শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

অনুরঞ্জনা ঘোষ নাথ। পারক গল্পপত্র


সুজাতা আবার পালিয়েছে। এই নিয়ে দুবার পালালো। মালতি দাওয়ার কাছে বসে কেঁদেই চলেছে সকাল থেকে যখন ছেলে সুজয় এসে খবর দিল যে দিদির ঘরে দিদি নেই, দরজা খোলা! মালতি ধড়মড় করে উঠে, বুকে অজানা ভয় নিয়ে চারপাশ খুঁজে যখন কোত্থাও ওকে পেলোনা তখন বুঝলো আবার ও হরর চালে ফেঁসে ভাগলবা হয়েছে। কত কষ্ট করে মালতি সাত বাড়ি ঠিকের কাজ করে তিন ছেলে মেয়েকে মানুষ করছে, বড় মেয়েটার মাধ্যমিক পাশের পর ভালো ঘরে বিয়েও দিয়েছে। মালতির বর কবে যে সেই ঝগড়া করে অন্য বৌ নিয়ে  চলে গিয়ে আলাদা সংসার পাতলো তখন থেকে মালতি এই সংসারের জোয়াল একাই টেনে যাচ্ছে। মেয়ের দুঃখে এখনও বুক চাপড়ে চাপড়ে সে কেঁদেই  চলেছে, পাড়াপড়শির সান্ত্বনাতেও একটুও স্বস্তি পাচ্ছে না।
             ওদিকে সুজাতা যেন মুক্ত বিহঙ্গ- 'হর'। 'হর' ওর হরসুন্দর আজ ওকে নিয়ে যেতে এসেছে, কাল সন্ধ্যেবেলাই  তো ফোনটা এসেছিল যখন ও কোচিং এ পড়তে গিয়েছিল। হরর ফোন এ ওর  মনে আনন্দের জোয়ার বয়ে গিয়েছিলো। কোচিং থেকে ফেরার পথে রোজ ফোন করে সে, অথচ কতদিন সুজাতা ফোন করেছে হর ধরেইনি। কেন ধরেনি?
সুজাতা তো ওর বিয়ে করা বৌ-না হয় একসাথে ঠিকমতো ঘর করা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু সে তো হরর মায়ের দোষ। ও তো দিদি আর মায়ের অমতে পালিয়ে গিয়ে মন্দিরে হরকে বিয়ে করেছিলো,ওর সঙ্গে ঘর বাঁধতে গিয়েছিল।

দিদির বৌভাতে যেদিন প্রথম হর ওকে দেখল আর ওকে প্রেম নিবেদন করল সেদিন থেকেই ও হরকে আপন করে নিয়েছে। ভেসে গেছে হরর প্রেমের জোয়ারে..... জীবনের প্রথম ও শেষ বলতে হরকেই বুঝেছে ও, নয়তো মা, দিদি, পাড়াপড়শির, বন্ধুদের কাছে বকুনি আর হাসি বিদ্রুপ ছাড়া কিই বা পেয়েছে ও জীবনে? চিরকাল একটু বোকা সোকা  বলে লোকে ওকে নিয়ে মজা করেছে। ওর স্কুলে ও বাড়িতে সুজাতা নামটা বদলে কখন যেন 'কেবলি ' হয়ে গেছে ও জানতেই পারেনি. .... ওর যেন কিছুই ভালো লাগতো না। এর মাঝে এলো হর -যেন সাক্ষাত দেবদূত। ও তখন নাইন-এ পড়ছে আর দিদি মাধ্যমিক পাশ করেছে।  ভালো সম্বন্ধ দেখে মা দিদির বিয়ে দিয়ে দিল মথুরাপুরে আর সেই দিদির বৌভাতেই নিমন্ত্রিত ছিল হর -হরসুন্দর মণ্ডল। এক দেখাতেই যেন দুজনে দুজনার হয়ে গিয়েছিলো..... সেদিনের চোখাচুখি হরর দেওয়া ফোন নম্বরে গল্পে গল্পে গভীর প্রেমে পরিণত হল। যদিও হর দূরে থাকতো তবুও সুজাতার টানে ও বার বার সুজাতার সঙ্গে দেখা করতে আসতো গড়িয়ায়। আর এতদিন  অকাজের  ফালতু মনে হওয়া সুজাতা নিজেকে যেন হরর ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে ফিরে পেল।  ও যে মানুষ, ওর একটা মন আছে, একজন নারী হিসেবে ওর কিছু মূল্য আছে এগুলোতো হর ওর জীবনে না এলে ও বুঝতেই পারতোনা! বাড়িতে জানাজানি হতে দেরি হলনা, সুজয় দেখল একদিন সন্ধ্যের অন্ধকারে কোচিং এর গলির মোড়ে হরর সঙ্গে। ব্যস, বাড়ি আসতেই মার উত্তম মধ্যম..... তবুও ও ছাড়েনি হর কে। কদিনের মধ্যেই হরর হাত ধরে পালালো বাড়ি থেকে, মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করে সোজা হরর বাড়ি একরাশ ঘরকন্নার স্বপ্ন বুকে নিয়ে।

কিন্তু হরর রায়বাঘিনি মা এককথায় দূর দূর করে ওদের তাড়িয়ে দিল, শুধু রাত টুকু হরর বাবার কথায় থাকতে দিতে রাজি হয়েছিল, ওদের। কিন্তু  আলাদা আলাদা ঘরে শোবার  শর্তে। হরর মায়ের কাছে সুজাতা আর অন্য ঘরে বাবা দাদার সঙ্গে হর। হরর মায়ের সাফ কথা - বেকার ছেলে বিয়ে করে বৌ এনেছো যেখানে পারো নিজের দায়িত্বে রাখো,  আমাদের ঘাড়ে বসিয়ে খাওয়ানো চলবে না। সত্যি সুজাতা প্রেমে এমন পাগল হয়ে গিয়েছিল পরের কথা ভেবে দেখেনি। সংসার হলে খাবে কি? হর তো তেমন কিছু করেনা। এই জন্য লোকে ওকে 'কেবলি' বলে। সত্যি ও একদম হাঁদারাম। এতো সাধের বিয়ের ফুলশয্যা ও সংসার তো হলোই না,  উল্টে হরর মা ওকে যা নয় তাই বলল। ওর বংশ মতিগতি তুলে খোঁটা দিল।  এমনকি হরকে ও ফাঁসিয়েছে বলে যখন মিথ্যে অভিযোগ দিল তখনো হর তেমন ভাবে প্রতিবাদ করল কই? বরং মায়ের সামনে ভিজে বিড়ালের মতো মিঁউ মিঁউ করতে লাগল। মনটা অভিমানে ভরে গেল ওর। শুধু মা আর দিদির কথা মনে হতে থাকলো অপরাধীর মতো উঠোনের এককোনে ঘোমটা মাথায় দাঁড়িয়ে। বাড়ি থেকে লুকিয়ে বেরোনোর সময় মায়ের একটা শাড়ি পরে এসেছিল, কিন্তু কপালে এই ছিল সে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি।  সে শুধু ভালোবেসেছে অন্ধের মতন হরকে। কিন্তু বাস্তবটা যে বড় কঠিন। তারা গরিব, বাবা মাকে ছেড়ে ছোটবেলায় চলে গেছে, অনেক যৌতুক দিয়ে আজ তার বিয়ে হলে বাড়ির সম্মান থাকতো, কিন্তু পালিয়ে যাওয়া মেয়েরও যেমন সম্মান থাকে না তেমনি ছোট হয়ে যায় তার বাপেরবাড়ি শ্বশুর বাড়ির কাছে। পথে ফিরতে ফিরতে একথাই ভাবছিল সে।  তবে হর বলেছে চিন্তা না করতে। সে এখন দুদিন কোনো একটা বন্ধুর বাড়ি থেকে কাজ জোটাবে, তারপর সুজাতা আর ও সুখের নীড় বাঁধবে। হরর কথা যেন ওর মনে জাদু করত, সমস্ত কষ্ট দুঃখ এক নিমেষে ভুলে যেত সে। বোকা সুজাতা এসকল  কথা  সত্যি মনে করে আবার ট্রেন এ চেপে বসল। কিন্তু হর ওকে লেডিস কম্পার্টমেন্ট এ তুলে দিতেই ওর কেমন যেন সন্দেহ হল। হর আশ্বাস দিল যে ও পাশের কামরায় আছে। গড়িয়া তে নেমে যায় যেন ও। হর নেমে এসে ওকে নিয়ে বন্ধুর বাড়ি চলে যাবে। জেনারেল কম্পার্টমেন্ট এ কারোর গায়ে নতুন বৌয়ের গা ঠেকুক... হর কিছুতেই তা  মেনে নিতে পারবেনা... ও  যে সুজাতাকে ভীষণ ভালোবাসে। আবার নতুন স্বপ্ন বুকে বেঁধে অজানার পথে পাড়ি দেওয়া -তবে এবার কেন জানিনা বুক দুরুদুরু করতে লাগল সুজাতার। অন্যদের জিজ্ঞাসা করে ও গড়িয়া স্টেশন এ নেমে গিয়ে চারপাশ খুঁজে কোথাও হরকে দেখতে পেলনা... অনেক্ষন অপেক্ষা করে ও খুঁজে হরকে না পেয়ে ধীর পায়ে বাড়ির পথে পা বাড়ালো। ভাগ্গিস ওর বাড়ি স্টেশনের কাছে... নয়তো আজ কি হতো?

হর ওকে ফেলে কোথায় গেল? স্টেশন এ একজনের থেকে ফোন চেয়ে ফোন ও করল কিন্তু সুইচ অফ পেল। রাগ দুঃখ হতাশা অভিমান ও মনে একরাশ প্রশ্ন  নিয়ে সে কোনোমতে বাড়ি ফিরে এলো. মালতি তো ওকে পেয়ে কেঁদে একসা.. যদিও লজ্জায় ও মাকে মুখ দেখাতে পারছিল না। সারা পাড়া ঝেপে এসেছিল। ওকে যা নয় তাই বলল... কিছুই ওর মাথায় ঢুকছিল না তখন ওর। দিদি জামাইবাবুও এসেছে দেখে ও আরো মাটিতে মিশে যাচ্ছিলো। পড়শিরা হরর নামে থানায় নালিশ করতে বলল, কিন্তু মালতি রাজি হলনা। মেয়েকে ফিরে পেয়েছে এই অনেক, আর ওর শক্তি নেই দুনিয়ার সঙ্গে লড়াই করার। কোনোরকমে দুটো খেয়ে মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল কাঁদতে কাঁদতে সুজাতা। আর তারপর থেকে কতবার হরকে ফোন করেছে সুজাতা, কিন্তু শুধু প্রতীক্ষাই সম্বল হয়েছে, হর ফোন ধরেনি... তখন বাড়ির কথাই শেষমেশ মেনে নিয়েছে ও -হর ঠকিয়েছে। এত দুঃখ নিয়ে মরে যেতে চেয়েছিল সে। কিন্তু ভাই আর মায়ের মুখ চেয়ে তাও পারেনি করতে। অবশেষে মায়ের কথায় রাজি হয়ে আবার ইস্কুলে ভর্তি হয়েছে সে। বন্ধুদের, পাড়াপ্রতিবেশী, আত্মীয়দের হাসি মজা কটূক্তি এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। শুধু মনে হয় হরকে পেলে একবার জিজ্ঞাসা করবে কেন করল হর এটা| জীবনের সব আনন্দ কেড়ে নিল কেন? ভালোইতো ও ছিল মায়ের কাছে|

এর মধ্যে একদিন কোচিং থেকে ফেরার পথে হঠাৎ হরর ফোন। চমকে উঠেছিল সুজাতা -একসঙ্গে খুশি রাগ আনন্দ দুঃখে ও ভেসে যাচ্ছিলো, ভেঙে যাচ্ছিলো সে |প্রথমে তো কবার কেটেই দিয়েছিল -শেষে অনবরত রিংটোনের জ্বালায় ফোন ধরে জানতে পারল- সেদিন নাকি হর ট্রেনের ধাক্কাধাক্কিতে একটা অন্য  স্টেশনের প্লাটফর্মে পড়ে যায় ও পায়ে আঘাত লাগে. যেহেতু সুজাতা অন্য কম্পার্টমেন্ট এ ছিল তাই  ও খবর দিতে পারেনি,  এমনকি ফোনটাতেও  চোট লেগেছিলো ও সুইচ অফ হয়ে গিয়েছিল। পরে ফোন অন করে ও দেখতে পাচ্ছিলো সুজাতার কল কিন্তু ধরতে পারছিলনা, কারণ ফোন টা চোট পেয়ে খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ও বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। সুস্থ হয়ে ফোন সারিয়ে এসে ওর সাথে যোগাযোগ করেছে। হরর এইসব ভুলভাল মন ভোলানো কথায় 'কেবলি ' যে শুধু বিশ্বাস করল তাইনা আবার নতুন করে হরর প্রেমে ফাঁসলো। হর পই পই করে সুজাতাকে বারণ করে দিল যেন বাড়িতে না বলে ও ফোন করেছিল আর সুজাতার থেকে ওর কোচিং এর সময়টা ভালো করে জেনে নিল। ধীরে ধীরে কিছুদিনের মধ্যেই সুজাতা আবার হরর প্রেমে হাবুডুবু খেতে লাগল। ওর একবারও মনে হলনা যে হরকে বলে তুমি এসে মায়ের সাথে কথা বল। বরং হর ওকে বুঝিয়েদিলো যে আগে যেহেতু একটা ঘটনা ঘটেছে তাই সুজাতা যেন বাড়িতে আর হরর কথা না বলে - তাহলে কেউ আর ওদের দুজনকে মিলতে দেবে না। হর আরো বললো যে ও এবার একটা চাকরি পেয়েছে আর একটা ঘর ভাড়াও নিয়েছে। ও এখান থেকে সুজাতাকে নিয়ে ওর মাসির বাড়ি যাবে,  সেখানে দুদিন থেকে ওখান থেকে ওরা ওদের ভাড়া ঘরে চলে যাবে। আর সেখানেই ঘটবে ওদের সাধের ফুলশয্যা আর সুজাতা আর হরর স্বপ্ন ও ভালোবাসায় ভরা সংসার গড়ে উঠবে সেখানেই। তাই দুদিন বাদে রাতের অন্ধকারের সুজাতা যেন রেডি থাকে,  একসঙ্গে ওরা আবার যাতে পালাতে পারে।

যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। দুজনে মিলে চলল হরর মাসির বাড়ি। সুজাতা কিছু চেনে না। হর ওকে নিয়ে যাচ্ছে। এতদিনের  ঘর বাঁধার স্বপ্ন এবার পূরণ হবে ওর। মাঝখানে দুবার ট্রেন বদল করে সুজাতাকে নিয়ে এলো বহুদূরে মাসির বাড়িতে। কিন্তু মাসিকে দেখে কেন জানি না সুজাতার ভালো লাগলো না। বুড়ি মাসির কেমন চটকদার সাজগোজ -আর কথা বার্তা গুলোও যেন কেমন গায়ে পড়া আর হরর মায়ের সঙ্গে মাসির একটুও মিল নেই যদিও দুজনেই বেশ স্বাস্থ্যবতী.  হরকে কথাটা বলাতে ও হেসে উড়িয়ে দিল। বলল ওর মাসি খুব মিশুকে আর মজা করে, মায়ের মতো রাগী না। আর মাসি ওর মায়ের পিসতুতো বোন, নিজের বোন নয়, হর আরো বলল যে এসব কথায় মন না দিয়ে যেন ও হাতমুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে সাজগোজে মন দেয়, মাসি ওকে সাহায্য করবে -কারণ আজতো ওদের ফুলশয্যা... লজ্জারাঙা মুখে সুজাতা মাসির সঙ্গে চলে গেল। মাসিকে গায়ে পড়া  মনে হলেও মাসির হাসিখুশি ব্যবহারটা ভালোই লাগল ওর. স্নান করতে করতে মায়ের কথা, ভাইয়ের কথা, দিদির কথা খুব মনে পড়তে লাগল.... ইস,  ওর মাকে যদি দেখাতে পারতো ও হরর সঙ্গে কত খুশি হয়েছে মা নিশ্চয়ই খুশি হত, দিদি আর হরকে ঠকবাজ আর সুজয় ওকে কেবলি মূর্খ বলতে পারতো না। রাতের বেলায় হর ওকে কত আদর করল. আদরের আশ্লেষে জড়িয়ে সুখের সাম্পানে ভাসতে ভাসতে সুজাতা একসময় ঘুমিয়ে পড়ল....

" এই মেয়ে কত ঘুমাবি, ওঠ, ওঠ উঠে পড়, বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেলযে রে"-মাসির চিৎকারে ধড়মড় করে উঠে বসল সুজাতা। সত্যিই তো অনেক বেলা গড়িয়ে গেছে। পাশে তাকিয়ে দেখল হর নেই বিছানায়। অবাক হয়ে মাসিকে জিজ্ঞাসা করতে মাসি বলল,  "হর কাজে বেরিয়েছে ফিরবে সন্ধ্যে বেলা।" সুজাতা অবাক হয়ে গেল। হর ওকে  না বলে মাসিকে বলে গেল ! মাসি বলল, সুজাতা গভীর ঘুমে ছিল বলে হর আর ডাকেনি ওকে। স্নান করে, জলখাবার  খেয়ে নিতে বলে মাসি চলে গেল... ভীষণ ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল ওর, খুব কান্না পেতে  লাগল। মাসির থেকে ফোন টা চাইলো হরকে কল করবে বলে। মাসি বলল হর নাকি ফোন ফেলে গেছে। সারাদিন মনখারাপেই কাটলো সুজাতার। একটু ভয় ভয় করতে লাগল। বিকেল বেলা মাসি এসে বলল সেজেগুজে নিতে সুন্দর  করে। হর ফিরছে, মাসিকে অন্য একটা ফোন থেকে কল করে জানিয়েছে। একটা রঙ্গিন চকচকে শাড়ি আর কিছু গয়না গাঁটি রেখে গেল ওর জন্য। সাজা হয়ে গেলে কাজল লিপস্টিক দিয়ে একটু কেমন  উগ্র মতো সাজিয়ে দিল ওকে। ও আপত্তি করেছিল। কিন্তু হর নাকি এমনি পছন্দ করে মাসি বলেছিল। তারপর মাসি এক গ্লাস সরবত খেতে দিয়ে বলল,  "এটা খেয়ে যা মেয়ে ওই ঘরে গিয়ে হরর জন্য অপেক্ষা কর "। হর নেই কিছুতেই আর রুচি নেই.... মনটা দুঃখে ভরে গেছে। মাসি বোধহয় ওর মনটা বুঝতে পারল। বলল,  মেয়ে সরবত টা খেয়ে ঘরে গিয়ে অপেক্ষা কর তোর বরের জন্য, তোর বর আসলো বলে। মাসির কথায় ভরসা করে সরবত খেয়ে ঘরে গিয়ে বসে ও অপেক্ষা করতে থাকল হরর জন্য। একা একা বসে আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে কেমন যেন একটা ঝিমুনি মতো ভাব এসছিল। হঠাৎ দেখল ওর ঘরের দরজা খুলে দুটো অচেনা লোক ওর ঘরে ঢুকে পড়লো। ও কিছু বলবার আগেইলোক দুটো ওর গায়ে হাত দিতে লাগল। ও চমকে উঠলো,  প্রতিবাদ করবার চেষ্টা করলো,  কিন্তু কোনো ফল হলো না। দুজনে মিলে ওর সঙ্গে জোর জবরদস্তি করতে লাগলো। "ও মাসি মাসি, হর হর, বাঁচাও বাঁচাও "  বলে চিৎকার করে কত ডাকলো কাঁদলো কিন্তু কোনো ফল হলো না। ওর জীবনের সব স্বপ্ন আশা আকাঙ্ক্ষা এক নিমিষে ধুলিস্যাৎ করে দিয়ে লোক দুটো শরীরের খিদে মিটিয়ে চলে গেল। অসহায়ের মতো পড়ে রইল সুজাতা। কোন সাহায্যের হাত কেউ  বাড়িয়ে দিল না। লোকগুলো চলে যাবার পর অনেক্ষণ ঐভাবেই পড়ে রইল সুজাতা খাটের মধ্যে নিস্প্রাণ জড় পদার্থের মতো। আর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে রইল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া ঘর বাঁধার স্বপ্নেরা ..... যা ও দেখেছিল প্রাণপণ... যার লোভে দু, দুবার পালিয়ে গিয়েছিলো নিজের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে অজানার দিকে.......

ওদিকে সুজাতার খোঁজ না পেয়ে মালতিরা হরর বাড়িতে গেছিল। সেখানে গিয়ে দেখে হরও বহুদিন ধরে বাড়ি ছাড়া আর ওর ফোনও বন্ধ। অনেক খোঁজ করে,  পুলিশে খবর দিয়েও  সুজাতাকে আর পাওয়া গেল না,  এমনকি হর কেও। কেউ জানতেই পারলো না যে সুজাতাকে হর পতিতাপল্লীতে বিক্রি করে ভিনরাজ্যে পালিয়ে গেছে। আর ওদিকে কাস্টমার না এলে  'কেবলি ' সুজাতা আজো ভাবে এমনি করে ওর হর ওকে ঠকাতে পারেনা -সেইতো ওকে প্রথমবার জীবনে ভালোবেসেছিলো, একজন নারী হবার অনুভূতি জাগিয়েছিল ওর মধ্যে! জানলার দিকে তাকিয়ে সুজাতা  প্রতীক্ষা করে থাকে, হর আসবে,ওরা  ঠিক ঘর বাঁধবে... যদিও আজ ওর দেহটাই  ভাড়াটে বাড়ি হয়ে গেছে,নির্দিষ্ট  ভাড়ার বদলে সেখানে লোক আসে যায় তবুও সুজাতা 'সুজাতার ঘর'এর স্বপ্ন দেখে যায় -আর দূরে গোধূলি সূর্য সন্ধ্যের মলিনতায় ধীরে ধীরে অস্তমিত হতে থাকে- অন্ধকারে ঢেকে যেতে থাকে বিশ্বচরাচর.....।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন