শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

রেখা রায়



রোজই রাতের ট্রেনে বাড়ি ফেরে বীণা। স্টেশনে ঢোকার মুখে কাঁচা বাজার আর ফুল কেনে। ট্রেনে উঠে মনোমত একটা সিট বাগিয়ে জলের বোতলে আজকের মত শেষ চুমুক দিয়ে মাথাটা এলিয়ে দ‍্যায় দেয়ালে।

শেষ স্টেশনে ট্রেন থামলে আপনিই চোখ খুলে যায়। ব‍্যাগ সামলে নেমে পড়ে অলস পায়ে। এবার রেললাইন পেরিয়ে ঢুকে পড়বে চিত্রিগঞ্জে। ক-দিন ধরেই লক্ষ‍্য করছে পাড়ায় ঢোকার মুখে বটগাছের থানে একটা যুবক দাঁড়িয়ে থাকে সাইকেলে ভর দিয়ে। বীণা এগিয়ে গেলে পিছন পিছন আসে। প্লাস্টিকের পর্দা সরিয়ে স‍্যাঁত স‍্যাঁতে ঘরটাতে ঢুকে গেলেই সে হাওয়া।

কতদিন ভেবেছে…জিজ্ঞেস করবে,"তোমার উদ্দেশ‍্যটি কী বাপু?" কিন্তু ঐ সময় নষ্ট !

এদিকটাতে পোস্টে আলো থাকে না প্রায়ই। অন্ধকারে ভয় ভয় লাগে। এখন কিছুটা নিশ্চিন্ত ওর জন‍্যই। ব‍্যাপারটা গা সওয়া হয়ে গেছে।

আজও বীণা ভাবতে ভাবতে চলেছে…গিয়েই স্টোভে ভাতটা বসিয়ে দেবে আগে। ছেলেমেয়ে দুটো পথ চেয়ে আছে। শাশুড়ী মশারির ভেতর থেকে শুধোবে, "বলি রাজার মেয়ের ফেরার সময় হল এতক্ষণে ? ফুল এনেচো ?"
রোজই একই কথা ! একই উত্তর। তবু দিতেই হয়। মানুষটা আছে বলেই না নিশ্চিন্তে আয়ার কাজটুকুতে মন দিতে পারছে ! শাশুড়ী আর বাচ্চাদের খাইয়ে সাধনের জন‍্য অপেক্ষা। একপেট চুল্লু গিলে হিন্দি গানের সুর তুলে রিক্সো ঠেলতে ঠেলতে তিনি ফিরবেন। সংসার গুছিয়ে গা ধুয়ে পাতলা একটা নাইটি জড়িয়ে শুতে গেলে সাধন সোহাগে কাছে টেনে নেবে। তখন বিড়ির গন্ধ, চুল্লুর গন্ধ আর পুরুষালি গন্ধ মিলেমিশে ঘোর লাগে বীণার।

আজও এদিক ওদিক হবার কথা নয়। খর কানে উৎসুক বীণা। রিক্সোর ক‍্যাঁচ কোঁচ আওয়াজে বোঝে তিনি আসছেন। কতদিন বলেছে একটু তেল দাও, তেল দাও চেনে। কে শোনে কার কথা ! আজ গানের সুর উঠছে না বলে মনটা কু গাইল। ধরেদের কলাবাগানের ধার থেকে বিকট চিৎকার কানে এল, "ফিরিচিস মাগী ! বারোভাতারি, আজ তোর একদিন কী আমার।" পর্দাটা সরিয়ে উঁকি দ‍্যায় বীণা, "চিল্লাচ্ছো কেনো? মুখ খারাপ করোনি। ঘরে আসো।"
…"করবনি মুখ খারাপ ? আজ ঠেকে চুটকেদা জিগাইছিল… বউ ত নূতন নাগর জুট করাইছে রে সাধনা। ন‍্যাশার ট‍্যাকা দ‍্যায়?
কাল থেকেন কুত্থাও যাবি নি হারামজাদী।"
থম মেরে থাকে বীণা। এবার সাধন অসময়ের জন‍্য জমিয়ে রাখা জ্বালনের চ‍্যালা কাঠ একখানা টেনে নিয়ে তেড়ে আসে। টাল সামলাতে পারে না। বেঞ্চে লেগে হুমড়ি খেয়ে পড়ে মেঝেতে। কপাল ফেটে একাকার। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মুখ। চিৎকার করতে করতে বীণা ছুটে বেরিয়ে পড়ে।

হঠাৎই দেখতে পায়…কে যেন সাঁই সাঁই করে গায়ের জোরে সাইকেলের প‍্যাডেল ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে আসছে।
স্বস্তি পায় বীণা…বড় নিশ্চিন্ত এখন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন