শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

অনুবাদ গল্প : বাসুদেব দাস। পারক গল্পপত্র


    বিশ্বনাথনের কব্জির ঘড়ির বয়স মোটামুটি তার বয়সী হবে।
    পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হয়ে গেছে।তাই তার সন্দেহ হচ্ছে ঘড়িটা ঠিকমতো চলছে কিনা।এইজন্যই সে আশেপাশের প্রতিবেশীদের জিজ্ঞেস করে,‘আচ্ছা ভাই,সময় কত হয়েছে?’
    কিন্তু তারা দ্রুত জবাব দেয় না-সময় কত…।মুচকি হাসির সঙ্গে তারা তাঁর কব্জির হাত ঘড়ির দিকে তাকায়।তাদের দৃষ্টি অনুসরণ করে বিশ্বনাথন সবসময় একই জবাব দেয়, ‘আমার ঘড়ি ঠিকভাবে কাজ করছে না।’প্রতিবেশীদের কাছ থেকে যদি শোনেন কি দশটা বেজে গেছে,তাহলে বিশ্বনাথন ঘাবড়ে গিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে দ্রুত চলতে শুরু করেন।
    বাস থেকে নেমে অফিসের দিকে এগোতে গিয়ে কাউকে সময় জিজ্ঞেস করার জন্য খুঁজে পান না।সামনের দোকানের দরজায় ঝোলানো ঘড়ির দিকে দৃষ্টি যেতেই বুঝতে পারেন কী সাড়ে নয়টা বেজে গেছে।তাঁর মনে ভয় জাগে।সে কখনও এত তাড়াতাড়ি অফিস পৌছায়নি।সম্ভবত ঘড়িটা ঠিক সময় দিচ্ছে না।আসলে দরজায় ঝোলানো ঘড়ি কি কখনও ঠিক সময় দেয়?নিজের ভয়টাকে দূর করার জন্য সে দোকানের ভেতর ঢুকে যায়।দোকানদার তাঁর দিকে এভাবে তাকায়,যেন বলতে চান তুমি এত দামি ফার্নিচারের দোকানে কেন এসেছ?
    বিশ্বনাথনের টাক মাথা,নোংরা দাড়ি,খদ্দরের পাঞ্জাবি,ইস্তিরিবিহীন ধুতি,খালি পা দেখে দোকানদার দ্রুত এই সিদ্ধান্তে পৌছে গেলেন কী এ কোনো গ্রাহক নয়,কাঠমিস্ত্রি হবে।
    দোকানের ভেতর জ্বলজ্বল করতে থাকা বিভিন্ন ধরনের সোফা,ড্রেসিং টেবিল,ডাইনিংসেট দেখতে দেখতে বিশ্বনাথের বিস্মিত দৃষ্টি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
    বাঁদিকে চকিত দৃষ্টি ফেরাতেই সামনের বিশাল আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল।সে খুশিমনে মাথায় হাত বুলিয়ে নিল।
    দোকানদার তার কাছে পৌছে বললেন,‘শোন,আমাদের কারখানা পাশের গলিতে।ওখানে চলে যাও,এখানে কেন এসেছ?’
    ‘কারখানায় কেন যাব?আমাকে অফিস যেতে হবে।’বিশ্বনাথন অবাক হয়ে বলল।
    ‘ওখানেই কারখানা,অফিস রয়েছে।সময় হয়ে গেছে।খুলে গেছে বোধহয়,যাও।’
    ‘সময় হয়ে গেছে।কয়টা বাজে?’
    ‘দেখ,দরজায় ঘড়ি ঝোলানো রয়েছে।সময় দেখতে জানতো?’
    ‘সাড়ে নয়টা বাজতে চলেছে,এটা কি ঠিক?’
    ‘তুমি এখান থেকে এখনই ভাগো।কী বোকার মতো প্রশ্ন করছ?দোকানদার গর্জন করে উঠল।
    বিশ্বনাথের মনে হল,এখানে আর এক মুহূর্ত ও থাকা ঠিক হবে না,দ্রুত সে দোকানের সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে গলির মধ্যে পৌছে গেল।ক্ষণিকের জন্য পেছন ফিরে তাকাল,দোকানের ভেতর গিয়ে জিজ্ঞেস করল,’আচ্ছা মহাশয়,আপনি এইমাত্র আমাকে কারখানায় যেতে বললেন কেন?
    ‘আমাদের কারখানায় দুই চারজন কাঠমিস্ত্রির প্রয়োজন রয়েছে।
    ‘আমি কাঠমিস্ত্রি নই।’বিশ্বনাথ অবাক হয়ে উত্তর দিল।
    কাঠমিস্ত্রি নয় এবং ফার্নিচার কেনার ও সামর্থ্য নেই।এই ধরনের আশ্চর্য লোক তাহলে কেন দোকানের ভেতরে এসেছে?শেষপর্যন্ত দোকানি ভেবে নিল লোকটা নিশ্চয় পাগল হবে।বললেন,’আচ্ছা এখন তাহলে আসতে পার।’
    বিশ্বনাথন কিছুতেই এটা বুঝতে পারছে না কি দোকানদার তাকে কেন কাঠমিস্ত্রি ভাবল।এতকিছু পরে ও সে টাইম জানতে পারল না।যদি সামনের কাপড়ের দোকানে গিয়ে সে সময় কত হয়েছে জিজ্ঞেস করে তাহলে তাকে হয়তো বোকা ভাববে।বেকার এই ঝামেলায় যাবার কী প্রয়োজন।তাড়াতাড়ি অফিস চলে যাওয়াই ভালো হবে।একথা ভেবে সে দ্রুত গতিতে অফিসের উদ্দেশ্যে পা চালাল।
    বিশ্বনাথন অফিস পৌছে দেখে অফিস একেবারে খালি।তার মনে ভয় দেখা দেয়,আজ অফিস বন্ধ নয়তো?আজ বৈকুণ্ঠ একাদশী।হয়তো ছুটির ঘোষণা হয়ে গেছে।কিন্তু কেউ তো আমাকে বলেনি।ভেতরে গিয়ে চারপাশে তাকাল।এক কোণে বসে চাপরাশি বীরাপ্পা বিড়ি ফুঁকছিল।
    ‘শোনো বীরাপ্পা,আজ অফিস ছুটি নয়তো?’
    ‘ছুটি কিসের জন্য সাহেব?’বীরাপ্পা জিজ্ঞেস করে।
    ‘আজ বৈকুণ্ঠ একাদশী না?’
    বিশ্বনাথন ভাবল,যে বৈকুণ্ঠ একাদশীর অর্থ জানে না,তার সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলার কোনো মানে হয়না।মানুষ কি এভাবে ভুলে যেতে পারে?সম্ভবত সবকিছু জেনেশুনেই সে নাটক করছে।ওকে অবহেলা করার জন্য বীরাপ্পা হয়তো ষড়যন্ত্র করছে,কে জানে?
    এই সমস্ত কিছু ভাবতে ভাবতে বিশ্বনাথন নিজের সিটের কাছে গিয়ে চেয়ারে বসে পড়ে এবং ফাইল বের করে টেবিলের উপর রেখে দেয়।সামনের দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়ির দিকে তাকায়,দশটা বাজতে দশ মিনিট বাকি রয়েছে।ভাবল,অন্য কর্মচারীরা এখনও আসেনি,তার মানে ঘড়ির সময় ঠিকই আছে।
    ঠিক তখনই বীরাপ্পা এসে অফিসার তাকে ডেকে পাঠানোর কথা বলে।আরে,প্রতিদিন সাড়ে দশটার আগে যে অফিসার অফিসে আসে না তিনি কীভাবে আজ এত তাড়াতাড়ি পৌছে গেলেন?আচ্ছা,এসেই না হয় গেছেন কিন্তু এসেই আমাকে ডেকে পাঠানোর মতো কী হল?কে জানে আজ সকাল সকাল গালিগালাজ শুনতে হবে কিনা।এই কথা ভাবতে ভাবতে সে ভীত হৃদয়ে অফিসারের চেম্বারে পৌছাল
    ‘হ্যালো মিস্টার বিশ্বনাথন।পরশুদিন আপনি যে স্টেটমেন্ট তৈ্রি করেছেন,তা অডিট সাহেব দেখে নিয়েছেন।’এই কথা বলে অফিসার সিগারেটের অবশিষ্টাংশ অ্যাশট্রেতে গুঁজে দেয়।ঐ স্টেটমেন্টে মনে হয় বড় কোনো ভুল থেকে গেছে,তানাহলে সকাল সকাল ডেকে পাঠিয়ে ওটার কথা কেন বলবেন?
    ‘ক্ষমা করবেন সাহেব।আমি খুব সাবধানতার সঙ্গে ওটা তৈ্রি করেছি,তবুও কোথাও কোনো ভুল থেকে গেছে বোধহয়।আমি জেনেশুনে কোনো ভুল করিনি।ক্ষমা করবেন।বিশ্বনাথন কৈফিয়ত দেবার চেষ্টা করে।
    ‘কী বললে,ভুল থেকে গেছে,কোথায়?’
    ‘আমি জানি না সাহেব,কোথায় ও হয়তো ভুল থেকে গেছে?’
    অফিসার এত জোরে হেসে উঠলেন কী মনে হল ছাদ ভেঙ্গে পড়বে।
    বিশ্বনাথন অফিসারের কাছ থেকে গালিগালাজ,তিরস্কার পেয়ে অভ্যস্থ,অফিসারের এই হাসির জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না।সে প্রথমবারের জন্য অফিসারের মুখে হাসি ফুটতে দেখেছে।এই কথা ভেবে সে বিব্রত হয়ে পড়ে।কে জানে এই হাসি কিসের ইঙ্গিত করছে।
    ‘ক্ষমা করবেন সাহেব।’বিশ্বনাথন কম্পিত স্বরে বলে।
    ‘নো নাথিং রঙ,বিশ্বনাথন।অডিটর আপনার স্টেটমেন্ট ওকে করে দিয়েচ্ছে।দ্বিতীয় স্টেটমেন্টটাও তৈরি করে দিন।আজ অডিটর আবার আসবে।ওটাও যদি ওকে হয়ে যায় তাহলে সবদিক রক্ষা।’
    ‘দ্বিতীয় স্টেটমেন্টও রেডি স্যার।’
    ‘আপনি খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন।সম্ভবত,এই মাসের শেষে আপনার প্রমোশোন হয়ে যাবে।আমি রিকমেণ্ড করে দিয়েছি।কনগ্রাচুলেশন।’অফিসার বললেন।
    ‘এ তো আপনারই কৃপা।’বিশ্বনাথ কৃতজ্ঞতা জানাতে চাইল,কিন্তু ওর মুখে কোনো ভাষা ফুটল না।তার ঠোঁটে কেবল কম্পন দেখা গেল।
    ‘নাউ ইউ কেন গো।’অফিসার বললেন।
    বিশ্বনাথের মনে হল সে পাগল হয়ে যাচ্ছে।ধীরে ধীরে এসে নিজের সিটে বসে পড়লেন।
    বিশ্বনাথ ভাবতে লাগল,’আজ হঠাৎই অফিসার তার প্রমোশনের কথাটা কেন বললেন।অফিসের অন্যান্য কর্মচারিদের ছেড়ে দিয়ে তাকেই কেন প্রমোশন দেওয়া হচ্ছে?মৃদু হাসির সঙ্গে কথাটা বলেছেন,তাই হয়তো আমার সঙ্গে মজা করার জন্য বলেছেন অথবা তার কাছ থেকে আরও বেশি করে কাজ আদায় করার জন্য এই টোপটা রেখেছেন অথনা প্রমোশনের নামে নারায়ণের মতো কোনো ঝামেলা থাকা পদে নিযুক্ত করে,কোনো ত্রুটি পেলে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে নিশ্চয়।যদি এটাই সত্যি হয় তাহলে মানতেই হবে কী আমার মাথার উপর কঠিন সঙ্কট ঘনিয়ে এসেছে। নারায়নের পদে কাজ করা দুইজন কর্মচারিকে এর আগে চাকরি থেকে চিরদিনের জন্য ছাটাই করা হয়েছে।এই যদি প্রমোশনের নমুনা হয় তাহলে তার প্রমোশনও চাই না চাকরি থেকে চিরকালের জন্য বরখাস্ত হওয়াও চাই না। যদি বাসি ভাত খেয়ে এই পদে এখানেই পড়ে থাকতে হয় তা ও  ভালো হবে।কিন্তু যদি আমাকে বলেন তোমাকে আমরা প্রমোশন দিয়েছি,ঐ পদে চলে যাও,তাহলে আমি তাতে কীইবা করতে পারি?’
    অফিসার সাহেবের স্টেনো সবাইকে খবরটা জানিয়ে দিল,বিশ্বনাথন প্রমোশন পেতে চলেছে।সবাই বিশ্বনাথনকে ঘিরে ধরে অভিনন্দন জানাতে লাগল।
    ‘আপনি তো বড় ভাগ্যবান।’ব্রহ্মাজী রাও বিশ্বনাথনকে অভিনন্দন জানালেন।
    ‘হ্যাঁ,আমি আমার ভাগ্যকে বিশ্বাস করতে পারছি না।বিশ্বনাথন সন্দেহজনক কন্ঠে                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                জবাব দিল।
    ‘অফিসার নিজের মুখে ঘোষণা করার পরেও বিশ্বাস করছেন না,এটা তো তাহলে বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়।’
    কে জানে,কিছু ঝামেলা থাকা পোস্টে পোস্টিং দিয়ে একেবারে বাড়ির টিকেট ধরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করছে কিনা?’
    ‘এই সময়ে যে চাকরি করছে,তার সব সময়ের জন্য মুক্তি পাওয়াই উচিত।‘এই কথা বলে ব্রহ্মাজী নিজের সিটে চলে গেলেন।
    মনে হয় এই ব্রহ্মাজী রাও কোনোভাবে তাকে মুক্তি দিয়ে এই পদে নিজের ভাগ্নে কে নিযুক্ত করতে চান।আমার কাছে ওসব চালাকি চলবে না সাহেব।আমার প্রমোশন চাইনা,এই পদেই থেকে যেতে দিন।এই কথা বলে অফিসারের কাছে আবেদন করব এবং এই সিটেই আঠার মতো আটকে থাকব।বিশ্বনাথন এভাবেই নিজের মনকে প্রবোধ দেয়।
    এর মধ্যেই জানতে পারে কি অফিসার তাকে স্টেটমেন্ট নিয়ে যেতে বলেছেন।বিশ্বনাথন স্টেটমেন্ট নিয়ে দৌড়ে যায়।
    বিশ্বনাথনের হাত থেকে স্টেটমেন্ট নিয়ে অফিসার এক নজর চোখ বুলিয়ে নেয় এবং তাতে সই করে বলেন ‘আপনি এটা নিয়ে সামনের রুমে বসে থাকা অডিটর সাহেবের হাতে দিয়ে আসুন।’
    বিশ্বনাথন স্টেটমেন্ট নিয়ে সামনের কামরায় চলে যায়।অডিটর বেশ রিলাক্স মুডে সিগারেট খাচ্ছিলেন।বিশ্বনাথনকে দেখে হেসে বলেন,‘আসুন বসুন।’
    বিশ্বনাথন চেয়ারে বসে পড়েন।অডিটরকে স্টেটমেন্টটা এগিয়ে দেন।অডিটর স্টেটমেন্ট পড়লেন না।বেশ কিছুক্ষণ ধরে সিগারেটের মজা নেন।পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের এক যুবক।দেখতে সুন্দর এবং স্বাস্থ্যবান।পরনে স্যূট।
    অডিটর ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করেন,‘আপনার নাম জানতে পারি কি?’
    ‘আমার নাম বিশ্বনাথন।’
    ‘আপনার বংশ পরিচয়?’
    বিশ্বনাথন নিজের বংশপরিচয় জানায়।অডিটর তার দিকে তাকিয়ে বিষ্ময়ের সঙ্গে বলেন-আপনি ছোট গলিতে থাকেন না?’
    ‘হ্যাঁ।বিশ্বনাথন এই ভেবে বেশ অবাক হন যে অডিটর তার বাড়ির ঠিকানা কীভাবে জানলেন।এরপর বিশ্বনাথন উঠে দাঁড়ান কেন না তার উপস্থিতি হয়তো আর প্রয়োজনীয় নয়।
    ‘অডিটর সাহেব,আমি কি এখন যেতে পারি?’
    অডিটর মৃদু হেসে বলেন- ‘আমার নাম অডিটর নয়,মাধব রাও।’
    ‘আচ্ছা।’
    ‘আপনার মেয়ের নাম রাধা নয়?’অডিটর জিজ্ঞেস করেন।
    ‘হ্যাঁ,আপনার সঙ্গে ওর পরিচয় আছে?’
    ‘হ্যাঁ,আমি ওকে জানি।বি কম পড়ার সময় আমার সহপাঠিনী ছিল।এরপরে আমি এম কম করে এই চাকরিতে ঢুকেছি।’
    ‘আচ্ছা।এই কথা।’
    ‘আপনার মেয়ে একবার আমাকে জানিয়েছিল ওর নাকি চাকরির প্রয়োজন।’
    ‘হ্যাঁ,কিন্তু আপনাদের মতো লোক আমাদের সাহায্য না করলে আমাদের আর কে চাকরি দেবে?’
    ‘আমি এক জায়গায় বলে দিয়েছি।দুই একদিনের মধ্যে মনে হয় অর্ডার হয়ে যাবে।বেশ বড় কোম্পানি।বেতন ও বেশ ভালো দেবে।ওকে বলে দেবেন যে আমি একথা বলেছি।’
    ‘আচ্ছা,আমি আপনার এই উপকার কোনোদিন ভুলব না।তবে আমাদের বংশে মেয়েরা চাকরি করে না।কিন্তু প্রতিদিন সংসারের খরচ সামলানো মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।আপনিই বলুন,এই ক্ষেত্রে আর কী করা যেতে পারে?আমার ভেতরে এক ধরনের ভয় কাজ করে যাচ্ছে কারণ আজ পর্যন্ত মেয়ে আমার মায়ের আঁচলের নিচে রয়েছে।ও কি অফিসে গিয়ে নিজের কাজকর্ম সামলে নিতে পারবে?পরিবারের আর্থিক অবস্থা দেখেই মেয়ে আমার চাকরি করতে চাইছে।‘বিশ্বনাথন একনাগাড়ে কথাগুলি বলে যায়।
    সমস্ত কিছু শান্তভাবে শুনে অডিটর বলেন,‘ঠিক আছে আপনি এখন যান,আমি কিছুক্ষণ পরে স্টেটমেন্টটা পাঠিয়ে দেব।’
    বিশ্বনাথন নিজের সিটে চলে যায়।একের পর এক সমস্ত ঘটনাগুলি তার মনে পড়ে যেতে থাকে।ফার্নিচারের দোকান তাকে চাকরির আশ্বাস দেয়,অফিসার তার প্রমোশনের কথা বলে,অডিটর তার মেয়েকে চাকরির ভরসা দেয়।এই সবই একজনকে অবাক করে দেবার পক্ষে যথেষ্ট।এই সবই সুখবর।সবাই উপকার করার আশ্বাস দিয়েছে,তবে সেটা বাস্তবে রূপায়িত হওয়াটা অবশ্য আলাদা।সবাই সুখবর দিয়ে স্বর্গসুখের আশ্বাস দেয়।কিন্ত সে অফিসার বা অডিটর যেই হোক না কেন,শুধু শুধু তার উপকার করতে যাবে কেন?তার দ্বারা তো কখন ও কারও উপকার হতে পারে না।এই অবস্থায় তার উপকার করায় যৌক্তিকতা কোথায়?এই জন্যই এই সমস্ত আশ্বাসন বিশ্বনাথনের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়না।
    টেবিলের উপরে একসঙ্গে অনেকগুলি ফাইল জমা পড়ে গেছে।বিশ্বনাথন নিজের কাজে ডুবে গেলেন।
    রাধা তাদের জানাল যে একটা বড় কোম্পানিতে সে চাকরি পেয়েছে।মা এবং ছোট বোন খুব খুশি হয়।কিন্তু বিশ্বনাথন চুপ করে থাকেন।
    ‘বাবা আমি যে চাকরিটা পেয়েছি,তার জন্য এম এ পাশ ছাত্র ছাত্রীরাও আবেদন করেছিল,কিন্তু আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকায় চাকরিটা আমি পেয়েছি।’
    ‘এম.কম ডিগ্রি থাকা ছাত্র ছাত্রীরা আবেদন করেছিল,তাহলে তুমি কীভাবে চাকরিটা পেলে?’সম্ভবত এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র আছে।’
    ‘এরকম কিছু কথা নেই বাবা।আসলে এই কাজের জন্য বি কম ডিগ্রিই যথেষ্ট।তাছাড়া এই কোম্পানিতে মাধবরাও আমাদের কোম্পানির ডাইরেক্টরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু,কোম্পানি তার কথাকে অবহেলা করতে পারেনি।এইজন্যই চাকরিটা আমি পেয়েছি।
    ‘আচ্ছা,এই কথা।মাধবরাও সুপারিশ করেছে,যিনি আমাদের কোম্পানির অডিটর।’
    ‘হ্যাঁ,বাবা,ইনিই।বলছিলেন যে আপনার সঙ্গেও নাকি কথা হয়েছে।’
          ‘তিনি কি ভালো লোক?’
    ‘ইনি একজন সত্যিকারের ভদ্রলোক,বাবা।’
    ‘কে জানে,আজকাল সবাইকে ভদ্রলোক বলে মনে হয়,আসলে কে কীরকম তা বাইরে থেকে কীভাবে বুঝতে পারব?
    রাধা চুপ করে থাকে।
    রাধা চাকরি পেয়ে প্রতিমাসে পাঁচশো টাকা করে পায়।বেতন পেয়েই রাধা সবার জন্য কাপড় কিনে নেয়।ছোট ভাই এবং ছোট বোনের জন্য বই,কলম,ইত্যাদি কিনে নিয়ে আসে।
    রাধা চাকরিতে ঢোকার পরে সংসারের অবস্থা অনেক ভালো হয়েছে।‘কিন্তু মেয়েকে আর কতদিন বসিয়ে রাখতে পারবে।সম্বন্ধ দেখতে থাকুন।চাকুরিজীবী মেয়েকে যে কেউ পণ ছাড়াই বিয়ে করতে রাজি হয়ে যাবে’,বিশ্বনাথনের স্ত্রী স্বামীকে বুঝিয়ে বলেন।
    ‘আমাদের ভাগ্নে আছে না রাম।ওরা রাজি হয়ে যাবে।ওদের আর্থিক অবস্থানও আমাদের মতোই।’
    ‘আমি প্রথমেই ওর কথা বলেছিলাম।কিন্তু আপনার মেয়ের মত নেই।’
    ‘তাহলে আমি বিষয়টা নিয়ে ভেবে দেখব।এই কথা বলে বিশ্বনাথন পোশাক বদলে শুয়ে পড়লেন।
    রাধা এবং মাধব রাওয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বেড়েই চলল। মাধব রাও যখন তখন রাধার সঙ্গে্ নিজের গাড়িতে সমুদ্রতটে চলে যায় এবং রাধাকে তার বাড়ির সামনে নামিয়ে দেয়।
    একদিন মাধব রাও রাধার কাছে বিয়ের প্রস্তাব রাখল।
    ‘আমার অনেক দায়িত্ব রয়েছে।আমাদের বাবা বুড়ো হয়ে পড়েছেন।প্রকৃ্তপক্ষে আমি যদি চাকরি না করি তাহলে আমাদের পরিবার চলা মুশকিল হয়ে যাবে।আমার ছোট ভাই ও বোনের পড়াশোনা বাকি আছে।আমার বিয়ের পরে আমি যদি শ্বশুর বাড়ি চলে যাই তাহলে আমাদের পরিবারটা কীভাবে চলবে?’রাধা জিজ্ঞেস করে।
    ‘এসব নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না,তোমার চাকরিও ছাড়তে হবে না।তুমি যা রোজগার কর তার পুরোটাই তোমার মা-বাবাকে দিয়ে দিও।তোমার বেতনের একটি পয়সাও আমার চাইনা।আমার রোজগার যথেষ্ট ভালো।তা দিয়েই আমাদের পরিবার খুব সুন্দরভাবে চলে যাবে।’মাধব রাও রাধাকে বুঝিয়ে বলল।
    ‘আপনি আমার মা-বাবার সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলে নিন।আমি তাদের বিরুদ্ধে কিছু করতে চাইনা।’
    ‘ভালো কথা।আগামীকাল তোমার মা-বাবার সঙ্গে নিজে কথা বলব।’মাধব রাও রাধাকে বলল।
    মাধব সুন্দর,সুশিক্ষিত এবং সম্পন্ন পরিবারের যুবক।বেশ ভালো চাকরি করে।এই ধরনের ছেলে,যে লক্ষ টাকা পণ পেতে পারে,তার মেয়ের সঙ্গে বিয়েতে কীভাবে রাজি হয়ে যাচ্ছে,এই কথাটাই বিশ্বনাথন কিছুতেই বুঝতে পারছে না।
    ‘আমি ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারছি না।’
    ‘এটা বলুন,আমাদের মেয়েই বা কম কীসে?’বিশ্বনাথনকে স্ত্রী জিজ্ঞেস করল।
    ‘আরে,কথাটা তা নয়,বিনা পণে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে।যদি ভেতরের কোনো ব্যাপার না থাকে তাহলে আমাদের গরিবের পরিবারে বিয়ে করতে রাজিই বা হবে কেন?আমার কেমন যেন আশঙ্কা হচ্ছে।’ বিশ্বনাথন বললেন।
    ‘সম্ভবত মেয়ে পছন্দ হয়ে গেছে।’
    ‘আরে পাগলি,মেয়ে পছন্দ হলেই বা পণের টাকা কে ছেড়ে দেয়।ভালো চাকরি বাকরি করে,ধনী পরিবারের ছেলে।কেবল দয়া করে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে,এটা খুবই আশ্চর্যের বিষয়।’
    ‘কে জানে?’
    ‘এছাড়া আরও একটি কথা হল আমাদের পরিবারের সঙ্গে ওদের অনেক পার্থক্য রয়েছে।ওদের সঙ্গে আমরা কীভাবে নিজেদের তুলনা করতে পারি।গরিব পরিবারের মেয়ে ভেবে তারা কি আমাদের মেয়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে না?’
    এর মধ্যে পাশের ঘর থেকে রাধা এসে হাজির হল।
    ‘বাবা আমি আপনার মন থেকে এই সমস্ত ভয় দূর করতে পারব না,কিন্তু একটা কথা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি মাধব রাও এবং তার সংস্কারের ওপর আমার পরিপূর্ণ আস্থা রয়েছে।বাবা,আপনিই বলুন ভবিষ্যতের ভয়ে আমরা বর্তমানে কোনো কাজ না করে কীভাবে বসে থাকতে পারি?’
    ‘শুনুন,মেয়ের যদি এই সম্বন্ধে কোনো রকম দুশ্চিন্তা না থাকে তাহলে আপনি অনর্থক ইতস্তত করছেন কেন?’বিশ্বনাথনের পত্নী স্বামীকে বললেন।
    ‘মা,এই সম্বন্ধের জন্য আমাদের পরিবারকে কোনোরকম কষ্ট পেতে হবে না।আমি প্রতিমাসে তোমার হাতে চারশো টাকা দেব।পাঁচ-দশ টাকার জন্য যেন ওর কাছে হাত পাততে না হয়,সে কথা ভেবে আমি একশো টাকা রেখে দেব।এই কথাটা আমি স্পষ্টভাবে ওকে জানিয়ে দিয়েছি।’
    ‘রাধা তুই আমাদের ছেলে এবং মেয়ে দুই-ই।তুই নিজের পছন্দ মতো পাত্রকে বিয়ে করে নে।’রাধার মা মেয়েকে অনুমতি দিয়ে দেয়।
    ‘কিন্তু ও কি বিয়ের পরে আমাদের পরিবারে টাকা দিয়ে সাহায্য করতে অনুমতি দেবে,এ ব্যাপারে আমার সংশয় রয়েছে।’বিশ্বনাথন আশঙ্কা ব্যক্ত করে।
    ‘আপনার সংশয় আর আশঙ্কার কোনো সীমা আছে কি?আপনি নিজে ছেলের খোঁজ করে রাধার বিয়ে দিতে পারবেন?এই ছোট ছোট ছেলেমেয়ের আপনি পড়াশোনা করাতে পারবেন?আমার মনেও এইসব নিয়ে অনেক সংশয় রয়েছে।সেইজন্য এখন আপনি আপনার শঙ্কার ওপর রাশ টানুন।’রাধার মা বলল।
--------
     
    লেখক পরিচিতি-বোম্মিরেড্ডি পল্লী অন্ধ্রপ্রদেশের একজন সুপরিচিত সাহিত্যিক।তাঁর লেখা গল্প ‘দোগলশারু জাগ্রত’(চুরি থেকে সাব্ধান)অখিল ভারতীয় গল্প প্রতিযোগিতায় পুরস্কৃত হয়।‘কল্লু-কয়লু’(স্বপ্ন এবং ক্তহা)লেখকের অন্যতম গল্প সংকলন। লেখকের গল্প মানব হৃদয়কে সহজেই স্পর্শ করে যায়।সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনাকে কেন্দ্র করে গল্পগুলির বিষয়বস্তু গড়ে উঠেছে।গল্পটি ‘ভারতীয় শ্রেষ্ঠ কহানিয়াঁ’র অন্তর্গত হিন্দি অনুবাদ থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। 
 
  

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন