শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

শাঁওলি দে। পারক গল্পপত্র


(১)
আলমারির ওপরের তাকটাও একবার ভালোভাবে দেখে নেওয়া দরকার। আপাতত ধূলো বালি ,মাকড়সার জাল দু’হাতে মেখে ক্লান্ত , কাহিল অবস্থা রুরু’র। দু’চারবার হাঁচিও হয়ে গেল। এমনিতেই ওর ডাস্ট অ্যালার্জি। মা জানতে পারলে আর আস্ত রাখবে না। তবু কাজটা আজ ওকে করতেই হবে। যে করে হোক খুঁজে বের করতেই হবে জিনিসটা।

বেশ পুরোনো বাড়ি রুরুদের। বাবা মা ঠাম্মা আর ও। রুরু’র এখন ক্লাস এইট। ও যখন আরও ছোট তখন দাদু চলে যায় না ফেরার দেশে। দাদু’র মুখটা হয়তো ও এতদিনে ভুলেই যেত ,কিন্তু ভুলতে পারে না। বাড়ির পেছনের জঙ্গল পরিস্কার করছিলেন নিজে হাতে। আচমকা সাপ এসে কামড় দেয় পায়ে। গোখড়ো হবে। খবর পেতে পেতেই সব শেষ।

নিচে বসার ঘরে বাবা দাদু’র একটা বিরাট ছবি লাগিয়েছে। হাসি হাসি মুখের দাদু। ওই ছবিটার দিকে তাকালেই মন কেমন করে ওর। ইশ দাদু থাকলে কত্ত মজা হত ! ঠাম্মা’র কাছে দাদুর অনেক গল্প শোনে ও। এখন তো মনে হয় দাদু ওর সঙ্গেই আছে।

   অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষ ছিলেন রুরু’র দাদু। সারাজীবন ঘুরে বেরিয়েছেন আর যেখানেই গেছেন নিয়ে এসেছেন কিছু না কিছু জায়গাটার স্মৃতি হিসেবে। রুরুদের বসার ঘরটা সাজানোই সেসব জিনিস দিয়ে। সবাই বলে প্রতাপ মুখার্জির মিউজিয়াম ওটা। কত দামী দামী জিনিস যে আছে তার ইয়ত্তা নেই। ছুটির দিন ওগুলো দেখতে দেখতেই সময় কেটে যায় ওর। ওগুলোকে ছুঁয়ে দেখে আর মনে মনে দাদুর স্পর্শ অনুভব করে দাদুর আদরের রুরু ,এই নামটাও তো নাকি দাদুরই দেওয়া।

  কিন্তু কিছুদিন হল এতটুকু শান্তি পাচ্ছে না রুরু। রোজ রাতে দাদুর স্বপ্ন দেখছে ও। প্রথম দিন দেখে তেমন কিছু মনে হয়নি , সকালে উঠেই ঠাম্মা’র ঘরে চলে গিয়েছিল। পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল ,’বলো তো কাল রাতে কার স্বপ্ন দেখেছি ?’
  ঠাম্মা নাতিকে চেনেন ,তাই  হেসে জবাব দিয়েছিল , ’কার আবার ? ওই যে মেসি না কে ,তার !’
‘না না ,একেবারেই না ,কাল রাতে আমি দাদু’র স্বপ্ন দেখেছি।’ ঠাম্মার নরম গালদুটো ধরে বলে ওঠে রুরু।
ঠাম্মার দীর্ঘশ্বাস পড়ে ,বলে ,’ইশ মানুষটা সেই যে গেল তারপর একদিনও আমার স্বপ্নে এল না। তা কী বলল তোর দাদু ?’
-‘নাহ ,তেমন কিছু না ,অবশ্য ভালো বুঝতেও পারিনি। তার আগেই ঘুম ভেঙে গেল তো !’ রুরু বলল।
কিন্তু ঘটনাটা আর সেই পর্যায়ে থাকল না। সেদিনের পর থেকে পর পর আরও কয়েকদিন দাদুর স্বপ্ন দেখল রুরু। আর যতদিন গেল ও বুঝতে পারল কী যেন ওকে বলতে চায় ওর দাদু ? কিন্তু কী সেটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারল না।


(২)
 -‘ঠাম্মা ,আমি তো রোজ স্বপ্নটা দেখছি তোমরা কেন বিশ্বাস করছ না বলো তো? ’ কাতর গলায় বলে রুরু।
-‘আমি তো বিশ্বাস করছিই , তোর বাবা মা’ই তো’ ,কথাটা শেষ না করেই থেমে যান রুরু’র ঠাম্মা। রুরু প্রায়  রোজই ওর দাদু’র স্বপ্ন দেখছে , তার মানে কি সত্যিই তিনি রুরুকে কিছু বলতে চান ? কিন্তু কী ? ছেলে ,বউমা তো ব্যাপারটাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। তবে কি তিনিই সাহায্য করবেন রুরুকে ?
-‘শোন দাদুভাই , চল আমরাই জিনিসটা খুঁজে বের করি ।তবে তুই ঠিক বুঝেছিস তো যে ওটাই খুঁজতে বলেছেন তিনি।’ প্রায় ফিসফিস করে কথাগুলো নাতিকে বললেন তিনি।
-‘হ্যাঁ ঠাম্মা। আমি কি রোজ ভুল দেখব নাকি ?’ রুরু এবার বেশ উত্তেজিত।
-‘বেশ চল তবে কাজ শুরু করা যাক।’ ঠাম্মা বলে ওঠেন।
-‘না ঠাম্মা ,খুঁজব আমি ,তুমি পাহারা দেবে ,যাতে কেউ দেখে না ফেলে। ঠিক আছে ?’

নাতির কথায় সম্মতি দেন ঠাম্মা। দুজনে লেগে পড়ে দাদু’র বলা জিনিস খুঁজতে।
প্রায় এক সপ্তাহ হল যখনই সুযোগ মিলছে সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজে চলছে ওরা। নাহ ,কোত্থাও নেই। থাকলে তো এতদিনে ... ! শুধু কাঠের আলমারির ওপরের তাকটাই যা দেখা হয়নি।
ঠাম্মা বলছেন ,’ওখানে থাকবে না রে ,ওই আলমারি তোর দাদু জীবনে ধরেনি।‘
-‘তাও দেখিই না  একবার, ‘ জোর গলায় বলে রুরু।


(৩)
সেদিন দুপুরবেলা ,বাবা মা দু’জনেই অফিসে। সারাদিন বৃষ্টি হয়েছে বলে রুরু’র স্কুলও তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গিয়েছে। প্রায় ছুটতে ছুটতে বাড়ি ফেরে ও। ঠাম্মা তখন ভাত ঘুমের আয়োজন করছে। রুরু চিৎকার করে বলে , ‘ঠাম্মা ,আজ খুঁজতেই হবে , নইলে দাদু শান্তি পাচ্ছে না কিছুতেই। ’
একটা কাঠের চারপেয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে রুরু। আলমারির ওপরের তাক থেকে যত জিনিস বের হচ্ছে তা হাতে করে দাঁড়িয়ে আছেন রুরু’র ঠাম্মা। জিনিস বলতে সব পুরোনো কাগজ পত্র ,রসিদ , ইলেক্ট্রিকের বিল। রুরু’র বাবার পুরোনো খাতা ,বই ছেঁড়া কাগজ আরও হাবিজাবি কত কী ! একটা করে জিনিস বের হচ্ছে আর রুরু’র মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। এখানেও যদি না পায় ,তবে তো দাদুর জিনিসটা আর পাওয়াই হবে না ওর। বিশ্বাস করে দাদু একটা কাজ দিল ,তাও পারবে না ও ? তবে কি ও দাদু’র তেমন নাতি নয় ? একটা সামান্য কাজ পারছে না ! আর ওইদিকে ওর দাদু কত মারাত্বক মারাত্বক কাজ করেছে ,গল্প শুনেছে রুরু। মনটা ভার ভার করেই শেষবারের মতো আরেকবার জিনিসগুলো নাড়াচাড়া করতে লাগল রুরু। পুরোনো খাতা বইগুলো ঝেড়ে ঝেড়ে দেখতে লাগল ,আর তখনি একটা বই থেকে টুপ করে নিচে পড়ে গেল জিনিসটা।
রুরু চমকে উঠে ঠাম্মা’র দিকে তাকাল ,ঠাম্মা’র মুখেও তখন যুদ্ধ জয়ের হাসি। টুল থেকে নেমে হাঁটু গেঁড়ে বসে ওটা দেখতে লাগল দু’জন।
ঠাম্মা বলে উঠল ,’আগেই ধরিস না ,ভয় করছে আমার।’
-‘ধুর ভয় কী ? কিচ্ছু হবে না’ বরাভয় দেখিয়ে সাহস দেয় রুরু। তারপর মেঝে থেকে আলতো হাতে তুলে নেয় ওটা। ওর দাদু’র বলে দেওয়া জিনিসটা।
একটা সাপের খোলস। খুব পুরোনো। সাদা ফিনফিনে ,ভেতরে সাদা দিয়েই সুক্ষ্ম আলপনা আঁকা। যেন ঈশ্বর নামের এক নিপূন শিল্পী তার সব প্রতিভা দিয়ে এঁকে দিয়েছেন ওটাকে। এতটাই পলকা যে মনে হচ্ছে  এখনই পাঁপড়ের মতো ভেঙে পড়বে। খুব সন্তর্পণে সেটাকে হাতে তুলে কাছ থেকে দেখতে লাগল ওরা। কড়া একটা গন্ধ নাকে এল। ঠাম্মা নাকে আঁচল গুঁজে বলল ,’পচে গেছে বোধহয়।’
রুরু ওটার দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক গলায় বলে উঠল -‘যত তাড়াতাড়ি পারি এটাকে ওখানে দিয়ে আসি ঠাম্মা। এখনই চলে যাই।’
ঠাম্মা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল -‘বৃষ্টি পড়ছে তো। এখন তো তোকে ওই পেছনে যেতে দেব না।’
-‘কিন্তু ঠাম্মা ,এখন না গেলে পরে যদি তাকে না পাই !’ কেমন একটা ঘোর লাগা গলায় বলে রুরু।
-‘পরে রেখে দিয়ে আসবি , তবু এখন যেতে দেব না। সেদিন এমনই বৃষ্টি পড়ছিল বলেছিলাম না তোকে দাদুভাই ! তোর দাদু’কে অনেক বারণ করেছিলাম ওই জঙ্গলে যেতে। আমার কথা শোনেনি সে। ’
রুরু হেসে ফেলে ,বলে -‘ঠিক আছে বাবা ,যা ভিতু তোমরা ! আমি পরেই যাব। রেখে দিয়ে আসব জায়গামতো যার জিনিস সে এসে নিয়ে যাবে।
বিকেল হয়ে এসেছে। বাবা মা অফিস সেরে এখনই ফিরে আসবে ঘরে। সাপের খোলসটা ঠাম্মার ঘরে রেখে হাত মুখ ধুয়ে অংক নিয়ে বসল । কাল রবিবার ,সকাল সকাল কাজটা শেষ করে ফেলতে হবে। দাদুকে আর অপেক্ষা করানো ঠিক হবে না !


(৪)
  সেদিন সারারাত স্বপ্ন দেখল রুরু। দাদু’র স্বপ্ন। দূরে একটা সরু আলোর রেখা। তার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে প্রতাপ মুখার্জী , রুরু’র দাদু। হাত বাড়িয়ে রেখেছে সামনের দিকে আর রুরু গিয়ে সে হাতের ওপর তুলে দিচ্ছে সেই সাদা ফিনফিনে সাপের খোলস নাকি ওটা একটা আস্ত সাপ ? সকালে উঠেই দৌড়ে ঠাম্মার ঘরে গেল রুরু। তারপর খোলসটা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। পেছন থেকে ও শুনতে পেল ঠাম্মা বলছে ,’রুরু   সাবধান।’

অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় প্রতাপ মুখার্জীর দূর্বলতা বা নেশা সবটাই ছিল সাপ। কত সাপ যে তিনি ধরেছেন তার ঠিক নেই। যেখানেই খবর পেতেন ছুটে যেতেন ধরতে ,কারো বারণ শুনতেন না। কেউ মানা করলে বলতেন ,’আরে বাবা , ভয় নেই কোনো আমি সাপেদের ভাষা বুঝি। কথা বলি ওদের সঙ্গে।’
কেউ বিশ্বাস করত ,কেউ করত না। তবে কোথাও সাপ ঢুকে পড়লে সবার আগে তাঁরই ডাক পড়ত। সাপ তো ধরতেনই তিনি ,তার সঙ্গে আরও একটা কাজ করতেন তা হল সাপের ছেড়ে যাওয়া খোলসগুলো জমাতেন। তারপর কোনো এক বৃষ্টির দিনে জঙ্গলে গিয়ে রেখে আসতেন সেই খোলস, পরদিন আর ওখানে সেই খোলসটি আর খুঁজে পেতেন না। এটা দেখতে দেখতে ওঁর দৃঢ় ধারনা হয়েছিল সেই ছেড়ে যাওয়া খোলস নিয়ে যায় জোড়া সাপের একটি। জমিয়ে রাখে নিজের আপনজনের স্মৃতি হিসেবে। যেমন করে আমরা প্রিয়জনের ছেড়ে যাওয়া জিনিস আগলে রাখি ঠিক তেমন।
কিন্তু আলমারিতে রেখে দেওয়া খোলসটি তিনি কোনো কারণে জঙ্গলে রেখে আসতে ভুলে যান ,আর তারপর সাপের কামড়ে ...

রুরু বাড়ির সামনের কাঠের গুঁড়িটার ওপর বসে আছে অনেকক্ষণ। একটু দূরে দাদু’র স্বপ্নে বলে দেওয়া জায়গায় রেখে এসেছে খোলসটা। এতক্ষণ কি ওর প্রিয়জন এসে ওটা নিয়ে গেছে ? দাদু কি ওঁর কাজটা শেষ হয়েছে দেখে শান্তি পেল ? এইসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে কখন সন্ধে হয়ে এসেছে টেরই পায়নি ও।
পিঠে একটা হাতের স্পর্শে চমকে ওঠে ও। তাকিয়ে দেখে  ঠাম্মা দাঁড়িয়ে। দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে রুরু ঠাম্মাকে। তারপর ধীরে ধীরে বলে ,’সাপটা তো ওর প্রিয়জনের ফেলে যাওয়া জিনিসটা পেয়ে যাবে ,কিন্তু আমরা কি আমাদের প্রিয়জনের রেখে যাওয়া কিছু পাব না , ঠাম্মা ? দাদু’র স্বপ্নও কি আর দেখব না ? ’
ঠাম্মা নাতিকে আদর করতে করতে বলে ,’তুই তো তোর দাদুর প্রিয় জিনিস ,যা আমরা আগলে রেখেছি ,বুঝলি।’
ঠিক ওই মুহুর্তে  দূরের আকাশে একটা তারা ঝিকমিক করে জ্বলে উঠল। ওই তারাটাই বুঝি রুরু’র দাদু । দূর থেকে রুরুকে দেখছেন তিনি ,যে কিভাবে তার নাতি তারই এক প্রিয়জনকে আগলে রেখেছে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন