শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

গোবিন্দ তালুকদার। পারক গল্পপত্র


রাতে ঘরে এসে শোবার পরে করুণা তার স্বামীকে  বলছে -- কি গো,  ঘুমাই গেনেন! শুতেই ভোঁস ভোঁস করে ঘুমাই যাছেন! দুডা মনের কথা তো কহা নাগে। মোর কী হাউস হয় না দুডা কথা কই! তা নয়,  ভঁইসের মতোন ঘুম!  কী কপাল করে যে সংসারোত্ আসিনু হায়! ভালো নাগে না বাপু!  দিনমান খাটিমু সংসারোত্, আর এ্যানা মোনের কথা  শুনিবে এমোন বান্ধবও নাই!

দিনরাত জমিত্  কাম করে করে উদয় মন্ডল হয়রান। ক্লান্তিতে বিরক্তির সুর গলায়। ফ্যাচ্ ফ্যাচ্ না করে ঘুমে পড়ো। চারদিকে লকডাউন, আর আইতের বেলা গপ্পো!  তুমিও পারো মাইরি।
  ঠ্যাস মেরে বৌকে বললো ---
আইত হইছে,  ভোরবেলা উঠপা হবে,  কি কছেন কও।  তোমার কথা কি শ্যাষ হয় না গো!  করুণা বলতে লাগে ওর দুঃখের কথা। মনের জ্বালা। চোখে জল।  কান্নাভেজানো কন্ঠে বলে চলে ওর স্বামীদেবতাকে।
---- কাঁদিচ্ছ ক্যান!  এ্যাঁ। কোন জ্বালাত্ পড়নু রে বাপু!  কও, কও দিনি কি কবার চাছিন!  খুলে কও।
এবারে  করুণা বুকে সাহস নিয়ে বললো, হ্যাঁ গো,  মোর নামটা পাল্টানা  য্যাবেনা?
---- হঠাৎ!  নাম বদলাতে হবে!  ক্যা,  কী হছে!
----- গাঁয়ের সব ম্যানষে মোর নাম  নিয়ে মজাক করোছে।  ঘাটোত চান করবার গেলে,  বাসন মাজা ধোয়াপাকলার কামোত্  গেলেই কহে মুই নাকি করোনা! মোক দেখেই নাকি মুখত্ গোমাইয়ের নাগান মুখোশ পরছে ভয়ে।  করোনা করোনা কয়ে এ ওর গায়োত্ উল্টে পড়ে, কী ঢলাঢলি বাপরে বাপ। মোক শরম নাগে খুবই। খিলখিল করে হাসপার ধরে। এ্যানাও ভালো নাগে না গো ওমার বেবোহার।  তাই ভাবিছি মোর  নামটাই প্যাল্টে দিমু।  তখন কি কবু কোস।
এবারে উদয় ওর বৌএর কথায় না হেসে থাকতে পারলো না। বললো,  তোমহার নাম করুণা।  তো করুণার মানে বোঝো।  আর গাঁয়ের বৌগুলান বুঝপার পারে!  করুণা মানে হছে দয়া।  ওমাক বুঝায় কোহো। শুনলে সবার মুখ ভেল্টে যাবে হিনি!  ইয়ার্কি মারবার নাগিছে!  বাটাম সাইজ করে দিমু, কয়ে দিও।
---- না গো না।  এ্যানা বুঝপার চেষ্টা করো।  তুমি তো ঠিকই কহিছেন।  মুইও শুনিনু। কিন্তু ওই পাড়ার বৌগুলানের জ্ঞান হবার নয়। তুমি একটা বেবোস্থা করে মোর মানইজ্জত বাঁচাও  সুন্দরের বাপ!
আচ্ছা,  উকিলের গোরত্ গেলে নাকি এপিঠওপিঠ না কি যে কয় বুঝিনা বাপু,  ওডা  করলেই নাকি নাম প্যাল্টে দেওয়া যায়। কাল উকিল মোক্তারোক ধরে দেখোনা গো।  তোমাকই তো কমু।  তোমার পাও ধরে কছি মোক তুমি বাঁচাও।  মোক কত্তো ভালোবাসেন তুমি। এই কামডা তুমি করে দাও, তুমি যা কমিন সব মানি নিমু সুন্দরের বাপ!
---- আচ্ছা,  ঘুমাও তো।  দেখমু,  কথা দিনু।
করুণা স্বামীকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করলো।  উদয় কলো, মোক ছুঁয়োনা।  হায় বাপ। সরকার মানা করিছে।  তাও তো বিছনাত্ একজাগাতই শুতি থাকি।  সরকার তো আর দেখোছে না!  নোক করে থাকি।  শুনিছো! সেদিন পাড়ার ভবসিন্ধু ডাক্তার তো কছোলো,  কীরে উদয়,  একসাথে বৌওক নিয়ে শুতিস?  মুই মিছামিছি উত্তর দিনু,  পাগোল হইছেন ডাক্তারবাবু,  করোনা থাকি বাঁচপার তনে বেবস্থা তো নিছি।  ঘর কম তো।  এ্যাটাই হামার ঘর। নিরুপায় মুই। মুই চোকিত থাকি,  আর বৌ নিচে ম্যাঝাত আলাদা  বিছনা কোরে শোতে।  ছাওয়ালটা থাকে ওর কত্তামা'র গোরত্ আর একটা ঘরোত্।  গরুর গোয়াল।  বারান্দাত্ রাঁধাবাড়া।
ডাক্তার কহিছে,  সাবধান থাকিস বাপু!
মিলামিশা করবু না কোল এখুন!  খুব সাবধান উদয়!  সতর্ক থাকিস কোল।
উদয় মনে মনে বিস্তর হাসলো।  এমনি কী আর কয়,  মহিলা মানে কি কহিলা! কোটে করুণা,  আর কোটে করোনা!  বৌটার মনোত্ ভয় স্যান্ধাছে। মনটা খারাপ নাগপার  ধরলো।
বৌওক্ স্বান্তনা দিয়ে ক'লো,  ঘুমাও,  সকালবেলা এডা বেবস্থা করা যাবে হিনি। চিন্তা করো না।  বুঝনিন।
করুণা খুশি হয়ে বললো --- হুঁ.... ঘুমাও।  বলেই পাশ ফিরে শুলো।


পরদিন গোয়াল থেকে গরুবাছুর বের করে মাঠে বেঁধে খড়ভুঁষি দিলো। বেলা হলে একটু পেঁয়াজ পান্তা খেয়ে কোর্টের দিকে রওনা হলো।  ওমা!  কোর্ট তো বন্ধ!
রাস্তার  মোড়ে দেখা উকিল কল্যাণ দত্তের সাথে।  সব ঘটনা,  বৌয়ের আব্দার চিন্তা সব খুলে বলেই ফেললো।

কল্যাণবাবু একচোট হাসলেন।  মজাও করলেন।  বুঝিয়ে বললেন,  এভিডেভিড করা যেতেই পারে।  খর্চাপাতিও এমন কিছু নয়।  তবে তোমার শ্বশুর শাশুড়ি তাদের আদরের মেয়ের নাম ভালোবেসে রেখেছে করুণা!  নাম পাল্টালে তাকে তো
কেউ চিনবে না ভাই! তুমিও ভুল করবে।  বরং বৌকে বুঝিয়ে বলো ও নতুন একটা নাম রাখো।  আদর করে ডেকো।  খুশিই  হবে নতুন নামে। ফালতু টাকা খরচ করবার  কী দরকার!

উদয়ের মাথায় ব্যাপারটা ঢুকলো এবার।  ঠিকই তো। মোর বৌয়ের নাম করুণা।  মানে দয়া মায়া!  আহা!  আর ম্যানষে ক্ষেপায় করোনা কয়ে!  ইয়ার্কি!  কোটে করুণা,  ব্যাঙ্গো করে করোনা কছে! নেখাপড়া জানলে তো হোবে!  ইয়ার্কি মারবারও একটা নিমিট আছে।  এগলার কোনো মানে হয়!

বাড়ি এসে  বৌকে ডাক দিলো --- শুনবার পানিন !  ভাত দাও।  খ্যায়েদ্যায়ে ভালো খবর কমু তোমাক।  হাসতে লাগলো উদয়। বৌ চমকে উঠে ক'লো --  তাই! ওমা,  মাইরি!  স্যাঁচা কছেন সুন্দরের বাপ!


দুপুরের খাওয়াদাওয়া শেষে ঘরে গিয়ে বৌকে বললো --- তোমহার নতুন নাম উকিলবাবু ঠিক করিছে।  আজ থ্যাকে তোমার নাম হলো, সোনা।
ওরে মোর সোনা বৌ। খুশি হইছো তো!
বৌ খুশিতে ডগমগ হয়ে উদয়কে জড়িয়ে ধরে চকাস্ করে চুমু খেলো।
হায় বাপ! চুমা খানিন! খ্যায়ো না। সাবধান থাকবা হবে। সরকার মানা করে দিছে।  দূরত্ থাকপা হবে  সোনা।
---- ওমা! আজ থিনি মোক সোনা বলে ডাকমিন?  মুই তোমহার সোহাগের সোনাআ...আ..... কি মজা।  আজ থ্যাকে মুই হনু তোমহার  আদোরের সোনা.....

                  

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন