শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

কাজল সেন


দিনের আলো আমার সহ্য হয় না। খালি চোখে রোদের দিকে তাকালেই চোখ জ্বালা জ্বালা করে। আর চোখ জ্বালা করলেই মাথাটা কেমন যেন থম মেরে যায়। কপালের দু’পাশের রগ দপদপ করতে শুরু করে। নাকে একটা সর্দি সর্দি ভাব। আর ঠিক তখনই আমার কান্না পায়। খুব কান্না পায়। চোখ থেকে টসটস জল গড়িয়ে পড়ে। বুকটাও ঢিবঢিব করতে থাকে।

ডাক্তার দেখানো হয়েছিল। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর তিনি জানালেন, বিশেষ  কোনো ওষুধের দরকার নেই। একটা আইড্রপ, জলের ঝাপটা ও একটা ভালো  সানগ্লাস হলেই চলবে। হ্যাঁ, তারপর থেকে তাই চলছে। আইড্রপ ও জলের ঝাপটার পাশাপাশি চোখে আমার সবসময় নামী ও দামী ব্র্যান্ডের সানগ্লাস। সকালে ঘুম থেকে উঠে সেই যে চোখে সানগ্লাসটা গলিয়ে নিই, রাতে শুয়ে চোখ বন্ধ করার আগে খুলে রাখি। আর তার ফলে হয়েছে কী, আমার দৃষ্টিতে আমার চারপাশের পৃথিবীটা তার বহুমাত্রিক রঙ হারিয়ে একমাত্রিক রঙে ফুটে ওঠে। আমার চোখে যেমন গাছের পাতা সবুজ, তেমনি আকাশও সবুজ, বাড়িঘর সবুজ, এমনকি মানুষগুলোও সবুজ। মিত্রা একদিন টিপ্পনি কেটে বলল, ভালোই হলো সুদক্ষিণা, তোর চোখে সারাজীবন সবকিছুই সবুজ থাকবে, কোনোকিছুই বুড়িয়ে যাবে না, তুই নিজেও কোনোদিন বুড়ি হবি না।

সবুজ রঙের মিত্রাকে যেমন দেখি, ঠিক তেমনি দেখি সবুজ রঙের অলকেন্দুকেও। যদিও আমরা সবাই একই ইউনিভার্সিটির সহপাঠী, তবুও বলতে আমার লজ্জা নেই, অলকেন্দুর সঙ্গে আমার একটি ইয়েও আছে। আসলে অলকেন্দু ডাক্তারের নির্দেশে না হলেও দিনের আলোয় সবসময় সানগ্লাস পড়তে ভালোবাসে। তবে ওর সানগ্লাসের রঙ নীল। আমি যেমন সবুজ পৃথিবী দেখতে ভালোবাসি, অলকেন্দু ভালোবাসে পৃথিবীকে নীল দেখতে। এবং ব্যাপারটা এমন একটা বিপজ্জনক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে, কোন পৃথিবীটা বেশি সুন্দর ও প্রাণবন্ত, তাই নিয়ে আমাদের মধ্যে রীতিমতো ঝগড়া লেগে যায়। কথা কাটাকাটি, মন কষাকষি। অলকেন্দু রেগে বলে ওঠে, তোর পৃথিবীটা তো সবুজ, শুধু সবুজ শ্যাওলায় ভরা! আমি ক্ষেপে যাই, আর তোর পৃথিবীটা কী! শুধুই  নীল, বিষে বিষময়। তুই জানিস না, শিব বিষ গলায় ঢেলে নীলকন্ঠ হয়েছিল?

বেচারি মিত্রা! আমাদের দুজনের ঝগড়ার মাঝে পড়ে সে বুঝে উঠতে পারে না, কীভাবে পরিস্থিতি সামলাবে। আমাদের দুজনকে নাড়া দিয়ে বলে, তোরা শুধু আজেবাজে উদাহরণ দিচ্ছিস কেন? ভালো ভালো উদাহরণও তো কত আছে! এই যেমন কাছের এই পাহাড়টা, কী মোলায়েম শ্যামল সবুজ! আর ঐ যে দূরের আকাশ, শান্ত সুনীল! এসব তো তোরা দেখতে চাস না খালি চোখে! নিজের নিজের পছন্দের রঙ নিয়েই ঝুটমুট রঙবাজী করছিস।

নিরুপায় হয়ে অলকেন্দু আমাকে প্যাঁক দিয়ে বলল, তবু যাই বলিস না কেন সুদক্ষিণা, সবুজ হচ্ছে ঘাসের রঙ। ঘাস খেয়ে থাকবি নাকি? শুনে আমার খোপড়ি  গেল আরও বিগড়ে। বললাম, ঘাস খাব কেন! তাহলে তুইও জেনে রাখ, নীল ঘুমেরও রঙ। আমাদের বিয়ের পর তুই শুধু ঘুমোবি নাকি? 

৪টি মন্তব্য: