শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

শুভাশিস দাশ




আমি বললাম তারপর ?
চায়ের কাপটা নামিয়ে টেবিলে রেখে বীরেন বোস হেসে বললেন দেখুন ভয় পাবেন না তো ?

রহমত গঞ্জের নতুন পুলিশ অফিসার বীরেন বোস কিছুদিন আগে মুর্শিদাবাদ থেকে বদলি হয়ে রহমত গঞ্জ থানার ইনচার্জ হয়ে এসেছেন । কাগজের লোক হিসেবে আমার সাথে পরিচয় এবং এ কদিনেই বেশ ঘনিষ্ঠ হয়েছে বন্ধুত্ব ।
বীরেন বাবু এখানে আসার মাস খানেক পর শুরু হলো করোনা জনিত লক ডাউন পর্ব । ব্যাস । ডিউটি বেড়ে গেলো । জুতো সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ শুরু হয়ে গেলো পুলিশ পার্সন দের ।

একটা নিউজ পোর্টালের কাজ করার সুবাদে থানায় খবরের জন্য যেতে যেতে এই পরিচয় ।

কাজ আমারও বেড়ে গেলো । আজ জনতা লক ডাউন ভাঙছে তো কাল রেশন বিলিতে দুর্নীতি । এ বেলা বাজারে ভিড় তো ও বেলা বাইরের রাজ্যের শ্রমিক ঢুকে পড়ছে । একদিকে মিডিয়া অন্যদিকে পুলিশ পার্সন ।

আজ টহল দিতে দিতে বীরেন বোস একেবারে আমার বাড়ির সামনে এসে তাঁর বুলেরো গাড়ির হর্ন বাজিয়ে দিলেন । আমি গেট খুলতেই গাড়ি থেকে সোজা নেমে এসে বললেন আগে হাতে একটু স্যাণিটাইজার দিন ।

মাস্ক মুখে দূরত্ব বজায় রেখে আমার উঠোনে রাখা চেয়ারে বসে বললেন এক কাপ চা খেতেই ঢুকে পড়লাম । সকালের দিকে তবু থানার সামনের চা দোকান টা খোলে । তবে দোকানদার কিন্তু সিস্টেম মানে । কাগজের কাপে চা দিয়ে চলে যেতে বলে খদ্দেরকে ।

নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে এসেছেন । সাথে একজন সিভিক ভলেণ্টিয়ার । ওকে গাড়িতেই থাকতে বলে নিজে এসে উঠোনের পাতা চেয়ারে বসে পড়লেন ।
আমি গিন্নি কে ডাক দিয়ে পরিচয় করিয়ে তিন কাপ চা দিতে বললাম ।

এই ক দিনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা দিতে দিতে সেই রাতের প্রসঙ্গ আসতেই কাপটা নামিয়ে মি: বোস বললেন । তবে শুনুন ।
এই রহমত গঞ্জ থানার অধীনেই বীরডাংগা গ্রাম । আদিবাসী অধুর্ষিত অঞ্চল । রহমত গঞ্জ হলো ভারত বাংলদেশ সীমান্ত একটা থানা । লোকেশন টা অত্যন্ত পিকিউলিয়র বলে এখানে সমাজ বিরোধীদের অবাধ বিচরণ । তবে সীমান্তে কড়াকড়ি হওয়ায় একটু শান্ত আছে ।

দিন সাতেক আগে একটা খবর পেয়ে আমি আর আমার থানার এক এস আই গেলাম বীর ডাঙ্গা গ্রামে । ওখানে নাকি বাংলাদেশ থেকে প্রায় জনা কুড়ি লোক ঢুকে পড়েছে ।

আমরা সন্ধ্যার পর পর রওয়ানা দিলাম । বীরডাঙ্গা পৌঁছনোর আগে আমাদের গাড়ির স্টার্ট হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলো । ড্রাইভার ছিল থানারই এক পুরোনো কনস্টেবল , নাম মতি লাল পান্ডা ।
বললাম কী হলো ?
ড্রাইভার মতিলাল কোন উত্তর না দিয়ে আবার গাড়িটি স্টার্ট দেবার চেষ্টা করলো ।

কিছুতেই কিছু হচ্ছে না সাহেব এই বলে ড্রাইভিং সীট থেকে নেমে গেলো মতিলাল । আগের জিপ গাড়ি হলে তাও চেষ্টা করা যেতো কিন্তু হালের এসব গাড়ির কারিগরি মতিলালের জানা নেই । তবু নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চেষ্টা করলো ।
গাড়ি থেকে নেমে পড়েছি সবে,  মতিলাল বললো বেশিদূর যাবেন না স্যার । সামনেই মহাশ্মশান । জায়গাটা খুব একটা ভালো না । অন্ধকার জাঁকিয়ে বসেছে । রাস্তার পাশে দেশি বড়াই এর ঝোপ । মাঝে মাঝে জোনাকি আলো দিচ্ছে । এর মধ্যেই কয়েকটা শিয়াল ডেকে উঠলো । একটা কেমন গা ছম ছম পরিবেশ !
বলতে বলতে চায়ে আবার চুমুক দিলেন বোস সাহেব ।

বললাম তারপর ?
আবার মি :বোস বলতে শুরু করলেন
এরপর যা ঘটলো তা নিজে চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না ।
আমরা তিন জনই রাস্তায় । হঠাৎ গাড়িটি একটা বিকট আওয়াজ করে ছুটতে আরম্ভ করলো । সন্ধ্যা হয়ে আসাতে গাড়ির হেড লাইট জ্বলে ছিল । সেই আলোতে আমরা দেখতে পেলাম ড্রাইভার সিটে কে একজন বসে গাড়ি চালাচ্ছে । কী করবো বা কী করা উচিত তা মুহুর্তে চিন্তা করতেই আমার সাথী সাব ইন্সপেক্টর অমল রায় তাঁর সার্ভিস রিভলবার থেকে গাড়ির চাকায় গুলি করে টায়ার ব্লাস্ট করলো । কিছুদূর গিয়ে গাড়িটি থেমে গেলো । আমাদের তিনজনের হাতের মোবাইল টর্চ জ্বালিয়ে এবং দুজনের রিভলবার তাক করে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম । পাশে একটা ডোবা থেকে কয়েকজন অদ্ভুত মানুষ এসে আমাদের ঘিরে ধরলো । আমি এবং অমল সাথে সাথে রিভলবার চালিয়ে দিলাম । সিক্স বোরের এই রিভলভারের সব কটা গুলি দুজনেই শেষ করে দিলাম কিন্তু কোন লাভ হলো না ।

তিনজনই অন্ধকারে অসহায়ের মত লোকগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম । মতিলাল জোড়ে জোড়ে ' রাম নাম সত্য হ্যায় ' বলছে ।

একটু পড়েই দেখলাম মানুষ গুলো চলে গেলো । একজন নেতা মত মানুষ বললো যা বেঁচে গেলি ।

আমি তড়িঘড়ি করে থানায় ডিউটি অফিসার কে মেসেস দিলাম ।
মতি লাল বললো স্যার এই শ্মশানে অনেক বেওয়ারিশ লাশের কবর হয়েছিল । আমার ঠাকুরদা বলেছিল এই আদিবাসী অঞ্চলে একবার কলেরায় গ্রাম সাফ হয়ে গিয়েছিল ।

ওদেরই আত্মারা নাকি ঘুরে বেড়ায় এই শ্মশানে । কথাগুলো শেষ না হতেই দূরে একজোড়া আলো দেখতে পেলাম , মনে একটু বল এলো ।

সঙ্গে সঙ্গে সেল ফোনটি বেজে উঠলো থানার ডিউটি অফিসার বললো স্যার গাড়ি কে রওয়ানা করে দিয়েছি । লাইন বিজি তাই একটু দেরি হয়ে গেলো ।
মি বোস বললেন মনে হয় গাড়ি এসে গেছে । ওকে বলে ফোনটি রেখে দিলেন । এরপর মি :বোস ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন আরে ব্যাস ! এক ঘণ্টা হয়ে গেলো ? আজ উঠি ?
বললাম তার মানে ? শেষটা ?

তারপর তো আমাদের গাড়ি এলো । সেখান থেকে ফিরে এলাম থানায় । বীরডাঙ্গা গ্রামে সেদিন আর যাওয়া হলো না ।

আজ উঠি । এই বলে মি :বোস গাড়িতে গিয়ে উঠলেন । গাড়ি ছেড়ে দিলো ।
সন্ধ্যা উতরে গেছে । চারদিক শুনশান । সামনের ল্যাম্প পোষ্টে আলো জ্বলছে ।  সাঁই করে বেরিয়ে গেলো মি :বোসের বুলেরো টা ।

কখন মাস্ক পরে গিন্নি এসে পাশে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি তাই পাশ ফিরতেই গিন্নি র গায়ে গা লাগতেই ছ্যাত করে উঠলো বুক টা , অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে গেলো -বাবারে !
গিন্নি বললো আমি গো আমি ! !


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন