শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

খোকন বর্মন


 ভিতর কি বা ঢুকে পড়েছে খচ্ খচ্ করে চলেছে অনবরত । হাত  দিতে গিয়েও সরিয়ে  নিচ্ছি যদি বেড়ে যায় লাল হয়ে যায় আরও। ড্রপ কোথায় পাব ? চশমা পড়লে গ্রামের লোক বড্ড হাসাহাসি করে এ পাড়ায় ভালো ডাক্তার নেই কি করব বলো? আকাশের পরিস্থিতি ভালো নয় । ঠাকুরদা মারা যাওয়ায় এবছরও ঘরে হাত দেওয়া হয় নি,। চাল ফুটো হয়ে টুপ টুপ করে জল  পড়ছে বিছানার এককোণে। হাতেও সময় নেই , ঘরে  সম্বল বলতে আধবস্তা চাল আর কেজি পাঁচেক আলু পরে আছে।  তেল এর অভাবে গত পনেরো দিন থেকে মাছ মুখে ওঠে নি। ব্যবসার মতো বাবার শরীরটাও আজকাল ভালো যাচ্ছে না  , মা তো এর আগে এরকম খিট খিট করতো না আমার সঙ্গে । বাবা মার একমাত্র পুত্র আমি ,কত স্বপ্ন আমাকে নিয়ে তাদের। কিন্তু তারাও কিছু একটা তীব্র যন্ত্রনায় ভুগছে আমাকে বলবে বলবে করেও বলতে পারছে না মুখফুটে।  বয়স তো  আর কম হলো না দেখতে দেখতেই পঁচিশ পেরোলাম। বাবা আর কতই বা করবে আমার জন্য?

এবার দূরে কোথায় গিয়ে ভালো ডাক্তার দেখাতেই হবে আমাকে। যাইহোক আর কতই বা সময় নষ্ট করব। গ্রামের ব্যাপার , বোনের এবার  উনিশ,ভুগোল অনার্স  ফোর্থ সেমিস্টার । টাকার অভাবে গত তিন টিউশন যেতে পারে নি। সামনে অনেক দায়িত্ব আমার কাঁধে। সবার কথা ভেবে  বাবার শেষ সম্বল কাঠা দশেক জমি বন্ধক রেখে টিকিট টা করেই ফেললাম। গ্রামে তো ভালো ডাক্তার নেই কি আর করার বলো।চোখ টাকে এখনই যদি সারিয়ে  না তুলি - বাবার উনষাট মা পাঁচ বছরের ছোটো বাবার থেকে। কিছুদিন পর হয়তো চলতে পারবে না ঠিক মতো ।আমি ছাড়া তো আর তাদের কেউ নেই  ।মায়ের কোমরের ব্যাথা টাও দিন দিন বেড়েই চলেছে প্রতি মাসে তাকেও ডাক্তার দেখাতে হয়। ছোটো বোন টার সময় মতো বিয়ে না দিলে এর ওর কানে কত ভালোমন্দ শুনতে হবে ,কত জনকেই বা আটকাতে পারব আমি।
 বলতে গেলে মা বাবার কাছে পরিবারের চোখ একমাত্র আমি। তাই আমার চোখ দুটোকে তাড়াতাড়ি সারিয়ে তোলা ভীষণ জরুরি। আমাদের পাড়ার প্রীতম মাস্টারের মেয়ে জুঁই সঙ্গে কি করে যে প্রেম টা হলো বুঝতে পারি নি প্রেম তো আর বলে কয়ে হয় না  ,প্রেম তো এরকমই । তাকে অষ্টমীর মেলা থেকে একডজন সবুজ চুরি ও একটি ঘড়ি  ছাড়া কিছুই দিতে পারি নি। মনে পড়ে  ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম তোমার আমার সময়টা যদি এরকমই চলত। ।
 সদ্য এম এ পাশ করেছি , চাকরি করি না বলে টিউসন পড়ানোর অফার আসে না ,কেনই বা পড়াবে আমার হাতে তো কোনো প্রজেক্টের নম্বর নেই। ওদের কি দোষ চাকরি বাকরির ক্ষেত্রে নম্বর টা ভীষণ জরুরি।

পরিণতির কথা বাদ দিলে প্রেমটা আমাদের গ্রীন জোনের মতোই নিরাপদ ছিল । ভুলেই গেছি বলতে তার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল তিন বছর আগে। তখন আমার চোখে কোনো সমস্যা ছিল না। হুট করে মেসেজ আসলো বাবা বিয়ে ঠিক করেছে ফালাকাটার অঞ্চল প্রধান শুভঙ্করবাবুর একমাত্র ছেলের সাথে । চোদ্দ লাখ ঘুষ দিয়ে প্রাইমারীর চাকরিটা ।  পেয়েছে বললে ভুল হবে সেটা যেন তার একটা অধিকার।

 তাতে কি  সরকারি চাকরি বলে কথা , কে এমন সুযোগ ছাড়তে চায় বলো ? তার কাছে কিছু সময় ছাড়া আর কিছুই চাইতে পারি নি সেদিন। একটুকুও খারাপ লাগে নি কেনই বা লাগবে কোন বাবা -মা ই বা চায় তার মেয়েকে একটা বেকারের হাতে তুলে দিতে। তারপর আর মুখোমুখি হওয়ার সৌভাগ্য হয় নি। দু বছর পর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেখলাম  তারও একটি  ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে  আমার ভাগ্নির মতো। নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না সেদিন। "বড়ো প্রেম কাছে টানে না "ভেবে নিজের প্রতিই খিল্লি ওরালাম কিন্তু চোখের কি দোষ  বলো মনের  ভাষা বুঝতে পেরেছে চোখের জল আটকাতে পারি নি সেদিন। এখন বাবা মোটামুটি সুস্থ মার কোমরের ব্যথা টাও সেরেছে।  চোখের খচ্ খচ্ টা পুরো সারে নি  কিন্তু বাবা মা টেনশন করবে বলে মুখ ফুটে বলতে পারিনি আজঅবধি।ছাত্র হিসেবে তো আমি খারাপ ছিলাম না এর জন্য মা বাবার খুব আফসোস হয়  কথাবার্তায় বুঝতে পারি ।

আমার সঙ্গে একজন শিক্ষক ও  তার প্রেমিকা ছিলেন তারা দুজনে তাজমহল ঘুরতে গিয়েছিলেন। সেদিন হিংসে হয়েছিল খুব শুনলাম সদ্য এম এ পাশ করে জয়েন করেছে। চোখ দেখে বুঝতে পেরেছিলাম ছেলেটি আমার থেকে দু তিন বছরের ছোটই হবে , কোকড়াঝাড়ে বাড়ি মাস গেলে পঞ্চাশ হাজার টাকা স্যালারি।  খুব মনে পড়ছিল সেদিনের কথা যেদিন টাকার অভাবে জুঁই কে রাজবাড়ী থেকে রেস্টুরেন্ট অবধি নিয়ে যেতে পারিনি । তারা আমায় জিজ্ঞেস করেছিল অনেককিছুই- এম এ পাস আমিও করেছি  মুখ ফুটে বলার সাহস  বা ইচ্ছা কোনটিই হয় নি সেদিন । ফালাকাটায় ট্রেন টা থেমেছিল মিনিট পাঁচেক ,খুব মনে পড়ছিল তার কথা পরিযায়ী স্পেশাল ট্রেনে নিউকোচবিহারে নেমেছি  চোদ্দ দিন কোয়ারেন্টাইন এ ছিলাম।  এসব ভাবতে ভাবতে চোখ দিয়ে জল  গড়িয়ে পড়ে মুখে ।তিন বছর পর ফিরলাম স্বপ্নের খয়েরবাড়ি , অনেক কিছুই আজ অচেনা পুরোনো স্কুল টা আজ সেজেছে নতুন রূপে ,কাঁচা রাস্তা আর কাঁচা নেই রাস্তার  পড়েছে নতুন পাথর।রাস্তার ধারের আমগাছ গুলো এখন আর নেই খুব মনে পড়ে সকালে উঠে আমকুড়োবার দিনগুলো। রাস্তার ধারে অনেক নতুন মুখ দেখা যাচ্ছে , কত পরিচিত মুখ হারিয়ে গেছে। এখন আমি বাড়ির পাশেই রাস্তার মোড়ে । জুঁইয়ের বাবা আমাকে দেখে চোখ সরিয়ে নিল খানিকটা ইচ্ছে করেই ,যেন  আমাকে কেমন আছো বললেও তার কোনো বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।
 দূর থেকে কে বা চিৎকার করে উঠল পরিযায়ীর গাড়ি এসেছে। শুনলাম আমার ভাগ্নিও এসেছে আমাদের বাড়িতে। মায়ের হাসির শব্দ কানে আসছে। বাড়ির ভিতর আমার প্রিয় মাছের ঘ্রাণ আসছে ।ভাগ্নি  দৌড়ে আসছে তার সঙ্গে এই প্রথম দেখা হবে আকাশের।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন