শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

অর্পিতা গোস্বামী চৌধুরী। পারক গল্পপত্র


বছর ঘুরতে না ঘুরতেই মিনু বাংলা বলতে এমনকি পড়তেও শিখে ফেলল। উত্তমের যেন  কারোর কাছে মাথা হেঁট না হয় ওর জন্য । তবে মিনুরও আসলে লাভই  হলো।  সত্যিই বাংলায় কি অপূর্ব একেকটা বই। আচ্ছন্ন হয়ে গেল সেই সব লেখায়। তাই বলে রান্নার ফাঁকে উপন্যাস  পড়বে! গুরুতর অপরাধ।  সব বই বের করে পুড়িয়ে দিয়েছিল উত্তম। ও ঘরের ভেতর থেকে  পাচ্ছিল বই  পুড়ে যাওয়ার ফরফর শব্দ আর কালো ধোঁয়াটে গন্ধ। যেন বিশাল বনে আগুন লেগেছে আর আরণ্যক  হরিণ, পাখি, সবাই ছুটোছুটি করছে। ডাকছে আর্তস্বরে।। আর মিনু খাটের এক কোন আঁকড়ে মেঝেতে বসে আছে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে। যেন কেউ ওর অস্তিত্ব বুঝতে না পারে  লুকিয়ে রেখেছে নিজেকে ভয়ে আতঙ্কে । উত্তম প্রচন্ড রেগে গেছে। পুরো দু'কেজি দুধ পুড়ে ছাই । নিশ্চয় আজ মেরে হাড়গোড় ভেঙে দেবে।

   মিনুর একটি ছেলে হল। ছেলে  মানে বংশের প্রদীপ । ওর বেশ কদর বেড়েছ।  শাশুড়ি আর গায়ে হাত তোলে না। স্বামী তো তুলতেই পারে মাঝেসাঝে। পুরুষমানুষ--  তা ভালোও তো বাসে। এই তো সেদিন বিবাহবার্ষিকীতে উত্তম একটা প্যাকেট নিয়ে এল  হাতে করে । প্রথম কোনও উপহার পেয়ে চোখ চিকচিক করে উঠেছিল মিনুর। উত্তম ওর কপালের চুল সরাতে সরাতে  বলল, তোমার সব বই তো আমি পুড়িয়ে দিয়েছিলাম সেদিন । খুব মন খারাপ হয়েছিল না !  নাও  আজ দুটো বই কিনে আনলাম তোমার জন্য। উত্তমের গলার স্বর ছিল অত্যন্ত মধুর । সত্যিই খুব খুশি হলো মিনু। তাড়াতাড়ি রঙিন মোড়ক খুলল। একটা দেশ বিদেশের রান্না, অন্যটা সাবেকি রূপচর্চা।  মিনু একটা ঢোক গিলে বই দুটো টেবিলে রেখে বলল, চা নিয়ে আসি। রান্না ঘরে গিয়ে ওর ঠেলে কান্না এল।   আজ একটা থাপ্পড়  নিজেকেই মারল ও । আজও বিহারীই থেকে গেল। বাঙালী হলে স্বামীর আনা উপহারে নিশ্চয় খুশি হত। উত্তম এত আদর করে বই, হ্যাঁ বইই তো এনেছে আর ওর পছন্দ হল না!

  ওর সেই মাঝপথে  কলেজে ছেড়ে আসা ফরাসি বিপ্লব, সেই স্বাধীনতার বিপ্লবের গৌরবজ্বল অধ্যায় , সেই পুড়ে যাওয়া সপ্তপদী, সেই প্রজাপতি অনুরাধা , সাতকাহন , অর্ধেক পড়া আরন্যক দাবানল হয়ে জ্বলছে এখনও ।  ওই সাহিত্য সাম্রাজ্য সন্তানের মতো আশ্রয় চাইছে ওর  বুকে  প্রতিদিন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন