শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

প্রবন্ধে উত্তরবঙ্গের জনজাতি : প্রদীপ রায়। পারক গল্পপত্র


উত্তরবঙ্গের টোটো জনজাতির জনজীবনের চিন্তা চর্চার পরিসর দীর্ঘদিন প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের মধ্যে পরিলক্ষিত হলেও স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা কথাসাহিত্য একটু একটু করে ধারণ করতে থাকে উত্তরবঙ্গের জনজাতিদের (টোটো) জনকথাকে। বাংলা আখ্যানে উঠে আসে টোটো জনজাতিদের জনজীবনের ইতিহাস, তাঁদের প্রত্যাশা-প্রাপ্তি ও নিজস্ব অনুভূতি। কোথাও দেখা যায় নৃতাত্ত্বিক অন্বেষণ, তাঁদের গোষ্ঠীজীবনের চালচিত্র। স্বাধীনতার কয়েক দশকের ব্যবধানে এখনও তাঁরা কেবল শাসকদের প্রতিশ্রুতি পায়, সামান্য প্রার্থিত স্বপ্ন তাঁদের কাছে অধরা। টোটো জনজাতির জনজীবনের সামগ্রিক প্রতিচ্ছবি, তর্ক-প্রতর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচিত হয়েছে বিমলেন্দু মজুমদারের ‘অরণ্য বসতি’ ‘ঝুমচাষের জমিন’, মণিদীপা নন্দী বিশ্বাসের ‘ওজা পাখির ঘর’, সুজয় চক্রবর্তীর ‘বুধাই টোটো’, শৌভিক রায়ের ‘পরমা’, শ্যামল সরকারের ‘মেরেমতি’, শাওলী দে’র ‘স্বপ্ন দেখব বলে’, পাপড়ি গুহ নিয়োগীর ‘কংক্রিটের ধূলো’ প্রভৃতি গল্পগুলিতে। প্রত্যেকটি গল্পপাঠে দেখা যায় গল্পকারদের (টোটো জনজাতিদের নিয়ে) নিবিড় অধ্যয়ন ও মেধাবী চর্চা। তবে আলোচনার সীমাবন্ধতার কারণে এই নিবন্ধে কেবল বিমলেন্দু মজুমদার, মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস, শৌভিক রায় ও শাঁওলি দে’র গল্প নিয়ে আলোচনা করব।         

দুই.
উত্তরবঙ্গের আদি জনজাতি টোটোরা এখনও বসবাস করেন আলিপুরদুয়ার জেলার ভারত-ভূটান সীমান্তের তাদিং পাহাড়ের নিভৃত কুহকে। ভারতবর্ষের এই অঞ্চলের একটি মাত্র গ্রামেই  তাঁদেরকে দেখতে পাওয়া যায়। মাদারিহাট থেকে টোটোদের গ্রাম পেরিয়ে যেতে হয় সাতটি ‘তি’ বা পাহারী নদী। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে একটি কথা খুব স্পষ্ট ভাবে বলা যায়— উত্তরবঙ্গের অনেক আদি জনজাতি সত্যিই আজ বিলুপ্ত। বিলুপ্তির পথে উত্তরের টোটোসমাজ। ডুয়ার্সের জলদাপাড়া অভয়ারণ্য ঘুরতে গিয়ে এখন আর দেখা যায় না ‘জলদা’ জনজাতিদের। কোথায় গেল তারা? দীর্ঘদিন যারা মুখ বুঝে ভুটান রাজাদের কষ্ট-যন্ত্রণা সহ্য করেও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভারবাহীর কাজ করত। টোটোরা বা আর কতদিন ধরে রাখতে পারবে তাঁদের স্বতন্ত্রতা? সে প্রশ্নের উত্তরও ভবিষ্যতের হাতে। না কি তাঁরাও থেকে যাবে নিছকই স্থাননাম হয়ে? সে প্রশ্ন তোলা থাক— বরং এই সুযোগে সেড়ে নেওয়া যাক পরিচয়ের পালা।
  উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জনজাতির ভাষায় ‘টোটো’ শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রচলিত। লিম্বু ভাষায় টোটো শব্দের অর্থ পোড়া মাংস, রাভা ভাষায় ‘টোটো’ শব্দের অর্থ খুব তাড়াতাড়ি হাঁটা। টোটোদের আদি বাসভূমি তিব্বত। টোটোপাড়ায় টোটোদের বসবাস অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে। নৃতাত্ত্বিক দিক থেকে টোটোরা মঙ্গোলয়েড জনগোষ্ঠীর একটি শাখা। ১৮১৫ সালে বাবু কৃষ্ণকান্ত বোস ফালাকাটার লুককেপুর গ্রামে টোটোদের প্রথম খোঁজ পেয়েছেন।১ ১৮৮৯-৯৪ পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের জমি জরিপের কাজের সুবাদে সান্ডার সাহেবও টোটোদের সংস্পর্শে আসেন এবং রিপর্টে টোটোদের স্বতন্ত্র ভাষা ও অস্তিত্বের কথা বলেন।২ টোটোপাড়ার মানুষদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ চারিতায় জানা যায়, বর্তমানে নদী, ঝর্ণা, জঙ্গল ঘেরা মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ টোটোপাড়ায় তাঁরা থিতু হলেও পূর্বে  ছিলেন যাযাবর শ্রেণির। মনে করা হয় তাঁদের আদি নিবাস ভুটানের আতুং। তিব্বতীভাষাবিদ এস. কে. পাঠকের মতে টোটোরা উত্তরবঙ্গের টোটোপাড়ায় এসেছিলেন জেলেপ্পার কাছাকাছি ক্রোমেভ্যালি থেকে স্থানান্তরিত হয়ে। Micheal Aris ভুটানের টাকটোপ উপজাতিদের সঙ্গে টোটোদের সাদৃশ্যের কথা বলেন। ডুয়ার্সের অন্যান্য উপজাতির (রাভা, মেচ, গারো, ডুকপা, লেপচা, জলদা) মতো টোটোদেরও রাজ্যের মানচিত্রে বারবার বদল ঘটে। দাস প্রজা হিসেবে ভারবাহীর কাজ করতে হয় ভুটান রাজার অধিনে। টোটোদের প্রধান পেশা শিকার। এখনও তাঁদের বনে ছোটোখাটো জন্তু জানোয়ার শিকার করতে দেখা যায়। বন থেকে তারা সংগ্রহ করেন গৃহ পালিত পশুর খাদ্য, শাকপাতা, বুনোলঙ্কা, বুনো আলু ও মধু। নদীতে ধরেন মাছ। টোটোদের মূল বনজ সম্পদ কমলালেবু চাষও আজ আর নেই। সাবেক প্রথার (ঝুমচাষ) পরিবর্তে নতুন পদ্ধিতিতে চাষ হচ্ছে।
টোটোদের ভাষার নাম টোটোভাষা। এটি মূল তিব্বতি ভাষার আঞ্চলিক রূপ। এই ভাষা ভোটবর্মী ভাষা পরিবারের ভোট হিমালয়ী ভাষা সম্প্রদায়ের শাখা ভাষা। টোটো সম্প্রদায়ের মধ্যেও এ ভাষার চর্চা ও প্রচলন ক্রমেই কমে আসছে। জীবিকার প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে তাঁদের শিখতে হচ্ছে অন্য দু-তিনটে ভাষা। ক্ষমতাবান শ্রেণির ভাষার চাপে তাঁদের ভাষাও আজ অস্তিত্বের সংকটে। সমগ্র টোটো সমাজ মূলত তেরোটি গোত্রে (দাংকো-বে, মাংকো-বে,দান্ত্র-বে,বাদু-বে, দিরিংচাংগো-বে, লিংকাইজি বে, মাংচিং-বে, নৃবি-বে, মান্ত্র-বে, নুরিনচানকো-বে, পিশুচাংগো-বে, বাংগো-বে, বউধ্‌-বে ) বিভক্ত।৩ আধুনিকতার ছোঁয়ায় টোটো সমাজ থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে তাঁদের সাবেকি পোশাক। টোটো পুরুষদের আর সেরকম দেখা যায় না সারা শরীর ও হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা ‘বাওয়া’ পোশাকে। মহিলাদের পোশাক আং-দুং৪ (Ang-Dung) চারটি অংশে বিভক্ত। ‘মেরা’ নামের বস্ত্রখণ্ডে ঢাকা থাকত কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত। তাঁরা কোমর বন্ধনী হিসেবে ব্যবহার করত বিজি, বক্ষবন্ধনী ‘তুমবা’। বিবাহিত মহিলারা মাথা ঢেকে রাখত ‘পারি’ দিয়ে। এখন টোটো সমাজেও সাবেকি পোশাকের পরিবর্তে দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে আধুনিক পোশাক। পুরুষরা পরছেন প্যাণ্ট-শার্ট, মহিলাদের পরিধানে দেখা যায় শাড়ি ও সালোয়ার-কামিজ। টোটোপাড়ায় আর সেরকম শোনা যায় না টোটোদের প্রাচীন লোকসঙ্গীত বা ‘লেতিগেহুয়া’দের গান।   
টোটোদের ঘরের আদল বর্তমানে পরিবর্তন হলেও টোটোপাড়ায় এখনও চোখে পড়বে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি বাড়ি বা নাকো-শা। টোটো ভাষায় বাসস্থানকে বলে ‘শা’। মাটি থেকে ছয়ফুট বাঁশের মাচার উপর তৈরি হতো এই বাড়ি। টোটোদের নকো-শা ঘরের উত্তর-পশ্চিম অংশে থাকে কুলদেবতার চিমার ঘর, এঘরে বাইরের লোক বা পরিবারের মেয়েরা প্রবেশ করেন না। অতিথিদের থাকার অংশকে বলা হয় ‘ডেইচি-কি-সিরি’, পরিবারের লোকেদের থাকার ঘর ‘সিরি’। টোটোদের রান্নাঘরের নাম মেরাং। টোটো সমাজে প্রচলিত ‘অমচু’ ও ‘ময়ু’  নামে দুটি সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই অনুষ্ঠান হয় টোটোদের ‘ডেমশা’ বা পুজোবাড়ির প্রঙ্গনে। যেখানে টোটোরা সকলে মিলিত হয়ে বিভিন্ন নাচ-গান ও আচার অনুষ্ঠান পালন করে। এই ‘ডেমশা’ ঘরেই রাখা থাকে পুজায় ব্যবহৃত পবিত্র দুটি ‘বাকুং’ (ঢোল)। যার পরিবেশ অনেকটাই নাগাদের ‘ড্রাম-হাউসের’ মতো। টোটোদের ‘অমচু’ পূজা হয় শ্রাবণ মাসে তিনদিন ধরে। প্রত্যেকের বাড়ি থেকে আসে কাউন দিয়ে তৈরি পানীয় ‘ইউ’। মুরগীর সঙ্গে ইউ নিবেদন করে তাঁরা সমবেতভাবে প্রকৃতির কাছে আবেদন রাখে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের, ফসল রক্ষা করার। টোটোরা মূর্তি পূজায় বিশ্বাসী নয়। কাছের পাহাড় ও আকাশকেই তাঁরা দেবতার প্রতীকে দেবার্ঘ্য উৎসর্গ করেন।
শ্রাবণ শেষে ভাদ্রে টোটো সমাজ সজ্জিত হয়ে ওঠে ময়ু পূজার ভেলা নিয়ে। ভয়ঙ্কর দেবীর হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রত্যেকে খুঁজে নেয় পশুহত্যার পথ। দিতে হয় পশু বলি সঙ্গে প্রচুর পরিমানে ইউ। টোটোদের নদিন ধরে ময়ু পুজায় গোয়া-দি তীরের আকাশ বাতাসে শুনতে পাওয়া যায় পশুদের আত্মনাদ। টোটো সমাজের মানুষদের বিশ্বাসে কেবল দেবতা নয়, অপদেতাও ভর করতে দেখা যায়। বন্যজন্তুদের হাত থেকে রেহাই পেতে তাই কখনও কখনও তাঁরা আয়োজন করেন অপদেবতা পিদুয়ার পুজোর। এখনও মেনে চলেন ঝাকড়ি বা ওঝার উপদেশ।
টোটোদের মধ্যে শিশু জন্মানো আনন্দের। নবজাতক শিশুকে স্নান করিয়ে তাঁরা মুখে  ছুঁইয়ে দেয় ‘ইউ’। এরপর আসে সামাজিক পরিচয়ে পরিচিত করাতে নামকরণের পালা। এই অনুষ্ঠান সাধারণত হয়ে থাকে শিশু জন্মানোর পাঁচ বা সাত দিনের মধ্যে। গ্রামের পূজারি এই অনুষ্ঠান পরিচালনা করে। শিশুর নাম উচ্চারণ করে পূজারি ঘাসের তৈরি ‘সাংডি’ বেঁধে দেয় শিশুর হাতে। টোটোদের বিশ্বাস ‘সাংডি’র বন্ধনই হবে শিশুর অপশক্তির হাত থেকে রক্ষাকবচ। টোটো সমাজে ‘বদি লং মি’ পূজা করা হয় একটি কাপড়ের ফালিকে। যে কাপড় টোটো নারীদের পিঠে বাঁধা সন্তানকে রক্ষা করবে বন জঙ্গলের অশুভ শক্তির হাত থেকে। অন্যান্য আদি জনজাতির মতো টোটোদের মধ্যেও আগে বাগদান প্রথা প্রচলিত ছিল। মেয়ের বয়স ৫-৭ বছর হলেই ছেলের বাবা বাকদান করে রাখেন। এবং মেয়ে কর্মক্ষম হলে ময়ু উৎসবে নতুন জামা কাপড় দিয়ে ছেলের বাড়িতে নিয়ে আসেন। বিয়েতে তাঁদের কোন ধর্মীয় উৎসব নেই— কেবল প্রীতি ভোজে থাকে মাংসের সঙ্গে ইউ। টোটোরা নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যে পছন্দের পাত্র পাত্রিদের বিয়ে করতে পারেন। তাঁদের সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করেন কাইজি। গোষ্ঠীর বাইরে বিয়ে করলে প্রায়শ্চিত্য করতে হয়, অন্য কোন গোষ্ঠীর মেয়ে টোটো ছেলেকে বিয়ে করলে তাকে গ্রহণ করতে হয় টোটো ধর্ম। মৃত্যুর সংবাদে এক লহমায় গোটা টোটোপাড়ায় নেমে আসে শোকের ছায়া। অশ্রুসিক্ত চোখে মাটি দেয় কবরে। তাঁদের বিশ্বাসে— জন্মের সময় সূর্য থেকে আসা মানুষ বিলীন হয় সূর্যাস্তের রক্তিম আভাতে।   

তিন.
টোটো জনজাতির গবেষক বিমলেন্দু মজুমদারকে (১৯৩৯) এই পর্বে আমরা পাব গল্পকার হিসেবে। টোটোদের নিয়ে লেখা ‘অরণ্য বসতি’ ও ‘ঝুম চাষের জমিন’ গল্পদুটি প্রকাশিত হয় মধুপর্ণী ও আমাদের কথা পত্রিকায়। ‘অরণ্য বসতি’ গল্পের মধ্যে দিয়ে গল্পকার টোটো জনজাতির জনজীবনের রাজনীতি ও ইতিহাসের আলেখ্যকে তুলে ধরেছেন। গল্পের শুরুতে আমরা দেখতে পাই ভোট বাহিনীর সিকিম যাত্রার বর্ণনা। ভোটবাহিনীর মালবাহক দাংকো টোটো জনজাতির। যার মুখে শোনা যায় ভোটবাহিনীর অত্যাচারের কথা— ‘ এদের কাছে আমরা খচ্চরের চেয়েও কম মূল্যবান ! কারণ আমরা মরলে, আমাদের মাংস বা চামড়া এরা কোনও কাজে লাগাতে পারে না।’৫ দাংকোর কথা থেকে জানা যায় ভোটবাহিনীর হাতে তাঁদের পরিবারের উচ্ছেদের কথা, টোটো জনজাতির সমর্থ পুরুষদের ভারবাহীতে রূপান্তরের কাহিনি। দাংকোরা ভেবে পায় না তাঁদের কী অপরাধ। বক্সাদুয়ারের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জোঙ পোনের সন্দেহের ফলে তাঁদের এমন বিপর্যয়। দাংকোদের প্রতি অভিযোগ ওঠে সমতলের লোকদেরকে গোপনে ভুটানের পথঘাট দেখিয়ে দেওয়ার।  কিন্তু সে অভিযোগ মিথ্যে। ছাব্বিশ বছরের জীবন অভিজ্ঞতায় দাংকো বুঝতে পেরেছে তাঁদের জনগোষ্ঠীর লোক বিশ্বাস ঘাতক নয়। এর পিছনে আসল রহস্য আসলে জোঙ পোনের প্রমোদ ভ্রমনে টোটো জনজাতিদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ভেট না পাওয়ার প্রতিশোধ। ভারবাহী দাংকো ভার বাইতে বাইতে মনে আসে কত পুরোনো স্মৃতি। সে ভাবে বাবা আল্লাপার কথা। তার বাবাকেও ভোটবাহিনী বন্দী করেছে গুপ্তচর বৃত্তির অপরাধে। রেহাই পাননি দেবরাজার একান্ত অনুরাগী হয়েও। দাংকোর মনে পড়ে প্রায় ছয়ফুট দীর্ঘদেহী তার বাবা আল্লাপার কথা যিনি সকালে গৃহদেবতার চিমাঘর থেকে বেরিয়ে আসতেন বা সূর্য দেবতার পূজা দিতেন। দাংকোর এই ভাবনার মধ্যে কোথাও যেন উঁকি দিয়ে ওঠে হারানো স্মৃতির আমেজ। যেগুলি সে বারবার ফিরে ফিরে পেতে চাইছে। উপভোগ করতে চায় হারানো পিতা মাতার স্নেহের সান্নিধ্য, তাঁদের অতীত ঐতিহ্যকে। স্মৃতির পিঠে স্মৃতি রেখে দাংকো ভাবে তার ছোটো বোন পুই-মা-তির মর্মান্তিক দৃশ্যের কথা। ভোটবাহিনীর কোতোয়াল যাকে জোর করে নিয়ে গেছে ইয়াকের পিঠে তুলে। ভার বাইতে বাইতে মোচড় খাওয়া পাহাড়ি পথে দাংকোর ভিতরটাও কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে, মনের সুপ্ত আগুনকে উসকে দেয়।  আকাশ বাতাসে ভেসে আসে তার নিজের নামের স্বর। ভারবাহী দাস প্রজা দাংকোর পথ চলতে চলতে হঠাৎ মনে পড়ে ছোটো বেলার সে পথের কথা। যে পথ দিয়ে তারা শিকারে গিয়েছে তিত্রিং ভোটানে। চৈত্রসংক্রান্তির পুজোয় নীচের খোলায় (নদীতে)। যে দাংকোকে লোকে বলত সূর্যদেবতা। যার সাহস বাঘের মতো। হরিণের মতো দ্রুতগামী দাংকোকে লোকে বলত ‘বাদামি চিতা’। ভাগ্যের পরিহাসে সেই দাংকোই এখন ভোটবাহিনীর ভারবাহী। সহ ভারবাহী পিশুচাং তাঁদের ফেলে আসা গ্রামের দিকে নির্দেশ করলে দাংকোর কথায় মিশে থাকে অভিমানি সুর—‘ঐ গ্রাম আর আমাদের নয় ! আমরা গ্রাম রক্ষা করতে পারিনি। আমাদের গোষ্ঠীর স্থায়ী বাসভূমি আর হবে না। আমরা আবার আগের দিনের মতো ঘুরে ঘুরে বেড়াব।’৬ কিন্তু দাংকোরা ভারবাহী দাস হলেও, নিজেদের গোষ্ঠী ও গ্রাম রক্ষা করতে না পারলেও তাঁদের স্বপ্ন দেখা শেষ হয়নি, তাদেরও থিতু হওয়ার স্বপ্ন দেখা শেষ হতে পারেনা। পাহাড়ের ঢালে ঝর্ণার ধারে ভোট সৈনিকদের নেশায় আচেতন করে দাংকোরা তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পালিয়ে আসে। তাদিং পাহাড়ের কোলে বনবস্তির মধ্যে পুরুষদের হত্যা করে সমস্ত নারীসহ একটি গ্রাম দখল করে, দাংকো পুনরায় ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে টোটো জনগোষ্ঠীর ভিপ্রিমার মেয়ে তাডিংমার সঙ্গে। একদিকে টোটোদের জীবন সংকট, অন্যদিকে তাঁদের মৌখিক পরম্পরার ইতিহাসের একটি সামগ্রিক দলিল গল্পকার তুলে ধরেছেন ‘অরণ্য বসতি’ গল্পে।   

চার.
কোচবিহারের বিশিষ্ট শিক্ষিকা মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস (১৯৬৪) –এর টোটো জনজাতি বিষয়ক গল্প ‘ওজা পাখির ঘর’। গল্পটি প্রকাশিত হয় পারক (ই-ম্যাগাজিন, বৈশাখ, ১৪২৬) পত্রিকায়।৭ গল্প প্রসঙ্গে তিনি বলেন— ‘এ গল্প আমার জীবনকে ছুঁয়ে থাকার গল্প, মানুষ ভালোবাসার গল্প।’৮ দীর্ঘদিন শিক্ষকতার চাকরির সুবাদে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন আদি জনজাতি ছাত্রের সঙ্গে আন্তরিকতা, স্নেহ ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার সম্পর্ক তাঁকে বাড়তি প্রেরণা জুগিয়েছিল উত্তরের জনজাতিদের নিয়ে গল্প লেখার। গল্পকার গল্পের নামকরণে ওজা নামে এক বিশেষ ধরনের পাখির মধ্যে দিয়ে টোটো জনজাতির কথাই বলতে চেয়েছেন। যে পাখিদের ঘরের নমুনা দেখে টোটো জনজাতিরা উত্তরবঙ্গের তাদিং পাহাড়ের কোলে স্বপ্নের ঘর বেঁধেছিল। ‘ওঝা পাখির ঘর’ গল্পে স্রগ্ধরা উত্তরবঙ্গের একটি স্কুলের শিক্ষিকা, সে সঙ্গে একটি সমাজ সেবা সংস্থারও সেক্রেটারি । না, উত্তরবঙ্গের এই প্রিয় ছাত্রি স্রগ্ধরাকে দায়িত্ব দিয়ে ভুল করেনি ড. প্রীতম বিশ্বাস। স্রগ্ধতার আগ্রহ, সব কাজে বাড়তি উৎসাহ ও মিশুকে স্বভাবের দিনিমনিকে খুব সহজেই কাছের করে নিতে পেরেছিল টোটো জনজাতির ছাত্র সতী ও  শোভোনারা। শোভনাদের আন্তরিক আর্তিতে সাড়া দিয়ে স্রদ্ধরা তাঁদের বাড়িতে এসে উপলব্ধি করে এক ভিন্ন অনুভূতি— ‘আজ এতদিন পর হঠাৎই টোটো ছাত্রি দুজন আবার যেন মনের গোপন জায়গাটা ধরে বেদম নেড়ে দিয়েছে। কি কষ্ট, কত কায়িক, মানসিক শ্রমে উঠে দাঁড়িয়েছে, প্রতিষ্ঠা করেছে অধিকার।’ স্রগ্ধরা দুদিন ও একটি রাতের অভিজ্ঞতায় টোটো জনজাতিদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ ও আবিষ্ট। সে শোভনার সঙ্গে গোটা টোটোপাড়া ঘুরে দেখেছে, জেনেছে তাঁদের জনজীবনের কথা, শুনেছে তাঁদের সুখ-দুঃখের কথা, উপলব্ধি করেছিল পরিবেশের সঙ্গে তাঁদের নিবিড় যোগসূত্রের। শোভনার কথায় সে জানতে পারে টোটোরা কীভাবে জঙ্গল থেকে জঙ্গলী শাক, মাশরুম, জংলী আলুর কন্দ সংগ্রহ কর আনে, জংলি বাঁশের চারা হাল্কা করে কেটে সব্জী বানায়। স্রগ্ধরার মনে হয় এখানকার পাহাড়, নদী, অরণ্য, ভূমি সবই যে এক একজন প্রানসত্তা ও সজীব। এখানকার মানুষ যেন জীবনযাত্রার প্রয়োজনে এদের সঙ্গে মিশে ওদের আত্মীয় করে নিয়েছে।   
স্রগ্ধরা জানতে পারে শ্রাবণ মাসে তাঁদের ফসলের দেবী অঞ্চুর কথা, টোটোপাড়ার নবজাতকের নামকরণ অনুষ্ঠান ‘মাদি-পাই-পো-আ’র কথা। স্রগ্ধরার মনে সংশয় জাগে তাঁদের বিভিন্ন সংস্কার দেখে। তাঁর টোটোপাড়ায় এসে সৌভাগ্য হয়েছিল সীমা ও যোগেশের বিয়ের অনুষ্ঠান দেখার, স্রগ্ধরা দেখেছিল একই এলাকা ও গোষ্ঠীভুক্ত হওয়ায় তাদের বিয়েকে কেন্দ্র করে উন্মাদনা। এর ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায় অন্য জাতির পুরুষ ও মহিলার যৌন সম্পর্কে। স্রগ্ধরার মনে হয় শোভনার মতো ছেলেমেয়েরা কী মানতে চাইবে তাদের সেই সংস্কার? তাঁরা কী আর বিশ্বাস করতে চাইবে তিতি নদীর ধারে তিত্রীং নামে গভীর অরণ্যে পিদুয়া ও মৈশিং নামে অপদেবতার কথা? তাঁরা আর কতদিন ইউ এর নেশায় মশগুল থাকবে? স্রগ্ধরার নিজেকে খুব পরিপূর্ণ মনে হয়—  শোভনা, তাঁর বাবা গিরীধারী, সতীদের নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখে। সে ফিরে আসে একরাশ মুগ্ধতা ও মনকেমন করা সঙ্গে নিয়ে। ‘ওজা পাখির ঘর’ আখ্যানে এভাবেই আমারা পাব টোটোদের সমাজ-বাস্তবতার সামগ্রিক একটি ছবি, যেখানে মিশে রয়েছে গল্পকারের নিজস্ব অনুভূতির সঙ্গে দক্ষ ক্ষেত্র-সমীক্ষার অভিজ্ঞতা।

পাঁচ.
উত্তরের সাহিত্য জগতে ‘মুজনাইয়ের বালক’ হিসেবে পরিচিত শৌভিক রায়ের (১৯৭০) টোটো জনজাতিদের জনজীবন নিয়ে লেখা ‘পরমা’ গল্পটি প্রকাশিত হয় মেঘ মেঘ বাদল (ডিসেম্বর, ২০১৯) নামক গল্প সংকলনে। ‘পরমা’ উন্নয়নে উপেক্ষিত টোটোসমাজের বদলে যাওয়া সমাজ সংস্কৃতির গল্প। স্বাধীনতার কয়েক দশক পেরিয়ে এসে এখনও যাঁদের প্রতি মূহুর্তে গ্রাস করে অনিশ্চয়তা, অদৃশ্য আতঙ্ক ও ভয়। এই গল্পে টোটো নারী পরমার মাকে তাড়িত করে অজানা ভয়। বদলে যাওয়া সমাজে আতঙ্কে থাকে— মেয়ে পরমাকে নিয়ে। পরমা নিজেও দেখতে পায় উত্তরবঙ্গের একমাত্র টোটো গ্রামটি দিন দিন বদলে যাচ্ছে— ‘হাউরি আর তোর্সা নদীর ধারে তাদের এই ছোট্ট গ্রামটা,এখন আর পুরোপুরি তাদের নেই।’৯ পরমাদের টোটোসমাজ থেকে ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে তাঁদের সমাজ, ভাষা, গান, নাচ। তাদিং পাহাড়ের কোলে তাঁদের পিতৃপুরুষদের জায়গা দখল করে নিচ্ছে নেপালি, বিহারিরা। বাড়ছে সুযোগ সন্ধানী মানুষের ঢল। কিন্তু এসব কিছুর মধ্যেও লেখক দেখিয়েছেন এখনও কীভাবে অমলিন রয়েছে টোটো গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরমাদের গ্রাম থেকে দেখা যায় গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে দূর পাহাড়ের গায়ে ছবির মতো ফুণ্টশেলিং। পরমা গাঁওবুড়া গাপ্পুর কাছে জানতে পারে দূর পাহাড়ের সেই পথ ধরেই একদিন এসেছিল তাঁদের পিতৃপুরুষেরা নিশ্চিত আশ্রয়ের খোঁজে। সে জানতে পারে ভুটান সরকারের কাছে তাঁর পিতৃপুরুষদের ভারবহনের কাজের কথা, নির্যাতনের কথা। পরমার কাছে গাপ্পুর মুখে অতীত স্মৃতি চারণার আখ্যান বয়ানের ঢঙে গল্পকার এভাবেই যেন ছুঁতে চান উত্তরবঙ্গের টোটো জনজাতির যাপিত জীবনের পরা-ইতিহাসকে, টোটোসমাজ হয়ে ওঠাকে। গাপ্পুর গল্পসূত্রে উঠে আসে স্যাণ্ডার সাহেব টোটোদের প্রথম খুঁজে বের করার কথা, টোটোদের কমলালেবু তোলার কাজ ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় নিস্ফলা কমলা ফলের প্রভাবে তাঁদের কর্মহীন দৈনন্দিন জীবনের প্রসঙ্গ। 
টোটোসমাজের বিচিত্র জীবন সংকটের মধ্যেও পরমা গল্পে আমরা দেখতে পাই নরনারীদের মনে রামধনুর রঙ। পরমা জানে শত ঝড় ঝাপ্টা, দুঃখ কষ্টের মধ্যেও জীবনকে কীভাবে সাজাতে হয়, জীবন তরীর হাল কীভাবে বাইতে হয়। এই গল্পে পরমাকে দেখি জাত-পাতের তোয়াক্কা না করে ভিন্ন জাত ও গোত্রের পুরুষ বিপ্লবকে অকপটে প্রেম নিবেদন করতে। পরমা জানে গতানুগতিক ভাব ধারায় বয়ে চলা তাঁদের টোটোসমাজ মানবে না তাদের এই তরুণ বয়সের বেলেল্লাপনাকে, লাচিজাংওয়া (গ্রাম শাসন সংগঠন) মানবে না তাদের ভিন্ন জাতের প্রেম-প্রনয়। কিন্তু পরমা সে সব ভাবনাকে পিছনে ফেলে পাহাড়ি পাথরের ঢালের নিভৃত কুহকে স্বেচ্ছায় বিপ্লবের সঙ্গে দুজনে মিশে গিয়েছিল নিজেদের মধ্যে। সে স্বপ্ন দেখেছিল ঘর বাঁধার ভিন্ন জাতের পুরুষের সঙ্গে কিন্তু বিপ্লবের বেকারত্ব, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সে পারেনি পরমার দিকে ভরসার হাত রাখতে, এমনকি পরমার শরীরে বেড়ে ওঠা নিজের সত্তাকেও সে হত্যা করতে চায় শহরের কোন ‘কসাইখানায়’। যেখানে টাকার বিনিময়ে চলে অবৈধভাবে ভ্রূণ হত্যার লীলা। ঘটনাক্রমে বিপ্লবের নিরুদ্দেশ, পরমাকে আবার শামবেহে করতে দেখা যায় পাতাল নামে এক যুবককে। সমাজের নিয়ম অনুযায়ী গর্ভধারণের পর প্রথামত বিয়েও হয়। কিন্তু পরমা বিয়ের পরও ভুলতে পারেনি বিপ্লবকে, তাঁর নিরুদ্দেশ হওয়ার স্মৃতিকে। বছরের ঐ নিদিষ্ট দিনে পরমাকে দেখা যায় ইউ আর পান সুপুরি রেখে হাউরির ধারে হাউ হাউ করে কাঁদতে। যে কান্নার মধ্যে মিশে থাকে বিপ্লবের প্রতি গভীর প্রেম। টোটো নারী পরমার ভিন্ন জাতের যুবকের সঙ্গে প্রেম এভাবেই সার্থক হয়ে ওঠে। পাতাল কে সে হয়তো টোটো সমাজের প্রথামত বিয়ে করেছে, দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বামীর মর্যাদা, পিতৃত্বের আস্বাদ কিন্তু পাতালের প্রেম শরীর ছাড়া পরমার মনের গভীরে কোন তল খুঁজে পায় নি। গল্পের শেষে আনমনা হয়ে কাঁদতে থাকা পরমার চোখের জল পাতালের মনে বন্য ক্ষুধা, বেহায়া অসভ্য হয়ে ওঠা ইচ্ছাগুলিকে বুঝিয়ে দেয় টোটো নারীদের ভোগে নয়, অর্জন করতে হয় ত্যাগে, শ্রদ্ধার সঙ্গে।                     

ছয়.
কোচবিহারের হলদিবাড়ি শহরে বেড়ে ওঠা কবি ও গল্পকার শাঁওলি দে’র (১৯৮২) ‘স্বপ্ন দেখব বলে’ গল্পটিতে টোটো জনজাতির মেয়ে রীনা টোটো— শুধু নিজে স্বপ্ন দেখেননি, টোটোসমাজকে স্বপ্ন দেখাতেও পেরেছিলেন নিজের বিলুপ্ত প্রায় সম্প্রদায়ের হয়ে নিস্বার্থ ভাবে কাজের মধ্যে দিয়ে। কলেজ জীবনে ভালোবেসেও জলপাইগুড়ির মানসকে দীর্ঘ পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল রীনাকে সঠিক ভাবে বুঝতে। শোভনসুন্দর বসুর এনজিও সংস্থা ‘স্বপ্ন’-এর উঁড়ানে চেপে নেই চাকরির বাজারে মানস টোটোপাড়ায় এসে তাঁর প্রিয় মানুষকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করে। এত দিনে সে বুঝতে পারে ঘর সংসারের বাইরে রীনার অন্য পৃথিবীর স্বপ্নকে। সামান্য শিক্ষিকার চাকরিতেও সে সমস্ত প্রতিকূলতা ছাপিয়ে সবার জন্য লড়াই করছে। নিয়েছে ছোটো ছোটো ছেলেমেদের পড়াশুনোর দায়িত্ব। মানস এনজিওর কাজে এসে বিকাশ টোটোর কাছে, রীনার কাছে জানতে পারে তাদের গ্রামের কথা, শিক্ষা ব্যবস্থার কথা, ঘর বাড়ি, তাদের প্রধান দেবতা ইশপার কথাও। রীনাদের গ্রামে প্রাইমারি স্কুল তৈরি হয় ১৯৯০ সালে, উচ্চমাধ্যমিক স্কুলটি হয় ১৯৯৫ এ। সদ্য একটি স্বাস্থকেন্দ্রও হয়েছে তাদের গ্রামে। এসব তথ্যের মাঝে মানস ভাবে রীনার কথা, তার স্বপ্নের কথা যে অনায়াসেই বলতে পারে—‘যতটুকু পারি সবটাই করব টোটোপাড়ার জন্য, এর বাইরে আমার কোনো অস্তিত্ব নেই।’
রীনার স্বপ্নের কাছে মানসের নিজের স্বপ্নগুলি খুবই ছোটো বলে মনে হলেও অতিক্রান্ত সময়ের ব্যবধানে রীনা পেরেছিল তার বন্ধুকে নিজের স্বপ্নপথের পথিক করে তুলতে। সগর্বে বাড়িয়ে দিয়েছে বন্ধুত্বের হাত। রীনা টোটো নিজের জনজাতিদের নিয়ে লেখা গবেষণামূলক বই মানসকে উপহার দিয়ে তাই হয়তো লিখেছে— ‘প্রিয় বন্ধুকে, যে নিজেও এখন বড় স্বপ্ন দেখে।’

সাত.
বাংলা সাহিত্যে উত্তরের টোটো জনজাতির কথা হতে পেরেছে চিরকালীন মানবকথা। শিল্প সার্থকতার বিচারে গল্পগুলি বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হলেও প্রত্যেকটি গল্পের স্পর্শে পাব লেখকদের চোখে দেখে অনুভব করার তাগিত। যা বাংলা জনজাতি কেন্দ্রিক আখ্যান চর্চায় নতুন স্বর সংযোজনের দাবি রাখে। প্রশ্ন উঠতে পারে বাংলা কথাসাহিত্যে উত্তরের জনজীবনের (টোটো) প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে। উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক টোটোদের জনজীবন বাংলা কথাসাহিত্যে খণ্ডচিত্র হলেও অপাংক্তেয় নয়। তাঁদেরকে বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্য কখনই সম্পূর্ণতা পেতে পারে না। উত্তর আধুনিক সাহিত্য বিচ্ছিন্নতাকে, প্রান্তিক জীবনকে গ্রহণ করে। অখণ্ডকে নির্মান করতে হয় খণ্ড দিয়েই। টোটোদের নিয়ে বাংলা গল্প পেলেও উপন্যাস এখনও রচিত হয়নি। কে জানে ! এই পথ ধরে হয়তো বাংলা সাহিত্যে আমরা একদিন খুঁজে পাব রাঢ় বঙ্গের তারাশঙ্কর কিংবা পূর্ব বাংলার তিতাস পারের অদ্বৈত মল্লবর্মনের মতো উত্তরবঙ্গের টোটো জনজাতির আখ্যানকারকে, যিনি আমাদের তাদিং পাহাড়ের নতুন কোন গল্প শোনাবে, মেরেমতি-তিতি নদীর অজানা কাহিনি বলবে। হয়তো, টোটোসমাজ নিয়ে লিখবেন মেরেমতি কিংবা তিতি পারের বৃত্তান্ত। আগামীর প্রতি কী আমরা সেই প্রত্যাশা রাখতে পারি না ?     

তথ্যসূত্র:

১. মজুমদার, বিমলেন্দু, উত্তরবঙ্গের আদিবাসী, গাঙচিল, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ- কলকাতা বইমেলা ২০২০, পৃ. ১৯০
২. Sunder Dhe, survey and settlement of the western Doors in the District of Jalpaiguri,1895
৩. টোটো, ধনীরাম, ‘টোটোদের সমাজ ও সংস্কৃতি’, জলপাইগুড়ি জেলা সংখ্যা,  তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, কলকাতা, ১৪০৮ বঙ্গাব্দ, পৃ. ১৭৩
৪. Majumdar, Bimalendu, A sociological study of the Toto folk tales, The Asiatic Society, Kolkata, 1991, p. 11
৫. মজুমদার, বিমলেন্দু, ‘অরণ্য বসতি’ (গল্প), রিনছেন (গল্পগ্রন্থ), অশোকগাথা, উত্তর চব্বিশ পরগণা, ২০১৮, পৃ. ৫৫
৬. পূর্বোক্ত, পৃ. ৫৮   
৭. http://parokprokasan.blogspot.com
৮. https://m.f.com/story.php?story_fbid=2259042364176847&id=100002133171612
৯. রায়, শৌভিক, ‘পরমা’ (গল্প), মেঘ মেঘ বাদল বাদল (গল্পগ্রন্থ), গাঙচিল, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ডিসেম্বর ২০১৯,   পৃ. ৭৯
     

                   

1 টি মন্তব্য: