শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

মাস্টার মহাশয়ের চিঠি অমিয়ভূষণকে : এণাক্ষী মজুমদার। পারক গল্পপত্র


ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে 'কোচবিহারের অমিয়ভূষণ'কে তাঁর মাস্টারমশায় উষাকুমার দাসের লেখা মূল্যবান একটি চিঠি এই প্রথম প্রকাশিত হচ্ছে।

১৩৬৬ সনের ২৫শে বৈশাখ নিও-লিট পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড অমিয়ভূষণের 'দুখিয়ার কুঠি' উপন্যাস প্রকাশ করে। মাস্টারমশায়ের বাড়িতে গিয়ে বইটি তাকে উপহার দিয়ে এসেছিলেন অমিয়ভূষণ। তারপর এই চিঠি।


উষাকুমার দাস
পাটাকুড়া
কোচবিহার

১৯/৬/ ১৯৫৯

কল্যাণীয়েষু,

ম্নেহের গোরা, তোমার “দুখিয়ার কুঠি” পড়ে তৃপ্তি পেয়েছি। ডাকঘরের চাকরিতে শহর থেকে দূরে এখানে ওখানে তোমাকে কাটাতে হয়েছে বহুদিন। অনেকে সেটাকে নির্বাসন বলে মনে করে। আমি বিস্মিত হয়েছি, সেসব জায়গায় ঘুরে দুঃখ তো তুমি পাওই নি, বরং এসব অপরিচিত বা স্বল্প-পরিচিত অঞ্চলের প্রবহমান সহজ জীবন-স্রোতকে প্রাণ দিয়ে অনুভব করেছ, বুদ্ধি দিয়ে বিশ্লেষণ করেছ, তোমার সাহিত্যিক প্রতিভায় এ দিয়ে গড়ে তুলেছ একটি অক্ষয় কথার মালা। সভ্যতা এগিয়ে চলে, যন্ত্রদানবের সাহায্য-পুষ্ট আধুনিক মানুষ প্রকৃতির লীলা-নিকেতনগুলিকে কৃত্রিম নাগরিক সুযোগ-সুবিধায় পাকিয়ে তোলে। প্রাণ-ধারণের মানের উন্নতিই এই সভ্যতার লক্ষ্য। কিন্তু মানুষ পেল কী? বাইরের পালিশের চাকচিক্য---এর স্থায়িত্ব কোথায়? সেকালের প্রকৃতির লীলা-ঘরে মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যে কপটতা ছিল না৷ ভালবাসাও ছিল আবার হিংস্র শত্রুতাও ছিল। কিন্তু দুই-ই খোলাখুলি--স্তালিনের সঙ্গে হিটলারের অনাক্রমণ-চুক্তি বা স্তালিনের সঙ্গে ইঙ্গো-মার্কিন বন্ধুতা তখনকার অশিক্ষিত মানব-মনের চিন্তার অতীত ছিল। ডাঙ্গর আই-এর চরিত্র নিয়ে রংবরের মাথাব্যথা নেই। রংবরের চোখে সে দেবী, হ্েচ্ছায় রংবর তার ক্রীতদাস। ফুলমতীও সহজ ভাবে সংসারে স্থান পেয়েছে। ডাঙ্গর আই বা ফুলমতীর কৃতকর্মের ভালমন্দ, পাপপুণ্য বা ফলাফল তাদের ব্যক্তিগত মনোজগতের ব্যাপার। সমাজ তাদের উপর খড়গ উদ্যত করে নি। সমাজিক উদারতার অভাবে তাই এর কুন্রী দিকটা বড় হয়ে সামাজিক-জীবনে উচ্ছুঙখলতা এনে দেয় নি। জলপরীর সঙ্গে মাতালুর সম্পর্ক বেহিসিবি হলেও অস্বাভাবিক নয়। মাতালু তলিয়ে গেল, কিন্তু তার বংশ যেন থেকে গেল জলপরীর ঘরে। আমাদের সভ্য সমাজ এদের স্বীকার করতে ভয় পায়। কিন্তু অতি-সভ্য সমাজে এ জাতীয় জীবনযাত্রার চল চোখে পড়ে। শুধু পূর্বাহ্নে আইন-আদালতের মাধ্যমে অধিকার কায়েমী করে নিতে হয়। বিচ্ছেদ ও মিলন, মিলন ও বিচ্ছেদ সেখানে পারিবারিক জীবনে হাতধরাধরি করে চলে ক্ষুদ্র স্বার্থচন্তাকে উপলক্ষ্য করে। উপন্যাসের গোড়ার দিকে ইতিহাসের কয়েক পংক্তি কুচবিহারের ইতিহাস আলোচনার পথে আলোকপাত করেছে। কুচবিহারীর কারও কারও মুখে ভুটিয়ার ছাপ অস্বীকার করা যায় না। ভূমিকায় অল্পকথায় ব্যাকরণের যে-মুলসূত্রের সরল ব্যাখ্যা দিয়েছ তাতে কুচবিহারী ভাষা বুঝতে বেগ পেতে হবে না কাউকে। ব্যাকরণ খাটছি অনেক দিন থেকে, কিন্তু কুচবিহারী ভাষা যে বাংলাভাষাই তা জানলেও তাকে ব্যাকরণের সূত্রের ভিতর দিয়ে এত সহজভাবে বুঝবার চেষ্টা করিনি কখনও।

পরিশেষে তুমি সেদিন বলেছিলে, আপনি যা অনুভব করতেন, অথচ লিখতে পারেননি, আপনার ছাত্ররা তা প্রকাশ করবার ভারপ্রাপ্ত। কথাটা সত্য বলে গ্রহণ করেছি। তোমার শুভ কামনা করি। ভগবৎ-চরণে প্রার্থনা জানাই তোমার লেখনীর উৎস-মুখে ভাষা ও ভাবের প্লাবন সংযুক্ত হয়ে সাহিত্য-ক্ষেত্রকে সরস করুক ও নব নব সৃষ্টি-মাধূর্ষে ভরিয়ে তুলুক। স্নেহ নিও।
শুভাকাঙ্ক্ষী,
মাস্টার মশায়।



চিঠির সম্বন্ধে বলার কিছু নেই। কিছু বলা দরকার পত্রলেখক সন্বন্ধে। আর তাঁর সম্বন্ধে কিছু বলতে যাওয়ার মানে অন্য এক কোচবিহারকে ছুঁয়ে আসা।

“আমাদের এই জেনকিন্স স্কুলটা ভালো স্কুল ছিল। ষাট বছর পরেও আমার শিক্ষকদের অনেকেই আমার অনুভূতিতে এখনো জীবিত। তাদের সম্বন্ধে এখনো আমার কৃতজ্ঞতা মেশানো ভালোবাসার ভাব মনে আছে।”-- “নিজের কথা” (লাল নক্ষত্র সেপ্টেম্বর ১৯৮৬) প্রবন্ধে লিখেছিলেন অমিয়ভূষণ।

এইরকম এক শিক্ষকের নাম উষাকুমার দাস। যেরকম শুনেছি, কলকাতার দিকে কোথাও, নাকি খোদ কলকাতাতেই, তাঁর বাড়ি ছিল। জেনকিন্স স্কুলে চাকরি নিয়ে কোচবিহারে এসেছিলেন। কবেকার কথা সেটা? বলা কঠিন। ১৯২৭-২৮-এর আগে তো বটেই। তাঁর সঙ্গে অমিয়ভূষণের প্রথম দেখা ১৯২৭ না ১৯২৮-এ, অঙ্কের ক্লাসে। “অঙ্ক কষাতেন উষাকুমার দাস মশাই। তাঁর মিষ্টি গলা আমাদের ভালো লাগত, কিন্তু প্রথম অঙ্কের পরীক্ষায় আমি পাঁচ পেলাম।”

এই 'মিষ্টি গলা' মৃদু ধীর সুরেলা স্বর শেষজীবন পর্যন্ত ছিল, এরকম বলেছেন অমিয়ভূষণের পুত্রকন্যারা, অপূর্বজ্যোতি ও মীনাক্ষী। বয়সের দরুন তখন হয়তো একটু ভাঙা-ভাঙা শোনাত। (সে হল গত শতকের ছয়ের দশকের কথা।) শ্যামবর্ণ একহারা সুপুরুষ চেহারা ছিল 'উষাবাবু'র, সদাবিন্যস্ত কেশ, যত্নক্ষৌরিত গন্ড। নিষ্কলঙ্ক, সাদা, ধবধবে ধুতি-পাঞ্জাবি তাঁর চিরকালের পোশাক। শৌখিন তাকে বলে না, কিন্তু সবই সুশৃঙ্খল, পরিচ্ছন্ন, যত্নলালিত, আকার-অবয়বে হোক কিংবা চলনে, অথবা চিন্তায়। কতকটা, বলা চলে, বিগত যুগের পিউরিটান ক্রিশ্চানদের মতো মনোভঙ্গি।

উষাবাবু ব্রাহ্ম ছিলেন। তখনকার দিনে সেরকম একটা যেন চল ছিল বলে শুনেছি। কোচবিহারে ব্রাহ্ম ছিল। একাধিক ব্রাম্মসমাজ ছিল। আরো বড় কথা, কোচবিহার রাজ্যের ঘোষিত ধর্ম, রাজার ধর্ম ছিল ব্রাহ্মধর্ম। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের মধ্যেও ব্রাহ্ম ছিলেন। ফলে কলকাতার দিক থেকে অনেক কৃতবিদ্য ব্রাহ্ম কোচবিহারের স্কুল-কলেজে নিযুক্তি পেয়ে এ দেশে আসতেন। সে ধারাটা গত শতকের প্রথম দুই দশক পর্যন্ত বজায় ছিল বলে মনে হয়। ব্রাহ্মদের মধ্যে তখন লেখাপড়া জানা লোক, যোগ্য লোকের অভাব ছিল না৷ অনুমান করি, কিন্তু প্রমাণের অভাবে অনুমানকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে পারি না। ব্রাহ্মদের মধ্যে পরস্পরকে এগিয়ে দেবার একটা প্রবণতা ছিল, যদিও তা যোগ্যতাসাপেক্ষে। এমনও হতে পারে, শুধু জীবিকার নিশ্চয়তাই নয়, কোচবিহার ব্রাহ্ম-রাজ্য হওয়াতে কলকাতা থেকে অনেক দূরে হলেও এ রাজ্যে আসতে তাদের স্বাভাবিক উৎসাহ জন্মিয়ে থাকবে। তাকে হয়তো “রিফর্মিং জীল” বলে। তবে ইতিহাসের বিষয়ে অনুমান নিয়ে বেশিদূর এগোনোটা কাজের কথা নয়। যেরকম শুনেছি, তোর্সা নদীর ধার ঘেঁষে, কেশবাশ্রমের কাছাকাছি 'বিধানপন্লী' নামে ব্রাহ্ম ভদ্রলোকদের এক উপনিবেশ স্থাপিত হয়েছিল পূর্বতন মহারানি সুনীতি দেবীর যত্নে। (এ 'বিধান নববিধান' অনুপ্রেরিত বই তো নয়) পুরনো পারিবারিক শ্রুতির সঙ্গে মিলিয়ে বুঝতে পারি উষাকুমার দাসের চিঠির মাথায় যে “পাটাকুড়া, নামক পল্লীর উল্লেখ, যে পল্লীতে তিনি আমৃত্যু বাস করেছেন, তা সুনীতি দেবীর “বিধানপল্লী” বটে। স্থানিক ইতিহাসের কোনো গবেষক হয়তো একদিন তথ্যের পাকা ভিত দিয়ে “শোনা কথা”র প্রামাণ্যতা যাচাই করবেন।

অন্যদিকে, এরকম পারিবারিক সূত্রে জেনেছি, কোচবিহারের ইতিহাসের এ পর্বটি চিরস্থায়ী তো নয়ই, দীর্ঘস্থায়ীও হয়নি। মহারাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ ভূপ বাহাদুরের রাজতৃকালের (১৯১১-১৯১৩) পরে, বিশেষ করে জিতেন্দ্রনারায়ণ মহারাজার মৃত্যুর পরে রাজমাতা ইন্দিরা দেবী রিজেন্ট মহোদয়ার আমল থেকে, কোচবিহারে ব্রাহ্মদের আনাগোনা এবং প্রতিপত্তিতে লক্ষ্যণীয় বাধার সৃষ্টি হয়।

এটা আশ্চর্যের যে কোচবিহারের সামাজিক ইতিহাসের এই দিকটি কী করে বা গবেষকদের নজরের আড়ালে থেকে যাচ্ছে। “কোচবিহার বিবাহ” নিয়ে এখনো
লেখালেখির, সত্যি কথা বললে রোমন্থনের, অন্ত নেই। কিন্তু কোচবিহার রাজ্যে ব্রাহ্মধর্মের বিস্তার, তার প্রভাব, সে সংক্রান্ত কোনো সামাজিক টানাপোড়েন, অথবা কোচবিহার রাজ্যের ব্রাহ্ম-অতীতের বিলুপ্তি-এমন সব বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

কিন্তু আমরা 'উষাবাবু'র কথাতে ছিলাম।

সেটা ১৯২৯ সালের কথা। তখনকার দিনের ফিফথ্‌ ক্লাসে উঠে, অর্থাৎ ক্লাসে মাস্টারমশাই এলেন।” অঙ্কের ক্লাসের তিনি “মাস্টারমশাই ছিলেন, গুরু নন। “মণিমাল্য” হাতে উষাবাবু আমার গুরু হলেন।”--১৯৬১ সালে জেনকিন্স স্কুলের শতবর্ষ স্মরণিকায় প্রথম পরিচ্ছেদ” প্রবন্ধে লিখেছেন অমিয়ভূষণ। ভাবার মতো বটে। “মণিমাল্য, হাতে উষাবাবু আমার গুরু হলেন'-- এই বাক্যটির কথা বলছি। কারণ এ লেখা অমিয়ভূষণের, শব্দের ব্যবহারে যার সতর্কতা ছিল।

আসলে ব্যাপারটা এই যে সে ভদ্রলোক মাস্টার মাত্র ছিলেন না, সিলেবাস শেষ করিয়ে দেওয়াকেই শিক্ষাদান মনে করতেন না। ক্লাস এইটের শিক্ষাদপ্তর-নিদিষ্ট বাংলা পাঠ্যপুস্তকের নাম ছিল 'সাহিত্যচয়ন'। এই বইয়ের উপরন্তু  উষাকুমার ছাত্রদের জন্য পাঠ্য করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের 'গল্পগচ্ছ' ও 'কথা ও কাহিনী' এই দুই পুস্তক। 'আজকাল বোধহয় এমন বোঝা চাপানোকে cruelty to animals বলা হবে। বালখিল্যদের রবীন্দ্রসাগরের তীরে নিয়ে যাওয়ার এমন আয়োজনকে বুদ্ধিমানেরা নিরর্থক বলবেন হয়তো। কিন্তু উষাবাবু যদি সে নিরর্থক কাজ করে থাকেন তবে D.P.I. তার বিচার করবেন। আমার মনে আছে 'কথা ও কাহিনী'-তে একটা কবিতায় ছিল : মোরে তুমি হে ভিখারী মার কাছ হ'তে টানি / করেছো আপন অনুচর। এরকম একটা ব্যাপার ঘটেছিল।” এত পড়ার ও উষাবাবুর এত পড়ানোর প্রভাব অন্য ছাত্রদের উপরে কী হয়েছিল কে বলবে, কিন্তু অমিয়ভূষণের উপরে তো তাঁর প্রভাব ছিল খুব স্পষ্ট। “রবীন্দ্রনাথের দিকে এভাবে ঠেলে দেওয়া কি ভালো হয়েছে? সেই সাগরে অবগাহন
করছি বটে, নাকানি-চোবানিও কম খেতে হচ্ছে না জীবনে।”

অমিয়ভূষণ লিখেছেন, “আমার ধারণা উষাবাবু D.P.I. বলতে Discretion in Preceptor's Instruction বুঝতেন।” শুধু এই পুস্তক নির্বাচনের ব্যাপারেই নয়। “ক্লাস নাইনের হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষায় বাংলার প্রশ্নপত্র দেখুন। অপঠিত বিষয়ের সারমর্ম লিখতে দিয়েছেন তিনি। এক নম্বরে দেখতে পাচ্ছি “শাজাহান” কবিতার একটি স্তবক অন্যটিতে শ্রীকান্ত চতুর্থ পর্বের বৈষ্ণবী কমললতার চরিত্রবর্ণনা। ছাত্ররা কি উত্তর দিতে পেরেছিল? পরে উষাবাবু আমাকে যা বলেছেন তার সারমর্ম এই : চারাগাছ একহাত উঁচু বলে কি তার জন্য টিনের ছাদ এঁটে আকাশকে তার মাপমতো করে দিতে হবে? “শাজাহান” কবিতার একটি স্তবক, সেই পওক্তিগুলির তাৎপর্য, অমিয়ভূষণ লিখেছেন, “এ নিশ্চয়ই আকাশের উদারতার সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।”

অমিয়ভূষণের স্কুল-জীবন সাঙ্গ হয়েছিল ১৯৩৪-এ। কিন্তু উষাবাবুর সঙ্গে যোগাযোগটা থেকেই গিয়েছিল। (সেটা যদিও রোজকার দেখাসাক্ষাতের মতো ব্যাপার ছিল না) তার একটা কারণ অকৃতদার উষাকুমার অন্য ব্রাহ্মদের মতো চাকরি-জীবনের শেষে কোচবিহার ছেড়ে চলে যাননি। বরং, যেমন শুনেছি, সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরে রামভোলা স্কুলে পড়াতেন তিনি। পড়িয়েছিলেন কিছুদিন। তাঁর মৃত্যুও হয় এই শহরে।

কিন্তু এটা, এই লেখাটা, একটা অসম্পূর্ণ লেখা হল বুঝতে পারছি। আসলে আগ্রহ যখন এল তখন বড় দেরি হয়ে গেছে। সেই অন্য কোচবিহারে যাবার পথটা চিনিয়ে দেবার মতো কেউ তো আর ছিল না!

রবীন্দ্রনাথ
শ্রীউষাকুমার দাস

এ মর্ত্যজগতে প্রচারিলে তুমি
অমর্ত্যলোকের বাণী, হে মরমী কবি;
নন্দনকানন হতে পুণ্য স্বর্গ-ছবি
দিলে আনি, ধুলিময় এ মর্ত্যভূমি
স্নেহময়ী মাতুরূপে দেখা দিল আজ।
গন্ডিবদ্ধ জীবনের শত বিফলতা
ঘুচায়েছ দানে দানে, এই তব কাজ।
বিশ্বের সবার সনে যোগসূত্রখানি
তোমার প্রসাদে আজ মন লয় মানি।
মরণের বিভীষিকা দূরে সরে যায়,
শ্যামরূপ লেখা পড়ে হিয়ার পাতায়
সার্থকজীবনে তব বিচিত্র সম্ভার
রেখে গেছ, হে রবীন্দ্র, লহ নমস্কার।

লুপ্তোদ্ধারও সাহিত্য-পত্রিকার সম্পাদকের কর্তব্য হতে পারে। সে কথা ভেবেই পারিবারিক সংগ্রহ থেকে দেওয়া গেল উষাকুমার দাসের একটি রচনা, যা ছাপা হয়েছিল রামভোলা বিদ্যালয়ের পত্রিকা কল্যাণ-এর “রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী সংখ্যা”য় মে ১৯৬১)। তখন ঢের বয়স হয়েছে “মাস্টারমশায়” উষাকুমার দাসের, কিন্তু রামভোলা বিদ্যালয়ের উৎসবের পরিচালনার ব্যাপারে যেমন, তেমন জেলাস্তরে আয়োজিত সরকারি
অনুষ্ঠানটিতেও, ১৯৫৯-৬০-৬১ সালে, দুই ছাত্র অশনিভূষণ এবং অমিয়ভূষণের পাশে তার ধীর সৌম্য মূর্তিটি সকলের চোখে পড়েছিল।

লেখক হবার, লেখক রূপে প্রতিষ্ঠা লাভের সমস্ত যোগ্যতাই তাঁর ছিল বলে মনে হয়, কিন্তু মনে হয় না সেরকম কিছু তাঁর জীবনে ঘটে উঠেছিল। আর, যদি তা হয়েও থাকে জানতে পারছি কই? অন্তত জেনকিন্স স্কুল-পত্রিকা 'অঞ্জলি'র প্রাচীনতর কালের সংখ্যাগুলি নেড়েচেড়ে কি কিছু পাওয়া যাবে? বলা মুশকিল। সেগুলি কি কোথাও আছে? অতীতের ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের একটা স্বাভাবিক উদাসীন্য আছে, আর তার ফলে এমন অনেক কিছুই হারিয়েছে যা কোচবিহারের সমাজ-ইতিহাসের আকর-উপাদান হতে পারত।

৮টি মন্তব্য:

  1. এমন এক বিরল অপ্রকাশিত ও অমূল্য সম্পদ আমাদের উপহার দেয়ার জন্য শুধু ধন্যবাদ নয় কৃতজ্ঞতাও আপনার প্রাপ্য। মহান সাহিত্যিক অমিয়ভূষণের স্বার্থক উত্তরসূরী হিসেবে যোগ্যতার সাথে আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলা সাহিত্য জগত্‍ সে জন্য আপনার কাছে ঋণী থাকবে। ভাল থাকবেন।

    উত্তরমুছুন
  2. ধন্যবাদ ম্যাম অপ্রকাশিত পত্র আমাদেরকে উপহার দেওয়ার জন্য। ওনার জীবনের নানান দিক আপনি 'বনেচর'বইটির মধ্যে তুলে ধরেছেন।

    উত্তরমুছুন
  3. অমিয়ভূষণকে চিনতে, জানতে এইসব অপ্রকাশিত তথ্য অতি আবশ্যিক। এণাক্ষী মজুমদার তাঁর 'বনেচর' পিতৃ-জীবন কাহিনীতে মানুষ ও সাহিত্য-সাধক অমিয়ভূষণের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়েছেন। আমরা কৃতজ্ঞ।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. এণাক্ষী মজুমদার৮ জুলাই, ২০২০ ১১:০৫ AM

      আপনাদের মন্তব্যগুলি পড়তে পড়তে মনে হচ্ছে যা আমার সাধ্যাতীত বলে মনে হয় তাও হয়তো অসম্ভব হবে না। অমিয়ভূষণ-চর্চায় সমস্ত রকম ভাবে সহায়তা করার জন্যই আমার এই ব্রতধারণ। তন্নিষ্ঠ পাঠককে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি

      মুছুন
  4. দিদিকে অনেক অনেক ধন্যবাদ লেখাটি আমাদের 'পারক'-এ প্রকাশ করবার অনুমতি দেবার জন্য। এরকম আরও অনেক লেখা আপনার কাছে প্রত্যাশা করি, আমরা সমৃদ্ধ হই। ভালো থাকবেন দিদি।

    উত্তরমুছুন
  5. সমৃদ্ধ হলাম দিদি। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

    উত্তরমুছুন
  6. এবার আমিএকটা তথ্য দিই। দাদু (অমিয়ভূষণ) নয়ের দশকের শেষদিকে প্রতিদিন বিকেলে আমাকে অর্থাৎ তাঁর বড়নাতিকে নিয়ে হাঁটতে বেরোতেন। একদিন আমরা কেশবাশ্রম বা রাণীবাগানের সামনে দিয়ে হাঁটছি, দাদু হঠাৎ একটা বাড়ি, যার চেহারা বেশ জীর্ণ ও হতশ্রী, তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বললেন "ভুকু, এটা কার বাড়ি জানিস?" বলে নিজেই জানালেন ওটি তাঁর প্রিয় শিক্ষক ঊষাবাবুর বাড়ি। বাড়ির সামনে অলস ভঙ্গিতে বসেছিলেন এক যুবতী। দাদু তাঁকে বললেন "ঠিক ত? এটা ঊষাবাবুর বাড়ি কিনা?" ভদ্রমহিলা খুব অভিমানী সুরে বললেন, "খোঁজ নেন কেন? ওঁর খোঁজ একদম নেবেন না। লোকে ত ভুলেই গেছে ঊষাবাবকে!" অভিমানর সুর এতটাই চড়া ছিল যে, প্রথম প্রতিক্রিয়ায় শ্রোতার রাগ হওয়াটাও অসম্ভব ছিল না। দাদুর মুখের অভিব্যক্তি দেখে আমারও মনে হয়েছিল যে, ঐ আপাত বিরক্ত কণ্ঠস্বরের পেছনের দুঃখ এবং অভিমানকে চিনে নিতে তাঁও কয়েক দন্ড সময় লেগেছিল। যা হোক, বুঝে নেয়ার পর দাদু ওঁকে বলেছিলে, অত্যন্ত প্রত্যয় এবং ঊষাবাবুর ছাত্র হওয়ার গৌরবের সঙ্গে, "আমি অমিয়ভূষণ মজুমদার। স্বয়ং আমি মনে রেখেছি তাঁকে এবং আমি গর্বিত যে, আমি ঊষাবাবুর ছাত্র ছিলাম। কাজেই, এমনি কথা কখনোই ভাববেন না যে, কুচবিহার আছে অথচ ঊষাবাবু তাঁর প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে।" ভদ্রমহিলা, সম্ভবতঃ ঊষাবাবুর নাতনি, খুব খুশি হয়েছিলেন একথা শুনে। য্রন এরকম কিছু শুনবার জন্য বহুকাল অপেক্ষা করছিলেন। দাদুকে বলেছিলেন, "আপনার পরিচয় না দিলেও চলত।" উনি এবং ওঁর স্বামী একযোগে বলেছিলেন যে, দাদুর প্রতিটি বই খুব যত্নের সঙ্গে ওঁদের বাড়িতে রক্ষিত হয়। আজ এই লেখা পড়ে বহুবছর আগের সেই বিকেলটা মনে পড়ে গেল।

    উত্তরমুছুন
  7. এই চিঠি এক অমূল্য সম্পদ। যা যেকে জানা গেল অনেক না-জানা কথা। এণাক্ষীদি সেই সম্পদ আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন পাঠকদের জন্য। আমরা এরজন্য ওঁর কাছে কৃতজ্ঞ ও ঋণী থাকলাম।

    উত্তরমুছুন