শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

সংহিতা মিত্র। পারক গল্পপত্র



          কিছু কিছু চেতনা চিরকালের, তার সাক্ষী বয়ে চলা মানব সমাজ-সভ্যতা। মানুষ যত সভ্য হওয়ার দাবি করেছে ততই চিরন্তন প্রবৃত্তিকে Suppress করার চেষ্টা করেছে তাদেরই সভ্য সমাজের সংজ্ঞা অনুযায়ী। কিন্তু হঠাৎ যদি এই সভ্য সমাজের সব বাঁধন গুলি ছিঁড়ে যায়, তাহলে! তাহলে কি করবে এই ‘সভ্য’ মানুষ? ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’–র বীজ বোনা হয়েছে এই প্রশ্নেই।
          ৫১ বছর পরও যখন কোনো সৃষ্টি একেবারে প্রকাশ কালের সমান দাবি নিয়ে আজও আমাদের নাড়িয়ে দেয়, সেই সৃষ্টিতো আলাদা দাবি রাখবেই। উপন্যাস ও সত্যজিৎ রায়ের চলচিত্র (১৯৭০) কতটা জনপ্রিয়তার শিখরে পৌছেছিল তার প্রমাণ ৩৩ বছর পরে ‘আবার অরণ্যে’। গৌতম ঘোষের এই চলচিত্রের প্রথম কয়েক মিনিটেই Flashback-এ ধরা দিচ্ছে ১৯৬৯ -এর মে মাসে হঠাৎ বেরিয়ে পরা চার যুবকের নিজেকে খোঁজার গল্প ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে, লেখায় বারবার বলেছেন প্লট সাজিয়ে, একেবারে গল্পের সম্পূর্ণ জাল বুনে তিনি কখনই কলম হাতে নেননি। কাহিনী গুলো উঠে এসেছে তাঁরই জীবন জিজ্ঞাসা ও জীবন অভিজ্ঞতার মোড়কে মোড়কে, এককেবারে স্বাভাবিক ভাবে। বাংলাদেশের কবি বেলাল চৌধুরির সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকার মূলক অনুষ্ঠান – ‘কবিতার ঘর কবিতার বাহির’–এ বলেছেন তাঁর বোহেমিয়ান চরিত্রের ফসল ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’-
“...তখন তো আমরা, আমাদের হোটেলে থাকার মতো পয়সা আমাদের কাছে ছিল না, আর আগে থেকে ঠিকঠাক করে যাওয়াও হতো না, এই ট্রেনে উঠে পরলাম, উঠে পরে তার পরে গেলাম, কোনো একটা স্টেশনে নামলাম। নেমে আড্ডা-ফাড্ডা খাওয়া-দাওয়া এই সমস্ত, এই সব নিয়েই তো ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’।“(১)
            ১৯৬৮ সালে ‘কৃত্তিবাস’ ছাপার ঋণ মেটানোর তাগিদে যে উপন্যাস প্রকাশ পেল শারদীয়া ‘জলসা’ পত্রিকায় তার শিকড় কিন্তু বাস্তবের ধলভূমের মাটিতে পোঁতা। তাই পুরো উপন্যাস জুড়ে ওই মাটির উত্তাপ টাকেই ধরতে চেয়েছেন উপন্যাসিক।
         “আমি-শক্তি-স্মরন-ভাস্কর”(২) – বাস্তবের চরিত্রগুলির জীবন অভিজ্ঞতা লেখকের কলমে রূপ নিল অসীম, সঞ্জয়, হরি ও শেখর হয়ে। যারা এক অজানা অচেনা পথে বেরিয়েছে জীবনের মানে খুঁজতে। স্যুট-বুট পরা সভ্য শহুরে আমি আর আদিম নগ্ন অরণ্যজ আমি দুই যখন মুখোমুখী দাঁড়ায় তখন সেই সভ্য সত্তা কোথায় গিয়ে মুখথুবরে পরে; তারপর শুধুমাত্র মুক্তির স্বাদটুকু নিয়ে ফিরতে হয়, তারই কাহিনী ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’।
          উপন্যাস প্রকাশের দু-বছর পর ১৯৭০ খ্রীষ্টাব্দে সত্যজিৎ রায় চলচিত্রায়ন করলেন। প্লটের দাবীতে কাহিনীর কিছুটা পরিবর্তন করলেও, উপন্যাসের দাবী চলচিত্রে অক্ষুন্ন রাখলেন। যদিও একেবারে সচেতন ভাবেই ৭১ পৃষ্ঠার উপন্যাস কেঁটেছেটে একটা জোড়ালো প্লট তৈরি করেছেন। চরিত্র বা জায়গার নাম বদল কেবল নয়, বদলেছে সম্পর্কের ডায়মেনশন ও। উপন্যাসের কাহিনী জোড়ালো হচ্ছে বারবার Flashback-এর মধ্য দিয়ে, সেখানে পরিচালক মাত্র কয়েক মিনিটের Flashback দেখালেন। সঞ্জয়ের অতীত ধরা পড়লো নেশাগ্রস্থ অসীমের সংলাপে। চরিত্রগুলি স্বাধীনতা বা মুক্তির মানে খুঁজছে হাড়িয়ার দোকান, নারী শরীর আর গাড়ির আলোতে ধরা পরা মাতাল হয়ে ‘টুইষ্ট’ নাচে। যা আমি সভ্য সমাজে করতে পারিনা, তা সবকটার একেবারে চূড়ান্ত ভাবে রস নিংড়ে নেওয়ার তীব্র ইচ্ছাই কি স্বাধীনতা! ১৯৬৯ -এর সময়ের কোলকাতার ‘বাবুদের’ Party culture কি করে একই সমতলে মিশতে দেবে লখা আর অসীম-রবিদের। স্বাধীনতা মানে যে রাস্তার মাঝ বরাবর হাঁটা নয়, তাই পরিচালকের ক্যামেরার ক্লোসআপ-এ একেবারে সরাসরি গাড়ির আলো ফেললো ওদের মুখে।‘হাম লোক সব V.I.P. হ্যায়’(৩) স্পষ্ট করে দিল অরণ্য ও শহরের ফারাকটা।
           মানুষ বাদে জীবজগৎ-এর অন্য যে কোনো প্রজাতির দিকে তাকালেই বোঝা যায় বাকি সব-ই চলছে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে। মানুষ হঠাৎ নিজেকে সরিয়ে ‘সভ্য মানুষ’ করে তুললেও রক্তের ভেতরে বয়ে চলা আদিমতার ছন্দ যাবে কোথায়! তাই আদিম প্রকৃতির কাছাকাছি এলেই সেটা সেই ‘মহিষকুড়ার উপকথা’-র মহিষের মতো ‘আঁ আঁ র’ করে ওঠে চেতনে বা অবচেতনে। আর তাই এতো সহজেই প্রায় অপরিচিত চারজন পুরুষ, দুটি নারীর সাথে অকপটে মিশে যাচ্ছে, কোথাওতো সভ্য সমাজের রীতিনীতি মাঝে দেওয়াল তুলছে না। অরণ্যের গভীরতায় আর বাধাহীনতায় অসীম দ্বিধাহীনভাবে অপর্নাকে বলে ফেলছে মনের সবটা, আবার জয়ার কোলে নির্বিঘ্নে মাথা রাখছে শেখর। এই দৃশ্যগুলিকি সত্যি সম্ভব হতো কোনো ঝা-চকচকে অভিজাত শহুরে বাড়িতে? এই খোলসটা ওরা হারিয়েছে বলেই সেই মূহুর্তে শহুরে সভ্যতা, শিক্ষা, রীতিনীতি নিতান্ত অবাস্তব-অপ্রাসঙ্গিক, সেই সময়ের অনুভূতি গুলিই চিরন্তন সত্য। যেমন সত্য অরণ্য-প্রকৃতি।
            তাই বাবার প্রতিপত্তির জোরে যে অসীম খুন করেও রেহাই পায়, সেই অসীমই আবার ভালোবাসার বীজ অনুভব করে অন্তরে-
     “এখন হয়তো খুঁজে পাব না। কিন্তু সেটা আছে বিশ্বাস করো-”(৪)
পাতা ছাড়া শুধু ফুল নিয়ে সত্যি ফুল গাছটা আছে। যদিও আমার মনে হয়েছে উপন্যাসের অসীমের মনের তাগিদের থেকে পাওয়ার তাগিদ অনেক বেশি, কিছু দিয়ে যেন কিছ ভুলতে চাইছে। চলচিত্রের শেষাংশে অসীম (অভিনয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) অনেকটা সংযত, অনেকটা পরিপক্ক। তবে এই প্রসঙ্গে শেখরের কথাও উঠে আসে, এই সাদা গন্ধযুক্ত ফুল কি তাকে স্পর্শ করে নি? অরণ্যের গভীরতা কি তার মনের গভীরতায় পৌছোয়নি? যদি এই ব্যাপ্তিতে সে ধরা না দিত তাহলে জয়ার কোলে শুয়ে এতটা সাবলীল সে হতে পারতো না।
            চলচিত্রের শেষাংশে জয়া (কাবেরী বসু) ও সঞ্জয়ের (শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়)কফিতে আমন্ত্রন দৃশ্য অনবদ্য আমার কাছে। (ছবিতে শেখরের বদলে সঞ্জয় এসেছে জয়ার বিপরীতে)। জয়ার স্বামীর প্রতি রাগ, ঘৃণা আর তার সঙ্গে লিবিডো কেন্দ্রিক জর্জরতা সরাসরি আঘাত করেছে সঞ্জয়কে। আদিবাসিদের গয়না জয়া শুধু গায়েই পরেনি, এই গয়না গুলি যেন তার প্রবৃত্তি হয়ে জড়িয়েছে পুরো সত্তায়। আদিবাসিদের গয়না আদিম প্রবৃত্তি কোথায় যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে। যদিও উপন্যাসের শেখরের মতো সঞ্জয়ও এখানে Id-এর চাওয়াকে সরিয়ে Ego–এর মুখোমুখি। জয়া চরিত্রের রং অনেক বেশী গাঢ় উপন্যাসের তুলোনায় চলচিত্রে।
             জীবন সংগ্রামে বিপর্যস্ত চারজন যুবকের যখন কংক্রিট আর মানুষের ভীরে নিজেকে আলাদা করে মানুষ বলে চিহ্নিত করা দায় হয়ে উঠেছে, তখন অরণ্য-অরণ্যবাসি মানুষ আদিম ঠিকানা খুঁজে দেয় তাদের। তাই সহজেই রবি বলতে পারে-“আয় সঞ্জয় তোতে আমাতে নাচি”(৫) বা পোষাক খুলে সভ্য সমাজের সামান্যতম বন্ধনও ছিঁড়ে ফেলে এই নগ্ন দৌড় যেন সভ্য আমি থেকে আদিম আমির দিকে যাত্রা, যেখানে শরীর আর আত্মা একাকার হয়ে গেছে। ক্যামেরার লংগ ও ওয়াইড লেন্সে ধরা পড়েছে ধু ধু অরণ্যে মনুষ্যত্বের প্রশ্ন। টুবলু (জয়ার ছেলে) তুমি কে? জানতে চাওয়াতে শেখর উত্তর দিচ্ছে – “আমরা তো মানুষ”(৬) উত্তর কি শুধু টুবলু কেই দেওয়া, নাকি পরিচালক অস্তিত্বই হারাতে বসা ‘অতি সভ্য’ মানুষে দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন এ প্রশ্ন। রবির মতো সুপুরুষ চরিত্র আশ্রয় খোঁজে দুলির মতো সামান্য সাঁওতাল রমনীর কাছে। কারণ দুলিরা আর যাই হোক তপতীদের মতো মিথ্যা, কৃত্রিমতার আবরণে নিজেদের ঢেকে রাখেনা। সভ্য সমাজের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হচ্ছে এই মুখোশ।
           চলচিত্রে হরি(রবির পরিবর্তে) তার প্রাক্তন প্রেমিকার(অপর্না সেন)উইগস্ টেনে খুলে দিচ্ছে এই দৃশ্যটি যেন এই ব্যঞ্জনাই ধরতে চাইছে। আর সেখানে দুলিরা অকপট, আবরণহীন মন নিয়ে দাড়িয়ে।
           যে রবি এতোদিন তপতীর জন্য শরীরের সুচিতা বজায় চলেছে আজ দুলির সাথে মিলিত হয়ে মনের সুচিতা খুঁজে পাচ্ছে। দুলিও ‘ভালো বাবু’-র কাছে টাকা যেমন পেয়েছে, তার সাথে সবটা দিয়ে আদরও পেয়েছে, আর চাই বা কি! সময়ের বা সম্পর্কের খাঁচা দুলিদের প্রয়োজন নেই, সেই মূহুর্তে যেটা সত্যি সেটাই সবচেয়ে বড়ো সত্যি; তাই সহজেই দুজনেই অরণ্যের গভীরতার মতো মনের গভীরতম তলে ডুবে যেতে পেরেছে।চলচিত্র বা উপন্যাসে দুই ক্ষেত্রেই ধরা পরে শুধু শরীর নয় এর বাইরেও একটা দাবি রাখে রবি বা হরি দুলির প্রতি, তাই তাকে আলাদা করে পেতে চায়। উপন্যাসে যে রবি কোলকাতায় নিজেও ফিরতে চায় না দুলিকেও নিয়ে যাবে না। অরণ্যেই আদিম সত্তা খুঁজে পেয়েছে সে। যেখানে চলচিত্রে ক্যামেরার একেবারে ক্লোস অ্যাঙ্গেলে ধরা দিয়েছে হরির সরাসরি প্রস্তাব – তুই কোলকাতায় যাবি? এই প্রস্তাব ‘পোষ্টমাষ্টার’ গল্পের প্রস্তাব নয়, এর দাবি অনেক, অনেক বেশি স্পষ্ট। আর এই কারণেই উপন্যাসের রবি সত্তা ও চলচিত্রের হরি সত্তা আলাদা হয়েছে সূক্ষ্ম পার্থক্যে।
           পুরো ঘটনা অরণ্যে প্রবেশের থেকে শুরু হয়ে অরণ্যেই শেষ হলেও মাঝে মাঝে চরিত্র গুলির চিন্তার জালে ধরা দিয়েছে শহুরে মানুষের নির্লজ্জ মুখ। কখনো অসীমের বাবার টাকার জোড়ে ছেলেকে বাঁচিয়ে নির্দোষ গাড়ির ড্রাইভারকে জেলে যেতে হয়েছে, আবার কখনো সঞ্জয়ের চোখে ধরা পড়েছে ম্যানেজার মি. বিশ্বাসের নোংরা চরিত্র। কিছু করতে না পারা মধ্যবিত্ত সঞ্জয়ের ইচ্ছা হয়-
         “চারিদিকে থু থু করে থুথু ছেটায়।”(৭)
পেশাগত জীবন, পারিবারিক জীবনের বাইরেও আরও একটা সত্তা থাকে যে অনুরাধাকে দেখেই সুখি হয়, এইটুকুই আগলে রাখতে চায়। যদিও ভালোবাসাটা জোড়ের সাথে জাহির না করাটা তথাকথিত পুরুষোচিত নয়। তাই এই না পারা গুলোকে নিয়ে সঞ্জয় অরণ্যের গভীরতায় হারাতে চাইছে। লেবার ওয়েলফেয়ার অফিসার সঞ্জয় ব্যানার্জি তাই অবচেতনের তাগিদেই ছুটে যাচ্ছে দরিদ্র চৌকিদার রতিলালের স্ত্রীর অসুখে, আবার কখনও রতিলালের চাকরি বাঁচাতে কনজারভেটর ও ডি. এফ. ও.–এর গাড়ির দিকে, এই করতে পারার মধ্যেই বোধ হয় Satisfaction খুঁজছে সঞ্জয়।
             চলচিত্রের ক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায় সরকারি অফিসারদের ব্রিটিশ মেজাজটাকে এড়িয়ে গিয়েছেন। সঞ্জয়ের চরিত্রের এই দিকটাও তাই অধরাই থাকলো। যদিও আজও ধলভূম বা পালামৌ যেখানেই হোক না কেনো এখনও যে সভ্য মানুষকে(অবশ্যই তথাকথিত সভ্য) বাবু বলতেই তারা অভ্যস্থ এবং আমরা যারা ওই বিশেষ সভ্য শ্রেণীর মানুষ ওই ডাক শুনে সভ্য আত্মা বেশ পরিতৃপ্তিই পায়। তাই রবিরা বা চলচিত্রের হরিরা বিনাদোষে লখাদের গায়ে হাত তুলতে দ্বিতীয়বার ভাবেনা। বোধহয় সভ্য মানুষ ভুলে যায় আত্মসম্মান ওদেরও আছে, জোড় ওদেরও আছে। তাই-’একদিন মার খেতেই হতো…’(৮)-রবিকে।
             আদিমতা যেমন মজ্জায় রয়ে গেছে, আমাদের সভ্যতার চিহ্ন গুলিও কখনই একেবারে চলে যায় না, তাই রবি যখন চূড়ান্ত মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় অবলম্বণ খোঁজে অপর্ণা কিন্তু দ্বিধাগ্রস্থ হয়, এটা তো স্বাভাবিক একটি শিক্ষিত বুদ্ধিমতি মেয়ের পক্ষে, অথচ দুলির কাছে এবিষয়ে দ্বিধার কোনো প্রশ্নই নেই কারণ আদিমতার আসল রস তার শিরায় শিরায়। অরণ্য আমাদেরকে ক্ষনিকের জন্য আদিম করে তুললেও সভ্য চেতনাকে মেরে ফেলা সম্ভবই নয়। তাই দুলি যা দিতে পারে অপর্ণা তা পারে না। যদিও রবির ওই দিনের ডাকেই সে সত্যিকারের চিরকালের সেই ডাক শুনতে পেরেছে বলেই হয়তো রবির কাছে নিজেই ছুটে যাচ্ছে।
              উপন্যাস শেষের এই জটিলতাকে চলচিত্রে পরিচালক ধরলেন না, বরং ইঙ্গিত দিলেন অসীম ও অপর্ণার প্রেমের সূচনার। বিশেষভাবে ‘মেমোরি গেম’ দৃশ্যে প্রত্যেকের মানসিক অবস্থা জড়িয়ে আছে। আমার মনে হয় উপন্যাসের শেষ অংশে অপর্ণাকে যেভাবে আঁকা হয়েছে, সেখান থেকে চলচিত্রের অপর্ণা চরিত্রের গাঢ়তা একধাপ এগিয়ে। ক্যামেরার ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে অসীম-অপর্ণা যেখানে মধ্যবৃ্ত্তের চোখকে আরাম দেওয়া টিপিকাল সম্পর্ক, সেখানে সঞ্জয়-জয়ার সম্পর্কটা লিবিডের ঘেরাটোপেই আটকে রইলো, আবার হরি-দুলির সম্পর্কটা শরীর স্তর পেরিয়ে মনকে খুঁজে পেল নিজেদের নতুন সত্তায়। তিনটে সম্পর্ক পাশাপাশি রেখে মন-সময়-পরিস্থিতি ছকের মধ্যদিয়ে নতুন নতুন রং ধরা দিল।
             উপন্যাস শেষ হচ্ছে সম্পর্কের অনিশ্চয়তায়, চলচিত্র সেখানে ইতিবাচক সমাপ্তির দিকে এগিয়েছে। সত্যজিৎ রায়ের হাতে সৃষ্টি বলেই হয়তো উপন্যাস পড়ার সময় উপন্যাসিক ক্রমশ যে মনোভাব গড়ে তুলেছিলেন তা চলচিত্র দেখার সময় ধাক্কা খায়নি। কাহিনীর মজ্জাগত পরিবর্তন না হলেও চরিত্র গুলিকে নিজের মত করে সাজিয়েছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এই চলচিত্রের কাহিনী তাঁর উপন্যাস থেকে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন-
       “এটা একটা আমার জীবনের স্মরণীয় ঘটনা ।”(৯)
শুধু চলচিত্র নয় উপন্যাসের বর্ণনানৈপুন্য, বাস্তব অনুসঙ্গ আমাদের সম্মোহিত করেছে। ‘ব্যাখ্যাহীন অস্থিরতা’-র মধ্যে চরিত্র গুলি অন্তর্মুখি যাত্রায় চিরন্তন সত্তার সন্ধান পেয়েছে। অরণ্যের আদিমতার মধ্য দিয়ে যে যাত্রার শুরু আঁকা বাঁকা পথ দিয়ে শেষে সভ্যতার সড়কে উঠেছে।




উৎস নির্দেশ :-
১) বেলাল চৌধুরি ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাক্ষাৎকার । https://youtu.be/zs3XVcbrodA
২) পূর্বোক্ত
৩) ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ চলচিত্র। ১৯৭০।  https://youtu.be/Z6L59UbGigc
৪) সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। উপন্যাস সমগ্র-১। আনন্দ পাবলিশার্স। কলকাতা-১ লা মে ২০১৭। পৃ-৩৫৯।
৫) পূর্বোক্ত। পৃ-৩১৮।
৬) ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ চলচিত্র। ১৯৭০।  https://youtu.be/Z6L59UbGigc
৭)  সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। উপন্যাস সমগ্র-১। আনন্দ পাবলিশার্স। কলকাতা-১ লা মে। পৃ-৩২৯।
৮) পূর্বোক্ত। পৃ-৩৭৬।
৯) বেলাল চৌধুরি ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাক্ষাৎকার। https://youtu.be/zs3XVcbrodA


গ্রন্থঋণ
১) সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। উপন্যাস সমগ্র ১। আনন্দ পাবলিশার্স। সপ্তম মুদ্রণ।কলকাতা মে ২০১৭।
২) শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। বঙ্গসাহিত্যে উপন্যাসের ধারা। মডার্ন বুক এজেন্সী। কলকাতা। বইমেলা ২০১৪।
৩) সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা উপন্যাসের কালান্তর। দেজ। কলকাতা। নভেম্বর ২০১৬।
৪) কুন্তল চট্টোপাধ্যায়। সাহিত্যের রূপরীতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ। রত্নবলী। কলকাতা ২০০৪
৫) ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ চলচিত্র - https://youtu.be/Z6L59UbGigc
৬) বেলাল চৌধুরি ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাক্ষাতকার -https://youtu.be/zs3XVcbrodA
৭) বিবিসি লিকেস্টার, রিভিউ - http://www.bbc.co.uk/leicester/films/2002/07/26/aranyer_din_ratri_1969_review.shtml



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন