শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

চৈতালী চট্টোপাধ্যায়। পারক গল্পপত্র


মাধব যখন খুব ছোট,স্কুলেও যায় না আর কী,সেসময় থেকেই ওর ডিটেকটিভগিরি শুরু। বাবা টিচার ছিলেন বিবেকানন্দ হাইস্কুলের। যৌথপরিবারের যাবতীয় তন্তু ছিঁড়ে ফেলে বেরিয়ে এসেছিলেন মাধবের বাবা ভবভূতি। নদীয়া জেলায় চাকরি নিয়েছিলেন তিনি। কোথাও কিছু না পেয়ে,খড়কুটোর মতো এটাই আঁকড়ে ধরে, স্ত্রীর মৃদু, নিরীহ আপত্তির তোয়াক্কা না করে সংসার এনে ফেললেন রানাঘাটে।
মায়ের লক্ষ্মীমন্ত স্বভাব আর অভাব এই দুইয়ে মিলিয়ে টেনেটুনে কেটে যেত ওদের। ভবভূতির মাইনে কম, কিন্তু বাড়ির বাইরে অনেকটা সময় থাকতে হতো। রোজ চূর্ণীনদী পার হয়ে স্কুলে যেতেন।মা,মাধবী, সংজ্ঞামানা সুন্দরী না হলেও চোখা-চোখা চেহারা ছিল। নজরকাড়ামতো। স্কুল যাওয়ার সময়, বাড়ির দরজা ডিঙোনোর আগে হাত নেড়ে ইশারায় মাধবকে কাছে ডাকতেন বাবা।
- শোন,তোর মা সারাদিন কোথায় যায়, ঘরে কারা আসে,এসব একটু দেখেশুনে রাখিস তো!
মাধব ফ্যালফ্যালকরে তাকাতো।
- মা কি হারিয়ে যাবে? ও তো বড়!
বাবা চাপা গর্জন করত,
- আহ্, মুখে-মুখে তর্ক করিস কেন? আমি ফিরলে সবটা বলবি। আর,মা যেন টের না পায়। ফেরার সময় হজমি লজেন্স আনবো তোর জন্য, দুটো!

সেই শুরু। স্বভাবটা ওর রক্তে চারিয়ে যাচ্ছিল ক্রমশ। দুয়েকবছর পর ও নিজেই স্কুলে ভর্তি হল যখন, একদিন, টিফিনের ঘন্টা পড়ার পর,সবাই বেরিয়ে গেছে,রাজু বাথরুমে গেছে আর তখন খোকন রাজুর টিফিনবাক্স খুলে টিফিন খাচ্ছিল,খেয়েই ছুটে বেরিয়ে গেল,দেখে ফেলেছিল মাধব। অনিমেষ স্যারকে চুপিচুপি সেকথা বলতে যেতেই স্যার কটাংকরে একটা গাঁট্টা মেরেছিলেন মাথায়।
'খুব টিকটিকি হয়েছো,অ্যাঁ?'
সেইপ্রথম ও জানে ডিটেকটিভকে হেলাফেলায় টিকটিকি বলা হয়! তবু ডিটেকটিভ হওয়ার সাধ থেমে থাকেনি মাধবের। প্রতিবেশী উপেনকাকা চানের আগে নারকেল তেল চাইতে এসেছিল ওদের বাড়ি, সেটাও দেখে ফেলে মাধব।পেট কামড়াচ্ছিল,তাই সেদিন স্কুলে যায়নি ও। বাবা ফেরামাত্র হুবহু ঘটনাটা বলে দেয়ার পর রাতে মাধবীকে যখন ভবভূতি বেড়ালপিটুনি পেটাচ্ছিল,কান্না পায় মাধবের। কিন্তু ক্লাসে রচনা লেখার সময় বড় হয়ে গোয়েন্দা হব লিখতে দুবার ভাবেনি ও।

মা-বাবা দুজনেই পরপর চলে গেলেন যখন, কোলকাতায় আবার সেই যৌথপরিবারেই জায়গা করে নিল সে। ততদিনে সেখানে লোকসংখ্যা বাড়লেও ওটা ছিল দাদুর দস্তানা। তাই জায়গা হয়ে যায় ওরও। একটু নিজেকে সামলে নিয়ে ডিটেকটিভ এজেন্সি সার্চলাইট খোলে এক বন্ধুর কৃপায়। তাদের গাড়ি ছিল না,গ্যারাজ ছিল। সেখানেই সাইনবোর্ড টাঙালো মাধব। অজস্র বোকামো, অসংখ্যবার ভুল করা সত্ত্বেও যেহেতু গোয়েন্দাগিরি ওর ফার্স্ট লাভ, চলে যাচ্ছিলো মোটামুটি।
সব ঘেঁটে গেল।

ইতোমধ্যে মক্কেল হল অয়ন ঘোষ।  প্রেমিকাটাইপ একটা মেয়ে ওর বউ রাধা,যাকে দেখলেই বসন্তবাতাস বইবে।
অয়নের চক্কর চলছে অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে। মাধবকে বলে,'বস্, আমার বউকে একটা কেস খাইয়ে দাও না। ও কোথায় যায়,কার সঙ্গে মেশে...,যাতে ওকে ডিভোর্স করার একটা সোর্স সাজাতে পারি! মোটা টাকা দেব তোমাকে।'
যেটা হল, রাধাকে ফলো করতে করতে মাধব ওর বেদম প্রেমে পড়ে গেল।
মাধব সবটাই জানতো। অয়ন ঘোষ আসবে,তারপর একটার পর একটা ঘটে যাবে ঘটনাবলি। জানতো। কারণ মাধব নামে কেউ,সশরীর, ছিল না ততদিনে,আর। অয়ন যেদিন ফোন করে ওর চেম্বার থুড়ি গ্যারাজের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিল, সেদিনই পথে রানওভার হয়ে যায় মাধব। ডিটেকটিভ হওয়ার প্রবল স্পৃহাই ওর ভূতকে বাঁচিয়ে রেখেছে এতদিন। অয়ন কিংবা রাধার সঙ্গে যা-যা ইন্টারঅ্যাক্ট করেছে ও, পথেঘাটে গায়েপড়ে কথা বলেছে আর অপমান করেছে রাধা, একদিন তো পাব্লিক ডেকে মার খাওয়াতেও গেছিল এমনকী, রাধার পা জড়িয়ে ধরেছিল ও তখন, কোনওটাই মানুষ-মাধব করেনি!
শুধু,ও যেটা জানতো না ভূত হয়েও,সেটা হলো,রাধার প্রতি প্রেম ওকে ছাড়বে না।অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনে জড়িয়ে রাখবে।

২টি মন্তব্য: