শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

প্রগতি মাইতি। পারক গল্পপত্র


টুবাইয়ের দামালপনা নিয়ে বাড়িতে একটা অশান্তি লেগেই থাকে। ছোটকা ছাড়া বাড়ির প্রায় সকলের কাছে বকাঝকা খেতে হয় টুবাইকে। আবার ছোটকা প্রশ্রয় দেয় বলে তাকেও কম সমালোচনা হজম করতে হয় না। বাবা-মা-ঠাম্মা তিনজন যখন একদিকে তখন টুবাইয়ের হয়ে একা তার ছোটকা স্বর্ণাভ লড়াই করে। টুবাইয়ের মা শোভনা তো একদিন অনুযোগ করে বলে ফেলল, “দ্যাখো ঠাকুরপো, তুমি প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে ওকে আর মাথায় তুলো না তো? দিনকে দিন টুবাই উচ্ছন্নে যাচ্ছে। একটু বকতেও শেখো।' স্বর্ণাভ'র উত্তর ঠোটেই থাকে। সে বলে, “দেখো বৌদি, টুবাই এ বয়সে যা করছে আমরা এর চেয়ে ঢের বেশি বদমাইশি করেছি। এটা কোনো দুষ্টুমি হল? তাছাড়া যে যত দুরন্ত হবে সে তত বুদ্ধিমান হবে। তোমরা কথায় কথায় ওকে রে রে কোরো না তো? ফাপরে পড়ে টুবাইয়ের বাবা পর্ণাভ। ছোটবেলায় পর্ণাভও কম দূরন্ত ছিল না। কিন্ত ছেলের সামনে সে গম্ভীর ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ পিতা। পান থেকে চুন খসতে দিতে চায় না। তবে এতসব অশান্তি সত্বেও টুবাই সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। টুবাই তার ছোটকার প্রশ্রয়ের মান রেখেছিল। জিওগ্রাফী, কার্টুন নেটওয়ার্ক, পোগো--এসব চ্যানেলগুলো টুবাইয়ের পছন্দের চ্যানেল। টুবাইয়ের কিন্তু মোবাইলের নেশা নেই। তবু শোভা চায় না টুবাই টিভি দেখুক। টিভি দেখা মানে সময় নষ্ট করা। টিভি দেখা নিয়ে শোভনার সঙ্গে টুবাইয়ের একটা অশান্তি নিত্যকার ঘটনা। শোভনা বলে, "এটাকে বোকাবাক্স বলে, যারা এটা দ্যাখে তারাও বোকা।”

--- তাহলে বাপিও বোকা । আর ঠাম্মাও...

---- ওরা তো তোর মত অতসময় টিভি দেখে না।

--- তার মানে বেশি সময় দেখলে বোকা...

--- দ্যাখ টুবাই মুখে মুখে তর্ক করিস না। টিভি না দেখে বরং এ সময় ছবি আঁক বা নিদেনপক্ষে গল্পের বই পড়।

মা-ছেলের কথার মধ্যে স্বর্ণাভ ঢুকে পড়ে। আসলে স্বর্ণাভ তখন বাথরুমে ছিল। বাথরুম থেকেই মা-ছেলের চিৎকার শুনছিল। বাথরুম থেকে বেরিয়ে এদের এড়িয়ে নিজের ঘরে চলে যাওয়া মানে টুবাইকে এড়িয়ে যাওয়া। আর তাছাড়া স্বর্ণাভ কিছু বলার আগেই টুবাই তার ছোটকার উদ্দেশে বলে, "দ্যাখো ছোটকা, মায়ের কথা শোন।” সব শুনে স্বর্ণাভ তার জ্ঞানগর্ভ বাণী শোনায়, “পড়ার পর ব্রেনটা একটু রিলাক্সড করতে ও টিভি দ্যাখে। কিন্তু ছবি আঁকা বা গল্পের বই পড়লে তো সে-ই ওর মেন্টাল এনভলমেন্ট থেকেই যাবে। মস্তিষ্কের বিশ্রামটা কি হবে? তবে টুবাই, খুব বেশি হলে আধঘন্টা দ্যাখ। বেশি নয়, কেমন?”

স্বাধীনতা দিবসে অগ্রদূত" ক্লাবের ছেলেরা বসে আঁকো প্রতিযোগিতা ও রক্তদান ও সম্ভাব্য রক্তদাতার নাম সংগ্রহে বেরিয়েছে। সেইমতো ওরা পর্ণাভদের বাড়িতে আসে। শোভনা বসে আঁকো প্রতিযোগিতায় টুবাইয়ের নাম দিয়ে দেয়। টুবাই তখন স্কুলে। স্কুল থেকে ফিরতেই শোভনা বলে, "১৫ আগস্ট অগ্রদূতের বসে আঁকো প্রতিযোগিতায় তোর নাম দিয়েছি। বাড়িতে একটু প্র্যাকটিস কর। আঁকার স্যারকে বলবো এ সপ্তাহে যেন একদিন বেশি এসে তোকে প্র্যাকটিসটা করিয়ে দেয়।' অথচ টুবাই কোনো প্রতিযোগিতায় নাম দিতে চায় না। একবার স্কুলে আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছিল। ষোলজনের মধ্যে পনেরতম স্থানে ওর নাম ছিল। সে কী মন খারাপ! বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতে শোভনার বাউন্সার, 'খালি পড়লেই হবে? অন্যান্য বিষয়েও ফার্স্ট হতে হবে। কবিতাটা ভালো করে মুখস্থই করিসনি। দু'জায়গায় আটকে গেলি। ওখানেই তো মার খেলি। অথচ তোর উচ্চারণ বা উপস্থাপনা যথেষ্ট ভালো ছিল।'

টুবাই কোনো কাজে সফল না হলে তার নিজেরই মন খারাপ করে। তার উপর যখন কেউ তাকে বিদ্রুপ করে তখন মন খারাপ হয়ে যায়। সন্ধ্যেবেলা টুবাই পড়তে না বসে বিছানায় বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকে। অসময়ে টুবাইকে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে স্বর্ণাভ তার ঘরে ঢুকে বলে, “কী হলো তোর? অমনি করে এখন শুয়ে আছিস যে? শরীর খারাপ নাকি?'
 তারপর স্বর্ণাভ টুবাইয়ের গায়ে হাত দিতেই সে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ওঠে। আবৃত্তিতে প্রাইজ না পাওয়া এবং মায়ের কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে ছোটকাকে বলে হাল্কা হয় টুবাই। স্বর্ণাভ টুবাইকে সান্ত্বনা দেয়, 'তুই মুখে হাতে জল দিয়ে পড়তে বস। আজ তোর বাবা আসুক। একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়বো। তুই কিছু ভাবিস না।' টুবাই জানে, তার ছোটকা কোনো কথা দিলে ওটা সে পালন করবেই। মুহূর্তে চনমনে হয়ে টুবাই তড়াং করে বিছানা থেকে উঠে মুখ-হাত-পা ধুয়ে পড়ার ঘরে ঢুকে গেল। ভাবখানা এমন, যেন কিছুই হয়নি।

অন্যদিনের চেয়ে সেদিন পর্ণাভ একটু আগেই অফিস থেকে বাড়ি ফিরল। চা-টিফিন খেয়ে যখন পর্ণাভ ও শোভনা আড্ডা দিচ্ছিল, তখন স্বর্ণাভ ঘরে ঢোকে। 'এই যে দু'জনেই আছ দেখছি। ভালোই হলো। বলি এসব কী করছো বলো তো বৌদি? একটা ছেলেকে নিয়ে কি করতে চাইছো বলো তো?' পর্ণাভ যেন আকাশ থেকে পড়ল। শোভনা চুপ। পর্ণাভ বলে, “কেন কী করলো তোর বৌদি?”

---কী করেনি তাই বলো!

--- আহা বলই না।

--- আমি কেন, তুমিও বারণ করেছিলে যে টুবাইয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিযোগিতামূলক বিষয়ে অংশগ্রহণ করার দরকার নেই।

--- হ্যাঁ বলেছিলাম তো! তাতে কী হলো?

এবার শোভনা মুখ খোলে। শোভনা বলল, 'আরে বাইরে কোথাও না। স্কুলে। স্কুলের রিসাইটেশনে ওর নাম দিয়েছিলাম। কোনো কিছু হতে পারেনি বলে আমি কথায় কথায় দু'একটা কথা বলেছিলাম। তাতেই বাবুর মুখ গোমড়া। আর উনার মুখ গোমড়া মানে....।

পর্ণাভ বললো, “না, তুমি ঠিক করনি। স্কুলই হোক বা অন্য কোথাও । বাধ্যবাধকতা না থাকলে, সর্বোপরি টুবাইয়ের ইচ্ছা না থাকলে ওকে ফোর্স করবে না।” সুযোগ বুঝে এবার স্বর্ণাভ গলিয়ে দিল, “অগ্রদূত ক্লাবের বসে আঁকো প্রতিযোগিতায় ওর নাম দিয়েছ কেন?

--- এটা তো নিজেদের পাড়ার ব্যাপার। তাছাড়া ছেলেগুলো ধরলো যেকোনও একটাতে নাম দিতে।

--- বেশ তো, তুমি রক্তদানে তোমার নাম দিলে না কেন?

---- বসে আঁকো আর রক্তদান এক হোল?

--- আহা রক্তদান তো কোনো প্রতিযোগিতা নয়? ওটা কেবল দান। তুমি দানে নেই সংঘর্ষে আছো?

---- সংঘর্ষ!

--- প্রতিযোগিতা মানেই সংঘর্ষ।

---- আচ্ছা একটা কথা আমি তোমাদের দু'ভাইকে বলি। টুবাই আমার ছেলে, ওর ভালোমন্দ মা হিসেবে কি আমি দেখবো না? সবটাতেই তোমাদের হস্তক্ষেপ হলে আমি কিন্তু আর কিচ্ছুটি বলবো না। দেখে নিও।

--- দ্যাখো বৌদি, টুবাই আমার ভাইপো, এবাড়ির এখনো পর্যন্ত একমাত্র সন্তান। ভাইপো মানে নিজেরই ছেলে। সুতরাং কোথায় কী সমস্যা হচ্ছে তা কাকা হিসেবে আমি যদি না দেখতে পারি, তাহলে আমিও ওর ব্যাপারে বোবা হয়ে যাবো।

দেওর-বৌদির যুক্তি পাল্টা যুক্তির মধ্যে পর্ণাভ বিপদে পড়ল। আনেক ভেবেচিন্তে পর্ণাভ ফরমান জারি করে বললো, “ছেলে হোক বা ভাইপো, ব্যক্তিটাতো এক। মোদ্যাকথা, ওর উপর অযথা কোনো চাপ বা ওর মেন্টাল টর্চারের কোনো পথ বা মত আমরা কেউই সমর্থন করবো না। আজ এটা ফাইনাল হয়ে গেল। কী তোমরা দু'জন একমত হলে তো?'

বসে আঁকো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেনি টুবাই। অথচ এ দিন বেলা সাড়ে দশটা পর্যস্ত পড়ে নিয়ে নিজেই পড়ার ঘরে বসে ছবি আঁকতে শুরু করলো। যাকে বলে মনমন খুশি খুশি। মন হলে সব করবে। যেমন এদিন টুবাইয়ের মন হল ছবি আঁকতে। ছুটির দিন। সকলেই বাড়িতে। ছুটির দিনে টুবাই এতক্ষণ পড়ার ঘরে এবং কোনো সাড়াশব্দ নেই। ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক । শোভনা একবার ঘরে ঢুকে দেখে আসে। কিন্তু কোনো কথা না বলে বেরিয়ে এসে পর্ণাভকে বলে, “দেখেছো তো? সব এ ঠাকুরপো'র প্রশ্রয়।”

--- কেন কী হল?

--- বসে আঁকো প্রতিযোগিতায় গেল না। অথচ ওর ঘরে গিয়ে দেখে এসো, নিজে ছবি আঁকছে।

---- ও কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আঁকছে, নাকি বসে?

---- কেন, চেয়ারে বসে?

---- তাহলে তো ও বসে আঁকো-ই করছে। শুধু প্রতিযোগিতা শব্দটা নেই।

বেলা বারোটা নাগাদ টুবাই আঁকা শেষ করলো । জল রঙ ব্যবহার করে একটা দারুণ সুন্দর ছবি এঁকেছে। ছবিটা নিয়ে টুবাই প্রথম তার বাবা বা মায়ের কাছে না গিয়ে সটান ছোটকার ঘরে ঢুকল। ছোটকাকে ছবিটা দেখিয়ে বললো, “এখন আঁকলাম, দেখো তো কেমন হয়েছে?' স্বর্ণাভ প্রথমে সাধারণভাবে ছবিটা দেখছিল, তারপর বিষয় ও রঙের ব্যবহার দেখে অবাক হয়। একটাও কথা না বলে একহাতে ছবিটা আর অন্য হাতে
টুবাইয়ের বাঁহাতটা ধরে ওকে প্রায় টানতে টানতে দোতলায় ওর দাদা-বৌদির ঘরের দিকে এগোতে থাকে। যেতে যেতে চিৎকার করে বলে চলে, “বৌদি, বৌদি, কোথায় তুমি? দেখো তোমার এই বাঁদরটা কী করেছে? শিগ্রি দাদার ঘরে এসো।” টুবাই ভয় পেয়ে যায়। সে ভাবছে, ছোটকা এমন করছে কেন! ছবিটা তো খুব খারাপ সে আঁকেনি? ভালো হলে নিয়ে যাচ্ছে কেন! আবার এ “বাঁদর” শব্দটাও ওর কানে ঠেকছে। একটা দোমনা দোমনা ভাব টুবাইয়ের মধ্যে। দোতলায় উঠে প্রায় ধাক্কা দেওয়ার মতো ওকে ওর বাবার ঘরে ঢোকায়। প্রায় পিছন পিছন শোভনাও এসে গেছে। ছবিটা সযত্নে বিছানার উপর রেখে স্বর্ণাভ গর্জে ওঠে, 'তোমরা শুধু ছেলেটার খারাপ দিকগুলোই দেখলে? দেখ তো কী অসাধারণ ছবিটাও এঁকেছে। বিষয় ভাবনার জন্য তো আশি নম্বর, বাকিটা রঙ। আমি এটা ল্যামিনেশন করে আমার ঘরে রাখব।” হাফ ছাড়ে টুবাই, আর ভাবে, “যাক বাবা, এতক্ষণ তাহলে প্রশংসা করার মহড়া দিচ্ছিল ছোটকা । পর্ণাভ ও শোভনা ছবিটা দেখে খুব খুশি। তবু শোভনা বলে বসে, “সেই তো বাবা আঁকলি, দশজনের সঙ্গে বসে আঁকলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হতো? ফৌস করে স্বর্ণাভ, “আর পারি না তোমাকে নিয়ে বৌদি। দশজনের মধ্যে বসে ওর বিষয় ভাবনা এরকম নাও আসতে পারতো? ও যে আঁকতে জানে, এবং বেশ ভালোই আঁকে, তা তো প্রমাণ হলো? আমি এই আঁকাটায় মুগ্ধ হয়েছি। আজ বিকেলেই ওকে একটা হাতঘড়ি কিনে দেব। বসে আঁকার পুরস্কার ।”

গরমের ছুটিতে টুবাইয়ের পিসতুতো ভাই বিট্টু এসেছিল ওদের বাড়িতে। বেশ ক'দিন ছিল। দু'জনের পিঠোপিঠি বয়েস বলে ওদের বেশ জমে ভালো। দু'জনে শুধু যে টিভি দেখে কাটায় তা নয়। বরং ওরা দু'ভায়েতে একসাথে হলে ইনডোর গেম বা কোনও কিছু রেখেছিল। বাবার মত নিয়ে পুরনো ব্যাটারিটা নিয়ে নেয় টুবাই। এবার দু'ভায়ের এ ব্যাটারি গুঁজে টুনি বাল্ব  জ্বালালো। টুবাই আর এক কদম এগিয়ে টুথপেস্টের খালি টিউব কাঁচি দিয়ে কেটে ফ্যানের ব্লেড তৈরি করলো। দুটো ব্লেডের মধ্যিখানে ফুটো করে তার দিয়ে শক্ত করে বাঁধলো। এবার পুরনো ব্যাটারির সঙ্গে কানেকশান করে দিতেই ব্লেড দুটো বনবন করে ঘুরতে শুরু করলো। মৃদু হাওয়া হল। ওরা একে একে ব্লেডের সামনে মুখ নিয়ে গিয়ে হাওয়ার স্পর্শ পেল। বিট্টু চিৎকার করে শোভনাকে ডাকে, “মামি, ও মামি, দেখে যাও আমরা দু'জনে কী বানিয়েছি! শোভনা এলো, কিছু বাদে। দেখল ওদের তৈরি ফ্যান, আর বললো--এসব করে সময় নষ্ট না করে দু'জনে বরং পড়ার বই নিয়ে আলোচনা কর।”

বিট্টুর মুখটা ছোট হয়ে গেল। টুবাই বলে, এটাতে আরো অনেক কিছু করবার আছে।” বিট্টু বলে, 'কী আবার করবি?” টুবাই বিজ্ঞের মতো উত্তর দেয়, 'ইংরাজীতে একটা কথা আছে ডিউরেবল। এখন আয় দু'জনে বরং এটা নিয়ে ভাবি। আর যাইহোক ছোটকাকে এই আবিষ্কারটা দেখাতেই হবে”।

বিট্টু ও টুবাই আবার কাজে নেমে পড়ে। ওদিকে শোভনা ডাকে, “বেলা গড়িয়ে গেল, স্নানে যা।” দু'জনেই প্রায় এক সুরে বললো, “একটু দেরি হবে। কাজটা তো শেষ করতে হবে।"





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন