শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

সুবীর ঘোষ


বুকের মধ্যে  খিল এঁটে ঘুমিয়ে ছিল বাতায়ন । কী যেন একটা স্বপ্নও ভেসে আসছিল আর মিলিয়ে যাচ্ছিল । স্বপ্নের ভেতর দিয়ে বাতায়ন উড়ে যাচ্ছিল দূর আকাশের নীলরাজ্যে মেঘের রজতাভা সরিয়ে সরিয়ে । এমন সময় কে যেন তাকে নাড়া দিল । বাতায়ন প্রথমে ভেবেছিল বোধ হয় আকাশে ওড়া কোনো পাখি । সে-ও তো আসলে উড়ছিল । তার সঙ্গে বোধহয় টক্কর লাগল ঐ পাখিটার ।
ধড়মড় করে উঠে সজাগ হয়ে গেল বাতায়ন । তারপর ওই...। ওই আবার । টুক টুক... খুট খুট... হুস...।
কে , কে ওখানে ? কে বাইরে ?
আস্তে । এত উত্তেজিত হয়ো না । তোমার বয়েস হয়েছে ।
কে তুমি ?
আমি বাতাসী ।
বাতাসী নামটা শুনে বাতায়ন সহজ হয়ে গেল । সেই দুষ্টুমিতে ভরা উতলা মেয়েটা ।
বাতাসী । যখন তখন আসে আর নাড়িয়ে দিয়ে যায় বাতায়নকে ।

প্রথম প্রথম কাতুকুতু লাগত তার । এখন বেশ উপভোগ করে বাতায়ন । কেমন প্রেমালি ছোঁয়া আছে বাতাসীর স্পর্শে ।
বুকের খিলটা নামিয়ে দিয়ে নিজেকে বন্দীদশা থেকে মুক্তি দেবার একটা অবকাশ পেল বাতায়ন । নিজেকে উন্মুক্ত করে বাইরে চোখ মেলতেই বলা কওয়ার বালাই না রেখে চপলা কিশোরীর ঢিলে পদছন্দে ঢুকে পড়ল বাতাসী । ঢুকেই বলল—আহা মরি মরি ঐ দিকের বাথরুমের জানলাও দেখি খোলা । তবে আমি এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত একটু খেলে আসি । তুমি ততক্ষণ গুমোট কাটিয়ে একটু শীতল হয়ে ওঠো ।

ময়ূরের ছন্দে কিছুক্ষণ নেচে আসার পর বাতাসী বলল--বাতায়ন ওদিকটায় যাবে ?
দুঃখ দুঃখ মুখে বাতায়ন জবাব দিল—কেন প্রতিবার এমন করে বল,বল তো ? আমি যে স্থবির । কোথাও যেতে পারি না। ওদিকে আমার ভাই আছে তুমি তার সঙ্গে না-হয় মনের দুটো কথা বলে এস ।
আহা আমার তো তোমাকেই পছন্দ । সে পছন্দ বুঝি তোমার ভাই মেটাতে পারবে ? আমি কী দ্রৌপদী যে পাঁচ ভাইকেই আমার চাই !

খানিকটা  রাগ করেই বাতাসী এবার বাইরের ঘরগুলোর দিকে চলে গেল । খাবার জায়গাটায় সবুজ আলো ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে হিমবক্স , বলে-- চিনতে পারছ আমায় ?
হিমবক্স উত্তর দিল—কেন পারব না ? তুমি মুক্ত পাখির মতো স্বাধীনভাবে উড়ে বেড়াও তাই ভাবছ আমি তোমাকে চিনি না । আসলে আমার ভেতরের ঘূর্ণিপাক দিয়ে আমি তোমাকে ক্লোন করে নিয়েছি ।
--কই দেখাও দেখি আমার ক্লোনকে ।
দেখবে ?
এই বলে হিমবক্স  হনুমানের মতো তার হৃদয়টা খুলে ধরল । বাতাসী দেখল সত্যিই হিমবক্সের সমস্ত অ্যানাটমি  জুড়ে খেলে বেড়াচ্ছে এক অন্য বাতাসী । খুব চেনা । অথচ অচেনা । ঐ বাতাসী তার থেকে ফর্সা তার থেকেও শীতল ।
হিমবক্সের হৃদয়াভ্যন্তর থেকে কেমন একটা গন্ধ বেরুতে লাগল । বাতাসী অবাক হয়ে ভাবতে লাগল হাওয়া তো গন্ধবাহক । হাওয়ার কী নিজস্ব গন্ধ আছে ? উতল হাওয়ার গন্ধ আর পাগল হাওয়ার গন্ধ কী এক !
বাতাসী আর থাকতে না পেরে জিগ্যেস করে বসল –হিমবক্স,  এ কীসের গন্ধ ?
এটা হল মাংসের গন্ধ ।
হঠাৎ কী মনে পড়ে যেতেই বাতাসী হিমবক্সকে বলল—বন্ধ কর বন্ধ কর তোমার হিমাঙ্গ প্রদর্শনশালা । আমার ভালো লাগছে না ।

ব্যাপারটা হঠাৎই ঘটে গেল । অনেকদিন আগেকার একটা স্মৃতি মনে পড়ে যেতেই বাতাসী অমন চঞ্চল হয়ে উঠল । একবার সে ঘুরতে ঘুরতে একটা হাসপাতালের কাছে চলে গিয়েছিল । সেখানে যে মর্গ নামে একটা গ্যালারি আছে বাতাসী তা জানত না। হিমবক্সের থেকেও ঠান্ডা সে জায়গাটা । কিন্তু দুর্গন্ধে ভর্তি। বাতাসী দারোয়ানকে জিগ্যেস করে জেনেছিল ওখানে নাকি প্রাণহীন দেহ রাখা হয় । প্রাণে উত্তাপ না থাকলে দেহ গন্ধ ছাড়ে । আর দেহ থেকে গন্ধ বেরোলে মানুষই মানুষকে সহ্য করতে পারে না । সেদিন সেই পচাগলা দেহগুলোকে দেখে বাতাসীর খুব বমি পেয়েছিল । বাইরে চলে এসে সে অনুভব করেছিল তার গায়েও লেগে গিয়েছে দুর্গন্ধ । ওই দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে তাকে ভালো করে স্নান করতে হয়েছিল বৃষ্টির জলে । হিমবক্সের পাঠিয়ে দেওয়া মাংসের গন্ধ হঠাৎ বাতাসীর নাকে সেই লাশ- ঘরের গন্ধের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেল । বাতাসী ভাবল হিমবক্স নিজেও তো একটা মর্গে পরিণত হয়ে গেছে । মানুষের রকমসকম দেখে হাসি পায় তার। মানুষের জীবনে পদে পদে কৃত্রিমতা পদে পদে শঠতা । নইলে চারদিকে এমন গরমের মধ্যে এক নকল হিমপথিকের পথ চলা । যেমন বাইরের ঘরে টাঙানো অমরনাথ যাত্রাপথের পথিকের ঐ ফটোখানা । শীতবস্ত্রে আচ্ছাদিত তীর্থযাত্রীদের দেখে বাতাসীরও শরীর বেয়ে শীত বইতে থাকে ।

এসব সাত পাঁচ ভাবতে থাকে বাতাসী । বাতাসী ঘুরতে থাকে ঘরময় । এ দেয়াল থেকে সে দেয়াল । বেরুতে চায় । ধাক্কা । ছোট বড় ঠোক্কর । বাতায়নের ভায়েরা সব ঘুমন্ত । জাগাতে ইচ্ছে করে না তাদের । বাতাসীর বাতায়নকে ছাড়া আর কাউকেই ভালো লাগে না ।

বাতায়নই বাতাসীর কাছে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম । বাতাসীর দোলা খেয়ে নেচে ওঠে ফেং শ্যুইয়ের ডলফিন-দোলক । সিলিংফ্যানের দিকে চোখ পড়ে যেতেই হেসে ওঠে বাতাসী । প্রভুভক্ত ভৃত্যের মতো চোখ মেলে চেয়ে আছে ওরা । বোতলবন্দী দৈত্য যেন । শুধু হুকুমের অপেক্ষা । নিজের না আছে ঘুরবার ক্ষমতা না হাওয়া তৈরি করার । মালিক যখন সুইচে হাত রেখে হুকুম হাঁকাবে তখনি তারা চলবে আর ঘরের বাতাস কেটে কেটে ফালা ফালা করে মালিকের ও তার পরিবারের লোকজনের গায়ের ওপর ছড়াতে থাকবে । যেন খই ছড়াচ্ছে কোনো পুরোহিত । ঘরের বাতাস গরম হলে গরম । বাইরে থেকে হাওয়া না আসা অবদি সে গরম ।

বাতাসী একবার ভাবল যাবার আগে ঝুঁটিটা ধরে নাড়িয়ে দিয়ে যায় বুড়ো সিলিং ফ্যানটাকে । কিন্তু ভাবল সে মেয়েমানুষ। তার অত সাধে কাজ নেই অন্যের গায়ে খোঁচা দেওয়ার । থাক না যেমন আছে ফাঁসির আসামীর মতো লটকে ।

এমন সময় একটা শব্দ । ঠুর ঠুর ঠুর...ঠুকুর ঠুকুর ।
বাতাসী শুনছ ?
কে ? কে ডাকে ?
আমি বাতায়ন । কে যেন তোমাকে খুঁজছে !
আমাকে এই অসময় ! আমার তো এখন ঘুরবার সময় । আমার ডিউটি শেষ সেই মাঝসন্ধেয় ।

বাতায়নের কাঁধ ঘেঁষে উঁকি দিতেই বাতাসীকে এক লহমায় তুলে নিয়ে গেল আগন্তুক । একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল বাতায়ন । বাতাসীকে সে ভালোবাসে । বাতাসীর পেলবতা তার পছন্দের । কিন্তু ঐ যে আগন্তুক তাকে একদম পছন্দ করে না বাতায়ন । সে দস্যু । সে ধ্বংস করে । তছনছ করে । বাতাসীকে তুলে নিয়ে গিয়ে তার শরীরের সঙ্গে বাতাসীকে মিলিয়ে দেবে । বাতায়নের ভাবতে গিয়ে খুব কষ্ট হয় । সে ভয়ে ভয়ে আবার বুকের খিল তুলে দেয় । বাইরে তখন ঐ নবীন আগন্তুক , প্রভঞ্জন বলে যাকে সবাই ডাকে , খুব ধাক্কা দিতে থাকে । বাতায়নকে সে ভেঙে ফেলতে চায়...মেরে ফেলতে চায়...বাতাসী বা বাতায়ন কাউকেই সে পছন্দ করে না ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন