রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

অসিতবরণ বেরা।। পারক গল্পপত্র




পিকলু  আর পিকু দু ভাই বোনে এতক্ষণ বাগানে খেলছিল । সন্ধের মুখে ঘরে এসে ঢুকল । ওমনি ওদের ঠাকুমা তাঁর শোয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে হুকুম করেন ,”দাদুভাইরা , যাও বাথরুমে গিয়ে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত-পা ধুয়ে নাও ।স্যানিটাইজার দিয়ে পরে পরিষ্কার করে নেবে । “করোনা” বলে কথা ! কারোর রক্ষা নেই বুঝেছ ?”  

“ওঃ , বুড়িকে নিয়ে আর পারা গেল না । দিনরাত খ্যাচখ্যাচ । এটা করো না ওটা করো না । তার উপর এখন জুড়েছে “করোনা”। আর পারি না ।“ কিন্তু পিকলু বাথরুমে যায় ।  

“তুমি অসন্তুষ্ট হচ্ছ পিকলু । আমি তোমাদের ভালোর জন্যই বলছি । আমার আর কী ! আমার বয়েস হয়েছে । আজ আছি , কাল নেই । তোমাদের বাবা মায়ের চাকরি-বাকরি  আছে । যতদিন না বড় হচ্ছ আমারই যত জ্বালা । পিকু , বেসিনে হাত ধুলে হবে ? যাও , বাথরুমে যাও ।“  

পিকু কাউকে তোয়াক্কা করে না । সবার সঙ্গে মুখে-মুখে তর্ক করে । তার মা সৃজনী শাসন করেও বাগে আনতে পারেনি । তার বাবা অনুপম বলে ,”বড় হলে দেখবে ঠিক শান্ত হয়ে যাবে ।“ ঠাকুমার কথায় পিকু মুখ ভেংচে বলে ,”পিটপিটে বুড়ি শুধুই আমার খারাপ দেখে  আর মাকে লাগায় ।“  

“সে তুমি আমায় যতই গালমন্দ করো , তোমাদের যাতে ভালো হয় তা তো আমায় দেখতেই হবে । এখন ভালো করে হাত-মুখ ধোও দেখিনি ।“  

পিকলু আর পিকু হাত-পা ধুয়ে গজগজ করতে-করতে দোতলায় উঠে যায় । দোতলায় ওদের তিনটে রুম , দুটো বাথরুম । পিকলু আর পিকুর আলাদা আলাদা বেডরুম , ওদের মা বাবার বেডরুমটা এয়াটাচড বাথ । নিচের তলায় পিকলুর ঠাকুমার বেডরুম । সামনে রয়েছে ড্রয়িংরুম আর বাকি স্পেসে রান্নাঘর , ডাইনিং হল আর বাথ্রুম । তার মানে , পিকুলুর ঠাকুমা সারাদিন নিচের তলায় কেয়ার টেকারের ভূমিকায় । তিনি খবরের কাগজ পড়ে দিবানিদ্রা দেন । সন্ধেবেলায় যেমন সিরিয়াল দেখেন তেমনি দেশ বিদেশের খবর শোনেন । সেই সঙ্গে  জিওগ্রাফি চ্যানেল , আনিম্যাল চ্যানেল  এসবও দেখেন । আসলে নাতি নাতনিদের জন্য নিজেকে আপডেট রাখার চেষ্টা তাঁর ।  

সেদিন রাতেরবেলায় খাওয়ার টেবিলে খেতে বসে সবার উদ্দেশ্যে অনুপম বলে ,”জানো তো , আসছে কুড়ি তারিখে “উম্ফুন” ঝড় ১৮০ কিমি বেগে আছড়ে পড়বে পশ্চিমবঙ্গে । ঝড়ের তাণ্ডবে কী যে হবে বুঝতে পারছি না ।“  

পিকলুর ঠাকুমা বলেন ,”অনু , ঝড়ের বিস্তার প্রায় ১০০ কিমি । আমার মনে হয় , আমরা পশ্চিম মেদিনীপুরের যেখানে আছি তা ১০০ কিমির বাইরে । তাই এখানে বড় জোর ৮০-৯০ কিমি বেগে ঝড় হবে।“   

“মা , সেটাই বা কম কিসে ? গাছপালা কি আস্ত থাকবে ?” অনুপম বলে ।   

সৃজনী যোগ দেয় ,”আহা ইলেকট্রিসিটি থাকবে কি ? না থাকলে জলের সমস্যা , নেট সমস্যা , মোবাইল চার্জ সমস্যা । হাজারো সমস্যা । জাস্ট ভাবতে পারছি না ।“ 

“আমি তো ভাবছি পিটপিটে বুড়ির টিভি দেখার কী হবে ?” পিকু হাসে । 

“আর পেপার পড়া হবে না খিটখিটে বুড়ির । তখন শুধু আমাদের পিছনেই লাগবে । বুঝেছিস পিকু ।“ পিকলু ফোড়ন কাটে ।  

ধমক দিয়ে ওঠে সৃজনী ,” ছিঃ , এই তোদের সভ্যতা-ভব্যতা !  কথার কী ছিরি ! পিটপিটে , খিটখিটে ! ছি ছি , ঠাকুমাকে এভাবে বলতে হয় ? শিগগিরি ঠাকুমাকে  “সরি” বলো ।  

অভ্যাস মতো পিকলু আর পিকু ঠাকুমাকে সরি বলে । কিন্তু ভাই বোনে আড়ালে ভেঙচি কাটে । ঠাকুমা সব বুঝেও স্নেহের বশে চুপ করে থাকেন ।  


নিয়ম মেনেই ঝড় আসে ২০ তারিখের বিকেলেই । ঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে পিকলুরা বসে থাকে । ইলেকট্রিসিটি যথারীতি নেই । ইনভারটারে একটা আলো জ্বেলে নিচের একটা ঘরে সবাই বসে থাকে । শুধু শুধু কি আর বসে থাকা যায় ? সৃজনী একটা বড় বাটিতে করে মশলা মুড়ি আনে । সঙ্গে তেলেভাজা চা । গল্প শুরু করেন ঠাকুমা ,” জানিস পিকলু , ৬৭ সালে বিরাট ঝড় হয়েছিল । কাঁথি মহকুমা জলে থইথই। দুদিন বাস রাস্তা জলের তলায় ।“  

পিকু বলে ,” ঠাকুমা , গুল দিচ্ছ ।“  

তার মুখের কথা কাড়িয়ে অনুপম বলে ,” না রে না পিকু । আমি তখন প্রায় তোর মতন । আমি জানি সেসব কথা । কেন মা , বন্যার কথাই যদি বলো , ২০০৮ সালে কেলেঘাই কংসাবতীতে কেমন বন্যা হয়েছিল বলো তো ! “ 

সৃজনী বলে , “ আমি ভেবেছিলাম ফণীর মতোই ফ্লপ শো হবে এখানে । কিন্তু তা তো নয় । আমাদের এখানেই দেখো বাতাসের কেমন তাণ্ডব ! তাহলে উমফুনের “আই’ পোরসনে কি হচ্ছে ! কাল হয়ত শুনব কত লোকজন পশুপাখি মারা গেছে । কত মানুষ গৃহহারা হবে । চারিদিকে শুধু হাহাকার , হাহুতাশ ।“  

সৃজনীর বলার ভঙ্গিতে ছিল কেমন যেন মন খারাপের স্পর্শ । সবাই মুহূর্তে চুপ করে যায় ।  


পরের দিন সকালে ইলেকট্রিসিটি আসেনি দেখে সৃজনীর কপালে চিন্তার ভাঁজ । সবার উদ্দেশে সে ঘোষণা করে ,” দেখো , সবাই দেখেশুনে জল খরচ করবে । ইনভারটারের অবস্থাও ভালো নয় । টিভি , ফ্যান চালাবে না । পিকুর বাবা , তুমি বাইরে গিয়ে একটু খোঁজ নাও কারেন্ট কখন আসবে । সেই মতো ব্যবস্থা নিতে হবে তো ?”   

অনুপম মাস্কটা আঁটিয়ে নিয়ে বেরিয়ে যায় । ঠাকুমাও গুটি গুটি পায়ে বাগানের অবস্থা দেখতে বেরিয়ে যান । পিকলু  পিকুও ঠাকুমার সঙ্গে বাগানের দিকে বেরিয়ে পড়ে ।  

ওরা বাগানে গিয়ে হতভম্ব হয়ে যায় । কাল ঘরের ভিতরে বাতাসের সাপের মতো ফোঁসফোঁসানি মাঝে মাঝে শুনতে পেয়েছিল । বাড়ির দরজা জানালা বন্ধ থাকায় জিনিসপত্র স্থান বদল করেনি । রাত নটার দিকে ঝড়ের তেজ কমে গেলেও বৃষ্টি পড়ছিল । তাই ওরা ভেবেছিল বাইরের প্রকৃতি বা জনজীবনের চিত্রের অদলবদল ঘটবে না । কিন্তু বাগানে গিয়ে ওরা সমগ্র চিত্র দেখে বুঝতে পারে ঝড়ের তাণ্ডব কাকে বলে ! কাল রাতেও ওদের বাবা ঠাকুমা আশ্বস্ত করেছিল , এখানে ক্ষয়ক্ষতি তেমন একটা হবে না । “তেমন একটা” মানে যে বাগানের গাছপালা ভেঙে তছনছ হবে এমনটা তারা আশা করেনি ।   

ওরা বিস্ফারিত নেত্রে দেখল , তাদের ফলের বাগানে কলম-করা আম, জামরুল, পেয়ারা, সবেদা,পেঁপে, কলা গাছপগুলো যেন মাটিতে শুয়ে ঘুমাচ্ছে । অশোক গাছটা দেখে ওদের সবচেয়ে মন খারাপ করল । অশোক গাছটা পনের-কুড়ি ফুট মতো লম্বা হয়েছিল । লাল লাল ফুল ফুটে থাকত ।   অনুপম অশোক গাছের চারদিকে গোল করে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধিয়ে দিয়েছিল । সময় বিশেষে সবাই সেখানে বসে গল্পগুজব করত । বসন্ত গ্রীষ্মের শেষ বিকেলে ওখানে গিয়ে বসতে খুব ভালো লাগত । ওরা দেখল , অশোক গাছটা পুরো বেদিটা উপড়ে নিয়ে মাটিতে পড়েছে । তা দেখে দু ভাই-বোনের বুক মুচড়ে কান্নার দলা গলার কাছে আটকে থাকে । পিকু বলে ,” দাদা দেখেছিস , আমাদের সাজানো বাগানটা যেন কোন দৈত্য এসে ভেঙে শ্মশান করে দিয়েছে ।“    

পিকলু বলে ,” বাবার কত শখের বাগান ছিল । ইস , বাবা কত না দুঃখ পেয়েছে ! বাগান পরিষ্কার করতেই কয়েকদিন কেটে যাবে । তাছাড়া , লক ডাউনে লোকজন পাওয়াও মুশকিল । কী যে হবে !”  

ঠাকুমা কাছে এসে ওদের বলেন ,” ইস , এক্কেবারে লণ্ডভণ্ড ! বেলগাছটা তো গেছেই , তার উপর দুটো তুলসি চারা লাগিয়েছিলাম তাও উড়িয়ে নিয়ে গেছে ! কী সর্বনেশে কাণ্ড ! কাল ছিল আজ নেই !” 

“তুমি তো কাল বলেছিলে  , কিছুই হবে না । তাহলে ?” পিকু ঠাকুমাকে মুখ ঝামটা দিয়ে পিকলুকে বলে ,”দাদা চল রাস্তার ধারে । বাইরে কী অবস্থা হয়েছে দেখি ।“   

ওরা গেট খুলে রাস্তার ধারে এল । গেটের সামনেই মেন রাস্তা । প্রতিনিয়ত গাড়ি চলাচল করে । সাইকেল মোটরসাইকেল কত যে চলত তা গুণে শেষ করা যেত না । লক ডাউনে  এখন সব স্তব্ধ । ওরা নিশ্চিন্তে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রাস্তার দু প্রান্তে চোখ বুলায় । পিকু বলে ,” দাদা দেখ দেখ কত গাছপালা ভেঙে পড়েছে রাস্তায় ।“  

পিকলু বলে ,”দু একটা ইলেকট্রিক পোস্ট , টেলিফোন পোস্ট কোমর ভেঙে রাস্তায় মাথা ঠুকছে ।  

পিকু বলে ,” ঐ দেখ দাদা , ঝর্ণাদের ঘরের টিনের চাল উড়ে গেছে । সব কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে । ভেঙে যাওয়া জিনিসগুলোর জন্য বড় দুঃখ হচ্ছে রে দাদা ।“  

পিকলু বলে ,” হায় হায় ! তেমাথানির মোড়ে রবীন্দ্রনাথের স্ট্যাচু নিচে গড়াগড়ি খাচ্ছে । গত বছরই তো উদ্বোধন হল । সত্যি পিকু ভাবা যায় না । কাল যা সগৌরবে ছিল আজ তার অস্তিত্ব নেই । প্রকৃতির কাছে মানুষ কত অসহায় ।“  

দুজনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে লণ্ডভণ্ড দৃশ্যগুলো দেখতে থাকে । এমন সময় ঠাকুমা ডাকেন ,” আয় রে দাদাদিদিরা , জলখাবার রেডি । এসে খেয়ে নে ।“ 

পিকু বলে ,” দাদা , কাল ঠাম্মা কি বলেছিল মনে আছে ?”  

“ কী বলত ?“  

“ বলেছিল , আজ আছি , কাল নেই । দাদা , এই ভাঙা গাছপালা ঘরবাড়ি কাল ছিল , আজ নেই । তেমনি মানুষও আজ আছে কাল নেই । তাই না ?” 

বিষণ্ণভাবে পিকলু বলে ,” সত্যি রে , অশোক গাছটা নেই বলে বড্ড মন খারাপ । তেমনি আজ বুঝতে পারছি না কিন্তু ঠাম্মা যেদিন থাকবে না সেদিন আমাদেরও মন খারাপ হবে । ঠাম্মার শূন্যতা আমাদের মনের মধ্যে থাকবে ।“  

“ ঠিক বলেছিস দাদা ।  ঠাম্মাকে আর আমরা ও-রকম কিছু বলব না ।“  

ওরা দুজনে দৌড়ে ঠাম্মাকে জড়িয়ে ধরে বলে ,” ঠাম্মা , এবার সত্যি সত্যি সরি বলছি । তোমাকে আর ককখনো পিটপিটে খিটখিটে বলব না । তুমি আমাদের ছেড়ে ককখনো যেও না ।“  

ওদের ঠাম্মা অবাক হয়ে ভাবেন , ঝড়ের পরে এদের হলো কী  ! ঝড় কি এদের মাথাটা ঘুরিয়ে  দিল !  


 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন