শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

বিজয়া দেব। পারক গল্পপত্র


একটা আশঙ্কা বুকে নিয়ে দোর খুলল মেয়েটা। আজ তাকে বেরোতে হবে। অনেকগুলো কাজ। সময়মত কাজগুলো সেরে না রাখলে ঝামেলা বাড়বে। আজকাল কোনও কাজ সহজে হতে চায় না।  অফিসের কাজ মানে এ টেবিল থেকে ও টেবিলে। ‘এখানে নয়, ঐ টেবিলে যান’, যেখানে যাওয়া গেল সেখানে হয়ত ভদ্রলোক কিংবা ভদ্রমহিলার চোখ মনিটরের স্ক্রিনে স্হির। জরুরি কথাটা বলে ফেলা গেল, কিন্তু যাকে বলা গেল তার কানে গেল কিনা বোঝা গেল না।
 
মেয়েটার কেউ নেই, বাবা মারা গেছে সেই ছোটবেলায়, মা মারা গেল এই বছর ঘুরেছে। মা চাকরি করত, বাবার অফিসেই ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর মাকে চাকরি দেওয়া হয়েছিল। একটি ব্যাঙ্কের কেরানি।
 
তার বয়েস এখন বাইশ। সাধারণ পড়াশুনোয়। অতি সাধারণ ভাবে গ্রাজুয়েশন করেছে। মার পেনসন পাচ্ছে সে। আজ পেনসন তুলতে ব্যাংকে যাবে।
 
সময়টা খুব অস্থির, মানুষ যেন ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে, না কি সে-ই মানুষের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে! হ্যাঁ, কারোর সঙ্গ আজকাল ভালো লাগে না, মার ওপর খুব রাগ হয়, মনে হয় মা ইচ্ছে করে যেন তার সাথে শত্রুতা করেই তাকে একা ফেলে রেখে চলে গেল। এখানে ক’দিন থেকে একটা চাপা উত্তেজনা, মানুষ আর মানুষকে বিশ্বাস করছে না। গণ্ডগোলের সূত্রপাত হয়েছে পথের কুকুরকে নিয়ে। এক নেড়ি কুকুরকে পথে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। সন্দেহ করা হয়েছে একটি জাতিগোষ্ঠীর ওপর। কারণ ঐ কুকুরটিকে নাকি ঐ জাতিগোষ্ঠীর এক মহিলা টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। ধরে নেওয়া হল এরাই কুকুরটাকে মেরেছে। এরা হয় খাবে নয় বিক্রি করবে। এই নিয়ে মারপিট, গন্ডগোল চরমে। ব্যাপারটা পুলিশ অব্দি গড়িয়েছে।  মহিলাটি লোকজন নিয়ে পুলিশে লিখিত অভিযোগ করেছে। কারণ কিছু যুবক যারা দাপট দেখিয়ে বেড়ায় তারা নাকি মহিলাটির গায়ে হাত তুলেছে। মহিলাটি আদিবাসী। যুবকরা নিজেদের পশুপ্রেমী হিসেবে জাহির করছে, এভাবে পথের কুকুরকে মেরে ফেলা? মেনে নেওয়া যায় না কিছুতেই। গণ্ডগোল চরমে। গোষ্ঠী সংঘর্ষের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে ঘটনা। চারপাশে অবিশ্বাস, পারস্পরিক সন্দেহ, এগুলো চলছে, আরো চলবে, শান্ত হলেও আরও কোনও একটা ইস্যুতে অশান্ত হবে। মেয়েটাকে টালমাটাল নৌকোয় পা রেখে চলতে হয়। নৌকো উথালপাথাল হয়। আকাশের কোণে কালো মেঘ জমে হাওয়া আসে, মেঘের কালোত্ব কিছুটা ছিতরে যায়, মেয়েটা দেখে তবে ভাবে না আর, আগে ভয় পেত খুব, আজকাল ভয় পেতে পেতে ভয়টাও ধাতস্হ হয়ে গেছে কিছুটা।
 
এখন সে সদর গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ভাবছে, মোড়ের মোমোর দোকানটা খুলেছে কিনা! মনে হচ্ছে খুলেছে। একটু এগোতেই দেখা গেল খুলেছে, গরম ধোঁয়া উড়ছে। মোমো তৈরি হচ্ছে। রমরমিয়ে বিক্রি হয়। উল্টোদিকে একটা ইস্কুল,  ছেলেমেয়েরা খায়।
মেয়েটাকে দেখে মোমোওলা জিজ্ঞেস করে-ক’প্লেট?
-আজ একপ্লেটই দাও।
-কেন? খিদে নেই?
-ছাড়ো ত! চাটনি ফাটনি ফ্রেস আছে? না কি কালকেরটা দিয়ে চালিয়ে দেবে?
- ওরকম কথা বলতে তোমায় বারণ করেছি না? কোনটা দেব, স্টিমড্ না ফ্রায়েড?
-স্টিমড্ দাও।
 চাটনিটা মনে হয় কালকেরই। চালিয়ে দিল বেশ সকাল সকাল।
 মেয়েটি রাগ করে বলে- মিথ্যে বলেছ আমায়? কালকের চাটনি!
-খা খা হিসহিস্ করিস না।
চলে এল মেয়েটা। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তবু বলে এল- এটা ঠিক নয়। এজন্যে দু’প্লেট নিলাম না, বুঝেছ?
লোকটা কোনো উত্তর দিল না। তার কথা কে-ই বা কানে তুলবে! তবু সে বলে, বলে যায়। যা ঠিক নয়, তা বলতে হবে বৈকি, কাজ নাই বা হল।
মেয়েটার কি নাম নেই? আছে। কিন্তু সবাই খুকি বলেই ডাকে। সে-ও খুকিতেই অভ্যস্থ হয়ে গেছে। ইস্কুল কলেজের খাতায় নাম ছিল বৃষ্টিধারা। মা নাকি নামটা রেখেছিল। কিন্তু খুকি বলেই ডাকতো। এখানে সবাই তাকে খুকি বলে ডাকে। এখন ঘরে ঢুকে সে তার পুরনো ডাইরি বের করল, মা দিয়েছিল। সামনের পাতায় লেখা আছে, ‘খুকিকে-মা।’ আচ্ছা, মা ত আরেকটু ভাল করে লিখতে পারত, গুছিয়ে। তার সাবেকি নামটা দিলে কী এমন ক্ষতি হত-‘বৃষ্টিধারাকে-অনেক আদরসহ-মা।’ এভাবে লেখা যেতো। কিন্তু না, লেখেনি। খুকি খুকি খুকি। কেউ কেউ মেয়েটাও বলে। মা যেদিন মারা গেল সেদিন যারা তাদের বাড়িতে এসেছিল, তাদের বলতে শুনেছে সে- ঈসস, মেয়েটা একা হয়ে গেল। -মেয়েটাকে কে দেখবে! –একা মেয়ে কী করে জীবন কাটাবে, এত বড় জীবন! এছাড়াও একদিন রাস্তায় কেউ একজন ডাকছিল পেছন থেকে-এই মেয়ে, একা একা কোথায় যাচ্ছ? মার পেনশন বেরিয়েছে? ইত্যাদি।

ডাইরিতে লিখতে গিয়ে আজ থমকে গেল। ছবি আঁকল কাঁচা হাতে-মোমোওলা রঘু, তার দোকান। মামুলি ধরণের স্কেচ। নিচে লিখল-চিট্!
-এই খুকি, কী করছিস?- দরজায় ধাক্কা। কাকিমা।
দরজা খুলল মেয়েটা। পাড়ায় একটা ক্রকারির দোকান আছে কাকিমার। কাকুর বয়েস হয়েছে, অসুখ বিসুখে জেরবার। সারাদিন বিছানায় থাকে। কাকিমা তাই দোকানে বসে। মেয়েটাকে নিয়ে কাকিমা ভাবে। অতোটা নয়, তবে উদাসীন নয়। মেয়েটার মাকে খুব ভালবাসত কাকিমা। মা মারা যাওয়ার পর কাকিমা খুব কেঁদেছিল।
আজ ঘরে ঢুকে বলে- ঘরে কিছু বানিয়ে খাস না কেন? সকাল সকাল মোমো খেতে দেখলাম।
-হ্যাঁ খেলাম ত। বাসি চাটনি খাইয়েছে রঘু।
- খাওয়াবেই। ওর কালকের চাটনি কি ফেলে দেবে ভেবেছিস! ওগুলো শেষ করে তবে ফ্রেস চাটনি করবে। ফ্রিজে রেখে দিল ব্যস! তুই বাড়িতে চা বানিয়ে খাস না?
- চা ত খেয়েছি। ঐ ব্রেকফাস্টটা হয়ে গেল।
-দোকান থেকে পাউরুটি ডিম এনে তৈরি করে খাওয়া যায় না?
- হয়ে গেছে গো কাকিমা, ভেবো না।
-একা থাকিস , পেট খারাপ করলে তো দেখবার কেউ নেই।
-হবে না।
-মানে?
-মানে আমার কিচ্ছু হবে না।
- কথার ধরণ দেখে মনে হচ্ছে কিছু হলেই যেন খুশি হোস্।
- না না তা কেন হবে?-বলে মেয়েটা হাসে।
-আচ্ছা শোন যে কারণে আসা, তোর বিয়ের একটা প্রস্তাব আছে, ছবি আছে মোবাইলে? আমার হোআটস্ অ্য্যাপে পাঠিয়ে দে ত!
মেয়েটি চুপচাপ শুনল। তারপর মোবাইল ফোন থেকে একটা ফটো ঝট করে পাঠিয়ে দিল। কাকিমা খুব অদ্ভুত, একটা ছবি দু’জায়গায় দেয় না, কারণ বাতিল হওয়া ছবি নাকি অলুক্ষুনে। কাকিমা মন দিয়ে ছবিটা দেখছে। আঙ্গুল স্ক্রিনে লাগিয়ে ছবিটাকে বেশ বড় করে দেখছে। তারপর বলল-ধুর এটা কি দিলি! বেশ অগোছালো। দেখলেই বোঝা যাচ্ছে সারা চোখেমুখে অযত্নের ছাপ। ভালো একটা ছবি দে। মেয়েটা বাধ্য মেয়ের মতই বসে পড়ল। বেশ খুঁজেপেতে আর একটা ছবি ফরওয়ার্ড করে বলল-এটা দেখো। কাকিমা বলল-হুঁ! এটা বেশ। ঠিকাছে, আমি যাই। দোকান খুলতে হবে। রাজ্যের কাজ পড়ে আছে।
কাকিমা বেরিয়ে গেল। কোথাকার পাত্র, কী করে, বাড়ি কোথা্য়‌, পড়াশুনা করেছে কি না করেনি এসবে কোনও আগ্রহ নেই মেয়েটার। সময়ের ঘড়ি চলছে, মেয়েটাও চলছে। কারা বা কে তার বিয়ের প্রস্তাব নাকচ করে চলেছে জানে না মেয়েটা। হাবভাবে বোঝাই যায় জানতেও কোনই আগ্রহ নেই তার। জীবন থেকে পুরোপুরি আগ্রহ উঠে গেছে তাও হয়ত নয়। কেউ নেই তার, তবু আজো সন্ধ্যাদীপের শিখার মত ক্রকারি দোকানের কাকিমাটি এখনও মাটির পিদিমে দিপদিপ করছে। তাই কাকিমা মাঝে মাঝে স্বপ্নে আসে মেয়েটির। মার জায়গায় সে হয়ত ব্যাঙ্কে চাকুরি পাবে। তবে ছুটোছুটি করতে হবে। গত পরশুদিন একটা দরখাস্ত করেছে। কাকিমার কথা হলো –ওটা হোক, সাথে বিয়ের চেষ্টাও চলুক।

 সেদিন ব্যাংকে গিয়েছিল মেয়েটি। পেনশন তুলবে। কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন দীর্ঘতর হচ্ছিল। তার খিদে পেয়েছিল আর তার হাতে একটি পপকর্ণের ঠোঙা ছিল, সে আনমনা হয়ে পপকর্ণ খাচ্ছিল। আর শামুকের চলার মত কিছুটা সামনের দিকে একটু একটু করে এগোচ্ছিল। এই সময়ে পাশে রাখা সারবন্দি চেয়ারের একটিতে বসা একটি লোকের দিকে তার নজর গেল, মনে হল লোকটি তাকে খুব নজরে রাখছে।  যেমন হয়, এরকম মনে হলে বার বার চোখ তার দিকেই যায়, তেমনি হচ্ছিল। ঘুরেফিরে ওদিকেই যাচ্ছিল। হ্যাঁ লোকটা তাকে নজরে রেখেছে। তাকে দেখছে, আবার সে তাকালেই চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। লোকটার বয়েস এই তিরিশের কোঠায় হবে। হয়ত মাকে চিনত তাকেও সে ভাবেই চেনে তাই নজরে রেখেছে। যাই হোক মেয়েটার টার্ন যখন এল তখন সে ভুলেই গেল। কাজ ফুরিয়ে গেলে সে বেরিয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মনে হল কে যেন তার পিছু পিছু নামছে। এটা হতেই পারে। এটা ব্যাঙ্ক আর ব্যাঙ্কের কাজ মানুষের লেগেই আছে। তিনতলায় পেনসন কাউন্টার, লোকজন ওঠানামা করছে, করবে। একদম গ্রাউন্ড ফ্লোরে যখন সে নেমে এল, তখন পেছন থেকে ডাক শুনতে পেল- হ্যালো, একটু শুনবেন? –ফিরে তাকাল সে, সেই লোকটা, ব্যাঙ্কের কাউন্টারে যাকে তার ওপর নজর রাখতে দেখেছিল। মেয়েটার কথা বলতে ইচ্ছে ছিল না, তবু অস্ফুটে বলল-বলুন।
-আপনাকে কোথাও দেখেছি, ঠিক মনে করতে পারছি না। কোথায় দেখেছি বলবেন?
- না। কারণ আপনাকে কোথাও দেখিনি।
লোকটা হাসল।
-তোমার নাম খুকি?-চট করে আপনি থেকে তুমিতে নেমে আসার ধরণটি দেখার মত। আশ্চর্য!
- হ্যাঁ।
-ভালো কোনও নাম নেই?
- অচেনা লোকের কৌতূহলের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই। আসছি।
-আরে দাঁড়াও। অচেনা থেকেই চেনা হয়। তাছাড়া তুমি ত খুব একা। একা থাকা ভাল নয়।
মেয়েটার কি একটু কৌতূহল হল? তারপর বুঝি ভয় হল, ব্যাগে পেনসনের টাকা রয়েছে। লোকটা তার নাম থেকে শুরু করে সব কিছুই জানে।
লোকটা হেসে বলে- না, আমি চোর ডাকাত নই, বরং তোমাকে খানিক নিরাপত্তা দিতে পারি। বিশ্বাস করে দেখতে পারো।

বিশ্বাস সে কাউকে করে না, কাকিমা ছাড়া। তাছাড়া কাকিমা সবসময়েই বলে- সাবধানে থাকতে হবে তোকে, তোর কেউ নেই, এটা সবসময় মাথায় রাখিস।
লোকটি পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে। বলে-একটু দাঁড়াও, এই ভরদুপুরে আমি তোমার কী করব, চারদিকে লোকজন, তাই না? তোমার একটা বিয়ের প্রস্তাব গেছে আমার ভাগ্নের জন্যে, এই দেখো তোমার ছবি, কী, তুমিই ত দিয়েছ, তাই না? তা আমার ভাগ্নের ছবি দেখেছ? আমার ভাগ্নে কী করে , কতদূর পড়াশুনো করেছে কিছু জানা আছে? কী হল কিছু বলছ না যে?
-না।
-হুঁ। তা জানতে চাও না?
-কাকিমা জানাবে।
-কাকিমা জানাবে ঠিক আছে। তবে তোমার জানতে আগ্রহ হচ্ছে না?
-না। আমি যাই।
-আহা, যাবে তো। নিশ্চয়ই যাবে। আমার প্রশ্ন ছিল কিছু। ব্যাঙ্কের চাকরির চেষ্টা করছ? তোমার মায়ের চাকরিটা তোমাকেই পেতে হয়।
-আপনি এত সব জিজ্ঞেস করছেন, কিন্তু আপনাকে আমি মোটেই চিনি না।
-তাহলে ছবি দিলে যে! দিয়েই চলেছ।
-মানে?
-যা ঘটছে তাই বললাম। এই যে কাকে বিয়ে করবে জানতে চাও না তার কারণটা জানতে পারি? এটা ঠিক নয়। এই আমি বলছি আমার ভাগ্নে, ছাদনাতলায় গিয়ে দেখলে ভাগ্নে নয়, আমিই দাঁড়িয়ে আছি টোপর পরে, শুভদৃষ্টিতে যখন চোখাচোখি হল চমকে উঠলে। -বলে ফিচেল হাসি দিয়ে লোকটি কেমন অদ্ভুত একটা কটাক্ষ করে।
-শাট আপ! –আচমকাই মেয়েটার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল এবং লোকটার প্রতিক্রিয়া আর দাঁড়িয়ে দেখল না।

   আর ছবি সে দেবে না কাকিমাকে। আসলে ব্যাপারটা নিয়ে সে তেমন করে ভাবে নি। সত্যিই ত, সে ছবি দিচ্ছে আর সেটা কারও কাছে যাচ্ছে। তার ছবি আরও কেউ দেখছে, এরা অচেনা, এদের সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। এসব আর হতে দেওয়া যায় না। আজকের ঘটনাটি কাকিমাকে খুলে বলতে হবে। ছবি আর দেওয়া যাবে না। কিছুতেই না। কাকিমা এসব কি করছে? লোকটা ভালো নয়। কাকিমার ছেলেটাও ভালো নয়। দেখা হলে কেমন অস্বস্তি হয়। ঐ কুকুর-মারা গণ্ডগোলে নাকি কাকিমার ছেলে জড়িত আছে। সেদিন রঘু, মানে মোমোওলা তাকে বলছিল চুপি চুপি। তারপর তাকে সাবধান করেছিল-এই কাকিমাকে বলিস না। আমার ঘাড়ে তাহলে মাথাটি থাকবে না।–আজকের এই লোকটির সাথে কাকিমার ছেলে রাকেশের যোগাযোগ থাকতে পারে। কে জানে! নাহলে এত খবর লোকটি পেল কোথা থেকে!
 
বিকেলে কাকিমা এল, সাথে একজন অচেনা মহিলা, কালো, একটু মোটামতন। কাকিমা বলল- খুকি একদম সাজগোজ করে না, আপনমনে থাকে,সে আপনাদের বাড়িতে গেলে ঠিক হয়ে যাবে।
 
গতকালের ঘটনাটা মাথায় ছিল মেয়েটার, তাই কথাগুলো তার কানে ভিন্ন সুরে বাজল। সপাটে বলেই ফেলল -বিয়ে আমি করব না।
-আগে তো কখনও এমন করে বলিসনি খুকি।
-ভাবিনি।
- তো এখন এভাবে ভাবছিস কেন?
মহিলাটি চুপ করে আছে। পর্যবেক্ষণ করছে মেয়েটাকে।
ব্যাপারটা কিন্তু মেয়েটার চোখ এড়িয়ে যায় নি। চোখ দেখো! যেন জহুরী সোনা পরখ করছে। এবার তার মাথায় এল, কার জন্যে এসেছে মহিলাটি? কাকে বিয়ে করতে হবে? কিছুই তো সে জানে না! তার একার জীবনে এইসব অবাঞ্ছিত ঘটনাকে সে কিনা প্রশ্রয় দিচ্ছে।
এবার মহিলাটি একটু বাঁকা হেসে বলল- বিয়ে করবে না, তো ছবি দিয়েছ কেন? আগে ভাবো নি?
তারপর হঠাৎ উঠে পড়ে বলে- চললাম গো দিদি।
কাকিমা তার দিকে আগুনচোখে তাকিয়ে বেরিয়ে গেল।
একটু ভয় হল মেয়েটার। কাকিমা কি তাহলে আসবে না আর! মার মত চিরতরে তাকে এই দুনিয়ায় একা ছেড়ে দেবে! “বিয়ে” শব্দটা ভাবলে ভয় করে, অচেনা লোকজন। এরাই তার জীবনকে নিয়ন্ত্রন করবে। তার ত কেউ নেই, কাউকে কিছু বলতে পারবে না। মা থাকলে ছুটে চলে আসা যেত। যাকগে, যা হবার হবে, অত ভেবে লাভ কী! খুব তাড়াতাড়ি যদি কোনদিন মায়ের কাছে চলে যাওয়া যেত তাহলে বুঝি ভালই হত। কিন্তু কীভাবে? আত্মহত্যা করে অনেকে। কিন্তু এতে তার মন সায় দেয় না। এমনি এমনি কেউ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে না, কেউ তাকে এসে মারতে হবে, হয় রোগ নয় খুন। যাক, এত ভেবে লাভ নেই, তার সামনে কোনও পথ খোলা নেই আপাতত।

বিকেলে কিন্তু কাকিমা এল, খুব রাগ করেছে। বলল-খুব লজ্জা দিয়েছিস আজ। ছেলের মা খুব আপমান হল। আমিও হলাম। তোর ভেতরে এইসব আগে তো বলিসনি।
মেয়েটি কিছু বলল না। বলল না ব্যাঙ্ক ফেরত সেই লোকটার কথা। আগে ভেবেছিল বলবে। কিন্তু এখন আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে হল না। হয়ত বলা উচিত এটা মনে হল, ব্যাপারটা বোঝা দরকার এটাও মনে হল। কিন্তু তবু অনিচ্ছেতে কিছু বলা গেল না।
কাকিমা এবার বলল- এভাবে ঘরে একা থাকিস না, মাথায় সব উড়নচণ্ডী ভাবনা ঘুরবে। একটা কথা বলি,সকাল বিকেল দোকানে বসবি আমার সাথে? তোকে আমি কিছু দেব,হাতখরচা মত। বিয়ের ব্যাপারে আর আমি মাথা ঘামাই?
-রাগ করো না কাকিমা। তুমি রাগ করলে আমি কোথায় যাবো, বলো?
কাকিমা হঠাৎই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। মেয়েটার মা যেদিন মারা যায় সেদিন রাতে মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে কাকিমার কী কান্না! আজ আবার কাঁদছে।
-কাঁদছ কেন? বিয়ে করতে আমার ভয় করে।
-ভয়ের কী আছে রে?
-আমার তো তুমি ছাড়া কেউ নেই, কিছু হলে পালাবার পথ নেই। তোমার কাছেও আসতে পারব না।
 কাকিমার ষণ্ডামার্কা  ছেলেটি সারাক্ষণ বাইরে থাকে। মাঝেমাঝে বাড়িতে পুলিশ আসে, আবার কী করে জানি পুলিশ চলেও যায়। ছেলেটা তার মতই চলে। ছেলেটার কাছে লোকজন আসে। কেমন সব চেহারা। একদিন গিয়েছিল সে কাকিমার বাড়ি। ওরা তখন এসেছিল। কাকিমা চুপি চুপি বলল- এই খুকি, এখন বাড়ি যা। খিড়কি দুয়ার দিয়ে সে ছুটে চলে এসেছিল। আর যায়নি। কাকিমাও আর তাকে যেতে বলেনি। মাঝেমাঝে এটা ওটা খাবার তৈরি করে নিয়ে আসে।
-তুমি বলছ দোকানে বসতে, আমার খুব ভালোই লাগবে, আমাকে কিছু দিতে হবে না কাকিমা। কিন্তু তোমার ছেলে আছে...
-ওসব ভাবিস না। ও তো বাড়িতেই থাকে না। তুই সকাল সন্ধ্যায় বসবি আমার পাশে। সময় কেটে যাবে। ছেলে! ছেলে তো মানুষ হল না। ছেলে জন্ম না হয়ে যদি তোর মত একটা মেয়ে পেতাম!
মানুষের কত কষ্ট! কেন মানুষ এত কষ্টে থাকে কে জানে! মা-ও খুব কষ্ট করেছে। মা বলত তাকে-তোর বাবা মারা যাওয়ার পর কী না করেছি তোকে নিয়ে। প্রথমে অসহায় হয়ে তোকে নিয়ে তোর মামার বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে তোর মামীর একটা ভাই থাকতো। কাজকম্ম করে না, ঘুরে বেড়ায়। শেষে মা বলল-তুই এখানে থাকিস না রুমি, বিপদ হবে।- মা থাকতে পারে নি। ফিরে এসেছিল। একা বাড়িতে তাকে খুব কষ্ট করে বড় করেছে। তাকে নিয়ে মা-র ভয় ছিল। ঠিক তাকে নিয়ে নয়, তার মেয়েত্ব নিয়ে।
-কাকিমা, তোমার দোকানে বসলে আমার সময় খুব ভাল কাটবে। কিন্তু তোমার ছেলে যদি রাগ করে!
-ওসব আমার ওপর ছেড়ে দে। আমি থাকতে তোর কোন ভাবনা নেই। কাল  থেকে আয়।
সেই থেকে মেয়েটার বেশ ভালই চলছিল।
 
দোকানটা ক্রকারির। পাড়ায় এই একটাই ক্রকারির দোকান। বিক্রি আছে। পাড়ার লোকজনেরা বলছিল-ভালোই করেছ খুকি। একা ঘরে বসে করবেটা কি? সকাল দশটায় দোকান খোলে, দুপুর একটায় বন্ধ হয়ে যায়, কাকিমা রোজ দুপুরের খাবারটা টিফিন বক্সে দিয়ে দেয়, তৈরি করে রাধু, বেশ ভালো তার রান্না। রাধু কাকিমার বাড়িতে থাকে, রান্না ও আনুষঙ্গিক কাজ করে। সন্ধ্যা ছ’টায় দোকান খোলে, রাত নটায় বন্ধ। আটটা নাগাত রাধু আবার টিফিনবক্সে রাতের খাবার নিয়ে আসে। রান্নার হাতটা বেশ ভালো। কাকিমা খুব খুশি। একা দোকান চালানো ঝক্কির।

মেয়েটা খুব মন দিয়েই কাজ করছে। রোজকার কথা কিন্তু মেয়েটা তার ডাইরিতে লিখে রাখে। তেমন বিস্তারে নয়, ছোট্ট করে। যেমন, সেদিন এক ভদ্রলোক এসে বলল, একখানা টি- পট চাই। ভদ্রলোক একা থাকেন, এক বুড়ো লোক ছিল তাকে দেখাশোনা করতো, লোকটা মারা গেছে। ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পর কাকিমা বলল- ছেলে আছে লোকটার, ছেলের বউ নাতি আছে, এই শহরেই থাকে ওরা। ছেলে যখন ছোট তখন মা মারা যায়। ভদ্রলোক আর বিয়ে করেননি, খুব কষ্ট করে ছেলে মানুষ করেছেন। এখন ওরা নাকি আসেই না। আরও অনেক ঝামেলা আছে লোকটার বাড়ি নিয়ে।
 মেয়েটা জানে,বাড়িটাড়ি নিয়ে অনেক ঝামেলা জটিলতা হয়। তার এক তুতো জ্যেঠু, যে খোঁজখবর রাখে নি কখনও,   মা মারা যাওয়ার পর এল। তাকে বলল তাদের বাড়িতে চলে যাওয়ার জন্যে। একা থাকা ঠিক নয় এই কথাটা তুতো জ্যেঠু খুব করে বোঝাবার চেষ্টা করেছিল তাকে। সে বুঝে নিয়েছিল লোকটা কেন তাকে নিয়ে যেতে চাইছে। কারণটা বাড়ি। তাদের বাড়িটা বেশ বড়। এখানে বাবারা দুই ভাই, ঠাকুমা ঠাকুরদা সবাই ছিলেন। জ্যেঠু নাকি বিয়ের আগেই গত হন এক বিচ্ছিরি জ্বরে, বাবার হার্ট দুর্বল ছিল। সে ছোটবেলায় কাউকে দেখেনি। খুব কষ্ট করে মা বাড়িটাকে বেশ সুন্দর করে রেখেছে। বাড়িতে ফিরে সে ডাইরিতে লিখেছিল, ‘ ঐ লোকটা, মানে যে টি-পট কিনতে এসেছিল তাকে এনে যদি আমার কাছে রাখতে পারতাম তাহলে বেশ হত। বয়েসে ফারাক হলে কী হবে সে আমার বন্ধু হতে পারে। আমাদের মাথার ওপর ছাদ ছাড়া চলে না। আবার ছাদ কেড়ে নেওয়ার জন্যে মানুষের ফিসফাস ষড়যন্ত্রের নমুনা দেখা আশ্চর্য হতে হয়। আবার প্রকৃতি ঝড় হয়ে এসে গরীব মানুষের ছাদ গুঁড়িয়ে দেয়। পাখির ঘর বারবার ভাঙ্গে।’ তারপর তারিখ ইত্যাদি। এমনি ডাইরি লেখার ধরণ মেয়েটির।

এভাবে চলছিল। গন্ডগোলটা হল আচমকা। খুব চেঁচামেচি, হট্টগোল রাস্তার দিক থেকে আসছিল। কাকিমা একটু ভেতরে গিয়েছিল। দোকান বন্ধ করে কাকিমা,তালা দেয় গ্রিলের দরজায়, দোকানের ঝাঁপ ফেলে, ঐসময় রাধু আসে। দুদ্দাড় করে কিছু লোক ছুটে গেল, তারপরই চকচকে ছুরি হাতে একটি যুবককে ছুটে যেতে দেখল সে। অনেকটা কাকিমার ছেলে রাকেশের মত লাগছিল। কে একজন বাইরে থেকে বলল-এই খুকি, দোকান বন্ধ করো। শীগগির! আচমকা ঘটনা, সে কিছু সময় ভাবল কী করা যায়, ফোন করতে যাচ্ছিল কাকিমাকে। এই সময়ে জনা পাঁচেক যুবক দুদ্দাড় করে দোকানের ভেতর ঢুকে পড়ল। পেছনে রাকেশ। বাইরে একটা চাপা কোলাহল ও আর্তনাদ, যেন কোনও আহতের গোঙানো। যুবকগুলোর চোখ এবার মেয়েটার ওপর। একজন বলে উঠল-এই, কাকিমা কোথায় রে, এই মালটা কে?
-এই, বাজে কথা বলবেন না, মাল কি? আমি একটা মানুষ, দেখতে পাচ্ছেন না?
-এই তোকে এখানে কে বসিয়েছে? এত সাহস, আমার দোকানে বসে পাঁয়তারা কষছে দেখো! –রাকেশের উগ্রমূর্তি। মেয়েটা নির্বিকার তাকিয়ে রইল।
-বসুক বসুক। ওকে তুলে নিয়ে যেতে পারি এক্ষুনি, যদি বলো বস্।
এইবার রাকেশ তার হাত ধরে টেনে উঠিয়ে দিল। লাল মোদো চোখে তাকে দেখল খানিক,তারপর ছুরির মত ধারালো গলায় বলতে শুরু করল-কি? এত সাহস তোর? এই আমরা ছ’জনা আছি, তোকে এক্ষুনি এই ছ’জনা মিলে এই দোকানের ভেতর রেপ করতে পারি। -বাকি পাঁচজন চঞ্চল হয়ে উঠল।
- রোয়াব করছিস যে? আটকাবার ক্ষমতা আছে তোর? আমার দোকানটা কব্জায় নেবার ধান্দায় আছিস? একটা ফুঁ দিলে উড়ে যাবি! আমাকে বিয়ে করবার সাধ জেগেছে নাকি? না কি মার সাধ জেগেছে? মা তোকে ঘরের বউ করে আনতে চায়! ঐ তিনপুরুষের বাড়িটা চাই! তাই তো? ও এমনি আমার হবে। ফালতু তোকে বিয়ে করতে যাবো কেন?
-না না গুরু! তুমি তো পরীকে বিয়ে করবে, ওকে কথা দিয়েছ। পরী তোমার জন্যে ফিট গুরু। এ তো ঝোড়ো কাক! এ রেপড্ হবে। কোন প্রমাণ রাখব না। বাড়ি নিজে নিজে হেঁটে তোমার হাতে চলে আসবে। -পাঁচজনের ভেতর থেকে কেউ বলল। বাকিগুলো হ্যা হ্যা করে হাসছে।
রাকেশ দু’হাতে তার গাল দুটো চেপে ধরেছে। কথা বলতে পারছিল না মেয়েটা। এই সময় কাকিমার তীক্ষ্ন চিৎকারে রাকেশ তাকে ছেড়ে দিল। কাকিমা চিৎকার করছিল। রাধুকে ডাকছিল। রাধু এসে টেনে তাকে দোকান থেকে বের করে নিয়ে চলল। রাস্তায় একটা মানুষ পড়ে আছে। গোঙানির আওয়াজ আসছে। আবছা আলোয় চোখে পড়ল চারপাশটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। সে এগিয়ে যাচ্ছিল আহতের দিকে। রাধু শক্ত হাতে আটকাল।
কী করছ খুকি? পাগল হলে?

বাড়ির ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে বলল-শিগ্গির দোর দাও। আমি এসে রাতে তোমার কাছে থাকতাম। কিন্তু কী করি! উপায় নেই। রাতে মেশোকে দেখতে হয়। অসুস্থ মানুষ কখন কী হয়! সাবধানে থেকো। দরজা দাও। আমি আসি। ওদিকে কী হচ্ছে কে জানে! লাশটাকে ওগুলো গুম করে দেবে আজ রাতেই মনে হয়। মরেনি তো,এটাই চিন্তার কথা।

রাধু বেরিয়ে গেলে  মেয়েটি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল। আহত মানুষটা পথে পড়ে আছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে। মরেনি বলে রাধু আফসোস করে গেল। কাকিমা! কাকিমা কী...রাকেশ কী বলছিল? তাহলে কাকিমা কী...অসম্ভব...কিন্তু এ দুনিয়ায় অসম্ভব বলে কিছু আছে কি? আলো জ্বালাতে ভয় করছিল মেয়েটির। বুঝতে পারছিল মাঝেমাঝে অন্ধকারও  স্বস্তিদায়ক হয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন