শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২০

মলয় মজুমদার। পারক গল্পপত্র


অনিরুদ্ধ সোমের  জীবনে সব কটা স্বপ্ন যে শুধু স্বপ্ন, তা নয় । বেশির ভাগ স্বপ্নের সাথে জড়িত আছে জীবনের কিছু বাস্তব অতীত । ঘটে যাওয়া এক একটি ঘটনা অদ্ভুতভাবে তার স্বপ্নের সাথে জড়িত হয়ে যায় ।, অতি সামান্য ঘটনাও স্বপ্নের মাঝে খেলা করে কিছুদিন । আবার কোন কোন স্বপ্ন অনেকদিন ধরে চলে, আবার হঠাৎ হারিয়ে যায় । অনিরুদ্ধর জীবনে সুখের স্বপ্ন খুব কম, দঃস্বপ্নের আকারে আসা স্বপ্নগুলোই বেশি ।  অনেকের জীবনে প্রথমে স্বপ্ন আসে, তারপর হয়তো সেটা বাস্তবে রূপ পায় । অনিরুদ্ধর ঠিক উল্টো । স্বপ্নতত্বের বিশ্লেষণে কি দাঁড়ায় জানা নেই তার । চেষ্টা করেনি জানার । এইভাবেই তো জীবনটা কেটে যাচ্ছে অনিরুদ্ধর । 

অনিরুদ্ধর স্বপ্নগুলো তার অতীতের জীবনপনঞ্জী থেকেই আসে । সময়ের সাথে কিছু স্বপ্ন ফিকে হয়ে যায়, হারিয়ে যায় । আবার হয়তো কোন ঘটনা প্রবাহে, সেই স্বপ্ন জীবন্ত হয়ে ফিরে আসে  । হয়তো দু বছর কিমবা তিন বছর অথবা পাঁচ বছর সে স্বপ্নের দেখা পায় না,  অথবা অস্পষ্ট ভাবে কখনো আসে, কিন্তু তার ক্রিয়া মনকে স্পর্শ করে না । আজকাল  একটা স্বপ্ন, যা তার জীবনের রেখাচিত্রকে পরিবর্তন করে দিয়েছে । যে ঘটনা তাকে ছাড়তে বাধ্য করেছে ছোট থেকে বেড়ে ওঠা শহরটাকে । আর সেই ঘটনার জেরে দিনের পর দিন রাতের বিছানায় ভয়ে চমকে উঠেছে । জেগে উঠেছে  ঘুমের মধ্যে ।

 অনেক পূরানো সে ঘটনা । কত আর বয়স হবে, উনিশ কি বিশ । সময়ের সাথে সাথে  যা প্রায় ফিকে হয়ে গিয়েছিল,, সেটা আবার ফিরে এসেছে এক ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে । প্রতিরাতেই আসছে, আসছে আর অনিরুদ্ধর সব অস্তিত্বকে  ক্ষতবিক্ষত করে  জাগিয়ে রাখছে রাতের পর রাত । 

একটা স্বপ্নতো গত এক বছর ধরে চলছিল তার জীবনে । নানা ঘটনার প্রবাহ, তার জীবনকে অনেক ভাবেই কখনো উঠিয়েছে আবার কখনো নামিয়েছে । পরিবর্তন করতে হয়েছে শহর, কোন একটা শহরকে নিজের ভাবে ভাবনার আগেই, হাতে এসে পড়েছে ট্রান্সফার অর্ডার । প্রতিবার শহর ছাড়ার আগেই বহন করেছে স্বপ্নের রসদ । আর শেষ ঘটনার পরিণতি এমন ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছিল যে, স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়া ছাড়া কোন রাস্তা ছিল না । তাই  আটাশ বছরের দাম্পত্য জীবনের একটি সন্তান অনিমেষ । সেই অনিমেষকে একটা সময়ের পরে আর কাছে রাখতে পারেনি । পাঠিয়ে দিয়েছে বোর্ডিঙ স্কুলে, তারপর কলেজ । কলেজ জীবনটাও অনিরুদ্ধর ছেলেকে কাটাতে হয়েছে হোস্টেলে । 

স্ব-ইচ্ছায় অবসর গ্রহণ করার আগে দীর্ঘ যে ঘটনা, আজ আর ভাবতে চায় না । ভাবলে শরীরের মধ্যে রক্তের হিম স্রোত বইতে শুরু করে । রানু ওই ঘটনার কোন কথা তুললে, বুকের মধ্যে কেমন যেন ভয়ের যন্ত্রণা কাঁটা দেয় । রানুর অদ্ভুত ক্ষমতা চোখ দেখেই বুঝতে পারে অনিরুদ্ধর মনের অবস্থা । আর কথা বাড়ায় না । রানু অনিরুদ্ধর আঠাশ বছরের জীবন-সঙ্গিনী । বিয়ের পরে কিছুদিন চাকরী করেছিল একটা এম এন সি তে , কিন্তু বেশি দিন পারেনি । বিয়ের ছ’মাসের মাথায় অনিরুদ্ধর জীবনে তৃতীয় ট্রান্সফার । তারপর আর রানু কোনদিন চাকরি করেনি । ঘরের বউ হয়েই  কাটিয়ে দিয়েছে বাকি জীবনটা, এখনো কাটাচ্ছে । অনিরুদ্ধ জানে, রানুর মধ্যে তাই নিয়ে একটা ক্ষোভ আছে । কিন্তু সেই প্রসঙ্গ উঠলে অনিরুদ্ধ চুপ করে যায় । রানু একা একা অনেক কথা বলে । অনিরুদ্ধ শুধু শুনে যায় ।

দীর্ঘ কর্ম জীবনের ব্যস্ততা থেকে স্ব-ইচ্ছায় অবসর গ্রহণ করে সে ফিরে এসেছে তার পুরানো শহরে । সাথে করে এনেছিল দুঃস্বপ্নের রসদ ।  রাজনীতির জাঁতাকলে পিষে মরার মতো অবস্থা হয়েছিল । মাফিয়া থেকে রাজনৈতিক নেতা, বিরোধী থেকে শাসক । সেইদিন সে আবিস্কার করেছিল মাফিয়া শাসক আর বিরোধীদের মধ্যে সামাজিক ঐক্য - সামান্য একজন প্রথম শ্রেণীর সরকারী অফিসারের বিরুদ্ধে । কিন্তু স্টেশনে নামার পর সেগুলো কেমন যেন হারিয়ে গেলো স্মৃতি থেকে । স্মৃতিকে অতীতের পাতায় ফেলে দেবার জন্যেই তো সে  পালিয়ে এসেছে । কিন্তু ট্রেনে কামরা থেকে প্রথম পা স্টেশনে ফেলতেই, টের পেয়েছিল,স্মৃতির ভয়াবহতা নিয়ে এখানে তার জন্যে অপেক্ষা করছে একটা দগদগে অতীত । হোচট খাবার মতো অনিরুদ্ধর মনকে চমকে দিলো । তারপর  অতীতের সেই ঘটনা বিকশিত হতে থাকলো মনের মধ্যে । আর বিকশিত ডানাগুলো অনিরুদ্ধকে জাপ্টে ধরলো,অবরুদ্ধ হয়ে আসলো অনিরুদ্ধের মানসিক অস্তিত্ব ।

 আর এইভাবেই প্রতিরাতেই ঘুম ভাঙে, জল খায়, একবার ফ্ল্যাটের ব্যালকোনিতে এসে দাঁড়ায়, আকাশের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে, তবে অন্ধকারের দিকে তাকায় না । ভয় করে অনিরুদ্ধর এই সময় অন্ধকার দেখতে । তাই সে সোজা আকাশ দেখে, তারা ও চাঁদের আলো অনিরুদ্ধ মনকে বেশ শান্ত করে দেয় ।  শান্ত মন আকাশের তারা গোনে আর হাবিজাবি কি সব  বিড়বিড় করে, কখনো নিজের সাথে কথা বলে, কখনো চাঁদের সাথে । দেখলে মনে হয় যেন তারাদের সাথে বদল করছে ভাব, ভাষা  ও তার ঘটনা বহুল জীবনের ওঠানামা । 


(২)

ডিসেম্বরের ষোল, অবসর নেবার পাঁচ দিন পর অনিরুদ্ধ এসে নামলো এন জে পি স্টেশনে । রানু ও অনিমেষ দু’জনে আগেই চলে এসেছে । ট্রেন এসে থামলো, তখন রাত আটটা  ।, অনিরুদ্ধ কাছে এটা কোন রাত না, অনিরুদ্ধ যে শহর থেকে এসেছে, সেখানে এই সময়টাতে লোকের ছড়াছড়ি থাকে, পথে, ঘাটে, বাজারে, শপিং মলে,স্টেশন চত্তর তো মানুষে মানুষে ছয়লাপ, মেল ট্রেন, এক্সপ্রেস ট্রেন আর একের পর  একে লোকাল ট্রেন  । এখানে অতো ভিড় নেই । লোকাল ট্রেন খুব কম চলে । শুনেছে যা দু একটা চলে, সেটা দিনের বেলা । শুধু দুরপাল্লার ট্রেনেরই যাত্রীদের ভিড় ।   একেই বলে মহানগর আর নগরের মধ্যে পার্থক্য । এই সব চিন্তা করতে করতে নিজে মনের মধ্যেই হেসে উঠলো । স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখলো বেশ ভিড়, যাত্রীদের থেকে বেশি লোকাল ট্যাক্সি , রিকশাওয়ালা ,টোটো ড্রাইভার আর দালালদের  । এই সময় অনেক গুলো ট্রেন ঢোকে, আবার কিছু ট্রেন এখান থেকে ছেড়ে যায় ।  টোটো, লোকাল ট্যাক্সি কেউ কাছাকাছি দূরত্বে যেতে রাজি না । অগত্যা রিক্সা । রাত হয়ে গেছে, ভাড়া দিগুণ । দেরী না করে একটা রিক্সায় উঠে পড়লো ।

  বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা, বেশ ঢিমে তালে চলছে, রিক্সার গতি খুব মন্থর । তবু টানছে, কিছু একটা সমস্যা আছে বল বিয়ারিঙে, যতটা জোরে প্যাডেল দিচ্ছে ঠিক ততটা জোরে রিক্সার চাকাগুলো ঘুরছে না । রাস্তাও সে রকম মসৃণ না ।, অনেকদিন মনে হয় সারায়নি, কোথাও একটু উঁচু, কোথাও বা ছোট খাটো গর্ত  । এই সব খেয়াল করতে করতে  অনিরুদ্ধ চোখ বুজে  রিক্সায় হেলান দিলো । বহুদিন পরে আসা । মাফিয়া, শাসক ও বিরোধী পক্ষের ঐক্য এমন ভাবে এগিয়েছিল যে, অনিরুদ্ধর পক্ষে কোন কিছু করা সম্ভব ছিল না , হয় চাকরি থেকে বিদায় নতুবা দুর্নীতির কাছে মাথা নোয়ানো । প্রথমটাই অনিরুদ্ধর পছন্দ । কারণ দুর্নীতির কাছে কোনদিন মাথা নোয়াতে পারেনি বলেই তো একের পর এক ট্রান্সফারের চিঠি  জমা হয়েছিল চাকরি জীবনে । রানু এবার আর সহ্য করতে পারেনি । এর আগে সবগুলো ঘটনা ট্রান্সফারের চিঠিতেই শেষ হয়ে যেতো । এবার শেষ হলো না । লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল  সরকারের দূর্নীতি দমন  সংস্থাকে । যত রকম অস্বাভাবিক পরিস্থিতি মানুষকে আতঙ্কিত করা যায়, তার কোনটার থেকেই রেহাই পায়নি অনিরুদ্ধ ।


এলোমেলো চিন্তার মধ্যে দিয়ে রিক্সা এগিয়ে যাচ্ছে ।  কিছুটা আসার পরই অনিরুদ্ধ মনটা কেমন যেন কেঁপে উঠলো । সামনে ইন্ডিয়ান ওয়েলের কোয়াটার । বহু পরিচিত একটি কোয়াটার । ভুলে যাওয়া ফ্ল্যাট নাম্বারটা কিভাবে যেন মাথার মধ্যে এসে গেলো - তেরোর এ  । আর সেই ফ্ল্যাটের একটা ঘরের ছবিটা ভেসে উঠলো চোখের সামনে । এক পাশে সুন্দর করে সাজানো বইয়ের তাক, একটা সুন্দর পড়াশুনার জন্যে টেবিল, আলনা, ড্রেসিং টেবিল, একটা খাট , মিউজিক সিস্টেম, একটা বড়ো ওয়ারড্রব, দেওয়ালের একদিকে পিকাসোর আঁকা ছবি, আর ছড়ানো ছেটানো শ্রাবন্তীর বইপত্র । এক বছরে বহুবার এসেছে সে, কখনো একা, কখনো বন্ধুদের সাথে । কিছুদিনের মধ্যেই কেমন যেন আপন হয়ে উঠেছিল সব কিছু, বাড়ির লোকজন থেকে শুরু করে ঘরের প্রতিটি জিনিস-পত্তর । এমনকি ফ্ল্যাটের পাহারদার আফগান শেপার্ড । খুব কম লোকই সেই পাহারাদারের কাছাকাছি যেতে পারতো । কিন্তু সেও কিভাবে অনিরুদ্ধর আপন হয়ে উঠেছিল ।

 কোয়াটারটা যত এগিয়ে আসছে, অনিরুদ্ধর বুকটা যেন ততটাই কেঁপে উঠছে । প্রায় ছত্রিশ বছর আগের একটা বিকেল, তখন এক বছর হয়েছে কলেজে জীবনে , কলেজের প্রথম পরীক্ষা কিছুদিন পরেই । অন্যদিনের মতোই অনিরুদ্ধ গিয়েছিল শ্রাবন্তীদের ফ্ল্যাটে । আরো কয়েকজনের আসার কথাছিল, কিন্তু গিয়ে দেখলো, কেউ আসেনি । শ্রাবন্তী বিছানায় শুয়ে কি একটা পড়ছে । তারপর অনেকক্ষণ কেটেছে, কিন্তু হঠাৎ শ্রাবন্তী অনিরুদ্ধকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে গাঢ় নিঃশ্বাসে দীর্ঘ চুম্বন করে দু’জন দুজনকে জড়িয়ে বসে থাকলো অনেকক্ষণ । এটা যেন স্বাভাবিক ছিল অনিরুদ্ধর কাছে, শ্রাবন্তীর প্রতি তার আগ্রহ, সেটা অনেকেই জানতো কলেজে, এই নিয়ে কানাঘুষো হতো মেয়েদের মধ্যে । কিন্তু শ্রাবন্তীর হঠাৎ কি হলো, এক ধাক্কায় অনিরুদ্ধকে সরিয়ে শুধু বললো,’তুই এখনই বেরিয়ে যা ঘর থেকে ‘ ।

কিছুটা অবাক হয়ে বেরিয়ে এসেছিল সেদিন । পরের দিন কলেজে দেখা পায়নি শ্রাবন্তী, কিন্তু একটা নীরব  শব্দ যেন সেদিন বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে টের পেয়েছিল, বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে । এক দুবার জিঞ্জাসাও করেছিল, কিন্তু কেউ কিছু বলেনি । প্রশ্ন করলে, সবাই কেমন এড়িয়ে যাচ্ছিল । অনিরুদ্ধ নিজেও অতো বেশি পাত্তা দেয়নি, সেই নীরব রহস্যকে ।, ভেবেছিল হয়তো হয়তো মনের ভুল । পাঁচদিন পর সে নিজেকে যখন আবিষ্কার করলো নার্সিং হোমের বেডে,তখন স্মৃতি তাকে বুঝিয়ে দিলো, কলেজের নীরব রহস্যের কথা ।  চোখ মেলে দেখেছিল, মা-বাবার অসহায়পূর্ণ মুখ, আর পরিচিত মানুষজন, ছিল পুলিশের দল ।  মাথায় মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা ।, সব কিছু এলোমেলো ও আবছায়া । সে জেগে আছে , না ঘুমিয়ে বুঝতেই পারছে না । তারপর আর বাবা মা আত্মীয়রা দেরী করেনি, নার্সিংহোম থেকে সোজা মুম্বাই-এর এক বেসরকারি হাসপাতলে পাঠাতে । সেখানকার  একজন নাম করা ডাক্তার অনিরুদ্ধর কাকা, তারপর আর ফিরে আসেনি । সন্তানহীন কাকা কাকীমার কাছেই থেকে গিয়েছিল ।

বাবু এবার কোন দিকে যাবো ।
ডানদিকে ঢুকে তিন নাম্বার বাড়িটাতে দাঁড়াবি  ।

সেই রাতেই ফিরে এলো, ফিকে হয়ে যাওয়া স্বপ্নটা । মুখোমুখি শ্রাবন্তী ।  চারিদিক অন্ধকার, পৃথিবীর সব অন্ধকার যেন গ্রাস করে ফেলেছে তাকে । শুধু শ্রাবন্তী ও শ্রাবন্তীর পেছনে মুখোশধারী অপরিচিত কিছু মানুষ,যাদের শুধু ঝলসানো চোখ দুটো জ্বল জ্বল করছে । কারো হাতে ধারালো অস্ত্র- যা অন্ধকারেও চকচক করছে । কারো হাতে হকি স্টিক আর  শ্রাবন্তীর মুখে সাফল্যের বিষাক্ত হাসি । সেই হাসির বিষাক্ত গ্যাস অনিরুদ্ধকে কোন এক অতল গহবরে নিয়ে যাচ্ছে , আর অনিরুদ্ধ হারিয়ে ফেলছে তার সমস্ত চেতনা । ঠিক সেই সময়েই অনিরুদ্ধর ঘুম ভেঙে যায় । জেগে ওঠে । পাশে ঘুমন্ত রানু । অনিরুদ্ধ তখন বিছানা থেকে নেমে ব্যালকোনিতে এসে দাঁড়ায়।

(৩)

শীতের এই সকালে অনিরুদ্ধ ফ্ল্যাটের বারান্দায় বসে তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছিল করছিল পাড়া ও পাশে পম্পাদের বাড়ির বাগান । অনিরুদ্ধদেরও সামনে একটা ছোট বাগানছিল ,সেটা অনেক আগের কথা, তখন অনিরুদ্ধ প্রাইমারী থেকে হাই স্কুলের  উঠেছে । তারপর ধীরে ধীরের একদিন  বাগানটা কেমন যেন শুকিয়ে গেলো । পাতাবাহারের গাছ ছাড়া আর কোন গাছ বেড়ে উঠলো না । এখন সেটা ফ্ল্যাট হয়ে গেছে । এই ফ্ল্যাট বাড়ির একটা ফ্ল্যাট পেয়েছে সে  পৈ্ত্রিকসূত্রে । আগে কয়েকবার  রানু এসেছিল কখনো অনিমেষকে সাথে করে , কখনো বা একা । অনিরুদ্ধ এসেছিল মাত্র তিনবার, একবার বাবা মারা যাবার সময়, তারপর  মা মারা যাবার একদিন আগে ।  আর একবার এসেছিল বাড়ির বিষয়ে সই করতে । 

রানু চা দিয়ে গেছে সাথে বাজারের ব্যাগ । মুখটা বেশ গোমড়া, সকাল থেকে উঠেই এটা ওটা কাজ করে যাচ্ছে । এখনো কোন পরিচারিকা জোগাড় করে উঠতে পারেনি । এক-দু জন যারা এসেছিল । তাদের দেমাক দেখে রানুর নিজেরই রাগ হয়েছে । রেগে গিয়ে তো বলেই ফেলেছে ,’দরকার নেই এই সব হতচ্ছাড়া কাজের লোক, আমি নিজেই সব করে নেবো’।  অনিরুদ্ধ জানে ওটা শুধু রাগের ভাষা । কোনদিনই একা বাড়ির কাজ সামলাতে পারেনি । আজো পারে না । অনিরুদ্ধ চায়ের চুমুক দিয়ে পেপারটা উল্টে পাল্টে দেখে রেখে দিল টেবিলের উপর । এক পাশে দাদা ও অন্যপাশে বোনের সংসার ।  মুখ দেখাদেখি এরই মধ্যে বন্ধ হবার জোগাড় । দু’বার ঝগড়া হয়ে গেছে । রানু চুপ করে সহ্য করতে পারে না কিছু । 

চা শেষ করে অনিরুদ্ধ বেড়িয়ে পড়লো বাজারের ব্যাগ নিয়ে । সুভাষপল্লীর বাজার । এই বাজারকে গড়ে উঠতে দেখেছে অনিরুদ্ধ । আগে বাজার করতে যেতে হতো ‘পুরানো বাজারে’ । বাবার সাথে সাইকেল করে যেতো । তখন এই বাজার বেড়ে ওঠেনি । প্রথম যেদিন এই বাজারে এসেছিল, মায়ের হাত ধরে । চারিদিক দোকান পাটগুলো কেমন যেন । ঠিক বাজারের মতো না, একটু খাপছাড়া লেগেছিল । ধীরে ধীরে সেই বাজার একটা পরিণতি পেয়েছে । এখন তো একটা দিক পুরোপুরি কংক্রিটের । বাজার শেষ করে অনিরুদ্ধ , একটা চায়ের দোকানে এসে বসে পড়লো বেঞ্চের উপর । বাজার ভর্তি ব্যাগগুলো পায়ের কাছে রেখে, চা ও সাথে গরম সিঙ্গারা অর্ডার দিয়ে সামনে পড়ে থাকা পেপারটা তুলে নিলো । খবর প্রায় সব একই, কিন্তু এই পেপারে লোকাল অনেক খবর দেখতে পেলো, যা সে বাড়ির খবরের কাগজে পায়নি । বহুদিনের স্মৃতিতে থাকা বিশ্বাসকাকার দোকানের কথা মনে পড়ে গেলো । তবে এই দোকানটা একটু বড়ো ,ভিড় বেশি ।  অনেকটা জায়গা নিয়ে দোকান । অনেকগুলো বেঞ্চ, কিছু টুল আছে, আর একটা জায়গা ঘিরে আছে কিছু প্ল্যাস্টিকের চেয়ার । অনেকেই বাজার করতে এসে একবার ঢুঁ মারে , এক কাপ চা , সাথে কেউ কেউ সিঙ্গারা নিয়ে বসে ।

আচ্ছা আপনি অনিরুদ্ধ সোম না ?

তিন দশক পরে চেনা গলার আওয়াজ অনিরুদ্ধর বুকের ভেতরটা ছলাৎ করে উঠলো । অন্যমনস্ক মনটা হঠাৎ সরে গিয়ে অনিরুদ্ধ যার মুখোমুখি হলো, সে শ্রাবন্তী । হাতে বাজারের ব্যাগ । সুন্দর করে সাজানো চেহারা । কোথাও একবিন্দু খুঁত নেই । অনিরুদ্ধ উঠে দাঁড়ালো । 

হা, আপনি মানে তুই শ্রাবন্তী । তাই না ?
চিনতে পারলি তাহলে ? কবে এলি শহরে ? কেমন আছিস ? এতো বৃদ্ধ লাগছে কেন তোকে ? শরীর অসুস্থ নাকি ?

এক সাথে এতোগুলো প্রশ্ন অনিরুদ্ধ আশা করেনি । শ্রাবন্তীর মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে, কিছু বলার ইচ্ছে হলো না । নিজেকে কিছুটা বোকা আর অথর্ব মনে হলো অনিরুদ্ধর । আশ্চর্য লাগছে, কি সাবলীল ভাবে কথাগুলো বলতে পারছে । কিভাবে পারছে ? সব কিছু কি ভুলে গেছে ? সব স্মৃতি ? মৃত্যুর বিছানা পর্যন্ত যে অনিরুদ্ধকে পৌঁছে দিয়েছিল । সে কিভাবে এতো স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে পারে ? হোক না সে দীর্ঘকাল আগের কথা । সেদিন সাধন মাস্টার তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে না দেখলে, হয়তো অনিরুদ্ধ বাঁচতে পারতো না । সেতো জানতো না, যে শহরের রাজনৈতিক দাদার ভাইয়ের সাথে শ্রাবন্তীর দীর্ঘ প্রেম পর্ব । কেউ তাকে বলেনি । এমনকি শ্রাবন্তী পর্যন্ত কোনদিন ঘুণাক্ষরে জানতে দেয়নি । অনিরুদ্ধ বোঝেনি এমন পরিশীলিত একজন মেয়ে কখনো ওই রকম ক্লাস এইট পাস করা রাজনৈতিক ডাকাবুকোর সাথে দীর্ঘ প্রেমের ইতিহাস থাকতে পারয়ে ।   আজ কি স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে , খোঁজ নিচ্ছে শরীরের । কি বলবে অনিরুদ্ধ ? বুঝতে পারছে না । শরীরটা ঘেমে উঠছে ক্রমশঃ । বুকের ভেতর অদুভত একটা কষ্ট , যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না , সেই অনুভব নিয়ে নিরাকার অস্তিত্বহীন মানুষের মতো চেয়ে আছে , না শ্রাবন্তীর দিকে না । কারো দিকে না । দৃষ্টি স্থির শব্দহীন চোখের ভাষাতে । শুধু শ্রাবন্তীর কিছু কিছু শব্দ তার কানে এসে লাগছে, কিন্তু কোন বিকার নেই তার । এমনভাবে কতটা সময় পার হয়েছে , জানা নেই, শ্রাবন্তীর ধাক্কায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতেই আবার বসে পড়লো চায়ের দোকানের বেঞ্চে । 

কি হয়েছে তোর ? এমন করছিস কেন ? কি হলো ? 

কথাগুলো শুধু শুনলো, কিছু বললো না , পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে চায়ের দাম মিটিয়ে, একটা সিগারেট ধরিয়ে অনিরুদ্ধ হাঁটতে শুরু করলো । অদ্ভুত অস্থিরতা , অদ্ভুত আকারহীন আবেগ, রাগ , মাথার শিরাগুলো দপদপ করছে । এমন ভয়ঙ্কর ক্রোধ অথবা বেদনা সেদিনো অনুভব করেনি, যেদিন মাফিয়া, শাসক ও বিরোধী দলের চক্রান্তে সরকারী দূর্নীতি বিভাগের লোকগুলো এসে তছনছ করেছিল ফ্ল্যাটের সব আসবাব পত্তর। ওকথ্য ভাষায়  তাকিয়ে থাকা চোখগুলোও আজকের মতো অনিরুদ্ধকে আঘাত করেনি ।

  কাঠফাটা রোদে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু সে দাঁড়ালো না, একবার শুধু পেছন ঘুরে দেখলো, শ্রাবন্তী তখনো দাঁড়িয়ে । বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে শুধু এটাই মনে হলো ,শ্রাবন্তী - একটা নাম, একটা ঘটনা , একটা উদ্দেশ্য , একটা বিরামহীন বোঝাপড়া । শহর থেকে উচ্ছেদ করে দেওয়া অনিরুদ্ধর জীবনের ইতিহাস ।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন