শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

অমিত মুখোপাধ্যায়। পারক গল্পপত্র



প্রশান্ত এখন বাস্তব নিয়ে ভাবে। মানে, বাস্তব কী, কাকে বলে। তার চেহারাই বা কেমন। তলিয়ে দেখতে চায় কত রকমের বাস্তব আছে। আর সেই সব বাস্তব দিয়ে কত কী অর্জন করে ফেলা যায়। এই সেদিনের এক ঘটনা তাকে নতুন করে ভাবতে ঠেলা দিয়েছে যে !

শিলিগুড়িতে বালাসোন নদীর পাড়ে জলের সাথে গড়িয়ে আসা পাথর তুলে পারে নানা জায়গায় বসে ভাঙে বেশ কিছু লোক। পাশের নানা বসতি ও গ্রামে থাকে তারা। করোনার আক্রমণের পরে তাদের কাছে ট্রাকের আসা বন্ধ হতে এবং বাইরে থাকার নিষেধ জারি হওয়ায় তারা বেকার হয়ে পড়ে। যখন পাথর ভাঙার কঠিন খাটুনি ছিল, তখন তাদের পুলিশের ভয় ও ট্রাকের ঠিকাদারের বঞ্চনা ছিল। ফলে ছিল দিন আনি দিন খাই দশা। এখন তারা অনাহারের সামনে।

 পুরুষ নারীর সাথে  পরিবারের বাচ্চারাও কাজ করত দুটি বাড়তি পয়সার জন্য। সেতুর ওপর দিয়ে যাবার সময় দেখা যেত কোন দিদি তার ভাইবোনেদের শিখিয়ে দেয় পাথর ভেঙে নুড়ি করার কায়দা। যারা ছোট, ভাঙতে পারবে না এখনো, তারা হাঁটুজলে নেমে রঙের বাতিল কৌটোভরে সরাসরি নুড়ি তুলে আনে। পাশে চুপটি করে বসে শিশুটি সব দেখে, হয়ত ভাবে তার অবশ্যম্ভাবী মেয়েবেলার ভবিষ্যত নিয়ে। যে যার নিজের ওই কচি বয়সে এমন বিদঘুটে অস্বাস্থ্যকর কাজ করতে যা-ই ভাবুক না কেন, অত ভয়ানক কানফাটানো বিস্ফোরণের মতো শব্দ বা চোখে জ্বালা-ধরানো, নাক বন্ধ-করা ধুলো নিয়ে কণামাত্র বিব্রত ছিল না।

কখনো কয়েকটি ট্রাক এসে নিমেষে তুলে নিয়ে যেত তাদের বেলাশেষের সৃজনস্তুপ। কে জানে কত সামান্য দরদামে বিকিয়ে যেত রক্ত জল-করা খাটুনি। যত বেআইনি কাজ, তার কর্মশৃঙ্খল তত সুবিন্যস্ত।

  তাদের ছবি দিয়ে খবর হলো কাগজে। আরও অনেক খেটে খাওয়া শ্রেণীর মতো তাদের আকালের সন্ধানে নানা খোঁজখবর, আলোচনা ও নিন্দে হলো।
তাদের খোঁজ নিতে কিছু মানুষ গেলেন তাদের অগোছালো হতশ্রী বসতিতে। দেখা গেল লোকগুলি বড় অসহায় অবস্থায় আছে । বাচ্চাদের মুখেও কিছু তুলে দিতে পারছে না। কতজন বাসিন্দা আছে,বাচ্চা ও বুড়ো কত জন, ইত্যাদি খবর জেনে এলেন তাঁরা। পঞ্চায়েতকে বলে আসা হলো    জিনিস এখানে এনে রান্না করে দেওয়া হবে, বাকি সব দায়িত্ব তাদের নিতে হবে। সকলকে খবর দিয়ে রাখতে হবে, যাতে কেউ বাদ না যায়। আবার জমায়েত করাও চলবে না।  প্রতি বাড়িতে গিয়ে লোক বুঝে দিয়ে আসতে হবে। তারা যে যার মতো থালাবাসন নিয়ে তৈরি থাকবে।তা হলে কোন ঘরে দিতে দেরি হবে না!

পরদিন যে দল গেল তার মধ্যে প্রশান্ত এ কাজে বেশ অভিজ্ঞ ও দক্ষ। নানা সামাজিক কাজে প্রায়ই যোগ দিতে পেরে খুশি হয়। শুধু তাই নয়, নিয়মিত খোঁজ রাখে চাবাগান ও অন্যান্য মজুর-মহল্লায় কারা হঠাৎ বিপদে পড়েছে। এ হেন প্রশান্ত গিয়েই রান্নার তদারকিতে লেগে গেল। খিচুড়ি এক দিকে, অন্য দিকে কিছু আনাজ মিলিয়ে একটা সবজি আর চাটনি হবে। রান্নার ধোঁয়া উঠতে শুরু করতেই, এবার বুঝি ট্রেন স্টেশন ছেড়ে যাবে, এমন ব্যস্ততা জেগে ওঠে  বিস্তীর্ণ দু'পারে অসংখ্য মানুষের হাহাকার ধ্বনিতে। নিজে  শীর্ণ হয়ে যাওয়া বালাসোন সেদিন একা থমকে হোঁচট খেয়ে নিঃশব্দে নীরবে বয়ে গেলেও, তার তীর বেয়ে ছড়ানো    খিদের প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে নড়াচড়া শুরু হয়। মানা করা সত্বেও কিছু লোক এসে পড়ে। তাদের বুঝিয়ে আশ্বস্ত করে ফেরত পাঠানো এক বাড়তি কাজ হয়ে দাঁড়ায়।

  বেলা যত বাড়ে, রান্নায় মগ্ন, যোগানে ব্যস্ত কর্মীরা একে দুইয়ে অসহজ হতে থাকে দূর থেকে ভেসে আসা গুঞ্জন শুনে।তাতে ভাষা নেই, কিন্তু ভেতরে কোথাও কেবল নাড়া নয়, ঘা পড়তে থাকে। বালাসোনের বালির চড়ার প্রান্তে ফাঁকা অংশে কাজ-চলা পাকশালা থেকে সুবাস যত ছড়ায়, কোথায় যেন ঝড়ের সূচনা ভাষা পেতে থাকে। নদীর নিজের পুরনো জোরের কিছুই নেই, আধমরা করে রাখার জন্য মানুষের ওপরে সে এমনিতেই তেতে থাকে, হাজার জনতার মতোই চোখের সামনের লোককে হয়ত আসল দোষী ভাবে। ঠিকাদারকে নদী ঠাহর করতে পারে না। তাই পাথরভাঙা মানুষগুলোই তার হাড় পাঁজরা তুলে নিয়ে দুর্বল করে রেখেছে বলে মনে করে। রোজ বালি তুলে তারা নাঙ্গা করে দেয়। বুক থেকে পাথর সরিয়ে নিয়ে নিচে ফাঁকা করে দেয় বলেই জল বেশি করে শুষে নেয় গভীরের মাটি!পাহাড় থেকে এখন জল নামে কম, তার ওপর বিছানা নষ্ট করে দিলে তার নিজের প্রবাহ বলে আর থাকে কিছু!

তা-ই হয়ত এখন মোক্ষম সুযোগ পেয়ে বালাসোন রোদের সাথে ষড়যন্ত্র করে গরম করে তোলে হাওয়ার মেজাজ, আলো ঠিকরে তেজি করে ছুটিয়ে দেয় বেতো ঘোড়াকে, সে গিয়ে বসতিতে আছড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে।খাবারের সুবাস দ্বিগুণ হয়ে যায়। নতুন করে সাড়া পড়ে যায় নির্জীব মুখগুলোয়।তারা ভাবে গন্ধ এত জোরালো লাগে, তা হলে কি এগিয়ে এলো সরবরাহের ডালি!

এর মাঝে আরেক সমস্যা। ঘটনাচক্রে যারা নদীর ধার ধরে চলেছে বা কাছেপিঠে ঘুরছে কোন ধান্দায়, তারা চলে আসে খোঁজ নিতে। তাদের চেহারা দেখলেও পেটের অবস্থা বোঝা যায়। ফলে বলতে হয়, একটু তফাতে ওই গাছতলায় দাঁড়াও বা বোসো ভাই। আজ ওই বসতির জন্য আনা হয়েছে তো, বাঁচলে তোমাদের নিশ্চয়ই দেওয়া হবে। এভাবে এদিকে জমে মেঘ, ওদিকে অশনি সংকেত পৌঁছয় খিদের পাহাড়ে। অধৈর্যের কুয়াশা দৃষ্টি আচ্ছন্ন করতে থাকে। কিছু যদি হয়ে যায় ওদিকে!খাবার যদি হাতের বাইরে  চলে যায়! অত লোক ওখানে বরদাস্ত করে কেন! সরিয়ে দেয় না কেন! এক দিন ঠিকমতো খাবো, তাতে এত বাগড়া দেওয়া কেন !

রান্নার লোকেরা এবার বলাবলি করতে থাকে, আরও একটু আগে শুরু করা উচিত ছিল। ওই চিনু আর জগা তো আসতে দেরি করে ফেলল! নিজে থেকে চলে এসে কাজ করে, কিছু বলাও যায় না! কিন্তু এখন ঘোরালো না হয়ে যায় পরিস্থিতি! জলদি হাতা নেড়ে টান দে, ঘুরিয়ে নাড়া! সবজি আর চাটনি তো হয়ে গেছে, ওগুলো ঢেলে নিয়ে ডেকচিগুলোয় সাজাতে বল এখন। তারপর একে একে ভ্যানগাড়িতে তুলুক। প্রতি ভ্যানে দেবার লোক এবার ভাগ করে নিতে বল পঞ্চায়েতকে। যা!

খিচুরিতে আর একটু নুন লাগবে, হয়ে এল! আঁচটা দেখে নে!
 যখন খাদ্য-ক্যারাভ্যান চলতে শুরু করে, পাশের গাঁয়ের কিছু লোক এসে আটকায়। কে ভাই তোমরা! না, পাশের পঞ্চায়েতের সদস্যের কাছের লোক আমরা। তুমরা আমাগো লুকেদের দিবা না! প্রশান্ত তাদের মাথা-কে আলাদা করে ডাকে। সে জানে এদের অবস্থা পাথরভাঙা বসতির থেকে ভালো, রোজগারপাতির দশা তত খারাপ নয়। তবু নিচু স্বরে বলে, এদের বলে লাভ নেই, এরা সব রান্নার লোকজন। আপনার দাদার ফোন নম্বর দিন, সাথে আপনারও, কথা বলে আরেক দিন কিছু ব্যবস্থা করে দেব। বুঝতেই পারছেন, বসতির প্রায় সওয়া দুই, আড়াই হাজার লোককে দিতে হবে আজ! মিটে যেতে দিন, শিগগিরই দেখছি।

 একজন এগিয়ে এসে বলে, আপনেরা পেরেস্ আর উহাদের পটোগাফার আনেন নাই! ছবি তুলা হবে না!
- না রে ভাই, লোকের জমায়েত, ছবি তোলা এসব এখন ঠিক নয়!
-কেন নয়! লুকে জানতে তো পারত!
- জানলে কী হতো?
-তুমারদের মতো আউর লুক আইসতো, খাবার আইনতো ! কাগজে ছবি দিল বুলেই না তুমরা বসতিতে আইলে!
প্রশান্তের মুখের দিকে তাকায় বাকি সহযোগীরা।কিছুতে এখন কথা বাড়ানো ঠিক হবে না বুঝে ক্যারাভ্যান ফের চলতে শুরু করে। ততক্ষণে ফুটছে বসতিবাসী। গাড়িগুলো অবশেষে সত্যিই এলো বুঝে নজরদারের দল যে যার ডেরার দিকে ছোটে।যাবার পথে আশ্বস্ত করে বার্তা দিতে থাকে। যে যার দোরের সামনে পজিশন নেয়।

 আবার সামনের বাড়ির সারি ধরে খাবার দেওয়া শুরু হতেই পেছনের ঝুপড়ির লোক এগিয়ে আসতে চায়। বলতে হয়, না,না, যে যার ঘরের সামনে পাত্র নিয়ে রেডি থাকো। সেখানে পাবে। সবাই মিলে যত দ্রুত পারা যায় ডেকচি থেকে হাতা করে ঢেলে এগিয়ে চলে দল। প্রশান্তের মনে হয়,যদিও বেশ কিছু এমন অভিজ্ঞতা আছে নিজের, তবু তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ হয়ে গেল আজ। প্রতি মুহূর্তে কাজের সমান্তরালে একটা যুদ্ধ আটকানোর জন্য যুদ্ধ করতে হচ্ছে।

  আরেকটা ব্যাপারে অবাক লাগে প্রশান্তর। প্রতি জায়গায় ত্রাণ পাওয়া মানুষ হাত তুলে নিজের মতো করে কৃতজ্ঞতা জানায়, কত কিছু বলে। যারা বলে না, বলতে জানে না, তারা চোখেমুখের ভাবে বুঝিয়ে দেয়। এখানে যেন প্রত্যাশা নয়, তৃপ্তি নয়, কেমন একটা নিরুচ্চার দাবির ভাব মুখে! চাপা দেওয়া আছে বুঝি কিছু!

শেষে যখন ঘটনাচক্রে আসা এবং গাছতলায় আলাদা দল হিসেবে অপেক্ষমান মানুষগুলোকে ডেকে বেঁচে যাওয়া খাবার দেওয়া হয়, তখন ব্যাপারটা জেনে নেবার সুযোগ মেলে।
প্রশান্ত বসতির মুখিয়াকে ডাকে। কী ব্যাপার, আপনার লোকেরা তেমন খুশি নয় মনে হয়! কঠিন লাগে যে অনেকের মুখ!
- না দাদা, উয়ারা বইলছে, এততো দিন পরে কেন খেইতে পেইলম! হগলে বইলছে, টিবিতে দেঁখাইছে যে  সববাই পেঁয়েছে, আমাদের ইত-অ দের হল্যো কেনে?

প্রশান্তকে সরিয়ে নিয়ে যায় হেড রাঁধুনি, দুঃখের হাসি হাসে, বুঝলেন, প্রচার কী কী করতে পারে! কেবল প্রচার কত রকম স্তরে কত ছবি তৈরি করে দেয়! ছবিই বাস্তব দাদা এ যুগে !

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন