শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

কথাকার অলোক গোস্বামীর মুখোমুখি দেবায়ন চৌধুরী ও পুরুষোত্তম সিংহ। পারক গল্পপত্র




(কথাকার অলোক গোস্বামী এসময়ের একজন ব্যতিক্রমী কথাকার। আখ্যান ভাবনায় তিনি স্বতন্ত্রতার দাবিদার। জন্মসূত্রে উত্তরবঙ্গের মানুষ হলেও বর্তমানে কলকাতায় থাকেন। দুটি উপন্যাস ‘বাতিল নিশ্বাসের স্বর’, ‘অদ্ভুত আঁধার’ এর পাশাপাশি অনেকগুলি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে – ‘সময়গ্রন্থি’, ‘জলছবি’, ‘আগুনের স্বাদ’, ‘কথা কিংবা কাহিনি’ ‘দশটি গল্প’, ‘১৫টি গল্প’। সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে নয় আখ্যান নির্মাণের ভাবনা থেকেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ কথাকার হয়ে ওঠেন। ‘গল্পবিশ্ব’ পত্রিকার সম্পাদনার পাশাপাশি, উত্তরবঙ্গের লেখকদের নিয়ে সম্পাদনা করেছেন ‘উত্তরায়ণ’। পারক-ই ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে এ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল করোনার ভয়াবহ দিনগুলিতে।)

পুরুষোত্তম : প্রথম থেকেই প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা করে এসেছেন। তা আজও বর্তমান। আবার বিরোধীতার মধ্যেও দেখেছেন কারো কারো হাত ধরে এগিয়ে যাবার প্রচেষ্টা। অথচ আপনি অটল। এই যে অনমণীয় মানসিকতা এর ভিত্তিমূল কোথায় ?

অলোক গোস্বামী :-হাতধরা হাতছাড়া, এসব অভ্যেস ব্যক্তি চরিত্রে লুকিয়ে থাকে। আমি বরাবরই সোজা-সাপ্টা কথায় অভ্যস্ত। তাবলে কাউকে কখনও তোষামোদের যে চেষ্টা করিনি তেমনটা নয়। করেছি কিন্তু মুসকিলটা হলো যাকে তুষ্ট করতে চেয়েছি তিনি সেই তোষামোদে আস্থা তো রাখেনইনি উল্টে সন্দেহের চোখে দেখেছেন। শীগ্রি বুঝে গিয়েছি শুধু কথা দিয়ে কাউকে তুষ্ট করা যায় না, তার জন্য প্রয়োজন হয় চোখেমুখেও ভিখিরিপণা ফুটিয়ে তোলা। সেটা আমি চাইলেও আমার চোখ মুখ ভাবভঙ্গী বিদ্রোহ করবে। সুতরাং ওপথে আর হাঁটিনি। তবে স্পষ্ট কথা যখন কারো পক্ষে গিয়েছে তখন সে এসে হাত ধরার চেষ্টা করেছে কিন্তু পরবর্তী লক্ষ্য সে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাত ছেড়ে দিয়েছে। আমার কিছু এসে যায়নি। ভবিষ্যতেও যাবে না বলে মনে হয়।

পুরুষোত্তম : ‘হলফনামা’ শীর্ষক জবানবন্দিতে আপনি লিখেছেন ‘আমি বামপন্থায় যতটা আস্থাবান, বামফ্রন্টের তো ততটা নই’, তবে আপনাকে যতদিন ধরে চিনি মনে হয়েছে বামমনস্ক। আমার ধারণা ভুলও হতে পারে ! আশা করি সে ধারণা ভেঙে দেবেন। কিন্তু আপনি গল্প উপন্যাসে বামপ্রন্থী রাজনীতির নঞর্থক দিক, শুধু বামপ্রন্থী নয় যেকোন রাজনৈতিক দলের তুলধনা করেন- কোন চেতনা থেকে এই কলম তুলে নেন ?

অলোক গোস্বামী :- কারণ বামপন্থা মানে মার্কসবাদই একমাত্র নীতি যেখানে সমাজ পরিকাঠামোর পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। শ্রেণী বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে শ্রেণী সংগ্রাম বিনা মানুষের মুক্তি নেই। এবং এগুলো কোনোটাই বিড়লা বাড়িতে ঘাঁটি গেড়ে, ছাগলের দুধ খেয়ে স্বকপোলকল্পিত ধারণা নয়। এর জন্য সারা পৃথিবীর ইতিহাস, বিজ্ঞান ঘাঁটতে হয়েছে। যেহেতু মেহনতি মানুষের কথা বলা হয়েছে তাই সারা পৃথিবীর মেহনতি মানুষ আস্থা রেখেছে মার্কসবাদে। অর্থাৎ বুঝতেই পারছো, মার্কসবাদীদের কাছে কোনো বিচ্যূতি কিংবা শ্রমিক বিরোধী আচরণ আশা করা যায় না। সমালোচনা করতে হলে একমাত্র ওদেরই করা যায় কারণ আস্থাটা ওদের প্রতিই আছে। এ প্রসঙ্গে আমার মায়ের কথা বলি। প্রতিবার ভোটের আগে মা আতঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞেস করতো, ওরা ক্ষমতায় আসবে না তো!
ওরা মানে কংগ্রেস। মা তৃণমূল দেখে যেতে পারেনি। বেঁচে থাকলে হয়ত ওদের নিয়েও আতঙ্কিত হোত। কিন্তু মা কেন বামফ্রন্টকে চাইতো। মা তো মার্কসবাদ বুঝত না! আসলে মা, ফারাকটা বুঝতো। বুঝত, কারা মানুষের ভালো চায়। সুতরাং বুঝতেই পারছ আমি কেন বামপন্থীদের দিকে আঙুল তুলি।

পুরুষোত্তম : যে সময়ে বেশির ভাগ লেখক ক্ষমতার পাশে থেকে নিজের সুনাম যশ অর্জন করতে চাইছে তখন আপনি সচেতন ভাবেই রাজনৈতিক দলগুলির নঞর্থক দিকগুলি নিয়ে ব্যঙ্গ করেন। সে তুলধনা আবার সরাসরি নাম স্পষ্ট করে দিয়ে। রাজনীতির প্রতি বিতৃষ্ণা না আস্থাভঙ্গ – সৃষ্টিমূলে কোন প্রেরণা কাজ করে ?

অলোক গোস্বামী : বিতৃষ্ণার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ ওটাই শাসকদের স্ট্র্যাটেজি। ওরা চায় সাধারণ মানুষকে রাজনীতি নিরপেক্ষ রাখতে। চায়, মানুষ শুধু ভোটাধিকার প্রয়োগ করেই সন্তুষ্ট থাকুক। সেজন্যই বিনোদনের এত অঢেল বন্দোবস্ত। একটা উদাহরণ দিই, বাজার চালু সিনেমায় দেখবে রাজনৈতিক নেতা/মন্ত্রীকে ভিলেন হিসেবে দেখানো হয়। কখনও ভেবে দেখেছ সেন্সরবোর্ড কেন এটাকে অনুমোদন দেয়? এ কারণেই দেয় যাতে মানুষ রাজনীতির প্রতি বীতস্পৃহ হয়ে ওঠে। যাতে স্মার্টনেস বলতে বোঝে, রাজনীতি বিষয়ে অজ্ঞ থাকা। আমি একজন সচেতন মানুষ এবং লেখক হিসেবে সেই ফাঁদে পড়ি কিভাবে!

পুরুষোত্তম : আপনার আখ্যানগুলিকে আমরা রাজনৈতিক আখ্যান বলতে পারিনা। যেমন ভাবে ‘জাগরী’ বা অন্যকোন উপন্যাসকে দাগিয়ে দিতে পারি রাজনৈতিক উপন্যাস বা গল্প। কিন্তু আপনার আখ্যানের চোরাস্রোতে প্রবল ভাবে রাজনীতি উঠে আসে। সমান্তরাল ভাবে কাহিনির পাশাপাশি রাজনীতি সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠতে দেখি – যদি কিছু বলেন।

অলোক গোস্বামী : যে কোনো আখ্যানই গড়ে ওঠে সময়ের দাবী মেনে। জাগরীও তাই। শুধু জাগরী কেন, ঢোঁড়াইচরিত মানস-এও আখ্যানের পাশাপাশি তৎকালীন রাজনীতি ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে। আমার পছন্দ দ্বিতীয় ধারাটি। কারণ সতীনাথ প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। খুব কাছ থেকে দেখেছেন রাজনীতির ত্রুটি এবং সীমাবদ্ধতাগুলি। আমি তো বাইরের মানুষ। আমি রাজনৈতিক উপন্যাস লিখতে গেলে সেটা সমরেশ মজুমদার মার্কা হয়ে ওঠাটা স্বাভাবিক ছিল, মানে নকশাল আন্দোলনকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে প্রেম কহানি বেচে খাওয়া কেস, ওরকমই কিছু হোতো হয়ত। সেই ভয়েই...

দেবায়ন : অলোকদা, ‘উত্তরায়ণ’ নামে ‘উত্তরবঙ্গবাসী লেখকদের গল্প-সংকলন’  করেছিলেন আপনি, ২০০৬ সালে বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। তার ভূমিকায় আপনি স্পষ্টত বলেছিলেন –‘বাসভূমির বিচারে পাঠক বিভক্তিকরণের স্পর্ধা কারো নেই।‘ খবু জানতে ইচ্ছে করে সাম্প্রতিক উত্তরের লেখালেখি নিয়ে আপনি কীভাবে ভাবছেন ?

অলোক গোস্বামী : কিচ্ছু ভাবছি না। ভাবানোর মতো কোনো উপাদান পেলে তো ভাববো? তুমিও তো উত্তরবঙ্গেরই মানুষ, তুমিই বলো না কি ভাবছ?

পুরুষোত্তম : আপনার গল্প উপন্যাসে যেটা বিশেষ ভাবে লক্ষ করেছি তা হল আপনি একটি ঘটনা সম্পর্কে বিশ্লেষণে জোড় দেন। একটি ঘটনাকে সামনে রেখে একাধিক মতবাদ, পক্ষ-বিপক্ষে মত রেখে একটি সত্যে পৌঁছে যান। কাহিনি চরিত্রের হাতে গেলেও নিজেই যেন ঘটনা নিয়ন্ত্রক হিসেবে সর্বক্ষণ উপস্থিত থেকে কাহিনিকে ধরে রাখেন – কীভাবে এই নির্মাণ প্রক্রিয়া গড়ে তোলেন ?

অলোক গোস্বামী : কারণ আমি জানি সত্য বহুমাত্রিক। এক একটা ঘটনার সত্য মানুষ ভেদে বদলে যায়। তাছাড়া সত্য এক নিষ্ঠুর বিকৃতিও বটে। পান থেকে চুন খসলে অর্থ বদলে যায়। বরং মিথ্যা পরম সুন্দর এক আবিষ্কার। মানুষ মিথ্যে বলতে, ভাবতে শিখেছিল জন্যই এত সুন্দর একটা সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছে। অন্য জীবকুলের সঙ্গে তার ফারাকটাও এখানেই, এই মিথ্যেটুকু। মিথ্যের জন্য সৃষ্টিশীলতা প্রয়োজন হয়, প্রয়োজন হয় কল্পনাশক্তির। সত্য আকাট। নির্মম। মানুষকে বিমর্ষ করে। বরং মিথ্যে বেঁচে থাকতে প্রণোদনা জোগায়। মিথ্যেটাই শিল্প।

পুরুষোত্তম : অন্যান্য লেখকরা যখন শেকড়চ্যুত মানুষের কথা বলতে অভ্যস্ত তখনই আপনি ‘অদ্ভুত আঁধার’ এ বলে বসলেন –মানুষের মতো শেকড়বাজ আর কোন প্রাণী নেই। যদিও এ উপন্যাস শেকড়চ্যুত মানুষেরই বৃত্তান্ত, কিন্তু এই যে আখ্যানের বিপ্রতীপ স্বর, শুধু এ উপন্যাস নয় বহু গল্পেও তা বর্তমান –কীভাবে এই বিপ্রতীপ আখ্যান নির্মাণ করেন।

অলোক গোস্বামী : মানুষ কি স্বেচ্ছায় শেকড়চ্যুত হোতে চায়? যতদিন পারে জুড়ে থাকার চেষ্টা করে। দুয়েকটা ছিঁড়লেও বাদবাকিটুকুর ওপর ভরসা রেখে চেষ্টা করে থিতু হওয়ার। ততদিন, যতদিন না তার মূল শেকড়টাকেও উপড়ে ফেলা হয়। শেকড়চ্যুত হওয়া সত্বেও মানুষ যে ফের চেষ্টা করে মূল মাটিতে ফিরে যাবার তার জ্বলন্ত উদাহরণ ইজরায়েল রাষ্ট্র। ফিরে গিয়ে অন্য মানুষকে বাস্তুচ্যুত করার চেষ্টা। যে ঘমাসান লড়াই প্যালেস্টাইন এবং ইজরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলছে জানোই তো তার কথা।

পুরুষোত্তম : ‘অদ্ভুত  আঁধার’ উপন্যাসে কলোনির মানুষের সংলাপে বা বহু গল্পেও চরিত্রের সংলাপে খিস্তি খেউড় নিয়ে উপস্থিত হন। এ উপন্যাসে তো  সামান্য খিস্তির জন্য একটি ছেলের পড়াশোনার সমাপ্তি ঘটে গেল, যদিও উপন্যাসের চিত্রে তা অত্যন্ত বাস্তব, আপনার কথাসাহিত্যে ব্যবহৃত অশ্লীলতার প্রয়োগ নিয়ে যদি কিছু বলেন।

অলোক গোস্বামী : দ্যাখো, খিস্তি ব্যাপারটা অনেকটা একজস্ট পাইপের মতো। ব্যর্থ, পরাজিত মানুষের ক্ষোভ নিঃসরণের একমাত্র উপায়। খিস্তি ব্যাপারটা না থাকলে হয়ত মানুষ আরও বেশী খুন করতো কিংবা আত্মহত্যা করতো। যত বড় ইন্টেলেকচুয়ালই হোন, তীব্র অপমানবোধ থেকে কখনো মনে মনে কাউকে দু-চার অক্ষর উপহার দেয়নি এটা মানতে পারবো না। খিস্তি যে সব সময় অপরের ওপরে প্রয়োগ হয়, তা নয়, মানুষ নিজের ওপরে বিরক্ত হলেও নিজেকে দেয়। অদ্ভুত আঁধার উপন্যাসটার মূল কুশীলব যারা আমি তাদের খুব কাছের থেকে দেখেছি। মিশেছি। বলতে পারো প্রায় ঘরের লোকের মতো। সুতরাং ওদের কথাবার্তার ধরণ আমার ভালোই জানা, তাই ব্যবহার করেছি। তবে খেয়াল কোরো, মূল চরিত্র বিজু কিন্তু কোনো খিস্তি পারতপক্ষে দেয়নি। ওর ভেতরে খানিকটা হলেও রুচি-অরুচি বোধ ছিল। সেজন্যই বেচারির এত দুর্গতি।

দেবায়ন : সম্প্রতি দেবেশ রায় প্রয়াত হলেন। তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন প্রবন্ধ, গদ্য, স্মৃতিচারণমূলক লেখা প্রকাশিত হচ্ছে ; কিন্তু সেখানে তাঁর রাজনৈতিক ভাবার বদল নিয়ে বিস্তারিত কথা পাচ্ছি না। আমাদের ভুলও হতে পারে, যাইহোক, ধ্রুপদি আধারে আখ্যানকে বিন্যস্ত করতে গিয়ে মনে হয় না তিনি মাঝেমাঝেই পাঠকের ধৈযচ্যুতি ঘটিয়েছেন, নাকি পাঠককেও তিনি নতুন অভ্যাসে জারিত করতে চেয়েছিলেন ? আপনার মতামত জানতে চাই। একজন লেখক আরেকজন মহান স্রষ্টাকে কীভাবে দেখছেন।

অলোক গোস্বামী : এর উত্তর ভাই দেবেশ রায়ই দিতে পারতেন। অবশ্য দিতেন কিনা জানি না কারণ একবার আমি সরাসরি ওঁর ওসব প্যাঁচ পয়জার নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলাম। উত্তর পাইনি। হয়ত নাদান পাঠক ভেবে উপেক্ষা করেছেন। সে যা হোক, ভাষা যার যার তার তার। নিজস্ব চিন্তা চেতনা থেকে গড়ে ওঠে। বঙ্কিমচন্দ্র পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ যখন লিখতে এলেন তখন কিন্তু সহজ সরল ভঙ্গীতেই ভাবনার প্রকাশ ঘটিযেছেন। শুধু গল্প কিংবা উপন্যাসে নয়, প্রবন্ধেও। ওঁর আসল সম্পদটা ছিল দর্শনে, গদ্যের মারপ্যাঁচে নয়। আমি যেভাবে কথা বলি সেভাবেই লেখার চেষ্টা করি। কেউ কেউ পছন্দ করেন কেউ বা আবার মুখ বাঁকিয়ে সুনীল গাঙ্গুলি স্টাইল বলেন। বলুক গে। সুনীলবাবুর মতো ঝরঝরে ভাষায় লিখতে পারলে আমার কিন্তু ভালোই লাগবে।

পুরুষোত্তম : বিজু, বকাই সেন, ইরফানরা (অদ্ভুত আঁধার ) মৃত্যু অনিবার্য জেনেও সে পথেই এগিয়ে গিয়েছিল, আবার বেশকিছু গল্পে দেখি মৃত্যুর প্রেক্ষাপট ,পটভূমি ( ইছামতী, শেষ প্রশ্ন, হৃদয় জোছনা, সহ একাধিক গল্প ) তৈরি করেও মৃত্যু ঘটেনা। মৃত্যু সম্পর্কে আপনার কোন বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে না কাহিনির অবধারিত পরিণতি হিসেবে উপস্থিত হয়েছে।

অলোক গোস্বামী : মৃত্যু আমাকে ভাবায়। এ এক অনিবার্য পরিণতি অথচ কী আশ্চর্যময়! প্রতি রাতে ঘুমোতে যাবার সময়ও জানি না পরের দিনটা দেখব কিনা। জেগে ওঠার বিশ্বাস নিয়ে ঘুমোই। আবার কত মানুষ নিজেই নিজেকে শেষ করে ফেলে। মনস্ততঃ ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখবে জানি না তবে আমার কাছে বিস্ময়কর লাগে। জীবনানন্দ এটাকেই বিপন্ন বিস্ময় বলেছিলেন হয়ত। আরও একটা বিষয় আমাকে কৌতূহলী করে, সেটা হলো যৌনতা। ট্যাবুমুক্ত কিংবা ট্যাবুবাদী দেশেও কিন্তু যৌনতাকে কেন্দ্র করে প্রায় একই ধরণের ঘটনা ঘটে। যেমন ধরো ধর্ষন। কেন ঘটে? যৌনতা তো অনেকদেশে সহজলভ্য! বুঝি না!
আমার লেখায় চেষ্টা করি যৌনতা এবং মৃত্যুকে ছোঁয়ার। তবে ব্যাপারটা অত সহজ নয়। লেখককে একটা তারের ওপরে ব্যালেন্স বজায় রেখে হেঁটে যেতে হয়। মৃত্যুর দিকে বেশী ঝুঁকলে মর্বিড লেখা হয়ে যাবে। যৌনতার দিকে অধিক ঝুঁকলে অশ্লীলতা হয়ে যাবে।
চেষ্টা করি। পারি কিনা জানি না।

পুরুষোত্তম : সমস্ত লেখক যখন লেখেন – কোন চরিত্রের সঙ্গে বাস্তবের মিল খুঁজে পাওয়া গেলে তা অনিচ্ছাকৃত, আপনি তখন ‘অদ্ভুত আঁধার’ এর পশ্চাদ অংশে উপন্যাস পরিচয়ে লিখলেন –‘স্থান-কাল-পাত্রের সঙ্গে বাস্তবের মিল খুঁজে পাওয়া গেলে সেটা আদৌ কাকতালীয় নয়, বরং ইচ্ছাকৃত।‘ – এই যে আখ্যানকে বিপ্রতীপ স্বরে নিয়ে যাওয়া, এমনকি সে প্রচেষ্টা একেবারে লেখক জীবনের প্রথম থেকেই সচেতন ভাবে। প্রথম থেকে ঠিক করেই কি শুরু করেছিলেন কোন পথে যাবে আপনার সাহিত্যচিন্তা, না লিখতে লিখতে হয়ে গেছে ?

অলোক গোস্বামী : যাহা বলিব সত্য বলিব? লিখতে লিখতে হয়ে গিয়েছে। যখন ভেবে পাচ্ছিলাম না বিজুকে নিয়ে শেষ অবধি কী করবো তখনই মাথায় চিন্তাটা উঁকি মেরেছিল।হয়ত সত্য ঘটনাটা মাথার ভেতরে ঘাপটি মেরে লুকিয়েছিল। সুযোগ পেয়ে ফুঁড়ে বেরিয়েছে। তবে যেটাই হোক, ব্যাপারটা বোধহয় ভালো হয়নি। অনেকেই আপত্তি জানিয়েছে। বিশেষ করে যারা সত্য ঘটনাটার ঘাতে প্রচন্ড আহত হয়েছিলেন তারা আমার সাফাইগুলোকে ভালো ভাবে মেনে নেয়নি। সে না-ই বা নিলো। আমি তো সেই ধনঞ্জয়ের বায়োগ্রাফি লিখিনি। আমার প্রধান চরিত্র এক উদ্বাস্তু সন্তান যে কিনা উত্তরবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিল।

পুরুষোত্তম : ‘আগুনের স্বাদ’ গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন সোমেন চন্দ স্মৃতি পুরস্কার ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে। অথচ সেখানে বেশ কিছু গল্পে ( অফুরান রক্তের তিমির, আপাতত কোন সতর্কবার্তা নেই ) বামফন্টের রাজনীতিকে ব্যঙ্গ করেন। সে দল সম্পর্কে আপনার সমস্ত অভিপ্রায় কী ভেঙে গিয়েছেল ? কবে থেকে ধীরে ধীরে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হল।

অলোক গোস্বামী : বামফ্রন্ট যখন ক্ষমতায় আসে আমার বয়স পনের/ষোল। কলেজ জীবনে এস.এফ. আই এবং চাকরি জীবনে বামপন্থী ইউনিয়ন করতে গিয়ে অভিজ্ঞতা হয়েছে। মনে হয়েছে, এসবের অর্থ কী! কেন এসব? তবে বিরূপ ধারনা হলেও চক্ষুশূল হয়নি। আজও আমি বামপন্থী ভোটার।

পুরুষোত্তম : ‘কথা কিংবা কাহিনি’ গল্প সংকলনে পাই –‘যদিও মানুষ বিনা সময়ের মূল্য কেই বা কবে বুঝতে পেরেছে ! অতেব লেখকের পাশাপাশি খানিকটা দায় পাঠকের কাঁধেও রইল।‘ – উত্তর আধুনিকতা পাঠককে কিছুটা পরিসর দান করে। আপনি কী মনে করেন পাঠক বৃত্তকে ঘিরেই এ গল্পগুলি সম্পূর্ণ না অন্যকিছু ?

অলোক গোস্বামী : দ্যাখো, যিনি বলেন পাঠকের জন্য লেখেন না, আমার মনে হয় তিনি মিথ্যে বলেন। আরে বাবা, উপভোক্তা বিনা কোনো বস্তু উৎপাদন হয় নাকি! তাহলে তো লেখাগুলো খাতায় ফেলে রাখলেই হয়, ছাপতে দেয়া কেন? কাউকে পড়ানোর জনই তো? এখন কথা হলো পাঠককে আমি কতটা গুরুত্ব দেব? নিশ্চয়ই আমার যাতে বিশ্বাস নেই তাতে পাঠকের আস্থা থাকলেও লিখতে যাবো না! বরং উল্টোটা, আমার বিশ্বাসটাকেই পাঠকের ভেতরে চারিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবো। সোজা কথা হলো, আগামীকাল কী লিখবো জানি না কিন্তু কী লিখবো না সেটা জানি। সেটা পাঠকের প্রিয় বিষয় হলেও লিখবো না।

দেবায়ন : কিছুদিন হল আপনি ফেসবুকে ধারাবাহিকভাবে খণ্ডে খণ্ডে লিখছেন ‘মেমরি লোকাল’। স্মৃতির সূত্রে এক অন্য ইতিহাস উঠে আসছে। অরুণেশ ঘোষ, হাংরি আন্দোলন, আপনাদের স্বপ্নময় সাহিত্যজীবনের কথা বন্ধুদের ভালো লাগছে। সম্পাদক অলোক গোস্বামীর কথা জানতে চাই। ‘গল্পবিশ্ব’ প্রকাশের সম্বন্ধে যদি কিছু বলেন ....

অলোক গোস্বামী : কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প পর্ব চুকেবুকে যাবার পর গল্প লিখতে শুরু করি। প্রকাশ করি, ‘ক্রমশ’ নামে একটি পত্রিকা। সে পর্বও চুকিয়ে দিয়ে প্রকাশ করি, ‘গল্পবিশ্ব’। ছোটগল্প এবং ছোটগল্প সংক্রান্ত পত্রিকা। বেশ সাড়া পেয়েছিলাম। ওরকম পত্রিকা তো উত্তরবঙ্গে ছিলই না, দুই বঙ্গেও কম ছিল। কয়েকটা সংখ্যার পর নিতান্ত ব্যক্তিগত অসুবিধের কারণে বন্ধ করতে বাধ্য হই। আজও অনেকে জানতে চান কেন গল্পবিশ্ব ফের শুরু করছি না। হাসি। ভাবি। কে জানে হয়ত ফের শুরু করবো!

পুরুষোত্তম : আপনার গ্রন্থের নামে একটা সময়ের চিহ্ন থাকে ( সময়গ্রন্থি, অদ্ভুত আঁধার, বাতিল নিঃশ্বাসের স্বর ) সময় বৃত্তান্ত নিয়েই কী আপনার যাবতীয় ভাবনা ? যদিও সময় সমাজই আপনার আখ্যানের মূল কথা। এমনকি সেই সময় সমাজ সম্পর্কে আপনার দৃষ্টি প্রধান। সময় বৃত্তান্ত নিয়ে আপনার অভিমত যদি জানান।

অলোক গোস্বামী : সময় হলো এক অমোঘ সত্য। কালচেতনা বিনা শিল্প-সংস্কৃতি বৃথা। সাহিত্য নীরবে সময়ের সাক্ষী হয়ে থাকে। প্রাচীন সাহিত্য থেকে আমরা পুরোন সময় বিষয়ে ধারণা করে নিতে পারি। যেমন রামায়ণের কথাই ধরো। আমরা সবাই জানি, রামায়ণও এক সংহিতা। বিভিন্ন কবি বিভিন্ন সময়ে নিজেদের সৃষ্টিকে এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ফলে কাহিনিরও পরিবর্তন ঘটেছে। আমরা সেসব থেকে জানতে পেরেছি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মূল্যবোধ, সামাজিক অনুশাসন কিভাবে বদলে গিয়েছে। এটাও তো সাহিত্য থেকে এক পরম প্রাপ্তি।

পুরুষোত্তম : আমরা ‘বাতিল নিশ্বাসের স্বর’ হিসেবে বর্তমানে যে উপন্যাসটা পড়ছি তা প্রথম সংস্করণের পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ। নিজেই লিখেছেন –‘ফুটো টিনের চালটাকে এমন ভাবে মেরামত করে দিলাম যাতে অবুঝ জল ঢুকে না যায়।‘’ – আগের ভাবনাবলয়কে পুনরায় কীভাবে নির্মাণ করলেন ? পড়তে গিয়ে কোথায় কী মনে হয়েছিল বেশকিছু অংশের প্রয়োজন নেই, তাই কিছু বর্জন, সংযোজন করলেন ?

অলোক গোস্বামী : প্রতিটা লেখা ছাপা হওয়ার পর চেষ্টা করি এড়িয়ে চলার। কেননা পড়তে বসলেই অজস্র ভুল চোখে পড়ে। নিজের ওপরে ক্রোধ জাগে, কেন এই ভুলগুলো করলাম! ইচ্ছে হয় সংশোধন করে ফের ছাপতে দিই। সব সময় সুযোগ মেলে না। তবে সুযোগ পেলে কিন্তু আজও বদলাই। কোনো পুরোন গল্প যদি ফের তোমার চোখে পড়ে তাহলে পড়ে দেখো, হুবহু পাবে না। বদল পাবেই। তবুও কি অতৃপ্তি ঘোচে? না। আসলে একটানে শ্রেষ্ট লেখাটা লিখে ফেলার মতো প্রতিভাবান আমি নই। তাই আমাকে সাহিত্যিক নয়, অক্ষরকর্মী বলা উচিৎ।

দেবায়ন : ‘’উদ্বাস্তুর সন্তানের জন্য চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থাকতে নেই। আমার নিয়তি শুধু একটার পর একটা সীমানা পেরিয়ে যাওয়া।‘’ – ‘বিদায় অভিশাপ’ গল্পে দিবাকরের না বলা কথাগুলো কি আপনার সম্বন্ধে প্রযোজ্য ? শিলিগুড়ি থেকে কলকাতায় পাকাপাকিভাবে চলে আসার সিদ্ধান্তে নিজের লেখালেখিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে বলে আপনি মনে করেন ?

অলোক গোস্বামী : প্রথম কথা হলো, ছোট শহরে জীবন একমাত্রিক হয়ে থাকে। প্রায় একই ধরণের মানুষ, একই ধরনের জীবন যাপন দেখে যেতে হয়। লেখালিখির পক্ষে সেটা খুব একটা সুখকর নয়। তবে সেটা নিতান্তই আমার ধারণা। কেউ কেউ হয়ত গোষ্পদেও বিশ্বরূপ দর্শন করতে পারেন। আমার ততটা ক্ষমতা নেই।
দ্বিতীয় কথা হলো, ভালো করে দেখার জন্য একটা দূরত্বের প্রয়োজন হয়।এটা বিজ্ঞান। তাতে নিরপেক্ষতাও আসে। কোলকাতায় চলে আসার যা কিছু লিখেছি প্রায় সবকটারই পটভূমি উত্তরবঙ্গ, চরিত্রগুলোও ওখানকার। হয়ত ছেড়ে না এলে এতটা মমতার সঙ্গে লিখতে পারতাম না!

পুরুষোত্তম : ‘বাতিল নিশ্বাসের স্বর’ উপন্যাসের সূচনায় লিখেছেন –‘’আমি মনে করি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখা সেটাই যা কিনা অদ্যাবধি লেখাই হয়নি।‘’ লেখক হিসেবে কোন লেখা লিখতে চান ? আপনার কী মনে হয় আপনি এখনো নিজের শ্রেষ্ঠ লেখাটা লিখে উঠতে পারেননি ?

অলোক গোস্বামী : চিন্তাভাবনার কতটুকু অংশ লেখায় প্রতিফলিত হয়, বলো তো! আমার ক্ষেত্রে তো ১০% হলেই নিজেকে সফল ভাবতে পারি। হয় কোথায়? কারও ক্ষেত্রে হয়তো ১০% এর চে অনেক বেশী হয় তাবলে ১০০% কখনোই নয়। তাহলে সব লেখাতেই কিছু না কিছু ত্রুটি থাকত না। তাই বলেছিলাম, শ্রেষ্ঠ লেখা সেটাই যেটা অদ্যাবধি প্রকাশিত হয়নি। লেখকের মগজেই বাসা বেঁধে আছে।

পুরুষোত্তম : ‘বাতিল নিশ্বাসের স্বর’ উপন্যাসে ‘আসর বন্দনা’ অংশ উত্তর আধুনিক দৃষ্টি নিয়ে পাঠককে সঙ্গে নেন, পাঠককে উপন্যাসের ভিতর প্রবেশের চেষ্টা করেন, কিন্তু পরক্ষণেই জানান এই রহস্য থেকে পাঠক বেরতে পারবেনা, পাঠককের মুক্তি নেই। উত্তর আধুনিকতা তো পাঠককে একটা পরিসর দান করে – বিষয়টি কীভাবে দেখবেন ?

অলোক গোস্বামী : আমি ভাই অত তত্ত্ব বুঝি না। জীবনের জটিল গোলকধাঁধার কথা বলতে চেয়েছি ওই উপন্যাসে। দেখাতে চাইছি, সমাজ যাদের অক্ষম বাতিল মনে করে তাদের কী অবস্থা হয়। এই অক্ষমতার মানও নির্ধারণ করে দেয় সমাজই। কিন্তু তারপর? কোথায় যায় মানুষগুলো? আমি দেখিয়েছি সেই মানুষগুলো একটা জনপদ গড়ে তুলেছে, যা শুধু বাতিল মানুষদেরই জন্যই নির্দিষ্ট। পূর্বের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে  তারা ভাষা বদলে ফেলেছে, নিজেদের মধ্যেকার সম্পর্ক, রীতি নীতি, আচার আচরণ নতুন করে নির্ধারণ করে নিয়েছে। ওরা জানে, তবুও সভ্যতার আগ্রাসন থেকে রেহাই পাবে না ওরা। এই স্থানও একদিন সফল মানুষরাই দখল করবে। আবার হটে যেতে হবে ওদের। এসবই আর কী!

পুরুষোত্তম : ‘বাতিল নিশ্বাসের স্বর’ উপন্যাস শুরু হচ্ছে তপুর হাঁটার মধ্য দিয়ে। তাঁর যাত্রাকে আখ্যানের সূচনাও বলছেন না, আবার সমাপ্তিকে আখ্যানের শেষও বলছেন না। ‘শেষ কথা বলবে কেডা’ পরিচ্ছেদে পেলাম –‘’যে দৃশ্যটার মারফৎ আমরা এই আখ্যান শুরু করছি সেটা যেমন আদৌ শুরু নয়, তেমনই যে দৃশ্যটাকে আমরা আখ্যানের শেষ ভাববো সেটাও আদৌ শেষ হবেনা। হয়তো শুরুও বলা যেতে পারে !’’ – এই শুরু কী পাঠকের ভাবনা বলয়ের শুরু না অন্য কিছু ? উপন্যাসের উপস্থাপন কৌশল সম্পর্কে যদি কিছু বলেন ।

অলোক গোস্বামী : আসলে শুরু কোনটাকে বলা যেতে পারে? সময় তো অনন্ত। তার শুরু কিংবা শেষ আমরা জীবনের নিরীখে মাপি কিন্তু সময় তো স্বাধীন। নিজের মতো চলে। পৃথিবীর কিংবা জীবনের সৃষ্টির ইতিহাস যদি দেখ, ওখানে লক্ষ লক্ষ বছর কিংবা কোটি কোটি বছর কোনো ব্যাপারই নয়। আসলে যে যখন জেগে ওঠে তখনই তার শুরু।

দেবায়ন : আপনার জন্মদিন ২৯ মে, আপনার গল্পের চরিত্র নিশিকান্তেরও তাই। ‘কেবলই দৃশ্যের জন্ম’ আখ্যান শুধু নয় আমাদের মনে হয়েছে আপনি অস্তিত্ববাদী। আর মানবিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আপনি পূর্বনির্ধারিত যেকোন ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করতে প্রস্তুত। যেখানে প্রত্যাখ্যানের মধ্যেও মায়া জড়িয়ে আছে, যদি কিছু বলেন ।

অলোক গোস্বামী : খানিকটা ঠিকই বলেছ। মানুষের মৃত্যু হলেও মানব রয়ে যায়। অদ্ভুত আঁধার উপন্যাসের শেষে তেমনই একটা ইঙ্গিতও রেখেছি।

পুরুষোত্তম : ‘বাতিল নিশ্বাসের স্বর’ উপন্যাসে আখ্যানের আঙ্গিক নিয়ে সচেতন হলেও গল্পের ক্ষেত্রে দেখি বিশ্লেষণে বেশি নজর দেন, সেখানে আঙ্গিক সচেতনতা বিশেষ চোখে পড়েনা। আপনি কি মনে করেন গল্পে আঙ্গিক সচেতনতা বিশেষ জরুরি ?

অলোক গোস্বামী : উপন্যাসের পরিধি তো অনেক বড় তাই ওখানে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা যায়। পাঠক যখন উপন্যাস পড়েন তখন একটা মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই শুরু করেন। কিন্তু গল্পের ক্ষেত্রে সেটাকে অ্যালাও করেন না। মোদ্দা কথাটা জেনে নিতে চান। সুতরাং উপন্যাসে যে স্বাধীনতা থাকে গল্পে সেটা থাকে না। লেখকের শক্তিমত্তার পরিচয়ও বহন করে একমাত্র উপন্যাসই। ছোটগল্প চালাকি দিয়েও দান মেরে দেয়া যায়, উপন্যাসে সেটা হয় না।

পুরুষোত্তম : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আপনার প্রিয় লেখক । মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা কোথাও কি প্রভাবিত হয়েছেন ? ‘বাতিল নিশ্বাসের স্বর’ পড়তে গিয়ে তেমন একটা প্রশ্ন উঁকি দিয়েছিল। পাঠক হিসেবে সে আমাদের ভুল ধারণাও হতে পারে, যদি কিছু বলেন ।

অলোক গোস্বামী : মানিকবাবুর একটা উপন্যাসই আমাকে আজও আচ্ছন্ন করে রেখেছে, সেটা হলো দিবারাত্রির কাব্য। মানিকবাবুর যৌনতা নিয়ে একটা ট্যাবু ছিল। কুসুমকে মন সর্বস্ব হওয়ার জন্য উপদেশও দিয়েছেন। কুবের কপিলাকেও সংযম দান করেছেন। একমাত্র এই উপন্যাসটাতেই কোনো বাধা নিষেধ মানেননি। অনেকে বলেন এই উপন্যাসটা ওর প্রাক কমিউনিস্ট পর্বের লেখা তাই অন্য রকম। মানি না সেকথা। কেননা প্রকাশিত হয়েছে অনেক পরে। মানিকবাবু তাহলে উপন্যাসটা প্রকাশ করতে দিতেন না। সে কথা থাক, দিবারাত্রির কাব্য দ্বারা প্রভাবিত হোতে যথেষ্ট এলেমদার হোতে হয়। আমি ততটা নই। বরং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আমাকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছেন। জীবনে একটাই দুঃখ, ওঁর মুখোমুখি বসে দুটো কথাবার্তা বলার সুযোগ পেলাম না। সুযোগ পেলাম না প্রভাবের মাত্রাটা আরও খানিকটা বাড়িয়ে নেয়ার।

পুরুষোত্তম : আপনাকে যতটা জেনেছি তাঁতে আপনি গ্রন্থের নাম, প্রচ্ছদ নিয়ে খুব সচেতন। কিছুদিন আগে ‘১০টি গল্প’ ‘১৫টি গল্প’ নাম দিয়ে গ্রন্থ প্রকাশ করলেন। এই যে সংখ্যা দ্বারা গল্পগ্রন্থের নামকরণ – এটা কী নিছকই না কোন বিশেষ বক্তব্য থেকে ?

অলোক গোস্বামী : দ্যাখো, শ্রেষ্ট গল্প, সেরা গল্প, বাছাই গল্প--এধরণের নামকরণ আমার কাছে পাঠক ঠকানোর খেলা মনে হয়। সবটাই বাণিজ্যিক কালোয়াতি। দেখবে, বাজারে রবীন্দ্রনাথেরও শ্রেষ্ঠ গল্প পাওয়া যায়। কী হাস্যকর! আমার কাছে সব গল্পই সমান। হয় সেগুলো গল্প হয়েছে অথবা হয়নি। তাবলে সেরাফেরা বলতে পারবো না। তবু এতদিন যে কোনো একটি গল্পের নাম থেকে সংকলনের নামকরণ করছিলাম, পরে ভেবে দেখলাম সেক্ষেত্রেও সেই গল্পটাকে বিশেষ প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। তাই ওই দশ, পনের ইত্যাদি ইত্যাদি।

পুরুষোত্তম : বর্তমানে মফস্‌সলের সাংবাদিকদের নিয়ে একটি উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেছেন। সে উপন্যাস পাঠকের কৌতূ্হলে যদি কিছু বলেন ।

অলোক গোস্বামী : মফস্বলে বাস করার সুবাদে এরকম কিছু সাংবাদিককে দেখেছি। মানুষগুলো সংবাদ অন্ত প্রাণ অথচ হাউস তাদের প্রাপ্য সম্মান দেয় না। দেবে কেন? কোলকাতার সংবাদ জগতের কাছে কোলকাতার বাইরে যে একটা বৃহৎ বাংলা রয়েছে সে ব্যাপারে কোনো মাথাব্যথাই নেই। যদি না বড় কোনো ম্যাসাকার ঘটে যায়। এখন তো ইন্টারনেটের যুগে বাজার বেড়েছে, মফঃস্বল থেকে ভিন্ন সংস্করণও বের হচ্ছে। আমাদের সময়ে স্থানীয় সংবাদ প্রকাশিতই হোত না। বেচারি সাংবাদিক শুধু দৌড়ে বেড়াতো। এসব নিয়েই উপন্যাসটা লিখেছি। নাম রেখেছি, ‘আদিম হাওয়ার দিনলিপি।’

পুরুষোত্তম : বাঃ, বেশ। অনেক ধন্যবাদ দাদা আপনাকে। ভালো থাকবেন।

অলোক গোস্বামী : তোমরাও ভালো থেকো।            

৬টি মন্তব্য: