শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

আখ্যানে উত্তরবঙ্গের জনজাতি : মোনালিসা রেহমান। পারক গল্পপত্র



সুনীল রোজ সকাল সাতটা সাড়ে সাতটা নাগাদ  বের হয় টোটোপাড়া থেকে।  নইলে সে কলেজে  প্রথম ক্লাসটা ধরতে পারবে না। এখন একটিই বাস চলে সারাদিনে। দুটো তিনটে ছোট জিপ জাতীয় গাড়ি এতো ভিড়ে ঠাসা থাকে যে, সুনীল সাইকেলকে তার সঙ্গী করে নিয়েছে। সাইকেলে মাদারিহাট পর্যন্ত এসে তারপর আলিপুরদুয়ারগামী বাস ধরতে হয়। টোটোদের মধ্যে সে-ই প্রথম বাংলা সাম্মানিকের দ্বিতীয় বর্ষে ভালো রেজাল্ট করেছে। স্যার তাকে সবসময় ভরসা যোগাতে থাকেন, যাতে তার রেজাল্টটা ঠিক এইরকমই থাকে যাতে সে একবারেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়। এটাই তার এখন ধ্যান জ্ঞান, স্বপ্ন। এই স্বপ্নই তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে  সবসময়ই। তাদের কোন জমি জায়গা নেই, থাকার মধ্যে ঐ সুপুরি বাগানটা আর বাড়ি- ভিটেটুকু  সম্বল। তারা দুটো ভাই আর বাবা মা।  সবসময়ই সে তার বাবা মা আর ভাইয়ের কথা ভাবে। কি ভাবে যে সুনীল বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডিটুকু পেরোবে, কে  জানে!  নিজেদের আত্মীয় স্বজনেরা তো কেউ বড়লোক নয়। তার একছোট মামা ডিফেন্সে চাকরি করেন। তিনিই মাঝেমধ্যে  কিছু কিছু টাকা পাঠান, তাই দিয়ে কোনোরকমে  তার পড়ার খরচটা চলে,এরপর যে কি হবে, সুনীল আর ভাবতে পারে না। সকাল থেকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয় তাকে। বাইশ কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে, তিনটি নদী পেরিয়ে, খানিকটা হেঁটে, কাদা জলে মাখামাখি হয়ে,  মাদারিহাটের রাস্তায় উঠতে উঠতে তার  ৯টা বেজেই যায়। তারপর  বাস ধরে কোনওরকমে  আলিপুরদুয়ার কলেজে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেলা সাড়ে দশটা।

টোটোপাড়া নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই।  অথচ এখানকার  উন্নতি বলতে তথৈবচ । টোটোপাড়ায় ছয়টি গ্রামের মধ্যে দুমসি গাঁও- এ তার বাড়ি। বাবা মা দুজনেই কমলালেবু তোলার ঠিকে শ্রমিক। এখন বর্ষাকাল মা সকালে উঠে পাশের নদী থেকে গুগলি তুলে নিয়ে আসে। আর বাবা ঐ জাখোই  দিয়ে দু চারটে মাছ ধ'রে  বাজারে বিক্রি করে কোনোরকমে সংসারটি চালাচ্ছেন।

আর কদিন পরেই শুরু হচ্ছে ওমচু পূজা। তখন ঘরে ঘরে কাউন উঠবে। কাউনের পায়েস খুব  প্রিয় সুনীলের।ওমচু পুজোতে তাদের গ্রামের সবাই কাউনের মদ ও মুর্গি উৎসর্গ করে  ভক্তি ও শ্রদ্ধা জানায় দেবতাকে, যাতে আগামী বছর প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। ফসল ভালো হয়। তারা সবাই তখন বাদু পাহাড়ের দিকে মুখ করে দেবতা ঈশপের কাছে প্রার্থনা জানায়।

সুনীল টোটো জনজাতির হলেও ওকে দেখতে ঠিক টোটোদের মতো নয়।শারীরিক গঠন সুঠাম, সবল চেহারা, বেশ লম্বা। তবে  নাকের গঠন ও চোখের পাতার গঠনে মঙ্গলয়য়েড ছাপ স্পষ্ট। ওর আজকাল কয়েকটা মেয়ে বন্ধু হয়েছে, তাদেরকে একবার টোটোপাড়ায় বেড়াতে নিয়ে এসেছিল সুনীল ,ওদের সেকি আনন্দ!  দেশি মুরগির মাংস, হাড়িয়া,আর মোটা চালের ভাত ওরা মজা করে খেয়েছিল। হাড়িয়া খেয়ে দু'একজনের নেশাও হয়ে গিয়েছিল খুব জোর। তারপর যা অবস্থা, তা আর বলার নয়! এখনও হাসি পায় সুনীল এর। তবে এরপর থেকে সাবধান হয়ে যায় সুনীল, সে আর কাউকেই বাড়িতে নেমন্তন্ন করে না। এবার ময়ুতে আসবে বলে গান ধরেছে অনেকে। আবার তারা আসবে এবং সুনীলের কাঠের বাড়িতে পাটাতনেই  নাকি সব ঘুমোবে। তবে কোন মেয়ে নয়,তার ছেলে বন্ধুরাই আসবে। ময়ু হচ্ছে সবচেয়ে বড় পুজো। এই সময় টোটোরা নতুন জামাকাপড় পড়ে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠে।পান ভোজনের আয়োজন করা হয়। নাচ গানের অনুষ্ঠান হয়। এই অনুষ্ঠানের একটা বিশেষ রীতি হল, যে মেয়েদের অন্য গোত্রে বিবাহ হয়েছে, তারা তাদের বাপের ও মামার বাড়িতে ভাত মাংস ইউ নিজের হাতে তুলে দেয়। এটি
টোটো সমাজের বহুল প্রচলিত একটি সামাজিক রীতি ।

সত্যি মাঝে মাঝে সুনীলের মনটা ভরে ওঠে আনন্দে।কি রূপ এই এলাকার, প্রকৃতি যেন  অপার সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে টোটোপাড়ায়। পাহাড় অরণ্যে মোড়া ভূমি আর নদীর কল্লোলিত ধ্বনিতে প্রাণমন  অবশ হয়ে যায় । জনজাতি ঘেরা সুরেলা এই অঞ্চল ।।সারি সারি সুপারি গাছ ,আর সুন্দর সুন্দর কাঠের বাড়িতে অদ্ভুত একটা মায়া জড়িয়ে আছে । কোথাও গিয়ে ভালো লাগে না সুনীলের। এই টোটোপাড়াতেই মনটা পড়ে থাকে। অযথা ভিড়ভাট্টা একদমই পছন্দ নয় তার ।এই প্রকৃতিতেই  তার মন প্রশান্তি লাভ করে ।
টোটোরা চিরদিন প্রকৃতির  উপাসক। তারা প্রকৃতির পুজো করে ভক্তি সহকারে যাতে প্রকৃতি  ক্রুদ্ধ  হয়ে তাদের কোন ক্ষতি করতে না পারে। তাদের বিশ্বাস প্রকৃতিকে তুষ্ট রাখতে পারলে, তাদের কোন ক্ষতি হবে না।

সে মনে মনে সমস্ত দেবতাকে ডাকে, সে যেন স্কলারশিপের টাকাটা পেয়ে যায়। তাহলেও বাবার একটু সাশ্রয় হয়।  মা  দুদিন থেকে সুপারির ব্যবসা করার কথা বলছে। সংসার যে আর বাবার দ্বারা একা চালানো সম্ভব নয়, মা এটা ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিচ্ছেন।  সামনে ওমচু পুজা, ময়ু...খরচ তো একটা আছেই। মা আবার বাপের বাড়ি যাবে সওদাপাতি নিয়ে। স্যার  অবশ্য বলেছেন, তার স্কলারশিপটা চালু হলে আর ভাবতে হবে না।  তখন শুধু আনন্দ আর আনন্দ! সত্যি সত্যি ইলেভেন টুয়েলভে আশ্রমের স্যারেরা সুনীলকে যা সাহায্য করেছে তা সে কোনদিন  ভুলতে পারবে  না  এবং মাধ্যমিকের সময়ে ও যেভাবে তারা তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তা অভাবিত।  তখন অংক ও ইংরেজি নিয়ে তাকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হত। কোন টিউশনি ছিল না। শিক্ষক বলতে আশ্রমের স্যারেরাই।


টোটো সমাজের উন্নতির জন্য কত এন জিও কাজ করছে ।কিছু হয়তো সত্যি আন্তরিকভাবে কাজ করতে চায়। তবে বেশিরভাগই ভড়ং।একজন বয়স্ক ঠাকুমা যখন তার দৈনন্দিন কাজ সারতে ব্যস্ত, তখন তার সাথে তাদের সেলফি তোলার কেরামতি দেখবে কে? টোটোদের লৌকিকতা, বিশ্বাস, সংস্কৃতি, লোকাচার নিয়ে বাইরের লোকের কৌতূহলের  শেষ নেই। তবে  সুনীলের খুব রাগ হয়, যখন টোটোদের সম্পর্কে ভুলভাল তথ্য পরিবেশিত হয়।

এখন মাঝে মধ্যেই দারুণ দারুন সব আধুনিক গাড়ি নিয়ে প্রচুর মানুষ  আসেন বেড়াতে এবং কিছু কিছু মানুষ এমনভাবে তাদের জরিপ করেন,দেখলে মনে হয় যেন ওরা অন্য গ্রহের বাসিন্দা। সত্যি তখন খুব খারাপ লাগে। একবার তো একটা লোক ওকেই জিজ্ঞেস করে বসল যে, টোটোরা কি তিন চার ফুট লম্বা! সুনীল সাথে সাথে জবাব দিয়েছিল, 'এই যে ৫ ফুট ১০ইঞ্চির একজন মানুষ আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, একে কি আপনার অন্য গ্রহের মনে হয়? এও একজন টোটো জনজাতির মানুষ। টোটোরা আপনাদের মতো সাধারণ মানুষ মশাই ,চিড়িয়াখানার কোন জন্তু  নয়।'

আজ সকাল সকাল সুনীল কলেজের জন্য  বের হলো বাড়ি থেকে। পরনে সাদা সার্ট ও হাঁটু অবধি গুটিয়ে পড়া কালো প্যান্ট। রাস্তায় কিছুদূর আসতে ডমরু কাকু ও কাকিমার সাথে দেখা। হাসিমুখে কাকি বললেন, 'তোমাদের বাড়িতেই যাচ্ছি।'  কি মতলব কে জানে ! হাতে ও মাথায় করে প্রচুর জিনিস নিয়ে যাচ্ছে। হয়তো কাউকে দেবে। মাথা ঘামায় না সুনীল ।এই তল্লাটে ওরা বেশ সচ্ছল,জমি জিরেত আছে, এদের প্রচুর কাউন হয়। আগে মা কাউনের ক্ষেতে কাজ করত। ডমরু কাকী ও মা একসঙ্গে  মাটিও কেটেছে অনেকবার। তখন সুনীল ছোট। কাউন বিক্রি করে অনেক টাকা পায় ডমরু কাকা। ডমরু কাকার ছেলে মেয়ে দুটি ও পড়াশোনায় ভালোই ছিল। দেখা হয়নি ওদের সাথে অনেক দিন ।

 আজ কলেজে সুদীপ্ত স্যারের ক্লাস আছে। স্যার তাকে খুবই ভালবাসেন। স্যার এতো সুন্দর পড়ান যে, একেবারে মুগ্ধ করে রাখেন সমস্ত ছাত্রীদের। ক্লাসে ঢুকতেই স্যার হাসিমুখে বললেন,  'সুনীল তোমার স্কলারশিপটা এসে গেছে। তুমি ক্লাসের শেষে অবশ্যই হেড ক্লার্কের সঙ্গে দেখা করবে, কেমন।' আনন্দে চোখে জল এসে যায় সুনীলের। সে মাথা নাড়ে। কি অবস্থা তার পরিবারের,কত কষ্ট করে বাবা! ঐ হাড় জিরজিরে চেহারা নিয়ে বাবা  সংসার চালাতে গিয়ে কতটা হিমশিম খাচ্ছে তা ভাবা যায় না। তার মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের যা দাম...রোজ রোজ কলমি সেদ্ধ আর মোটা চালের ভাত, আর গুগলি রান্না করে মা আর মাঝে মধ্যে মাছ। এইত তাদের রোজকার খাবার। আজ সত্যিই খবরটা শুনে বাবা মা খুব খুশী হবেন যে, তাদেরকে আর সুনীলের কথা ভাবতে  হবে না। আজ বাড়ি ফেরার জন্য মনটা ছটফট করতে লাগল সুনীলের তার স্কলারশিপ পাওয়ার খবরটা বাবা মাকে দেওয়ার জন্য ।

সে সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে ঢুকে অবাক হয়। বাড়িতে প্রচুর লোকের আনাগোনা। উঠানের আলোতে ডমরু কাকুকে
দেখে সে অবাক হয়। সবাই বসে বসে হাড়িয়া খাচ্ছে।তাকে দেখেই ডমরু কাকু ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে বললেন, 'আজ থেকে তুমি আমাদের জামাই  হলে,আমার বেটির সাথে তোমার বিয়ে ঠিক করলাম।'
দূরে কোথায় যেন ঢোল বাজছে, আর কদিন পরেই তো ওমচু পুজা। সুনীলের মাথায় কে যেন সজোরে হাতুড়ির ঘা মারল। আস্তে আস্তে টলতে টলতে সুনীল তার ছোট্ট পড়ার ঘরটাতে ঢুকে কোনোরকমে ছিটকিনি তুলে দু'হাতে মুখ ঢেকে মাটিতে বসে পড়ল। তার দুচোখের জলে ঘামে ভেজা সার্টটা আরও ভিজে গেল।  সে তো তার ক্লাসেরই  একজনকে মনে মনে ভালোবাসে। মেয়েটিও তাকে পছন্দ করে কথাবার্তায় বুঝতে পেরেছে সে অনেকবার। বলবে বলবে করেও সে সাথীকে বলতে পারে নি। সাথীরও রেজাল্ট ভালো, হয়তো একই বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা ভর্তি হবে।একটা দিনের একটা ঘটনা, তার এতদিনের তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নকে এভাবে  চুরচুর করে ভেঙে দেবে তা সে কিছুতেই ভাবতে পারছে না। বাবা মা  একবারও তার সঙ্গে আলোচনা করল না! অথচ বিয়ে ঠিক করে ফেলল! খুবই অভিমান হলো তার ।সে আজ কত খুশি হয়ে বাড়িতে ফিরে এলো বাবা মাকে খুশির খবরটা দেবে বলে যে ,আজ তার কলেজে স্কলারশিপের টাকাটা এসেছে ...
কিন্তু মনটা দুরমুশ করে দিল বিয়ে ঠিক হওয়ার খবরটা ।

দরজায় ঘা দিয়ে মা সমানে ডেকে যাচ্ছে, অথচ সুনীল কিছুতেই সাড়া দিতে পারছে না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন