শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

অভিজিৎ রায়। পারক গল্পপত্র


শান্ত দুপুরে মোবাইলটা বেজে উঠলেই মন ভাল হয়ে যায় প্রতিমার। এইসময় তাকে তার নাতনি ছাড়া আর কেউ ফোন করে না। তিতলি, তার একমাত্র আদরের নাতনি। খাটে শুয়েছিলেন। আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে টেবিলের উপর থেকে মোবাইলটা তুলে ধরলেন।
- তুমি কবে বড় হবে দিদা?' হ্যালো বলার সুযোগ না দিয়েই কথাগুলো বলে খিল খিল করে হেসে ওঠে তিতলি। প্রতিমা প্রথমে থমকে যান তারপর নাতনির সাথেই হেসে উঠে বলেন, 'আগে বুড়ো হয়ে নিই! তারপর না হয় বড় হবো!' দুজনেই আবার খিল খিল করে হেসে ওঠে। হাসি থামলে তিতলি বলে,  'ফেসবুকে যে বাচ্চার ছবিটা শেয়ার করেছ সেটা এক্ষুনি ডিলিট করো।' প্রতিমা ভয় পেয়ে যান। বলেন, 'কেন রে? কী ভুল করলাম? এইসব কি আর আমাদের কম্মো? কেন যে এসব আমাকে শেখাতে গেলি!'
তিতলি হো হো করে হেসে ওঠে। 'তুমি খুব বাজে স্টুডেন্ট দিদা। পনেরো দিন ধরে ফেসবুক অপারেট করতে শেখালাম। বললাম, অপরিচিত কারোর পোস্ট না বুঝে শেয়ার করবে না! তুমি তাইই করলে?'
প্রতিমা এবার রেগে যান। বলেন, 'অদ্ভুত ব্যাপার সব তোদের। দেখছিস না বাচ্চাটাকে খুঁজে পাচ্ছে না ওদের বাবা মা? কত আর বয়স? দশ, বারো বছর হবে।'
তিতলি আবার হেসে উঠল খিল খিল করে। বলল, ওহ দিদা ওটা পাঁচ বছর আগের পোস্ট।  এখন ওই ছবি দেখে ওই ছেলেকে আর খুঁজে পাবে কেউ? দাড়ি, গোঁফ গজিয়ে গেছে যে!'
- পাঁচ বছর আগের! তা আমি বুঝব কী করে?
- ছবির মাথায় দেখবে দিন, তারিখ লেখা থাকে। বাচ্চাটাকে খুঁজে পেয়েছে ফেসবুক থেকেই ছবি দেখে একজন। সেই কমেন্ট লিখতেই পোস্টটা সামনে উঠে এসেছে।
- ওহ। তাই বুঝি? খুঁজে পেয়েছে! বাহ, কী ভাল খবর।' চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল প্রতিমার! মুছতে মুছতেই বললেন, 'তা তোরা কেমন আছিস? গরমের ছুটিতে আসছিস তো? তোরা এলেই আম পাড়তে বলেছি। পুকুরের মাছও ধরা হবে। চলে আয় তাড়াতাড়ি।
- হ্যাঁ দিদা। যাব। মায়ের স্কুলের ছুটি পড়লেই যাব। আর দিন পনেরো পরে।

ফোন রেখে দিয়ে টেবিলের উপর থেকে একটা ফটোফ্রেম হাতে নিলেন প্রতিমা। একটা বছর পাঁচেকের ছেলের ছবি। কাচের উপরের ধুলো মুছতে মুছতে হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন প্রতিমা। কাঁদতে কাঁদতেই বলতে লাগলেন, তখন তো ফেসবুক ছিল না! তাই বুঝি তোকে আর খুঁজে পেলাম না রে বান্টি!
খাটের উপর ছবিটি রেখে প্রতিমা মোবাইলে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে দেন। ছবির সাথে লিখে দেন, হারিয়ে যাওয়া এই ছেলেটিকে খুঁজে পেলে এক্ষুনি জানান।

সারাটা দুপুর প্রতিমা তারপর ফেসবুক খুলে বসে থাকেন উত্তরের আশায়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন