শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

আহসান হাবিব। পারক গল্পপত্র


‘বাবা, আমাদের নিজেদের একটা বাড়ি কি কখনোই হবে না’ ?
আকাশ রায়হান তার একমাত্র মেয়ে দোলনের দিকে তাকিয়ে থাকে, কি বলবে সে ভেবে পাচ্ছে না ! এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে আছে, কিন্তু বলতে পারছে না । সে জানে কোনদিনই তার নিজের একটি বাড়ি হবে না । তাকে যে এমন একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে এটাও তার মাথায় ছিল না ।

‘তোর মাকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর’
দোলন বাবার দিকে তাকায়, সে কি এই উত্তরে বাবার অক্ষমতা ধরে ফেলেছে ? বয়স আর কত, নয় বছর । সিদ্দিক’স ইন্টারন্যাশনালে পড়ে ক্লাশ টুয়ে । বুদ্ধিমতী, নিশ্চয় বাবার এই উত্তরের ঠিক মানেটা বুঝে ফেলেছে, সে বাবার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, আর কোন প্রশ্ন করে না । ড্রইং রুমে বসে সে  আনমনে ছবি আঁকছিল । মা ভীষণ ব্যস্ত, আগামী শুক্রবার বাসা বদলাতে হবে, হাতে আর মাত্র দুটো দিন সময় । দোলন ছবি আঁকা ছেড়ে ড্রইং রুম থেকে বেরিয়ে গেলো, বাবা দেখল মনে হয় সে তার মায়ের কাছে যাচ্ছে । সে কি সত্যি সত্যি তার মাকে গিয়ে এই একই প্রশ্নটা করবে ? হয়তো করবে, হয়তো করবে না ।
আকাশ ড্রইং রুম থেকে বেরিয়ে তার নিজের রুমে গিয়ে ঢুকল । কয়েকটা কার্টুন ছড়িয়ে আছে রুমে, তার উপর দায়িত্ব পড়েছে এইসব কার্টুনে নিজের যা কিছু সব প্যাক করে ফেলতে । তার নিজের কি আছে, কয়েকটা পোশাক, বেশ কিছু বই আর একটা হারমোনিয়াম, একজোড়া তবলা ডুগি আর একটা রাগিনী- ইলেকট্রিক তানপুরা । তার এই ঘরটাকে সে ব্যবহার করে গানের ঘর হিসেবে, এই ঘরেই সে তার কিছু ছাত্রছাত্রীকে গান শেখায় । কিছু ছাত্রছাত্রীকে বাসায় গিয়ে শেখায় । বারান্দায় বেশ কিছু ফুলের টব, সেগুলিও প্যাক করে ফেলতে হবে । খুব বেশী সময় লাগবে বলে মনে হয় না । সে বিছানায় গান এলিয়ে দেয়, ছাদের দিকে চোখ রাখে ।

নিজের একটা বাড়ির স্বপ্ন সে কখনো দেখেনি, দেখতে চায়নি কারণ সে সবসময় এমন একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের কথা ভেবেছে যেখানে নিজের বলতে কিছু থাকবে না । একটা যূথবদ্ধ সমাজ নির্মাণ হবে, সমাজের এক একটা ব্যক্তি সমাজের সামস্টিক কল্যাণের মধ্যে নিজের ব্যক্তিত্ব অনুভব করবে । সে যখন খুব ছোট, দেখেছে তার বাবা কি করে একটা বড় সংসার নির্বাহ করেছে । কি ছিল তার বাবার ? প্রায় কিছুই না, একটা বিরাট পরিবার ছিল, যাকে বলে একান্নবর্তী পরিবার । এক এক বেলায় বিশ পঁচিশ জনের খাবার রান্না হতো । সেই পরিবার যখন দেখতে দেখতে ভেঙে পড়লো, বাবা এক হয়ে পড়লেন, একটা ছোট্ট ঘর তার ভাগে পড়লো । সেই ছোট্ট ঘরে নিজের সংসার পাতলেন । একটা ঘর থেকে ক্রমে ঘর বেড়েছে, দুইটি থেকে তিনটি হয়েছে, মাটির দেয়াল, খড়ের চাল । বাবার নিজের কোন জমিজমা ছিল না, একান্নবর্তী পরিবার যখন ভেঙে গেল, তখন ক্লাশ টেন পর্যন্ত পড়ুয়া তিনি স্থানীয় বেসরকারী স্কুলে অফিস সহকারীর চাকরি নিলেন এবং সেই সংসারে এসে পড়লো একে একে সাত সাতটি সন্তান, আকাশ চতুর্থ । অন্যকিছু নয়, তিনি তাঁর সব ছেলেমেয়কে পড়ালেখা করালেন । সে এক কঠিন সংগ্রাম বটে !

আকাশের গানের প্রতি ঝোঁক ছিল সেই ছোটবেলা থেকেই । রেডিওতে গান শুনে শুনে সে নিজে গাইতে চেষ্টা করতো । ওর বয়স যখন ছয় তখন প্রথম সে স্কুলে যায় এবং একই সংগে সে পাশের গ্রামের গানের ওস্তাদ ওয়াজিউদ্দিনের কাছে গিয়ে বসে থাকতো । ওয়াজিউদ্দিনের কাছে সারাদিন এক একজন করে ছাত্রছাত্রী আসতো, আকাশ দেখত ওস্তাদ কি করে তাদের গান শেখান । ওয়াজিউদ্দিন তাকে দেখতেন কিন্তু কিছু বলতেন না । সেদিন সব ছাত্রছাত্রী চলে গেলে তিনি দেখলেন আকাশ এক কোনে তখনো বসে আছে, আকাশকে কাছে ডাকেন, বলেন ‘গান শিখবি’ ?
আকাশ চমকে ওঠে, তাকে কি ওস্তাদ শেখাবেন গান ? সে তো ওস্তাদকে কোন দক্ষিণা দিতে পারবে না । অসহায়ের মত ওস্তাদের চোখের দিকে একবার তাকায়, একবার নীচু করে
‘কি, গান শিখবি, তুই’ ?
‘শিখব, ওস্তাদ’
আকাশ সব ভয় এবং লজ্জা ঠেলে বলে ফেলে কথাটা
‘একটা গান করতো’
আকাশ ভয় পেয়ে যায়, তার গলা কাঁপতে থাকে, এতোটুকুন বাচ্চা, সে আবার ওস্তাদের সামনে কি গান করবে ? এতদিন রেডিওতে যা শুনেছে, সেখান থেকে সে দু এক লাইন গাইতে পারে, আর এখানে এসে ওস্তাদের শেখা কিছু কিছু স্বর সাধনা মনে মনে সে রপ্ত করেছে । ওস্তাদ তাড়া দেন, আকাশ গেয়ে ওঠে-
‘নি রে গা ক্ষ ধা নি র্সা, র্সা নি ধা পা ক্ষ গা রে সা’
বলেই আকাশ চুপ করে যায়, আর কিছু বলে না । ওস্তাদও চুপ হয়ে পড়েন, একেবারে নিখুঁত স্বর কি করে লাগাল এই ছোট্ট বাচ্চাটা, বিস্মিত হয়ে পড়েন তিনি ! আকাশকে তিনি বুকে টেনে নেন ।
তারপর আকাশের মুখটা সামনে তুলে নিয়ে বলেন ‘বল তো এটা কোন রাগ’ ?
‘ইমন, ওস্তাদজী’
ওস্তাদ ওয়াজিউদ্দিন এই উত্তর শুনে বিস্মিত হয়ে পড়েন ! সেইদিন থেকে আকাশের তালিম চলতে থাকে, নিরবে, নিভৃতে, সবার অগোচরে ।
আকাশ একদিন মাঠে ফুটবল খেলছিল, পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন ওস্তাদ ওয়াজিউদ্দিন, আকাশকে দেখতে পেয়ে কাছে ডাকেন,
‘আমার সংগে ঘুরবি’ ?
আকাশ তো যেন হাতে চাঁদ পেয়ে গেলো, খেলা ফেলে ওস্তাদের সংগে হাঁটতে শুরু করলো । ওস্তাদ হাঁটতে হাঁটতে তাকে নদীর কিনারে নিয়ে এলেন, একটা জায়গায় বসলেন তারপর তিনি সুর ভাজতে শুরু করলেন-
ন ঋ গা ক্ষা পা দা পা ক্ষা দা ন র্সা
র্সা ন দা পা ক্ষা গা ক্ষা ঋ গা ঋ সা
আকাশ তন্ময় হয়ে শুনছে, আর তার মনে হচ্ছে নদীর উপরে সন্ধ্যা নেমে আসছে । ওস্তাদ দীর্ঘ আধাঘণ্টা ধরে একমনে সুর ভেজে চললেন, আকাশ শুধু শুনে চল, কিছুই বোঝে না, কিন্তু সে বুঝতে পারে তার মগজে সেই সুরগুলি যেন বসে যাচ্ছে ।
‘জানিস, এটা কি রাগ ? এটা হচ্ছে পুরিয়াধানেশ্রী । এখানে কড়ি মা আর কোমল ধা কেমন করে লাগলো দেখলি, আবার শুদ্ধ গা দিয়ে কোমল রেখাবে কিছুক্ষণ বসে থেকে সা এ এসে থামল । আকাশ এসবের কিছুই বোঝে না, শুধু শুনে যায়, আর ওস্তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে । ওস্তাদ জানেন  আকাশ কিছুই বোঝে না, তবু এসব বলতে থাকেন আর তার মুখমণ্ডলে ভেসে ওঠে এক স্বর্গীয় আনন্দ । আবার তাঁরা উঠে পড়ে, বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে । একটা স্থায়ীয় বাজারে এসে থামেন ওস্তাদ, একটা দোকান থেকে কয়েকটা চকোলেট কেনেন, তারপর আকশের হাতে দিয়ে বলেন ‘যাও, সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে, চকোলেট খেতে খেতে বাড়ি চলে যাও’
আকাশ বিস্ময়ের ঘোর নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে । একটা চকোলেট মুখে পুরে চুষতে থাকে আর মাথায় ঘুরতে থাকে-
ন ঋ গা ক্ষা পা দা পা ক্ষা দা ন র্সা
র্সা ন দা পা ক্ষা গা ক্ষা ঋ গা ঋ সা...

এটা তেরতম বাসা বদল । তার বিয়ের বারো বছর পেরিয়ে গেছে, তেরই পড়বে আগামী অগাস্টে । বার বছরে তেরবার বাসা বদল । বাসা বদল যেন একটা বাৎসরিক উৎসব হয়ে দাঁড়িয়েছে । এই ক’বছরে তাদের বাসা বদলের একটা বাহিনী দাঁড়িয়ে গেছে । খবর দেয়া মাত্র তারা তাদের ভ্যানগাড়ি নিয়ে এসে হাজির হয়ে পড়ে । ওরা এসে সবকিছু ঠিকঠাক মত নতুন বাসায় তুলে দেয় সব মালামাল । তারপর কয়েকদিন চলে নতুন বাসা সাজাবার ধকল, সেসব করে দোলনের মা । দোলন এসব দেখে আসছে, এইবার নিয়ে সে নয়বারম দেখবে । নতুন বাসায় গেলে দোলন খুশীই হয় । আকাশ এবং সুমনা তাদের প্রথম সংসার পাতে ছয়শ টাকার একটা বাসায় । তাও আবার একজনের সংগে ভাগাভাগি করে । একটা মাত্র ঘর, নিজের, বাথরুম, রান্নাঘর শেয়ার করতে হয় । সে এক সময়ন গেছে বটে । দোলন যখন জন্ম নিল, এই শউয়শ টাকার বাসাটা ছেড়ে তারা উঠে এলো পনেরশ টাকার বাসায়, এখানে দুটো কক্ষ, বড় বড়, রান্না ঘর, বাথরুম মিলিয়ে একটি ছোট্ট সংসারের জন্য দারুণ উপযুক্ত ।

সুমনার সংগে দেখা হয়েছিল একটা গানের অনুষ্ঠানে, সেই অনুষ্ঠানে কয়েকটা গান গেয়েছিল আকাশ । দারুণ গেয়েছিল, দর্শকরা হাততালিতে ফেটে পড়েছিল । অনুষ্ঠান শেষ হলে আকাশ দেখে তার দিকে এগিয়ে আসে একটি মেয়ে, একদম সামনে এসে দাঁড়ায়,
‘কথা বলতে পারি’ ?
‘নিশ্চয়’
‘অপূর্ব গান করেন আপনি, খুব ভাল লেগেছে’
‘অশেষ ধন্যবাদ’
‘আবার কোন অনুষ্ঠানে গান করলে কি করে শুনতে পাবো’ ?
‘আমি জানাবো’
‘কি করে’ ?
আকাশ হেসে ফেলে ‘তাই তো’
সুমনা একটা কার্ড বের করে দেয়,
‘এখানে আমার সেল নম্বর দেয়া আছে, প্লিজ জানাবেন, আপনার গান আমার দারুণ পছন্দ হয়েছে’
আকাশ ধন্যবাদ দেয়, সুমনাও ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যায় । আকাশ নেইম কার্ডটা চোখের সামনে নিয়ে আসে,
‘সুমনা রহমান, পরিচালক, আমার বাংলাদেশ’ এর পর ঠিকানা এবং সেল নম্বর দেয়া । তারমানে মেয়েটির নাম সুমনা, একটা এন জি ও চালায় । এন জি ও নামটা দেখেই আকাশের ভেতর একটা মিশ্র অনুভূতি হয় । সে জানে এন জি ও কি । কিন্তু সব ছাপিয়ে মেয়েটির মুখশ্রী তাকে অন্য এক অনুভূতিতে জাগিয়ে তুলল, মেদহীন একটা ছিপছিপে গড়ন, পরিষ্কার কণ্ঠস্বর, প্রমিত উচ্চারণ, কোন রকম আড়ষ্টতা ছাড়াই বলে গেল তার পছন্দের কথা, শুধু তাই নয় আবার শুনবার আগ্রহ প্রকাশ করলো । আগেও এমন হয়েছে দুএকবার, কিন্তু এই মেয়েটি সবার থেকে যেন আলাদা, অন্যরকম । আকাশের মনের ভেতর একটি মুখ গেঁথে গেলো ।

ইন্টারমেডিয়েট পাশ করার পর একদিন আকাশ বাড়ির সবার অগোচরে ঢাকায় চলে আসে । ততদিনে গান তার ধ্যান জ্ঞান হয়েন উঠেছে । প্রতিদিন ওস্তাদ ওয়াজিউদ্দিনের কাছে চলছে তালিম, ওস্তাদ তার উপর বেজায় খুশী ।
‘তুই এক কাজ কর আকাশ, তুই ঢাকায় চলে যা, বড় কোন ওস্তাদের কাছে নাড়া বাঁধ’। আকাশ ওস্তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, কিছু বলতে পারে না । কি বলবে সে ? এতদিন তাঁর কাছে গানের যে শিক্ষা সে রপ্ত করেছে, তার কোন তুলনা নাই কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ওস্তাদ তাকে আরও বড় কোন ওস্তাদের কাছে পাঠাতে চান । কিন্তু তা কি করে সম্ভব ? আকাশ কি ঢাকায় গিয়ে কোন ওস্তাদের কাছে শিখতে পারবে ? তেমন সামর্থ্য কই ? সে মনে মনে চুপসে যায় । সেদিন কোন তালিম না নিয়েই বাড়ি ফিরে আসে আর তার মাথায় ঘুর ঘুর করতে থাকে একই কথা ‘আকাশ তুই ঢাকায় চলে যা, বড় কোন ওস্তাদের কাছে নাড়া বাঁধ’ ।
যেদিন ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষার ফল বেরুলো, আকাশ গেল তার এক বন্ধুর কাছে, সেই বন্ধু লেখাপড়া ছেড়ে ব্যবসায় নেমেছে, শুনেছে ভাল করছে সে । সেও দরিদ্র, বাবা মারা যাওয়ার পর বাড়ির হাল ধরেছে সে ।

‘দোস্ত, একটা আবেদন নিয়ে এসেছি’
লতিফ তার মুখের দিকে চায়, ‘আমার কাছে আবার কিসের আবেদন, দোস্ত, তুই তো ভাল ছাত্র, অসাধারণ গান করিস, আমি সাধারণ একজন ছাপোষা মানুষ, আমার কাছে আবার কিসের আবেদন’ ?
‘আমি ঢাকায় যেতে চাই, তুই তো জানিস আমার বাবার সে সামর্থ্য নাই, তুই আমাকে কিছু টাকা ধার দে’
লতিফ আকাশের মুখের দিকে তাকায়, সে তার নিজের কথা ভাবে, সে দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়া করতে পারে নাই, আকাশ দরিদ্র কিন্তু লেখাপড়া করতে চায়, তার মনের ভেতরে একটা অন্যরকম অনুভূতি খেলে গেল ।
‘কত টাকা হলে তোর চলবে, বলতো’ ?
‘আপাতত তুই আমাকে হাজার কাহ্নেক টাকা দে’
লতিফ এক হাজার টাকা আকাশের হাতে তুলে দেয়,
‘এই টাকা কোনোদিন তোকে ফেরুত দিতে হবে না’
আকাশ এই কথা শোনা মাত্র বিহ্বল হয়ে পড়ে, কি বলবে কিংবা করবে বুঝে উঠতে পারে না, লতিফকে সে আলিঙ্গন করে, দীর্ঘ সময় ধরে থাকে তারপর বাড়ি ফিরে আসে । পরদিন সকালে সে রওয়ানা দেয় ঢাকার উদ্দেশ্যে, বাড়ির কোন লোক ঘুণাক্ষরেও টের পায় না ।
ঢাকায় এসে সে প্রথমে ওঠে একটা মেসে, তারপর ভর্তি হয় মিউজিক কলেজে । মিউজিক কলেজের শিক্ষক ওস্তাদ শ্যামল চৌধুরীর কাছে সে আলাদা ভাবে নাড়া বাধে । বি মিউজিক শেষ করে বেরিয়ে আসে, তারপর শুরু হয় তার কঠিন জীবন । দিনে দিনে গান শেখানো হয়ে ওঠে তার পেশা । মাঝে মাঝেই ডাক পড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ।

নতুন বাসাটা আগের চেয়ে সামান্য বড়, ভাড়াও বেশি । দোলন খুব খুশী । এখন সে বেশি জায়গায় ছুটাছুটি করতে পারে । এমনকি মাঝে মাঝে ফুটবলও খেলতে শুরু করে দেয় বাবার সংগে ।
‘আচ্ছা, বাবা, শহরের বাসাগুলি এমন কেন’ ?
‘কেমন’ ?
‘ছোট ছোট, খেলার জায়গা নাই, মাঠ নাই, গাছপালা নাই বাড়ির আশেপাশে’
‘তোমার কেমন বাড়ি পছন্দ, মা’ ?
‘ঠিক তোমার গ্রামের বাড়ির মত’
আকাশ চমকে ওঠে, দোলনের চোখের দিকে তাকায়, দেখতে পায় তার ভেতরে দুটো চিত্র, আনন্দ এবং বেদনা । বিয়ের ছয় বছরের মাথায়, দোলনের বয়স যখন প্রায় সাড়ে তিন, গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গেছিল । ঐ একবারই । বাড়ির মাঝখানে একটা বড় আঙিনা, আঙিনার কিনারে হরেক রকম ফুলের গাছ দোলনকে মুগ্ধ করে । বাড়ির পেছনে আদিগন্ত মাঠ, মাঠ জুড়ে ফসল, বড় বড়  আমগাছ, কাঁঠাল গাছ, নিমগাছ, বিশাল একটা বাঁশ ঝাড়, ঠিক তার পাশেই একটা পুকুর । দোলন এইসব কখনো দেখে নাই, ঘুম থেকে উঠে যখন সে বাবার সংগে বাড়ির পেছনে এসে দাঁড়ালো, খুশিতে সে যেন আটখানা হয়ে উঠলো । বাবার হাত ছেড়ে ছুটোছুটি করতে শুরু করে দিল । যে কটা দিন ছিল, দোলন প্রায় সারাদিন বাড়ির পেছনে ছুটে বেড়াতো । তার সারা গায়ে পোকামাকড়ের কামড়ে ভোরে গেছিল, সেদিকে তার কোন খেয়াল ছিল না, কোন অভিযোগ ছিল না । ঢাকায় ফেরার দিন, মনে পড়ে, সে খুব মন খারাপ করেছিল, কপ্যেক ফোঁটা চোখের জলও ফেলেছিল ।
‘তাহলে চল, আমরা গ্রামে চলে যাই’
‘বাবা ওখানে কি আর্ট স্কুল আছে’?
‘না, নেই’
‘তাহলে কি করে যাবো’ ?
‘তাই তো । তোমাকে তো অনেক বড় চিত্রশিল্পী হতে হবে’
‘ঠিক বলেছ বাবা, আমি বড় হয়ে চিত্রশিল্পী হবো’
এই বলে সে আর্ট পেপার আর রঙের বাক্স নিয়ে বসে গেলো ছবি আঁকতে ।
ঠিক এইসময় সুমনা এসে বসলো ড্রইংরুমে । মুখ গম্ভীর,
‘তুমি কি একটু আমার রুমে আসবে’ ?
‘চল’
দোলন একবার তাদের দিকে মুখ তুলে চাইল, তারপর ছবি আঁকায় মন দিল । আকাশ সুমনার পিছে পিছে তার রুমে ঢুকল । বাসা বদলের পর প্রথম এই রুমে আকাশ ঢুকল । এর আগে গত বাসাটায় সে সুমনার রুমে প্রায় ছমাস ঢুকে নাই । বিয়ের তিন বছরের পর থেকেই তাদের মধ্যে নানা মতানৈক্য শুরু হয় । এই মতানৈক্য প্রধানত অর্থনৈতিক, আকাশ গানের টিউশনি করে যা উপার্জন করে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম । সুমনাই বলতে গেলে বাসা চালায় । প্রথম প্রথম এই নিয়ে তাদের মধ্যে কোন আলাদা চিন্তা ছিল না । ক্রমে এই চিন্তা দানা বেঁধেছে এবং এই নিয়ে প্রথম কথা বলেছে সুমনা
‘তুমি তো দেখছি উপার্জনের কোন চেষ্টাই করছ না, শুধু গান শিখিয়ে ক’টাকা আয় করবে ? তা দিয়ে কি সংসার চলবে ? আমি কি সবকিছু সামলাবো’ ?
আকাশ এই কথা শুনে হতবাক হয়, কিন্তু ধীরে ধীরে সেও অনুধাবন করতে থাকে তাকেও অর্থ উপার্জনের জন্য ভিন্ন চিন্তা করতে হবে । কিন্তু সত্যি হচ্ছে এটা তার করা হয়ে উঠেনি । যত সময় গেছে তাদের দুজনের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে । মাঝে মাঝেই তারা ঝগড়া করেছে । এইন টানাপড়েন নিয়েই কেটে গেছে আরও নটি বছর । এখন তাদের বারো বছর চলছে ।
‘আমি তোমার সংগে থাকতে চাইছি না’ সুমনা বিছানায় বসে প্রথম কথা বলে,
আকাশ চমকায়নি কথাটা শুনে, বরং সে বুঝতে পারছিল এমন একটি কথাই সে বলতে যাচ্ছে । কেননা গত বাসায় একদিন রাত চারটায় ঘুম ভেঙে আকাশ বিছানা থেকে উঠে ড্রইং রুমে উঁকি মেরে দেখে সুমনা কার সাথে যেন কথা বলছে । তখন তারা আলাদা ঘরে ঘুমাত । আকাশ আশ্চর্য হয়, এতো রাতে সুমনা কার সাথে কথা বলে ! এগিয়ে যায় আকাশ, একদম মুখোমুখি দাঁড়ায়,
‘এতো রাতে কার সাথে কথা বল’ ?
‘সে কৈফিয়ত কি তোমাকে দিতে হবে আমাকে’ ? সুমনা ঝাঁঝের সংগে বলে ওঠে। আকাশ আর কিছু জিজ্ঞেস করে না , নিজের রুমে ফিরে যায় । পরেরদিন সকালে সুমনা তাকে জানিয়ে দেয় সে তার সংগে আর একত্রে থাকবে না ।
‘কি করতে চাইছ’ ?
‘ডিভোর্স’ বলে সে একটা খাম তার হাতে দেয়
‘কি এটা’ ?
‘ডিভোর্স লেটার, সই করে দিও’
আকাশ ডিভোর্স লেটারটা নিয়ে সুমনার রুম থেকে বেরিয়ে আসে । ড্রইং রুমের দিকে হাঁটতে থাকে, একটা সোফায় গিয়ে বসে ।
‘বাবা, বাবা, আমি তোমাকে জন্য একটা বাড়ি বানিয়েছি’
‘তাই নাকি ? দাও দেখি’
দোলন তার সদ্য আঁকা ছবিটা বাবার হাতে তুলে দেয় । বাবা দেখে একটা বাড়ির পেইন্টিংস । ঠিক যেন তার গ্রামের বাড়িটা ! আকাশের বাম হাতে ডিভোর্স লেটার, ডান হাতে দোলনের আঁকা বাড়ির ছবি !

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন