শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

কথাকার গৌর বৈরাগীর মুখোমুখি রাজীব কুমার ঘোষ। পারক গল্পপত্র


(সত্তরের শেষদিক। শাস্ত্র-বিরোধী আন্দোলনের যুগ। যোগ দিয়েছিলেন বলরাম বসাকের ‘মুক্ত গল্পসভা’য়। গল্পকার বন্ধু হিসাবে পাশে পেয়েছিলেন রমানাথ রায়, শেখর বসু, তপন বন্দ্যোপাধ্যায়, আশিস ঘোষ ও আরো অনেককে। এরপর রাধানাথ মন্ডলের ‘গল্পচক্র’তে যাতায়াত শুরু। এর মধ্যে চন্দননগরে ‘গল্পমেলা’ তৈরি, উদ্দেশ্য ছিল গল্পকারদের জন্য একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। সবসময় চেয়েছেন নতুন নতুন গল্পকার উঠে আসুক। তিনি গৌর বৈরাগী, যতটা বড়দের লেখক ততটাই ছোটোদের। ছোটোগল্পের সংখ্যা সাতশোর ওপর, অণুগল্প ধরলে সংখ্যাটা হাজারের ওপর। অসামান্য সংগঠক। চল্লিশ বছর পেরোনো চন্দননগর গল্পমেলার স্থপতি। যে গল্পমেলা অতিক্রম করেছে তিনশোটি গল্পপাঠের আসর। প্রতি রবিবার সকালে যার বাড়িতে বসে গল্পের আড্ডা। কাছে দূরে মিলিয়ে গড়ে উপস্থিত থাকেন পঁচিশ থেকে তিরিশ জন গল্পপাগল লোক। গল্পের সমালোচনায় তিনি কঠিন-কঠোর, এক নির্মম সমালোচক। বড়দের জন্য তার গ্রন্থগুলি হল — গৌর বৈরাগীর গল্প(১৯৯৭), কাঠবাদাম গাছ(২০০৩), অপার্থিব(২০০৪), মূকাভিনয়ের একদিন(২০০৪)। ছোটোদের জন্য গল্পগ্রন্থ — গম্ভীরপুরের রাজামশাই (২০০৬), গুপ্তধন আবিষ্কার ও অন্যান্য গল্প(২০১০), বাঘ মারুনি(২০১১), বদলে গেলেন রাজামশাই(২০১২), তিনু পুলিশের বন্দুক(২০১৯)। ছোটোদের জন্য উপন্যাস — আকাশবাণী মহাদেবপুর(২০০৮), আকাশকুসুমপুরের ডায়েরি (১৪১৭), ভুতুড়ে সাক্ষাৎকার(২০০৯), স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ – প্রথম আলো এবং অন্ধকার (২০০৯)। এছাড়াও রয়েছে অজস্র অগ্রন্থিত গল্প। বানিজ্যিক, অবানিজ্যিক পত্রিকায় অজস্র গল্প প্রকাশ। পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন অগণিত সংস্থা থেকে।)

রাজীব।।  একদা প্রয়াত প্রাবন্ধিক, আলোচক — নৈহাটির পার্থপ্রতীম বন্দ্যোপাধ্যায় আপনার গল্প নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন ‘গৌর বৈরাগীর গল্প’। গৌর বৈরাগীর গল্প নিয়ে চর্চায় এই আলোচনাটির গুরুত্ব অপরিসীম। এই প্রবন্ধে তিনি আপনার গল্প রচনার কিছু বৈশিষ্ট্য  চিহ্নিত করেছিলেন। আজ আপনার গল্প-জীবনের একেবারে পরিণত পর্যায়ে এসে আপনি যদি সমস্ত গল্প-জীবনের দিকে ফিরে তাকান তাহলে কোন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় বা কোন প্রভাবে বা জীবনযাপনের কোন অভিঘাতে এই বৈশিষ্ট্যগুলির আপনার লেখনীতে আত্তীকরণ ঘটেছে সেই উত্তর খুঁজতেই এই সাক্ষাৎকার।

গৌর বৈরাগী।। ১৪১৮ সালে 'এবং মুশায়েরা' পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল।

রাজীব।। আশা করব এই আলোচনা নবীন অক্ষরকর্মীদের সামনে বিস্তৃত পথের ওপর আলো ফেলবে, আরো স্পষ্ট হবে তাদের গন্তব্য। প্রথম যে বৈশিষ্ট্যটি পার্থপ্রতিমবাবু নির্দেশ করেছিলেন তা হল আপনি তুচ্ছ প্রাত্যহিকতাকে  নিয়ে যান এমন এক স্তরে যাতে পাঠক ঢুকে যায় সময়ের গভীরে। এই প্রসঙ্গে এখন আপনি কী বলবেন?

গৌর বৈরাগী।। কথাটা ঠিকই, তুচ্ছর দিকেই আমার নজর থাকে। যা ছোট, যা অবহেলিত, যা সাধারণের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। হয়ত যে ঘটনাটি ব্রাত্য সে কারণেই কীনা কে জানে আমার পক্ষপাত এমন এমন সময়ে ‘ছোটো’ বা ‘তুচ্ছ’র প্রতিই থাকে। আমার কেন যেন মনে হয় তুচ্ছকে তাচ্ছিল্য করার বিষয় নয় মোটেই। প্রাত্যহিকতায় ঘটে যাওয়া তুচ্ছ ঘটনাটি তো একক নয় তা আসলে সংলগ্ন হয়ে থাকে বৃহৎ ঘটনার সঙ্গে। বড় ঘটনার একটা অংশ। লেখক হিসেবে আমার কাজ হল টুকরো অংশকে ধরে সমগ্রে পৌঁছে যাওয়া। এটা একটা পদ্ধতি। একজন অক্ষরকর্মী হিসেবে আমার এমনটাই স্বচ্ছন্দ লাগে। এর মধ্যে আর একটা খুব দামি কথা আছে। ওই যেখানে বলা হচ্ছে – ‘পাঠক ঢুকে যায় সময়ের গভীরে’। এটা শুধু কথা হিসেবে দামি নয়, সময়ের গভীরে পাঠককে পৌঁছে দেওয়ার কাজটা বেশ জটিল একটা প্রক্রিয়া। শুধু কিছু অক্ষর দিয়ে তত্ত্ব দিয়ে, ঘটনার ঘনঘটা দিয়ে এ কাজটা করা যায় না। এটা একটা কৃৎকৌশল, একজন অক্ষরকর্মীকে সারাজীবন ধরে তা আয়ত্ব করতে হয়, তবেই লেখকের প্রার্থিত জায়গায় পাঠককে নিয়ে যাওয়া যায়।

রাজীব।। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হল — আপনি গল্প বলতে বোঝেন ঘটনা ও চরিত্রের মধ্যে একটা থিমকে ক্রমশ নির্মাণ করা। সেই থিমকে গল্পের মূর্ত বাস্তবে নিয়ে আসা এবং ক্রমে ক্রমে এক বহুমাত্রিক স্তরে পৌঁছানো।



গৌর বৈরাগী।। গল্প আসলে কোনো ঘটনা নয়। কিছু চরিত্রের সমাহারও নয়। একটা থিমকে দাঁড় করাতে গেলে যদিও ঘটনা বা চরিত্র অপরিহার্য তবু একটি গল্পের গল্প হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এটা অপরিহার্য নয়। প্রত্যেক লেখকেরই একটা ‘বলার কথা’ থাকে। যাকে মেসেজও বলা যায়। গল্পের ভেতর যার কিছু খুব প্রচ্ছন্ন ভাবে থাকার কথা। সব নয়, কোনো কোনো ঘটনা, দৃশ্য বা চকিত চমক লেখকের মনোজগতে আলোড়ন তোলে। ঘটনার ঘাত ব্যক্তি পরিচয় ছাড়িয়ে দাবি করে সামগ্রিকতায় পৌঁছাতে। লেখক তখন নিরুপায়। পাঠকের সামনে হাজির হওয়া ছাড়া তার আর অন্য উপায় থাকে না। আবার শুধু গল্প কিংবা ঘটনার বিবৃতি দেওয়াটাই তো লেখার উদ্দেশ্য নয়, তেমন হলে লেখা হবে একমাত্রিক। লেখকের মনন জগতে একজন শিল্পী সতর্ক পাহারায় থাকেন। তিনি একমাত্রিকতায় তুষ্ট হবেন কেন! ওই যে বলা হল গল্প কোনো স্থূল ঘটনার বর্ণনা নয়। গল্পে কোনো বহুমুখী চরিত্রেরও উপস্থিতি নয়। এগুলি বাইরের পোষাক। গল্প থাকে নিঃশব্দ গোপন এক অন্তরালে এবং তা অবশ্যই একমাত্রিকতায় থাকে না।

রাজীব।। তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি হল আপনি বর্তমান সময়কে ব্যবচ্ছেদ করেন। আপনার শ্রেণীকে বা ‘ক্লাস’কে ব্যবচ্ছেদ করেন।

গৌর বৈরাগী।। একজন শিল্পীমানুষ কখনও অনুভূতিশূণ্য হতে পারে না। আনন্দে উচ্ছ্বসিত হন, দুঃখে দীর্ণ হন, প্রতিদিন ধ্বস্ত হতে হতে এক সময় আগুন হতে ইচ্ছে হয়। অন্যের কথা বলতে পারিনা। কিন্তু আমার গায়ে জোর নেই, মুষ্ঠিবদ্ধ হাতকে প্রতিবাদী করার মত সাহসও নেই। শুধু হাতে একটি নির্বিষ কলম আছে। সেটাই আমার আয়ুধ। তা দিয়ে যথাসম্ভব সময়কে নির্মাণ করি এবং বলতে কী আমাকেও নির্মাণ করি। এ সেই ‘আমি’ যাকে আগুনের আঁচ থেকে রক্ষা করার বদলে আগুনেই নিক্ষেপ করি। একজন শিল্পীকে এভাবেই ব্যবচ্ছেদ করতে হয়। সমাজকে তো বটেই, নিজেকেও।

রাজীব।। আপনার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল — আপনি শুধু আশার কথা শোনান না বা জোর করে আশার নামে মরীচিকার আলো দেখান না অন্ধকারে শব ব্যবচ্ছেদ-ও করেন। যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

গৌর বৈরাগী।। এ ব্যাপারে আমি একটু পুরনো পন্থী। আমি মানুষটা অত্যন্ত আশাবাদী। সব গল্পই আসলে জীবনের গল্প। বাস্তবে মানুষের হেরে যাওয়া আছে, হতাশা আছে। হতাশ মানুষের সামনে মৃত্যুভাবনার গহীন অন্ধকার আছে। এগুলো বাস্তব। কিন্তু কেন জানিনা এই চাক্ষুষ বাস্তব আমাকে শান্তি দেয় না। এই ঘোর বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। পৌঁছতে চাই অন্তরের বাস্তবতায়। কলমকে আঁকড়ে ধরার পেছনে এটাও একটা কারণ। সব যুবকের মতো আমিও একদিন সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিলুম। সত্তরদশকের আঁচ গায়ে লেগেছিল। লাগার কথাই। সে আঁচে ঝলসে যেতে পারতুম। পারিনি সেও একজন হেরো মানুষের কথা ভেবে। তেমন একজন মানুষ আমার বাবা। অন্যজন আমার মা। বাবা শ্যামনগর নর্থ জুট মিলের চোদ্দ টাকা বারো আনা হপ্তার কল মিস্ত্রি। তার জীবনে দুটি প্রিয় আকাঙ্খা ছিল। প্রথমটি মিল ফেরত সন্ধ্যাকালীন হরিসভায় গিয়ে নামগান, অন্যটি ছিল প্রায় প্রতিরাতে মায়ের ক্লান্ত শরীরে তার রাগের মোচন। তাই আমরা ভাইবোন মিলিয়ে এগারো জন। এই অপরিকল্পিত যাপনে দারিদ্র আর কৃচ্ছতা যে নিত্যসঙ্গী হবে এ কথা বলাই বাহুল্য। এই অবস্থায় শৈশব কৈশোর পেরিয়ে একদিন যুবক হলুম। সেই যুবক বেলায় চাকরিও জুটে গেল একটা। প্রথম পোস্টিং ছিল শান্তিনিকেতনে। তখন সেই ১৯৭০-৭১ সালে শান্তিনিকেতনে রাজনীতির আঁচ ছিল গনগনে। অফিস কাছারিতে মুহূর্মুহু স্লোগান উঠছে তখন। গোপন মিটিং অ্যাটেন্ড করছি। উত্তেজনায় টগবগ করছে শরীর। ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরা’র আগুনে আহ্বানে পা বাড়াবার অপেক্ষা শুধু। তখনই একদিন মাস মাইনে হাতে করে বাড়ি গেছি। মাইনের প্রথম টাকাটি বাবার হাতে আর জীবনে এই প্রথম মায়ের হাতে একটি দশ টাকার নোট আলাদা করে। দীর্ঘ রোগভোগের পর তাদের দুজনার হাতে সামান্য পথ্য। সেইদিন বাবার রাগি চোখ দুটো দেখেছিলুম শান্ত, নম্র, বিভোর। মায়ের চোখ বাধা মানে নি। এই হল তুচ্ছ প্রাত্যহিকতা। এর তুলনায় ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরা’র স্লোগানই সমস্ত তুচ্ছতার বিরুদ্ধে আহ্বান। কিন্তু সত্যি কথা হল সেই দিন আমি তুচ্ছতাকে তাচ্ছিল্য করতে পারিনি। ঘরকেই গৃহকোণকেই মর্যাদা দিয়ে ফেলেছিলুম। এর মধ্যেই যে কত অন্ধকার। খাঁজে খাঁজে কত যে পাপ। শুধু এই পাপকেই তুলে আনা নয় আমি এর মধ্যে আলোর সন্ধানও করি। ওই যে বলা হচ্ছে ‘অন্ধকারের শব ব্যবচ্ছেদ’ সত্যি বলতে কী শব ব্যবচ্ছেদ করি বইকি। তবে সেই ব্যবচ্ছেদে পুঁজ রক্ত ক্লেদ তুলে আনিনা। আমি তুলে আনতে চেষ্টা করি আত্মাকে।

 রাজীব।। পার্থপ্রতিমবাবু বলেছিলেন আপনার লেখায় আপনি বর্তমান সময়ের অনন্বয়, চরিত্রহীনতা, সার্বিক ভাঙনের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েক যুগ পার করে আজ আপনার কী মনে হয়?

গৌর বৈরাগী।। এই যে সার্বিক ভাঙনের বিপ্রতীপে দাঁড়াবার কথা বলা হচ্ছে এটা যেকোনো শিল্পীর ক্ষেত্রেই সত্যি। তিনি যে মাধ্যমেই কাজ করুন না কেন, তিনি চিত্রশিল্পী হোন, অভিনেতা, গায়ক, লেখক – সবার ক্ষেত্রেই কথাটা খাটে। একজন শিল্পী হলেন সমাজের মুখ। সামাজিক অবক্ষয় আর চরিত্রহীনতার কারণে সচেতন শিল্পী মাত্রেই দীর্ণ হন। গলা তুলতে হয় এর বিরুদ্ধে। এই গলাটা একজন চিত্রশিল্পীর ক্ষেত্রে রঙ তুলি। গায়কের কন্ঠ এবং সুর, অভিনেতার অভিনয়, কবি সাহিত্যিকের কলম। সমাজে সার্বিক ভাঙনের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দী হয়ে ওঠাটাই একজন যথার্থ শিল্পীর দায়।

রাজীব।। পার্থপ্রতিমবাবুর মতে গল্পের ছোটো পরিসরেই আপনি সফলভাবে বহুস্বরিক হয়ে উঠেছেন। যে বহুস্বরিকতা সাধারণত উপন্যাসের ধর্ম। আপনি কী মনে করেন?

গৌর বৈরাগী।। এটা বুঝি আমারই কথা। ছোটোগল্প আমার প্রিয় বিষয়। আবার ‘পরিসর’ শব্দটিও এখানে যথোপযুক্ত অন্তত আমার ক্ষেত্রে। চল্লিশ বছর ধরে লেখালেখি করতে করতে ছোটোগল্প এবং ছোটোদের গল্প লেখা হয়ে গেল অজস্র। উপন্যাস বলতে যা বোঝায়, অন্তত বর্তমানে যে মাপের উপন্যাস লেখালেখি হচ্ছে তা হয়ত হাজার পঞ্চাশ শব্দের, তেমন উপন্যাস একটিও লিখিনি। প্রথম কথা উপন্যাস আমি লিখতে পারিনা। এর কৃৎকৌশল আমার অধিগত নয়। ছোটোগল্পেই আমি স্বচ্ছন্দ এবং সাবলীল। আসলে আমি কম কথার মানুষ। কম বলে কত বেশি বলা যায় তারই অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছি এখনও। আমার অধিকাংশ গল্প আকারে খুবই ছোটো। লিখতে গিয়ে দেখেছি এক দেড় হাজার অথবা বড়জোর দু’হাজার শব্দের মধ্যে যা বলার তা বলা হয়ে যায়। আরও বড় করার অর্থ গল্পকে টেনে বাড়ানো। তার মানেই গল্পের শরীরে মেদ বাহুল্য। আমার মনে হয় ব্যবহৃত হতে হতে শব্দের নিজস্ব একটা ওজন তৈরি হয়। শব্দের ধার আছে, ভারও আছে। এটা এমনি এমনি হয় না। জনজীবনে ব্যবহৃত হতে হতে মৃতপ্রায় কোনো শব্দ জীবন্ত হয়ে ওঠে। তখন তার ধার তৈরি হয়, ধারালোও হয়। শব্দের চরিত্র নির্মাণে নিঃশব্দে এগুলো কাজ করে। আবার নতুন শব্দও প্রতিদিন তৈরি হয় সমাজ সংগঠনে। পুরনো নতুন মিলিয়ে এইসব শব্দই হল একজন অক্ষরকর্মীর কাঁচামাল, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রথমেই আসবে বাক্যের কথা। বাক্য হল শব্দের সমষ্টি। যেমন তেমন করে শব্দ জোড়া লাগিয়ে বাক্য হয়ত একটা তৈরি হল কিন্তু শব্দের সংস্থাপনে যদি গলদ থাকে তা সে বাক্য উৎরোবে না। গদ্যেরও একটা ছন্দ আছে। সে ছন্দকে কবিতার ছন্দের মতো সংজ্ঞায়িত করা যায় না বটে কিন্তু কান ঠিক টের পায়। তখন কান ঘাড় ধরে মনকেও টেনে আনে গদ্যের জঞ্জাল থেকে।ঠিক ঠিক শব্দ সাজিয়ে বিষয়ানুযায়ী যদি একটি ছন্দিত বাক্য তৈরি হয় তবে তা বিদ্ধ করতে পারে পাঠকের হৃদয়। সে সময় বেশি কথা বলার দরকারই হয় না। স্বল্প পরিসরে বলার কথা বলে ফেলা যায়। আমার লেখায় বরাবর সে চেষ্টাই আছে। পুরোপুরি সফল হয়েছি এমন দাবি কখনোই করি না। গল্পের শ্রেষ্ঠত্ব তার আয়তনের ওপর মোটেই নির্ভর করে না। স্বল্পায়তনের অনেক গল্পই যে সাহিত্যে অমর হয়ে আছে তার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যেও। বর্তমানে সময়ের দাবি মেনে ছোটোগল্প আরও ছোটো হচ্ছে যার শব্দ সংখ্যা ২০০/২৫০/৩০০ এবং তার নাম অণুগল্প। এই গল্পই এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পত্র পত্রিকার পাতা থেকে ফেসবুক, হোয়াটস্‌ অ্যাপের পাতাতেও। যদিও এই গল্প ছোটোগল্পের থেকে চেহারা চরিত্রে একদম আলাদা। কিন্তু একটা কথা হল পরিসর। স্বল্পায়তনেও যে বলার কথাটা বলা যায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ অণুগল্প। এখানেও বহুস্বরিক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে পরিসর কোনো অন্তরায় নয়।

রাজীব।। বর্তমানে কিশোর থেকে শুরু করে কলেজ পড়ুয়া বা যিনি সদ্য গল্প লেখা শুরু করেছেন তাদের উদ্দেশ্যে আপনি কী বলবেন?



গৌর বৈরাগী।। আসল যেটা বলার হলো, বিষয়টাতো প্রত্যেকেই জানে যে কোন বিষয়ের ওপর তারা লিখবে কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আরো লেখা আর কী, আরো আরো লিখে যাওয়া। লিখতে লিখতে যেটা হয় এফিসিয়েন্সি তৈরি হয়, পারফেকশন তৈরি হয়। শব্দের, বাক্যের যে গঠন কম কথায় অনেক বেশি বলা যায়, যেটা আমি আগেও বলেছি, সেটা কিন্তু একমাত্র চর্চার ভেতর দিয়ে — চর্চা, চর্চা, চর্চা, আরো চর্চা তার ভেতর দিয়ে আরো পারফেক্ট হয়ে ওঠে। এই সময়ের লেখকদের কাছে আমার বলা, তারা তো চোখ-কান খুলেই লিখছে, সেটা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই যে এই বর্তমান সময়টা যেন তাদের লেখার মধ্যে আসে। আসবেই। কিন্তু শুধু তো তাই নয়, তাকে লেখা তৈরি করতে গেলে এবং শিল্পীত প্রয়াস হতে গেলে, শুধু তো বিষয় নয়। বিষয়ের পরেও গল্প হয়ে ওঠার জন্য যে রসায়নটা, সেটা শব্দ, বাক্যের এমন গঠন যাতে করে সেটা অন্তত বাক্যটা যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই জায়গাটা, এটার জন্য কিন্তু চর্চা দরকার। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত চর্চাটা দরকার।

রাজীব।। বর্তমানে এই যে করোনা পরিস্থিতি, লকডাউন পরিস্থিতি। এই সময়ে এই পরিস্থিতিকে নিয়ে কিছু না কিছু গল্প নিশ্চয়ই আপনি শুনেছেন বা পড়েছেন ডিজিটাল মাধ্যমে। যদিও আমি জানি আপনি ডিজিটাল মাধ্যমে অতটা সরগড় নন, তবুও নিশ্চয়ই কিছু গল্প অবশ্যই পড়েছেন। এই পরিস্থিতিকে নিয়ে লেখা সেইসব গল্প নিয়ে বা লেখকদের অভিমুখ নিয়ে আপনার মতামত কী? আপনার কেমন লেগেছে বা আপনার কী মনে হচ্ছে কোন দিকটা ঘাটতি থেকে যাচ্ছে?

গৌর বৈরাগী।। খুব যে বেশি পড়েছি তা নয়, প্রিন্ট মিডিয়া তো হাতে তখন বিশেষ পাইনি, তবুও যা পড়েছি তাতে করে মনে হয়েছে তারা বিষয়টা দেখছে এবং তারা বিষয়টার ওপর ওপর দেখছে না কিন্তু। এই যে সমস্যা তার গভীরে চলে যাচ্ছে, কারো কারো লেখায় আমি দেখেছি। তারা গভীরে যাবার চেষ্টা করছে। মানুষের মূল্যবোধের যে সংকট, মানুষের নিজস্ব পারস্পরিক মিলনের যে সংকট এবং এই সময়ের যে আত্মিক সংকট এটাকে ধরে বেশ কয়েকটা লেখা আমি দেখেছি। প্রিন্ট মিডিয়ায় নয় কিন্তু ওই অনলাইনে যেগুলো দেখেছি। সঠিকভাবেই এসেছে।

রাজীব।। দীর্ঘকাল আপনি ছোটোদের জন্য গল্প লিখেছেন, ওয়ার্কশপ করেছেন। এখন লকডাউন পরস্থিতিতে যখন প্রিন্ট মিডিয়া আর সেভাবে ছোটোদের কাছে পৌঁছোচ্ছে না, তখন একমাত্র অবলম্বন হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে যে সমস্ত পত্রিকা আছে সেগুলোই। যেমন অনলাইনে ছোটোদের অন্যতম একটি পত্রিকা ‘জয়ঢাক’ যা বাংলায় প্রথম ছোটোদের ওয়েবজিন এবং অন্যান্য ওয়েব পত্রিকাগুলি। এই পরিস্থিতিতে আপনি অভিভাবকদের কী বলবেন?



গৌর বৈরাগী।। এখন যারা ছোটোরা, যদি স্কুল পড়ুয়া ধরি তারা তো অন-লাইনটা মোটামুটি সরগড় হয়ে যাচ্ছে। অনেক সরগড় হয়েছে আরো দু’তিন মাসে আরো হবে। তার মানে এই জায়গাটায় তারা প্রিন্ট মিডিয়া থেকে একটু সরে এসেছে। এইখানেই কিন্তু একটা সুযোগ, বড় সুযোগ এই সমস্ত অনলাইন বা অনান্য ছোটোদের পত্রিকাগুলির এদের দিকে একটু নজর ফেরানোর। ছোটোরা নিজেরা পারবে না যারা অভিভাবক তারা যদি অন্তত এইটাকে তাদের সামনে উন্মোচন করেন এবং একটু সময় দেন, সময়টা দিতে হবে। ওইখানে একটা অন্য জগত তৈরি হয়েছে এটা ঘটনা। সেই জগতটাতে যাওয়া দরকার, মানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে বদলানো দরকার। আধুনিক যেটা হয়েছে সেটাতে যেতে আমার কষ্ট হলেও সেখানে যেতে হবে। যেতে যেতে সেটা স্বাভাবিক হবে।

রাজীব।। আপনি কি মনে করেন এই সময়, এই পরিস্থিতিতে অন-লাইনে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ছোটোদের জন্য যারা লেখেন তাদের ছোটোদের সামনে আসা উচিত? তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা উচিত বা তারা লিখতে আগ্রহী হলে সেই নিয়ে ওয়ার্কশপ – এগুলো আমাদের সংখ্যায় বাড়ানো উচিত?

গৌর বৈরাগী।। অবশ্যই। যত ইন্টার‍্যাকশন হবে তত লেখকের দিক থেকেও মঙ্গল। লেখকরা জানতে পারবে ছেলেরা কী চাইছে। যারা ছোটোরা তারাও বুঝবে আমাদের কোন লেখা পড়া দরকার কোন লেখাকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া দরকার। আসলে শেষ কথা তো যতোই মেশিন আসুক, যতোই কম্পিউটার আসুক, এই নেট দুনিয়া কিন্তু আসল নেট দুনিয়া তো ভেতরে। প্রত্যেকের ভেতরে। এই জায়গার উন্মোচনটা কিন্তু দরকার। সেটা এই নেটের মাধ্যমে হোক বা প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে হোক, এই মানবিক জায়গাটা যদি আমরা তাকে না দিতে পারি, শিশুর যে জায়গাটা এবং সেটা শিশু জন্মগতভাবে আয়ত্ত করে নেয় বা এটা থাকে তাদের। সেটা যে মানবিক জায়গাটা। অর্থাৎ একটা লোক হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে তাকে কিন্তু একটা শিশু না জেনেই তুলতে যায়। অবধারিতভাবে তুলতে যাবে। তাকে কিন্তু কেউ বলে দেয়নি যে অসহায় মানুষটির হাত ধরে তুমি তোলো। সে কিন্তু এগিয়ে যাবে। অর্থাৎ এর ভেতরে কিন্তু বীজটা প্রকৃতি দিয়ে দেয়। সহজাত প্রেরণা। আজকে বাইরের যে শক্তিটা অর্থাৎ ব্যবসায়িক যে শক্তিটা সেটা তো আমাদের এই বৃত্তিগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়ার, নষ্ট করে দেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত ছক কষছে। একমাত্র এখানেই সাহিত্য, শিল্পের বলার জায়গাটা — বলা তোমার মানবিক চৈতন্যের যে উন্মোচন, তোমার ভেতরে যে সহজাত প্রেরণা রয়েছে সেটাকে তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। মানুষের হাত ধরো। পড়ে যাওয়া মানুষকে টেনে তোলো। একটু তাকে শুশ্রুষা করো, তাকে ছায়া দাও। এই জায়গাটা কিন্তু তাকে বার বার বলতে হবে। সেটার জন্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে এইধরণের অনুষ্ঠান যদি করো তোমরা তাহলে সেটা খুব ভালো হয়। আগামী দিনের পাঠকদের কাছাকাছি পৌঁছানো যাবে। খুব পজিটিভ চিন্তা।

রাজীব।। পারক অন-লাইন পত্রিকার পক্ষ থেকে আপনাকে অজস্র ধন্যবাদ। আশা রাখি ভবিষ্যতেও পারকের পাশে আপনাকে আমরা পাবো।







কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন