শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

নবনীতা সান্যাল। পারক গল্পপত্র


এই যে জীবন --তার যে দুই পিঠ ..কজন তার খবর পায়?  জীবনের সব তারে ধরা পড়ে সব সুর? সব রং বেরং কোথায় জড়িয়ে আছে কেই বা তার খোঁজ রাখে?  ধবধবে জীবনেও ধারে ধারে, আনাচে কানাচে লেগে থাকে কত কালি, ধুলো, ময়লা ! --সব সরিয়ে আর ফেলা হয় কই? সব কালো সরিয়ে তাকে পরিস্কার, ধবধবে করে তোলা যায় কী? যায় না, যায় না ।তো .. সেই কালকে ধলো করার ইতিহাসেই ঢুকে গেল কমলা দেবনাথ । কমলা কালো । কিন্তু, তার চোখ মুখ যে তুলিতে আঁকা ...'চোখ দুখানা হাসিতে ঝলোমলো '। তবে , ঐযে "যতন করি বাঁধলি মাথা..তবু হইল বাঁকা সিঁথা "-কমলার হলো গে তাই। কমলার বাপ  সিধু গুনিন চোখ কান খুলে, ভেবে, দেখে  তারক কেই 'সমোপপন' করলেন বাহারী কন্যাকে ।             

তারকনাথ দাস । বয়স পঁচিশ । কাজ নাই, বেকার । তবে ,কীর্তনের আসরে খোলখান যা  বাজায় .. 'আহা স্বয়ং গোরাচাঁদ গো'।আর বাঁশি ধরলে ..সে  যে "বড়ো মন ভাসানি  ..." । 'খুব মানাইবো দুজনারে '।কমলার ঠাকুমা দয়ালী  দাসী  মা হারা কমলিকে তারেকের হাতে তুলে দিয়ে বড়ো 'নিচিনতি '  হয় । নাহ , কোনো দিকে কোনো অমিল নাই কী মতে কী  পথে ... বৈষ্ণব মতে কণ্ঠি বদল  ..কম খরচে বিয়া সারা । আর কী লাগে? তারকনাথ দাসের ঘর আলো করে কমলা সুন্দরী I             

তা ..তারকনাথ মানুষ ভালো । রসের সাগর। কিন্তু, কী জানি  নাই  ..কী  জানি নাই সংসারে । কী নাই ..কী যে নাই   ..চোদ্দো বছরের মেয়ে বোঝে না ।তার' চোকখে শুধু  ..স্বপন আসে ..স্বপন ভাসে ' । সিধু গুনিন মুখে পানের টোপলা নিয়ে আলাপ করে 'একাচুরা' জামাই তারকনাথের  সঙ্গে... ..."সোমসারের নিয়ম অইল গিয়া বড়ো হওন  ..বড়ো হৌক .অইবই.....সোমসারে বাপ নাই, মা নাই তুমার ..অহন সোমসার বডো হওনের লাগব । সুতা ছাইড়া দাও । বাকি গোবিন্দের ইচ্ছা ..."। তা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় বড়ো হল সংসার । তেরো থেকে তেইশে আসতে কমলার মেয়েই হল তিনখানা । মুখ চুন করে বসে থাকে তারক দাস ..দোষ দেয় সেই গোবিন্দকেই।আর ,বিড়ি বেঁধে .. চাল ভেজে সোমসার করে কমলা। শোক খুব বেড়ে উঠলে তারক দাস আদাড়  বাদাড় ঘোরে । কিন্তু  চলে কই? আয় কুলায় না । কিন্তুক ছেলে না হলে চলে ?মেয়ে গুলো পরের ঘরকে যাবে না?  তখন?         

কত মানত, আর কত গড়াগড়ি, কত সেবা  .. শ্যাষে  আইল সাত রাজার ধন",  ..তখন আন তো বামন সেবা ..দে তো দেখি  কীর্তন .. এত কইরা শেষে ঘরে মন বসলো তারেকের । আর" পোলা দেইখা   . ...নাতনির ঘরে পুতি দেইখা  সাতদিন পর মরল গিয়া দয়ালী দাসী ।"             কিন্ত ছেলে যে কথা কয় না । বছর ঘোরে ছেলে তো  আর কোল ছাড়ে না । কী হবে উপায়?  তারক ছেলের দিকে তাকায়  দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে । গুনিন সিধু আড়ালে 'চোকখের জল মোছে .".এমন ছেলে বিয়াইলু কী হবে উপায়:"? কমলার বড়ো মেয়ে জয়াবতী মাথা নেড়ে বলে   .."আমি পডুম, আরো পডুম । পাশ দিয়া চাকরি নিয়া ভাইয়েরে ঠিক করুম। "মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া মেয়ের কথা শুনে বাপে চমকায়, মায়ে গুমরায় ...। কিন্তু মেয়ের পড়া হয়না ।'ষুলো বছবেই বিয়া সারা হয়' । সুন্দরী, শিক্ষিত মেয়েকে ঘরে তুলতে   সম্বন্ধ আসে  বাড়ি বয়ে। সামান্য খরচেই  বিয়ে হয় । তারপর  খরচ আরো বাড়ে .বাড়তেই থাকে।আরো দুইটা মেয়া  ..তাগোর  বিয়ার  জন্য খরচাপাতি আছে। সবার ভাইগগো জযার মত অইবই...এমন না। আর ছেলেটাও..তার চিকিৎসা  ...কী উপায় কী উপায়? তারক হাল ছেড়ে দিয়ে বাইরে বাইরে ঘুরে বেডায  ..কমলা আলাপ করে বাবার সঙ্গে  ..কী যে উপায়.. কী উপায়?              মনা মাসী  শহরে যায় ..কাজ করে টাকা আনে । "ওগোর সোমসার অহন উথলাইতেছে" . .কমলা বলে । "তাই বইলা  বাসাবাড়ি কাম করবা "..  মুখ বেঁকায তারক ...।সিধু গুনিন মাথা নাড়ে, বলে  .."এইটারে কাম কয় না ঠিক ..এইডা হইল  যারে কয়'  শ্যাবা' ..মানসের শ্যাবা করা ভাল .."। তারক ঝাপটা মারে ..".হ ..সে তো ঠিকই । আর আমার সোমসার ভাইসা যাক. . পোলাটারে  লইয়া  চলব   কিযেরে? "  কমলা মাথা নিচু থাকে । গুনিন বলে ..মাইয়া দুইটা তো আছে ..সামনে টাকাটা তুমার লাগে কি না  কও...তোমাগো দিক দিয়া কেউ তো আগাইলো না কুনো দিন! সোমসার টা চালানো তো লাগে, নাকি ..কী কও  ?..কও অহন"। কমলার শহরের যাওয়ার ব্যাপারটা ফাইনাল হয় । শহরে  আয়া মাসীর কাজ পায় কমলা । দিনের কাজের  একরকম, রাতদিন করলে টাকা ডবল । সাতদিন কাজ করলে একদিন ছুটি । সিধু গুনিন আর মনা মাসীর মধ্যস্থতায় ..এই লাভজনক কাজটাই শেষে  ঠিক হয় কমলার  ।         

শহরে এসে  প্রথম কদিন যেন আরামে শরীর ছেড়ে দেয় কমলার । কী আরাম .. কী আরাম ..আঃ । এমন নরম বিছানায়   জন্মে শোয় নাই.. কাজ কতো কম ।  সারাদিনে ..চাল কোটা নাই ..রান্না বারি নাই। ছেলেটাকে দেখশোন নাই ..আর তারেকের জন্য হা পিততেশ করে দেখে দিন গেলে ঠান্ডা ভাত গেলাও নাই ।..গাই দোযানো নাই ..কুয়াতলা নাই ..ছাম গাইন, ঢেঁকি ..কিচ্ছু নাই । দিব্যি, ফিটফাট আর   কী গোছানো সব । কাজের মধ্যে সারাদিন  ঠাকমার সঙ্গে কথা কওয়া ।তা তো কমলার ভালোই লাগে । এতদিনে তার কথা কওযার  ফুসরত মিলছে যে!..ঠাকমার সঙ্গে সঙ্গে ..থাকা ..তাকে ধরে নিয়ে ঘোরা ..একদিন সাহস করে কমলা বলেই ফেলে ..এটটা কথা জিগাই ঠাকমা ..."তোমার হইছে  কী গো ? শরীলে কী অসুখ তোমার"? ..  ধবধবে সাদা চাদরে ঢাকা বিছানার থেকে ঠাকমা বলেন, হাঁটু  ভাঙা দ হয়ে বেঁচে আছি, বুঝলি ...কোমরেও জোর নাই রে  ..."ঠাকমার কথা গুলান কেমন করে জানি দয়ালী ঠাকমার সঙ্গে মিলে যায় ..অথচ দুইজনে কত ফারাক ..দয়ালী ঠাকমা তো পডা লিখা জানতোই না ।আর, এই ঠাকমা একসময় ইস্কুলের দিদিমণি আছিল  । ঠাকমার কাছে কেউ খুব একটা আসে না । আসলেও বেশিক্ষণ বসে না । মাঝেমাঝে কখনো হাঁপের টান ওঠে ...তখন খবর দিতে যায় কমলা ...তখন ছেলেরা আসে ।               ঠাকমার  তিন ছেলেই খুব ব্যস্ত ।একজন আবার বিদেশে থাকে। বাড়ির  মধ্যে এরকম  আরো একটা বাড়ি যে থাকতে পারে  এইখানে না এলে কমলা জানতেই পারতনা। ঠাকমার ঘরের সঙ্গে পুরো বাড়িটার কোন যোগাযোগই নাই ।শুধু মাত্র মাঝখানের এক দরোজা ছাড়া ।..কমলার ছত্রিশ বছরের জীবনে এমন যে হয়  সে  ধারণাই ছিল  না। দিনের মধ্যে একবার রাতে বাড়ির খোঁজ নেওয়া . সপ্তাহের শেষে বাড়ি যাওয়া, একদিন ছুটি কাটিয়ে ফিরে আসা .. মন্দ চলছিল না তার  । ছেলের জন্য বেশ কিছু টাকা রাখা আছে ঠাকমার কাছে ? আর ডাক্তারের খোঁজ  নিয়ে দেখছে ঠাকমা..একে ওকে ফোন করে । "ঠাকমার তোমার তো বিশাল  চিনা জানা দেহি ."।   ' দাঁড়া' .. বাপু ..আগে খোঁজ খবর হোক । তারপর দেখি" ...ঠাকমার সঙ্গে মন খুলে কথা বলে অনেকদিন পর বড়ো শান্তি পায় কমলা।              হঠাৎই কী যেন হয় শহরটাতে । সারা শহর জুড়ে  হঠাৎই  সব বন্ধ হয়ে যায় । ঠাকমার শরীর টাও বেশ খারাপ হয়ে যায় ..বাড়ি যেতে পারে না কমলা ..এক সপ্তাহ  ..দু সপ্তাহ । মন কেমন করে ছেলে টার জন্য ।কাউকে বলতে পারে না । জ্বর আসে ঠাকমার।খুব জ্বর ..বুকে চাপ বাথা  বাড়ে । শ্বাস নিতে কষ্ট হয় । ভেতরের ঘরের থেকে খাবার দেওয়ার জন্য যে মেয়েটা  আসে, কমলা বলে তাকে  .তবু কেউ আসে না । সারারাত ভয় ভয় করে কমলার ..ঠাকমার খুব কষ্ট হয় । ভোরের দিকে ভেতরের  দিকে যায় কমলা । গিয়ে মনেহয়  যেন সারারাত ধরে কী এক উচ্ছব চলেছে এখানে ..ভাগ্যিস বড়দা বাবুর তাকে চোখে পড়ে । আর তাইতো তাড়াতাড়ি খবর পৌঁছায়। ডাক্তার আসে  । ফেরার সময়ে ডাক্তার বাবু বলেন, "সত্তর বছর বয়স  এটা একটা বিরাট ফ্যাক্টর . বলে দিচ্ছি, নিয়ে যান  ..কাছের নার্সিংহোম টা নিয়ে নেবে ...".। সেদিন রাতে কমলার কান্না পায় ..কাঁদে।বাড়ির কথা মনে পড়ে ..হঠাৎ খুব ভয় করে।  সারাবাডি টা কেমন ভুতুড়ে নিঝুম হয়ে ঝিমায় । কাল এমনিতেই  বাড়ি ফেরার কথা । কথাটা কাকে বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না কমলা ।

দাদাবাবুরা কীসব আলোচনা করে নিচু গলায় । তাদের বৌ রাওখুব সাবধানে কী সব কথা বলাবলি  করে । কমলা সাহস করে বৌ দের কাছে ঠাকমার কথাটা পাড়ে । কিন্তু কেউ তার কথার উত্তর দেয় না । মেজ বৌ বলে'  কমলার বাড়ি ফিরে যাওয়াই ভালো ।' বড়ো বৌ বলে,' কিন্তু পরে দরকার হলে লোক পাওয়া যাবে?   '  বড়ো দাদাবাবু গম্ভীর মুখে বলেন, '।এখন লোক রাখাটাও রিস্কি হয়ে যাবে ।'  সাবধানী গলায়  মেজ দাদা বলেন . 'এমনিতেই পাড়ায এখন কী পজিশন হয় দেখো । 'কমলার কথাটা  কোথাও কেউ শোনে না । হঠাৎ কথাটা ওঠে। কমলা ঠায় দাড়িয়ে তখন । দাদাবাবুর  বড়ো মেয়ে নন্দিনী বলে .." কমলা পিসির এখন  বাড়ি ফিরে যাওয়াই উচিত ।" কিন্ত  ফিরবে কী করে?  সেটাও কথা হয় । ড্রাইভার কে ফোন করা হয় ।.সে রাজি না ..চেষ্টা চলে নানারকম কমলাকে বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়ার । তারকও ফোন করে ..বাড়ি ফেরার তাগাদা দেয় । টাকা পয়সার কথাও তোলে ...কমলার বলি বলি করেও বলা হয় না, সেই টাকাগুলোর কথা ..যেগুলো সে ঠাকমার কাছে রেখেছিল। বলা হয় না ।কান্না আসে কমলার । খুব ভয় পেতে থাকে কমলা ..বুকটা ভার ভার লাগে । ঝড়ের দিনে মানুষকে কাছে রাখলেই শান্তি ।তেমন  মানুষ কেআছে কমলার ? কে ছিল কোনদিন?শরীর টা ভার হয়ে আসে ..ঘুম পায়  ..একা একা ঘরে বেশিক্ষণ ভালো লাগে না । পরদিন কী জ্বর ..মাথা তুলতে পারে না কমলা .. কথা বলতে পারে না ।  কী হবে, কী হবে উপায় ।?  "বাড়ি যাও বাড়ি যাও"..নানা সুরে সবাই বলতে থাকে । কমলাও বাড়ি যেতে চায় ..কিন্তু কেমন করে ! কেমন করে! তিন ঘণ্টার পথ সে কেমন করে পার হয় এখন?  দয়ালী ঠাকমার কথা গুলান মনে পড়ে  .".জীবন ঝান চেতই পিঠা রে ভাই .. উপরসই ধবধব করে ..ভিতরি ময়লা নাখান,." ছেলেটার মুখখান ভিতরে সিঁদায় ধবধবে শাদা বাড়িটার থেকে নেমে পথে এসে দাঁড়ায় কমলা সুন্দরী .....।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন