বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

অনুসূয়া সরকার বিশ্বাস।। পারক গল্পপত্র



ভোরের কুয়াশা সরিয়ে স্পস্ট হয়ে উঠছে  পুরনো শহর।

বাসটা ক্রমশঃ পাহাড়পুরের দিকে এগিয়ে আসছে। চারপাশটা অনেক বদলে গেছে।এমনি বৃষ্টি ছিল সেদিন ভোরেও ,যেদিন বিধ্বস্ত অবস্থায় তিন বছরের রাইকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলো নম্রতা। একরত্তি মেয়েটা কোল আঁকরে চুপ করে বসেছিল। এতটুকু কাঁদেনি। বরং যেন আগলে রেখেছিল নম্রতাকে।দেখতে দেখতে সতেরোটা  বছর কেটেগেলো।


এই তো দেবীচৌধুরানীর মন্দির। যেদিন  টকটকে লাল সিঁদুর আর লাল বেনারসি পরে প্রথম পা রেখেছিল এই শহরটায় ,সেদিনই  এসেছিলো এখানে প্রণাম করে নতুন জীবনের আশীর্বাদ নিতে।  ভেজা, ভেজা মায়া চোখে লেপ্টে যাওয়া কাজল  আর একরাশ স্বপ্ন ছিল সেদিন। তারপর  তো কত হেরে যাওয়া বিকেলে সে  এসেছে।…

সেই পাকুড় গাছটা!   চার বছরে যতবার এদিকে এসেছে, ততবার খুঁজেছে গাছটাকে। রঙিন থেকে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া জীবনের নীরব সাক্ষী তো এই গাছটাই!

বাসের হর্নে আর স্মৃতির মেদুরতায় কখন যে ব্যাগে মোবাইলটা বাজছে খেয়ালই করেনি নম্রতা।ফোনটা রিসিভ করে বললো

"হ্যাঁ  রে  রাই, এক্ষুনি ও বাড়ী পৌঁছব। সন্ধ্যের আগে ব্যাক করবো কোচবিহারে দিদির কাছে।..দিদান কে দে তো একটু…" 


৩ 

নেতাজী বাস টার্মিনাস থেকে কয়েক পা এগোলেই চৌমাথার মোড়টা। ডান পাশে সরু কানাগলিতে ঢুকতেই  ঐ তো দোতলা হলদে বাড়িটা। সামনের বেগণভোলিয়া গাছটা নেই বলেই কেমন  যেনো ন্যাড়ান্যাড়া লাগছে।  এই তো আর দু পা এগোলেই বিশাল ফটক। কিন্তু পা গুলো কেন অসাড় হয়ে আসছে নম্রতার? অবশেষে সব দ্বিধা কাটিয়ে কলিংবেল বাজাতেই বেরিয়ে এলো এ বাড়ির জামাই দেবেশ। প্রত্যক্ষ আলাপ নেই।

"আরে আসুন ! একা কেনো রাই কোথায়?"

"ওর ক্যাম্পাসিং আছে।"

" . বাপের ভিটে, ঠাকুমা এদের প্রতি অবশ্য আজকালকার ছেলে মেয়েদের তেমন সেন্টিমেন্ট নেই…যাইহোক,

ম্যাডাম তো  এখন কলকাতার ফ্ল্যাটে? ইস্কুলটা কোথায়?আর পেপারে ফিচার টিচার তো লিখছেন খুব …"

"ওই একটু আধটু."!.

" স্কুল ব্যান্ডেলের কাছে।থাকি উত্তর পাড়া । প্রপার কলকাতা নয়। ফ্ল্যাট না,দিদির ননদের বাড়ির নিচতলায় ভাড়া আছি…"

একাই তো থাকা হয় নাকি? বলেই ফিচেল হাসি হাসে দেবেশ।

"একা কেনো? রাই আর মা থাকে। " দৃঢ়ভাবে বলে নম্রতা।


ইতিমধ্যেই দোতলায় এসে পৌঁছেছে নম্রতা। বড়ো বৈঠকখানাটা এখন রোগিণীর শয্যা। বিছানার একপাশে পরে আছে এক কালের দাপুটে বিভা দত্ত। চারদিকে চোখ বোলাতেই নজরে এলো দেয়ালে ঝুল আর ধুলোর আস্তরণের মাঝে ঝুলছে শুকনো ফুলের মালা জড়ানো দীপকের ছবি।

ত্রস্তব্যস্ত হয়ে ছুটে এলো সোনা। এখন বেশ গিন্নী-বান্নি।

"ও  তুমি?এসো এসো ।মা তো ঘুমোচ্ছে।একটু বসো। তোমার জিনিস তো সব আগেই নিয়ে গেছে তোমার মা ,চিলেকোঠার আলমারিতে কিছু থাকলে নিয়ে যেও। আমরা কারো জিনিস আটকাইনা।"

( ডাক -খোঁজের স্বভাব আজও রপ্ত করেনি!)

বলেই ঈশারায় স্বামীকে ডেকে নিয়ে গেলো।

আয়া মাসী বলে চলে " তুমি বুঝি 

বাবুনদার পর্থম বউ! বুড়ি খুব তোমার নাম করতেছে!"

 তার নাম করছে? আশ্চর্য! কয়েক মুহূর্তের জন্য নম্রতা পিছিয়ে গেলো একুশ বছর আগে। তখন সে পাঁচ মাসের গর্ভবতী। রাত প্রায় বারোটা। সব কাজ সেরে ঘুমনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। দীপক অফিসের কাগজ পত্র নিয়ে একটু বিচলিত। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ে বিচলিত আর উত্তেজিত হওয়াটাই  তার প্রকৃতি। নম্রতা বেশি ঘাটাতোনা। হঠাৎই  

রণংদেহি  হয়ে ছেলের ঘরে কড়া নেড়ে  উপস্থিত হলেন বিভাদেবী।

"ও বাবু দেখ !দেখ !তোর বউ আজ ও হলুদের বয়মের মুখ আলগা রেখে এসেছে। আগে একদিন এভাবে চিনি নষ্ট করেছিল,আমি না দেখলে এখনি সব ছিটিয়ে চিত্তির হতো! বলি বিয়ে বাড়িতে গিয়ে কী মেয়ে দেখে পছন্দ করে আনলি? আমার সংসারটা তো গোল্লায় গেল!"..

"নম্রতা !নম্রতা কি শুনছি এসব?

"আসলে … মা বললেন শেষ পাতে সোনা বেগুন ভাজা খাবে ,  তাই তাড়া

 হুড়োয় খেয়াল করিনি…"



"হলুদ কি তোমার বাবা যোগায় নাকি? "

"বাবার নাম  তুলবেনা। উনি নেই…"

"একদম চুপ! মুখেমুখে কথা বললে  জিভ টেনে ছিঁড়ে দেবো।"

"আহ্ লাগছে! চুলটা ছাড়ো! "

"চল হারামজাদী! মা আর সোনার  কাছে ,ক্ষমা   চেয়ে বল তোর মাস্টার বাবা তোকে শিক্ষা দেয়নি! বল!"

" আহ্ লাগছে! ক্ষমা কেনো চাইবো ? ভুল করে হয়েগেছে। ইচ্ছে করে তো...

" চুপ!  আই! সোনা নিয়ে আয় ওর খাতাগুলো! দেখাচ্ছি মজা ! লুকিয়ে লুকিয়ে কাগজে ফিচার পাঠানো?মন সবসময় উরুউরু ! এক্ষুনি সব ছিঁড়ে দেবো।"


"ও বৌদি চা  খাবা গো! ও বৌদি!"

চারুমাসীর ডাকে সম্বিত ফেরে নম্রতার।

একবার শীর্ণ বিভাদেবীর দিকে তাকায়। এই মৃত্যু পথযাত্রীনির শেষ ইচ্ছে পূরণ করতেইতো আসা! 

পাশের লাল সিমেন্টের ঘরটা ছিটকিনি দেওয়া। চারুর অনুমতি নিয়েই ঢুকলো নম্রতা। এখানেই তার খাট,আলমারি ছিল এক কালে! পরে হয় তো রুম্পা ও এখানে থাকতো! এখন বাতিল জিনিসের আখরা হয়েছে। হয়তো বাতিল হওয়া

 সম্পর্কও?  ঘর? না সেভাবে নম্রতা কোনো বরাদ্দ ঘর পায়নি এ বাড়ীতে। বিয়ের পরপরই উঠেছিল নিচ তলার আলো,বাতাসহীন স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই রাই এলো। বাচ্চার ঠান্ডার ধাত থাকায় উপরের লাল সিমেন্টের ঘর বরাদ্দ হলো । কিন্তু সোনার পড়ার সমস্যা হওয়ায় শেষমেষ রাই আর নম্রতার ঠাঁই হলো  ডাইনিং ঘরের  এককোণে কাঠের চৌকিতে। দরজাগুলোর একটাতেও কোনো পাল্লা ছিলনা ।শ্বশুর মশাই নগেন দত্ত তখনও জীবিত ।একে  অ্যলজাইমা তার ওপর ডায়বেটিস।  যতবার তিনি ঘরের ওপর দিয়ে টয়লেটে যেতেন ততবার ছোট্টো রাইকে ফিডিং করাতে নম্রতাকে অস্বস্তিতে পড়তে হতো। হাজার বুঝিয়েও সুরাহা হয়নি। আসলে বিভাদেবী চাননি দীপক আর নম্রতার কোনো ব্যক্তিগত পরিসর থাকুক।  জিনিসপত্র অবশ্যি নিচতলার ঘরেই থাকতো।

একদিন এটাই তার সংসার ছিল! কই এতটুকু টান আসছেনা তো?  নম্রতার ঠাকুমা বলতেন দিনহাটার বাড়িটা ঠাকুমার স্বামীরভিটে।পরপারে যাবার আগে তিনি ভিটে ছাড়বেননা! সেই ঠাকুমার সংস্কারেই  তো বড় হয়েছে সে! স্বামীর ঘর, সিঁদুর,শাখাপলা, নোয়া এসব ভাবলেই ছোটবেলায় প্রতিটা রোমকূপে যেশিহরন জাগতো সেসব যে কোথায় উবে গেল কবে!

ধীরেধীরে জানালার শিক গুলোতে হাত বোলায় নম্রতা। কত বুক ফাটা কান্নায় এই শিকগুলোর ফাঁক দিয়ে এক ফালি আকাশ খোঁজার চেষ্টা করেছে! ডান দিকের সরু দরজাটা খুলতেই চোখে পরে বাঁকানো সিঁড়িটা। ধীরে ধীরে খানিকটা ঘোরের মধ্যেই ছাদে চলে আসে নম্রতা।এই ছাদটার মধ্যেই মরূদ্যান খুঁজে পেত এক সময় সে! গাছগুলো সব শুকিয়ে মরে আছে। চারদিকে পরিত্যক্ত টব।ওই তো  নম্রতার ফেব্রিক দিয়ে রং করা ছোট্টো টবটা  রঙচটে পরে আছে।  আজও মনে পরছে তখন সবে দুদিন বিয়ে হয়ে এসেছে… আপন মনে গাছে জল দিতে দিতেই পাশের বাড়ির ক্যাসেট থেকে ভেসে আসা  "আমার প্রাণের মাঝে সুধা আছে চাও কী , হায় !বুঝি তার খবর পেলেনা!" শুনছিল আর

সুরেসুরে  গুনগুন করছিল, হঠাৎ পেছন থেকে দীপকের ধুপধাপ চটির শব্দ এগিয়ে আসছিল.. কাঁধে দীপকের স্পর্শে চোখ বুজে রোমান্টিকতার কাব্য লিখছিল সে।না কোনো আবেশেই আবিষ্ট হতে পারেনি সেদিন। দীপক জানিয়ে দিল তাদের সবার বাটি,চামচ,থালা,গেলাস আলাদা। দেখে বুঝে নিতে হবে।গুলিয়ে যেনো না যায়।আর সোনার ঘরে বিছানায় ভুলেও নম্রতা যেন না বসে। সোনার এসব পছন্দ নয়। বলেই চলে গিয়েছিল দীপক! অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে ছিল নম্রতা! আর গানটা শুনতেই পায়নি! বন্ধই হয়ে গেছিলো নাকি  কে জানে!

 আজও চোখে জল এসে গেল নম্রতার?এখনও?  দীপকের জন্য? ভালোবাসা না পাওয়ার জন্য? নাকি  'স্বামী ' নামক অদেখা ব্যক্তিটির জন্য আশৈশব তিলতিল করে জমানো   এক বুক ভালোবাসার এককণাও দিতে না পারার জন্য? সত্যি কোথায় গেলো ভালোবাসাগুলো যার এক কণা ও এই পরিবারের একটি

 মানুষকেও সে দিতে পারলনা।



"ও বৌদি নীচে চলো গো সবাই ডাকছে! "

"তুমি চারু?কতদিন আছো?"

আমি অনেকদিন। আগে ঠিকা কাজ করতাম।এখন  বুড়ির ডিউটি। "তোমার কথা শুনছি অনেকের মুখেই।"

"কী?আমি খুব খারাপ?'

"ধুর ! মানুষ দেইখে চুল পাকলো !

রুম্পা বৌদিও খারাপ না গো! একটু

 ইসস্টরং! বাবুন দাদা যে কি করলো! বেরেন শর্টের অতগুলা ওষুধ!  তুমি আসো শিগগির,আমি যাই নাহলে ভাববে চুকলি কাটতেছি ।"

ধীরে ধীরে  পা বাড়ায় নম্রতা। চিলেকোঠার কাছে এসে পুরনো কাচের   আলমারিটা চোখে পড়ে। ধুলোয় ধূসরিত।এখানেই হয়তো ঘাপটি মেরে আছে দু একটা পুরনো যাপনের  চিহ্ন।সেই লাল কভার ফাইলটা ,না? , বাঁধন খুলতেই হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে এলো ছোট্টো রাই আর দীপকের ছবি !বহুদিনের অযত্নে অস্পষ্ট ,সাদা ছোপ ছোপ। এই তো সেই চিঠিটা! যেটা প্রথম দিনহাটায় গিয়ে দীপককে লিখেছিল। বোকা বোকা,সেন্টিমেন্টাল! ঐ প্রথম, ঐ শেষ।  

 ফাইলটা যেনো জোর করে মনেকরিয়ে দিল আঠেরো বছর আগের  দগদগে স্মৃতিটা । 

সেদিন দীপকের বন্ধুর বিয়ে ছিল। দীপক যাবেনা। কথা ছিল নম্রতা সন্ধ্যের আগেই রাইকে নিয়ে হরিদার রিকশায়  যাবে। সুখের উপকরণ এত কম  ছিলযে ছোটছোট জিনিসে সুখ খুঁজে নিতে হতো। দীপক অফিসে বেরিয়ে গেছে।আলমারি  থেকে লাল সিল্কটা বের করে আয়রন করতে গিয়ে দেখে দীপকের কভার ফাইলটা ছিটিয়ে আছে।ধীরেধীরে সব গুছিয়ে আলমারিতে তুলে রাখে নম্রতা। সচরাচর দীপকের  জিনিস  ঘাটার অভ্যাস তার ছিলনা। বিকেলে সব কাজ এগিয়ে ,তৈরি হতে গিয়ে দেখে আলমারি থেকে সব বের করে স্তুপাকার করা। নম্রতার ভালো শাড়িগুলো সিগারেট দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া আর কাঁচি দিয়ে কাটা। দীপকের চোখগুলো  আর ফর্সা গালদুটো টকটকে লাল হয়ে আছে। নিজেকে সংযত রেখে কি ঘটেছে জানতে চাওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই  ঝাঁপিয়ে এসে  চুলের মুঠী ধরে শুরু হয়েগেলো এলোপাথাড়ি কিল, চড়, ঘুসি।  অভ্যাস বশত চেষ্টা করেছিল শান্তভাবে  পাঁচ কান না করে চার দেয়ালে মিটিয়ে নিতে! কিন্তু সেই সময় পাশবিক বলে বলীয়ান হয়ে দীপক এমন ধাক্কা দিল ,যে সে আছরে পরলো লোহার রেলিংয়ের ওপর! তারপর কতক্ষন যে পরেছিল নম্রতা সিঁড়ির নীচে আজ আর মনে করতে পারেনা। হাতটা ফ্র্যাকচার হয়েছিলো।ওই অবস্থায় মেয়েটাকে খাইয়ে  হাত ব্যাগে বাবার দেওয়া গয়নাগুলো ,২০০ টাকা আর রাইএর দু একটা জিনিস  ভরে ,ভোর হবার আগেই চুপিসারে উঠেবসে ছিল কোচবিহারের বাসে। তারপর তো জামাইবাবু সব সামলালো।পুলিশ কেসের ভয়ে মিউটুয়াল ডিভোর্সটা হয়ে গেলো।এরাও ততদিনে ছেলের মানসিক সমস্যা দেখিয়ে গা বাঁচালো। তখনও দীপক দ্বিতীয় বিয়ে করেনি। ফোনে,চিঠিতে মেরে ফেলার হুমকি দিত। সেই জন্যই দিদি পাঠিয়ে দিল উত্তরপাড়া। সেখানে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি,টিউশনি,আর একের পর এক লড়াই।  

আজ ও ভাবে সেদিন ফাইল থেকে একটা কাগজ খাটের নীচে পড়ে যাওয়ার মাশুল তাকে কিভাবে যে দিতে হয়েছে?  কাগজটা পাওয়াও গিয়েছিলো।কিন্তু কতটা দরকারি ছিল সেটাই তো আর জানা হলনা!


ইতিমধ্যে অনেকেই হাজির।বিভাদেবী বালিশে হেলান দিয়ে বসে।

ছোট কাকিমনি বললেন

"কত দিন পর দেখলাম নম্রতা!  বাবুন চলে যাবার পরও এলেনা? এলেম আছে তোমার। বর ছেড়ে,কলকাতায় গিয়ে চাকরী নিলে,ফিচার লেখালেখি ! এ বাড়ির ছেলেদের মেজাজ তো বরাবরই তিরিক্ষি।আমরা আর পারলাম কই?"



"আপনারাও তো কাকিমা রাইয়ের বাবার খবর যতদিনে জানালেন তখন আসা না আসা এক।কি হয়েছিল সেটাও  বলেননি।"

"কি আর জানাবো বাছা! তুমি মাথা বিগড়িয়ে দিয়ে গেলে ,ওষুধ ধরলো,পরের বউ এসে কোথায় বুঝিয়ে ওষুধ খাওয়াবে তা না ,আরো বাড়িয়ে দিল…. শেষমেষ সেই ওষুধ গুলো একবারে খেয়েই... 

ও সোনা কাদিস না মা!"

"কি করবো বলো কাকিমা! দাদাটা এতো সৎ ছিলনা! আমার মায়ের মত।অন্যায় বরদাস্ত করতোনা। বউ গুলো এমন জুটলো !"

নম্রতার হাসি পাচ্ছিল তবু সংযত হয়ে বললো "এতটাই সৎ ? যে না জানিয়ে বিকারগ্রস্ত ছেলের দুবার বিয়ে দিলেন? হঠাৎই বিভাদেবী বলে ওঠেন

"বৌমা তুমি রাই দিদিকে আনলেনা?ক্যান্সার রোগীটা ফোন করেছিল তাও রাখলেনা কথাটা?"

"পরে আসবে। এখন ক্যাম্পাসিং।"

"আর পরে কি আমি  থাকবো?"

এই বালাটা রাখ।রাইদিদুর বিয়েতে দিও।আর এই শিবলিঙ্গটা রাখ মা।সে মেয়েকে আমি বলতে পারবোনা আর সোনা অত  পারবেনা,

তাই তুমি এর দায়িত্ব নাও।"

গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস নেয় নম্রতা।দেবেশ ইতিমধ্যে দলিল আর জমি_ বাড়ির ম্যাপ নিয়ে হাজির । উকিলী কেতায় বলে চলে

"ম্যাডাম l পুরোবাড়ি আর ফাঁকাজায়গা নিয়ে ৪ কাঠা ৮ছটাক। শ্বসুর মসাই নগেন দত্তের নামে বাড়ী।ওয়ারিশ হচ্ছে,বিভা দত্ত,সোনালী রায়, রুম্পা দত্ত,ছেলে রাতুল দত্ত,আর আপনার মেয়ে রাইমা দত্ত।আপনি তো ডিভোর্সী। এবার আমি রুম্পা বৌদিকে বুঝিয়েছি সরকারি রেটে আমাকে বিক্রি করতে। রাজি হচ্ছেননা।আমি অবশ্য এমন কেস ঠুকে দিয়েছি ও কাউকে বেচতেও পারবেনা।এবার থাকে আপনার মেয়ে।আমরা ভদ্র ফ্যামিলি।রাইকে বঞ্চিত করবনা।আপনারা দানপত্রে কোনো দাবী নেই বলে সই করে দিন। রাই এর বিয়েতে আমরা থােক অ্যামাউন্ট কিছু দেবো। এখন হাত টা খালি…"

আপন মনেই হেসে ওঠে নম্রতা।

দেবেশের দিকে তাকিয়ে  

দৃঢ়ভাবে বলে  "এখন ডিভোর্সী মহিলারও প্রপার্টিতে লিগ্যালি অনেক দাবী আছে।আপনি  বোধহয় জানেননা।"

"মানে… আপনি সহজে মেটাবেননা তাইতো? অত দুর থেকে সব পারবেন?"

"থামুন! আমার কথা শেষ হয়নি।"

বিভাদেবীর দিকে তাকিয়ে বলেন 

"রাই এখন বড়ো হয়েছে। কিছু না কিছু করবেই।ওর বিয়ে নিয়ে আমার কোনো তাড়া নেই। আপনি বালাটা রাখুন।আর শিবঠাকুর আমায় দিচ্ছেন? ভরসা পাচ্ছেন? একদিন তো ঠাকুর ঘরে ঢুকতে 

দিতেননা।যাইহোক ওটা দিতে চাইলে আমি নেবো। এই চেকটা রাখুন সই করা।আপনার ছেলের একটামাত্র এল . আই . সির নমিনি ছিলাম আমি।বাদ বাকি তো আপনি আর সোনা।যখন সব বন্ধন ছেড়ে গেছি তখন এটার জন্য ঋণী থাকতে চাইনা।আপনার চিকিৎসায় লাগবে।৫০,০০০ আছে।"

সবাই একটু মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে দেখে নম্রতা   আরো বলে  "আশা করি  বুঝেছেন সম্পত্তির প্রতি আমার আর রাইএর কোনো আগ্রহ নেই।সম্পর্ক যখন ছিঁড়ে গেছে  তখন প্রপার্টি দিয়ে কি হবে?  যার জন্য আমি প্রাপ্য খোরপোশ টুকু নিইনি। এ বাড়িতে চারবছরে একটাই সম্পদ  পেয়েছি সেটা আমার রাই।যা ,যা সই সাবুদ একটু গিয়ে করিয়ে আনবেন আবার কবে আসবো জানিনা ভালো থাকবেন।"


অনেক দিন ধরেই ওই চেকটা গলার কাঁটার মতো বিঁধে ছিল।আজ ফেরত দিতে  পেরে স্বস্তি হচ্ছে। অনেক ভেবেছে রাইয়ের  অধিকারের কথা।কিন্তু না ।সে রাইকে যোগ্য করে গড়তে পেরেছে।রাই নিজেই নিজের পায়ে দাঁড়াবে।আর যা পরে রইলো তা তো আর্থিক লাভ আর ক্ষতির হিসেব।পুরো জীবনটাই  যার ক্ষতির খাতে চলেগেলো  এগুলো তার  কি সৌভাগ্য এনে দেবে?

সোজা অাসামমোড়ে না গিয়ে ঘুর পথেই গৌরীয় মঠের সামনে অাসে নম্রতা।এখন সুন্দর ব্রিজ হয়েছে। শহরের মাঝ বরাবর তির তির করে বয়ে যাচ্ছে  নিস্তরঙ্গ করলা নদী। ধীরে ধীরে ব্যাগ থেকে  দীপককে লেখা নিজের চিঠিটা বের করে।তারপর টুকরো টুকরো করে ভাসিয়ে দেয় করলার জলে। ভেসে যাক সব অতীত,গ্লানি, ঘৃণা । আজ নিজেকে উদাত্ত আকাশের মত মুক্ত মনে হচ্ছে।এই শহরটা বড়ো মায়াবী।না তার জন্মভূমি নয়।স্বামীর ভিটের অনুভূতিও নেই ।তবে বড়ো আপন।অনেক মন কেমন করা মুহূর্তে এই জল শহরের রাস্তা,নদী,গাছ,মন্দির তাকে বলেছে তুমি কেঁদোনা আমরা আছি! এগিয়ে যাও, বাঁচ, হেরোনা। আজ শহরটা আরো ঝকঝকে হয়েছে।কিন্তু আনাচে কানাচে জুড়ে সেই আন্তরিকতা ছাপ আজ ও আছে! ভালো থেকো জল শহর। জানিনা আবার আসবো কিনা। যদি আসি শুধু তোমার জন্যই আসবো। কক্ষনো আমি তোমাকে ভুলবোনা। এই তোমরা আমার কেউ না হয়েও  যে অনেক কিছু!



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন