শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

জয়িতা ভট্টাচার্য। পারক গল্পপত্র


অন্য আর পাঁচটা দিনের মতোই।
সকালটা একই রকম মরা মাছ।রাসবিহারী এ্যাভেন্যুএর পাশে প্রসন্নময়ী ঔষধালয়ে বসে আছে প্রণব।এক'শ বছর পেরিয়ে গেছে। বিরাট অন্ধকারময় ঘরটা স্যাঁতস্যাঁতে, ঝাঁঝালো গন্ধ।প্রণবের নিজস্ব জগত এটা।

আশপাশে আরো দু এক ঝকঝকে দোকান।মেডিক্যাল স্টোর।তবে কিনা তাদেরটা সতন্ত্র। তারা আয়ুর্বেদিক ঔষধালয়।সারাদিন বিরাট সেগুন কাঠের টেবিলের একপাশে বসে থাকে প্রণব।কেউ আসে না তা নয় অবশ্য। সকাল সকাল আসে অকৃতদার দেবেশ ভটচায দাদুর বন্ধু।কপালে তিলক।হাতে সাজি।ছোটোখাটো চাকরী করতেন এখন বেশ কটা দোকান ধরে ফেলেছেন।সকাল সন্ধ্যে ধূপ ধুনো।
আর আসে আধো আঁধারি বয়স্ক এই দোকানটার মতোই কিছু মৃতপ্রায় পুরোনো খদ্দের।

প্রণব তাকিয়ে থাকে পথের দিকে।গতিশীল এই জগতের কিছুই বুঝি তাকে স্পর্শ করে না।

দিন থেকে দেশান্তরে তারপর মোহ রাত।
প্রণব সব জানে। সারি সারি শিশি আর নানা গঠনের এসব তরল.....।সবই জানা।
শেষদিন হরিহর ডাক্তার বলেছিলো
____" তোমাকে আর কী বলব ভাই প্রণব, ডিগ্রীটা ছাড়া তুমি ত আমার চেয়ে বেশি জানো সব"
একটু আত্মশ্লাঘা হয়েছিলো বৈকি।কিন্তু তারপর___" তুমি আমার নাতির মতো।এসব রসায়নের খেলা অতি ভয়ানক। খুব সতর্কে ব্যবহার কোরো "কথাটা একটু অস্বস্তির।

এক সপ্তাহ পরে হরিহর মারা গেছিলো। মৃত্যুর সব লক্ষ্ণণ স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছিলো প্রণব। মাকে মনে পড়ে না।বাবার মুখটা ফ্রেমে বাঁধানো।দাদুর কাছে মানুষ।অবশ্যি যদি মনুষ্য পর্যায় ফেলা যায় তাকে।
বেঁটে কালো কুঁতকুঁতে চোখ,তোতলা কলেজ পার করার আগেই দাদু দোকানে প্রতিষ্ঠা করে দিলো। তিনতলা বাড়িটা।দোতলায় ভাড়া।সেই টাকাতেই চলে দুটি প্রাণ।দোকানটাত আছে তার অস্তিত্বের প্রয়োজনে।

রোদ সরে গেলে ছায়া ছায়া অবয়ব ঘরে আসে।প্রণবের তন্দ্রা আসে।আর তখনই প্রসন্নময়ীর সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করে বিকট ডায়নোসর।এরোড্যাক্টিল ওড়ে উঁচু করিবর্গায়,তাক থেকে তাকে টেরোডাক্টিল ছায়া শরীরগুলো জড়িয়ে ধরে ওকে ভয়ে। প্রণব জাগে।থাকে থাকে অরণ্যগন্ধা।তরল রাসায়নিক।.... ইভ।সব তার। প্রণবের দুএকটা বন্ধু থেকেই গেছে।সন্ধ্যায়  তারা আসে।সামনের রকটায় বসে। প্রণব ব্যস্ততার ভান করে।অথবা এটাই তার নেশা।বোতলগুলো বার বার মোছে,হাত দেয়,ভেতরের লাল তরল নড়ে চড়ে। ভর দুপুরে উত্থিত হয়।চেপে ধরে তার বিশেষ অংশ,একেকদিন একেকটা বোতল।সে সময় কেউ এসে গেলে তার রগ ফুলে ওঠে ক্রোধে,চিৎকার করে তাড়িয়ে দেয়।

প্রণব সব জানে।কালিঘাটের মেয়েগুলো আসে।পেটের বাচ্চা খসাতে। সে ওষুধ  দেয়। তারা চোখ মটকায়,কোমর মচকায়। প্রণব কাগজে চোখ রাখে।

বড়ো হবার পর থেকে প্রণব অনেক দেখেছে। তবু তার কিছুই হয় না এসব নারীতে,এমনকি পুরুষেও।

প্রবৃত্তি হার মেনেছে তার কাছে।শুধু রাত হলে বোতলগুলো নড়ে,চড়ে নানা গঠন নানা সৌষ্ঠব।ভেতরে লাল তরল টলটল করে।

প্রণব কাঁপা হাতে আদর করে।চুমু  খায় একটু একটু।কঠিন লোহা হয়ে যায় তার অশ্বশিশ্ন তারপর গলিত লাভার মতো মুক্ত হয় সব তরল বীজ।

বাতের ওষুধ থেকে ধ্বজভঙ্গ ,মৃতসঞ্জীবনি সবই থাকে সাজানো শোকেসে।
প্রনব সব জানে।কিসে কী।এমনকি.......,এমনকি প্রায় সবটাই।
দাদু গত দুবছর শয্যাশায়ী। এবাড়িতে অন্য ওষুধ ঢোকা নিষেধ। তার মা মরে গেছে  তার জন্মের পর। সূতিকায়__ রক্তাল্পতায়।

কেন ওই যে সারি সারি শিশি ওতে নিমেষে রক্ত বাড়ে।দেয়নি কেন কেউ?কেন বাবা হঠাৎ ঙমারা গেছিলো দাদুর সঙ্গে রাতভর অশান্তির পরদিন..........
রাধামাসি দরজা খুলে শাওয়ারের নীচে চান করে।সাবান ঘষে গায়ে  পিঠে।তাদের কাজের লোক।
দাদুকে দেখা শোনা,ঘর মোছা ....রাতে চলে যায়।

দাদুকে এভাবেই  ঘষে ঘষে চান।
প্রণব সব জানে। শুকনো ওই ঝোলা মাইটা ফুলিয়ে দেওয়াই যায় অথবা পেটে বাচ্চা নষ্ট ।রাধামাসির বর নেই। তবু ওকে শিশ্ন জাগানিয়া দিতে বলে।কেন তাও জানে প্রণব।নীরবে দারাকে ড্রয়ারে।
ওর কোনো অনুভূতি হয় না।রাধামাসিও জানে সে ক্লিব লিংগ।ক্লাবের জান থাকে উষ্ণতা থাকে,বিপর্যয় বা শক্তি থাকে অনেকে জানে না।

প্রণব আজ ভাববে রাতভর।
কারণ সময় বেশি নেই।ছায়ারঙ্গিনীরা বিপন্ন।সে মদ খায় । বন্ধুরা মদ এনেছে সঙ্গে চানামাখা।

আজ প্রণব অনেকটা খায়।
সারা রাতে আজ অনেক কাজ।
আসলে তার একরকম জীবন চলেই যায়।নিস্তরঙ্গ পৃথিবী ঘুরতেই থাকে খারাপ ভালোর অনুভূতি ছাড়াই যদি না ধাক্কা খায়  আচমকা দুর্গ্রহের সঙ্গে।
এ রাজ্যের মাথাওলা শুঁড়ওলা বিকট ডাইনোসরের চোখে পড়ে গেলো দোকানটা....বাড়িটা আর এ বাড়ির ক্লীব উত্তরাধিকারের। ভাড়াটিয়াদের গোপন বৈঠক,রাধামাসির সঙ্গে ছোটো ডাইনোসরের রাতকথা,দাদুকে  ভয় দেখানো......প্রণব  এসব-ই জানে।

ওর কিছু এসে যায় না।জলে থাকলেই বা কী ডাঙাতেই বা কী। কিন্তু প্রসন্নময়ী কে ছাড়া সে যে শূন্য,অবয়বহীন কীট।
ওই গন্ধ ছাড়া, ওই লাল মিষ্টি বিষ,নানা গঠনের বোতল.....প্রনব রাতে আর যে মানুষ থাকে না।বোতলগুলো হয়ে যায় জীনপরী।তার মতো আকারহীন , উন্মত্ত ,কাম গন্ধে ভরে যায় প্রসন্নময়ী।
ওরা এসে যাবে কাল দখল নিতে প্রসন্নময়ীকে।

আজ অমাবস্যা।প্রণব পাগলের মতো ছুটে যাচ্ছে এ তাক থেকে ও তাক ,এলো মেলো বোতলে হাতরাচ্ছে কী যেন। ঝাঁঝালো গন্ধটা বাড়ছে। অবশেষে তাকে পায়। তাকে।তার রম্ভা তার উর্বশী। রসায়ন তাকে রসালো করে তোলে,ক্লীবতা থেকে প্রাচীন  সেই বিলুপ্ত প্রাণী জেগে ওঠে।
প্রণবের  ডাকে তরলেরা সাড়া দেয়।
রসায়ন  আপন মনে মিউটেশন বদল করতে থাকে।কষ্ট! আহহহ।উল্লাস ....

মাঝরাতে একটি ক্লীব সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে বুকে হেঁটে উঠে যায় নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে।অমাবস্যার রাত।কালো মাংসাশী সরীসৃপ।

রাসবিহারী এভিনিউ তে রোদের জ্যাম।কুকুর, ভ্যাট, দোকানের সারি....
প্রসন্নময়ী ঔষধালয় এখনো আছে।
পোড়া ,কালচে বোর্ড দেখা যায়।
এমন এক শীত সকালে হেডলাইন হয়েছিলো

"একই বাড়িতে আটটি মৃতদেহ উদ্ধার।"
বাড়িটি তে সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি পনেরো দিন।পাওয়া যায়নি পচনের গন্ধ।শোনা যায় প্রভাবশালী ডায়নসর বাড়িটি দুদিনের মধ্যে হস্তান্তর করার জন্য চাপ দিচ্ছিলো।

গভীর রাতে রাতে এখনো লাস্য করে রসায়ন একটি সরীসৃপেরা সঙ্গে, কখনো শিশুর ক্রন্দন শোনা যায়।পথচারী এড়িয়ে চলে রাতে ওদিক।
                         _________"

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন