শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। পারক গল্পপত্র


আজ নিয়ে পাঁচদিন। এখনও কুড়ি দিন। বেশিও হতে পারে। কিছুই বলা যাচ্ছে না। নৃপেন এক মুহূর্তের জন্যেও বাইরে বের হয় নি। পাড়ার ছেলেরাই তাকে চাল ডাল সবজি ওষুধ এনে দিচ্ছে। একজনের সংসার। তিন চার কেজিতেই অনেক দিন চলে যায়।

রাস্তাঘাট ফাঁকা। বাড়িতে লোকের আসা যাওয়া বন্ধ। পাড়ার ছেলেরা রান্নার বৌটাকে আসতে দিতে চাইছিল না। নৃপেন ওদের জানায় তাহলে না খেয়ে মরতে হবে। এই সত্তর বছরে তার পক্ষে রান্না করে সম্ভব নয়। অবশেষে তারা রাজি হয়।

একটু গা গরম মনে হলেই মাথায় চিন্তার পাহাড় ভেঙে পড়ে। যদি সত্যিই এইসময় কিছু একটা হয়ে যায় তাহলে বিনা চিকিৎসায় মরতে হবে।

দু তিন হল নৃপেন ভয়ে ঘরের জানলাগুলো পর্যন্ত খুলছে না। যদি হাওয়ায় ভাইরাস ভেসে এসে তার ঘরে ঢুকে যায়। বন্ধ ঘরের মধ্যে নৃপেন পুরোনো দিনের গান শোনে। মন দিতে পারে না, তবুও চালিয়ে রাখে। গান বাজলে মনে হয় বাড়িটা এখনও বেঁচে আছে।

সকালের মুড়ি খেতে খেতে নৃপেনের মনে হলো কেউ যেন জানলা ঠেলছে। উঠে গিয়ে জানলাটা খুলতেই দেখে একটা বছর বারোর ছেলে।
----- কেমন আছো দাদু ?
----- তোমাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না বাবা।
ছেলেটা একটা ফ্ল্যাটের দিকে আঙুল দেখিয়ে  বলল ----- ওই ফ্ল্যাটটার চারতলায় আমরা থাকি।
----- কিছু বলবে বাবা ?
----- এই তিন দিন আপনি এই জানলাটা খোলেন নি কেন?
----- তুমি কি করে জানলে ?
----- আপনি তো আমার সূর্য।
----- মানে ?
----- আপনি রোজ ঘড়ি ধরে সাড়ে পাঁচটায় ওঠেন। আর আমার মা বলে, সূর্য উঠে গেছে। এবার উঠে পড়। আমি তো প্রথমে বিশ্বাসই করতে চাই নি। এত ভোরে সূর্য ! একদিন মা জানলার কাছে এসে মানেটা বুঝিয়ে দিল।
কতদিন পরে নৃপেন আজ হাসলো। ----- তোমার ভয় করছে না বাবা ? বাইরে বেরিয়েছ কেন ?
----- মা বলল, দাদুর খোঁজ নিয়ে আয়।
----- এই সময় বাইরে না বেরোনই ভালো।
----- ভয়ের কিছু নেই দাদু। প্রতিটা মানুষ তার নিজের নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাক। আর নিয়ম মেনে চলুক। তাহলেই আমরা এই বিপদ থেকে উদ্ধার হয়ে যাব। সরকারের কাজ মানুষকে সাবধান করা। মানুষের কাজ নিয়ম মেনে ঘরে থাকা। আমার কাজ ঘরে থেকে পড়ে যাওয়া। আপনার কাজ নিয়ম মেনে ঘরের জানলাগুলো খোলা।

নৃপেনের মনের মধ্যে যেন একটা শক্তি এলো। তার খোঁজ নেওয়ার মানুষও তাহলে আছে। নৃপেন দেখলো, জানলা দিয়ে আসা রোদ ঘরটাকে আলো করে দিয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন