শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

শ্রীকান্ত অধিকারী। পারক গল্পপত্র


একটা মাঠ ,খেলার মাঠ। বৃত্তাকার ।তার পিঠ বরাবর হাঁটা পথ। চুন দিয়ে বা দাগ কেটেও নয়। দীর্ঘদিন ধরে একই বৃত্তে বারবার হাঁটার ফলে ঘাসগুলো আর গজাবার সুযোগ পায়নি । আপনা থেকেই তাই সহজে একটা বৃত্ত আঁকা হয়ে গেছে ।এপাশে ওপাশে ঘাস । গুচ্ছ চুলের মাঝে এক চিলতে সিঁথির মতো গুটি কয়েক মানুষের চলার পথ ।  যে মানুষগুলো দিন রাত এক করে বাঁচতে চায় ।বাঁচার জন্য পথ চলে । চলতেই থাকে ,–--মিটারের পর মিটার, কিলোমিটার ..... । আরও দূর ,অনেক দূর ----।

অপর্ণাও হাঁটে ।এক পা এক পা করে  হাঁটে । আর মাঠের মাঝে বসা সুবীরকে লক্ষ্য করে । ঠিক আছে  তো ! একটু কি মুভ করল ।একটু কি ছেলেদের খেলা দেখল ! একটু কি কিছুই করল না !

না সে সকালে আসে না । অপর্ণা সুবীরকে ধরে ধরে নিয়ে এসে মাঠের মাঝখানে বসিয়ে দেয় ,তখন ঠিক কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটে । ততক্ষণে মাঠের উত্তর দিকে ফুটবলের কোচিং শুরু হয়ে গেছে ।পশ্চিমে ক্রিকেটের ছেলেরা গা ঘামাচ্ছে । আর পুব দিকে বিচ্ছিন্নভাবে গুটি কয়েক মা বাবা তাদের কচি কচি বাচ্চা গুলোকে মাঠে ছেড়ে দিয়েছে ।

 ওগুলোর কারও হাতে ফ্লাইং ডিস্ক , কারও হাতে পলিথিনের নরম তুলতুলে বল । কিংবা ছোট টেনিস বল।ওসব ছিটকেছুটকো গুলো কখনও কখনও  উড়ে এসে বা গুড় গুড় করে সুবীরের কাছে আসে । আবার গা বেয়ে পাশ কাটিয়ে চলে চলে যায় ।

যায় যাক--- , তাতে সুবীরের কোনও যায় আসে না । সে তখন দিব্যি চোখ বন্ধ করে ঝিমোয় । আর মাঝে মাঝে অতিকায় চোখ করে বৃত্তে পাক খাওয়া অপর্ণার দিকে অপলক চেয়ে থাকে । অপর্ণাও একই ভাবে পথ চলতে চলতে বসিয়ে রাখা সুবীরকে চোখে চোখে রাখে । সুবীর যেন খুঁটি , সেই খুঁটিকে কেন্দ্র করে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে অদৃশ্য সুতোর বাঁধনে অপর্ণা পাক খায় ।খুঁটি নড়ে গেলে কক্ষপথ পাল্টে যাবে ।ছিটকে গিয়ে পড়বে কোথায় কে জানে ।


অতীন সেদিন ফ্লাইট ধরল পাকাপাকি ভাবে । বলতে গেলে সাত বছরের কন্ট্যাক্ট পেয়ে কলরাডোয় চলে গেল ।প্রজেক্ট শেষ হতে বছর সাতেক লেগে যাবে।মাঝে হয়তো খুব বেশি আসা যাওয়া হবে না।অপর্ণা ভাবে, যাব যাবটাই ভালো । সত্যি সত্যি ঐ দিনটা চলে এলে মন খারাপ হয়ে যায় । ওয়েষ্ট বেঙ্গল জি –এর ইঞ্জিনীয়ারিঙ সেকশনে আটাত্তর র‍াঙ্ক করেছিল অতীন কোনও কোচিং ছাড়াই । সেদিন অনেকেই অনেক বাহবা দিয়েছিল বটে । কিন্ত্ত এর মাঝে পড়শীর কয়েকটা কথাও শীত-কামড় বসিয়েছিল ।
--এখন তো খুব  আন্ম্দ হচ্ছে অপর্ণা , একদিন তোমায় কাঁদতে হবে ।
--  কাঁদতে হবে কেন ।
--- তোমার ঐ এক রত্তি ছেলে তোমায় ফেলে উড়ে যাবে । সারা জীবনের মত ।
এটা কোনও কথা হল ! ওড়ার কথা কোথ্থেকে আসে । ছেলে জীবনে প্রতিষ্ঠা পাক , এ তো সব বাবা মা-ই চায় ।                                                                                           সুবীর- অপর্ণা বুক বেঁধেছিল অনায়াসে । দমদম থেকে বাড়ি ফেরার পথে পরস্পরে  উদাহরণ এনেছে      রনিতা সুজিতবাবুদের।  --ওনাদের একমাত্র ছেলে মৌনাকের আট বছর হয়ে গেল সিডনিতে সেটেলড্ হওয়া । সুবীর মনে করিয়ে দেয় । অপর্ণা বলে, কাবাডিয়ার ছেলেটা কানাডা আর মিসেস ব্যানার্জ্জীর  এডিনবরা না কোথায় যেন ।
---কেন বক্স বি-এর ৩২৭ এ আবার সাংহাই ।এখন অবশ্য ইউরোপ আমেরিকায় মর্ডান স্টুডেন্টদের তেমন নজর নেই। এশিয়াতেই, চিন-জাপান-মালয়েশিয়ায় নাকি অনেক বেশি বেনিফিট অ্যান্ড অপরচুনিটি।
    --- তা হোক । ওনাদের প্রত্যেকের ছেলেমেয়েরা বাইরে ।কে কবে আসে তার নেই ঠিক।অপর্ণা বলে, কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে ওনাদের । 
 --- ঠিকই বলেছ, এটাই ন্যাচারল। ছেলে-মেয়ে  যাই হোক কেন  একটা বড়সড় কোম্পানিতে  এন্ট্রি নেবে । নিজের গাড়ি বাড়ি ফ্ল্যাট থাকবে , -ব্যস্ । এ গ্রেডের সার্ভিস এ গ্রেডের কোম্পানি।
 --- ছেলেমেয়ের সঙ্গে সঙ্গে মা-বাবারও স্টেটাস বাড়বে । লি্ভিং স্ট্যান্ডার্ড বলে একটা কথা আছে না !                       --- ও সিওর! এ সব তো আর ঘরে বসে পাওয়া যায় না । সুবীর  ফোঁস করে  নিশ্বাস ছেড়ে শরীরে একটা ঝাঁকুনি দেয় ,--এ বংশে এই প্রথম কেউ একজন দেশের বাইরে পা রাখল ।
     --এটা কি কম কথা ! অপর্ণার মনে হয়,এতদিনে যেন বুকচাপা আশা আকাঙ্ক্ষাগুলো একটা মুখ পেয়ে সঠিক  আবর্তে দৌড়তে শুরু করেছে ।
       সুবীর জানলার কাচটা নামিয়ে দেয়।তারপর পাশে বসা অপর্ণাকে বাম হাতের বেষ্টনি দিয়ে গভীর আগ্রহে বুকে টেনে নেয়।ডান হাতে তখন স্টিয়ারিং। গাড়ির কাঁটা পাঁই পাঁই করে ওপরের দিকে উঠছে ।
কিন্ত্ত সব কিছু উলঢুল হয়ে যায় ঘরে ফিরতেই ।হঠাৎ বিষন্নতার প্রবাহ বইতে শুরু করে । গাড়ি থেকে নেমে কারও কোনও কথা নেই ।চুপিসারে অপর্ণা দরজা খুলে নিজের রুমে চলে যায় । ও লক্ষ্যই করে না সুবীর গাড়ি থেকে নামতে অনেক সময় নিল । ধীরে ধীরে গাড়িটা গ্যারেজ করে ভেতর দরজা লাগোয়া সিঁড়ির কাছে আসতেই সুবীর দাঁড়িয়ে পড়ে । মুখ দিয়ে চুক চুক আওয়াজ করে গজগজ করে, –ছেলেটা কবে যে সেল্ফ-সাফিসিয়েন্ট হবে , সাইকেলটাকে পর্যন্ত ঠিক করে রাখেনি ।

     বছর ছয়েকের পুরোনো হাইড্রলিক সাইকেল । এদিক সেদিক --বন্ধুদের বাড়ি , পাড়ার লাইব্রেরি,স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলতে যাওয়া সবেতেই ব্যবহার করত অতীন । সুবীর সাইকেলটাকে সোজা স্ট্যান্ড করে সেলফস্টোর থেকে বিছানার চাদর নিয়ে ঢেকে দেয় । তারপর সিঁড়ি পেরিয়ে ডাইনিং স্পেসে আসার আগে আবারও আটকে যায়।–অতীনের রুম । ডোরেমনের কার্টুন চেটানো দরজা আলতো করে ভেজানো । কবে কোন স্কুলবেলায় চিটিয়েছিল । কিছুটা ছিঁড়ে গেলেও আবছা বোঝা যায় ।দুই কপাটের ফাঁকে চেরা ফালি দিয়ে ঘরের ভেতরটা দেখা যাচ্ছে । সুবীর বাঁ হাতে চাপ দিতেই কপাট দুটো সরে  গেল । অমনি টাটকা ঝকঝকে  একরাশ স্মৃতি দরজা ঠেলে এক ছুট্টে বাইরে বেরিয়ে এসে সুবীরের বুকে জোরসে আঘাত করে ।সুবীর ককিয়ে ওঠে ।

       বেডের ওপর জামা প্যান্ট ল্যাপটপ বুক পেড়ে পড়ে আছে । চেয়ারের মাথায়

(দুই)

একটা মেঘলা রঙের টি-শার্ট।এই সবগুলো গুছি্য়ে যখন টেবিলে ছিটকে থাকা ইঞ্জিনীয়ারিঙের দু-খানা বই সাজাতে যায় অমনি সুবীর পিছলে মেঝেতে পড়ে । সে যণ্ত্রণায় চিৎকার করে --–আ! পায়ের তলা থেকে ডিউস বলটা মেঝেতে গড়াগড়ি খেতেখেতে খাটের নিচে এক কোণে গিয়ে লাগে।
সুবীর হামাগুড়ি দিয়ে অনেক কষ্টে খাটের তলা থেকে বলটা বের করে আনার চেষ্টা করে , ঠিক তখন অপর্ণা দরজায় দাঁড়িয়ে ।---কী করছ কী তুমি ?
সুবীর আর ওঠে না । মেঝেতেই হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ে ।শরীর যায় ঝুলে । দুচোখ দিয়ে তখন গুল গুল করে জল গড়াচ্ছে ।

      পরদিন সকালে অপর্ণা চমকে ওঠে । লোকটা বিছানার ওপর বসে দেওয়ালের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে কেন ! মুখে কোন কথা নেই । ডাকলে সাড়া দেয় না । নিশ্চুপ , নির্বিকার । ঠিক যেন একটা ডিঅ্যাক্টিভেটেড ট্রান্জিস্টার । কুঁক কাঁক কিছুই করে না । শুধুমাত্র অবয়বে সে বর্তমান । যার কোন ভূত ছিল না , ভবিষ্যতও নেই । সকাল-দুপুর-রাত সব যেন পাল্টে যায় । তার কাছে এক দুই তিন করে দিন পেরোনোরও কোনও হিসেব থাকে না ।

     ঘুম থেকে উঠে বাথরুম যায় না ।ঘুম ভাঙলে চোখ খোলে , -তাকায় । ঐ পর্যন্ত।গায়ে চাদরটাও টানে না। খাবার দিলে কেমন একটা শূন্য শূন্য ফাঁকা ফাঁকা চায় । লক্ষ্যহীন ভাবহীন --। যেন কিছুই বুঝতে পারছে না , আমি কে –কী বলছি । কী এটা –কী সব ।

অপর্ণা ভাবে ছেলে নিয়ে আদিখ্যেতা ওর ছিল ।--টিউশন খেলার মাঠ আত্মীয়ের বাড়ি পড়াশুনা খাওয়া-শোওয়াতেও কাছ ছাড়া করতো না ,এমনকি রাতে মশারির দড়ি  আটকে দেওয়া পর্যন্ত ও নিজেই করে দিত । ছেলের পড়াশুনা বাইরে যাওয়া সবই তো ওর প্লানমাফিক । তবে ! নিজেকে প্রশ্ন করে –তবে কেন ? কেন এমন হল !কেন এমন করে নিজেকে ছেড়ে ফেলল! আর সবের মত হতে পারল না সে !

....তারপর ডাক্তার ওষুধ অবসর ।আর একলা চলার একঘেঁয়েমি ।সময়ে মরচে পড়তে শুরু করে । অপর্ণা বোঝে এই বয়সে চকচকে ইস্পাত হওয়া যায় না । তবে প্রতিদিন ঘসলে মরচে নাও পড়তে পারে। আর এই ঘসার কাজটা ওকেই করতে হবে ।

কলেজ লাইফে হোমসাইন্স পড়াটা যে এভাবে সংসারে কাজে লেগে যাবে কেউ কি ভেবেছিল । অথচ সে সময় অনেকেই মুখ বেঁকিয়ে বলেছিল ওটা কোন সাবজেক্ট হল । কিন্ত্ত ওটা যে ওর ভালো লাগে বোঝাবে কাকে । এখন নিজেকে নিজের পিঠ চাপড়াতে ইচ্ছে করে, ভাগ্যিস সেদিন ওদের কথা না শুনে নিজের পছন্দটাকে প্রশ্রয় দিয়েছিল ।

    শুধু মেডিসিনে যে হবে না সঙ্গে মানুষের সুসঙ্গও দরকার অপর্ণা বেশ ভালোকরেই বুঝে গেছিল।ছেলের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়া, পাশে থাকা, –মজা করা -ওর পছন্দের ভালো ভালো খাবার বানানো ,-একসাথে বসে টিভি দেখা এমন কি ফেলে আসা  জ্বলজ্বলে দিনগুলোর কিছু ঝকঝকে মুহূর্ত্তকে ফিরিয়ে আনা ।স্মৃতিখুঁড়ে তার ছবি-অ্যালবাম-ভিডিও সব করে দেখল এই তিন মাস ।

সেদিন কাজের মাসি হঠাৎই ডুব দিয়েছে ।অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও যখন এল না, নিজেই নেমে পড়ল  ময়দানে । বাসন মাজা , ঘর পরিষ্কার  ছোটখাটো কাপড় ধোয়া , -
(তিন)

তারই মাঝে সময় মতো জল-খাবারটা ওর মুখের  কাছে  দিয়ে এসে ছিল,-হাতে ধরিয়েও দিয়েছিল । কিন্ত্ত ঘণ্টা খানেক পর গিয়ে দেখে যা-কে তাই ।ঐ একই ভাবে বসে । খাবারের থালা জুড়ে পিঁপড়েরা ঘুরে বেড়াচ্ছে । নিজেকে সামলাতে না পেরে বলেই ফেলে,-- হাতে তুলে চাট্টি খাবারও খেতে পার না । আর কত জ্বালাবে তুমি ।

কিন্ত্ত এতেও যখন কাজ হল না অর্থাৎ সুবীরকে একই রকম বসে থাকতে দেখলে অপর্না নিজেই নিজে অবাক হয় । কাকে কি বলছে ! এমন কথা তো মুখ দিয়ে কোনদিন বেরোয় নি ।-- লজ্জা লাগে । এরকম মেজাজ হারানোতে ভীষণ লজ্জা বোধ হয় ওর।একটু পরেই সুবীরের দুই গালে দুই হাত রেখে অপর্ণা শুধোয় –কী গো ,এমন করে থাকলে চলবে?  আমদের বাঁচতে হবে তো ।তবু নিশ্চুপ জগতের দৃষ্টিতে সুবীরের চোখদুটো কি অসহায় ভাবে ওর দিকে চেয়ে থাকে। চিক চিক করে ।কোথায় যেন সব হারানোর হাহাকার ।এক বুক শূন্যতার দ্বার হাট করে খোলা ।বাইরে থেকে সুবাস আসবে বলে একদিন যে দ্বার খুলে ছিল সে দ্বার দিনে দিনে অনেক বেশি ফাঁক হয়ে গেছে ।অনেক বেশি অর্গলমুক্ত। ভিজে কাপড় নিঙড়ানোর মত শরীরের সমস্ত নাড়ী নিঙড়ে অপর্ণার চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল চুঁইয়ে পড়ে ।

অপর্ণার এক পাক হাঁটা হয়ে গেল । ওর সঙ্গে এখন কেউ নেই । ওকে পাশ কাটিয়ে অনেকে চলে যাচ্ছে । যাক । ওর একটু একটু করে হাঁটলেই হবে ।

অপর্ণা লক্ষ্য করেছে , সবাই পাশ কাটিয়ে চলে যায় না । কেউ কেউ সঙ্গ দেয় । গল্প করার চেষ্টা করে ।কিছু দূর এক সঙ্গে হাসি মুখে ঘরে বাইরের গল্প করতে করতে পা মেলায় । অপর্ণাও চেষ্টা করে মাথা দুলিয়ে এক মুখ হাসি এনে কথা বলতে ।ও নিজেও চায় সারাদিনের একাকিত্ব , একঘেয়েমি  থেকে দূরে থাকতে ।কিন্ত্ত বার বার ঘুরে ফিরে আসে ঐ লোকটার চিন্তা । ঠিক আছে তো ! চোখ চলে যায় সেই মাঠের মাঝখানে । একটু কি মু্ভ করল ! মাঝে মাঝে এমন অন্যমনস্কতা পাশে চলা সঙ্গীকেও হতাশ করে ।  কোন এক সময় সেও বলে কাকীমা কিংবা জেঠিমা কিংবা মিসেস মাইতি , আপনি আসুন । আমি এগিয়ে যাই ।

অপর্ণার মাথা হেলানো ছাড়া উপায় থাকে না । সে আলতো হেসে সম্মতি জানায়।কয়েক মিন্টো মন খারাপ,তারপর আবার হাঁটাতে মন দেয় । অপর্ণা দেখেছে তবু যেন ওরা খুব খুবই প্রাণখোলা ।-সমানু্ভূতিশীল ।মাঠে যারা আসে তারা এরকমই হয় ।--‘মাঠ উদার মন তোমার ।‌‌‌‌‌’

পরদিন আবার সেই মাঠ । লোকটাকে বসিয়ে দিয়ে বৃত্তের বাইরে বাইরে হাঁটা ।আর চোখে চোখে রাখা । ডাক্তারের কথা মত এনি রিঅ্যাকশন অর এনি মুভমেন্ট নোট করা । আর সঙ্গে সঙ্গে ওনাকে ইনফর্ম করা ।

আজ অবশ্য মাঝখানে নয় । একটুকু দক্ষিণে ঘেঁসে ।ওখানে কিছু ছেলে ফুটবল খেলছে নিজেদের মত করে । উদ্দাম-বাঁধনহীন । রেফারি নেই কোচ নেই । শুধু খেলা আর খেলা ,গোল আর গোল । শুধু বলে লাথি মারা ।আর মুখ দিয়ে অদ্ভুত –কিম্ভুত ডাক দিয়ে ছোটাছুটি,-হেই—হেদিকে । –মার মার ,পেছনে পেছনে ।সাইডে মার শট। মার জোরে –গো-ও-ল !

     এসব বুনো উদ্দাম আওয়াজে ঘুমন্ত দৈত্যও জেগে যায় ।শুধু জাগে না সুবীর । মাঝে
(চার)

 মাঝে মিট মিট  পিট পিট করে তাকায় আর সর্বদা ঝিমোয় । বয়েজ জিমের দিকটায় কিছুটা জায়গা ফাঁকা থাকে । বসার জায়গা প্রচুর । বসে বসে টগবগে ছেলেদের খেলা দেখা যায় । ওদের ছুটোছুটি দেখা যায় । দেখা যায় চঞ্চল প্রাণের ছটফটানি । আরও বেশি দেখতে হলে ওদের হুটোপুটির মাঝ দিয়ে তারজাল ঘেরা মাঠের চৌ্হদ্দির ওপাশে চোখ ফেলতে হবে । টালি আর ইটের ছোট ছোট বাড়ি । গাদাগাদি । তারও ওপারে সরকারি টেলিফোন অফিস । আর তার অনেক উঁচু টাওয়ার ।
                                                                                                                           দেখতে দেখতে জীবনের জমানো অনেক সময় হুস করে তারজাল টপকে গ্যালারির ওপারে পড়ে । যেখানে একটা পুরোনো অশ্বত্থ গাছ ডাল পালা ছড়িয়ে তির তির করে পাতা কাঁপিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । দেখলেই দেখা হয় ।কিন্ত্ত এত্তসব দেখবে কে ! দেখার ইচ্ছা থাকলে তবে না দেখা ।

অনেক ভেবেচিন্তে সুবীরকে মাঠে এনেছিল ।যদি কিছু হয় । অনেক লোকের মাঝে লোকই তো থাকে । প্রকৃতি মানুষকে  ভালো রাখে । মাঠ মানুষকে জীবন্ত করে । প্রাণের মাঝে শত শত আরবি ঘোড়া ছুটিয়ে দেয় । চাইলে ঝপ করে লাফ মেরে টাট্টু ঘোড়ার জিনে বসে লাগাম ধরতেই পারে । আবার কখনও কখনও না চাইলেও ছুটতেই হয় ।

কিন্ত্ত ওর লোকটা কেন ঘোড়ায় চড়ে না । অপর্ণার ইচ্ছেগুলো যেন ইটচাপা ঘাসের মত বিবর্ণ হতে থাকে । অদূরে যে ঘোড়াগুলো ইচ্ছে মত ছুটছে, পাগুলো ছুঁড়ছে ,ওর স্বামীর কি এখন ইচ্ছে করে না ওদের খুরের ধুলো গায়ে মাখতে ।ওই ধুলোর গন্ধ নিতে ।অথচ ফুটবলের প্রতি সুবীরের টান সে দেখেছে । বিয়ের পরেও মাঠকে নিয়ে পাগলামি করেছে । স্কুল ফিরে ওকে বেড়াতে নিয়ে যাক আর না যাক ছেলেকে রেগুলার মাঠে নিয়ে গেছে । ছেলের বুটের ফিতে বাঁধতে বাঁধতে স্বামীজীর কথা বলেছে। গল্প শুনিয়েছে কৃষানু ভাস্কর চিমা ভাইচুঙ  পেলে  মারাদোনা রোনাল্ডোর। মাঠে যাওয়ার জন্য কারও চোখে মুখে এমন খুশি উপচে পড়ে অপর্ণার জানা ছিল না ।

চোখ ছল ছল করে ওঠে ।  সামনে একটা আস্ত জড়ভরত । বাইরে থেকে মানুষ মনে হলেও ভেতর ভেতর সে একটা নামানুষকে পিঠে নিয়ে পাক খাচ্ছে । কতদিন –আর কতদিন এমনি করে বইতে পারবে !

--মার হাবরাকে মার । ওর পাছাতে জোরসে একটা কিক মার । বল দেবে না ! বুড়োর খ্যাপামো ছাড়িয়ে দে ।--অপর্ণার বুকটা ধড়াস্ করে ওঠে । দেখে কতকগুলো ছেলে সুবীরকে ঘিরে ধরে ঝাঁ ঝাঁ করে লেগেছে । ছুট্টে গিয়ে ওদের থামানোর চেষ্টা করে , ও খোকারা তোমরা ওনাকে মেরো না ।শোনো বাবুরা ,–উনি অ্যাকচুয়েলি আমাদের মত না। উনি ছেলেমানুষি করে  ....।
                                                                                                          সুবীর কখন ঐ ছেলেদের মাঝে ঢুকে পড়ে বলটাকে ধরে ফেলেছে , অপর্ণা দেখেও বিশ্বাস করে নি । এমন কান্ড সুবীর ঘটাতে  পারে ! অপর্ণা জানে ছেলেগুলো সব পাঁচিলের ওপারের । পাঁচিলের ফোকর গলে ওরা মাঠে আসে । নিজেদের মত করে খেলে ।সাধারণত
ওদেরকে কেউ ঘাঁটায় না । ওয়াকাররাও নিশব্দে হেঁটে চলে যায় ।

(পাঁচ)

    --অপর্ণাও ওদেরকে ঘাঁটাতে চায়না । ঠান্ডা গলায় বলে,--সুবীর বলটা দিয়ে দাও । ওরা বাচ্চা। ওদের খেলার জিনিস নিতে নেই । দাও বলছি ।
সুবীর অপর্ণার দিকে এমন ভাবে তাকায় ,যেন বলতে চায় –কী বলছ কী ! এমনটা আবার হয় নাকি !
অপর্ণা খেয়াল করে সুবীর অদ্ভুত ভাবে বলটাকে একবার বার করছে আবার বগলের ফাঁকে লুকোনোর চেষ্টা করছে । ছেলেরা যত বলটার জন্য ছটফট করছে সেও বার বার একই রকম আচরণ করছে । মার খাওয়ার ভয় নেই । ভয় নেই মান খোয়ানোরও ।

ধীরে ধীরে লোক জমতে শুর করেছে ।অপর্ণা বড্ড অপ্রস্ত্তত হয়ে পড়ে।  কোনরকমে ভুল হয়ে গেছে , ও বুঝতে পারে নি বাবারা বলে টলে সুবীরকে নিয়ে সে দ্রুত মাঠ থেকে বেরিয়ে যায় ।

গুড – গুড । সো গুড । পজিটি্ভ সাইন । ডক্টর মাহারাকে দেখাগেল বেশ উত্তেজিত হয়ে কথা বলতে । সুবীরবাবু ওরকম আচরণ করেছে মানে মেন্টালি হি ইজ  মুভড । আপনাকে আগেও বলেছি , এই ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের পেশেন্টরা মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন । নিজেকে প্রচন্ড অসহায় ভাবেন। দিনের দিন এরা ডিপ্রেশনের চোরাবালিতে হারিয়ে যান । তবে  আশার কথা এই ডিসঅর্ডার টু উইকস - টু মান্থস থেকে টু ইয়ার্সের পরও রিমুভড হতে পারে ।  দেখুন মিসেস মাইতি আমরা ডাক্তাররা রোগ ধরতে পারি, রোগ সারানোর জন্য মেডিসিন দিতে পারি । ঐ পর্যন্ত । তাতে যে রোগ  একেবারে সেরে যাবে তার গ্যারান্টি  আমরা দিতে পারি না । যতটা দিতে পারেন আপনারা । বাড়ির লোকেরা । একটা পেশেন্টের মেডিসিনের যা দরকার হয় তার চেয়ে ঢের বেশি প্রয়োজন ফ্যামিলির  সিনসিয়্যারিটি –সিমপ্যাথি -এমপ্যাথি । মিসেস মাইতি আপনি সেই ডিউটিটা অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে করেছেন । আর ট্রু-লি ইউ হ্যাভ গট এ সাকসেস ভেরি সুন ।

অপর্ণা মন্রমুগ্ধের মত ডক্টর মাহারার কথাগুলো শোনে । চোখ ভিজে আসে । শুনতে শুনতে একটা কথাই মাথার মধ্যে ঘোরে, --ক্যারি অন মিসেস মাইতি -ক্যারি অন ।

বৃত্তের স্টার্টিং পয়েন্ট যেখান থেকেই ধরা হোক না কেন বৃত্ত কখনও শেষ হয় না । থাকে না কোনও ফিনিশিং পয়েন্ট। লক্ষ্য থাকে একটা লক্ষ্যের । আবার সেই লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেললে মনের দমও ফুরিয়ে যায় ।বড্ড ক্লান্ত লাগে তখন । ছেলেটা কাছে নেই । আর যে কাছে আছে, সে আছে দূরে –অনেক দূরে ।                 
সেদিন সুবীরের সেই অদ্ভুত আচরণ অপর্ণার অবসন্ন শরীরে এক চিমটে গ্লুকোজের মত কাজ করে । তার মনের মধ্যে একটা আশার আলো ছিটকে আসে।–সম্ভব! সম্ভব ! আবার আগের মত সব সম্ভব ।অপর্ণা নিজের শরীরে আরও বেশি করে এনার্জি আনার চেষ্টা করে । মাথার মধ্যে বার বার হ্যামারিং করে, আরও বেশি ধৈর্য ধরতে হবে । আরও

(ছয়)


আরও ......। এখনও তার কাজ শেষ হয় নি ।
 
আবার সে মাঠে যায় । সবুজ মাঠের ধার ধরে কাঁচা মাটির রাস্তাটা গোল হয়ে বলয়ের মত সমস্ত মাঠটাকে ঘিরে রয়েছে ।গাঢ কুসুম রঙের সূর্যছটা সারা মাঠের মুখে পড়েছে । সবুজ ঘাঁসগুলো আরও সবুজ লাগে । ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে ,একদল ফুটবল । কেউ কেউ হাঁটতে শুরু করেছে ।
সুবীরকে আবার সে মাঠের এক জায়গায় বসিয়ে দিয়ে বৃত্তে পাক খেতে শুরু করে । হোক সে ক্লান্ত ,হোক সে বেহাল ।তবু সে হাঁটে।
                                                                                     সংসারের স্টার্টিং পয়েম্টে কে যেন কখন  বলেছিল,--অন ইওর মার্ক,গেট সেট গো – ক্লাপিং ...।তারপর দৌড় দৌড় আর দৌড় --।পাঁজরের হাপর থেকে উষ্ণ হলকা বাতাস সাঁই সাঁই করে বেরিয়ে পড়ে। কান বন্ধ । হাত পায়ের পেশী গুলো বড্ড বেশি অগ্রাহ্য করছে ,করুক ।তবু অপর্ণা হাঁটে। আপন বৃত্তে হাঁটে ।পৃথিবীর নিয়মেই হাঁটে । তবুও নিজেকে বলতে তো পারবে ,‌‌‌আমি অন্তত সবার পেছনে নেই ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন