শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

সত্যম ভট্টাচার্য। পারক গল্পপত্র


আরে কাকু,কি করবেন এতসব বইপত্র?
আর বলিস না রে, ঘরে জায়গা নেই।এখন একটু ফাঁকা আছি,তাই পরিষ্কার করে রাখি-সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন অসীমবাবু।তারপর একটু থেমে নিশ্বাস নিয়ে আরো বললেন-রেখে গেলাম এগুলো এখানে,কেউ নিলে নিলো,না হলে পরে একটা কিছু ব্যবস্থা করতে হবে।

অসীমবাবুদের ফ্ল্যাটের নীচে মনার গ্যারেজে কাজ করে পিন্টু।এতদিন বন্ধ থাকার পর দুদিন হল গ্যারেজটা খুলেছে ।আপাতত একবেলা খোলা রাখতে পারবে ওরা।যদিও প্রথমে ফ্ল্যাটের লোকেরা খুলতেই দিতে চায়নি।পিন্টুরা সবাই ডাক্তারী পরীক্ষা করিয়ে হাসপাতালের সার্টিফিকেট দেখিয়ে তবে গ্যারেজ খুলতে পেরেছে।আর লোকজনও রাস্তাঘাটে নেই।যারা অনেকদিন পর বাইক বের করাতে সমস্যা হচ্ছে,তারাই কেবল কাজ করাচ্ছে বাইকের।আর আছে কিছু বখাটে ধরনের ছেলে।এদের ক্ষেত্রে মালিকের শক্ত নির্দেশ আছে যে এরা এসে বাইকের কোন কাজ হবে কিনা জিজ্ঞেস করলেই  না বলে দিতে হবে।কারণ এরা কাজ করিয়ে টাকা দিতে চায় না।

অসীমবাবু বছর পঞ্চাশের সরকারী চাকুরে।এ ফ্ল্যাটে থাকেন বেশ কবছর হল।পিন্টুর প্রতি ওর একটা সফট কর্ণার আছে।জীবনের অভিজ্ঞতায় তিনি বুঝেছেন ছেলেটা অন্য গ্যারেজে কাজ করা ছেলেদের থেকে কোথায় যেন একটু হলেও আলাদা।তাই যেতে আসতে পিন্টুর সাথে দাঁড়িয়ে একটু কথা বলে যান তিনি।
গ্রাম থেকে কোনোদিন সাইকেল, কোনোদিন বাইক-যেদিন যেভাবে পারে নটার মধ্যে গ্যারেজে ঢুকে পড়তো পিন্টু।ওর এই উনিশ কুড়ি বছরের কালি ঝুলি মাখা জীবনে ও বুঝেছে এখন যত বেশী কাজ তত বেশী টাকা।সকাল নটা থেকে রাত আটটা অব্দি তাই দুতিন বার ওঠা ছাড়া টানা কাজ করে যেতো পিন্টু।তারপর ধুঁকতে ধুঁকতে বাড়ির পথ ধরতো।ফিরতি পথে এক জায়গা থেকে বাজারটা সেরে নিতো কোনরকমে।সেই যে দাদাটা কেরলে চলে গেলো কতদিন আগে কাজ করতে,প্রথম প্রথম ছমাস একবছর পর পর আসতো,প্রতিদিন বাড়িতে ফোন করতো।যখন আসতো খুশীর বন্যা যেন বয়ে যেতো পিন্টুদের সংসারে।অনেক টাকা,জিনিসপত্র,মায়ের জন্য শাড়ি,বাবা আর ওর জন্য জামাকাপড় –সব কিনে আনতো।পিন্টু তখন স্কুলে পড়ে।দাদা চলে গেলে খুব মনখারাপ হত ওর।তারপর যে কি হল।আস্তে আস্তে দাদার ফোন আসা কমতে লাগলো,সাথে নিজের আসাও, তারপর তো আসা বন্ধই হয়ে গেলো একসময়।এখন লোকজন বাজে কথা বলে দাদা সম্পর্কে,তাই পিন্টুরা আর কাউকে জিজ্ঞেসও করে না।বাবাও কোন কাজ করতে পারে না প্রায় বছর চারেক হল।দাদা যে টাকা পাঠাতো,সে টাকাও আর পাঠায় না আর।তাই পিন্টুই এখন সব বাড়ির।

কিন্তু লকডাউনের এই দু মাসে সব হিসেব পালটে গিয়েছে।সরকারি নির্দেশের পরও ওরা দুদিন গ্যারেজ খোলা রেখেছিলো।পিন্টু জানতো যে কাজটা ঠিক হচ্ছে না,কিন্তু ও কিছু বলতেও পারছিলো না।কারণ কাজ না করলে মালিক টাকা দেবে না।আর ওর বলাতে যদি মালিক কাজ বন্ধ করে দেয় তাহলে গ্যারেজের বাকি সবার কাছে ও খারাপ হয়ে যাবে।তারপর তো কাউন্সিলর এসে এক সকালে গ্যারেজ বন্ধ করে দিলো।

এই দুমাস যে কিভাবে কেটেছে তা একমাত্র পিন্টুই জানে।প্রতিটা দিন সকালে উঠে একই চিন্তা যে কিভাবে বাড়ির এতগুলো লোকের দু বেলার খাওয়া চলবে।তবু ভালো, যে দিন মালিক কাজ বন্ধ করলো,সেদিন ওর পাওনা কিছু  টাকা দিয়েছিলো।আর তা দিয়েই বাড়ি ফেরার পথে একবস্তা চাল কিনে নিয়ে গিয়েছিলো পিন্টু।আর ছিলো কিছু জমানো টাকা।তা দিয়ে একমাস মতো কোনরকমে চলেছে।কিন্তু তারপর থেকে-উফ,ভাবলেই শিউরে ওঠে পিন্টু।প্রতিদিন সকালে গিয়ে পাড়ার মুদিখানার দোকানে গিয়ে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকতো ও।দোকানদার বিরস বদনে ওর দিকে তাকাতো।তারপর জিনিসপত্র যতটা কম পারতো ওজন করে দিতো ওকে।মাঝে মাঝে ধৈর্য হারিয়ে বাড়িতে মাথা গরম করে ফেলতো পিন্টু।তাই যেদিন খবর পেলো যে গ্যারেজ খুলছে একবারও ভাবেনি ও।ঐ দম বন্ধ করা পরিবেশে ও আর থাকতেই পারছিলো না।

আর গ্রামের ছেলেগুলোও কেমন যেন হয়ে গেছে সব।সারাদিন, সেই সকাল থেকে সব গিয়ে বসে থাকে মোড়ের মাথায় বাঁশের মাচায়।কোনো নিয়ম মানার বালাই নেই।আবার কখোনো এসে বসে স্কুলের সামনে যে গাছটা আছে তার নীচে।আর সেই একই মোবাইল ঘাঁটা অথবা নোংরা জিনিস দেখা বা আলোচনা।এক দু দিন পিন্টুও তাতে ছিলো,কিন্তু প্রতিদিন ঐ একই জিনিস কি ভালো লাগে?আর আছে পার্টির কাজ।লোকজনকে বাইক নিয়ে গিয়ে অনর্থক ধমকানো।এসব একদম ভালোলাগে না পিন্টুর। এখন আর আগের মতো সবাই স্কুলের মাঠে  খেলে না।পিন্টুর মনে পড়ে ছোটবেলায় যখন স্কুলে গরমের বা পুজোর ছুটি পড়তো, সকাল দশটা বাজতে না বাজতেই মাঠে খেলা শুরু।শেষ হতো সেই বেলা দুটো পেরিয়ে।

আজ সকাল থেকে মনটা কেন জানি এলোমেলো হয়ে আছে পিন্টুর।কিছুতেই কাজে বসছে না।নাট ভুল হয়ে যাচ্ছে বারবার।এদিকে দুপুর হয়ে গেলো।কিন্তু একটা বাইকের কাজই আজ এখোনো শেষ করতে পারলো না ও।আগে এতক্ষণে তিন চারটা হয়ে যেতো।তার মধ্যেই অসীমবাবুর এইসব রেখে যাওয়া বইপত্র । কাজ করতে বারে বারে পিন্টুর চোখ চলে যাচ্ছিলো ঐ বইগুলোর দিকে।ছোটবেলায় খুব গল্পের বই পড়তে ভালোবাসতো ও,কবিতারও।হাইস্কুলে ভর্তি হল যখন,স্কুলের লাইব্রেরী থেকে বই নিয়ে পড়তো।তারপর যখন একটু বড় হল,স্কুল লাইব্রেরীরও সব বই পড়া হয়ে গেলো,তখন গ্রামের লাইব্রেরীতে নাম লেখালো পিন্টু।সেখানে আরো অনেক অনেক বই।শরতচন্দ্রের শ্রীকান্ত, বিভূতিভূষণের চাঁদের পাহাড় পড়ে কল্পনার রাজ্যে ভেসে যেতো পিন্টু।বরাবরই ও স্কুলের ভালো স্টুডেন্ট ছিলো।স্যাররাও খুব ভালোবাসতো ওকে।তারপর তো এই পরিণতি।মাধ্যমিকের টেস্টের আগেই পড়া ছেড়ে কাজে ঢুকে পড়তে হয়েছিলো পিন্টুকে।কাউকে বলেনি,স্কুলেও না। কোনরকমে মাধ্যমিকটা দিতে পেরেছিলো ও।কিন্তু আর এগোয় নি।ওর স্কুলে ভর্তি না হওয়া দেখে স্যাররা বেশ কবার বলেছিলো ওকে।পিন্টু তারপর উপায়ন্তর না দেখে স্যারদেরকে দেখলে অন্যদিকে চলে যেতো।তাতে অনেক স্যারই ওকে খারাপ ভেবেছে,জানে পিন্টু, কিন্তু আবার এটাও জানে ও যে কাজ করে বাড়িতে টাকা না আনলে তখন হাঁড়ি চড়তো না।কিন্তু এখন আর বহুদিন ওর বই পড়াই  হয় না।

সেরকমই কিছু বই যেন দেখা যাচ্ছে ওখানে । পায়ে পায়ে ওদিকে এগিয়ে গেলো পিন্টু।ডাঁই ঘেটে বের করে আনলো কয়েকটা বই।তার মধ্যে একটা বই পল্লীকবি জসিমুদ্দিনের,আরেকটা বই মহেশ।বইগুলো ঝেড়েঝুড়ে সুন্দর করে সাইডে রেখে দিলো পিন্টু।যাবার সময় বাড়ি নিয়ে যাবে,পড়বে।ওর মনে হচ্ছে যে এইরকম একটা দম বন্ধ করা বাড়ির আর গ্রামের পরিবেশে ওকে একমাত্র মুক্তি দিতে পারে বইগুলিই।ফাঁকা সময়টা ও এখন এগুলো পড়েই কাটাবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন