শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

অনুবাদ গল্প : রাখি পুরকায়স্থ। পারক গল্পপত্র


সে স্বপ্ন দেখছিল - হৃষ্টপুষ্ট একটা হরিণের পেছনে ধাওয়া করছে দুর্দান্ত গতিতে। গত দু’দিন ব্যর্থ হয়েছে সে। এবার মোটেই এমন ভুল করবে না। তাই গতি আরও বাড়িয়েছে। দ্রুত কমে আসছে হরিণ আর তার মধ্যেকার দূরত্ব। একেবারে সঠিক মুহূর্তে একটা মোক্ষম লাফ মেরে সে কামড়ে ধরল হরিণটির ঘাড়। মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত! তার পরেই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে হরিণটি ঢলে পড়ল মৃত্যুর কোলে। দশজন তাগড়াই জওয়ানের পক্ষেও যে বিশাল হরিণটিকে বয়ে নেওয়া সম্ভব ছিল না, সেই নধরদেহ হরিণটিকে অনায়াস দক্ষতায় মুখে তুলে নিয়ে সে দিব্যি চলে গেল প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গভীর জঙ্গলের ভেতর! প্রায় দু’টো দিন লেগে গেল গোটা হরিণটাকে উদরস্ত করতে। আহা, সে কী পরিতৃপ্তি!

এবার সে চোখ মেলে চাইল। তন্দ্রা কেটে গিয়েছে। এতদিনকার অদম্য খিদেটা আবার তাকে অস্থির করে তুলছে। শেষ যেন কবে শিকার করেছিল? ঠিক কত কাল আগে – কয়েক সপ্তাহ, কয়েক পক্ষকাল, না কি কয়েক বছর আগে? কিছুই ঠিক মতো মনে করতে পারছে না সে।

জলের মধ্যে হঠাৎ করে কী যেন একটা নড়েচড়ে উঠল। সে সজাগ হতেই দেখল, যে ঢিপিটার ওপর বসে আছে তার গা ঘেঁষে একটা প্রকাণ্ড লম্বা সাপ তীব্র গতিতে সড়সড় করে চলে গেল। ঢিপিটার চারিদিকে কেবল জল আর জল, ... ঘোলা, বিকট গন্ধী, ঠাণ্ডা জল ... যেন বরফ গলা। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। আবার বৃষ্টি হবে। তখন জল বাড়লে এখানে আর বসে থাকা যাবে না। ঠিক কবে এসেছিল এখানে? গতকাল না পরশু, না কি তারও আগে কোনো একদিন – ওঃ ক্ষুধা সব ভুলিয়ে দিয়েছে – সেদিন সাঁতরাতে সাঁতরাতে জনমানবশূন্য গ্রামটার প্রান্তে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা বাঁশঝাড়টার ঠিক উলটোদিককার এই ঢিপিটায় এসে পৌঁছেছিল। এখন যেখানে বসে আছে তার ডান দিকে একসময় গাছ-গাছালিতে ভরা একটা ছোটোখাটো জঙ্গল ছিল। ওর মনে পড়েছে, বেশ কিছু কাল আগে ওই জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে শিকারের জন্যে অল্প কয়েক দিন অপেক্ষা করেছিল। এখন সেখানে একটা গাছেরও চিহ্ন নেই। মানুষেরা সব গাছ কেটেকুটে সাফ করে দিয়েছে। এমনকি লুকোবার জন্যে একটা ছোটো ঝোপও আর অবশিষ্ট নেই সেখানে।

পাহাড়ের দিকটায় যাওয়া সম্ভব নয়। ওদিকে ওর চরম শত্রু সুযোগের অপেক্ষায় কোথায় যে ওত পেতে বসে আছে কে জানে! নিজের বিচরণ ক্ষেত্রতে অনধিকার প্রবেশ সে সহ্য করবে কেন? নিজের অস্তিত্ব আর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে তাকে বহু লড়াই করতে হয়েছে। জয় পরাজয় কারোরই অবশ্য হয়নি। এখন শত্রুর বিচরণ ক্ষেত্রের একেবারে সীমানায় এসে পৌঁছেছে সে। অবশ্য ডান দিকে খানিকটা দূর সাঁতরিয়ে গিয়ে, ডাঙ্গায় উঠে সাপের গায়ের মতো মসৃণ পথটা পার হয়ে পাহাড়ের দিকে উঠে গেলেই জলের হাত থেকে সহজেই রক্ষা পাওয়া যেত। তবে এ কাজটি করবার ফল দাঁড়াবে ভয়ানক - প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে আমৃত্যু লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়া। এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে যুদ্ধের জন্যে সে মোটেই প্রস্তুত নয়। তাই তাকে বাধ্য হয়ে বিপরীত দিকে যেতে হবে। কিন্তু এই অথৈ সাগরের মধ্যে দিয়ে সে যাবে কোথায়? অহরহ জলের গর্জন ধ্বনি শুনতে শুনতে একসময় সে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু ক্ষুধার তাড়নায় ঘুমটা আবার ভেঙ্গে গেল। কয়েকটা কাক কা-কা করতে করতে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলে গেল। ওরা সত্যিই কী ভাগ্যবান! কখনওই খাবারের অভাব হয় না।

কখন যেন আবার ঘুম নেমে এসেছিল দু’চোখের পাতায়। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি এসে গা ভিজিয়ে দিতেই ঘুমটা চট করে ভেঙ্গে গেল, ঠাণ্ডাও লাগছিল ভীষণ। আশ্চর্য! ... এত কম সময়ে জল এতটা বেড়ে গিয়েছে! আচ্ছা, সত্যিই কি খুব কম সময়? হয়তো বেশ কয়েক ঘন্টা কিংবা হয়তো সম্পূর্ণ একটা দিন পার হয়ে গিয়েছে, সে বুঝতেই পারেনি! যে গাছটির তলায় সে বসে রয়েছে তার ছড়িয়ে থাকা মোটাসোটা শেকড়গুলিকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে জল। চারপাশের মাটি ধ্বসে গিয়ে গাছটি ক্রমশ একপাশে হেলে পড়তে চাইছে। এখানে বেশিক্ষণ বসে থাকাটা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাই এবার ঠাণ্ডা, ঘোলা জলের মধ্যে নেমে সাঁতরাতে লাগল সে।

------
জলে অর্ধেক ডুবে আছে গ্রাম। সেখানকার সারি সারি ঘরবাড়িগুলির পেছন দিককার জলের ওপর দিয়ে নিঃশব্দে ভেসে এল একটি নৌকো। সে দেখতে পেল না। তার সদা সতর্ক, সন্ধানী দৃষ্টি যেন ধোঁয়াশাচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। অথচ বহু দূরে গাছের পাতা পড়ার সামান্য শব্দও অনায়াসে তার কানে এসে পৌঁছয়। কিন্তু আজ!...সম্ভবত জলের অবিরাম গর্জনের কারণে জলের ওপর বৈঠার আছড়ে পড়ার শব্দ তার কান অবধি আসতে পারেনি। বাতাস তার সামনের দিক থেকে পিছনের দিকে বইছিল। এতে নৌকোতে বসে থাকা তিনটি মানুষের খুব সুবিধে হল। জলে অর্ধেক ডুবে থাকা বাঁশঝাড় আর ঘরবাড়ির পেছনে লুকিয়ে ভেসে থেকে একটা সুবিধেজনক অবস্থানের সন্ধানে নৌকোটি তার পেছন পেছন খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে চলতে লাগল। নৌকোর আরহীরা তো বেশ ভালো করেই জানে ওর প্রখর দৃষ্টি আর শ্রবণ শক্তির কথা।

------
ইতিমধ্যে চারিদিকে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ঝুপ করে নেমে এসেছে। বিস্তীর্ণ সাগরের মাঝে একাকী দ্বীপের মতো বালির ঢিপিটাকে তবুও সে ঠিক খুঁজে নিল। এখানেই তো একদিন সে একটি ছাগলকে মেরেছিল। আসলে সবকিছুর মূলেই তো সেই ক্ষুধা! আঃ ক্ষুধা! মানুষগুলো সেদিন আগুন জ্বালিয়ে চারপাশে বসে ছিল। ব্যস্ত ছিল নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলতে। সে তখন কেবলমাত্র সুযোগের সদ্যব্যবহার করেছে। সে-জন্যে অবশ্য কোনো আক্ষেপ নেই তার। এই মানুষগুলো যখন বিনা অনুমতিতে লুকিয়েচুরিয়ে তার জঙ্গলে ঢুকে গাছ কাটে, মাছ ধরে, হরিণ শিকার করে ...সেই বেলা?

তবে জল দ্রুত বাড়ছে। বালির ঢিপিটার ওপরকার গাছগাছালি আর ঝোপঝাড়ের নিচে ইতিমধেই জল চলে এসেছে। সেখানে আশ্রয় নেওয়া অসম্ভব। তাই সে আবার সাঁতরাতে লাগল। সে জানে, ওই পারে উঁচু পাহাড়টার কাছে একটা সংকীর্ণ গুহার মতো জায়গা আছে। কাছেই রয়েছে আকাশচুম্বী শাল আর গামারি গাছের ছোট একখানা বন। সেসবের মাঝে ছড়িয়ে আছে ঘাসে ঢাকা একটি সবুজ প্রান্তর। ওখানে এক-দুটো কচি গণ্ডার কিংবা কয়েকটা হরিণের সন্ধান মিললেও মিলতে পারে। সে মোটেই আশা ছাড়েনি। তাই নিঃশব্দে সাঁতার কেটে এগিয়ে যেতে লাগল।

------
বালির ঢিপিটা ওরা তিনজন আগে থেকেই চেনে। গত বছর নদী পার হয়ে ওই অভয়ারণ্যে ঢোকার আগে এই টিপিটাতেই তো এক রাত কাটিয়েছিল। নৌকোটিকে এবার তারা জলের স্রোতে ছেড়ে দিয়ে ঢিপির কাছ বরাবর আপনমনে ভেসে যেতে দিল। তাদের মনে খানিকটা হলেও আশা ছিল, সে হয়তো ওই ঢিপিটার ওপরকার ঝোপেঝাড়ে আশ্রয় নেবে। কিন্তু তা হয়নি। ওর পিছু ধাওয়া করে অনেকটা পথ ভেসে এসেছে ওরা। এখন আবার আগের জায়গায় ঘুরে যাওয়া সম্ভব নয়, ধরা পরবার ভয় আছে। এবারে তাহলে কী করবে ওরা? সব বাদ দিয়ে ফিরে যাবে, না কি শেষ দেখে ছাড়বে?

------
এমনিতেই ভীষণ চওড়া নদীটা, এখন তার চাইতেও দেড়গুণ চওড়া হয়ে গিয়েছে। শীতের সময় এই নদী পার হতে এত বেশি সময় লাগে না। কিন্তু এখন...! অনেকক্ষণ হল সে ক্রমাগত সাঁতরিয়ে চলেছে, তবুও ওপারের সাথে দূরত্ব যেন কমতেই চায় না। তবে কি পথ ভুল করেছে? সে এবার তাই বাঁ দিকে বেশ খানিকটা বেশি ঘুরে সাঁতরাতে লাগল। ক্লান্ত লাগলে শরীরটাকে কেবল জলের ওপরে ভাসিয়ে রাখছিল। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু এই ঠাণ্ডা জলে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। সকালে যেমন করেই হোক মাটি খুঁজে নিতে হবে।

বহুক্ষণ ধরে জল কেটে সাঁতরানোর পর, এক সময় ভোরের হালকা আলোক রেখা এসে পড়ল ছোটোছোটো ঢেউগুলির ওপর। প্রভাতী আলোর দিকে তার উজ্জ্বল চোখ দুটো স্থির রেখে সে আবার সাঁতার দিতে লাগল। ধীরে ধীরে অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে। ও বুঝতে পারছিল, ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই।

------
নদীর মূল স্রোত অতিক্রম করবার জন্যে শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে ওদের দু’জনকে উত্তাল নদীর বুকে বৈঠার ঘাই মারতে হচ্ছিল। বাড়ন্ত জলে ভেসে থাকা গাছের ডালের দীর্ঘ ও শক্ত টুকরোগুলো নৌকায় আঘাত করতে পারে। সেই ভয়ে যথেষ্ঠ সন্তর্পণে নৌকোটিকে এদিক-ওদিক করে ঘুরিয়ে বাঁচিয়ে এগিয়ে নিতে হচ্ছিল। অবশেষে মূল স্রোতটি অতিক্রম করা গেল। তার পরেই নৌকোর গতি সামান্য বাড়ল। তারা অনুমান করতে পারছিল, সে ওই সরু গুহাটির দিকে যেতে চাইবে, কিন্তু পারবে না। প্রচণ্ড জলস্রোত তাকে নিমেষের মধ্যে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। আর তখন সে কোথায় যেতে পারে সেটাও তারা বেশ আন্দাজ করতে পারছে, তবে নিশ্চিত হতে পারছে না। এবার নৌকোটাকে বাঁ দিকে ঘুরিয়ে সোজা বিপরীত তীর লক্ষ্য করে এগোতে লাগল তারা। ও পাড়ে অন্ধকার ক্রমশ হালকা হতে শুরু করেছে। ভোর হতে বেশি দেরি নেই। তাই তারা এবার নৌকোর গতি আরও বেড়িয়ে দিল।

------
অন্ধকারের মধ্যেই গাছগাছালির অস্পষ্ট অবয়ব ফুটে উঠেছে। শেষমেশ তবে পাড়ের দেখা মিলল। কিন্তু নরম পলির মধ্যে তার ভারি শরীরটা প্রায় ডুবে যাচ্ছে। বহু কষ্টে কাদা থেকে হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে বেরিয়ে একটি শুকনো জায়গায় লাফিয়ে পড়ল সে। তখনও ভালো করে দিনের আলো ফোটেনি। ফিকে আলোয় জায়গাটা দেখে সে ভীষণ হতাশ হয়ে গেল। কীভাবে যেন সেই চেনা সরু গুহার দিক থেকে অনেকটাই পশ্চিমে ভেসে এসে একটা অচেনা ডাঙ্গায় উঠে পড়েছে সে!

------
এটাই হয়তো শেষ সুযোগ। একবার যদি উঁচু পাড় বেয়ে উঠে যায়, তখন কিন্তু আর ওকে অনুসরণ করা সম্ভব হবে না। জলের ওপর ঝুলে থাকা লতা ঝোপের নিচে নৌকোটাকে রেখে একটা শক্ত লতানে ডালের সাথে নৌকোটাকে বেঁধে নিল তারা। তার পর বন্দুক হাতে তুলে নিয়ে মাটিতে ভর দিয়ে এগিয়ে যেতে শুরু করল। অভ্যস্ত শিকারী ওরা, বন্দুক চালাতে একটুও হাত কাঁপে না।

------
সশব্দে কী যেন একটা এসে পড়ল পায়ের কাছে। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল কাদামাটির থকথকে দলা। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ডান কানের ধার ঘেঁষে কী যেন একটা সোঁ সোঁ শব্দে চলে গেল। সে তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারল, এখানে আর একটি মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকা চলবে না। তাই বিশাল একটা লাফ মেরে উঁচু পাড় বেয়ে দ্রুত গতিতে উঠে এসে একটা রাস্তায় নামল। মসৃণ রাস্তাটা এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে। না থেমে তাড়াতাড়ি সেই পথ ধরে সোজা এগিয়ে গেল সে। ঠিক তখনি একটা পরিচিত গন্ধ এসে নাকে ঠেকল। খানিকটা বিভ্রান্ত হল সে।
অনুজ্জ্বল আলোর মধ্যে কয়েকটা অস্পষ্ট অবয়ব কখন যেন তার দৃষ্টিপথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে খানিকক্ষণ থমকে রইল। তাকে অবাক করে দিয়ে বেশ কাছ থেকেই ভেসে এল একটা অদ্ভুত আওয়াজ। তার পরেই আরেকটা আওয়াজ, উপর্যুপরি এরকম আরও অনেকগুলো আওয়াজ তাকে ক্রমশ সন্ত্রস্ত করে তুলল। তার পর সামনের দিকে ভালো করে নজর করতেই দেখতে পেল, লম্বা লম্বা কী সব জিনিস হাতে নিয়ে তার থেকে বেশ অনেকটাই তফাতে অর্ধবৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েকজন হিংস্র মানুষ। তারা কিন্তু এখনো তার সঠিক অবস্থান বুঝতে পারেনি। সে এবার দু-এক পা এগিয়ে গিয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে ভয়ঙ্কর গর্জন করল। তার সেই আদিম গর্জনে যেন বিদীর্ণ হয়ে গেল আকাশ বাতাস। আশেপাশের ঘরবাড়ি-মাটি-গাছপালা কাঁপতে লাগল থরথর করে।

------
মানুষ তিনটি শুনতে পেল সেই ভয়াবহ ক্রুদ্ধ গর্জন। কোনদিক থেকে আসছে তা বোঝা মুশকিল। তবে এটুকু বেশ বুঝতে পারা যাচ্ছে, এখান থেকে এক্ষুনি চলে যাওয়াটা জরুরি। সে তাদের নাগালের বাইরে। এমতাবস্থায় তাকে অনুসরণ করবার অর্থ সাধ করে নিজেদের জন্যে বিপদ ডেকে আনা। বন্দুকধারীরা তড়িঘড়ি নৌকোতে ফিরে গেল।

------
রাস্তার দুপাশে সারি সারি ঘরবাড়ি। অধিকাংশ বাড়ি পাকা দেওয়ালে ঘেরা। রাস্তার ধারে ইতস্তত দাঁড়িয়ে রয়েছে দু-চারটে গাছ। আশেপাশে কোথাও ঝোপঝাড় কিংবা ছোটোখাটো বন-জঙ্গল দেখা যাচ্ছে না। শঙ্কিত মনে চারিদিকে নজর বুলিয়ে নিচ্ছিল সে। ঠিক তক্ষুনি তার চোখে পড়ল, কিছু দূরেই একটা ঝোপ, আর তার ধারেই একটা অসুরক্ষিত, পরিত্যক্ত বাড়ি। দেরি না করে দুটো বিরাট লাফে সেই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল সে। তার পর ভেতরের পাতলা আঁধারের মধ্যে ঠাণ্ডা মাটির মেঝেতে আরাম করে গুছিয়ে বসে পড়ল।

দূর থেকে কিছু মানবীয় শব্দ ভেসে আসছে। সে অবশ্য সে-সবের কোনো অর্থ বুঝতে পারছে না। ভয়ের না ত্রাসের শব্দ তাও আন্দাজ করতে পারছে না। ছুটে আসা শব্দগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। তার চেতনাবোধকে কিছুই যেন আর ভেদ করতে পারছিল না। অপার ক্লান্তি তার শরীরটাকে ক্রমশ অবশ করে দিচ্ছিল। তার দু’চোখের পাতা ভারি হয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসছিল বহুযুগ ধরে সঞ্চিত হতে থাকা ঘুমের স্রোত।

আচমকা একটা শব্দ শুনে ধড়মড় করে উঠে বসল সে। তারপর লাফ দিতে উদ্যত হতেই আবার উপর্যুপরি কয়েকটা শব্দ কানে এল। ঠিক এমন সময় আড়াল থেকে কেউ তার পায়ে প্রচণ্ড আঘাত করল। কাছেই আবারও একটা শব্দ শুনল সে, ... আবারও একটা আঘাত নেমে এল। এবার সর্বশক্তি দিয়ে সে একটা গগনবিদারী হুংকার দিল, কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঢলে পড়ল মাটিতে!

------
তার উজ্জ্বল কমলা-হলুদ-সাদা ডোরাকাটা সুঠাম দেহটিকে ওই ভগ্নপ্রায় বাড়িটার বাঁশের বেড়া কেটে অনেকে মিলে ধরাধরি করে বের করে নিয়ে এল। তার পর একটা লম্বা বাঁশের সাথে তার পাগুলো রশি দিয়ে বেঁধে চ্যাংদোলা করে বয়ে নিয়ে চলল, যেন সে একটা মৃত গরু! শেষমেশ দশ-বারোজন মানুষ তাকে ঠেলাঠেলি করে ট্রাকের ওপর তুলে একটা বড়ো লোহার খাঁচার ভেতর পুরে দিল! একটা অবোধ নাদুসনুদুস শিশুর মতো ঘুমে আচ্ছন্ন তার দেহটিকে বয়ে নিয়ে সেই ট্রাক ঘন জনবসতিপূর্ণ গ্রাম-শহর, ফাঁকা হয়ে আসা বন-জঙ্গল, উঁচু পাহাড়-পর্বত পার হয়ে এগিয়ে যেতে লাগল গভীর জনঅরণ্যের দিকে।

------
নাকে এসে ধরা দিল একটি পরিচিত গন্ধ। চোখে মেলতেই দেখল সামনে খাবার! আঃ খাবার! খাবার! সে গোগ্রাসে গিলতে শুরু করল। বহুদিনের ক্ষুধার আগুন নির্বাপণ করতে অনেকটা সময় লেগে গেল তার। কাছেই একটা বড়ো গোলাকার বস্তুর ভেতরে জল। প্রাণ ভরে জল পান করল সে। এরপর দুই-এক পাক এদিক সেদিক ঘুরে সে অবাক দৃষ্টিতে দেখল, তার আজন্মের পরিচিত ঘন সবুজ ঘাস, কাঁটা ঝোপঝাড়, ছায়াঘেরা গাছেদের সারি এসব আশেপাশে কোথাও নেই – আছে কেবল তাকে ঘিরে থাকা লোহার গারদ। সামনের দুটি বলিষ্ঠ পা দিয়ে সে লোহার শিকগুলিকে টানাটানি- ধাক্কাধাক্কি করতে লাগল। প্রচণ্ড শক্তি প্রয়োগ করে বেঁকিয়ে দিতে চেষ্টা করল সেগুলিকে। কিন্তু হায়, তার সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হল। বার বার শুধু কানে এল ধাতব ঝনঝনানি। খানিকটা দূরেই এক দল কৌতূহলী মানুষের মুখ। দৃষ্টি তাদের ছাড়িয়ে গেলে পেছনে দেখা যায় সবুজ গাছপালার সারি। সে ক্রমশ বিমূঢ়, ক্রুদ্ধ, অধৈর্য্য হয়ে পড়ল। তার পর প্রচণ্ড গর্জনে কাঁপিয়ে দিল চারিদিক - একদুবার নয়, অনেক বার। সেই কৌতূহলী মুখগুলো নিমিষের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল সামনে থেকে। এবার অসহায়ভাবে বসে পড়ল সে। কোথায় সেই চেনা অরণ্য, কোথায় সেই তরাং নদী, কোথায় সেই সাগর সদৃশ বরনৈ নদীর অথৈ জল, কোথায় সেই মৃদুমন্দ বাতাসে ধীরে ধীরে দুলতে থাকা লম্বা সবুজ ঘাসেরা?

দিন শেষ হয়, রাত আসে, দীর্ঘ হলেও রাত পোহায়, আবারও ফিরে আসে আরেকটি ভোর ...। সে তর্জন গর্জন করে, অবসন্ন দেহে বসে থাকে, যা খেতে দেওয়া হয় তাই পেট ভরে খায়। সে জানে, ধীরে ধীরে, সংগোপনে তাকে শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। শরীরটাকে আরও তাগড়াই আর শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। তাকে যে ভাঙতেই হবে এই লোহার গারদ ... একদিন না একদিন!
                       

মূল লেখক পরিচিতিঃ শ্রী মদন শর্মা অসমিয়া সাহিত্যের একজন প্রসিদ্ধ গল্পকার, উপন্যাসিক, সমালোচক এবং অনুবাদক। তাঁর পাঁচটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আসামের তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি আর বিদেশী ভাষা বিভাগের অধ্যাপক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন