শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

রামামৃত সিংহ মহাপাত্র। পারক গল্পপত্র


টুপ করে ডুব দিয়ে ঐ পাড়ে গিয়ে উঠলো কালো কুচকুচে পাখিটা। নাম জানে না সুমন্ত।পাখিটা এদেশের নয়,শীতের শুরুতে ভিনদেশ থেকে উড়ে আসে তিলবাড়ির বাঁধে।এই সময় ওদের নিজের দেশ সাইবেরীয়ায় বরফ পড়ে,বরফের হাত থেকে বাঁচতে পাড়ি দেয় এতটা পথ। ঠিক যে ভাবে পেটের জন্য এখানে , কলকাতা থেকে এতটা দূরে বাঁকুড়ার এই গণ্ড গ্রামে পড়ে আছে। ইউ পি থেকে এগ্রিকালচার নিয়ে পড়াশুনা করে ওদিকেই একটা চাকরীতে ঢুকেছিল সুমন্ত কিন্তু থাকতে পারেনি,চাকরীটা ছেড়ে ঘরে এসে বসেছিল কিছুদিন। তবে দাদা-বৌদির সংসারে বেরোজগেরে হয়ে থাকতে বিবেকে লেগেছিল ওর।তাই ঘর ছেড়ে বেরিয়েছিল চাকরীর চেষ্টায়। দাদা বরং বলেছিল ‘ সরকারি চাকরির চেষ্টা কর না, এখনই হন্যে হয়ে বেসরকারি চাকরীতে ঢুকতে হবে কেন। সংসারেও তো তেমন চাপ নেই।‘ দাদা ভুল কিছু বলে নি।দাদা বৌদি দুজনেই সরকারী চাকুরে। বছর দুই বিয়ে হয়েছে ওদের।ছেলে পুলে নেয় নি এখনও। সেই হিসাবে নিরিবিলির সংসার। দাদা বৌদি কেউ কোনদিন ওর চাকরির ব্যাপারে কোন কথা বলে নি,তবুও নিজে থেকেই বেরিয়ে এসেছিল সুমন্ত। কোম্পানীর হেড অফিস কলকাতাতে, তবে ওদের ফার্ম ছড়িয়ে রয়েছে পুরো রাজ্য জুড়ে।জয়েন করার পর কোম্পানীর এম ডি বলেছিলেন ‘ কৃষির প্রকৃত উন্নতি তখনই হবে,যখন,কৃষিবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করা ছেলেমেয়েরা গ্রাম বাংলায় গিয়ে মাঠে কাজ করবে।‘ তার সাথে যোগ করেন জানোতো চাষবাস নিয়ে পড়াশোনার জন্য রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের পাশাপাশি শ্রীনিকেতনের প্রতিষ্ঠা করেন। সেইসঙ্গে নিজের ছেলে রথীন্দ্রনাথকে বিলেতে পাঠান কৃষি নিয়ে পড়াশোনা করানোর জন্য।‘ ‘ব্যাস এই শুরু হলো ‘।ফুট কাটে শ্রুতি।মেয়েটা ওদের কোম্পানীর সেলসে রয়েছে। মেয়েটা সুন্দরী, প্যারফরম্যানসেও ভালো।তাই এম ডি র গুড বুকে নাম রয়েছে ওর। ওর গলা পেয়েই বোধহয় থেমে যান এম ডি সাহেব,তারপর ওর দিকে তাকিয়ে হেসে বলেন ‘ নিশ্চয় বিরক্ত হচ্ছো, ওকে ওকে,আজ আর বকবক নয়। আসল কথায় আসি। বাঁকুড়া জেলার তিলবাড়ীতে আমাদের কোম্পনী একটা নতুন ফার্ম খুলতে চলেছে।সুতরাং বুঝতেই পারছো এই অফিস থেকে বেশ কয়েকজনকে ওখানে শিফট করা হবে।‘

-স্যার আমি কী সেই লিস্টে আছি? উদ্গ্রীব হয়ে জানতে চায় শ্রুতি।

-নো ,নট এট এল মাই ইয়াং লেডি। লিস্ট উইল বি ডিসক্লোজ সুন। এম ডি সাহেবের কথায় শ্রুতি, স্বস্তি লাভ করলেও অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে বাকি সকলের মুখে। সুমন্তর চাকরির বয়স কম হলেও, ও বুঝেছে সুন্দর মুখের সাথে শুধু প্যারফরম্যানেসেরই নয়, হেড অফিসে স্থিতু হবারও একটা সমানুপাতিক সম্পর্ক রয়েছে। সবার চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ ছড়িয়ে পড়লেও, সুমন্ত ছিল এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিস্পৃহ।বরং কিছুদিনের জন্য চলে যেতে চাইছিল কলকাতা ছেড়ে।সুযোগটা জুটেও গেল ওর কপালে।যে লিস্ট বেরোল তাতে সবার আগে ছিল ওর নাম।

তিলবাড়ি জায়গাটা খারাপ লাগে নি ওর।নতুন ফার্ম,তাই কাজের চাপও কম। আপাতত বীজ ধান তৈরী ছাড়া অন্য কোন কাজ শুরু হয় নি।ফলে অখন্ড অবসর ওর। মাঝে মাঝে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে জঙ্গল লাগোয়া এই বাঁধটার ধারে।একাই বসে থাকে।বসে বসে পাখি দেখে,গাছ দেখে,স্থানীয় মানুষজন দেখে।শেষ বিকেলে মানুষজনের ঘরে ফেরা দেখে ,নিজের ঘরের জন্য মন খারাপ হয় ওর।ভেবে আশ্চর্য হয় ওর মনের কথা।কিছুদিন আগে ভালো লাগছিল না কলকাতা, অথচ এখন উতলা হয় কলকাতার নিজের ঘরের কথা ভেবে।কেউ কেউ কথাও বলে ওর সাথে।ধান বীজ বিলি করে বলে ওরা ওর নাম দিয়েছে বীজ বাবু।কাছে এসে জানতে চায় ,’বীজ বাবু আপনি ইখানে বসে’

-এমনি। তোমাদের গ্রাম দেখছি।কখনো সুমন্ত জানতে চায়,এটা কী গাছ,ওটা কী পাখি?গাছ সব ওরা চেনে তবে বেশিরভাগ বিদেশী পাখির নাম ওরা জানে না। তবে পুকুরে ভেসে বেড়ানো পাখিদের ওকে চিনিয়েছে, প্রত্যূষা।প্রত্যূষা এখানকার স্থানীয় মেয়ে নয়। সামনে একটা বেসরকারি প্রাইমারী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ রয়েছে, ওখানে পড়ায় ও। প্রকৃতির সান্নিধ্য পছন্দ করে মেয়েটা,তাই মাঝে মধ্যে এখানে এসে বসে থাকে ।সত্যি কথা বলতে কী,সুমন্ত এখন যে রোজ এই পুকুর পাড়ে এসে বসে থাকে তা ওই মেয়েটার টানেই। মেয়েটাকে আশ্চর্য লাগে সুমন্তর।ওর পাশে বসে,কথাও বলে, তবুও ওর মনের নাগাল পায় না। সুমন্ত বুঝতে পারে না, মেয়েটার আবেগ নেই,না কি আবেগকে চাপা দেবার সহজাত ক্ষমতা রয়েছে। ওর সাথে পরিচয় হয়েছিল একটু অদ্ভূত ভাবে।তখন সবে পরিযায়ী পাখির দল আসতে শুরু করেছে এখানে।আকাশের দিকে তাকিয়ে সুমন্ত দেখতো ঝাঁক কে ঝাঁক পাখি উড়ে যাচ্ছে শালগাছের মাথা গুলোর উপর দিয়ে।খুব ভালো লাগতো ওর।একদিন হঠাতই ওকে বিমর্ষ করে তুলল একটা ঘটনা।ওর ফার্ম থেকে হেঁটে হেঁটে আসছিল পুকুরের পাড়ে ,হঠাৎ দেখতে পেল উড়তে উড়তে একঝাঁক পাখির মধ্যে কয়েকটা আছড়ে পড়লো নীচে।প্রথমে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে ও।তারপর ছুটে যায় পাখিগুলোর কাছে।গিয়ে ওখানে আবিষ্কার করে প্রত্যূষা  কে।ওকে দেখে বলে ওঠে ‘ দেখেছেন কি নিষ্ঠুর ভাবে মেরেছে।‘

-কারা মেরেছে?

-সামনেই একটা আদিবাসী পাড়া আছে , ওখানের কিছু ছেলে খেলার ছলে তীর ছোঁড়ে এদের দিকে।

-সে কি?

-হুম।আনেকবার বারন  করেছি কাজ হয় নি।দেখি আজ আর একবার বলি। বলে হাঁটতে শুরু করে মেয়েটি।ওকে অনুসরণ করে সুমন্ত ।প্রত্যূষাকে কে দেখে হাতে তীর ধনুক  নিয়ে যারা ঘোরাঘুরি করছিল তারা লুকিয়ে পড়ে।বুঝতে পারি এই গ্রামের সবাই প্রত্যূষাকে চেনে।তবুও কৌতূহল বশত জানতে চাই, আপনাকে এরা চেনে ?

-হুম।তারপর একটি মেয়েকে দেখে এগিয়ে যায়।ওর কাছে গিয়ে বলতে শুরু করে ‘ওই ছেলে গুলোকে বলবি ,এরপর যদি পাখিগুলোকে তীর ছোঁড়ে ভালো হবে না।পুলিশ নিয়ে এসে ধরিয়ে দেব।

-উয়াদেরকে সিটোই করা দরকার। এতবার বুলছি,কিছুই শুনছে নাই।

-বেশ আমিও দেখছি কেমন না শোনে ।বলে হনহন করে ফিরতে থাকে যে পথে  এসেছিল সেই পথ ধরে। মেয়েটি ছুটে এসে বলে ‘আমাদের ঘরকে চলুন’

-না রে আজ নয়।আন্যদিন যাবো।হাঁটতে হাঁটতেই উত্তর দেয় ও।কিছু পরে হাঁটার গতি কমে আসে।কথা বলার সু্যোগ হয় সুমন্তর।জানতে চায় ‘এরা আপনার চেনা?,

-হ্যাঁ আমাদের কলেজে এই গ্রামের কয়েকজন পড়ে।ওদের সাথে এসেছি কয়েকবার। কথা বলতে বলতে এগিয়ে যায় ওরা।দুপাশে পাতা শূন্য শাল গাছ।পাতা ঝরার সময় এখন।পাতা শূন্য শালগাছ গুলোর দিকে তাকালে বনানীকে কেমন রিক্ত মনে হয়। মন খারাপ হয়।বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করে ওঠে।দূরে একটা কোথাও পাখি ডাকছে, স্বরটা বেশ উদাস করা। পাশে হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ ওর শরীর ছুঁয়ে যায় প্রত্যূষার শরীর। ‘সরি’ বলে ছিটকে সরে যায় সুমন্ত। জঙ্গলের মাঝে সরু পায়ে চলা পথ। দুপাশে জমা আছে শুকনো পাতার স্তুপ।সরে গিয়ে হাঁটতে থাকে ওই শুকনো পাতার উপর। মড়মড় শব্দে পাতা ভেঙ্গে হাঁটতে থাকে সুমন্ত।শব্দে সচকিত হয়ে হঠাৎ ওর হাতটা ধরে টেনে প্রত্যূষা বলে ‘ রাস্তায় নেমে আসুন।পাতার উপর হাঁটবেন না।পাতার মধ্যে চন্দ্রবোড়া কেমোফ্লেজ করে থাকতে পারে।সাপের নামটা এখানে এসে শুনেছে সুমন্ত।শীত-গ্রীষ্ম সব সময়ই বেরোয়।বেশিরভাগ সময় মাঠের কোলে লুকিয়ে থাকে। ভীষণ ক্ষীপ্র এই সাপ।তবে এই পথেও যে থাকতে পারে তা জানা ছিল না।তাই প্রত্যূষার কথায় দ্রুত ফিরে আসে রাস্তায়,হাঁটতে থাকে ওর পাশ ঘেঁষে।স্বগোক্তি করে প্রত্যূষা ‘আগে এই অঞ্চলে এই সাপ ছিল না।বছর খানেক আবির্ভাব হয়েছে।

-তাই?

-হুম।বছর খানেক আগে খুব বড়ো বন্যা হয়েছিল।সবার ধারণা সেই বন্যার জলে ভেসে এসেছিল এই সাপ।

-আশ্চর্য!

-হুম।প্রতিবছর কতকিছু যে বদলে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার।

-সত্যি। প্রসঙ্গ পাল্টায় সুমন্ত।আপনি এখানেই থাকেন?

-হুম।ঐ ডি এড কলেজে পড়াই।

-আচ্ছা।তার মানে আপনি দিদিমণি।

-বলতে পারেন।স্মিত হেসে উত্তর দেয় প্রত্যূষা।

-বাড়ি এখানেই?

-না,হাওড়া।তবে বর্তমানে কলেজের হোস্টেলে থাকি।

-যাক ।বাড়ি যাবার সঙ্গী পাওয়া গেল একজন।আমার বাড়ি কলকাতা। বলে সুমন্ত।

-বাড়ি আমার সে ভাবে যাওয়া হয় না।


না কারনটা তখন জানা হল না সুমন্তর।ততক্ষণে ওরা এসে পড়েছিল সেই জায়গায় যেখান থেকে,আলাদা পথে হাঁটতে হবে ওদের।‘আসি’ বলে কলেজের রাস্তায় হাঁটতে থাকে প্রত্যূষা ।ওর চলে যাবার পথের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সুমন্ত।তখন আধাঁরে ঢাকছে পিছনের হেঁটে আসা পথ। সামনের রাস্তা।দূরের বনানী।সুমন্ত ফিরতে থাকে ওর ফার্মের রাস্তায়।পরের দিন আবার যায় ঐখানে প্রত্যূষাকে দেখতে পাবার আশায়।সন্ধ্যে পর্যন্ত বসে থাকে ।প্রত্যূষা আসে না।ওর দেখা না পেয়ে মন খারাপ হয় সুমন্ত র। পরপর কদিন গিয়েও দেখা  না পেয়ে ভাবে তবে কি আর  আসবে না।তবে পুরোপুরি আশাহত হতে হয় না ওকে।প্রত্যূষা আসে।তখন সুমন্ত এক দৃষ্টিতে পাখিদের ভেসে বেড়ানো দেখছে তিলবাড়ির বাঁধে।প্রত্যূষা এসে দাঁড়ায় ওর পাশে।ওর গায়ের মিস্টি গন্ধ এসে লাগে সুমন্তর নাকে।ফিরে তাকায় ও।মুখে হাসি ঝুলিয়ে প্রত্যূষা বলে ‘পাখি দেখতে আপনি রোজই আসেন,তাই না?’

-না না কোন কোন দিন।

-কিন্তু আমি রোজই দেখি আপনাকে

-কিন্তু কই আমি তো আপনাকে দেখতে পাই না।আবাক হয়ে বলে সুমন্ত।

-বাঁধের এই পাড়টাতে আসা হয় না।তবে অন্য পাড় থেকে দেখেছি।আপনি হয়তো খেয়াল করেন নি।

-বার্ড ওয়াচ করেন? মানে সখ আছে?

-না সে ভাবে না।আসলে এই সময় আমাদের ফার্মে কাজের চাপ কম থাকে।তাই বিকেল দিকে এখানে এসে বসি।

-জায়গাটা খুব সুন্দর তাই না?

-হুম।আমাদের কলকাতায় এরকম প্রাকৃতিক পরিবেশ তো দেখা যায় না।তাই যতটা পারি দুচোখ মেলে দেখে নি।আর এই মুক্ত বাতাস বুক ভরে টেনে নি।

-ঠিক।তবে আমার বাড়ি হাওড়ায় হলেও, প্রপার হাওড়ায় নয়। গ্রামের দিকে।

-আচ্ছা আপনি সেদিন বলছিলেন বাড়ি যান না,কারন টা জানতে পারি? সুমন্তর কথা শুনে মুখটা থমথমে হয়ে যায় ওর।উত্তর না দিয়ে ও বলে ‘দেরী হয়ে যাচ্ছে এবার ফিরতে হবে আমায়।‘বলে ওর কলেজের রাস্তায় হাঁটতে থাকে প্রত্যূষা ।সুমন্ত বুঝতে পারে জিঞ্জেস করাটা ঠিক হয় নি ওর।তাই ওর হেঁটে যাওয়া পথে হাঁটতে থাকে সুমন্ত।ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ঘুরে দাঁড়ায় প্রত্যূষা।জানতে চায় কিছু বলবেন?

-বলছিলাম বুঝতে পেরেছি,আমার আপনাকে ওই কথাটা জিঞ্জেস করা ঠিক হয় নি।কিছু মনে করবেন না প্লিজ।

-না না মনে করবো কেন।শুকনো গলায় উত্তর দেয় প্রত্যূষা ।

-তবে যে উঠে চলে এলেন।

-কাজ আছে বললাম যে।

-না আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে আমি আপনাকে দুঃখ দিলাম

-না সে রকম কিছু ব্যাপার নেই।

-তবুও যদি থেকে থাকে তার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আমি।

-আরে আরে একি করছেন আপনি। বললাম তো আমি আপনার কথায় রাগ করি নি।

-তবে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারি।

-হুম,নিশ্চই হেসে বলে প্রত্যূষা।

-কাল আসবেন। দ্বিধাগ্রস্থ স্বরে বলে সুমন্ত।

-আচ্ছা আসবো।হেসে বলে প্রত্যূষা ।


পরেরদিন এসেছিল প্রত্যূষা।এখন রোজই আসে।এসে বসে সুমন্তর পাশে।সুমন্ত পাখি চেনে, জানে ওর কাছ থেকে।তিলবাড়ির বাঁধে মৃদু বাতাসে ওঠা ঢেউ স্পর্শ করে যায় সুমন্তর হৃদয়, প্রত্যূষা ওর পাশে থাকলে। তবে সুমন্ত খেয়াল করেছে সুমন্ত প্রত্যূষার যত কাছে যেতে চায়,প্রত্যূষা তত দূরে সরে যায়।তবে কী ওর এমন কোন  অতীত রয়েছে, যা সুমন্তর সামনে স্বাভাবিক হতে বাধা দেয় ওকে।সুমন্তর মনের কথা বুঝতে পেরেই হয়তো সেদিন  ওর  অতীতের দুঃখ জীবনে  অবগাহন করিয়েছিল সুমন্তকে।ততদিনে আপনি থেকে তুমি তে নেমে এসেছে দুজনেই ।প্রত্যূষা বলেছিল 'আমার  একটা খারাপ অতীত আছে, যেটা কোন পুরুষের সামনে স্বাভাবিক হতে বাধা দেয়  আমায়।'

-কি রকম?জানতে চেয়েছিল সুমন্ত।শুরু করতে একটু সময় নিয়েছিল ।' তুমি হয়তো জানো না আমি ডিভোর্সী।'এটুকু বলে থেমে যায়।বলার জন্য তাড়া দেয় না সুমন্ত। ও জানে প্রত্যেক মানুষের  একটা ব্যক্তিগত পরিসর রয়েছে।সেই পরিসর  অন্য মানুষের সামনে যতটা প্রসারিত করতে চায়, ততটুকুতেই মানুষের ঢোকা উচিত ।তবে ওখানেই থেমে থাকে না ।বলে চলে 'বিয়ের তিন বছরের মাথায় বিয়েটা ভেঙে দি আমি।ভাঙ্গার কারণ, বলতে পারো ভীষণ রকম মেন্টাল টরচার।ভীষণ খুতখুত ছিল আমার বর।পান থেকে চুন খসলেই ঝামেলা বাঁধাতো।এই ঝামেলা নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো না ।ফোন করে করে ব্যতিব্যস্ত করে তুলতো আমার বাবা মা থেকে শুরু করে সকল  আত্মীয় স্বজনদের ।বারবার বুজিয়েছি 'নিজেদের ব্যাপারে অন্যকে জড়াচ্ছো কেন?

-জানাতে হবে না তুমি কত শয়তান ।

-আমি শয়তান না তুমি ?।এই আমি তুমি চলতেই থাকতো হরদম।তবুও বাবা মায়ের কথা ভেবে সব মেনে নিয়ে নিয়েছিলাম ।এর মধ্যে কনসিভ করি আমি।তারপর থেকে শুরু হয়  অন্য রকম টরচার।সবাই কে ফোন করে বলতে থাকে , সামনা সামনি গিয়ে বলতে থাকে 'এখন  আমার রোজগার কম। এখন সন্তান জন্মালে ওকে ভালোভাবে মানুষ করতে পারবো না ।'

-তো নিলে কেন

-প্রত্যূষার চাপে।বলতে বলতে থামে ও ।কান্না ভেজা গলায় বলে বিশ্বাস করো সুমন্ত সন্তান নেবার কথা আমি একবারও ওকে বলিনি।আমাকেই বলতো 'একটা বাচ্চা হোক দেখবে আমাদের সব  অশান্তি কেটে যাবে।'সেই মানুষটাই যে এভাবে আমাকে এ  দোষারোপ করবে বুঝতে পারি নি।ওর  ঐ ব্যবহারের জন্য বাধ্য হই অ্যাবরশন করাতে।আর তখনি সিদ্ধান্ত নি এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাকে ।এই রকম মানসিক রোগীর সঙ্গে জীবন কাটানো সম্ভব নয়।কথা গুলো বলে কাঁদতে থাকে প্রত্যযূষা।সুমন্ত বলে 'ওটা একটা ভুল সম্পর্ক ছিল।ভালো করেছে বেরিয়ে  এসেছো।আবার নতুন করে জীবনটাকে শুরু করো।'

-জানিনা সব কিছু জানার পর কেউ আমাকে একসেপ্ট করবে কিনা?

-আর যদি করতে চায়?

-জানি না ।ঘরপোড়া গরু তো সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরাই ।বলে চলে যায় প্রত্যূষা ।

সুমন্ত বসে থাকে।ভাবে ও যদি প্রত্যূষাকে গ্রহন করে  ওর বাড়ির লোক মানবে তো?যদিও বা মেনে নেয় প্রত্যূষা ওদের ঠিক মনে গ্রহন করবে তো?ভাবতে থাকে কিন্তু কোন  উত্তর পায় না । আকাশে বাড়তে থাকা তারার জাল ঝেঁকে ধরে ওকে।রাত বাড়তে থাকে ।তবু ওঠে না সুমন্ত।শুধু ভাবতে থাকে আর ভাবতে  থাকে।তখনি ভয় পেয়ে চমকে ওঠে ফট ফট শব্দে।সেই মুহূর্তে ভয় পেলেও পরক্ষণেই ভয় ভেঙে যায়।বুঝতে পারে পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ।শীত কমে গেলে বেশিরভাগ পাখি ফিরে গেলেও দু একটা এই বাঁধেই থেকে যায় জোড়বেঁধে, সাহসের উপর ভর করে । এবার সাহস পায় সুমন্ত মনের ভেতর। উঠে দাঁড়ায়।ফিরতে থাকে ফার্মের দিকে।আজ রাত হয়ে গেছে ।তবে কাল বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করবে না, সকালেই যাবে প্রত্যূষার কাছে।জোড়বাঁধার কথা বলতে ।






1 টি মন্তব্য: