শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

অনুবাদ গল্প : বিপ্লব বিশ্বাস। পারক গল্পপত্র


বেশ কিছুকাল এই গাছে চড়ে বসেছি। খুব ক্লান্ত। নিচে নামতে চাই। কিন্তু কী করি, বদখদ নেকড়েটা নিচেই খাড়িয়ে ; গাঁড়া চোখে আমার দিকে তাকিয়ে। আমার নামার অপেক্ষায়। আর একবার বাগে পেলেই টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে খাবে।
এই যে গাছটি আমাকে আশ্রয় দিয়েছে সে অদ্ভুত। একে জাদুগাছও বলা যায়। এখানে আমার যে কোনও ইচ্ছে তুরন্ত পূরণ হয়। যদি নরম গরম বিছানা পেতে চাই, পরক্ষণেই তা পাশে হাজির হয়। খুব একঘেয়ে লাগলে সামনে দেখি একটি জাঁকালো টিভি সেট, তাতে স্টিরিয়ো স্পিকার আঁটা আর বিশ্বজুড়ে নানান চ্যানেল। যখন যে খাবার খেতে মন চেয়েছে, নিমেষে হাজির। এখানে আমি সব পাই - যাবতীয় আরাম - আয়েস। কিন্তু যেটা নেই আর যার জন্য আকুলিবিকুলি করি তা হল স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা উপযুক্ত মূল্য চায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এর দাবি হল, আমি নিচে নেমে নেকড়েটাকে মেরে ফেলি। কিন্তু আমার সে সাহস নেই। ওকে ভয় পাই কেননা ও আমার চাইতে শক্তিশালী।

কখনও যদি সেই সময়টার কথা মনে পড়ে যখন নেকড়েটা আমাকে তাড়া করেছিল, সারা শরীরে ঠান্ডা ঘাম ফুটে ওঠে। তখন দেহজুড়ে ছুটে মরে এক অদ্ভুত অনুভূতি আর আমার হৃদয় নিস্তেজ হতে থাকে। আশ্রয় পাওয়া এই গাছটি তখন খুঁজে পাওয়ায় ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিই। নচেৎ এই শয়তান নেকড়ে কবেই আমাকে মেরে ফেলত। বিষণ্ণ হতাশার চাদরে মুড়ে থাকতে থাকতে আমি প্রায়ই সেই ভাবনায় সান্ত্বনা পাই যে গাছটি বেশ লম্বা আর আমি এখানে পুরো নিরাপদ ; নেকড়ে আমার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।

           দিনের বেলা বেশ গুছিয়েটুছিয়ে থাকি, এটা করি, সেটা করি। কিন্তু রাত এলেই শুরু হয় যন্ত্রণা। যদি ঘুমিয়ে পড়ি দুঃস্বপ্ন জ্বালাতন করতে থাকে, আমি যেন নরকের পথে চলি। সর্বাঙ্গে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয় যেন কেউ বেতিয়ে লাল করে দিয়েছে। তখন পুরো বিধ্বস্ত লাগে।

              প্রায়ই অবাক হয়ে ভাবি, আর কতকাল এই যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে! কতকাল আর অপেক্ষা করতে হবে নেকড়েটার অনাহার - মৃত্যুর জন্য। শুকিয়ে মরা দূরের কথা, আগের চাইতে ওকে বরং বেশ চাঙ্গাই দেখায়।

                                    এভাবেই এক সকালে চোখ খুলে মনে হল, কেউ যেন পাতাগোছার আড়ালে লুকিয়ে। ভয়ে তো চেঁচিয়ে উঠলাম। ভাবলাম নেকড়ে বেটা হয়তো ঘটনাচক্রে তার উদ্দেশ্য সফল করে ফেলেছে। যাই হোক, পরে আমি দেখে অবাক, ও আমারই মতো একটি মানুষ, চিন্তিত আর ভয়ার্ত। লোকটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য এক নেকড়ের থাবা থেকে বাঁচতে এই গাছে উঠে পড়েছে আর নেকড়েটা গজর গজর করে গাছের ছাল ছিঁড়ছে। যাহোক, অনেক চেষ্টা করেও সে গাছে উঠতে পারল না।

               এভাবে নেকড়েদুটো আমাদের দুজনের পেছনে পড়ায় আমরা ঘাবড়ে গেলাম। এখানে সব রকমের আরাম - আয়েস থাকতেও আমরা সুখী নই। প্রতিটা দিন যাচ্ছে আর বিরক্তি ও পীড়ার দুঃসহ অনুভূতি আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। আমরা রাতে ঘুমোতে পারি না। যেই না চোখদুটি বুজে আসে নেকড়ের ভয়ংকর চেহারা তাড়া করতে থাকে। এমন কি আমাদের স্বপ্নের মধ্যেও ঢুকে যায়, যে কারণে সে জগতেও আমাদের শান্তি নেই।
সাধারণত নেকড়েদুটো তাদের জায়গায় শান্তভাবে বসে থাকে। মধ্যেমাঝে যখন পাগলামি চেপে বসে গাছটিকে তেড়েমেরে নেয়, ভয়ানক গোঙানির সঙ্গে দাঁত দিয়ে গাছের গুঁড়ি কাটতে থাকে আর থাবা দিয়ে আঁচড়াতে থাকে। হঠাৎ হঠাৎ ওদের এই পাগলামিতে আমাদের আরও বেশি ভয় ধরে যায়। এর মধ্যেও একটি বিষয় অদ্ভুত ঠেকে। আমার পেছনে লেগে থাকা নেকড়ে একমাত্র আমার উদ্দেশেই এ সব করে ; একইভাবে অন্য নেকড়েটা ওকে লক্ষ্য করেই হাঁপালঝাঁপাল করে। আমার সঙ্গীর নেকড়ে আমাকে নিয়ে ভাবে না আর আমার নেকড়ে ওকে নিয়ে। আরও অবাক করা বিষয় হল, নেকড়েদুটো কোনওভাবেই নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক রাখে না।

অনেক ভেবেচিন্তে আমরা দুটিতে একদিন ঠিক করলাম, যাই ঘটুক না কেন, নিচে নেমে শয়তানদুটোর মোকাবিলা করব। এই পীড়াদায়ক জীবন আর সহ্য হচ্ছে না। ঠিক করলাম, চোখ বুজে ঝাঁপ দেব। কথামতো আমার সঙ্গী ঝাঁপিয়ে পড়ল আর আমি, ভীতুর ডিম, যেখানে ছিলাম সেখানেই বসে রইলাম।

           মাটিতে পড়তে দেখে ওর নেকড়ে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমার নেকড়েও কান খাড়া করে অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু আমাকে না নামতে দেখে ও ক্ষেপে গিয়ে পুরো হিংস্রতার সঙ্গে গাছের গুঁড়িটাকে আক্রমণ করল। ওদিকে আমার সঙ্গীর নেকড়ে ওকে পেড়ে ফেলবার আগেই গাছের একটি  ছোটো  ডাল দিয়ে নেকড়েকে সপাটে বাড়ি মারল। ডালটি ও ভেঙে নিয়েই নেমেছিল। নেকড়ে বাছাধন মাটিতে পড়ে নিমেষের মধ্যে ছটফটিয়ে মরে গেল।

আমার সঙ্গী এখন মুক্ত। চরম সাহস জুটিয়ে সে এই স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এদিকে আমি তখনও জীবন - যন্ত্রণা ভোগ করে চলেছি আর নিজেকে অভিশাপ দিচ্ছি। আমার নেকড়ে এখন আরও বেপরোয়া, সব সময় গাছের গুঁড়িটাকে ছিঁড়েখুঁড়ে চলেছে। হয়তো ভাবছে, এটা চালিয়ে যেতে পারলে হয় আমি নিচে পড়ে যাব নয়তো গাছটাই ভেঙে পড়বে। আমি শক্ত করে গাছের ডাল চেপে বসে থাকলাম, কেননা ভয়ে আমার গোটা শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার। দিনরাত নেকড়েটাকে শাপ - শাপান্ত করছি কিন্তু ও দমবার পাত্র নয়।
আমার সঙ্গীটি আমাকে উৎসাহ দিয়ে হেঁকেই চলেছে : ' নেমে এস। নেকড়ে কিচ্ছুটি করতে পারবে না। আসলে ও খুব দুর্বল। ওকে সহজেই মেরে ফেলতে পারবে। '

কিন্তু ওর কথায় আস্থা রাখতে পারি না, উল্টে ভয়ে কাঁপতে থাকি। এরপর এমন কিছু ঘটনা ঘটতে শুরু করল যা নির্দিষ্টভাবে আমার মৃত্যুর দিকে ইশারা করে। হঠাৎই গাছটি কাঁপতে লাগল। নিচে তাকিয়ে দেখে নিতে চাইলাম, নেকড়েটা গাছটি নাড়াচ্ছে কি না ; কিন্তু ও তো ওর জায়গায় শুয়েই আছে। এরপর দেখে চমকে গেলাম যে গাছটি কুঁকড়ে ছোটো, আরও ছোটো হয়ে যাচ্ছে! ভয় পেয়ে গাছটির নড়াচড়া বন্ধ করতে আমি বড় ডালগুলিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে গেলাম, কিন্তু পারলাম না। আর একটা দৃশ্য আমাকে আরও ঘাবড়ে দিল। দেখলাম, নেকড়েটা আকারে বাড়ছে আর নিমেষে সে বিশাল ষাঁড়ের আকার নিল। আমি আর্তনাদ করে গাছটির নিচ -ওপর করতে লাগলাম। কিন্তু সুরাহা কিছু মিলল না। আসন্ন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম, চারপাশের সবকিছুকে বিদায় জানাতে লাগলাম। প্রতিটি পেরিয়ে যাওয়া মুহূর্তের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নেকড়ে আর আমি একে অপরের কাছাকাছি চলে আসছি।
মনটা অসাড় হয়ে পড়ছে। চোখদুটি বুজে গিয়েছে। ফাঁসিতে ঝুলতে যাওয়া অপরাধীর ঢঙে আমি মৃত্যুকে স্বাগত জানাচ্ছি ঠিক ফাঁসির দড়ি গলায় পরিয়ে দেওয়ার আগে। কখন ফাঁসুড়ে লিভারটা দাবিয়ে দেবে সেই অপেক্ষায় আছি। শুধু যে শব্দটি কানে বাজছে তা হল আমার সেই মুক্ত সঙ্গীটির হাঁক যাতে সে বেপরোয়াঢঙে গাছ থেকে নামার জন্য আমাকে উৎসাহ দিয়ে চলেছে। বলছে যে, আমি নাকি ওই  নেকড়ের চাইতে শক্তিশালী। ' নেকড়েটা কাল্পনিক ভয়ের প্রতীকমাত্র। এটা একটা বাতাসে ফোলা ব্যাগ যাকে একটি লাথ মেরে তোমার রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে পারো। '

              ঘটনাচক্রে আমি সাহস জুটিয়ে লাফ দিয়ে পড়লাম। নেকড়েও দেরি না করে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু সে আমাকে কবজা করার আগেই আমি একটি ছোট্ট নরম ডাল দিয়ে ওকে সাঁটিয়ে দিলাম ; আমিও ডালটি গাছ থেকে এক টানে ছিঁড়ে নেমেছিলাম। যে নেকড়ে বাড়তে বাড়তে ষাঁড়ের আকার নিয়েছিল সে আমার চোখের সামনে মাটিতে পড়ে মরে গেল।

           আমি এখন মুক্ত মানুষ। স্বাধীনতা শব্দটি কতই না সুন্দর! মুক্তির অনুভব কতই না আনন্দদায়ক! আমি খুশিতে কেঁদে ফেললাম, নাচতে লাগলাম। নাচতে নাচতে পাগলপারা হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর উৎসাহে ভাটা পড়লে সঙ্গীটিকে খুঁজতে লাগলাম যাতে তাকে ধন্যবাদ জানাতে পারি। তাকে দেখতে পেলাম না। চারদিকে খুঁজে অবাক হয়ে গেলাম। চারপাশে অসংখ্য গাছ। সব গাছেই চড়ে বসে আছে একজন করে মানুষ আর প্রতিটা গাছের নিচেই একটা করে নেকড়ে গর্জন করছে।

                                আমি গবগবিয়ে হাসতে থাকলাম। হাসতে হাসতে সেই সরল, নিষ্পাপ মানুষগুলির দিকে এগোলাম ; হ্যাঁ, সেই সব মানুষ যারা বিনা কারণে তাদের নেকড়েদের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে।

******************************************

লেখক - কথা > ফারুক সারোয়ার (২৫.৬.১৯৬২ -), পাকিস্তানের লেখক, অনুবাদক। ইংরেজি, উর্দু, পশতু ভাষায় লেখেন। বাড়ি, কোয়েটায়। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। আইনের ডিগ্রিধারী এই লেখক পেশায় আইনজীবী। বারো - অধিক বইয়ের স্রষ্টা। অ্যাকাডেমি অফ লেটার্স, পাকিস্তান, পাক টেলিভিশন, তথা বালুচিস্তান সরকারের দেওয়া পুরস্কারে বারকয়েক ভূষিত ফারুক। ইংরেজি অনুবাদে ' The Wolf ' নামের বর্তমান গল্পটি তার বিখ্যাত গল্পগুলির অন্যতম। #############################                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                               
                                                                                                     

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন