শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

আখ্যানে উত্তরবঙ্গের জনজাতি : সুজয় চক্রবর্তী। পারক গল্পপত্র


শরৎ আমার বন্ধু। গত বছর আলিপুরদুয়ারে একটা সার্ভে করতে গিয়েছিল ওরা। ওরা বলতে ও আর ওর দুজন কলিগ। ফিরে এসে আমাকে একটা গল্প বলেছিল সে। গল্পটা এই ------

তোর্সা নদীর পশ্চিম দিকের যে গ্রাম তার নাম টোটো পাড়া। ভুট্টা, সুপারি আর কমলালেবুর বাগানের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে এবড়োখেবড়ো সরু পাথুরে রাস্তা। পাহাড়, নদী ও জঙ্গলে ঘেরা এক শান্ত ও কোলাহলহীন পরিবেশ । এখানকার মানুষের আগে দিন চলতো বাঁশের তৈরি বেত আর ঝুড়ি বিক্রি করে । এখন কেউ কেউ সরকারি বা বেসরকারি চাকরিও করছে। চাষবাস বলতে একটা সময় তারা শুধু কাউনের চাষটাই জানতো। এখন অল্পস্বল্প ধান চাষও করতে পারে।  স্বাচ্ছন্দ্যে না থাকলেও কিছুটা হলেও এখন আধুনিকতার ছোঁওয়া লেগেছে তাদের গায়েও। পুরুষরা প্যান্ট-শার্ট,  মহিলারা শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, সবই পড়ছে।

তো এই টোটো পাড়ারই গলি-মহল্লায় বেড়ে ওঠা সুঠাম চেহারার অধিকারী তরুণ-যুবক বুধাই, মাতিয়াস টোটোর ছোট ছেলে। ছোটো থেকেই সে খুব ডানপিটে স্বভাবের। সাঁতরে নদী পার হওয়া থেকে শুরু করে তরতরিয়ে গাছে ওঠা তার কাছে মনে হয় জলভাত। কিন্তু একেবারেই ছন্নছাড়া সে নয়। মানুষের বিপদেআপদে তাকে ডাকলেই পাওয়া যায়। অসহায়ের প্রতি দরদ আছে তার। একথা পড়শিরাও বলে। আর একবার সে যে কাজটা করবে বলে মনে করে, সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত  থামে না, সবাই জানে তা। তাই বুধাই যে 'এই কাজ'টারও শেষ দেখে ছাড়বে, তা সনে, সেতাপারা সেদিনই টের পেলো ওর কথা শুনে।

'এই কাজ' বলতে নিজেদের মাতৃভাষার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার 'লড়াই' । এই সেদিন, ঝম করে ইউনেস্কো বিপন্ন ভাষার তকমা দিয়ে দিলো টোটো ভাষাকে!  খবরটা প্রকাশ পেলো যে সংবাদ মাধ্যমে, তারই হকারি করে গ্যালিল। সেই-ই প্রথম ছড়ালো খবরটা। গোটা গ্রাম জানলো। আর তারপর থেকেই খুব মুষড়ে পড়েছিলো বুধাই । এভাবে কি পৃথিবীর ভাষার মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাবে এত পুরনো একটা ভাষা! একটা ইতিহাস! বেশ ভাবিয়েছিলো বিষয়টা। এই সভ্যতা, এই সংস্কৃতি, এই ভাষা তো তার 'মা'! তাই মা'র অস্তিত্বই যখন সংকটে, তখন সে চুপ করে বসে থাকে কি করে?

'মাতৃভাষা মায়ের সমান, বুঝলি? তাই তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায় আমাদেরই।' -----  বুধাইয়ের এই ভাবনা প্রভাবিত করলো বাকি বন্ধুদেরও। সনে, সেতাপা, বিমলরাও সায় দিলো বুধাইয়ের কথায় । বিদ্যালয় জীবন শেষে এখন তাদের কারও কারও ঠিকানা বীরপাড়া বা আলিপুরদুয়ার কলেজ। কেউ বা আছে টেকনিক্যাল লাইনে।

ব্যস্, ভাবনা যখন এক, জড়ো হয়ে গেলো সবাই। তবে একটা লুপ্তপ্রায় ভাষাকে টিকিয়ে রাখা তো আর মুখের কথা নয়! রীতিমতো চ্যালেঞ্জই। শুরু হল যেন 'কোর কমিটি'র মিটিং! নির্দিষ্ট স্থান নেই। আজ গোয়াতি নদীর ধারে তো কাল উঁচু টিলায় বসে চলতে থাকলো মাতৃভাষা সংকট নিয়ে তাদের আলাপ-আলোচনা, ভবিষ্যৎ  পরিকল্পনা।

কিন্তু বিমলদের এই 'হুজুগ' আর গতিপ্রকৃতি দেখে বিমলের বাবা সোমরা টোটো একদিন বলে বসলেন, 'যে ভাষা কোথাও কোনও কাজে লাগে না, শুধু জন্মপরিচয়ে তা বয়ে বেড়ানো কি খুব প্রয়োজন?' বুধাইয়ের ভালো লাগলো না তারঁ কথাটা। তারা যে ভাষার মৃত্যু চায় না! তাকে আগলে রাখতে চায় দুহাত দিয়ে!
----- আমরা আমাদের ভাষার জন্য জীবন বাজি রাখতে রাজি আছি। দেখে নেবেন, আমরা জিতবই।
মুখের উপর বলে দিয়েছিলো বুধাই। পাশে বিমল তখন চুপ। সায় তো তারও আছে! একটা '২১ ফেব্রুয়ারি' বা একটা ' ১৯ মে ' র জন্য যদি মানুষ জান দিতে পারে, সেখানে তারা তো আর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না। একটা চেষ্টা তো করতে হবে!

শুধু মাথায় আছে ভাষাকে বাঁচাতে হবে। কিন্তু কোন পথে হবে সেই সংগ্রাম, জানে না বুধাই। সংগ্রামে হাতিয়ার লাগে, অস্ত্র লাগে। পাইক-বরকন্দাজ লাগে। সেসব কিছুই নেই তার। তার অস্ত্র শুধু গান!
ছোট থেকেই গান বাজনার প্রতি দারুণ ঝোঁক ছিল বুধাইয়ের। মিষ্টি গলা। তালিমের কোনও ব্যাপার নেই। সবটাই শুনে শুনে। প্রকৃতি যেন সেই ছোট থেকেই ওর গলায় সুর ঢেলে দিয়েছে৷ আর তাই গানকেই শেষে আশ্রয় করে বসলো সে! ওর দেখাদেখি সঙ্গে গলা মেলালো সনে, বিমল, রাজেশরাও।

টোটোদের রূপকথায় গান, ছড়া আগেও ছিল। ধর্মীয় গান ছাড়া সামাজিক কিছু গান ছিল অবসর বিনোদনের জন্য।  এখনও আছে। কিন্তু সেই গানে আধুনিকতার মোড়ক দিল বুধাই, সনেরা। গান গেয়ে, গান লিখে।

সেতাপা খোল বাজায় খুব ভালো ৷ সনে গান লেখে টোটো ভাষায়। সুর দেয় বুধাই। গলা মেলায় বিমলরা। প্রথম দিকে কয়েকটা ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বুধাইরা নেচে, গেয়ে গ্রাম চষে বেড়ালো ৷ মাতিয়ে দিলো গ্রামের ছেলেবুড়োদের। একদিন তো এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় দেখা গেল, বুধাইয়ের বাঁধা গান আর টোটো ছেলেমেয়েদের নাচে জমজমাট আসর বসেছে মহল্লায়। পুরনো গানের মাঝেই সবার নজর তখন নতুনের দিকে । ওদের গান শুনে মানুষ শুধু অবাকই হল না, বুধাইদের যাত্রাপথে তারাও যে সঙ্গে আছে, বুঝিয়ে দিলো ভিড় করে, হাততালি দিয়ে। চটুল হিন্দি গান সরিয়ে মানুষ আপন করে নিলো বুধাইদের গানকে।

সবাই জোটবদ্ধ হয়েছে । পৃথিবীর কোনও অশুভ শক্তিই আর তাদের মুছে দিতে পারবে না। এই জোটবদ্ধ জীবন তাদের বাপ-ঠাকুর্দার আমলেও কেউ দেখেনি। মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে বুধাই সবাইকে আজ এক ছাদের তলায় আনতে পেরেছে। আড়ালে তাই কেউ কেউ বলছে, এই 'দম'টা কেবল বুধাইয়েরই আছে !
দিনকয়েকের মধ্যেই বিভিন্ন মহল্লা থেকে ডাক পেতে লাগলো ওরা৷ বসলো  নাচগানের আসর ৷ একসঙ্গে সবাই গলা মেলালো৷ গানের সুরে হলেও অন্তত ভাষাটা যে উচ্চারিত হচ্ছে, এতেই উৎসাহ পায় বুধাই। এটাই বড়ো ব্যাপার! অন্তত গানেই বেঁচে থাকুক না তাদের আদরের  ভাষা! মায়ের ভাষা৷ এই গানেই মানুষ তাঁদের সঙ্গে হাতে হাত রাখুক--- এটাই ইচ্ছে বুধাইদের। শুধু মহল্লাগুলোতেই না, বাইরে থেকেও ডাক আসতে লাগলো তাদের। দুটো বকশিসও মিলছে এখন ।

টোটো পাড়ার আকাশে যে মেঘ জমে কালো হয়েছিলো এই সেদিন পর্যন্ত,  বুধাইয়ের কল্যাণে এখন ফর্সা হয়েছে সব। তাদের ভাষা যে এখনও মরেনি, এটা  জেনেই খুশি সবাই। মানুষকে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতাটা সবার মধ্যে থাকে না, যেটা বুধাইয়ের মধ্যে আছে। আর এটা ছিল বলেই তাদের ভাষা, সংস্কৃতি আজ জীবন্ত। একথা স্বীকার করেছে সোমরা টোটোও।

এই মিশুকে স্বভাবের জন্যই বুধাইকে বড়ো ভালো লাগতো বিমলীর। সেই স্কুলে পড়ার সময় থেকে। কবে যে সেই 'ভালোলাগা'টা ধীরে ধীরে ভালোবাসায় রূপ বদলালো, মনে পড়ে না তার। বিপুল টোটো'র ছোট মেয়ে বিমলী। মহল্লায় এক গানের আসরে একদিন সে কথা জানিয়ে দিলো বুধাইকে! আচমকাই। তারপর লজ্জায় মুখ ঢেকে সেখান থেকে সরে পড়েছিল।

থ' হয়ে গিয়েছিলো বুধাই। সোজা পিছু নিয়ে ধরে ফেলেছিলো ওকে। চোখে চোখ রেখে বলেছিল, 'সত্যিই কি তাই! ভালোবাসো?'
------ ভালোবাসা সত্যিই হয়, মিথ্যে হয় না। 'মিথ্যে ভালোবাসা' বলে কিছু আছে না-কি?
------ জানি না। থাকতে পারে৷ তবে ...
------ তবে কী?
------ এতদিন কেন বলোনি?
------ বলেছি তো! সব কথা কথায় বলতে নেই। কিছু জিনিস ইশারাতেও ধরা দেয়। তুমি একটা বুদ্ধু, ইশারা বোঝোনি।

বিমলীর মুখে 'বুদ্ধু' কথাটা শুনে মাথা চুলকাতে লাগলো বুধাই। কেমন যেন সব গুলিয়ে গেল। একটা আরামও পেল। কথার আরাম। তারপর হাসি হাসি মুখ নিয়ে বললো, 'আমারও যে তোমার মতো হয়, বিমলী। তোমাকে যে বড়ো ভালো লাগে আমারও। এখন বাড়িতে কী বলে, কে জানে।'

গ্রামের হাইস্কুল থেকে 'পাশ' দিয়ে বিমলী এখন কলেজে পড়ে। শুধু তার বাড়িই বা কেন, পুরো টোটো পাড়াতেই কলেজেপড়া  ছেলেমেয়ে হাতে গোনা। পড়াশোনায় বরাবরই সে ভালো। স্কুলের পরীক্ষাগুলোতে দিব্যি তাক লাগিয়ে দিয়েছিল 'মাস্টর'দের! বিমলী ফর্সা। তার স্বাস্থ্য ভালো। চেহারাতেও একটা লাবন্য আছে। তাকে দেখে অপছন্দ করবে, টোটো পাড়ায় কে আছে? বুধাইও পারেনি। কিন্তু তাদের চেয়ে আর্থিক অবস্থা ভালো বিমলীদের। বিপুল টোটো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কেরানি। বুধাইয়ের বাবা এখনও বাড়িতে বেতের ঝুড়ি তৈরির কাজ করে। তাই একটু 'কিন্তু' ছিলো প্রথমে । একদম সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত বুধাইদের বাড়ির পরিবেশ দেখলেই বোঝা যায় বিমলীদের সঙ্গে তাদের ফারাকটা ঠিক কোথায়! উঁচু মাচার উপর বাশঁ, কাঠ পাতা দিয়ে তৈরি বুধাইদের ঘরদুটো। একদম সাধারণ। টোটো পাড়ার গার্হস্থ্য জীবনের চিহ্ন বহন করে চলেছে বুধাইদের বাড়িটা। প্রায় সময় মাচার নিচে খেলা করে বেড়ায় হাঁস-মুরগীর বাচ্চা। ঝোপজঙ্গলে ঘিরে রেখেছে বাড়িটা। একটা সময় এসব সাফসুতরো হতো, যখন বুধাইয়ের মা বেঁচে ছিল। একা হাতে সবকিছু সামলে নিত করালী, মাতিয়াসের বউ। ঘনঘন কাশি আর তার সঙ্গে রক্ত পড়া এই ছিল তার রোগ। ঝাড়ফুঁক, তুকতাক যখন ফেল, তখন তাকে নিয়ে যাওয়া হল ডাক্তারের কাছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। রোগটা ধরা পড়লো তখন, টিবি। যখন জানা গেল ততদিনে ভেতরে জাল বিস্তার করে ফেলেছে অসুখটা। প্রতিরোধের সময় দেয়নি। টপ করে মারা গেলো। মা যা যা ভালোবাসতো, অনেক কষ্ট করে তাই তাই যোগাড় করেছিল বুধাই। কবরে মৃতদেহের সঙ্গে সব দিয়েছিল।

বুধাই আর বিমলীর ব্যাপারটা ছড়িয়ে পড়লো মুখে মুখে। দুজনেই প্রাপ্তবয়স্ক।তাই বিমলীদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে হাজির হল বুধাইয়ের বাবা। বিপুল টোটো মাতিয়াসের প্রস্তাবের জন্যই যেন অপেক্ষা করছিলো। রাজি হয়ে গেল। শুরু হল আনন্দ উৎসবের আয়োজন। এরপর নিয়মানুযায়ী একসঙ্গে থাকতে লাগলো ওরা, বুধাই আর বিমলী। নতুন ঘরও  বাঁধলো গ্রামে ।

দেখতে দেখতে বছর ঘুরলো। কিন্তু মাতৃত্বের পরীক্ষায় ফেল করে গেলো বিমলী! বেশ কয়েকবারের চেষ্টাতেও মা হতে পারলো না সে। এতে অবাক হল বুধাই। অবাক হল ওর বাড়ির লোকও!
তারপর নিয়মকরে জড়িবুটি, তুকতাক শুরু হল বিমলীর। কিন্তু কোনও ডাক্তার-বদ্যির নাম করলো না কেউ । সে রেওয়াজও যে নেই। ফলতঃ মাটি উর্বর না, চাষের উপযোগী না, এই জাতীয় ধারণা মরমে গেঁথে গেল বাড়ির লোকের।  এমনকি বুধাইয়ের মনেও!

বাড়ির আশেপাশে চলতে লাগলো না না গুঞ্জন, ফিসফাস। 'সন্তান জন্মদানে তুমি অক্ষম। তাই তুমি বিয়ের উপযোগী নও।' এই কথাই যেন শুনতে পেলো বিমলী। তাই আর দেরি না করে বুধাই নিজে এসে বিমলীকে বাপের বাড়ি রেখে দিয়ে গেল! বিমলী কোনও প্রতিবাদ করলো না। তাদের সমাজের নিয়মই তো এই ! সন্তান যার হবে না, তার তো বিয়ে দেওয়া মানায় না! শুধু চলে যাওয়ার সময় বিমলী বুধাইকে বললো, ' একটা কথা বলবো?'
----- বলো।
-----  একটা বছর তো কাছাকাছি ছিলাম..... এতটুকুও কষ্ট হবে না! "
কথাটা শোনামাত্র মুহূর্তে মাথাটা নীচু করে ফেললো বুধাই। মুখটা কালো হয়ে গেল তার। যত দিন কাছে ছিল বুধাইয়ের চোখে কখনও জল দেখেনি বিমলী। আজ যেন বুধাইয়ের চোখটা একটু ছলছল করতে দেখলো ও।

বুধাইয়ের বাবা মাতিয়াস কঠিন মনের মানুষ। অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন সামাজিক সব অনুশাসন। বুধাইয়ের দাদা-বৌদিও তাকে রীতিমতো ভয় করে। তাই বুধাই বাড়িতে বিমলীকে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বললেও রাজি হলেন না মাতিয়াস। নিয়মবিরুদ্ধ কাজ তার ধাতে নেই।  বুধাইয়ের চোখের জলে গললো না বাপের মন। মাতিয়াসের কথাই বাড়ির শেষ কথা। অবশেষে বুধাইও হাল ছেড়ে দিল।  একদিন বাড়ি থেকেই বেরিয়ে গেল বুধাই। সঙ্গে সদ্য কেনা তার গীটারটা।

কিন্তু গানকে পেশা হিসেবে নেওয়াটা বড় কঠিন কাজ। কেননা হাত খরচ উঠলেও সংসার চালানোর খরচ ওঠে না তাতে। তাছাড়া ইতিমধ্যেই তাদের 'দল'টাই গেছে ভেঙে! সনে এখন কোলকাতা পুলিশের কনস্টেবল। বিমলের বাবা মারা যাওয়ার পর সেও এখন সংসারের দায়িত্ব নিয়ে পুরোপুরি সংসারী। যোগ দিয়েছে অন্য কাজে। সেতাপাও এখন গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মচারী। একমাত্র বুধাই এখন প্রায় বেকার বলা চলে।

বুধাই মাঝেমাঝেই ভাবে, ভাষাটা বেঁচে আছে তাদের গানে, কিন্তু গান বাঁচিয়ে রাখতে পারলো না তাদের ।

বুধাই এখন গ্রাম থেকে অনেক দূরে, শহরে কাজ করে । একটা প্রাইভেট ফার্মে । কেষ্টদা বলেছে, ওখানেই থাকার একটা ব্যবস্থা করে দেবে ৷ যশোদা কন্সট্রাকশনের মালিক কেষ্ট'দা, অমায়িক লোক। বুধাইকে আপন ভাইয়ের মতোই দেখে। তাই সে-ই ঠিক করে দিল থাকার জায়গা। বিমল পাকাপাকিভাবে জলপাইগুড়িতে চলে এসেছে। সেখানেই সংসার পেতেছে, বিমলীকে সঙ্গে করে।  সাধ্যমতো বিয়ের অনুষ্ঠানও করেছে সে। পুরোহিত মন্ত্র পাঠ করে বিমলীর নতুন নাম দিয়ে বিয়ের আচার শেষ করেছেন। অনুষ্ঠানে আসার জন্য নিজের পরিচিত কয়েকজনকে নেমন্তন্ন করে এসেছিল বুধাই, নিজে গিয়ে। অভিমানে বাড়ির কাউকে বলেনি। বললেই বা কে আসতো! শালপাতায় ডাল, বেগুন ভাজা, তরকারি ও মাছের ঝোল চেটেপুটে খেয়ে গেছে সবাই। রান্নাটাও ভালো হয়েছিল! আর অতিথিরা 'হাড়িয়া'র বদলে নিয়ে এসেছিল নানা রকমের উপহার।

বুধাইয়ের সব সময়ের শুভাকাঙ্ক্ষী কেষ্টদা। তার পরামর্শে বিমলীকে ডাক্তার দেখিয়েছে বুধাই। জলপাইগুড়ি শহরের নামকরা ডাক্তার। আর ফলও পেয়েছে হাতেনাতে। বিমলী এখন গর্ভবতী!
দেখতে দেখতে বছর ঘুরে বিমলীর কোল আলো করে এসেছে মেয়ে রুমনি। আনন্দ আর ধরে না বুধাইয়ের । খুশি বিমলীও। খবরটা ছড়িয়ে পড়লো টোটো পাড়াতেও। মাতিয়াস নিজে এসে ছেলে,বউমা, নাতনিকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল বাড়িতে। বুধাই কোনও আপত্তি করলো না। শ্বশুড়ের পা ছুঁয়ে প্রণাম করলো বউমা। বাড়ির সবাই এখন খুব খুশি। বাড়ির নতুন সদস্যের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েই এখন ব্যস্ত সবাই।

বিমলী ভাবে, ভাগ্যিস সেদিন বুধায়ের চোখে জল এসেছিল ! কেননা এই 'জল'টাই তো অনেকের আসে না! শুধু সুরই না, 'কন্ঠস্বরে'ও বুধাই আর সকলের চেয়ে আলাদা।



                  -------------------------


# টোটো সমাজের কিছু তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ভ্রাতৃসম প্রদীপ রায়।

1 টি মন্তব্য:

  1. ভালো লাগলো। টোটো ভাষায় কিছু সংলাপ থাকলে পাঠকের কিছুটা ধারণা হোত।

    উত্তরমুছুন