শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

অমিতাভ দাস


তখন শেষ রাত । বাইরে কুকুরের ডাক । ঘুম ভেঙে গেল ।উঠে বসলাম । গলাটা শুকিয়ে কাঠ । হাত বাড়িয়ে জলটা নিতে গিয়েই চমকে উঠলাম । একটা ছায়া ছায়া মতোন-- কে যেন বসে আছে সোফার ওপর ? নাইট ল্যাম্পের আলোয় স্পষ্ট দেখছি কেউ বসে আছে ! আমি তাকাতেই সে একটু কেশে উঠল খুক খুক শব্দে । তারপর  বলল , অবাক হবার কিছু নেই । আমি ঈশ্বর । তোমার সঙ্গে দেখা করতে এলাম । নাও আগে জলটা খেয়ে নাও । তারপর কথা হবে ।

    বিস্ময় আমার কিছুতেই যায় না । হাঁ করে তাকিয়ে থাকি । ভয় পাই ভেতরে ভেতরে । ঈশ্বর কেন দেখা করতে আসবেন আমার সঙ্গে ? সামান্য মানুষ আমি । আশ্চর্য !! তবু একটু জল খেয়ে নিই ।

ঈশ্বর আমার মুখোমুখি সোফাতে বসে । বললেন , কেমন লাগছে এই গৃহবন্দী জীবন ?
বিস্ময় জড়ানো কণ্ঠেই  বললাম , ভালো লাগছে না । যদিও আমার খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না ।
-- হুম । তোমার একটা অভ্যাস আছে একা থাকার । একাকী মানুষের সমস্যা হবার কথা নয় । তুমি তো নিজের মধ্যেই ডুবে থাকো অধিক সময় ।
   আবার কুকুর ডেকে উঠল । বললাম , কুকুরগুলো খুব ডাকছে ।
--খিদে পেলে তো ডাকবেই । খুব কষ্ট ওদের ।
--আপনি তো ঈশ্বর । কিছু করছেন না কেন ওদের জন্য ? বললাম আমি ।
  তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন । ওই তোমাদের দোষ । ভাবো ঈশ্বর সর্বশক্তিমান --তিনি জাদু জানেন-- সব করতে পারেন । আসলে তা নয় । নিজের ভেতরের শক্তিকে জাগাও , তাহলেই ঈশ্বর জেগে উঠবে । সে তো তোমার মধ্যেও আছে ।
   আমি একটু সাহস পেলাম । বললাম , এই করোনা ভাইরাস আমাদের আর কতো দিন ভোগাবে ?
         ঈশ্বর বললে , যতদিন তোমরা চাইবে । ওকে তো তোমরাই ডেকে এনেছ ।
--মানে ?
--মানে  তোমাদের অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন ।তোমাদের বাসনা । তোমাদের লোভ । তোমরা মানুষেরা কাউকে থাকতে দিচ্ছ না এই পৃথিবীতে । গাছ কেটে ফেলছ । প্রাণীদের ধরে ধরে হত্যা করছ । তোমাদের খুব হিংসে । পরীক্ষাগারে এমন সব বিষাক্ত রাসায়নিক তৈরী করছ যা কেবল নিজেদের শেষ করবে না , সমূহ পৃথিবীকে শেষ করে দেবে । তোমরা মন্দির-মসজিদ-গীর্জা নিয়ে মারামারি, কাটাকাটি করো । অথচ অসহায় মানুষ ও অবলা প্রাণীদের খেতে দাও না । ঈশ্বরের নামে লোককে ভুল বোঝাও । ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করো । দুর্বলের ওপর অত্যাচার করো ।

           এতগুলো কথা বলে তিনি থামলেন এবার । কথাগুলো বলতে বলতে ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর বদলে গেল । তিনি আবার বলতে শুরু করলেন , সবাই প্রকৃতির সন্তান । এই প্রকৃতি জননীই সকলকে লালন ও পালন করেন , এমনকি আমাকেও । সময় হয়েছে , পাপে পূর্ণ বসুন্ধরা -- প্রকৃতি তাঁর প্রতিশোধ নিচ্ছে । প্রতি একশো বছরে একবার প্রকৃতি এইভাবেই জেগে ওঠে । প্রতিশোধ নেয় ।

       চিন্তা করে দেখলাম ঠিক কথাই তো । ১৭২০ তে প্লেগ , ১৮২০ তেও কলেরা , ১৯২০ তেও স্প্যানীশ ফ্লুর মতো মহামারীর কারণে পৃথিবীতে প্রচুর লোকক্ষয় হয়েছিল  আর এখন করোনা ভাইরাস পৃথিবীকে নিস্তেজ করে দিয়েছে । এখন কোনো যুদ্ধ হচ্ছে না-- রাজনীতি হচ্ছে না । সবাই ভয়ে কেমন সিঁটিয়ে আছে । মৃত্যুভয় । বাইরে বেরচ্ছে না । গৃহবন্দী করেছে নিজেকে ।

   ঈশ্বর বলতে লাগলেন , ভালো লাগছে বন্যজন্তুরা এখন খুব ভালো আছে । নির্ভয়ে বিচরণ করছে । গাছগুলি সবুজ বাতাসে আন্দোলিত হচ্ছে । উৎকট শব্দ হচ্ছে না  ট্রেন-বাস ও নানান যন্ত্র-দানবের । পাখিরা আনন্দে গাইছে । কচ্ছপের দল উঠে আসছে সমুদ্র সৈকতে । ওরা ডিম পাড়ছে । হরিণ নির্ভয়ে ঘুরছে-- ছুটছে । দূষণ কমে যাচ্ছে পৃথিবীর। নদী কথা বলছে আকাশের সঙ্গে , বাতাসের সঙ্গে । বলতে বলতে আনন্দে কেঁপে উঠছে ঈশ্বরের কণ্ঠ । খুশিতে ঝলমল করছে তাঁর মুখ । এই প্রথম দেখলাম ঈশ্বরের আনন্দিত মুখ ঠিক মানুষের মতোই । আলাদা কোনো বিশেষত্ব নেই ।বলতে বলতে ঈশ্বরের চোখে আনন্দাশ্রু । তারপর একটু একটু করে তিনি মিলিয়ে গেলেন , আর কিছুই বলতে পারলাম না । জিজ্ঞেস করা হল না । আমি কেমন যেন আবিষ্ট হয়ে থাকলাম ।

   দেখি বাইরে আলো ফুটেছে । ' চোখ গেল , চোখ গেল '--- পাখি ডাকছে । জানালা খুলতেই এক ঝলক টাটকা দখিনা বাতাস । গাছে সাদা সাদা ফুল ফুটে আছে ।


২টি মন্তব্য: