শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

চিরদীপ সরকার


রঘুর নিজস্ব কোন পুকুর নেই । অন্যের পুকুরে চুক্তিভিত্তিক মাছ চাষ করে । গত বছর থেকে চৌধুরীপুকুরে মাছ চাষ করছে সে । খুব ভোরে রঘু উন্মুক্ত জালের বিস্তারে ধরতে চায় তার ভোররাতের ইচ্ছেতারাগুলো, জলের নিবিড়তায়,তারপর শুরু হয় পাইকারি দরে বেচা,সময়ের আড়তে। কিছু মাছ নিজেও সাইকেলে করে বিক্রি করে পাড়ায় পাড়ায়।

   গ্রীষ্ম আসার অনেক আগে থেকেই জাল টানার সময় রঘুর জালে বেশ কয়েকবার ধরা পড়েছে একটি বড় সাইজের কাতলা প্রথমদিকে ছোট থাকার কারণে ছেড়ে দিলেও পরবর্তীকালে বড় মাপের হওয়া সত্ত্বেও বেশ কয়েকবার মাছটিকে ছেড়ে দিয়েছে রঘু । প্রথমদিকে সে দেখতে চেয়েছিল মাছটিকে সে সর্বোচ্চ কত বড় করতে পারে । এই পুকুরে যা হয়ে উঠবে তার  মৎস্যচাষ দক্ষতার অহংকারের প্রতীক । অন্য পুকুরের চুক্তি পাওয়ার অ্যাডভারটাইজমেন্টও । পরে প্রয়োজন বুঝে মাছটিকে আরতে বিক্রি করে দেবে কলার উঁচিয়ে । কিন্তু ধীরে ধীরে মাছটির প্রতি এক অদ্ভুত মায়া জন্মাতে শুরু করে রঘুর , মাছটিও যেন অনায়াসে রঘুর জালে ধরা দিতে থাকে বিশ্বাসের প্ররোচনায়।রঘুকে,সময়কে ও জালকে প্রতারক না ভেবেই । রঘু প্রতিবার ধরা পড়া মাছটির চোখের দিকে একবার তাকায় তারপর ছেড়ে দেয়। মাছটিও বিলীন হয়ে যায় জলের মধ্যে থাকা অদৃশ্য এক মায়াজলে।

এবছর প্রচণ্ড গরম পড়েছে আশেপাশের সব পুকুরগুলো প্রায় শুকিয়ে যাওয়ার  সামিল।চৌধুরী পুকুরের গভীরতা একটু বেশি হওয়ায় অন্য পুকুরে থেকে জল সামান্য বেশি থাকে ঠিকই কিন্তু তা মাছ চাষের জন্য বেশিদিন আর পর্যাপ্ত হবে না,জানে রঘু। সে মনে মনে ঠিক করে কাল জাল টেনে সব মাছ তুলতেই হবে।

এদিকে রঘুর একমাত্র কন্যার কাল জন্মদিন। কন্যা অন্তঃপ্রাণ রঘু মাঝে মাঝে মেয়েটার কথা আনমনে ভাবে। মনে হয় একদিন তার স্নেহান্ধ মেয়েটি এ বাড়ির মায়া কাটিয়ে চলে যাবে শ্বশুর বাড়িতে ! কিন্তু রঘু ভবিতব্য ও কঠোর বাস্তব মেনে নিতে জানে। রঘুর বউ বলে - "কালতো আমাদের পুচু পাঁচে পা দিচ্ছে,মেয়েটার জন্য অন্তত একটু ভালো খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করব ভাবছিলাম,ওর তো আবার মাছের মাথা খুব প্রিয়,একটা বড় কাতলা যদি নিয়ে আসতে।"

মাছ চাষ করার আগে রঘুর পারিবারিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না । ইদানিং নুন আনতে পান্তা ফুরোয় না ঠিকই কিন্তু সামান্য একটা পুকুরের চুক্তিভিত্তিক মাছ চাষি হয়ে মাছের দোকান থেকে মাছ কিনে আনা তার কাছে বিলাসিতা তো বটেই ব্যাগে করে নিয়ে আসা বিস্ময়বোধক ও প্রশ্ন চিহ্নও,যেখানে সে নিজেও মাছ বিক্রি করে । তাছাড়া পুকুরে জল কমে আসছে ,কাল মাছগুলো এমনিতেই তুলে না নিলে মারা যাবে সব। ক্ষতি হয়ে যাবে খুব।

রঘু ভোররাতে বেরোয় জাল নিয়ে । প্রায় সব মাছ ধরে। ধরা দেয় সেই বড় মাছটিও। রঘু তার চোখের দিকে তাকায় না। নিয়ে যায় না আড়তে। দুপুরের রঘুর বউ মেয়ের জন্য অনেক রকমের পদ রান্না করে খেতে দেয় , কাঁসার বাটিতে দেয় মাছটির মাথাও। রঘু সেই মাছটির চোখের দিকে না তাকাতে চেয়েও চোখ চলে যায় অজান্তেই ।
 শান্ত,নীরব,গভীর,পলকহীন,অভিযোগহীন । প্রতারণার উপপাদ্য আরও জটিল হয়ে যায় জালের বুননের মতন। জালকাঠিতে তখন প্রতিশ্রুতি বলে কিছু নেই । চোখের ভিতরের শক্ত দানাটিও মিলিয়ে যায় মাংসের স্বাদে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন