শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

দেবপ্রিয়া সরকার



সুকন্যা :
বাড়ির সামনের রাস্তাটার উল্টো দিকে খানিকটা আগাছা ঢাকা ফাঁকা জায়গা, তারপর ট্রেনলাইন। সকাল আটটা কুড়িতে একটা ট্রেন ঝমঝম করতে করতে আপ লাইন দিয়ে চলে যায়। আপ? হ্যাঁ আপই তো। নাকি ডাউন? ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকায় সুকন্যা। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে, এসময় তো ডাউন ট্রেন যায় না! আপই হবে।

মুহূর্তের মধ্যে হুইসল বাজাতে বাজাতে হাজির হল আপ হলদিবাড়ি-নিউ জলপাইগুড়ি লোকাল। একটা সন্তুষ্টির হাসি ছড়িয়ে পড়ল সুকন্যার চোখে মুখে।
-আরে ঝিরি! তুই এখানে? আমি সেই কখন থেকে খুঁজছি! চটপট খেয়েনে এটা।
অপর্ণার গলা শুনে পেছন ফিরে তাকাল সুকন্যা। হাতের ট্রেতে চা আর বিস্কিট। বললেন,
-তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিতে হবে। ডঃ বর্মণের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্টের কথাটা মনে আছে তো?

রাজর্ষি :
-মোহনদা মেইন রোডটা অ্যাভয়েড করো। একে তো ধুলো, তারপর জ্যাম থাকলে আর দেখতে হবে না!
ড্রাইভারের থেকে রাজর্ষির নজর ঘুরে গেল সুকন্যার দিকে। পেছনের সিটে, তার পাশেই দরজা ঘেঁষে বসে আছে সে। পরনে হালকা গোলাপি রঙের সালোয়ার স্যুট। কাঁধ পর্যন্ত চুল হাওয়ায় উড়ছে।
-কী ভাবছো ঝিরি?
-কিছু না।
জানালার দিক থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই অস্ফুটে জবাব দিল সুকন্যা।
-আচ্ছা,ডঃ বর্মণকে কেমন লাগছে তোমার? ওঁর ট্রিটমেন্টে ফল পাওয়া যাবে বলে মনে হয়?
অনিচ্ছা সত্বেও রাজর্ষির দিকে মুখ ফেরায় সুকন্যা। একটা শীতল, শুকনো হাসি হেসে আবার চোখ রাখে জানালায়। আহত হয় রাজর্ষি।

ফাঁকা রাস্তা পেয়ে গতি বাড়িয়ে দিয়েছে মোহন। পিছিয়ে পড়ছে চাষের জমি, চা-বাগান, গাছগাছালি, আর রাজর্ষির মন।
শহরের নামজাদা ব্যবসায়ীর একমাত্র সুদর্শন ছেলে রাজর্ষি। তার ব্র্যান্ডেড জামাকাপড়,অ্যাক্সেসারিজ, ঝাঁ চকচকে বুলেট দেখে কলেজের ছেলেরাও হকচকিয়ে যেত। কত মেয়ের যে রাতের ঘুম কেড়েছিল রাজর্ষি, গুপ্ত এন্টারপ্রাইজেসের একলওতা ওয়ারিশ তার কোনও হিসেব নেই।

সুকন্যা তেমন পাত্তা দিত না রাজর্ষিকে। বড়লোকের বাউন্ডুলে ছেলে ছাড়া আর কিছুই ভাবত না তাকে। কিন্তু কলেজের ফাংশনে যখন কতগুলো বখাটে ছেলে উত্তক্ত করছিল মেয়েদের, তখন রুখে দাঁড়িয়ে ছিল রাজর্ষি। হয়েছিল হাতাহাতিও। এরপরেই মন গলে সুকন্যার, দানা বাঁধে দু’জনের সম্পর্ক।
সুকন্যা বা রাজর্ষি কারও বাড়ি থেকেই তাদের সম্পর্ক নিয়ে কোনও ছুঁৎমার্গ ছিল না। পাক্কা পাঁচটা বছর তারা চেটেপুটে নিয়েছে প্রেমের স্বাদ। সেবছর সুকন্যার জন্মদিনে দুর্দান্ত একটা সারপ্রাইজ প্ল্যান করেছিল রাজর্ষি। বার্থ ডের ঠিক আগেরদিন গাড়ি নিয়ে সোজা পাড়ি জমায় কালিম্পঙে। গন্তব্য ছবির মতো সুন্দর গ্রাম রামধুরা। সেখানে অপেক্ষা করছিল ভুটিয়া হোমস্টেতে আগে থেকে বুক করে রাখা একটা স্বপ্নের চারদেয়াল।
অবাক হওয়ার পাশাপাশি দারুণ খুশি হয়েছিল সুকন্যা। আদরে, চুমুতে ভরিয়ে দিয়েছিল রাজর্ষিকে। ব্যালকনিতে কাটা হয়েছিল কেক। শ্যাম্পেনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল তারা ভালবাসার স্রোতে। আচমকাই হাতের গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে সুকন্যার সামনে হাঁটু মুড়ে বসল রাজর্ষি। পকেট থেকে বের করল একটা ডায়মন্ড রিং। বলল,
-উইল ইউ ম্যারি মি?
যে কোনও মেয়ের কাছে এমন মুহূর্ত ভোররাতে দেখা স্বপ্নের মতো। সেই কলেজ থেকে শুরু হওয়া তাদের সম্পর্কের কু-ঝিকঝিক রেলগাড়িটা যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল পাহাড়ের কোলে এক তারায় ভরা স্টেশনে। সেখান থেকে আবার শুরু হবে পথ চলা, সঙ্গে মিশবে আরও নতুন কিছু রং। নতুন নতুন চাওয়া পাওয়া।
পরদিন সূর্যোদয়ের সময় কৃষ্ণচূড়া রঙের আকাশটাকে মুগ্ধ হয়ে দেখছিল সুকন্যা। আর রাজর্ষি দেখছিল তাকে। সাতসকালের সোনারঙের রোদ্দুর ছুঁয়ে ছিল তাদের।
আচমকা গাড়ির হর্নের শব্দে ঘোর ভাঙে রাজর্ষির।

অর্চিস্মান :
ডঃ অর্চিস্মান বর্মণকে আর যাই হোক ঠিক ডাক্তার বলে মনে হয়না। কেমন যেন পাশের বাড়ির নান্টুদা, পিন্টুদা গোছের হাবভাব। দিলখোলা মানুষটি গল্পের ছলে পৌঁছতে চাইছেন সমস্যার গভীরে। তীক্ষ্ণ চোখে জরিপ করছেন সুকন্যা এবং রাজর্ষিকে। গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন,
-আগের সিটিঙে সানরাইজ পর্যন্ত শুনেছিলাম গল্পটা। এরপর কী হয়েছিল? তুমি বলবে সুকন্যা?
রঙিন পেপারওয়েটটার দিকে বিহ্বলভাবে তাকিয়ে ছিল সুকন্যা। ডাক্তারবাবুর কথা শুনে মুখ তুলল। কিন্তু কোনও অভিব্যক্তি নেই সেই দৃষ্টিতে। অর্চিস্মান মুখ ফেরালেন রাজর্ষির দিকে।
-তোমার মুখ থেকেই তাহলে শোনা যাক ক্লাইম্যাক্সটা।
গলাটা একটু পরিষ্কার করে শুরু করল রাজর্ষি,
-ঝকঝকে সকালে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলছিল সিলারিগাঁওয়ের পথে। কিন্তু একটা তীক্ষ্ণ বাঁক ঘুরতেই কোত্থেকে সামনে এসে পড়ল মালবোঝাই এক টেম্পো আর মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু ওলোট পালোট। যখন সম্বিৎ ফিরল, দেখলাম খাদের একদম ধারে পাথরের সঙ্গে লেগে আছে আমাদের গাড়িটা। একটু বেচাল হলেই পড়ে যাবে নিচে। ড্রাইভারের আসন ফাঁকা। ঝিরির মাথা থেকে দরদর করে ঝরছে রক্ত। দু’চার জন লোকের সাহায্যে উদ্ধার করলাম ঝিরিকে। নিয়ে এলাম শিলিগুড়ি। একসপ্তাহ নার্সিংহোমে থেকে বাড়ি ফিরল সে। আর তখনই নজরে এল সমস্যাটা। নিজের ঘর, জিনিসপত্র সব কিছু নিয়ে দিব্যি আছে। ঠিক আগে যেমন ছিল। বদলায়নি অভ্যেসগুলোও। কিন্তু গোলমালটা ছিল অন্য জায়গায়। আমরা কেউ কাছে গেলেই ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। পুরনো অজস্র ঘটনার কথা মনে থাকলেও, ঝিরি মনে করতে পারে না তার মা-বাবার মুখ, আপনজনদের চেহারা। ভুলে গিয়েছে ওর রাজকেও।

কথাগুলো বলতে বলতে গলাটা ধরে আসে রাজর্ষির। ডাক্তারবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তাঁর ল্যাপটপটা এগিয়ে দিলেন রাজর্ষির দিকে। স্ক্রিনে একটা মানুষের মস্তিষ্কের ছবি।
-সুকন্যার যেটা হয়েছে সেটা হল ফেস ব্লাইন্ডনেস বা চেহারা চিনতে পারার অক্ষমতা। এক ধরনের স্নায়বিক সমস্যা। এই রোগে আক্রান্ত হলে মানুষের চেহারা চেনার ক্ষমতা হারিয়ে যায়। যদিও অন্য কিছু চেনার ক্ষেত্রে তাদের চোখ বা মস্তিষ্ক ঠিকঠাকই কাজ করে। ডাক্তারি ভাষায় আমরা একে বলি প্রসোপ্যাগনোসিয়া।
-কেন হয় এই ফেস ব্লাইন্ডনেস, ডক্টর?
-আমরা যখন কিছু দেখি তখন মস্তিষ্কের একটা বিশেষ লোব সেটাকে প্রসেসিং করার দায়িত্ব নেয়। এর নাম অক্সিপিটাল লোব। এই লোবের একটা অংশ হল অক্সিপিটো–টেম্পোরাল কর্টেক্স। এই অংশটা যদি কোনওভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় তবেই দেখা দেয় প্রসোপ্যাগনোসিয়ার লক্ষণ।
-বুঝলাম। অনেকটা যেমন আমরা সিনেমা বা সিরিয়ালে দেখে থাকি। ধরুন কেউ একজন মাথায় চোট পেয়ে স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলল, আবার দ্বিতীয়বার চোট পেয়ে সেটা ফিরে এল। তাই তো?
রাজর্ষির বলার ভঙ্গিতে হেসে ফেললেন ডাক্তারবাবু।
-জীবনটা যদি সিনেমা হতো তাহলে তো মিটেই যেত। অপ্রিয় হলেও সত্যিটা এই যে, এখনও পর্যন্ত এই নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডারের কোনও সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা আবিস্কৃত হয়নি।
-তার মানে আমরা আর কোনও দিন ফিরে পাব না আগের ঝিরিকে?
অর্চিস্মান একঝলক দেখলেন সুকন্যাকে। উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে অর্চিস্মানের দিকেই। লেখার প্যাডটাতে খচখচ করে কীসব যেন লিখলেন। তারপর হাসি মুখে বললেন,
-সমস্ত ঘটনা শুনে আর সুকন্যার ব্রেন স্ক্যানের রিপোর্ট স্টাডি করে আমি ধরে ফেলেছি সমস্যাটা। কিছু সাইকোথেরাপি বা অকুপেশনাল থেরাপির সাহায্য নিয়ে এসব রোগীদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা হচ্ছে আজকাল। আমরাও অ্যাপ্লাই করব সেগুলো। ধৈর্য রাখো।

এবং রোদ্দুর :
রাজর্ষি বেরিয়ে গিয়েছে কেবিন থেকে। এখন মুখোমুখি সুকন্যা আর অর্চিস্মান। সুকন্যার দৃষ্টি স্থির অর্চিস্মানের দু’চোখের ওপর। তার বুকের ভেতর তোলপাড় করছে অজস্র ভাবনা। কোথা থেকে শুরু করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। এলোমেলো মনটাকে গুছিয়ে নেয় একবার।
-আর পারছি না ডক্টর। গত দু’মাস ধরে একই কথা, ওই একই প্রশ্ন শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। কতগুলো অচেনা মুখের বৃত্তের ভেতর যেন থমকে আছি আমি। কী করব, কোথায় যাব কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি আমাকে বাঁচান, প্লিজ। এই আলোছায়ার জগৎ থেকে মুক্তি চাই এবার।
টেবিলের ওপর রাখা সুকন্যার হাতটায় আলতো করে চাপ দেন অর্চিস্মান। তারপর বলেন,
-অর্চিস্মান বর্মণ হাল ছাড়ার পাত্র নয়। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চালিয়ে যাব লড়াই। শুধু একটু কো-অপারেট করো আমার সঙ্গে। কি, করবে তো?
হাসি মুখে মাথা নাড়ে সুকন্যা।
অলস দুপুর একটু করে গড়িয়ে চলছে বিকেলের দিকে। জানালা দিয়ে কখন যেন একফালি মিঠে রোদ্দুর এসে ছুঁয়ে ফেলেছে তাদের।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন