শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

কিন্নর রায় । পারক গল্পপত্র


অন্ধকারের ভিতর আরো একটা অন্ধকার থাকে। বাষট্টির তিমির, তিমির কান্তি দাস বুঝতে পারেনি খুব ভোরে আলোর ভিতর একটা আলোও থাকে। অন্ধকার এবং আলোর এই কাটাকুটি দেখতে দেখতে কখনো কখনো সে পৌঁছে যায় তার বাল্যকাল, শৈশব, কৈশোর, যৌবন বেলায়। যখন পাখিরা তাদের ঠোঁটে করে নিয়ে আসে নির্নিমেষ অন্ধকার অথবা আলোর কোনো পরিযায়ী দরবারির জানালা, তিমির একা একা নিঃসঙ্গ গভীর গোপন অসুখের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে আবিষ্কার করে পৃথিবীর চতুর্দিকে এখন প্রবল করোনাবেলা। তার বাড়িটা, বাড়ি না বলে ফ্ল্যাট বলাই ভালো সেটাও যেন একটা কোয়ারেন্টাইনে---- একক, নির্জন বাস।

তিমির একাই থাকে, তার বিবাহবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সহজীবনের মানুষটি চলে গেছে আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে। জীবনানন্দের সেই অতি চর্চিত লাইন,
'জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার ' তিমিরের মনে থাকে না, কারণ সে তো আর কবিতা পড়ে না।  কিন্তু তিমিরের ফ্ল্যাটের বাতাস কখনো কখনো এসব লাইনগুলো শোনাতে চায় তিমিরকে। সকালে ঘুম থেকে উঠে একটু  হালকা এক্সাসাইজ, তারপর চুপ করে খবরের কাগজ, দুঃসংবাদ ইত্যাদির  অপেক্ষা করা। সমস্ত পৃথিবীর গভীর করোনাবেলায় ---- কোভিড নাইন্টিন বা করোনা ভাইরাস পৃথিবীকে খেয়ে ফেলার জায়গায় নিয়ে গেছে।  ব্যতিক্রম কেউ নেই ---- চীন, আমেরিকা, ইটালি, ফ্র্যান্স,ইংল্যান্ড, জাপান, জার্মানি, কানাডা, ইরাক প্রায় সব দেশই প্রবলভাবে করোনামারিতে আক্রান্ত। তিমির জানে না এই করোনা ভাইরাস কবে পৃথিবী থেকে হাত গুটোবে কিংবা আদ্য গুটোবে কি না। সে অতীতে নানা রকম মারি আক্রমণের কথা শুনেছে। কোনোটার নাম স্প্যানিস ফ্লু, কোনোটার নাম এশিয়াটিক কলেরা, কোনোটার নাম বুরবনিক প্লেগ। পরে পরে ইবোলা, সার্স, অ্যানথ্রাক্স সহ সমস্ত মারি আক্রান্ত দেশ, পৃথিবীর কথা তিমিরের জানা আছে খবরের কাগজ এবং টিভি পড়তে পড়তে। ইদানিং আর টিভি দেখতে ভালো লাগে না। ----- এই টিভি শো গুলোকে অধিকাংশই  সার্কাস মনে হয় তিমিরের কাছে।

তার বন্ধু সুশান্ত মাঝে মাঝে মোবাইলে ফোন করে জানতে চায় তিমির ঠিক কেমন আছে। তিমির তখন তার বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালবাওয়া টিকটিকিটার দিকে তাকায়। সেই টিকটিকি একটি পোকার প্রত্যাশা করে। শিকার, শিকার ---- তিমির কি টিকটিকি না পোকা? না-কি সে টিউবলাইট ----যাকে ঘিরে অজস্র আলো পোকাদল এবং একটি ডাইনোসরের বংশধর কখনো কখনো ঘুরে বেড়ায়। করোনাবেলায় টিকটিকির কোনো সমস্যা নেই। সে দিব্যি আছে। খাচ্ছেদাচ্ছে। নাদুস হচ্ছে।

দক্ষিণের জানলা খুলে দিলে তিমির এখন দেখে এই কোয়ারান্টাইন বেলায় কোলকাতার আকাশ আশ্চর্য পরিচ্ছন্ন হয়ে গেছে। দশতলার উপর তার ফ্ল্যাটের জানলায় কখনো কখনো হয়তো বা উড়ে আসে সিন্থেটিক প্রজাপতি। সেই প্রজাপতির ডানার রং, বাষট্টি ছোঁয়া তিমিরের গালে একটু একটু করে লেগে যায়। সকালে একটা মৃত্যু ছিল, দুপুরে অনেকগুলো মৃত্যু, রাত্রে মৃত্যুর হাহাকার যাপন! তবু তিমির জীবনের রঙিন যাত্রায়, ধূসরিমা তাড়িয়ে ভাবে পৃথিবী থেকে আমি খসে গেলেই কী বা এমন ক্ষতি হবে? আমার মতোন মানুষ যার কেউ নেই, কোনো ঠিকানা নেই, ব্যাঙ্কে কিছু জমানো টাকা আছে, অফিসের পেনশন আছে, খানিকটা নিশ্চিন্ত, নিরুপদ্রব, নিরুদ্বেগের জীবন সে মরে গেলে পৃথিবীর কারুর কিছু ক্ষতি হবে না। তবু যখন দশতলার ফ্ল্যাটে হঠাৎ হঠাৎ সেই মায়া-প্রজাপতি তার সিন্থেটিক ডানার রং ছড়াতে ছড়াতে একটি রং কোম্পানির আস্ত বিজ্ঞাপন হয়ে যায়, তখন তিমির বুঝতে পারে কোলকাতার এত উঁচুতে প্রজাপতি আসা সম্ভব নয়। এমনকি লকডাউন হওয়ার পর পৃথিবী খানিকটা দূষণ-মুক্ত, পরিশুদ্ধ হয়ে গেলে যখন বলা হচ্ছে ভেনিসে নাকি নেমে এসেছে বুনো হাঁসেরা, হাতিরা নেমে এসেছে অনেক দূরে, ময়ূর দেখা যাচ্ছে ব্যারাকপুরে, কিন্তু তিমির কোনো কিছুই দেখতে পায় না। ওই প্রজাপতির হলুদ রং, লাল রং, কালো রং তার গালে অবলীলায় মেখে যেতে থাকে।

তিমির ঠিক করেছে সে এবার ভালোবাসবে, সে এবার প্রেমে পড়বে।  কিন্তু প্রেমে পড়বে ভাবলেই তো প্রেমে পড়া যায় না। তার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বউয়ের কথাও কখনো কখনো তার মনে পড়ে। সে এক অদ্ভুত টানাপোড়েনে থাকে এবং এক গভীর রজনীতে যখন পৃথিবী ঘুমোয় তখন দশতলার ফ্ল্যাটে একা ফোর-জি মোবাইল হাতে তিমির আর তার না পোষা টিকটিকিটি জেগে থাকে।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন