শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস


মণিমেখলা হাঁফাতে হাঁফাতে ফ্লাইওভার পার হয়।বরাবর সিঁড়ি দিয়ে উঠতে আর নর্থবেঙ্গল এক্সপ্রেসের দাঁড়িয়ে থাকা তিননম্বর অসহ‍্য লাগে।কেনরে বাবা, একদিন ওকি এক নম্বরে দাঁড়াতে নেই! এই দৌড়ে দৌড়েই জীবন শেষ।আজ অবশ‍্য পিনু সঙ্গে আছে।ওর ই টোটো সেই চার কিলোমিটার পেরোনো রাস্তা উজিয়ে নিয়ে যায় নিয়ে আসে।যখন ছোটে ও মাথা ঠান্ডা রাখে বেশ।এবার মণিমেখলার ফ্ল‍্যাটের উল্টোদিকের দোকানদারের ছেলে ছেলের বৌকে তুলেছে পিনু ওর সাথে।না, তাতে মণিমেখলা রেগে যায়নি।বিরক্ত ও হয়নি।পিনুই একটু কিন্তু কিন্তু করে প্রস্তাবটা এনেছিল।-ম‍্যাডাম,আজ না হরিদার ছেলে আর ছেলের বৌ আমার টোটোতে যাবে বলেছে....নেব?...নাও।দেখ টাইম যেন ফস্কায়না।এখান থেকে আড়াইটেয় বেরোতেই হবে।

হুঁ।একেবারে দুটো বেজে পঁচিশে রেডি সে।রেডি হ ওয়ার পর এক মিনিট ও অপেক্ষা করতে ইচ্ছে হয়না।ঘরের সব কিছু পরিষ্কার করে আর ও একবার।জানলা দরজা ঠিকঠাক লাগানো হয়েছে কিনা দেখে নেয়।আর ফ‍্যানতো চলছেই।পিনু ফোন না করা পর্যন্ত ওটা চলতেই থাকবে।শেষমুহূর্তে ফ‍্যান না নিভিয়েও কতবার বেরিয়ে পড়েছে।গোটা সাতদিন ধরে ঘুরেছে ফ‍্যান একা একাই।বিল বেড়ে আর ও পঞ্চাশ।তাই এবার এলার্ট।
পিনুর জন‍্য আর অপেক্ষা না।ও ই ফোন করে।-কিরে,রেডি? -আচ্ছা ম‍্যাডাম,আপনাকে আগে তুলি।দাঁড়ান।বারান্দায় ব‍্যাগ রাখেন, আমিই আনব।
মুহূর্তে টোটোটা নীচে দাঁড়ায়।বোঝে সে শব্দেই।আর সিঁড়ি দিয়ে নামার টুকরো জালিকা সব বলে দেয়।দুদ্দাড় দোতলায় ওঠে পিনু।দুহাতে ব‍্যাগ তোলে।মণিমেখলাও দরজার হ‍্যাজবোল্ড টেনে তালা দেয়। ঠিকঠাক ফ‍্যান বন্ধ করেছে এবার।বারকয়েক মনে করে কিছু ফেলেছে কিনা,ঠিকঠাক সব।

পিনু গাড়ীটা ঘুরিয়ে সোজা তোর্সার সেই পুরোনো বাঁধ রাস্তা ধরে এগিয়ে যায়।কে বলবে তোর্সার জল আগে ছিল থৈ থৈ স্রোত।এখন নদী মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে।বাঁধ রাস্তা কালো পিচঢালা ঝকঝকে।সোজা স্টেশনমুখী এ রাস্তাটা বেশ প্রিয় মেখলার।পৌঁছে গেল তিনটের আগেই।তিনটে পঁচিশ ডিপারচার টাইম।কলকাতা আর কলকাতা।প্রত‍্যেক মাসে যাচ্ছে আসছে।আচ্ছা যদি বাড়ীটা না থাকত তো এমন কিছু হাতি ঘোড়া হতোনা।ভবনগুলোতো আছেই। চিন্তা কি!

হরিদার ছেলে বৌ নতুন বিয়ে। বেচারীরা মণিমেখলা আছে বলে একটিও কথা বলছেনা।আর সেও এক বিশাল রকম গম্ভীর মুখ করে বসে র ইল।এখন অযথা আলাপ করতে ভালো লাগছেনা।আসলে কর্ম বদল,ব‍্যক্তিত্ত্ব বদল।এখন কেমন কথা কমে গেছে।এমনিই বুঝি হয়।তবে হরিদার জামাই কয়েকবার কুশল প্রশ্ন করেছে,মেখলা উত্তর দিয়েছে। কিন্তু দায়সারা।
হঠাৎ বৃষ্টি।ভিজে ভিজেই পিনু ওকে ফ্লাইওভার দিয়ে লাগেজ উঠিয়ে বসিয়ে এল সিটে।এবার মণিমেখলা আর পারেনা।বেশ কিছুদিনের চিন্তাটা বলেই ফেলে।
-কিরে পিনু,এত মুটিয়ে যাচ্ছিস কেনরে?এরপরতো রোগ টোগ ধরবে অকালে।ঠিক তাই। অল্পবয়সী মানে ত্রিশ হয়েছে সবে এমন ছেলের বাগানো ভুঁড়ি,বেড়েই চলেছে, এতো চিন্তার কথা।চোখ মুখগুলোও ফুলো ফুলো।আসলে এই পিনুর অল্পবয়সে সংসারী হয়ে পড়া,বাবা বনে যাওয়া এসব ভাল লাগেনি মেখলার।খবর কাগজগুলো গুছিয়ে নিয়ে গেল যেদিন, পিনু মনের কথাগুলো বলেছিল একটু একটু।

'মোরে বাপ একবার মাকে বিয়া করছে,আবার ওই দেশে ফিরা আবার এক সংসার পাতছে,চ ইল‍্যা গেছে কবে,আমি তো দেখিইনাই।...ঐখানেই অসুখ হ ইছে।ম ইরছে ঐখানে। মা আমারে নিয়া খুব কষ্ট ক ইরছে দিদি।আর মাও আমারে যাওনের আগে আমারে বিয়া দিবেই।দিছে।বাচ্চা কাচ্চাও হ ইছে। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে মণিমেখলা, কটা বাচ্চা?আঙুল দিয়ে দেখায় "দুই"।...হুঁ বাবা,আর যেন না হয়।তাহলে মরেছ।-হ‍্যাঁ জানিতো দিদি।

আজকাল মণিমেখলা যেন জ্ঞান দেওয়ার রাজা।....এখন বসে আছে ট্রেনের সিটে।পিনুকে টাকাটা মিটিয়ে দিয়েই এক্সট্রা টাকা দিয়ে রাতের জন‍্য ধোসা আনিয়ে নেয়।বলে রাখে,ওরে পিনু,ফিরব যেদিন,তোকে ফোন করব।স্টেশনে চলে আসবি গাড়ী নিয়ে।বশংবদের মত ঘাড় নাড়ে।ও নেমে যেতেই মেখলা ভাবতে বসে 'ও কি এ্যালকোহলিক!কেমন থ‍্যাসথেসে হয়ে পড়ছে।এ ভাবনা খুব স্বাভাবিক ভাবেই এসে যায়।অল্পেই মানুষকে বিশ্বাস করা,ভালোবেসে কাছ থেকে দেখা আর তার ভিতর পর্যন্ত পড়ে ফেলার ক্ষমতা জন্মে যাচ্ছে কেমন করে যেন!এসব অভিজ্ঞতার জমানো ফল।না কি ওদের ভালবাসার ফল ও জানেনা।।
পিনু নেমে চলে যাওয়ার দশ মিনিটের মধ‍্যেই ট্রেন চলতে শুরু করল।মোটামুটি ফাঁকাই কামরা।উল্টোদিকে সাইড সিটে,জানলার কাছে এক ভদ্রলোক।বোধহয় ডেইলি প‍্যাসেঞ্জার।এসি কামরায় ব‍্যাগ মাথার নীচে নিয়ে ভঁসভসিয়ে ঘুমোচ্ছে অনায়াসে‌।বাদাম ওলা দাঁড়িয়ে আছে।দশটাকার বাদাম নেয় মণিমেখলা।টাকা বের করতে যাবে...ইস্।দেখতো ভাই ওটা ছারপোকা কিনা! মেখলার সিটের পাশের জানলার কাছ দিয়ে ঘোরাফেরা করছে ছোট্ট পোকা‌মনে মনে চায়না মেখলা ওটা ছারপোকা হোক। কিন্তু দেখতে সেরকম ই তো!

বাদাম ওলা অবলীলায় বলে দেয় হ‍্যাঁতো ওটা ছারপোকাই।ট্রনে যে কত কিছুই আছে।...ইঁদুর ও।তাই বলে এসি কামরায়!ঘিনঘিনে এক অনুভূতি ফিরে এল মেখলার বহু বছর পর।সেই কলকাতা হোটেলে থাকার সময়।...বাদামের প‍্যাকেট একপাশে রেখে খবর কাগজ গুটিয়ে ঝাপট লাগায়।পোকাটা অদৃশ‍্য হয়।

*      *       *
মন হঠাৎ ই পিছিয়ে গেল প্রায় চোদ বছর।...একরাশ ছারপোকা লাইন দিয়ে রাতের অন্ধকারে।বিছানায় খুব সস্তা দামের অথচ মোটামুটি পরিচ্ছন্ন একখানা চাদর।সিঙ্গল  একখানা রুম।মেরেকেটে খুব চেষ্টা করে শিয়ালদা চত্বরে পেয়ে গিয়েছিল সে।উঠোন অলা পুরোনো আমলের তিনতলা।একখানা তুলসী বেদীও আছে।মালিক জানিয়েছেন ওখানে সন্ধেতে প্রদীপ ও জ্বালানো হয়।ছোট্ট ক্ষুদে বয় অলক ওই জ্বালায় আপাতত ।মেদিনীপুরের ছেলে।আর মালিকের খোলতাই চেহারার আশপাশ থেকে ঠাকুর দেবতার বাঁধানো ছবি অগুন্তি ঝুলে আছে।মণিমেখলা প্রথম প্রথম চোখ বুজে কপালে হাত ঠেকিয়েছে।এখন মাস কয়েকে অভ‍্যেস হয়ে গেছে।এখন মালিকের কাছে গেলেই টাকার হিসেব ছাড়া কিচ্ছুনা।শিয়ালদা চত্বরে নিকেতন আর সাবিত্রীলজ মুখোমুখি।সাবিত্রী লজেই প্রথমদিন এসে উঠেছিল লাগেজপত্র সহ।সঙ্গে ব ই খাতাও।আসলে গেণুদির ফ্ল‍্যাটটা দক্ষিণে।সেটাও বড় কথা নয়। গেণুদি মেখলাকে থাকতে দিয়েছেন বলে যত্র তত্র বলে বেড়াতে শুরু করেছিল,মেখলার সামনেই।

এমনকি,ক্লাসঘরের অফ পিরিয়ডে সকলে যখন স্টাফ নোটেশন কিংবা একটু আগে শিখিয়ে যাওয়া গানের স্বরলিপি মেলাতে ব‍্যস্ত,গেনু দি তার বয়সীদের মধ‍্যমণি হয়ে গুলতানি জুড়লেন,কি আর করব বল্, মেখলা যা সিরিয়াস,ওতো পুরো ক্লাস না করে যাবেইনা,কিন্তু আমার আবার সাড়ে তিনটের মেট্রো ধরতেই হবে।দাদা বৌদি আসবে।কি করব,দায়িত্ব নিয়েছি যখন,মেখলাকে রেখে তো যেতে পারিনা।খট্ করে  কানে কথাটা তীরের মত ছুটে এল।ব‍্যাপার কি!মেখলাতো নিজে থেকে গেনুদির ফ্ল‍্যাটে থাকতে যায়নি।সে নিজে চাকরী করে।নিজের ইচ্ছেয় জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রভারতীর গানের কোর্স করতে এসেছে।গেনুদি একা থাকবে বলে নিজেই মেখলাকে তার ফ্ল‍্যাটে থাকার প্রস্তাব দেয়,তুই আমার সঙ্গে থাকবি।মিনতি একেবারে।তারপর নোট পত্র যা হবে দুজন মিলে করবে...এসব‌তখনতো বোঝেনি গেনুদির মতলব।পড়াশুনোর থিওরি পার্ট টোটাল মেখলাকে দিয়ে সেরে নিতে চেয়েছিল গেনু।

সেদিন কথাগুলো কানে যেতেই ছুটিতে বাড়ী ফিরেই সিদ্ধান্ত,না।গেনুদির ওখানে আর নয়। শিয়ালদাই ওর পছন্দের জায়গা আর ওখানে থেকে সেন্ট্রাল হয়ে রবীন্দ্রভারতী পৌঁছতে বেশীক্ষণ লাগার কথা নয়। জোড়াসাঁকোঠাকুর বাড়ীতেই গানের ক্লাস।নিয়মিত হৎ অন‍্যান‍্য নাটক বা আর্ট সব ই ওখানে হয়।ব‍্যস্ তারপর থেকে স্বাবলম্বী মেখলা।

সাবিত্রী লজে কদিন থাকার পর দেখা গেল এভাবে এত টাকা প্রতিদিন দিয়ে থাকলে না খেয়ে থাকতে হবে মেখলাকে,সুতরাং উল্টো দিকে নিকেতন অগত‍্যা।রেডি হয়ে কলেজের পনেরো মিনিট আগেই লাইন হোটেলে গরম ভাত মাছ ভাজা ডাল লেবু লঙ্কা অমৃতে্য মত খেয়ে র ওনা।কিন্তু ফিরে আসার পর ই যত যন্ত্রণা।একা একা সন্ধের স্টেশন চত্বরে ঘোরাফেরা,বাইরে চা খেয়ে ঢুকে পড়া।আর কমন বাথরুম,মেখলা বলে ব‍্যবহার করেছে,অন‍্য কেউই বোধহয় পারতনা।কিন্তু ঐযে কোর্স কমপ্লিট করে পড়াশুনো চালিয়ে যেতেই হবে।বাড়ীতেও 'সারাজীবনের ছাত্রী"তকমা পড়ে গেছে।চাকরীতো করোই বাবা,নিশ্চিন্তি নেই...এই এমিউজ এ হবে কি? ইনক্রিমেন্ট হবে! এ খোঁচাগুলো খেলে প্রথম প্রথম ক্ষত বড় প্রবল হত।কান্নাও বুজিয়ে দিত গলা।কিন্তু এখন হয়না।হারমোনিয়াম সহ নিকেতনে যখন ঢুকল এসে মণিমেখলা খুব সাধারণ নীচের তলায় একঘরে,ম‍্যানেজার যতটা সম্ভব চেষ্টা করল পরিচ্ছন্ন করে ওষুধ পত্র দিয়ে ঘর পরিষ্কার রাখার।

এই রাতের অন্ধকারে যতক্ষণ বিছানায় না যাবে ঠিক আছে।কিন্তু নাইট ল‍্যাম্প জ্বালিয়ে যে মুহূর্তে বালিশে মাথা,চোখ বুজেছে কি বোজেনি মুহূর্তে সারি সারি রেলের কামরার ক্ষুদে সারি চলতে শুরু করে বিছানার উপর দিয়ে মাথার নীচে বালিশের কাছাকাছি মেখলাকে ছুঁয়ে ঐ জীবন্ত কালো লাইনের সারি। সকালবেলা সব পেট মোটা হয়ে টুপুস।প্রথম যেদিন দেখল মেখলা বিড়বিড়ে পোকাগুলোকে শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল।ঘুম মাথায় উঠল।এরপর প্রতিরাতে।অত রাতে সিঁড়ির নীচে থেকে অলক,রাম ওদের দুটিকে ঘুম থেকে জাগিয়ে আলো জ্বালতেই ভোঁ ভাঁ।কিছুই নেই। বহু ওষুধ,কেরোসিন তেল,সব চলল,এবার ওষুধ স্প্রে করার পর খুঁত খুঁত মন নিয়ে যেমনি বালিশে মাথা অন্ধকার হয়েছে কি,আবার বিড় বিড় পোকার মিছিল।

এই চলতে চলতে মালিকের কাছে ফোন,দোতলায় শিফ্ট, হলে কি হবে! দোতলার আপাতদৃষ্টিতে স্বচ্ছ পরিচ্ছন্ন বিছানায় একটু নিশ্চিন্তে চোখ বুজেছে কি!খুঁতখুঁতুনি তো লেগেই আছে।হ‍্যাঁ ঠিক।এখানে আবার লাইনটা বিরাট দেয়াল থেকে শুরু হয়ে বিছানা জুড়ে চলছে তো চলছেই।আঁতকে উঠেছিল মেখলা।রাতে ঘুম না হলে কি করে হবে!পরদিন ক্লাস করাই চাপ।ঘুম ই ভাঙবেনা।দিনেরবেলা এরা অদ্ভুতভাবেই অপসৃয়মান।ঐ ছারপোকা চেনা,ওদের ভয় পেতে শুরু করা।ঐ  রক্তবীজের বংশধর যখন যেখানে বাসা বাঁধে সহজে সরেনা।ওর ই মধ‍্যে কি করে নিকেতনে কাটিয়েছে সে সেসব এখন গল্পকথা।তবে ঐ যে মালিক,বয়দের একটু আনুকূল‍্য সে সবতো জীবনের ক্ষতগুলো ভরিয়ে তুলেছে।শেষ পরীক্ষার পর যখন বাড়ী ফিরছে ঠিক তার একমাস আগে ফাইনাল।কয়েকটা দিনের ছুটিতে বাড়ী ফেরা।সঙ্গে দু একবার কলেজেও যাতায়াত।ওটা আছে বলেই না শক্ত বনিয়াদ।এত আস্ফালন নয়তো হয়েছিল আরকি!এসব গানে গানে ডুবে থাকা। সেই তখন থেকেই তো একলার সিদ্ধান্ত।কলেজের চাকরীটা যখন সি এস সির পাট চুকিয়ে হয়ে গেল মা শুধু একবার বলেছিলেন,মেখলা মা,গানটা বাদ দিসনা।তখন ই মার অসুস্থতা চরম।নিজের অদম‍্য ইচ্ছেছিল গানের,সেটা হয়নি,হয়না যৌথ বাড়ীর সাত বধূর মধ‍্যে একজন যদি সবরকম চর্চা করে,রাখতে চায় তাকে বহু কথার খোঁচা সহ‍্য করতে হয়।সুতরাং লবডঙ্কা‌।ইচ্ছেটা বেশ ভাল রকম ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিল মা।

মেখলার এ মিউজে ভর্তি আর মায়ের বিছানা নেওয়া প্রায় একসাথে।কালেভদ্রে এক আধবার দেখতে যাওয়া।সংসার আর চাকরী সামলে।ভালো দেখেনি কোনদিন।বাবা আগেই চলে গেছেন সুতরাং দুর্ভাগা মার সন্তান থাকতেও একলা হয়ে যাওয়া,বেডশোর হ ওয়া,এসব মেখলা শুধু দেখেছে,প্রতিকার করতে পারেনি।এতদিন পর ও নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।দোষারোপ করার প্রবণতা নেই আর।ঠিক যেদিন ফাইনাল পরীক্ষার জন‍্য ট্রেনে চাপবে,ভোরবেলা সহোদর অনুজের ফোন,মা চলে গেলেন।কি করবে এখন!চারমাস আগে দেখে আসা মানুষটা তখন ই মৃত‍্যুপথযাত্রী।অনেকক্ষণ থমকে থাকা।এ বাড়ীর কেউ সু পরামর্শ দেবেনা মেখলা জানে।মুহূর্তে  সমীনণ ব‍্যনার্জিকে ফোন করে সব শুনছ একটি কথাই বলেন উনি,যাঁর ইচ্ছেয় তোমার রবীন্দ্রভারতীতে আসা,তাঁর ইচ্ছের মূল‍্য যদি দিতেই হয়,তোমার পরীক্ষাটাই আগে দরকার।এখন শ্মশান যাত্রী হলে এ কোর্স ও তোমার আর হবেনা।ফ‍্যামিলিম‍্যান তুমি।....মুহূর্তে সিদ্ধান্ত।না,বাড়ী ফেরা নয়।কলকাতার ট্রেন ই ধরবে।মেখলার বর অবীন ও যে খুব সন্তুষ্ট হয়েছিল এ সিদ্ধান্তে তা নয়।কারণ,সব দায়িত্ব এসেতো পড়ল তার ই।ওখানে তাকেইতো উপস্থিত থাকতে হবে।

*       *      *
সে সব এখন স্বপ্ন।না,ট্রেনের ক্ষুদে পোকাগুলো আর বেরোয়নি।কিন্তু নিকেতনের ছারপোকারা তা রাতের ঘুম  কেড়ে নিয়েছিল।
কবের কথা সব,পনের ষোল বছর পার।নদীর মত ই গতি মুখ ও বদল হয়।কতবার জায়গা বদলের ইতিহাস।সন্ততির জন‍্য ও পিছন ফেরা নেই। সে একক।মেখলা এক এক সময় নিজেকে  প্রশ্নবাণে ঝাঁঝরা করে দেয় একা...একান্ত অবসরে।তাই অবসর চায়না।আনেনা।চোখ বুজে আগামীর স্বপ্ন দেখে।সে আগামীর বীজ বুনে দিতে চায় ছাত্র ছাত্রীর মধ‍্যেও।আর চলতি পথে এই পিনুর মত ভাইদের যদি না পেত কি করে এগোত!পিনুতো শুধু যাতায়াত নয়,গ‍্যাস ফুরোলে বদলে আনা,কুরিয়ার করা,পোষ্ট অফিস যাওয়া,,ওষুধ এনে দেওয়া,মাঝে মধ‍্যে বাজার এনে দেওয়াও।কলেজেও বহু জটিল অন লাইনের কাজের ও সঙ্গী আছে মেখলার।পরমেশ।ওর কাছে হাতে কলমে কত কিছু শেখে।কতবার যন্ত্র হ‍্যাং হয়ে যায়,সতৃষ্ণ চোখে ও নিজের সবুজ কালির ডায়রীটার দিকে তাকায়।মধ‍্যপথে দাঁড়াতে সে জানেনা।পথের মধ‍্যিখানে ঈশ্বরের দেখা পায়।পরমেশ সারিয়ে তোলে যন্ত্র।এগোতে হবেই....সামনে কিসের আলো সেত পরম শক্তি।
তন্দ্রা কেটে যায়। কখন ভোরের আলো।শিয়ালদা ভোরের হৈ চৈ।দুটো ব‍্যাগ নিয়ে কুলি ছাড়াই বেশ পারে লোকাল ট্রেনে উঠে পড়তে।আসলে ভাঙতে ভাঙতেই নিজেকে গড়ে নেওয়া।অফিস ছোটা,পারমিশন নেওয়া,ডক্টরেটের পেপারস তৈরির,এদেশ,সেদেশ।
 শিয়ালদার অজস্র ভীড়ে বার বার পিলপিলে ছারপোকার লম্বা সারির কথা মনে হয়।সবাই যে যার লক্ষে দৌড়চ্ছে।ঐ স্টেশনের ভিখু আর তার সঙ্গির কোন ডেষ্টিনী নেই।ওরা স্টেশন চত্বরে মাঝবরাবর বসে থাকে।চুলের লালচে জটে অজস্র উকুন।গায়ে প্রস্থ খানিক ময়লা,চোখে পিচুটি ওসব নিয়েও ওরা প্রেম করছে,বাচ্চা নিয়ে ঘুরছে।সব দেখছে মেখলা ।বদলে গেছে চত্বর।ওরা কেন,ওদের মত কাউকে চোখে পড়েনা আর।মণিমেখলা মানুষ খোঁজে,কলকাতাগামী কিংবাশিয়ালদা হয়ে ফেরার সময়,অজস্র স্টেশন,নদী অভিমুখে,স্রোতের কিনারে মানুষ মুখ খোঁজে।আসলে প্রান্ত বয়সে এসে জ্ঞানের ঝুলিতে নতুন মুখ,নতুন প্রসঙ্গ তুলে নিতে নিতে নিজেকেও ছারপোকার দলে মনে হয়।উপকারে না লাগা নিজস্ব ভাবনার এক সর্পিল মানুষ।একা দাঁড়িয়ে থাকা এক অর্ধসত‍্য মানুষ।গাছের মত ক্লোরোফিল নেই,মরা পাঁশুটে চামড়া,রুক্ষ,শুষ্ক উঠে যাওয়া চুল,এদিকে অজস্র স্বপ্ন চোখে নিয়ে ঘুরতে থাকা প্রজন্মের মাঝখানে স্টেশন চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা মেখলা এখন মানুষ খোঁজে,ট্রলি হাতে এ স্টেশন থেকে অন‍্য স্টেশন যাতায়াতের ফাঁকেই আড়চোখে দেখে নেয় অজস্র মিছিল....কোন মুখে লেগে আছে মাকড়সার জাল,সরীসৃপের চেরা জিভ আর উদ‍্যত ইচ্ছের বাতাস...ফুরিয়ে যেতে যেতেও ভালবাসা খোঁজে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন