শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

রতন শিকদার ।। পারক গল্পপত্র



সদর দপ্তরের দিকে যাওয়া

মূল রচনা: ইতালো কালভিনো

ভাষান্তর :রতন শিকদার


হাঙ্কা বন, আগুনে প্রায় ধংস হয়ে গেছে, লালচে পাইনের সূঁচের মতো পাতার মাঝখানে পোড়া গাছের গুঁড়িতে ধূসর বর্ণ। দ'জন মানুষ, একজনের কাছে অস্ত্র অন্যজন নিরস্ত্র, গাছপালার মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে নেমে যাচ্ছে।


সশস্ত্র লোকটা বলছিল, “সদর দপ্তর, তারা সদর দপ্তরের দিকে যাচ্ছে। বড়োজোর আর আধ ঘন্টার হাটা পথ।”


“আর তারপর


“তারপর কী?


নিরন্তর লোকটা বলল, “তারপর তারা আমাকে চলে যেতে দেবে কি? সে প্রতিটি উত্তরের প্রতিটি শব্দ শুনে যাচ্ছিল যদি একটা মিথ্যে আভাস খুঁজে পাওয়া যায়।


সশস্ত্র লোকটা বলল, হ্যা, ওরা তোমাকে ছেড়ে দেবে। আমি ব্যাটেলিয়ান থেকে আনা কাগজপত্র তাদের হাতে দেব, তারা সেগুলো তাদের তালিকায় ঢোকাবে, তারপর তুমি বাড়ি চলে যেতে পারবে?”


নিরন্তর মানুষটা মাথা নাড়াল আর মনে হল সে আশা ছেড়ে দিয়েছে।


“ওহ, তারা এসব করতে অনেকটা সময় লাগায়। আমি জানি ...? সে বলল, বোধহয় শুধুমাত্র অন্য লোকটা কথাটা আবার বলবে বলে:


'আমি বললাম তো, তারা তোমাকে তখনই চলে যেতে দেবে।”


সে বলে চলল, “আমার আশা । আমি আশা করছিলাম আজ বিকেলেই বাড়ি ফিরে যেতে পারব । আহ, ভালো, ধৈর্য”


সশস্ত্জন উত্তর দিল, 'আমি বলছি তো তুমি পারবে। শুধুমাত্র কয়েকটা প্রশ্ন, আর তারা তোমাকে চলে যেতে দেবে। গুপ্তচরদের নামের তালিকা থেকে তোমার নামটা কেটে দেবে।”


“তোমাদের কাছে গুপ্তচরদের নামের একটা তালিকা আছে বুঝি £


“অবশ্যই আছে। আমাদের কাছে সব গুপ্তচরদের নাম আছে। আর আমরা এক এক করে তাদের পাচ্ছি”


“তাতে আমার নামও আছে?”


হ্যা তোমার নামও আছে। তারা ঠিকঠাক ভাবে তোমার নামটা কেটে দেবে, নাহলে আবার তোমাকে ধরে নিয়ে যাবার বিপদটা থেকে যাবে।


তাহলে আমার নিজেরই সেখানে যাওয়া উচিত, যাতে পুরো জিনিসটা তাদের আমি বুঝিয়ে বলতে পারি।”


“আমরা এখন সেখানেই যাচ্ছি। ব্যাপারটা তাদের ঠিকঠাক পরীক্ষা করে দেখতে হবে।


নিরস্ত্রজন বলল, “কিন্ত এরই মধ্যে, এরই মধ্যে তোমরা সবাই জেনে গেছ যে আমি তোমাদেরই পক্ষে আর কখনওই আমি গুপ্তচরের কাজ করিনি।”


“ঠিক তাই। আমরা এখন এবিষয়ে সবই জানি। তোমাকে এখন চিন্তা করতে হবে না।


নিরন্তর মানুষটা মাথা নাড়াল আর চারপাশে তাকিয়ে দেখল। তারা একটা বড়ো ফাকা জায়গায়, আগুনে মৃত ঝলসে যাওয়া পাইন গাছ আর ভেঙে পড়া গাছের ডালে সাজানো জায়গাটা । তার পথ ছেড়ে চলে গিয়েছিল, আবার খুঁজে পেয়েছে আবার পথ হারিয়েছে, আর বনের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা পাইন গাছের মাঝখান দিয়ে এলোপাথারি হেঁটে চলেছে। নিরস্ত্র মানুষটা এ অংশটা চেনে না। হান্কা কুয়াশার স্তরের ভেতর দিয়ে সন্ধে গড়িয়ে নামছে, নীচের বন অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেছে। পথ ছেড়ে যাওয়াতে সে চিন্তায় পড়ল; যেহেতু অন্যজন মনে হল এলোমেলো হেঁটে চলেছে। সে আবার পথ খুঁজে পাবার আশায় ডানদিকে ঘেঁষে চলতে থাকল: অন্যজনও ডানদিকেই চলল, মনে হয় এলোমেলোভাবে। তারপর যেখানেই সহজভাবে হাঁটা গেল নিরস্ত্র মানুষটা তখনই ফিরে তাকাল, দেখতে পেল সশস্ত্র মানুষটা তাকে অনুসরণ করে চলেছে।


সে মনস্থির করে জিজ্ঞেস করল, “সদর দপ্তরটা কোথায়?”


সশস্্জন উত্তর দিল, “আমরা সেদিকেই যাচ্ছি। এবার শিগ্িরই তুমি সেটা দেখতে পাবে।”


কিন্ত কোন জায়গায়, মোটামুটি কোন অংশে?”


সে উত্তর দিল, “ঠিক, কেউ বলতে পারে না সদর দপ্তর আছে একটা জায়গায় বা একটা অংশে। যেখানে থাকার সেখানেই আছে। বুঝতে পারলে?”


সে বুঝতে পারল; সেই নিরস্ত্রজন একজন মানুষ যে বুঝতে পারে। তবুও সে জিজ্ঞেস করল, “সেখানে যাবার কোনো পথ নেই?”


অন্যজন উত্তর দিল, “একটা পথ? তুমি বুঝতে পারলে তো। একটা পথ সবসময় কোথাও যায়। কেউ পথ দিয়ে সদর দপ্তরে যায় না।

তুমি বুঝতে পারলে তো।


নিরস্ত্র মানুষটা বুঝতে পারল, সে সব বুঝতে পারে, সে একজন বিচক্ষণ মানুষ।


সে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কি প্রায়ই সদর দপ্তরে যাও?”

সশস্ত্রজন বলল, 'প্রায়ই। হ্যা প্রায়ই যাই।"


তার মুখটা করুণ, শূন্য দৃষ্টি। সম্ভবত সে-ও এই অঞ্চলগুলো খুব ভালোভাবে চেনে না। মাঝে মধ্যেই সে যেন উদাস হয়ে যাচ্ছে, আর হেঁটেই চলেছে যেন এসবে তার কিছু আসে যায় না।


সে উত্তর দিল, “তোমাকে সাথে করে নিয়ে যাওয়াটাই আমার কাজ। আমিই সে লোক যে অন্যদের সদর দপ্তরে নিয়ে যায়।"


তুমিই তাদের দূত, তাই না?


সশস্ত্জন বলল, “একদম ঠিক। তাদের দূত।”


নিরস্জন ভাবল, “এক অদ্ভুত দূত, যে পথই চেনে না। কিন্তু... সে ভাবল, যদি আমি বুঝে ফেলি সদর দপ্তরটা কোথায় সেজন্যে আজ সে পথ ধরে যাচ্ছে না, কারণ তারা আমাকে বিশ্বাস করে না। লক্ষণ সুবিধের না, এখনও তারা বিশ্বাস করল না।” নিরন্ত্রজন না ভেবে পারল না।

কিন্তু যদিও সেটা একটা খারাপ লক্ষণ, তবুও তার মানে এই নয় যে তারা সত্যিই তাকে সদর দপ্তরে নিয়ে যাচ্ছে আর তাদের ইচ্ছে তাকে ছেড়ে দেয়া। এটা ছাড়াও, আরেকটা খারাপ লক্ষণ এই যে বনটা ধীরে ধীরে গভীর হয়ে উঠছে। তারপর এই নীরবতা আর এই মনমরা সশস্ত্র লোকটা।


“তুমি কি সেক্রেটারিকেও সাথে নিয়ে সদর দপ্তরে গিয়েছিলে? আর কলের সেই ভাইদের? আর সেই দিদিমনিকে? এক নিশ্বাসে সে প্রশ্নগুলো করে ফেলল, একটুও ভাবল না যে এটাই নির্ধারক প্রশ্ন, যার অর্থ সবকিছু; সেক্রেটারি, কলের ভাইরা, দিদিমনি, সবাই সেই মানুষ যাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে আর তারা কখনও ফিরে আসেনি, যাদের সম্পর্কে আর কখনও কিছু শোনা যায়নি।


সশস্ত্র লোকটা বলল, “সেক্রেটারি ছিল একজন ফ্যাসিস্ট। কলের ভাইরা ছিল মিলিশিয়াতে, দিদিশনি ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে কাজ করত”


“আমি শুধু অবাক হচ্ছি যে তারা আর কখনও ফিরে আসেনি”


সশস্ত্র লোকটা বোঝাবার চেষ্টা করল, “আমি যা বলতে চাইছি তা হল তারা যা ছিল তারা তাই-ই। তুমি যা তুমি তাই-ই। কোনো তুলনা

চলে না?”


অন্যজন বলল, 'অবশ্যই। কোনো তুলনা চলে না। আমি শ্রেফ কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করছি তাদের কী হয়েছিল।"


সে নিজের সম্পর্কে নিশ্চিত বোধ করল, নিরস্ত্রজন নিজের সম্পর্কে ভীষণভাবে নিশ্চিত। সে হল গ্রামের সব চাইতে বিচক্ষণ মানুষ, তাকে খাটো করা কঠিন। অন্যরা, সেক্রেটারি, দিদিমনি, ফিরে আসেনি; সে ফিরে আসবে। জার্মান সার্জেন্টের কাছে সে বলবে, 'আমি বড়ো কামরাড। বিদ্রোহীরা আমাকে ধরতে পারবে না। আমি তাদের সবাইকে ধরব।” সার্জেন্ট হয়তো হেসে ফেলবে।


কিন্তু পোড়া গাছগুলোকে মনে হল সেগুলো অন্তহীন আর অস্পষ্ট আর ভাবনাগুলোকে অন্ধকার আর অচেনা কিছু ঘিরে ফেলল, ঠিক বনের মাঝখানের ফীকা জায়গাটার মতো।


'আমি সেক্রেটারি আর অন্যদের চিনি না। আমি হলাম দূত।”


নিরস্ত্র লোকটা জোরাজুরি করতে লাগল, “সদর দপ্তরের ওরা নিশ্চয়ই চিনবে?


হ্যা, সদর দপ্তরে ওদের জিজ্ঞেস করবে। ওরা সব জানে।


সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। তাকে সাবধানে হাটতে হচ্ছিল, দেখতে হচ্ছিল নীচের ঝোপঝাড়ে যাতে পা পড়ে ঘন লতাপাতার নীচে লুকনো পাথরের ওপরে তারা পিছলে না যায়; আর এটাও খেয়াল রাখতে হচ্ছিল তার ভাবনা কোথায় চলে যাচ্ছে, যেহেতু উত্তরোত্তর বেড়ে চলা উত্তেজনার মধ্যে তারা একে অপরকে অনুসরণ করছিল, কারণ যদি হঠাৎই আতঙ্ক তাদের সরাসরি গ্রাস করে নেয়।


নিশ্চিতভাবেই তারা তাকে যদি একজন গুপ্তচর ভেবে থাকে তবে তারা তাকে কখনও এভাবে বনের মধ্যে দিয়ে একা এই লোকটার সাথে যেতে দেবে না, এই লোকটা তার দিকে আদৌ খেয়াল রাখছে না; সে চাইলে যে কোনো সময়ই তার কাছ থেকে পালিয়ে যেতে পারত।

ধরা যাক, সে যদি এখনই পালাবার চেষ্টা করে, তাহলে সে, সেই অন্য লোকটা, কী করবে?


সে যখন গাছগুলোর মধ্যে দিয়ে পাক খেয়ে নেমে যাচ্ছিল, তখন নিরস্ত্র মানুষটা একটু একটু করে পথ থেকে সরে যেতে থাকল, বাঁদিক ধরে, যখন অন্যজন ডানদিক ঘেঁষে চলছিল । কিন্তু সশস্ত্র লোকটা, মনে হল, তার প্রতি প্রায় কোনো খেয়াল না রেখেই হেঁটে চলল; ফাকা ফাকা বনের মধ্যে দিয়ে তারা নেমে চলল, এখন তাদের একজনের থেকে অন্যজনের খানিকটা দূরত্ব বহাল রইল। মাঝে মাঝে তারা একে অপরের দৃষ্টির বাইরেও চলে গেল, গাছের গুঁড়ি আর ঝোপঝাড়ের আড়ালে, আর তারপর নিরস্ত্র লোকটা হঠাৎ ঘুরে দাড়িয়ে দেখল অন্যজন ঠিক তার ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে।


তখন অবধি নিরস্ত্রজন ভাবছিল, “যদি তারা এক মুহূর্তের জন্যে আমাকে ছেড়ে দেয়, তাহলে এবার তারা আমাকে আর খুঁজে পাবে না।' কিন্তু এবার সে চিন্তা করে নিজেই অবাক হয়ে গেল, “যদি আমি পালাতে পারি, তাহলে এবার ...+। আর ইতিমধ্যেই সে কল্পনায় দেখতে পাচ্ছে জার্মানদের, জার্মান সেনাবাহিনির ছোটো ছোটো দল, লরিতে আর সীজোয়া গাড়িতে জার্মানরা, একটা দৃশ্য যার অর্থ অন্যদের মৃত্যু আর তার নিজের, একজন বিচক্ষণ মানুষের, যার চাইতে ভালো মানুষ আর হয় না, তার নিজের জন্যে নিরাপত্তা।


এখন তারা বড়ো বড়ো ঘাস আর পায়ের নীচে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গভীর সবুজ বনে প্রবেশ করছে, এই বন আগুনে ছোঁয়নি; মাটিতে ছড়িয়ে আছে পাইনগাছের শুকনো ছুঁচলো পাতা । সশস্ত্র লোকটা পেছনেই রয়ে গেছে, বোধহয় সে অন্য পথ ধরেছে। তারপর, খুব সাবধানে, নিরক্ত্র মানুষটা দীতে জিব কেটে তার গতি বাড়াল, আরও গভীর বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল, পাইনগাছের মাঝখান দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে চলল। হঠাৎই সে বুঝতে পারল সে পালাচ্ছে। তখন এক মুহূর্ত ভয় তাকে পেয়ে বসল; আর সে এটাও বুঝল সে এখন অনেকটা দূরে চলে এসেছে আর অন্যজন নিশ্চয়ই লক্ষ করেছে সে পালাবার চেষ্টা করছে আর সেই অন্যজন অবশ্যই তার পিছু নিয়েছে। একমাত্র উপায় হচ্ছে দৌড়ানো, ব্যাপারটা আরও খারাপ হবে যদি সে পালাবার চেষ্টা করতে গিয়ে আবার অন্যজনের পাল্লায় পড়ে যায়।


মাথার ওপরে পায়ে চলার শব্দ শুনে সে ঘুরে দাঁড়াল; কয়েক গজ দূরে সেই সশস্ত্র মানুষটা তার দিকেই আসছে, ঠান্ডা মেজাজে,

উদাসীন চলনে। হাতে তার বন্দুকটা। সে বলল, এদিক দিয়ে নিশ্চয়ই কম পথ হাটতে হল', আর তাকে ইশারা করল তার আগে আগে হাঁটতে।


সবকিছুই আগের মতো ফিরে এল: এক সন্দেহজনক জগৎ, যেখানে সবকিছুই পুরোপুরি খারাপ হতে পারে অথবা পুরোপুরি ঠিক

হতে পারে, বনটা হাক্ষা হবার পরিবর্তে ঘন হচ্ছে। এই লোকটা একটাও কথা না বলে তাকে প্রায় পালিয়ে যেতে দিয়েছিল।


সে জিজ্ঞেস করল, “এই বনটা, এটা কি চিরকাল এরকমই চলবে?


অন্যজন বলল, এই পাহাড়টা ঘিরে চলবে আর তারপর আমরা পৌছে যাব। একটু সহ্য কর, আজ রাতেই তুমি বাড়ি পৌছে যাবে”


“ঠিক সেভাবেই, তারা কি নিশ্চিতভাবেই আমাকে চলে যেতে দেবে? মানে আমি বলতে চাইছি, ধরা যাক, তারা কি আমাকে পণবন্দি

হিসেবে ওখানে আটকে রাখবে না?”


“আমরা জার্মান নই। আমরা পণবন্দি করি না। বড়ো জোর তারা তোমার জুতোজোড়াকে পণবন্দি করতে পারে যেহেতু আমাদের

সবারই প্রায় পা খালি।"


লোকটা গজগজ করতে লাগল যেন সে শুধু তার জুতোজোড়াকেই হারাবার ভয় করে, কিন্তু মনে মনে সে খুশিই হল; তার ভবিষ্যতের

খুঁটিনাটি, ভালো অথবা মন্দ, সবকিছুই খানিকটা আত্মবিশ্বাসবোধ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করল।


সশস্ত্র লোকটা বলল, ঠিক আছে, তুমি তোমার জুতোজোড়া নিয়ে যখন এতটাই ভাব তখন এটা করা যাক; সদর দপ্তরে যাওয়া অবধি

তুমি আমার জুতোটা পর, আর যেহেতু আমার জোড়া শতছিন্ন তারা ওটা তোমার কাছ থেকে নেবে না। আমি তোমার জোড়া পরে থাকব আর

যখন তোমার সাথে ফিরে আসব তখন আমি তোমাকে ওগুলো আবার ফেরৎ দিয়ে দেব।”


একটা বাচ্চাও বুঝতে পারবে যে ওসব পুরো চালাকির কথা। সশস্ত্র লোকটা তার জুতোজোড়া চাইল, ঠিক আছে, সে যা চাইবে

নিরন্ত্রজন তাই তাকে দিয়ে দেবে, সে একজন বোঝদার মানুষ আর এত সহজে ছাড়া পাবার জন্য সে খুশি হল। সে জার্মান সারজেন্টকে বলবে,

'আমি বড়ো কামরাড। আমি ওদের আমার জুতোজোড়া দিয়ে দিলাম আর ওরা আমাকে চলে আসতে দিল।” সার্জেন্ট হয়তো, জার্মান সৈন্যরা

যেমন হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা বুটজুতো পরে, তেমনই একজোড়া জুতো তাকে দেবে।


“তাহলে তোমরা কারোকেই পণবন্দি কর না? এমনকী সেক্রেটারি বা অন্যদেরও £


“আমাদের তিনজন কমরেডকে সেক্রেটারি নিয়ে গিয়েছিল; কলের ভাইরা মিলিশিয়াদের সাথে মিলে ধরপাকড়ে গিয়েছিল, দিদিমনি

১০ নং ফ্লোটিলার লোকদের সাথে বিছানায় শুয়েছিল”


নিরন্ত্ব লোকটা থেমে পড়ল। সে বলল, "তুমি কি কোনোভাবেই মনে কর না যে আমিও একজন গুপ্তচর? তুমি কি কোনোভাবেই

আমাকে হত্যা করবার জন্যে এখানে নিয়ে আসনি? আর সে হাসছে এমন করে দাত বের করল।


সশস্ত্রজন বলল, “আমরা যদি ভাবতাম তুমি একজন গুপ্তচর তাহলে আমি এটা করতাম না।” সে বন্দুকের সেফটি ক্যাচটা টেনে

পেছনে করল, “আর এই"। সে ওটা কীধের ওপর রেখে এমন একটা ভাব করল যেন সে তাকে গুলি করছে।


গুপ্তচর ভাবল, 'আচ্ছা। ও গুলি চালাচ্ছে না।”


কিন্তু অন্যজন আর কখনও বন্দুকটা নামাল না; তার বদলে সে বন্দুকের ঘোড়াটা টিপে দিল।


গুপ্তচরের শুধুমাত্র এটুকু ভাববার সময় হল, 'সামরিক অভিবাদনে, এটা সামরিক অভিবাদনের গুলি।' আর যখন সে অনুভব করল

ভয়ংকর একটা ঘুষির মতো গুলিটা এসে তাকে আঘাত করল যেটা আর থামল না, ভাবনাটা তখনও তার মনের মধ্যে রয়ে গেল, “ও ভাবছে ও

আমাকে হত্যা করছে, কিন্তু আমি বেঁচে আছি।"


মুখটা নীচের দিকে করে ও পড়ে গেল আর শেব গুলিটা তার চোখে একটা দৃশ্য হয়ে ধরা দিল যেখানে রইল তার মোজাপরা পা আর

তার জুতোজোড়া পা থেকে টেনে খুলে নেওয়া হচ্ছে।


সুতরাং, গভীর বনের মধ্যে সে একটা মৃতদেহ হয়ে পড়ে রইল, তার মুখটা পাইনের সঁচের মতো পাতায় ভরা। ইতিমধ্যে দুশ্ঘন্টা পরে সে পিপড়েতে কালো হয়ে গেছে।




(লেখক পরিচিতি: ইতালো কালভিনোর জন্ম কিউবাতে, ১৯২৩ খরিস্টাব্দে। মাত্র দু'বছর বয়সে তার পরিবার ইতালিতে চলে আসে। পিতার ইচ্ছানুযায়ী কৃষিবিদ্যা নিয়ে পড়াশুনা শুরু করলেও তা শেষ করে উঠতে পারেননি। বহুদিন সাংবাদিকতার পেশায় যুক্ত ছিলেন। তিনি  গল্প-উপন্যাস রচনার পাশাপাশি প্রবন্ধও রচনা করেছেন। ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত রাশিয়া ছাড়া হাঙ্গেরি আক্রান্ত হবার পর কম্যুনিস্ট পার্টির সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। তার মৃত্যু হয় ১৯৮৫ সালে।)


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন