শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

রাজেশ ধর

                   
বাসরাস্তার থেকে বেশ ভেতরে ছিল আমাদের পাড়া। কিন্তু রিক্সাস্ট্যান্ড ছিল না। সবেধন নীলমণি একমাত্র  সুবলদার রিক্সা। শীতলা মন্দিরের সামনে রিক্সা নিয়ে সকাল, দুপুর , সন্ধে সে থাকবেই। আবার ঝড়, জল , বিপদ-আপদে মাঝরাতেও ডাকলে সে চলে আসত। তার জন্য বেশি ভাড়াও সে নিত না। মদ, জুয়ার নেশা ছিল না তার। শুধু দিনে দুবার দুছিলিম গাঁজাতেই সন্তুষ্ট। তবে সেই নেশাতেও সে বেসামাল হত না। শুধু চোখদুটো লাল হয়ে থাকত। আর কপালেও সারাদিন থাকত লম্বা লাল সিঁদুরের টিপ। রিক্সার হ্যান্ডেলে জড়ানো লালজবার মালা। মাকালি ছিল তার একমাত্র ঈশ্বর। মাঝেমাঝে বলে উঠত…জয় মা, জয় মা! সত্যি সত্যি একটা চরিত্র ছিল  আমাদের পাড়ার।

এই সুবলদাকে নিয়ে বেশ মজা হত আমাদের সেই ছোটবেলার দিনগুলোতে। সুবলদাকে কেউ বিশ্বাস করাতে পারত না যে চাঁদে মানুষ গেছে। সে মানতই না, ঠাকুর-দেবতার শরীরে কখনও মানুষ নামতে পারে? অনেক তক্কোটক্কোর পর সে রুখু চুলের মাথাটা ঝাঁকিয়ে বলত, ‘… সব মিথ্যে কথা!’ চায়ের দোকান হোক, কিম্বা শীতলাতলা বা বোসবাগানে তাসের আড্ডা… সুবলদা গেলেই একটা হৈচৈ হত আর তারপরেই আমরা শুনতাম ওর চড়া গলা, ‘…সব মিথ্যে কথা!’
                 
চাঁদে যাওয়াই শুধু না আরও যে কত ছিল! যেমন ইন্দিরা গান্ধী, সুভাষ বসু, মুজিবর রহমান যারা গরীব, মার খাওয়া মানুষের কথা ভাবত তারা সব অবতার। ভগবান নিজে তাদের স্বর্গে নিয়ে গেছেন। একটা, দুটো বা কয়েকটা মানুষ মিলে তাদের মারতেই পারে না। আরও আছে; রাজধানী এক্সপ্রেস একদিনে দিল্লি যেত। সেটাও বিশ্বাস করানো যেত না তাকে। শেয়ালদা থেকে কালিঘাট আসতে রেলগাড়ির একঘন্টা লেগে যায়। আর দিল্লি যাবে একদিনে…ছোঃ।
                                                                                     (২)

প্রায় তিরিশ-পঁয়তিরিশ বছর  হয়ে গেল। আর তাকে দেখি না। কিন্তু আজকাল  খুব মনে পড়ে । কীভাবে সবাই ওকে অবিশ্বাস করত, পেছনে লাগত…। ভেবে খুব গ্লানি হয়! মনে হয়, এখন যদি হত; তাহলে…তাহলে…
                     
কিন্তু পারতাম কী! মনে হয় না। এই যে আমার কথা শুনেও তো লোকে আজকাল মুখ টিপে হাসে। কেউ কেউ তর্কও জুড়ে দেয়। কোন কথাই শুনতে চায় না তারা। জোর করে জিতবে! তা জেত না!…আমার পিছনে লাগিস কেন? আমি যখন যুক্তি দিয়ে বোঝাই আমাদের সবার বিশুদ্ধ রক্ত, আমাদের কোন পূর্বপুরুষ বাইরে থেকে আসেনি। ওদের চোখে তখন ভয়ানক অবিশ্বাস। আমি যখন বলি ; ‘ ঐ শালারাই যত অশান্তির মূল। ইতিহাসে তার কত প্রমাণ!’ তখন যারা শুনছে তাদের এক একেকজনের মুখের, গলার শিরা ফুলে ওঠে । বুঝি সে আসলে কাদের লোক!  তারপর… এই যে সেদিন বললাম; ‘প্রমাণ দিয়ে কখনও ইতিহাস হয়? মানুষের বিশ্বাসে যা আছে তার দাম নেই? ঐ বিশ্বাসটাই আসল, সেটাই ঠিক!’  এইসব বলছিলাম। বলেই যাচ্ছিলাম। আচমকা; চায়ের দোকানে সবাই একসাথে বলে উঠল, ‘…মিথ্যে কথা, সব মিথ্যে কথা!’ আমার সুবলদাকে মনে পড়ে গেল। ওরা যেন সবকটা সুবলদা…না, না ভুল বলছি আমি সুবলদা। আমি তো রাগাচ্ছি না, ওরা আমাকে রাগাচ্ছে!’

তাই এখন আর লোকজনের মধ্যে যাচ্ছি না। ইদানিং পড়াশুনো করে জ্ঞান বাড়াচ্ছি। পরে বলতে হবে--দেশ-জাতির কতবড়  সংকট !  কত যে বলিদান দিতে হবে!! কিন্তু ভয় লাগে এই মূর্খের দেশে মানুষ সব বুঝবে তো! যেভাবে আমায় হ্যাটা করে সবাই।
                                                                                 (৩)

যাই হোক।  সুবলদার কথা বলি।  একদিন দেখলাম ওকে। সত্যি সত্যি দেখলাম। খুব বুড়ো হয়ে গেছে। লাঠি ঠুকে ঠুকে শীতলা মন্দিরের সামনে দিয়ে আসছে। মনের ভেতর কী যে হচ্ছিল! বুঝলাম অনেকদিন ধরে ওর অপেক্ষায় ছিলাম আমি। কাছে গিয়ে বললাম; ‘ চিনতে পারছ আমাকে সুবলদা?’ সে চোখদুটো কুঁচকে আমায় চেনার চেষ্টা করছিল, পারছিল না। আমি নিজের নাম বললাম। তারপর পুরোনো অনেক কথা বললাম। নাহ…কিছুই মনে পড়ে না। শেষে, ওকে যেভাবে রাগানো হত সেই কথাগুলো বলতে শুরু করলাম। চোখ বুজে সব শুনছিল। কিন্তু যেই চাঁদে যাওয়ার গল্পের বিশ্বাস, অবিশ্বাসের কথা এল। ও চিৎকার করে উঠল, ‘ সব মিথ্যে কথা, সব মিথ্যে কথা!’ আমিও উৎসাহ পেয়ে বললাম, ‘ ঠিকই বলতে তুমি। এখন আমারও মনে হয়, চাঁদে মানুষ যায়নি…যেতে পারে?’ সে কিন্তু আমার কথার উত্তর না দিয়ে নিজেরই কথারই রেশ টেনে যাচ্ছিল, ‘ …ও ব্যাটাদের সব মিথ্যে কথা! ওদের হাতগুলো দেখেছ! আঙুলে, ড্যানায়, জামার নীচে…কত মাদুলি, কত পাথর…রাহু রাক্ষস, চন্দ্র দেবতা, শনি ঠাকুর ভাল করতি পারে, খারাপও করতি পারে। ওরা সব জানত। জেনে শুনেও আমায় রাগাত। মিথ্যে কথা বলত…সব মিথ্যে…’ কথা না থামিয়েই তারপর লাঠি ঠুকতে শুরু করল সে।
               
আমিও হাতের মুনস্টোনটার দিকে তাকালাম। বয়স তো বাড়ছে। কয়েক রতি বাড়াব নাকি! সুবলবুড়ো গলায় সেই আমলের জোর ফিরে এসেছিল। শুনতে পাচ্ছিলাম ‘ মিথ্যে কথা…সব মিথ্যে কথা…’


৩টি মন্তব্য: