শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

মেহেবুব আলম। পারক গল্পপত্র


বাংলা ভাষায় যে কজন লেখক তাঁর প্রথম লেখাতেই সাহিত্যে স্থায়ী আসন গড়তে সফল হয়েছেন আবু ইসহাক সেই গুটিকয় লেখকের মধ্যে একজন। তিনি খুবই স্বল্প সংখ্যক সাহিত্য নিয়েই মূলত নিজ প্রতিভাগুণে বাংলাদেশের তথা বাংলা কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে নিজের চিরস্থায়ী স্থান  করে নিয়েছেন। তিনি তাঁর দীর্ঘ জীবনে মাত্র তিনটি উপন্যাস লিখেছেন- ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ (১৯৫৫), ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ (১৯৮৬), ‘জাল’ (১৯৮৮)। আর লিখেছেন দুটি গল্পগ্রন্থ- ‘হারেম’ (১৯৬২) ও ‘মহাপতঙ্গ’ (১৯৬৩)। আরও একটি গ্রন্থ রয়েছে যা তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। সাহিত্যিক আবু ইসহাক জন্মেছেন ১৯২৬ সালের ১ লা নভেম্বর। করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৬০ সালে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। মাত্র কুড়ি বছর বয়সেই তিনি যা রচনা করেছেন, তা এককথায় বাংলা সাহিত্যের অমূল্য অক্ষয় সম্পদ।
আবু ইসহাকের প্রথম উপন্যাস হল ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ যা তিনি মাত্র কুড়ি বছর বয়সেই রচনা করেছেন। এই উপন্যাসটি ১৯৫০-৫১ সালে ‘নওবাহার’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। আর ১৯৫৫ সালে গ্রন্থাকারে উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি তিনি তাঁর পিতার স্মৃতির উদ্দেশে উৎসর্গ করেছেন। উনিশটি পরিচ্ছেদে পরিসমাপ্ত মাত্র একশো চব্বিশ পাতার এই নাতিদীর্ঘ উপন্যাসটিকে নিয়ে পরবর্তীকালে অর্থাৎ ১৯৭৯ সালে বাংলা চলচ্চিত্র ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ নির্মিত হয়েছে। এই চলচ্চিত্রটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন মসিহউদ্দিন শাক ও শেখ নিয়ামত আলী। উপন্যাসের মতোই চলচ্চিত্রটি সকলের কাছে ব্যাপক আকারে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। যার ফলস্বরূপ এই চলচ্চিত্রটি একই সঙ্গে বিভিন্ন বিভাগে ন’টি জাতীয় (বাংলাদেশ) পুরস্কার এবং ছ’টি আন্তর্জাতির পুরস্কার লাভ করতে সক্ষম হয়েছে।
আবু ইসহাকের এই একটি উপন্যাস একই সঙ্গে পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলার সমস্ত পাঠকের হৃদয় জয় করে নিয়েছে। উপন্যাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায় ছড়িয়ে রয়েছে এক অপার বিস্ময়। উপন্যাসটি পাঠক একবার পাঠ করতে আরম্ভ করলে উপন্যাস সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত পাঠকের পক্ষে ক্ষান্ত হওয়া একেবারেই অসম্ভব। এর কাহিনিক্রম পাঠককে নিজের মধ্যে আকর্ষিত করে রাখে এবং ক্রমশ পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে চলে। উপন্যাসটির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে দুই বাংলারই সাহিত্যিকগণ এই উপন্যাস সম্পর্কে তাঁদের নিজ নিজ বক্তব্য উপস্থাপন করেছন। ওপার বাংলার বিশিষ্ট সমালোচক মুহাম্মদ আবদুল হাই বলেছেন—
“...পূর্ব বাংলার গ্রাম্য মুসলমানদের জীবনের বিবিধ সংগ্রাম এমন বাস্তব দৃষ্টিতে এর আগে আমাদের সাহিত্যে কোন কালে রচিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই।” ১
এপার বাংলা থেকে বিশিষ্ট নাট্যকার মনোজ বসু জানিয়েছেন—
“...মাটির গন্ধ পাই যেন কাহিনীর মধ্যে। আমার জন্মভূমি, আশৈশব পরিচিত পূর্ব বাংলার ছায়াচ্ছন্ন এক মনোরম ছবি। চোখ দিয়ে পড়া নয়, দুর্ভিক্ষ-পীড়িতের মত আমি সবচিত্তে গ্রাস করেছি।” ২
‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ উপন্যাসটি যেন জয়গুনের একপ্রকার জিহাদ। ‘জিহাদ’ বা ‘জেহাদ’ শব্দটির অর্থ হল‘ধর্মীয় বা অন্য কোনো সৎ উদ্দেশ্যে যুদ্ধ প্রতিবাদ বা বিদ্রোহ’ ৩। সে জিহাদ ধর্মীয় অনুশাসনের বিরুদ্ধে, আবার একই সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং শোষকদের বিরুদ্ধেও। এই উপন্যাসে যে সমস্ত বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে তা হল- সদ্য সমাপ্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব, ছেচল্লিশের দাঙ্গা, সাতচল্লিশের দেশভাগ, নবগঠিত পাকিস্তান নিয়ে বাংলার মানুষের আশাভঙ্গ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, গ্রামীণ সমাজের কুসংস্কার, সাধারণ মানুষের ওপর গ্রামের মোড়লের চক্রান্ত ও ব্যাভিচার, ধর্মান্ধতা ইত্যাদি। সর্বোপরি বলা যায় এই সমস্ত কিছুর জাঁতাকলে পড়ে এক অসহায়, হতদরিদ্র নারীর উত্তোরণ বা প্রথাভাঙার ও যীবনযুদ্ধের এক অনন্য দলিল হয়ে উঠেছে এই উপন্যাস।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হল জয়গুন। আকালের সময় স্বামী কতৃক পরিত্যক্তা হয়ে দু’মুঠো অন্নের জন্য দুই সন্তান, ভাইজি ও শফী সহ শহর থেকে হতাশ হয়ে পুনরায় নিজগ্রামে ফিরে আসে। অন্যকোনো উপায় না থাকার ফলে তারা থাকতে বাধ্য হয়েছে অপয়া ভিটেতে অর্থাৎ সূর্য দীঘল বাড়িতে। যে ভিঠে সম্পর্কে গ্রামে ভূতুরে কিছু কথা প্রচলিত আছে যে যারাই এই সূর্য দীঘল বাড়িতে থাকে তাদের বংশ ধ্বংস হয়। জয়গুনকে এই ভয় থেকে উদ্ধার করেছে নামকরা ফকির জোবেদ আলী বাড়ির চারদিকে চারটি তাবিজ পুঁতে দিয়ে। ভয়কে জয় করার পর জয়গুনের অন্যতম প্রধান চিন্তা হয়ে ওঠে উদরের ক্ষুধাকে জয় করার। তাই সে তার গ্রামেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঘড় লেপে, ধান ভানে, চিঁড়া কোটে। আর জয়গুনের সন্তান হাসু স্টেশনে কুলির কাজ করে যে দশ থেকে বারো আনা উপার্জন করে তা দিয়ে জয়গুন, হাসু ও মায়মুনের পেট চলে। তাই অভাব তাদের নিত্য দিনের সঙ্গী। কোনো কোনো দিন তাদের অনাহারেও থাকতে হয়। অভাবের সঙ্গে জুঝতে থাকা জয়গুন শত কষ্টেও কখনোই অসৎ পন্থা অবলম্বন করেনি। এই উপন্যাসে জয়গুনই পূর্ব বাংলার সমস্ত খেটে খাওয়া সংগ্রামী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছে।


মানুষের এক জৈবিক চাহিদা হল ক্ষুধা। যা মানুষের প্রাচীনকাল থেকেই নিত্য সঙ্গী। এই ক্ষুধা নিবৃত্তির অভাবেই তৈরি হয় অনাহার। আর এই অনাহার যখন দীর্ঘস্থায়ী গণরূপ নেয়, তখনই সৃষ্টি হয় দুর্ভিক্ষ। প্রকৃতি কখনোই মানব জাতিকে তার অকৃপণ দান থেকে বঞ্চিত করেনি। জনসংখ্যার অত্যাধিক বৃদ্ধি ঘটেছে এ যেমন সত্য, তেমনি মানুষ তার প্রয়োজনের অধিক শস্য উৎপাদন করে এও তেমনি সত্য। এবার প্রশ্ন হল তাহলে খাদ্য সংকট কেন ? শুধু কি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ? না। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি এক শ্রেনী মানুষের (শাসক, জমিদার, মধ্যস্বত্ত্বভোগী এবং অসাধু ব্যবসায়ী) মাত্রাতিরিক্ত লোভের কারণেই বাঙালির জীবনে নেমে আসে দুর্ভিক্ষের অভিশাপ। ওয়েলফেয়ার ইকোনোমিক্স যার প্রবক্তা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেন, তাতে তিনি দেখিয়েছেন যে ভারতীয় উপমহাদেশে যত দুর্ভিক্ষ ঘটেছে সেসবের পিছনে উতপাদনের স্বপ্লতা মুখ্য কারণ ছিল না। বরং যথেষ্ট খাদ্যশস্য মজুত থাকা সত্ত্বেও মজুতদারি, কালোবাজারি ইত্যাদির কারণেই একটা বিরাট সংখ্যায় নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিল।
উপন্যাসটি শুরুই হচ্ছে দুর্ভিক্ষের আভাস দিয়ে। আমরা উপন্যাসের শুরুতেই দেখতে পাই দুর্ভিক্ষের দিনে জয়গুন তার দুই সন্তান, শফী ও শফীর মা সহ গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যায় লঙ্গরখানায় দু’মুঠো অন্নের আশায়। কিন্তু সেখানে তারা দেখে মজুতদারের গুদামে চালের প্রাচুর্য। একটু ফ্যানের জন্য বড়লোকের বন্ধ দরজায় মাথা ঠুকে ঠুকে নেতিয়ে পড়ে তারা। রাস্তার কুকুরের সঙ্গে খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে গিয়ে ক্ষত-বিক্ষত হয়। হোটেলে খাবারের সমারোহ দেখে তাদের জিভ শুকিয়ে ওঠে। ধনুকের মতো বেঁকে যায় তাঁদের দেহ, পেট গিয়ে ঠেকে পিঠে। চোখের জল মুছে তারা আবার নিজ গ্রামে ফিরে আসার সংকল্প নেয়। এই মন্বন্তর সম্পর্কে কথাকার উপন্যাসের শুরুতেই বলেছেন—
“পঞ্চাশের মন্বন্তরে হুচোট-খাওয়া দেশ আবার টলতে টলতে দাঁড়ায় লাঠি ভর দিয়ে।” ৪
এছাড়াও ঔপন্যাসিক দুর্ভিক্ষের দিনে সরকারের সামান্য সাহায্যটুকুও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে না দিয়ে তার পুরোটাই গ্রামের মোড়ল-প্রধানদের লুটেপুটে খাওয়ার প্রসঙ্গকে নিখুঁতভাবে পাঠকের সন্মুখে উপস্থাপন করেছেন তাঁর এই উপন্যাসে । দরিদ্র মানুষের অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির মানুষ শুধু তাদের শোষণ কার্য কায়েম রেখেছে। উপন্যাসের  মোড়ল খলিল বক্স, গদু প্রধান, ফুড সেক্রেটারি খুরশীদ মোল্লা মিলে সাধারণ মানুষের ওপর এহেন শোষণ চালিয়েছে। গ্রামের মানুষের জন্য চিনি এলে ফুড সেক্রেটারি খুরশীদ মোল্লা সে চিনি গ্রামের মোড়ল খলিল বক্স ও গদু প্রধান উভয়ের জন্য চার সের, জমিদারের জন্য পাঁচ সের, এছাড়াও ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বারদের দিয়ে যা অবশিষ্ট থাকে তাই গ্রামের লোকেদের নেবার কথা জানায়—
“আমি কী করতে পারি, বলো তোমরা। গভরমেন্ট মোটে সাপ্লাই দেয় না…আবার যখন চিনি আসবে, তার সঙ্গে মিলিয়ে ভাগ করে দেওয়া যাবে।” ৫
দুর্ভিক্ষ বা আকাল যেমন এই উপন্যাসে প্রাধান্য বিস্তার করেছে, তেমনি প্রাধান্য পেয়েছে দুর্ভিক্ষের সঙ্গে জয়গুনের লড়াইও। উভয়ের মধ্যে আকালের দিনে জয়গুনের টিকে থাকার এই লড়াই-ই শেষ পর্যন্ত উপন্যাসে সেরার শিরোপা পাবার যোগ্য।
 সংস্কৃত ‘ধৃ’ ধাতু থেকে বাংলা ‘ধর্ম’ শব্দটি এসেছে। যাকে ইংরেজিতে বলা হয়ে থাকে রিলিজিয়ন (Religion)। আবার ইসলামীয় কালচারে ‘ধর্ম’ বলতে ‘দ্বীন’কে বোঝানো হয়ে থাকে। এক কথায় ‘ধর্ম’ বলতে আমরা বুঝি যা সমাজকে ধারণ করে রাখে। এই ধর্ম মানুষকে দেবতায় উন্নীত করে। যে কোনো ধর্মই হোক না কেন তার অনুশাসনগুলি মূলত মানুষকে সর্বদা সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্যেই তৈরি করা হয়েছে। তাই নিঃসন্দেহেই বলা যায় মানুষকে বাদ দিয়ে সেসবের কোনো অস্তিত্বই নেই।
ধর্মের মূলত দুটো দিক। একটি হল আধ্যাত্মিক অথবা আভ্যন্তরীণ দিক, আর অপরটি হল সামাজিক বা বাহ্যিক দিক। ধর্মের আধ্যাত্মিক দিক হল অপরিবর্তনশীল বা বলা যায় ধ্রুব সত্য। কিন্তু বাহ্যিক দিকটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনশীল। ধর্মের এই বাহ্যিক আড়ম্বর যখনই প্রবল হয়ে উঠে মানুষের উপর চেপে বসার চেষ্টা করে, তখনই যাবতীয় সমস্যার সৃষ্টি হয়।
উপন্যাসে কথাকার পূর্ববঙ্গে ইসলাম ধর্মের কিছু অন্ধবিশ্বাসকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। দেখিয়েছেন কীভাবে গ্রামের সহজসরল মানুষেরা মোল্লা-মাতব্বরের চক্রান্তকে অতি সহজেই গ্রহণ করে। কোনো যুক্তি দিয়ে বিচার না করেই তা ঐশ্বরিক নির্দেশ হিসেবে মেনে নিয়ে যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট মাথা পেতে নেয়।
মুন্সি জব্বর জয়গুনের প্রথম স্বামী। তার কাছেই জয়গুন জানতে পেরেছিল ইসলাম ধর্মের সমস্ত অনুশাসন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ না পড়ার শাস্তি, বেপর্দা নারীর শাস্তি ইত্যাদি। একদিকে বেহেস্ত ও দোজখের চিন্তা এবং অপরদিকে নিজের ও কচি দুটো ছেলেমেয়ের উদরের চিন্তা জয়গুনের মনে প্রবল দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত ধর্মের অনুশাসনকে পরাজিত করে জয়গুনের কাছে উদরের চিন্তাই প্রবল হয়ে ওঠে। তাই জয়গুন শেষ পর্যন্ত গেদির মা ও লালুর মায়ের সঙ্গে ট্রেনে ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে রওনা হয় চালের ব্যবসা করে দু’পয়সা রোজগারের জন্য। স্বামীহীনা জয়গুনের উপয়ার্জনের জন্য এভাবে গ্রামের বাইরে যাওয়াকে গ্রামের মানুষ সহজভাবে নিতে পারে নি। তাই গ্রামের সকলের কাছেই জয়গুনের এখন  ‘বেপর্দা অওরাত’ বা মূল্যহীনা নারীতে পরিণত হয়েছে। একারণেই জয়গুনের পাঠানো হাঁসের ডিম ইমাম সাহেব ফিরিয়ে দেন কেননা তা বেপর্দা অওরাতের সামগ্রী।
ধর্ম কিংবা সমাজ কেউই জয়গুনের ভাত কাপড়ের সংস্থান করে দেয় না। বরং ফকির, গদু প্রধান সকলেই ধর্মের দোহাই দিয়ে জয়গুনের অসহায়তার সুযোগ নিতে তৎপর। কিন্তু সে ঠিক জানে যে গ্রামের লোকের কথা মেনে চললে তাকে না খেয়ে শুকিয়ে মরতে হবে। তাই কারোর প্রতি তার আর বিশ্বাস নেই। বিশেষ করে কোনো পুরুষের ওপর। যেখানে অভাবের দিনে জয়গুনের নিজ স্বামী তার ভরনপোষণের দায়িত্ব এড়াতে তাকে ছেড়ে দিয়েছে। সেখানে অন্যের ওপর তার কোনভাবেই নতুন করে বিশ্বাস জন্মানোর কথা নয়। জয়গুন তার দ্বিতীয় স্বামীর এহেন আচরণে যেন সমস্ত পুরুষজাতিকেই সে চিনে নিয়েছে। তাই তার বক্তব্যে ফুটে ওঠে তীব্র প্রতিবাদ—
“খাইট্যা খাইমু। কেওরডা চুরি কইর‍্যাও খাই না, খ’রাত কইর‍্যাও খাই না। কউক না, যার মনে যা--” ৬
উপন্যাসের চোদ্দ নম্বর পরিচ্ছেদে মায়মুনের বিবাহকে কেন্দ্র করে গ্রামের মৌলবি সাহেব ও গদু প্রধান মিলিতভাবে পাত্রের বাবা সোলেমানের সঙ্গে পরামর্শ করে যে, জয়গুনকে ‘তওবা’ করাতে হবে। অর্থাৎ জয়গুনকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। জয়গুনের অপরাধ শুধু এই যে সে অভাবের তাড়নায় উপার্জনের জন্য গ্রামের বাইরে গিয়েছে। এ পুরোপুরিভাবে জয়গুনকে ঘরে বন্দি করার এক ফন্দি ছাড়া আর কিছু নয়।
আমরা জানি ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পুরুষতন্ত্রের সঙ্গে কতৃত্ববাদ মিশেগিয়ে উপন্যাসে নারীকে গৃহবন্দি করার এক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। আর এই প্রবণতা চরিতার্থ করতে ধর্মকে তোপ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। মার্কসবাদেও বলা হয়েছে ধর্ম এক আফিং নেশা, যা ব্যবহার করে একটি শ্রেণী অপর শ্রেণীকে শোষণ বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। এখানে স্পষ্টতই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ অসহায় একটি নারীকে নিয়ন্ত্রিত বা বশীভূত করার জন্য ব্যবহার করেছে ধর্মকে। ধর্মের ভয় দেখিয়ে তার স্বাবলম্বীর পথ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে যাতে সে বাইরে গিয়ে নিজের কায়িক শ্রমে অর্থ উপার্জন করতে না পারে। 
জয়গুন ও হাসুর মিলিত উপার্জনে কষ্টেশিষ্টে তাদের দিন অতিবাহিত হয়ে যায়। কারোর কাছে হাত পেতে কিছু চাইতে হয় না জয়গুনকে। ঠিক এখানেই সমস্যা গদু প্রধানের। তার অনেক অর্থ-সম্পত্তি। ধন-সম্পত্তির বিনিময়ে সে জয়গুনকে পেতে চায়। যেহেতু জয়গুন তার বিয়ের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। তাই গদু প্রধান এখন জয়গুনকে বাইরের সমস্ত রকম কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এনে ঘরের মধ্যে এনে বন্দি করতে চায়। যাতে জয়গুন অভাবের তাড়নায় এবং উদরের জ্বালায় নিরুপায় হয়ে গদু প্রধানের কাছে ধরা দেয়। আর তার এই কর্মে সে ধর্মের আশ্রয় নিয়েছে। যাকে যথেষ্টভাবে ধর্মের বিধান দিয়ে সাহায্য করেছেন মৌলবি সাহেব। মৌলবি সাহেব জানান বেপর্দা নারীর শাস্তির কথা—
“পর্দা না মানলে চল্লিশ বছরের এবাদতও কবুল হয়না খোদার দরগায়। সব বরবাদ অইয়া যায়। বেপর্দা স্ত্রীলোক আর রাস্তার কুত্তি সমান।” ৭
আমরা উপন্যাসে দেখতে পাই যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে গৃহবন্দী করার জন্য যাবতীয় প্রচেষ্টা চালিয়েছে। অথচ মার্কসবাদ বলে, উৎপাদনে কার্যে শ্রমিক শ্রেনীর মধ্যে নারী ও পুরুষের  কোনো পার্থক্যই নেই। তবু সমাজে নারী উৎপাদক হিসাবে অনেকটাই পিছিয়ে। যদিও সব দেশের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য নয়। কোনো কোনো দেশে উৎপাদনের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের চেয়েও অনেকটাই এগিয়ে। কিন্তু আমাদের দেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে নারীকে বিভিন্ন অন্ধবিশ্বাস, কু-সংস্কার ইত্যাদির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ বা শোষণ করছে পুরুষ। উপন্যাসেও আমরা দেখতে পাই পণ্যায়িত জয়গুনকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পুরুষ সমাজ তার কায়েমী স্বার্থ চরিতার্থ করার চেষ্টা করেছে। নয়তো উৎপাদনে নারী ও পুরুষের কোনো ভিন্নতা নেই। তার প্রমাণ আমরা পাই— 
“The less the skill and exertion of strength implied in manual labor, in other words, the more modern industry becomes developed, the more is the labor of men superseded by that of women. Differences of age and sex have no longer any distinctive social validity for the working class. All are instruments of labor, more or less expensive to use, according to their age and sex.” ৮
প্রতিবাদী জয়গুন এহেন পরিস্থিতিতেও কোন মতেই তওবা করতে রাজি নয়। সে কোনো অপরাধ করেনি, তাহলে প্রাশ্চিত্ত কীসের ? সে ভালো করেই জানে কেউই বিনা স্বার্থে তার ভাত-কাপড় দ্বায়িত্ব নেবে না। তাই এই মুহূর্তে তওবা করা অর্থাৎ মৃত্যুকে স্বেচ্ছায় ডেকে আনা। একারণে জয়গুন উপস্থিত সকল পুরুষের প্রতি প্রশ্ন তোলে—
“তোমরা ইনসাফ কইর‍্যা কও, তো’বা করলে কে আমারে ঘরে আইনে খাওয়াইব ? ...এতগুলো পেট কেমুন কইর‍্যা চালাই, তোমরাই কও।” ৯
জয়গুনের এই প্রশ্নের উত্তর ছিলো না কারো কাছেই। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যে কোনো প্রকারেই হোক না কেন সে নারীর ওপর তার প্রভাব খাটাতে বদ্ধপরিকর। কেননা একে তো নারীর নিজস্ব কোনো অস্তিত্বই নেই, উপরন্তু স্বামীহীনা নারী। আমাদের ধারণা সমাজের যাবতীয় অকল্যাণ নারীর দ্বারাই সম্ভব। তাই এই নারীকে পুরুষেরই নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। নারী কে ? এর উত্তরে মল্লিকা সেনগুপ্ত তাঁর‘স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণ’ গ্রন্ত্রে জানিয়েছেন—
“ধর্ম বলে : নারী থেকেই পাপের জন্ম, ধর্মাচরণে সে, পুরুষের সহকারিণী মাত্র।
আইন বলে : মা তার সন্তানের অভিভাবক নয়, ধাত্রী মাত্র। সন্তান পিতার।
শিল্প বলে : নারী সুন্দরী, যৌন উত্তেজনা সঞ্চারিণী, প্রেরণাদাত্রী। শিল্পসৃষ্টি তার কাজ নয়।
বিজ্ঞাপন বলে : নারী মা, নারী গৃহিণী, নারী এক অতিসুন্দরী অলীক মানবী।
সাহিত্য বলে : নারী প্রেরণা, নারী উর্বশী অর্থাৎ যৌনতার প্রতীক, নারী গৃহলক্ষ্মী। যে নারী সাহিত্য সৃষ্টি করে সে পুরুষের জগতে অনুপ্রবেশকারী ‘মহিলা কবি’।
দর্শন বলে : মাতৃত্ব আর স্বামীসেবাই নারীর আসল দায়িত্ব যা তাকে মহীয়সী করে।
সমাজ বলে : নারী শ্রীমতী অমুক-পুরুষ বা মিসেস তমুক-পুরুষ, তার নিজস্ব কোন পরিচিতি নেই। নারী অনাম্নী, অনুগত, অন্তঃপুরচারিণী।
অর্থনীতি বলে : সাবধান, এখানে নয়, কাজের জগতটা পুরুষের। পুরুষ ভর্তা, নারীর ভরণপোষণের দায় তার। নারী নির্ভরশীল।” ১০
অবশেষে দেখা যায় জয়গুনের সামনে আর অন্যকোনো উপয়ায় না থাকায় শুধুমাত্র মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে বা মেয়ের সুখের জন্য সে তওবা করতে রাজি হয়। জয়গুনের এই হেরে যাওয়া অভাবের তাড়নায় নয়। অভাবের দিনেও সে কীভাবে লড়াই করেছে আমরা তা পূর্বেই জেনেছি। বরং তার এই পরাজয় মূলত কন্যার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেই। সন্তানের সুখের জন্য নিজের শতকষ্টকেও নতশিরে গ্রহণ করে নেবার মধ্যে দিয়ে তার মাতৃত্বের পূর্ণ পরিচয় ফুটে ওঠে। তাই এই উপন্যাস যেন বাংলাদেশের সমস্ত লড়াকু মায়েদের গল্প হয়ে উঠেছে। শুধু জয়গুনই নয়, এমন মায়ের পরিচয় বাংলা উপন্যাসে আমরা আরো খুঁজে পাই যার সঙ্গে ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ উপন্যাসের নায়িকা জয়গুনের চরিত্রের অনেক মিল পাওয়া যায়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের সর্বজয়া, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জননী’ উপন্যাসের শ্যামা এবং শওকত ওসমানের ‘জননী’ উপন্যাসের দরিয়া বিবি প্রভৃতি চরিত্রগুলিও সমানভাবে উজ্জ্বল। এঁরা প্রত্যেকেই সন্তানের সুখের জন্য সারাজীবন ভয়াবহ দারিদ্র, প্রতিকূল সমাজ এবং ধর্মীয় সংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। সেকারণেই জয়গুন শুধু সাহিত্যের পৃষ্ঠাতেই নয়, সে যেন হয়ে উঠেছে চলমান জীবনের বহমানতার প্রতীক।
গ্রামের হতদরিদ্র অশিক্ষিতা স্বামী পরিত্যক্তা জয়গুনের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আমরা খুঁজে পাই উপন্যাসের ষোলো নং পরিচ্ছেদে। কাসু প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হলে তার বাবা করিম বক্স ছেলের চিকিৎসার জন্য ফকির দিদার বক্সের শরণাপন্ন হয়। শুধু করিম বক্সই নয়, গ্রামের বেশিরভাগ মানুষেরই ডাক্তারের চেয়ে ফকির-কবরেজদের ওপরও বেশি ভরসা। তাই তাদের কাছে ঔষধের চেয়েও বেশি কদর মন্ত্রফুক পানির। কিন্তু গ্রামের সকলের ভাবনার থেকে আলাদা জয়গুনের ভাবনা। সে কাসুর অসুস্থতার খবর শুনেই ছুটে এসেছে। মৃতপ্রায় সন্তানকে বাঁচানোর শেষ সুযোগ সে কোনভাবেই হারাতে চায় না। তাই সে হাসুকে দিয়ে রমেশ ডাক্তারকে ডেকে আনে। ডাক্তারের কথা মতো জয়গুন দিবারাত্র ছেলের শুশ্রূষা করে ছেলেকে সুস্থ করে তোলে। পুরনো অন্ধবিশ্বাসকে নস্যাৎ করে দিয়ে জয়গুনের আধুনিক শল্যচিকিৎসার ওপর আস্থা বা বিশ্বাসই তাকে তার সন্তানকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছে। তাই বলা যায় তার এই জিহাদ অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে। আর তার এই জয় সমস্ত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের জয়।

উপন্যাসের একেবারে শেষে দেখা যায় দুর্ভিক্ষের কড়াল গ্রাসে গোটা দেশ নেতিয়ে পড়েছে। গ্রামেও চালের দাম কুড়ি থেকে লাফিয়ে চল্লিশে গিয়ে ঠেকেছে। এই দুর্ভিক্ষ শুধু ভাতের নয়, কাপড়েরও। ঠিক তখনই মায়মুনকে তার শ্বশুর বাড়ি থেকে ফেরত পাঠিয়েছে। সে এখন তার মায়ের কাছেই থাকে। অন্যদিকে ডাক্তারের পরামর্শ মতো কাসুকে তার মায়ের কাছে রেখে গেছে করিম বক্স। জয়গুনও আজ ছ’মাস যাবত তওবার মর্যাদা রক্ষা করে ঘরে বন্দিজীবন অতিবাহিত করছে। হাসু চার জনের পেটের ভাত জোগাড় করতে পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ। তাই আকালের দিনে জয়গুনকে তিনদিন ধরে না খেয়ে থাকতে হয়। লালুর মায়ের ধানের কলে কাজ করার প্রস্তাবকে জয়গুন অসহায়ভাবে ফিরিয়ে দিয়েছে। কেননা তার মনে প্রবল দ্বিধা। দ্বিধা একারণে যে, ধর্মের আধ্যাত্মিক দিককে সে সঠিকভাবেই গ্রহণ পেরেছে। তাই ‘তওবা’ উপেক্ষা করে বাড়ির বাইরে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। অথচ ধর্মের নিদান দেওয়া ব্যক্তিদের এই পরিস্থিতিতে দেখা মেলা ভার। এই সমস্ত কায়েরদের বাস্তবের মুখোমুখি হবার সৎ সাহস নেই, আছে শুধু কাপুরুষের মতো নিজেকে ধর্মের পশ্চাতে আড়াল করার ক্ষমতা। তাই উদরের চিন্তা প্রবল হয়ে উঠলে লালুর মায়ের কথায় জয়গুনের মনে আবার প্রবল দ্বন্দ্ব শুরু হয়—
“না খাইয়া জানেরে কষ্ট দিলে খোদা ব্যাজার অয়। মরলে পরে খোদা জিগাইব, তোর আত-পাও দিছিলাম কীয়ের লেইগ্যা ? আত দিছিলাম খাটবার লেইগ্যা, পাও দিছিলাম বিদ্যাশে গিয়া ট্যাকা রুজি করনের লেইগ্যা।” ১১
ইসলাম কিংবা হিন্দু উভয় ধর্মেই আমরা পর্দাপ্রথা লক্ষ্য করি। পুরুষেরা যুগে যুগে এই পর্দার সাহায্যেই নারীকে সর্বদা সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার এক প্রচেষ্টা চালিয়েছে বা এখনও চালিয়ে যাচ্ছে। আসলে পুরুষেরা নারীকে খেয়ালখুশি মতো পরিচালনা করতে নারীকে নিজের মতো করে গড়ে তুলেছে। যেন নারীর বিধাতা হল শুধুমাত্র পুরুষ। সঙ্গত কারণেই‘নারী’ গ্রন্থের শ্রষ্টা হুমায়ুন আজাদ তাঁর গ্রন্থের ‘নারী, ও তার বিধাতা ; পুরুষ’ অংশে বলেছেন—
"কেউ নারী হয়ে জন্ম নেয় না, ক্রমশ নারী হয়ে ওঠে।” ১২
কিন্তু উনিশ শতক নারীর সমস্তরকম প্রাচীর ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসার সময়। ইউরোপের নবজাগরণের প্রভাব, আমাদের বাংলাদেশে বিভিন্ন মহাপুরুষদের প্রভাব, নারী শিক্ষার প্রসার, নারীবাদী আন্দোলনের প্রভাবে নারীরা বাইরে বেরিয়ে আসতে সফল হয়। বিশ শতকে নারীর এই প্রথা ভাঙার উদাহরণ আরো বেশি মাত্রায় আমাদের সামনে আসে। কিন্তু গ্রামেগঞ্জে যেখানে কুসংস্কারকে বেশি প্রাধান্য দেয় নিরক্ষর-সহজ-সরল মানুষেরা, সেখানে এখনও নারীরা যথার্থভাবে পর্দার বাইরে বেরোতে পারে নি অথবা তাদের বেরোতে দেওয়া হয়নি । আর সেখানেই মৌলবি সাহেব ও গদু প্রধানের মতো লোকেরা পর্দার সঙ্গে ধর্মকে জুড়ে দিয়ে নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করতে সদা প্রস্তুত। কিন্তু জয়গুনের মতো যুক্তি সম্পন্না নারী তাদের এমনতর চক্রান্তকে সফল হতে দেবে কেন ? তাই সে সংকল্প নিয়েছে, সে অবশ্যই ধান কলে কাজ করতে যাবে। হাত পা সক্ষম থাকতে সে কোনভাবেই না খেয়ে মরবে না। যার ক্ষুধার অন্ন নেই, তার আবার পর্দা কীসের ? সে উপলব্ধি করেছে, জীবন রক্ষা করাই ধর্মের প্রধান ও শ্রেষ্ঠ  মন্ত্র। তার উদরে যে আগুন জ্বলছে তা নেভাতে দোজখের আগুনে ঝাঁপ দিতেও সে রাজি। আমরা লক্ষ্য করি এভাবেই ধর্ম, ধর্মীয় অনুশাসন, অন্ধবিশ্বাসগুলি বারবার নিরক্ষর জয়গুনের যুক্তির কাছে পরাজিত হয়েছে। উদরের চিন্তাই জয়গুনকে সমস্তরকম ধর্মীয় অনুশাসনের জাল ছিঁড়ে বাইরে বেরতে সাহায্য করেছে।
তেরশ পঞ্চাশ সালের দুর্ভিক্ষে অসহায়ভাবে মানুষ জমিজমা, ঘটী-বাটি, ছেলে-বউ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল মহাজনের কাছে। শুধু তাই নয়, সুখ-শান্তি-বিবেক-মনুষ্যত্ব সবই যেন একসঙ্গে তাদের জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিলো ক্ষুধার তাড়নায়। এক টুকরো রুটির জন্য তারা সমস্তরকম অবৈধ  কাজ করতে প্রস্তুত। সুকান্ত ভট্টাচার্য“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী-গদ্যময়/পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্‌সানো রুটি।।”১৩
--এপ্রসঙ্গে যথার্থই বলেছেন। তবে উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জয়গুনের মধ্যে আমরা এক লড়াকু নারীর বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাই। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সহজেই হার মেনে নেবার মতো নারী সে নয়। শ্যাওলা ও কচুরিপানার মতো প্রতিকূল স্রোতেও সে ভেসে যায়নি, বরং মাছের মতো সাঁতার কেটে নিরন্তর এগিয়ে চলে তার জয়যাত্রা।

জয়গুনকে কেন্দ্র করেই রচিত হয়েছে উপন্যাসের কক্ষপথ। কোমলে-কঠোরে, মমতায়-প্রতিবাদে অসাধারণ এক প্রতিবাদী চরিত্র জয়গুন। কখনো সে মমতাময়ী মা, কখনো সে হিংস্র বাঘিনী। যা ন্যায় সঙ্গত নয় তাই অন্যায়—এমন ভাবনায় বিশ্বাসী জয়গুন অভাবে অনাহারে ক্লিষ্ট ও জর্জরিত হবার পরেও সে কখনোই তার নারীত্বকে বিকোয়নি। তা সে উপকারী ফকির জোবেদ আলী হোক, কিংবা জয়গুনকে জমি লিখে দেবার লোভ দেখিয়ে বিয়ে কয়ার প্রস্তাব পাঠানো গদু প্রধানই হোক, অথবা দ্বিতীয় স্বামী করিম বক্স নিজের ভুল বুঝতে পেরে পুনরায় জয়গুনকে গ্রহণ করতে চাইলেও সেই প্রস্তাবকে সহজেই জয়গুন ফিরিয়ে দিয়ে নিজের সিদ্ধান্তেই অটল থেকেছে। এ থেকে তার একরোখা স্বভাবের পরিচয় আমরা পাই। দরিদ্র এবং নারী হবার কারণে তাকে সহ্য করতে হয়েছে ক্রমাগত নিপীড়ণ। তবু সে কখনোই পিছিয়ে যায়নি বরং সমস্ত নিপীড়ণকে সে তার পদতলে দলিল করে এগিয়ে গেছে সন্মুকে। তাই এই উপন্যাস যেন হয়ে উঠেছে জয়গুনেরই জীবনগাথা।






তথ্যসূত্র :--
১.  ইসহাক আবু ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’, চিরায়ত প্রকাশন, কলকাতা, পঞ্চম মুদ্রণ, জানুয়ারী ২০১৯, বইটি সম্পর্কে কিছু মতামত অংশ
২.  তদেব, বইটি সম্পর্কে কিছু মতামত অংশ
৩.  ‘সংসদ বাংলা অভিধান’, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, পঞ্চম সংস্করণ, নভেম্বর ২০০০, ত্রয়োবিংশতিতম মুদ্রণ, জুলাই ২০১৬, পৃ- ৩২৯
৪.  ইসহাক আবু ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’, চিরায়ত প্রকাশন, কলকাতা, প্রথম চিরায়ত সংস্করণ, ডিসেম্বর ১৯৯২, পঞ্চম মুদ্রণ, জানুয়ারী ২০১৯, পৃ-৭
৫.  তদেব, পৃ-৩৯
৬.  তদেব, পৃ-১৯
৭.  তদেব, পৃ-৮১
৮.  Karl Marx and Frederick Engels Manifesto of the Communist Party, (অনুবাদক শাহ্‌ আলম), ইনফরমেশন সেন্টার ফর ওয়ার্কাস ফ্রিডম, বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ, সেপ্টেম্বর ২০১২, পৃ-২৫
৯.  তদেব, পৃ-৮২
১০. সেনগুপ্ত মল্লিকা ‘স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণ’, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, প্রথম সংস্করণ ১৯৯৪, ষষ্ঠ মুদ্রণ, সেপ্টেম্বর ২০১৪, পৃ- ১৩-১৪
১১. ইসহাক আবু ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’, চিরায়ত প্রকাশন, কলকাতা, প্রথম চিরায়ত সংস্করণ, ডিসেম্বর ১৯৯২, পঞ্চম মুদ্রণ, জানুয়ারী ২০১৯, পৃ- ১২০
১২. আজাদ হুমায়ুন ‘নারী’, কাকলী প্রকাশনী, কলকাতা, তৃতীয় সংস্করণ, ত্রয়োবিংশ মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃ- ১৯
১৩. সুকান্ত রচনা সমগ্র, প্রথম গীতাঞ্জলি সংস্করণ, ২০১১, কলকাতা, পৃ-৬০


1 টি মন্তব্য: