সুতরাং অপেক্ষায় আছি যদি কারো দেখা পাই। যতদূর চোখ যায় শুধু গাছ আর গাছ সাথে হরেক রকম পাখির ডাক, অচেনা স্থানেও উদ্বেগমুক্ত একটা ব্যাপার। বেশ কিছুক্ষণ পরে জঙ্গলের অদৃশ্য রাস্তা থেকে দাকমান্দা (গারোদের পোশাক) পরিহিত চার পাঁচ জন মহিলা বেড়িয়ে এল। সবার হাতেই একটি করে বিভিন্ন জিনিসপত্রে ভরা ব্যাগ এবং মুরগি ঝোলানো, বুঝতে একটুও অসুবিধে হল না  যে এরা বিয়ে বাড়িতেই যাচ্ছে। এই হচ্ছে গারো সমাজ, কারো বাড়িতে অনুষ্ঠান হলেই হল সাহায্য সবাই মিলে করবেই। তাঁদের ডেকে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গারো ভাষায় জানালাম যে আমি রাস্তা ভুলে দাঁড়িয়ে আছি এবং আমিও বিয়ে বাড়িতে যাব। তাঁদের কথামত গাড়ি মাঠেই পার্ক করে পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করলাম। পৌঁছে দেখলাম কলা গাছ দুপাশে লাগিয়ে সুন্দর গেট বানানো আর নকশা করে রঙিন কাগজ কেটে সুতো দিয়ে আটকে গোটা উঠোন জুড়ে সামিয়ানা টাঙ্গানোর মত করে সাজানো। আমাকে দেখতে পেয়েই সেংচি দিদি ছুটে এল। বড্ড খুশি হয়েছে আমায় দেখে ,বাড়ির সবাইকে ডেকে পরিচয় করালো। গোলমরিচ দেওয়া নুন চা আর তাবুলছু (শিমুল আলু) দিল খেতে, এটি গারোদের অত্যন্ত প্রিয় খাবার। 

দিদির বাড়িটি বাঁশের বেড়া এবং খড়ের ছাউনি দিয়ে তৈরি একদম টিপিক্যাল গারো বাড়ি। আগে আমাদের উত্তরবঙ্গের গারো বাড়ি গুলিও এমনি হত, এখন প্রায় সবার বাড়িই সিমেন্টের তবে আর্থিক ভাবে পিছিয়ে যারা রয়েছে তাঁরা এখনো টিনের বাড়িতে থাকে। বাড়ি ভর্তি লোকজন কেউ বসে নেই সবাই কাজ করছে , কেউ সবজি কাটছে কেউ বা ছামে আদা রসুন থেঁতো করছে , একদল চাল গুড়ো করছে। প্রথমবার নিজের জাতিকে এত কাছ থেকে চিনতে -জানতে পেরে মনে খুবই আনন্দ হচ্ছিলো। কিন্তু কারুর সাথে মন খুলে কথা বলতে পারছিলাম না ভাষার কারণে। একে তো আমি খুব একটা ভালো করে নিজের ভাষা বলতে পারি না তার ওপর আসামের গারো আর উত্তরবঙ্গের গারো ভাষার মধ্যে একটু পার্থক্য আছে। মেঘালয় বা আসামের গারোরাদের ভাষাকে আচি্ক  এবং আমাদের সমতলের গারোদের ভাষাকে আবেং বলা হয়। কিন্তু বিভিন্ন জনজাতির সাথে বাস করবার দরুন এই আবেং ভাষার মধ্যেও বাংলা ও অন্যান্য ভাষা মিশিয়ে এক আলাদাই  ভাষা আমরা ব্যবহার করি। 

এর মধ্যেই আমাকে খেতে দিল “মিমিত্তিম” ভাত যাকে ইংরেজিতে বলে স্টিকি রাইস এবং “দোহ বেন ব্রেংআ”অর্থাৎ বাঁশপোড়া চিকেন যা রেস্তোরা গুলিতে ট্রাইবাল ফুড নামে বেশ বিখ্যাত। এই রান্নাটিও গারোদের খুবই জনপ্রিয় একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। 

যেহেতু আজকেই বাড়ি ফিরে যাব আর এখানে সবাই কাজে ব্যস্ত তাই একটুও সময় নষ্ট না করে গ্রাম ঘুরতে বেড়িয়ে পড়লাম। আমার হাবভাবে সবাই বুঝে গেছে আমি পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসছি। এরাও বাংলাদেশের লোকেদের মত আমাদের বাংলাকে বেঙ্গল বলে।  সবাই কি সুন্দর করে জিজ্ঞেস করছে “বেঙ্গলের কোন গ্রামে বাড়ি? তোমার বাড়িতেই সেংচি থাকে? কত গারো আছে ওখানে?”  হাঁটতে হাঁটতে গ্রাম ঘুরে হাঁপিয়ে গেছি , একটি বন্ধ দোকানের সামনে বাঁশের মাচা দেখতে পেয়ে বসে পরলাম। অবশেষে ফোনে টাওয়ার এল।  দিদার নম্বর থেকে অনেকগুলো মিস্ড কল অ্যালার্ট পেয়ে ঘুরিয়ে ফোন করতেই বলতে লাগল  “এদিক সেদিক একা ঘুরিস না অনেক খারাপ লোক আছে জাদুটোনা করতে পারে , সাবধানে থাকিস নয়তো ওষুধ করে অসুস্থ করে দেবে।“  জানিনা আদৌ তাঁরা এসব পারে কিনা তবে জঙ্গলের আদিবাসীদের নিয়ে এই বদনামটা থেকেই গেল। 

অনেকটা বেলা হল আস্তে আস্তে হাঁটা শুরু করলাম বাড়ির দিকে দেরি হলে আবার বিয়েটা অদেখা থেকে যাবে। বাড়ির কাছকাছি এসেই গেছি প্রায় একজন বয়স্ক লোক খুব ধীর গতিতে শুকনো কাঁশি কাশঁতে কাশঁতে এগোচ্ছে ,  জিজ্ঞেস করলাম -”দাদু ওষুধ খাচ্ছ না?”  উত্তর না দিয়ে আমায় পাল্টা জিজ্ঞেস করল “বেঙ্গলের নাকি?” আমি বললাম হুমম। আমাকে আবার জিজ্ঞেস করল -“থাকবে না চলে যাবে?” আমি বললাম খেয়েই চলে যাব। এরপর কথা না বাড়িয়ে উনি হাঁটতে শুরু করলেন নিজের মত করে , আমিও পেছন পেছন এলাম। 


এদিকে মেয়ে পক্ষ চলে এসেছে বিয়ের জন্য , মেয়ে সুন্দর ভাবে পরিপাটি করে দাকমান্দা পরেছে  সাথে গলা ভরে পুঁতির মালা যা গারোরা নিজেদের ভাষায় বলে রিপ্পক এবং তাঁদের অতিমুল্যবান অলঙ্কার যার নাম থাংকা সরা অর্থাৎ রুপোর টাকার তৈরি মালা ও কানে রুপোর তৈরি দুল বা নাদেলেং। ছেলে পরেছে প্যান্ট এবং শার্ট এবং কাঁধ থেকে কোমর অবধি আড়াআড়ি ভাবে নিয়েছে গারো কাপড় বা পান্দ্রা। তবে বর্তমানে অনেকেই এইসব জাতিগত পোশাকের পরিবর্তে পুরোপুরি খ্রিস্টান মতে বিয়ে করবার জন্য মেয়েরা সাদা গাউন এবং ছেলেরা ব্লেজার ও প্যান্ট পরে।  এইদিকে বিয়ের রীতিনীতি শুরু হয়ে গেছে। আমার কাছে এগুলো যদিও চেনা , আমাদের গ্রামেও এই একই রীতি পালন করা হয়। তবে আমাদের উত্তরবঙ্গে ছেলেরাই বউ আনে, খুব কম জন ঘরজামাই আসে। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। বিয়ে ঠিক হবার পরেই উভয় পক্ষের অবিভাবকেরা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয় পাত্রী ছেলের বাড়িতে আসবে নাকি পাত্র ঘরজামাই হয়ে থাকবে। এই আলোচনা কে বলা হয় চাওয়ারি বা জিক সিংআ । যেহেতু গারোরা এখন বৃহৎ সংখ্যায় খ্রিস্ট ধর্মে বিশ্বাসী তাই বিয়ে ঠিক হবার পরে অভিভাবকেরা ধর্ম যাজককে বিষয়টি জানায় এবং তিনি পাত্রপাত্রীর নাম, তাঁদের অভিভাবকদের নাম, বংশ তালিকা নথিভুক্ত করে নেন যাতে বিয়ের নিয়ম অনুসারে কোন বাধার সৃষ্টির না হয় , এই রীতিকে বলা হয় বান সিংআ এবং এর পরে ধর্ম যাজক সুবিধামত বিয়ের তারিখ নির্বাচন করে দেন। নাম লেখানোর পর তিন সপ্তাহ ধরে গির্জায় নাম ঘোষণা করা হয় যাতে ঐ পাত্রপাত্রীর বিয়েতে যদি কারো কোন সমস্যা বা অভিযোগ থাকে তবে গির্জা কর্তৃপক্ষকে বা ধর্মযাজককে জানাতে পারে। এই নিয়মের বেশ সুবিধা আছে যেমন গ্রামের সকলে জানতে পারছে কবে কার বিয়ে তেমনি কেউ যদি আগে কখনো কোথাও বিয়ে করে থাকে তবে সেটিও সকলে জানতে পারবে। বিয়ের দিন প্রথমে বাকদান পর্ব  চলে , এই পর্বে সমবেত আত্মীয় স্বজনের সামনে পাত্র ও পাত্রী বিয়েতে তাঁদের সম্মতির মতামত প্রদান করে।  বাকদানের সময় পাত্র এবং পাত্রী পক্ষ উভয়ই তাদের হবু বউ ও জামাই এর জন্য সামর্থানুযায়ী সোনা বা রুপোর  আংটি বাকদানের প্রতীক হিসাবে নিয়ে আসে। মতামত নেয়ার পর সেই উপহার সামগ্রী আনুষ্ঠানিকভাবে উভয় পক্ষই একে অন্যের সাথে দেয়ানেয়া করে ।বাকদান অনুষ্ঠান করার পর আর বিয়ে ভাঙ্গা যায় না এবং এই পর্ব শেষ হলে শুরু হয় পান চিনি রাগত্তা বা পান চিনি বিনিময়। মেয়ে পক্ষ পান ও চিনি এবং বাতাসা নিয়ে আসেন সবার জন্য এবং নিজ হাতে উপস্থিত সকলের মধ্যে বিতরণ করেন। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী হবার কারণে গারো রীতি রেওয়াজ শেষ হলে খ্রিস্ট ধর্ম অনুযায়ী  শাস্ত্র পাঠের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের এক সপ্তাহ পরে পাত্র/পাত্রী তার নিজের বাড়িতে আসে বাবা মাকে খাওয়াতে, এই নিয়মকে ফিরাগমন বা ফিরাফিরি বলা হয়।  

বিয়ে শেষ হবার আগেই আমি খেতে বসে পরলাম। যেটা নজর কাড়ল সেটা হল কোন থালা বা প্লেট নয় খাবার পরিবেশন করা হল কলা গাছের ঢঙ্গলে।কয়েক বছর আগে অবধিও আমার গ্রামে শুধু নয় উত্তরবঙ্গের সব গারো গ্রামেই এই ঢঙ্গলেই খাবার দেবার চল ছিল। এখন যুগের সাথে পরিবর্তন এসছে , অনুষ্ঠান গুলিতে জায়গা করে নিয়েছে প্রথমে শাল পাতা তারপর প্লাস্টিক বা থার্মোকলের প্লেট। খাবারের আয়োজন ছিল খুব সাধারণ- ভাত, একটা ঘণ্ট সবজি, ঐতিহ্যবাহী কিছু গারো রান্নার পদ যেমন- গারোদের প্রিয় শূকরের মাংসের ফুরাখাড়ি (চালের গুড়ো ও খাবার সোডা দিয়ে তৈরি) ,মুরগির মাংসের কাপ্পা এবং জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করে আনা চালতার চাটনি। 


উত্তরবঙ্গে  দমনপুর, কালকূট বস্তি, পানিয়ালগুড়ি বাদে অন্যান্য গারো গ্রাম গুলি অত্যাধিক বাঙালী এবং অন্য জাতির সাথে বাস করবার কারণে তাঁদের পোশাক ও খাদ্যাভাসে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আসাম ,মেঘালয় এমনকি বাংলাদেশের গারোরা মনে করেন যে উত্তরবঙ্গের গারোরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রায়। তাঁদের ধারণা আমরা আমাদের ভাষা , নিজস্ব সংস্কৃতি, আচার-আচরন , আদব-কায়দা সব ভুলতে বসেছি। কিন্তু এমনটা নয়, আমরাও অন্য গারোদের মত খুব সামাজিক। এখনো গ্রামে কারো বাড়িতে বিয়ে ,শ্রাদ্ধ বা অন্য যে কোন অনুষ্ঠানে সবাই মিলে মিশে কাজের দায়িত্ব ভাগ করে নেয়, বিয়ে হলে দুদিন আগে থেকে শুরু হয় আনন্দ করা। গারো সমাজের কাউকেই আলাদা ভাবে নিমন্ত্রন করতে হয় না বা কাজ করতে আসবার জন্য বলতে হয় না। তাঁরা মনে করেন এটা নিজেদের দায়িত্ব এবং উপস্থিত থেকে সকল প্রকার সাহায্য করে।  রাত জেগে কীর্তন, নাচ-গান, কাজ-কর্ম সবই করা হয়। সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হল যার বাড়ি অনুষ্ঠান তার যাতে আর্থিক সমস্যা না হয় তাই গ্রামের সব গারো পরিবার নিজেদের সামর্থ্য মত কেউ চাল-ডাল-সবজি, কেউ মশলাপাতি, কেউ মাছ-মাংস অথবা কেউ টাকা তুলে দেয় বাড়ির কর্তা/ কর্ত্রীর কাছে। গারো কৃষ্টি মতে , এই সাহায্য গুলো ভবিষ্যতে ফিরিয়ে দিতে হয় , কেউ মুরগি বা ছাগল দিয়ে সাহায্য করলে তাকেও তার বাড়ির কোন অনুষ্ঠানে একই জিনিস দিতে হবে নয় ঋণ থেকে যাবে। বর্তমানে এত নিখুঁত ভাবে হিসেব রাখা সম্ভব হয় না কিন্তু যথাসাধ্য চেষ্টা করে ফিরিয়ে দেবার। এছাড়াও আরও একটি প্রথা গারো সমাজে খুব নিষ্ঠার সাথে পালন করা হয় তা হল জাসি চাআ বা পা খাওয়া অনুষ্ঠান। বিয়ে বা অন্য যে কোন অনুষ্ঠানে আত্মীয় বা যে কেউ কোন শূকর বা ছাগল সাহায্য দিলে মূল অনুষ্ঠানের পরের দিন আবার খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় এবং পশুটির একটি পা সাহায্যকারীকে ফেরত পাঠানো হয়। গারোদের এই সামাজিক মূল্যবোধ এখন শক্তভাবে বিদ্যমান। আত্মীয়তার সম্পর্ক ভালো রাখবার জন্য গারোরা সামাজিকতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং গোত্রগত বন্ধনও খুবই সমৃদ্ধ।  

খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম , গ্রামের সবাই খেতে বসছে এক এক করে। বাড়ির দিকে রওনা হব বলে বিদায় নিচ্ছি এই সময় পরিচয় হল সেই গ্রামের নকমা বা গাঁওবুড়ো অর্থাৎ গারো সমাজের প্রধান একনিষ্ঠ ব্যাক্তির সাথে। উনার নাম বেঞ্জামিন মারাক, বয়স আনুমানিক ষাট ছুঁইছুঁই করছে। নকমা সাধারণত গ্রামের মানুষদের দারা নির্বাচিত হন এবং সমাজ ও গ্রামের সাধারণ মানুষ সবার সমস্যা সমাধান করে থাকে, সালিশি সভার ব্যবস্থা ও বিচার করেন এবং তার মতামত কেই সর্বোত্তম হিসেবে ধরা হয়। যেহেতু উনি সমাজের সন্মানীয় ব্যাক্তি তাই উনাকে খুতুপ বা পাগড়ি পরানো হয়েছে সাথে যুক্ত করা হয়েছে মোরগের লেজের পালক দিয়ে তৈরি দোহমি। তাঁর পরনে ছিল সাদা ধুতি। ধুতি পরার চল আছে গারো সমাজে এবং তাঁরা এটিকে মার্জিত পোশাক মনে করে। উনি আমার কাছে জানতে চাইলেন আমাদের গ্রামেও নকমা আছে কিনা। উনি আরও জানতে চাইলেন উত্তরবঙ্গের মান্দিরা অর্থাৎ গারোরা নিজেদের সংস্কৃতি ধরে রেখেছে কিনা এবং নিজেদের ভাষা, গান,নাচ এসব চর্চা এবং গারো রীতিনীতি সঠিক ভাবে পালন করে কিনা, আমি যথাযথ উত্তর দিলাম তাকে। তাঁকে জানালাম আমাদের উত্তরবঙ্গে এখন একটাই প্রধান সমস্যা সেটা হল ঐতিহ্যিক মাতৃসমাজ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মের অনেক ছেলেমেয়েরাই এখন মায়ের পদবির বদলে বাবার পদবি ব্যবহার করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরকারি অফিসের কর্মচারীরা অনেকেই গারোদের মাতৃতান্ত্রিক সমাজের  ব্যাপারে অবগত নন তাই দরকারি কাগজপত্রে পিতা এবং সন্তানের পদবি এক করে লিখে দেন। এতে কাগজপত্র ঠিক করবার জন্য তাঁদের হয়রানিও হতে হয়, এই কারনেও অনেকে পিতামাতাই সন্তানের জন্য পিতার পদবি ব্যবহার করে।  উনি আরও অনেক কিছুই বললেন কিন্তু আমি অনেক কথাই বুঝে উঠতে পারিনি। শেষে ক্ষমা চেয়ে বললাম আমি ঠিক পারি না গারো বলতে, বেশ দুঃখ ও আক্রোশের সাথে বললেন নিজের ভাষা বলতে না পারাটা কিন্তু লজ্জার, নিজের জাতি ও নিজের ভাষাকে অবহেলা করা ঠিক না। আমি নির্লজ্জের মত মাথা নেড়ে জানালাম যে আচ্ছা শিখে নেব খুব তাড়াতাড়ি। একটা প্রণাম ঠুকে বিদায় নিলাম। 

গাড়ি যেহেতু মাঠে পার্ক করা তাই হাঁটতে শুরু করলাম , সেংচি দিদি এগিয়ে দিতে এসেছে । আবার সেই হুপিং কাঁশির বুড়োর সাথে দেখা, কাঁশতে কাঁশতে বাড়ি ফিরছেন উনিও। আবার জিজ্ঞেস করলাম – “ওষুধ খাও না ?” ফিরে তাকিয়ে জানালো কাংকিল (কুলের) গাছের বাকল থেঁতো করে খেয়েছে। আমি অবাক হয়ে বললাম এসব খেলে সারে নাকি?? পারলে ডাক্তার দেখিয়ে কফ সিরাপ নয় বন তুলসিপাতা মধু দিয়ে খাও এদিকে তো পাওয়া যায় সহজেই। আবার বলে উঠল কাল সিলিংবলের ( কলকে গাছের)আঠা খাবে না লাগাবে এমন কিছু একটা, ঠিক বুঝিনি। আমি জানতাম কলকে ফুল খুব বিষাক্ত কিন্তু উনি এসব ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করছেন জেনে খুব কৌতূহল হল। জিজ্ঞেস করলাম আপনি গাছগাছালির ওষুধ বানান নাকি ?? আমাকেও কিছু শিখিয়ে দেবেন চলুন উঠুন আমার গাড়িতে আপনাকে বাড়ি নামিয়ে দিচ্ছি। এতোটা পথ এলাম কিপটে বুড়ো শুধু বলল বিয়েতে যে এত্ত মাংস খেলে এর পর যদি ডায়রিয়া হয় তবে চালতার পাতা বা বাকল আর খাবার হজমে সমস্যা হলে আতা ফলের পাতা বেঁটে রস করে খেয়ো। এগুলো নাকি গারো ওষুধ, বহুকাল থেকে এসব গাছ গাছালির রস খেয়েই নাকি অনেক রোগের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে তাঁরা। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম অবশ্য এসব সম্পর্কে একদমই ওয়াকিবহল নয়,অ্যালোপ্যাথি এবং হোমিওপ্যাথিতেই ভরসা করে। 


সন্ধ্যে নেমে এল , বুড়ো দাদুকে নামিয়ে দিলাম তার বাড়ি। আমাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে বাড়ি থেকে পাঁচ ছয়টা জংলী লেবু এনে দিল আর করুণ মুখে জিগ্যেস করল “মাটগ্রিক কে চেনো?? মাটগ্রিক চিসিম, ও জংশনের পাশে থাকে।“  মাথা ঝাঁকিয়ে না বললাম। আমি তো কোনোদিন শুনিনি এই নাম , কি জানি থাকতেও পারে সবাইকে তো আর চিনিনা। কথা বাড়ালাম না আর নয়তো আমার এবার ফিরতে খুব দেরি হয়ে যাবে , বিদায় নিয়ে চলে এলাম বাড়ি। 


দিদাকে জিগ্যেস করলাম মাটগ্রিক নামের কোন লোককে চেনে কিনা , দিদা বলল – “কবিরাজি ওষুধ করত , ও তো মাদং !! “

মাদং ?? এটা আবার কি জিনিস ? 

 দিদা আবার বলে উঠল “ গারো নিয়ম জানিস না? একি মাহারি (গোত্র) বিয়ে করা যায় না , আর করলে গ্রাম থেকে বের করে দেয়। একি গোত্রের সবাইকে ভাই বোন মানা হয়।”


দিদার কাছেই শুনলাম আগেকার সমাজ খুব কড়া ছিল , প্রথাবিরোধী কাজ করলেই সামাজিক ভাবে বয়কট করা হত নয় গ্রাম ছাড়া। মাটগ্রিক বুড়ো আসাম থেকে পালিয়ে আমাদের গ্রামেও এসেছিল আশ্রয় নিতে কিন্তু তখনকার নকমা তাকে থাকতে দেয় নি এই ভয়ে পাছে এই গ্রামের যুবক যুবতীরা এই একই ভুল না করে বসে। এরপর নাকি গারোবস্তিতে চলে যায়। কিন্তু কিছুদিন পরেই উনার স্ত্রী মারা যায়। এর থেকে বেশি দিদা জানে না। 

ফুলঝোড়ার প্রত্যেক মানুষের মুখ গুলো চোখে ভাসছে , বিশেষ করে ওই বুড়ো দাদুর কথা খুব মাথায় ঘুরছে ।  নিশ্চয়ই মাটগ্রিক চিসিম ঐ দাদুর আত্মীয় নয় বন্ধু হবে , দুজনেই অনেক ঔষধি গাছ চেনে। ওই গ্রামের নকমার কথা গুলোও মনে করলেই কষ্ট লাগছে। মোবাইলটা অন করে একটা গারো ডিকশনারী অ্যাপ ইনস্টল করলাম, ভাষাটা শিখতেই হবে নয় লজ্জায় পড়তে হবে। তবে আমার গ্রামেও নকমা ছিল জেনে বেশ ভালো লাগল।  ঘুম থেকে দিদাকে তুলে আবার জিগ্যেস করলাম এখন নকমা নেই কেনো?  বিরক্ত হয়ে জবাব দিল – 

                                          “ কলিযুগের পুলাপান

                                                বাপরে কয় তামুক আন

                                                        মারে কয় কুটনি বুড়ি । ”


চারিদিকে খোঁজ নিতে শুরু করলাম মাটগ্রিক বুড়োর। জানিনা আদৌ বেঁচে আছে কিনা তবুও চেষ্টা করি দেখি। গারোদের বসতি যেসব এলাকায় কোথাও বাদ রাখিনি কিন্তু কেউ কোন খবর দিতে পারল না। সবার একই কথা আগে উনি সব গ্রামেই নাকি ছিলেন কিন্তু তারপর কোথায় গেছে জানেনা। একদিন নিজেই বেড়িয়ে পরলাম গারোপাড়া রেল স্টেশন সংলগ্ন এলাকায়। রাজাভাতখাওয়া স্টেশনের ঠিক পরের স্টপেজ। ওখানে এখনও গারো বস্তি আছে তবে গারোদের বিন্দু মাত্র অস্তিত্ব নেই। মাটগ্রিক বুড়োর খোঁজ করলাম কেউ চিনতেই পারলনা। খুব হতাশ হয়ে ফিরে এলাম। কিছুদিন পর এক দাদা জানালো বক্সা দুয়ারের কাছে নাকি গারো পরিবার আছে তবে সঠিক ঠিকানা জানে না।  তার কিছুদিন পর আরও একজন খবর দিল কাঞ্চি বাজার পেড়িয়ে রায়ডাক নদীর চড়ে ভূটান বর্ডারের কাছে গারো পরিবার হয়তো আছে। কিন্তু খুব কষ্টকর এভাবে একজন মানুষকে খুঁজে বের করা। 

এর মধ্যে সেংচি দিদি ফিরে এলে জানতে পারলাম মাটগ্রিক বুড়ো নাকি ওই বুড়ো দাদুর ভাই এবং দিদির কাছেও নাকি অনেক বার খোঁজ চেয়েছে।আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল আমার , পরের দিনই বেড়িয়ে গেলাম মারখাটার কাঞ্চি বাজার এলাকায়। যতটা পারলাম স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বললাম কিন্তু লাভ হল না।তবে তাঁর জাতির প্রতি ভালবাসা ছিল কিন্তু প্রবল, উনি একটি ভুলের কারণে কোথাও স্থায়ী আস্তানা গড়তে পারেনি ঠিকই কিন্তু তা সত্ত্বেও বহু বার আশ্রয় খুঁজেছে  প্রতিটি গারো গ্রামে শুধুমাত্র নিজের জাতির সান্নিধ্যে থাকবার জন্য। তবে সব গ্রাম কিন্তু তাকে ফেরায়নি একপ্রকার অপরাধ বোধের কারনেই তিনি টিকতে পারেনি। 

কষ্ট হল ফুলঝোড়া গ্রামের দাদুর জন্য ,পারিনি খুঁজে বের করতে তাঁর ভাইকে তবে গারোদের ইতিহাসটা যে ভুল নয় তার প্রমান দিল এই মানুষটি। সত্য যে গারো জাতি যাযাবর যেখানেই পাহাড় ও জঙ্গল পেয়েছে আবাস গড়েছে। শান্তিপ্রিয় সরল গারো জাতি কারোর উপরে কর্তৃত্বও করে নি, অন্যদিকে কারোর কাছে মাথানত, বশ্যতা স্বীকার করেও চলতে চায় নি। তবে ইতিহাস এটাও বলে গারোরা দলবেঁধে একসাথে থাকতে ভালোবাসে কিন্তু এখানে মাটগ্রিক বুড়ো সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে দলচ্যুত হয়েছে। 

এরপর প্রায় অনেকটা সময় কেটে গেছে , এখন আমাদের গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে চলছে নবান্ন অনুষ্ঠান। সবাই ব্যস্ত ধান ভাঙাতে চাল ঝাড়তে। উত্তরবঙ্গের শুধুমাত্র কালচিনি ব্লকের কালকূট বস্তিতে দামা (লম্বা ড্রাম), বাঁশি, করতাল ছাড়াও গারোদের বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে নাচ গানের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠান করে নবান্ন উৎসব বা ওয়ানগালা পালন করা হয়। বাকি গ্রাম গুলিতে সবাই নিজের বাড়িতেই গ্রামবাসীদের ডেকে ইশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে নতুন চালের ভাত খাওয়ায়। আজ আমাদের বাড়িতে নবান্ন উৎসব উপলক্ষে সবার নিমন্ত্রণ। গ্রামের মোটামুটি সবাই জানত মাটগ্রিক বুড়োকে খোঁজার ব্যাপারটা, খাওয়া শেষে বয়স্ক দু-তিন জন আমায় জানিয়ে গেল মিদ্দি খ্রংনা বা গ্রংনা- এর সম্পর্কে। গারোদের আদি ধর্ম  সাংসারেক-এর মতে এই দেবতা হল নিরাপদে বন জঙ্গল পার করতে সাহায্য করে এবং বন্য জীব জন্তুর হাত থেকে রক্ষা করে। তাঁদের বিশ্বাস হয়তো মাটগ্রিক বুড়ো যেহেতু গাছ গাছালির ওষুধ বানাতো নিশ্চয়ই জঙ্গলেই কোন দুর্ঘটনা ঘটেছিল। পরিস্কার ভাবে জানা যায়নি তাঁর জীবনের কি পরিণতি হয়েছিল, আদৌ বেঁচে আছে কিনা সেটিও স্পষ্ট নয়। তবে তাঁর জীবন নিয়ে অনেক গল্প এখন লোকমুখে শোনা যায়। ফুলঝোড়া গ্রামের অনেকেই মনে করে মাটগ্রিক বুড়ো উত্তরবঙ্গ ছেড়ে আসামে ফিরে কামরূপ জেলার গোবর্ধন গ্রামে থাকতে শুরু করেছিল এবং মায়াং পাহাড় নাকি তাঁর জীবন কেড়ে নিয়েছে। গোবর্ধন গ্রামের আদি গারোরা অভিশপ্ত মনে করে এই পাহাড়কে। যারাই পাহাড়ে গিয়েছে কেউ নাকি ফিরে আসেনি। এখনও কেউ পাহাড়ের ওপরে ওঠে না, শুধু বড় বড় মানুষাকৃতি পাথর দেখা যায় এবং সেই এলাকার বাসিন্দাদের কাছে শোনা যায় প্রাচীন কালে পাহাড়ের মাথায় একটি নগর ছিল এবং অপদেবতার রোষে কোন এক কারণে সবাই একদিন পাথরে পরিণত হয়ে যায়। আদি ধর্ম সাংসারেকে বিশ্বাসী গারো জাতি ছাড়াও অন্যান্য আদিবাসীরা নানান দেবতা এবং অপদেবতার পূজা করে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের মুক্তির জন্য এবং অনেকে নাকি তাদের মুখে মাটগ্রিক চিসিমের নাম উচ্চারণ করতে শুনেছে।   

 

৪টি মন্তব্য: