শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

দিব্যেন্দু সরকার


জীবন ছোট না বড় এই প্রশ্নের মিমাংসা কোনদিনও করতে পারে নি  প্রতিমা।  ট্রেনটার জানলায় বাঁ হাতের কুনুইটা অল্প একটু ছুঁইয়ে তার উপর থুতনিটা চেপে সেই পুরোনো অথচ অমিমাংসিত প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে সে।
  বাইরে শনশন বেগে পেছন দিকে ছুটে চলেছে গ্রাম,  প্রান্তর নদী,  ছোট ব্রীজ।  মুহূর্তে চোখের নাগাল থেকে সরে যায় সেসব। কিন্তু মনের নাগাল থেকে সরে কি?  মনে যা ধরে যায়,  তাকে সরানো শক্ত।  পথ যতো এগোয় মন তত পেছোয়। অথচ এগোতেই হবে।
  একজনের  হাতধরে সে উঠেছিলো  আগের প্লাটফর্মে, পাঁচবছর আগে,  ট্রেন বদলে। এখন সে নেমে যেতে চাইছে।

  মানুষের জীবন থেকে আনন্দের স্মৃতি গুলো কত দ্রুত মুছে যায়,  কিন্তু ---- -- সকালবেলা যখন বর্ধমান স্টেশন থেকে ট্রেনটা ধরে সে আকাশ স্বাভাবিক ছিলো। মাত্র দুঘণ্টা আগের কথা। আকাশের দিকে চেয়েও ছিল সে খানিকক্ষণ,  কিন্তু সে কোনমতেই সেই আকাশের ছবি আঁকতে পারবে না।আঁকতে ভালই পারতো প্রতিমা। ছোটবেলার ফুল, পাখি হয়ে একদিন সে একে ফেললো তাদের কুমড়োর চালায় কুমড়োর গায়ের মত রোম, বাড়ীর ল্যাংড়া আমের নীচটার মতো ঠোস খাওয়া থুঁতনি,  আর কাঁঠাল গাছে শালিক পাখির মতো এলোমেলো ঝাঁকড়া চুল।  সেই অনির্বাণকে সে নামিয়ে দিলো কোন এক প্লাটফর্মে।

  অনির্বাণকে যেদিন ও জানালো,  সে তার খুব ভাল বন্ধু,  কিন্তু রজতকে সে ভালবাসে, অনির্বাণ শুধু বলেছিলো -
 " তুই সুখে থাকিস।  তোর সুখের চেয়ে বেশি চাওয়ার কিছু নেই। মনে পড়লে ফোন করিস। "

 না ফোন করতে হয় নি, হঠাৎ একদিন দেখা হয়ে গেছিলো অনির্বাণের সাথে কলকাতায়। অনির্বাণ এখন মাঝেমাঝেই ফোন করে। সে কলকাতায়ই থাকে, একটা কলেজের শিক্ষকতা করছে সে।
" বিয়ে এখনও কেন করিস নি, " উত্তরে  সে  বলে "সময় পাই নি। "

যেদিন রজত  পাঁচ বছরের সম্পর্কটায় ছেদ আনতে চাইলো ---- - "সম্পর্কটায় সে বোর হয়ে গেছে,  প্রতিমার  শীতল রক্তে সে জীবনের উষ্ণতা খুঁজে পাচ্ছে না -"। সেদিনকার  আকাশের সেই ধুসর ছলছলে ছবিটা সে নিখুঁত ভাবে এঁকে  দিতে পারে। কষ্টের ছবির তো একটাই রঙ - আলো নেভা ছাই ছাই রঙ। আর অন্য কোন রঙ নেই। অথচ আনন্দের কতো রঙ। বড্ড কঠিন সে অনেক রঙের আঁকিবুঁকি মনে রাখা!  মানুষ ভুলতে চেয়েও তাই ভুলতে পারে না কষ্টগুলো। প্রতিমাও ভুলতে পারে না সেই বিষন্ন স্মৃতি!  অথচ মনের সব রঙ ঢেলে যে ছবিটা বর্ষার বিকেলের মতো প্রতিদিন  ছবি এঁকে চলেছিলো সেই মনটাকেই আর কোথাও খুঁজে পায় না!  প্রতিমা  বুঝে গেছিলো গরম রক্তেই রজতের নেশা,  নরম মনের হদিশ তার কাছে নেই।

   আরেক স্টেশনের দিকে  এগিয়ে চলেছে সে।  দুটো স্টেশন।  একটায় সে নিজেই  চেপেছিলো। কখনও  থামবে ভাবে নি!  এখন দুটোর মাঝে সে।  কি ভীষন যন্ত্রনা! সে বারবার টের পেয়েছে সেটা।

   ডিভোর্সের পেপারটা বের করে প্রতিমা।চোখ বুলিয়ে নেয় ।   তাও একমাস হতে চলল রজত সাইন করে পেপারট তাকে দিয়েছে।   সাইন করে নি সে। অবশ্য রজতও চাপাচাপি বা অন্য কিছু এখনও করে নি,  মুখোশটা কতক্ষণ পড়ে থাকতে হয় সে বেশ জানে।

   বাড়ী ফেরার মুখ নেই, কোথায় যাবে সে!! বড্ড অদ্ভুত  এই জীবন!  একমুখী ছুটে চলা। চাইলেও পেছন ফেরা যায় না।  কলেজের পেছনে পাকুড় গাছটার নীচে  কালীমন্দিরের থেকে সিঁদুর তুলে নিয়ে রজত প্রতিমার  সীমন্তে ভরে দিয়েছিলো।  প্রতিমার  সেবার অনার্সের ফাইনাল ইয়ার।

ধনী বাড়ীর ছেলে রজত। বুড়ো আঙ্গুল আর তর্জনীতে এক চিমটি সিঁদুর তুলে নিয়ে কালো কোঁকড়ানো চুলের মাঝখানটা ফাটিয়ে বলেছিলো - " তোমার জন্ম জন্মান্তরের দায়িত্ব নিলাম। আমাদের অত বড় ব্যাবসা-- তোমার পরিক্ষাটার কি প্রয়োজন -- ঐ একটা ফালতু কাগজের জন্য -- ক্লার্ক বা মাস্টারি করে কতো পাবে ----।  "
অনার্স টিকলো না, পাস কোর্সে গ্রাজুয়েট।

 সাধারণ নিন্ম মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে প্রতিমা। তিন বোন পীঠেপীঠে। লেখাপড়ায় প্রতিমা বরাবরই ভালো। রজতের দিক থেকে হুড়মুড় করা পাগলামো ছিলো, কিন্তু প্রতিমার  সে ডাকে সাড়া দেওয়ায় কতটা প্রেম আর কতটা নিরাপত্তা ছিল,  সে হিসেবই এখন সে কষে যাচ্ছে।  ছোট বোন দুটোর পড়াশোনার খরচ সামলাতে হিমসিম খাওয়া কিন্তু সাহাস্য বাবার  মুখটা তার মনে পড়ে। অভাব ছিলো কিন্তু কোন অভিযোগ তো ছিল না। তবে সে কেন ধরে নিল তার গতি হলে বাবার চিন্তা কমবে।

  বিয়ের করে প্রতিমা দুবার বাবার কাছে গিয়েছিলো,  বোনদের জন্য কিছু টাকা পয়সা, বাবা মায়ের জন্য কাপড় চোপর বোঝাই করে।  অমন নরম মানুষটাকে এমন নির্লিপ্ত পাষাণের মতো শক্ত হতে পারে,  প্রতিমা ভাবতেও পারে নি। বাড়ী আসতে মানা করে নি কিন্তু প্রতিমা  বুঝে গেছিল সে তার বাবাকে  চেনে নি,  বাবার মুখ থেকে বাকি জীবনের হাসি সে শুষে নিয়েছে। স্বার্থপর লাগছিলো নিজেকে সাহস হয় নি সে পথ মাড়াবার। বাবা শুধু বলেছিলো - আমি রক্ত বিক্রি করছি, তোদের বিক্রি হতে দেবো না বলে, আর তুই নিজেকে বেচে দিলি ! ! "

প্রতিমার মনে পড়ছে সেই স্কুলের দিনগুলো। বাবা অফিস থেকে নিভু নিভু দিনের আলোয় বাড়ীর উঠোনে এসে সাইকেল থেকে নেমেই ডাকতো -- " বুড়ি" এই নামেই প্রফুল্লবাবু  তার বড় মেয়ে ডাকতেন। আর সেটা নিয়ে গাল ফুলিয়ে প্রতিমা বলতো -- তুমি সবার সামনে আমাকে " বুড়ি বলবা না কিন্তু ।  আমি কি বুড়ি!!  "। বলেই বাবার বুকে কয়েকটা ঘুষি  মেরে বাবার বুকে মুখ ঘষতো ।  বাবা মেয়ের খুনসুটির ছবিটা ভেসে উঠতেই দু চোখ ছলছল  করে ওঠে প্রতিমার।

 ট্রেনটা একটা স্টেশনে এলো।  বড্ড সুন্দর সেটা। দুটো বড় আমগাছ,  কয়েকটা কাঠবিড়ালি,  গোটা কয়েক পুরুষ্টু ইউকালেপ্টাস গাছ অনেক উঁচুতে উঠে গেছে, খোলা প্রান্তর থেকে হাওয়া এসে পাতা গুলো ঝিরিঝিরি দোলাচ্ছে। কিছু মানুষ উঠল,  নামল। কেউ ঘর থেকে বেরিয়েছে, কেউ ঘরে ফিরছে।  যারা বেরিয়েছে, সবাই ঘরে ফিরবে।
প্রতিমাও বেরিয়েছে। তারই  শুধু ফেরা নেই।  মাঝে শুধু ছোট্ট একটা কাজ।  কিন্তু গন্তব্য সে জানে না। দেখতে দেখতে ট্রেনটা শিয়ালদা  এসে পড়ে। স্বাতী নেমে পড়ে। ঘড়ি মিলিয়ে নেয় । এগারোটা বাজতে এখনও অনেক বাকি। সাপের মতো একেবেকে গেছে সব লাইন,  কেউ কাউকে মাড়িয়ে গেছে,  শুধু ট্রাক চেঞ্জ করার পর খটাশ করে একটু শব্দ,  ট্রেনগুলো ছড়িয়ে যায়।

 প্লাটফর্মের একটা একটা ফাঁকা বেঞ্চ দেখে বসে প্রতিমা।  কাঁধ থেকে শান্তিনিকেতনী পাটের ব্যাগটা বের করে। পাঁচ বছর  আগে বাবা দিয়েছিলো ওকে। রজতের দেওয়া দামী সব গিফটের ছোয়া বাচিয়ে যত্ন করে রেখেছিলো সাইড ব্যাগটা। প্রফুল্লবাবু অফিসের একটা কাজে শান্তিনিকেতন গিয়েছিলেন। স্টার মার্কস পেয়ে প্রতিমা কলেজে ভর্তি হয়েছে সবে। খুব সুন্দর হাতের কাজ করা ব্যাগটায়। একটা বাউলের ছবি। হাতে একতারা ।  ব্যাগটা প্রতিমার কাঁধে  ঝুলিয়ে বাবা বলেছিলেন -- " একদম দিদিমণি !  "।

 থেকে দুটো কাগজ বের করে প্রতিমা।  ডিভোর্সের পেপারটাতে সই করে প্রথমে। তারপর  মিশনারি স্কুলের জয়েনিং লেটারটায় সই করে কনডিশনাল ফর্মটায় "আন ম্যারেড "  লিখে দেয়।

  কাউন্টারে দাঁড়ায়,  একটা টিকিট কাটে ফেরার,  সেলফোনটা ব্যাগ থেকে বের করে,  অনির্বাণের নম্বরটা ডিলিট করে বাবাকে ফোন করে,  "

 বাবা, তোমার বড় মেয়ে সব ভুল শুধরে নিয়েছে, তোমার কোলে একটু মাথা রাখতে দেবে না "


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন