শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

আখ্যানে উত্তরবঙ্গের জনজাতি : অমল কৃষ্ণ রায়। পারক গল্পপত্র


মানসাই নদীর অদূরে বড়াইবাড়ি গ্রাম। সে গ্রামের সর্দারের নাম খলাই সর্দার। বয়স শতাধিক। তবে এখনও যথেষ্ঠ সচল। দীর্ঘাঙ্গী, শ্যামলা রঙের স্বাস্থ্যবান মানুষ। তিনি সবসময় গ্রামের বেদেদের ভালমন্দের খোঁজখবর রাখেন। বেদেজীবনে রোগ, কেসকামারি, অভাবঅনটন তো কম নেই। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো একেকটা পাহাড়প্রমাণ সমস্যা এসে বেদেজীবনটাকে তছনচ করে দিয়ে যায়। সেসব সামলিয়ে নিতে হয় তাঁকেই।

এবারের অঘ্রাণে সর্দার নির্দেশ দিলেন বহর যাবে বারবিশা অঞ্চলে। সেখানে নাকি ধানের আবাদ ভাল হয়। সাপের খেলা দেখানো, ওষুধ বিক্রির পক্ষে খুব ভাল জায়গা। সেইমতো বড়াইবাড়ির বেদেদল রওনা হল। সকলের সঙ্গে কমবেশি বোঁচকাবোঁচকি, লাঠি-খন্তা, সাপের ডোলা, তাঁবুর সরঞ্চাম, হাঁড়ি-কড়াই, থালা-বাটি, হাতা-চামচ সব। এসব নিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটছে সবাই। নাসিরের পরিবারের সবাই এবারের মরশুমি বহরে আসতে পারেনি। কারণ, তার পালিতপুত্র মতি ভিনরাজ্য থেকে রোগ নিয়ে ফিরেছে। তাকে দেখভাল করতে বউমা সেমিও বাড়িতে রয়ে গেল। আর রইল মেজো ছেলে জহির। সে বলল, এবার শহরাঞ্চলেই ঘুরে ব্যবসা করবে। নাসিরের সঙ্গে এল তার স্ত্রী রহিমা আর ছোট ছেলে মাফিজ। বয়স বারোর মাফিজের বহরের সঙ্গে বাইরে যাবার অভিজ্ঞতা একেবারেই নেই। এবারেই প্রথম ক্লাস সিক্সে পড়া ছেলেটি বাবার সঙ্গে বহরে যাবার বায়না ধরেছে। বাবাও সঙ্গে নিয়ে এসেছে। মায়ের তাতে খুব একটা ইচ্ছে ছিল না। বাবা বলল, কাজ শিখুক। বাইরে না ঘুরলে কাজের অভিজ্ঞতা কী করে হবে। সাপুড়ের ছেলে যতই লেখাপড়া করুক, একদিন তো তাকে সাপ নিয়ে কারবার করতে হবে।
দলের নেতৃত্বে আছেন মাইনদার সত্তল বাজিকর। তিনি খলাই সর্দারের নির্দেশে দল নিয়ে এসেছেন। বলতে গেলে তিনি হলেন সর্দারের সর্বোচ্চ পরামর্শদাতা। বেদেসমাজে সারিদারের ঠিক উপরে পদে অধিষ্ঠিত। বেশ রাতে দল পৌঁছল বারবিশা এলাকার একটি গ্রামীন বাজারে। মাইনদার ঠিক করলেন এখানেই রাত কাটিয়ে এলাকাসম্পর্কে একটা ধারনা নেবেন। পরদিন ঠিক করবেন, কোথায় স্থায়ী ভাবে তাঁবু করলে ব্যবসা ভাল হবে। যেই বোঁচকাবাঁচকি নিয়ে বাজারসংলগ্ন একটি প্রাথমিক স্কুলের বারান্দা হাজির হলেন, তখনই একদন স্থানীয় লোক তাদের তেড়ে আসলেন। বললেন, এখানে ঘাঁটি গাড়া যাবে না। ফুটো এখান থেকে। মাইনদার অনুরোধ করলেন, শুধু রাতটাই এখানে থাকবেন তারা। ভোরবেলা উঠে চলে যাবেন। তারা কিছুতেই মানলেন না। বাধ্য হয়ে দলটি আবার রাতের অন্ধকারে হাঁটা ধরল। বেশ কিছুটা যাবার পর একটা বটগাছের তলায় তারা রাত কাটানোর জন্য থিতু হল। তখনই শুরু হল ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। সঙ্গে লাকড়ি যা ছিল ভিজে গেল। তাই রাতে আর রান্না করার কোনও উপায় থাকল না। না খেয়েই তারা গাছের তলায় পড়ে রইল। এদিকে সারারাতের বৃষ্টিতে সবাই ভিজে চপচপে হয়ে গেল। ভোরবেলা নাসিরের জ্বর এল। রহিমার শরীরটাও ম্যাজম্যাজ করছে। বলল, আজ গাওয়াল করতে যেতে ইচ্ছে করছে না। মাফিজ ঘুম থেকে উঠে দেখল মা-বাবা দুজনেই শুয়ে আছে। এদিকে খিদেয় পেট চোঁ-চোঁ করছে। কী করবে বুঝতে পারছে না। বহরের আরেক বেদে কিশোর হারান বাজিকর তাকে ইশারায় ডাকল। বলল, চল আমরা সাপের খেলা দেখাতে যাই। তাতে চালের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। নাহলে খাব কী। মাফিজ রাজি হয়ে গেল।
 দুজনে সাপের ডোলা কাঁধে বেরিয়ে পড়ল। একটা মোড়ে এসে হারান বলল, দুজনে এক গ্রামে গেলে ব্যবসা ভাল হবে না। আমরা দুজন দুদিকে যাব। সন্ধে হবার আগে আবার এখানে এসে হাজির হব। তার পর দুজনে একসঙ্গে বাড়ি ফিরব। তাই করল তারা। মাফিজ একটা পাড়ায় ঢুকতেই কে যেন ঢিল মারল। টুক করে ঢিলটা সাপের ডোলায় এসে পড়ল।  মাফিজ ব্যাপারটাকে পাত্তা না দিয়ে সোজা একটা বাড়িতে ঢুকে সাপের খেলা দেখাতে শুরু করল। সাপের খেলা দেখতে ভিড় জমে গেল। বাড়িওয়ালা তাকে বেশ কিছুটা চাল দিল। এরপর একের পর এক বাড়িতে যেতে লাগল মাফিজ। তার সঙ্গে ইঁটুলির মতো লেগে লইল একদল কিশোর। সারাও সঙ্গে সঙ্গে চলল। এক বাড়িতে বাড়িয়ালি মাফিজের মুখটা শুকনো দেখে খেতে দিল। পেট ভরে খেয়ে নিল মাফিজ। এভাবে একটা ঘোরের মধ্যে মাফিজের দিনটা কেটে গাল। এবার বাড়ি ফেরার জন্য সেই মোড়ে এসে দাঁড়াল। সন্ধে নেমে আসছে। হারানের কোনও পাতা নেই। ভয়ে কাঁদতে শুরু করল মাফিজ। তখন এক পথচারি তাকে দেখে সব শুনে বলল, এই রাস্তা ধরে কিছুটা গেলে একটা বিল পাবি. তাতে হাঁটু জাল। সে জল পেরোলেই তোদের বহর দেখতে পাবি। তাই করল মাফিজ। রাতের অন্ধকারে বিল পেরিয়ে যখন ডাঙায় উঠল, তখন দেখল বাবা দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাকে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরল।

     এবারের বহরে বেশ ধান চাল উঠল। সেসব নিয়ে মাইনদার সত্তল সর্দার দল নিয়ে ঘরে ফিরে এল। এসেই শুনল, দেশে সাপের আইন লাগু হয়েছে। চারিদিকে খুব ধরপাকড় চলছে। সাপের খেলা দেখাতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়লে সোজা জেল। এদিকে জহিরের কোনও খোঁজখবর নেই। বেশ চিন্তায় পড়ে গেল নাসির। এমনিতেই সময়টা মোটেই ভাল যাচ্ছে না। সংসারের অভাব অনটন। মতি রোগ নিয়ে ভিন রাজ্য থেকে ফিরেছে। হঠাৎ খবর এল, জহির এখন মাথাভাঙা জেলে বন্দি। শহরে সাপের খেলা দেখাতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। শোনামাত্র ছেলেকে ছাড়াতে নাসির মাথাভাঙা ছুটল। এ-ওর কাছে ছুটাছুটি করে কিছু ফল হল না। শেষে একজন বলল, শহরের বড় উকিল অনিন্দ্য। সেই পারবে জহিরকে ছাড়াতে। তার কাছে সব কিছু বলে নাসির ফিস দিয়ে বাড়ি ফিরে এল।

 এরপর নাসির একদিন শহরে গেল উকিলের সঙ্গে দেখা করতে। অনিন্দ্য উকিল। খুব নামডাক। চেম্বারের সামনে এসে নাসির জানালার ফাঁক দিয়ে দেখল, উকিলবাবু দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। গভীর ভাবে কিছু ভাবছে মনে হল। তাই এইসময় তার ভাবনার ব্যাঘাত না ঘটিয়ে নাসির বাইরেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। ভাবল বাইরে বেরোলেই ছেলের কথাটা তুলবে। তখনই হঠাৎ চোখে পড়ল, উকিলবাবুর কাঁপা আঙুল থেকে জলন্ত সিগারেটটা পড়ে গেল। টেনশন হলেই নাকি অনিন্দ্য উকিলের এরকমটা হয়। সেটা উকিলের বাড়ির চাকর প্রবীর একদিন নাসিরকে বলেছিল। আর টেনশন এই দুঁদে উকিলের প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কোনও কেসের সমাধানসূ্ত্র না পেলেই নাকি উকিলবাবুর টেনশনের পারদ সাঁই সাঁই করে উপরে উঠতে থাকে। আইনের ধারার ফাঁকফোকর খুঁজে দিশেহারা হয়ে অনিন্দ্যবাবু তখন কেমন যেন হয়ে যায়। সমাধানসূত্র পেয়ে গেলে অবশ্য অনিন্দ্যের মুখে চোরাহাসি ফুটে উঠে। তখন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ারে বসে পড়ে। সে শ্বাস যেন বানের জলে মতো বিরোধীপক্ষের উকিলকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সে তখন অ্যাস্ট্রে-তে সিগারেটের শেষাংশ গুজে আগুনটা মেরে দিয়ে কেসের লড়াই সাজায়।

 আজ সিগারেটটা পড়ে গেল কেন, তাহলে কি...। ভাবতে ভাবতেই অনিন্দ্য উকিল বাইরে বেরিয়ে এল। তাঁকে দেখেই ব্যস্তত্রস্ত নাসির জিজ্ঞেস করল, বাবু, গারদের ভিতর থেকে ছেলেটাকে বের করা যাবে তো?
অনিন্দ্য নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। কোনও কথা বলল না। তাকে চুপ থাকতে দেখে নাসিরের চোখ ভিজে গেল। বেশ খানিকক্ষণবাদে অনিন্দ্য উকিল অস্ফুটে বলে উঠল,
‘বন্যপ্রাণী আইন বড় কড়া।’ ভেজা চোখের উপর কাঁধের গামছা ঘসে নাসির সবিনয়ে বলল,
‘কোনও ফাঁকফোকর নেই বাবু?’
‘না। আমিতো কোনও আশা দেখছি না।’
‘আইনের বইটা আরেকবার ভাল করে দেখলে হতো না বাবু। যদি কিছু করা যায়।’
‘কাল কোর্টে এসো। তার পর দেখা যাবে।’ উকিলের বিমর্ষমুখের কথাটা শুনে নাসির নির্বাক কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। তার পর ধীরেসুস্থে বাড়িমুখো হল। রেফিউজি পাড়ায় পা রাখতেই নাসিরের কানে এল, কারা যেন আড়ালে বসে ফিসফিস করছে—
‘ঐ যে নাসির বেদে আসছে। ওর ছেলে জহির এখন মাথাভাঙা জেলে।’
‘তাই নাকি! কেন?’
‘জানিস না। শহরে কোথাও সাপের খেলা দেখাচ্ছিল। পুলিশ এসে নলা ধরে তুলে জেলে পুরে দিয়েছে।’
‘বুঝবে এবার। কোর্ট-কাছারির কী ঝামেলা-ঝক্কি। কথায় বলে— বাঘে ছুলে আঠারো ঘা, পুলিশে ছুলে ছত্রিশ ঘা।’
‘বড় ত্যাঁদড় ছেলে। সেদিন পারাডুবির পঞ্চায়েতের লোকজন এসে বেদেপাড়ায় সভা করে বলে গেল, দেশে আইন হয়েছে। সাপ ধরা যাবে না। খেলা দেখালেই জেলে যেতে হবে। সেটা শুনেও পাত্তা দিল না। এবার বোঝ ঠ্যালা।’

কথাগুলো যেন নাসিরের শরীরে ঢুকে দাপাদাপি করতে লাগল। এফোড় ওফোড় করে যন্ত্রণা দিতে লাগল। কী করবে বুঝতে পারছিল না। একবার নাসির মুখ ফুটে ছোকরাগুলোকে বলতে চাইল, আমার ছেলে জেলে গেছে তো তোদের কী। তোরা তো বেহায়া। পরের জমি দখল করে থাকিস। সে বেলা লজ্জ্বা করে না? তোরা তো পুর্ব পাকিস্থানের লোক। শরণার্থী হয়ে এসেছিলি।  পরের জমিতে বেশ ঘাঁটি গেড়ে রয়ে গেলি। বেহায়া কুকুরের দল। কথাগুলো মনে এলেও মুখফুটে বলল না নাসির। রেফিউজি নরেন পঞ্চায়েতের কানে গেলে  রক্ষে নেই। আবার কী করে বসে কে জানে। জমির পাট্টা দেব না। কোথায় যাবি যা। এ জমি কি তোর বাপের খরিদ করা। বড় বড় কথা বলিস। এসব তো নদীর চর ছিল। সরকারী জমি। কোনও খতিয়ান নেই। সে খবর রাখিস তো। সেসব ভেবে দমে গেল নাসির। তাই কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে খেয়েও নিজেকে কোনওরকমে গুটিয়ে নীরবে স্থান ত্যাগ করল।


                            ২

মতির মেয়ে আজিরা খবরটা শোনার পর থেকে কদিন ধরে শুধু কাঁদে। নাসিরকে শুধু পীড়াপীড়ি করে— যাও না মাথাভাঙা। কাকাকে জেল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসো। কাকার বুঝি কষ্ট হয় না। আজ নাসির মাথাভাঙা যাবে শুনে আজিরার কী ফুর্তি। একবার বায়না ধরল ঠাকুরদার সঙ্গে যাবে। নাসির রাজি হল না। তাই সারাটা বিকেল আজিরা পথেই বসে রয়েছে। শূন্যদৃষ্টিতে পশ্চিমের রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখছে, কখন কাকাকে নিয়ে ঠাকুরদা ফিরবে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমে এলে, আজিরা দেখল ঠাকুরদা একা আসছে। দেখেই চেঁচিয়ে উঠল, কাকা কোথায়? নাসির কোনও কথা না বলে নাতনির পাশে দাঁড়িয়ে মাথায় খানিকক্ষণ হাত বুলিয়ে দিল। তার পর ওর হাত ধরে বাড়িমুখো হল। আজিরা কাঁদতে কাঁদতে ঠাকুরদার সঙ্গে হাঁটতে লাগল।

    নাসিরকে একা ঘরে ফিরতেই বাড়িতে আরেক প্রস্থ কান্নাকাটি শুরু হল। জহিরের মা  কেঁদে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগল। অসহায় নাসির পাশে দাঁড়িয়ে স্ত্রী রহিমার চিৎকার সহ্য করল। সে কান্নার আওয়াজ গোটা বেদেপাড়া ছড়িয়ে পড়ল। প্রতিবেশী অনেকেই বাড়িতে ভিড় জমাল।
খলাই সর্দারও খবরটা জানল। শুনে যেন সর্দারের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। ভেবেছিল জহিরকে একদিন জেলে রেখে হয়তো ছেড়ে দেবে। আজও ছাড়ল না! কী করবে বুঝবে পারছে না। তিনি সর্দার। সমস্যার সমাধানের পথ তো তাকেই খুঁজে বের করতে হবে। তখনই নাসিরের বাড়ির দিকে রওনা হল। একা একা রাস্তা ধরে খলাই সর্দার হাঁটছে। তাঁর মনে হল সন্ধের বেদেপাড়া আজ কেমন যেন থমথমে। মোড়ের ঠেকে তাসখেলার আসরটা আজ নেই। তার পাশে গফুরের চায়ের দোকানটাও বন্ধ। অবশ্য, কী করবে গফুর দোকান খুলে। তাসের আসর ছাড়া তো চা বিক্রির কোনও ফুরসত নেই। সারাদিন তাসের আড্ডায় অন্তত পঞ্চাশ কাপ চা বেচে গফুর। তাতেই ওর দিন গুজরায়। বলতে গেলে এ জায়গাটায় লোকজনের একটা ভিড় সারাক্ষণ থাকেই। কেউ কাজের জন্য বাইরে যাবার আগে কিংবা পরে একবার ঠেকে গিয়ে বসে তাসের খেলা দেখে কিংবা নিজেও খেলে। সন্ধের তাসের আসরে সারাদিন বাইরের কাজের অভিজ্ঞতার একটা বিচার বিশ্লেষণও চলে। কোন পাড়াতে সাপের আইন এখনও লাগু হয়নি। কোথায় গেলে খেলা দেখিয়ে এখনও দুপয়সা বেশি রোজগার হয়, সেসব নিয়ে চায়ের কাপে তুফান তুলে আলোচনা হয়। সেইসঙ্গে জহিরের শহরে সাপের খেলা দেখানোটা যে একেবারে বোকামি হয়েছে, সেদিকেই অনেকে সায় দিল। অনেকটা যেন সুন্দরবনের বাঘের আস্তানার পাশে কাঁকড়া ধরতে যাবার মতো।

     তাসের ঠেকের মোড়টা দ্রুত পায়ে পেরিয়ে গেল সর্দার। যেতে যেতে সমাধানের পথ খুঁজছে। কী করা যায়। মাথাভাঙা শহরের কার কাছে গেলে জহিরকে ছাড়িয়ে আনা সহজ হবে। তখনই চোখ পড়ল মনিরুলের বাড়ির দিকে। রোজ এইসময় সে বাড়ির বাইরের ঘরটায় কত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ভিড় জমে। ডায়লগের ফুলঝুড়ি ফুটে মুখে। যাত্রার নির্দেশক মনিরুল বাজিকর রিহার্সাল চালায়। আজ মনিরুলের যাত্রার আড্ডাঘরটা যেন একদলা অন্ধকারে ডুবে রয়েছে। দেখে গা ছমছম করছে সর্দারের। শূনশান জায়গাটা পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে যেতেই সর্দার দেখল সন্ধের অন্ধকারে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রয়েছে বজরুল বাজিকর। তার হাতের রেডিয়োটা আজ বন্ধ। খলাই কখনও এই অশীতিপরকে রেডিয়ো বন্ধ অবস্থায় দেখেনি। দিনরাত বজরুলের রেডিয়ো খোলা থাকে। লোকগীতি শোনে, খবর শোনে। সারাদিন চলে রেডিয়ো। দেশের খবর শুনে বজরুল সারা বেদেপাড়ায় পৌঁছে দিয়ে বড় সুখ পায়। খলাই সর্দারও তার কাছ থেকে দেশের খবরাখবর নেয়। প্রাইমারী গণ্ডি পার-পাওয়া প্রবীণ মানুষটি এলাকার যথেষ্ঠ সম্মাননীয়। এমনকী সর্দারও কোনও সিদ্ধান্ত নেবার সময় তার মতামত নেয়। শতবর্ষ প্রবীণ খলাই সর্দার সেটা মেনেও নেয়। তাকে শুধালো খলাই,
‘রেডিয়োর ব্যাটারি ফুরিয়ে গেল নাকি?’
‘না না। বজরুলের রেডিয়োর ব্যাটারি ঘরে সারা বছর মজুত থাকে। ফুরোয় না কোনওদিন।’
‘তাইতো জানতাম। তা বন্ধ কেন?’
‘মন ভাল নেই।’
‘শোনেননি কিছু?’
‘শুনেছি।’
‘তাহলে ভাবুন তো ব্যাপারটা। একটা জেলখাটা ছেলেকে আমি মেয়ে বিয়ে দেব। আমার কি মানসম্মান নেই?’
‘জেলে গেলেই বুঝি লোকের মানসম্মান মাটি হয়ে যায়। কে বলেছে। দেশে কত নেতা মন্ত্রী জেল খাটে। আবার জেল থেকে বেরিয়ে সম্বর্ধনাও পায়।’
‘অতসব বুঝি না সর্দার। জেলের ঘানিটানা ছেলে আমার পছন্দ নয়।’
‘সাপ আমাদের চৌদ্দ পুরুষের ব্যবসা। সে সাপের কারণে কোনও বেদে যদি জেলে যায় তো আমি বলব সে হল বেদেসমাজের গর্ব।’
‘না না। আমার কাছে এটা গর্বের ব্যাপার নয়। আমি আপনাকে সাফ জানিয়ে দিচ্ছি। জহিরের সঙ্গে আমার নাতনির বিয়ে দেব না।’
 শুনে সর্দারের মাথায় যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। বিস্ময়ে বললেন,
‘আরে বুঝছ না কেন বজরুল। জহিরতো আর চুরি করে জেল খাটেনি। সাপের আইন হয়েছে। সেটা ও জানত না। তাই শহরে সাপের খেলা দেখাতে গিয়ে ধরা পড়ে জেলে গেছে।’
 ‘না, সর্দার। ও জানত। বেশি পয়সার লোভ হয়েছে ওর। তাই সাপের ডোলা নিয়ে শহরে গেছে। ওতে বেদেপাড়ায় প্রায়ই বলত, মাথাভাঙা কাছারি চত্বরের মতো ব্যবসা নাকি আর কোথাও হয় না। ওকে আমি পইপই করে বলেছিলাম। শহরে সাপ নিয়ে যাস না। রোজগার কম হোক বেশি হোক, খেলা দেখাতে গ্রামে চলে যাবি। গ্রামে আইনের এত কড়াকড়ি নেই। ও শুনল না আমার কথা। বলল, কোর্টচত্ব্ররে রোজগারটা ভাল হয়। এবার বোঝ। উকিলকে কাড়ি কাড়ি টাকা দাও। না দিতে পারলে জেলে পচে মরো। যত্ত সব।’
‘শোনো বজরুল। বেদে জাতের কাছে কোনও সমস্যাই সমস্যা নয়। তোমার হয়তো মনে নেই। যেদিন তিস্তার পাড়ের ভুরার ঘাট ছেড়ে এই বড়াইবাড়িতে এসে তাঁবু করলাম, সেদিন এখানে কী ছিল। মানসাই নদীর বিস্তীর্ণ বালির চর। তাতে ঘনঘন কুল গাছ। ছনের জঙ্গল। তার আড়ালে থাকত শেয়াল। রাত হলে হুক্কাহুয়া রব উঠত। ঘরে থেকে হাসমুরগী নিয়ে যেত, ছাগলের পা ধরে টানাটানি করত। কম অত্যচার সহ্য করেছি। সেসব কুল গাছ কেটে ঘর বানালাম। জঙ্গল কেটে সাফ করলাম তবে তো এই বড়াইবাড়ি হল। বলতে গেলে এ গ্রামটা তো আমার হাতেই তৈরি।’
‘তা জানি। স্থানীয় ভাষায় ‘কুল’ মানেই তো ‘বড়ই’। তা থেকেই তো এ গাঁয়ের নাম হল বড়াইবাড়ি।
‘তাই বলছি। এই সমস্যাটাও একদিন মিটে যাবে। জহির জেল থেকে ফিরে তোমার মেয়েকে বিয়ে করে সুখে সংসার করুক এটা আমি মনেপ্রাণে চাই। তাছাড়া বিয়ের বোলচালি হল, পানিপিয়ালা হল। পানচারিও হল। ছেলেপক্ষের সঙ্গে বসে শরবত খাওয়া হল, বিয়ের দিনতারিখ ঠিক করল। এখন তো বিয়ের শুধু অনুষ্ঠানটাই বাকি।’
‘সর্দার, আপনি একজন মান্যগণ্য মানুষ। আমাদের গেরামের সর্দার। তাবলে অন্যায় কিছু বললে তো আমি তা মেনে নিতে পারি না। বিয়ের সব ঠিকঠাক হবার পরে যদি ছেলে অপছন্দ হয় তো মেয়েপক্ষ বিয়ে ভেঙে দিতেই পারে। এটা তো আমাদের বেদেসমাজের বিয়ের নিয়মের মধ্যেই পড়ে।’
‘তা পড়ে। ছেলে যদি কর্মক্ষম না হয়। তাহলে সে বিয়ে ছেলের বাবা ভেঙে দিতেই পারে। কিন্তু জহির তো পরিশ্রমী ছেলে। ওর মতো ছেলে আমাদের বেদেপাড়ায় কটা আছে? ওর জন্যইতো বাজিকর অপেরার যাত্রদলটার এত নামডাক। যেমন ওর নায়ক-নায়ক চেহারা, তেমন ওর ডায়লগ। যাত্রার আসরে কথায় কথায় হাততালি পড়ে।’
 কোনও উত্তর দিল না বজরুল। জহিরের এত গুণগান গাইলেও সর্দারের মনে হল, বজরুলের মুখে কোনও ইতিবাচক ভাব নেই। কেমন যেন গোমড়ামুখো হয়ে বসে রয়েছে। অবশেষে সর্দার এবার কানের কাছে মুখ নিয়ে ঝুঁকে বলল, শোন বজরুল, আমার কাছে খবর আছে, দুঁদে উকিল অনিন্দ্য নিজেই জহিরের কেসটা লড়ছেন।  সে মানুষটাতো আইনের বইটা রীতিমতো গুলে খেয়েছে। আমিতো আজ পর্যন্ত শুনিনি যে অনিন্দ্য উকিল কোনও কেসে হেরেছে। আরে মানসাইয়ের চরের মার্ডার কেসের আসামীকে কে ছাড়িয়ে আনল। ঐ অনিন্দ্য উকিল না থাকলে ঐ মজিবর আলির যাবৎ জীবন কে ঠেকাতে পারত।’

 তবু বরফ গলল না। বজরুল যেন একটা চিন্তার ঘোরেই চুপচাপ বসে রইল। বজরুলের কাছ থেকে আশানুরুপ কোনও উত্তর না পেয়ে খলাই আরও খানিকটা এগিয়ে গেল। কানে  নাসিরের বাড়ির কান্নার আওয়াজ আরও তীব্র হয়ে উঠল। বাড়ির লোকজনকে সান্ত্বনা দিতে সেদিকেই চলল খলাই। গিয়ে দেখল রান্নাঘর অন্ধকার। একটা কুপি বারান্দায় জ্বলছে। তার পাশেই বসে জহিরের মা কাঁদছে। ঠাকুমার মুখের দিকে শুকনো মুখে হা করে তাকিয়ে রয়েছে নাতনি আজিরা। ভাঙা গোয়ালের ভিতর থেকে দুধাল গাইটা উঁকি দিচ্ছে। অদূরে পেট খিদেয় খাল হওয়া বাছুর। মায়ের দিকে করুণমুখে তাকাচ্ছে। খলাই বুঝল নাসির শহর থেকে দেরিতে ফিরেছে বলে গাইটা এখনও দুয়ানো হয়নি।
       গলা খাঁকারি দিয়ে সর্দার উঠোনে ঢুকে পড়ল।

                           ৩
কাকভোরেই সেমি সাপ নিয়ে বেরিয়েছিল। সঙ্গে কিছু গাছালি ওষুধ, মা মনসার ফটো, সঙ্গে এক নির্বিষ সাপ। শিঙা লাগানোর মাসোয়ারা কটা বাতের রোগী আছে সেমির। তাতে কমবেশি রোজগার হয়। সেমির শিঙার বেশ নামডাক।

একবার বহরের সঙ্গে সেমি বেশ কিছুদিনের জন্য বাইরে ঘুরতে বেরিয়েছিল। প্রায় মাসখানেক পরে গাওয়াল করে ফিরেছিল। এসে শুনেছে কত রোগীর লোকজন এসে বেদেপাড়ায় সেমিকে খুঁজে গেছে। একদিন নাকি এক পালকি এসে বেদেপাড়ায় হাজির হল। সবাই অবাক। কে এল তাতে। অনেকে মনে করল, দূর দেশ থেকে দেশান্তরে বউ নিয়ে হয়তো পালকি বাহকেরা যাচ্ছিল। তারা পথ ভুল করে এখানে ঢুকে পড়েছে। পাড়ার সবাই এসে পালকিকে ঘিরে ভিড় করল। বউ দেখতে সবাই উঁকিঝুঁকি শুরু হল। কেউ কেউ অবাকও হল। বউ যাচ্ছে। সঙ্গে কোনও বাজনা-বাদ্য নেই। ব্যাপার কী। এবার পালকির পর্দা সরাতেই সবার ঠোঁট উল্টে দিল, একি! বউ কই। এতো এক ঘাটের মরা বুড়ি। তা এখানে কেনইবা এল। পালকির সঙ্গেই ছিল এক যুবক। সে বলল, এখানে সেমি বাজিকর কে?
 উৎসুক বেদেদের ভিড় থেকে একজন বলল, ঘরে নেই।
 ‘কোথায় গেছে?’
‘জোড়াই-রামপুরহাটে।’
শুনে যুবকের মুখটা আরও শুকিয়ে গেল।
‘কী দরকার তাকে?’
‘আমার ঠাকুমার বাতের ব্যথাটা গতকাল থেকে খুব বেড়ে গেছে। ওকে শিঙা লাগাতে হবে।  গতকাল রাত থেকে ঠাকুমা বায়না ধরেছে, তাকে বেদেপাড়ায় নিয়ে যেতে হবে। তাকে সেমি বাজিকরের হাতে শিঙা লাগিয়ে আনলেই ব্যথা কমে যাবে।’
বুড়ি পালকির ভিতর বসে চ্যাঁচাচ্ছে— এই রতন, সেমিরে ডাক। শিঙা ছাড়া আমি বাঁচব না রে।
‘সেমি বাড়ি নাই।’ জানাল যুবক।
‘কী কস!’ বুড়ির গলায় হতাশা।
‘হ—। বহরে গেছে।’
‘তাইলে আইজও শিঙা লাগানো অইত না?’
যুবকটি আশাব্যাঞ্জক কিছু বলতে পারল না। নাতি কিছু বলছে না  দেখে বৃদ্ধার মনটা খারাপ হয়ে গেল। যন্ত্রণায় বুড়ি আরও বেশি কাতরাতে লাগল— ওরে বাবারে, ওরে মারে, মরে গেলাম রে—। ভগবান তুমি আমারে তুইল্যা নেও— আমি যে আর সইতে পারতাছি না—। নিরুপায় হয়ে যুবকটি পালকিবাহকদেরকে পালকি নিয়ে ফিরে যাবার নির্দেশ দিল। বাহকেরা ফিরে যাবার জন্য পালকি কাঁধে তুলে ফিরে গেল।

বেশ কিছুদিন পরে সেমি যখন বড়াইবাড়িতে ফিরল সে ঘটনা শুনে বুঝতে পারল, রায়পাড়ার যতীন রায়ের মা নিশ্চয়ই এসেছিল। সেমি তখনই ছুটল রায়পাড়ায় শিঙা নিয়ে। যতীন রায়ের বাড়ির কাছাকাছি আসতেই দেখল বেশ মানুষের ভিড়। ভিড়ের ধরন দেখে বুঝে ফেলল, কেউ মরেছে। ভিড় ঠেলে সামনে যেতেই দেখল, সেই যতীনবাবুর মা দেহ রেখেছে। তাকে ঘিরেই ভিড় জমেছে। তার নাতি তাকে বিমর্ষমুখে বলল, আমার ঠাকুমা আর নেই। তার শিঙা লাগানো আর হল না। তুমি একটা কাজ কর। ঠাকুমার গায়ে শিঙাটা একটু ছুয়ে দাও। তাহলে ওর আত্মা শান্তি পাবে। সেমি তখন ব্যাগ থেকে শিঙা বের করে সেটা মরার গায়ে বেশ কিছুক্ষণ ছুয়ে রাখল।

আজ বেশ রাতে সেমি গাওয়াল থেকে বাড়ি ফিরেছে। এসেই নজর করল, কেমন আছে তার স্বামী। পুব ভিটেতে আলোবাতাসহীন এক বদ্ধ ঘরে সেমির স্বামী মতি থাকে। ঘরটাতে ছনের বেড়া। তার উপর মাটির প্রলেপ। ঘরে জানালা নেই। মেঝেতে খড় বিছানো। খড়ের উপরে চট পাতা। তার উপরে দুই প্রস্থ ঢাকনা। মাদুর আর কাঁথা। তাতেই সারাদিন তার এইডস রোগী স্বামী শুয়ে কাটায়। ঘরের দিকে তাকিয়ে সেমির মনে হল মতি খিদেতে কাতরাচ্ছে। বিড়বিড় করে বলছে,
‘মোকো ভুক লাগিল হাবে।’ মতির বুকের সাঁই সাঁই হাঁপানির শ্বাসের শব্দ সেমির কানে এল। নিশ্বাস নেওয়া এবং ছেড়ে দেওয়ার সময়কাল সহজে মেপে নেবার মতোই স্পষ্ট। তা শুনে শুরু হল মুখ ঝামটা—
‘থইতমে শুতে রাহানে সে কামাই হয়গে নায়।’ খলাই সর্দার তখনও উঠোনের এক কোণে বসে আছে। মাফিজের মা কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত হয়ে তখন ঘরের মেঝেতে শুয়ে রয়েছে। খলাই সর্দার মোলায়েম স্বরে সেমিকে বলল, ঘরে শুয়ে না থেকে কী করবে? তুই তো জানিস, ওকে তো মারণ রোগে ধরেছে।
 ‘তা তো জানি সর্দার। আমি অত জ্বালা কী করে সইব বলুন তো। রোজ রোজ ঘ্যানঘ্যানানি, প্যানপ্যানি আর কত সহ্য হয়।’
‘এইডস রোগটা তো সারে না। আমরণ কষ্ট দেয়। যতদিন বাঁচবে, এভাবেই মতি কষ্ট পাবে। তোকেও কষ্ট দেবে। কী আর করা যাবে।’
ঘর থেকে জহিরের মা আবার কেঁদে উঠল। শাশুড়িকে কাঁদতে শুনে সেমি আজিরাকে জিজ্ঞেস করল,
‘মা কাঁদে কেন?’
‘কাকা আজও জেল থেকে ছাড়া পেল নাতো, তাই। উকিল বলেছে, ছাড়ানো বড় কঠিন।’
সেমি বুঝল, এবার সংসারে আরেক প্রস্থ সমস্যা কাঁধে চেপে বসল। সেটা মতির মারণ রোগের চাইতেও কমকিছু নয়।

                                 ৪

  একটা শহুরে বাবু বেদেপাড়ায় ঘুরঘুর করছে। মনে হল কাউকে খুঁজছে। এরই মধ্যে বজরুলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। একথা সেকথা বলতে বলতে লোকটা যখন জানল বজরুল একসময় গ্রামে গ্রামে ঘুরে গান গেয়ে, ম্যাজিক দেখিয়ে রোজগার করত। এখন বয়সের ভারে আর যেতে পারে না। শুনে মানুষটি সহমর্মী হয়ে বজরুলের গান শুনতে চাইল। বজরুল তার পুরনো শুটকেসে রাখা দোতারা, ধনেশ পাখির হাড় সহ ম্যাজিকের নানা সরঞ্জাম বের করল। লোকটি সেসবের ছবি তুলে নিল। তার পর শুরু করল গান। গাইতে গিয়ে গানের লাইন বারবার ভুলে যাচ্ছিল বজরুল। গানের শেষে ম্যাজিক দেখাতে গিয়েও তাই হল। ম্যাজিকের ফাঁকফোঁকর বাবুর কাছে ফাঁস হয়ে যাচ্ছিল। শেষে আক্ষেপের সুরে নিজের অক্ষমতা স্বীকার করল বজরুল—  বয়স হয়েছে বাবু। এখন আর আগের মতো পারি না। বাবু তাতে কিছু মনে করল না। বরং বজরুলকে খুশি হয়ে কিছু বকসিস দিয়ে বাবুটি মতি বাজিকরের বাড়ি কোনটা জানতে চাইল। ইশারায় নাসিরের বাড়িটা দেখিয়ে দেল বজরুল। কেউ একজন বাবুকে নাসিরের বাড়িটা দেখিয়ে দিল। সে তখন সে বাড়িতে ঢুকে পড়ল। নাসির বাড়িতেই ছিল। বাবুগোছের মানুষটাকে বসতে দিল। এবার তিনি যে কথা বললেন, তা শুনে নাসির অবাক। বলল,
 ‘কী বলেন! মতির মা এখনও বেঁচে আছে?’
 ‘হ্যাঁ। তিনি রাজস্থানে থাকেন। আমার এক বন্ধু সেখান থেকে ফোনে জানিয়েছে।’
 ‘কী করেন সেখানে?’
‘যা করেন সেটা খুব একটা সম্মানজনক নয়। একসময় সেখানে তাকে নাকি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। তার পর যা হয় আর কী।’
 ‘বুঝলাম।’
 ‘এক খদ্দেরের কাছে তিনি ভেঙে পড়লেন। তার ছেলে মতি নাকি বড়াইবাড়িতে থাকে। শেষ জীবনে ছেলেটাকে দেখতে চায় তিনি।’
‘আসতে বলুন তাকে।’
 ‘তাঁর এখন বয়স হয়েছে। মালকিনের কাজ করে। আসতে পারবে না।’
‘মতি তো এখন মরণের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। যাবে কী করে?’
বাবুটি বুঝল, মতির পক্ষে রাজস্থানে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া সম্ভব নয়।

 মতির শৈশবের ইতিহাস বলতে শুরু করল নাসির— সেতো বহুদিন আগের কথা। জলপাইগুড়ি রেলস্টেশনে বসে বসে কাঁদছিল ছেলেটা। দেখে আমার মায়া হল। তাই ওকে নিয়ে এসে মানুষ করলাম। বিয়ে দিলাম। সংসারের অভাব মেটাতে ভিন রাজ্যে কাজে গিয়ে শরীরে মারণ রোগ নিয়ে ফিরল।
‘কী রোগ হয়েছে?’
‘এইডস।’
শুনে বাবুটি যেন শঙ্কিত হল। তবে মুখে কিছু বলল না। নাসির দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
‘মতির মায়ের মতো যদি কর্ণবালা আজও বেঁচে থাকত।’
‘কে কর্ণবালা?’
 ‘আমার মেয়ে। ও খুব সুন্দরী ছিল। একবার আমাদের বহরে ডাকাত পড়ল। ভুল্লা ডাকাত। ভীষণ খতর্ণক। শুরু হল বেদে-ডাকাতে মল্লযুদ্ধ। শেষে ভুল্লা ডাকাত ধরা পড়ল। ডাকাত ধরে যখন জানা গেল সে এসেছিল কর্ণবালাকে তুলে নিয়ে যেতে, তখন তাকে কর্ণবালার মুত খাইয়ে ছেড়ে দেওয়া হল। সেই থেকে তার নাম হয়ে গেল মুত-খাওয়া ডাকাত। সে রাগেই আরেকদিন সত্যি সত্যিই কর্ণবালাকে তুলে নিল। আর ওরে ফিরে পেলাম না।’
নাসিরের কথা শুনে বাবুটি আর কোনও কথা বলল না। কর্ণবালার কথা বজরুলের কাছেই কিছুক্ষণ আগে শুনেছে। পুরুষের চোখ এড়াতে তাকে নাকি বাড়িতেই একটা বন্ধ ঘরে রাখা হতো। কোনওদিন সে সূর্যের মুখ দেখত না। কাকভোরে একবার শৌচকর্মের জন্য মাঠে যেত। সঙ্গে থাকত মা। তারপর পাড়ার রেফিউজিদের পুকুরে একটা ডুব দিয়ে এসে আবার ঘরে ঢুকে পড়ত। তবুও ডাকাতের হাত থেকে মেয়েটি রক্ষা পায়নি।
ফোনে কথা বলতে বলতে বাবুটি নাসিরের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
                                      ৫

ধীরে ধীরে বড়াইবাড়ি আবার ছন্দে ফিরে এল। জহির জেল থেকে ফিরে এল। গফুরের চায়ের দোকান খুলে গেল। বেদেপাড়ার তাসের আড্ডাও জমে উঠল। মনিরুলের বাড়ির যাত্রা রিহার্সালে ভিড়ল সবাই। এবার মনিরুলের যাত্রা পালা— বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না। প্রতি সন্ধেতে রিহার্সাল হয়। তা দেখতে ভিড় পড়ে যায়।
এরই মধ্যে খলাই সর্দার একদিন সভা ডেকে সবাইকে বলে দিল, আজ থেকে তোমরা সবাই আমাকে কথা দাও। জীবনে আর কোনওদিন সাপ ধরবে না। সাপের খেলা দেখাবে না।

 সবাই তাতে সায় দিল। সর্দারের কথাটা মেনে নেবার প্রতিজ্ঞা করল— আইজ থেকে আমরা আর সাপ ধরব না, খেলা দেখাব না। এরপর সর্দার নির্দেশ দিল, এখনই সবাই ঘরে ফিরে যাও। যার ঘরের ডোলায় যত সাপ আছে সব জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে এসো। শুনে সবাই এ ওর দিকে তাকাতে লাগল। সবাই যে এ নির্দেশে বেশ কষ্ট পেল, সেটা সর্দার বুঝে ফেলল। কষ্ট অবশ্য পাবারই কথা। যে সাপ সংসারের অভাব মেটায়, মুখে অন্য তুলে দেয়। তাকে তারা কী করে ছেড়ে দেবে। এ নিয়ে নানা জনে নানা কথা বলতে লাগল। একসময় অনিচ্ছা সত্বেও তারা সবাই সভা ছেড়ে বাড়ি গেল। দলে দলে সাপের ডোলা নিয়ে চলল জঙ্গলের দিকে। সেখানে সব ডোলা একসঙ্গে খুলে দিল তারা। সাপেরা কিলবিল করে ঝোঁপের আড়ালে নিমেষেই অদৃশ্য হয়ে গেল।

কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই সর্দারের কাছে ফিরে এল। সর্দার প্রশ্ন করল, তোমরা সবাই কি সাপগুলো ছেড়ে দিয়েছ? সবাই তারস্বরে ‘হ্যাঁ’ বলল। সর্দার শুনে তাদের দুহাত তুলে আশীর্বাদ করে বলল, একটা কথা মনে রাখবে। জীবনের জন্য জীবিকা। জীবিকার জন্য জীবন নয়। বেদেরা সাপের খেলা না দেখালেও ঠিক বেঁচে থাকবে। সম্মানের সঙ্গে বাঁচবে। বজরুল এবার আগ বাড়িয়ে বলল, সর্দার। আমার আর কোনও আপত্তি নেই। আমি কথা দিচ্ছি, আমার মেয়ে জাহানারার সঙ্গে জহিরের বিয়ে দেব। খুশি হল সর্দার,
 ‘খুব ভাল কথা। তবে বিয়ের আয়োজন শুরু কর।’
 মনিরুল আসরে বলে উঠল, বিয়ের হবার আগে এক পালা যাত্রা হলে কেমন হয়?
‘খুব ভাল হবে।’ সকলে সম্মতি দিল। সর্দারও সায় দিল। শুধু জানতে চাইল,
‘কোন পালা।’
‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না।’
‘নায়িকা জ্যোৎস্নার রোলটা কে করবে?’
‘জাহানারা।’
‘নায়ক আনোয়ার?’
‘সেতো জহির ছাড়া আর কেউ ফুটাতেই পারবে না।’
আসরের সবাই সজোরে হাততালি দিল। তালি থেমে যেতেই আসরে একটা কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। সবাই উৎকীর্ণ হয়ে শুনতে লাগল। এরই মধ্যে এক কিশোর ছুটে এসে বলল, মতি মরে গেছে। আসরটা থমথমে হয়ে উঠল। সর্দার নির্দেশ দিল। মতিকে গোরস্থানে নেবার আয়োজন কর। যদিও জানি না, ও হিন্দু না মুসলিম। তবে ও তো নাসিরেরই কুঁড়িয়ে পাওয়া ছেলে। তাই কবরই হবে ওর সঠিক ঠিকানা। আসর ভেঙে গেল। বেদেপাড়ায় একটা শোকের ছায়া নেমে এল। রেফিউজি পাড়ার লোকজনও ছুটে এল। মতির শেষ যাত্রায় সবাই সামিল হল। সর্দার দেখল, বড়াইবাড়ির মানুষের ঢল গোরস্থানের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। কে বেদে, কে রেফিউজি কোনও পার্থক্যই তার চোখে ধরা পড়ল না।

                       ৬

মনিরুল একদিন বজরুলের কাছে হত্যে দিয়ে পড়ল,
‘চাচা আমাকে বাঁচান।’
‘কী হইছে ক।’
‘জাহানারা আমার দলে নায়িকার অভিনয় করবে। এতে ‘না’ বলবেন না।’
‘সে নাহয় করবে। কিন্তু নায়ক কে হবে?’
‘কে আবার। আপনাদের হবু জামাই জহির। সর্দার বলে দিয়েছে। যাত্রা এবার হবেই।’
‘সে যদি হয়, তাতে আমার কোনও আপত্তি নেই। তবে কী। যা করবে বিয়ের পরে। এখন নয়।’
‘চাচা, শোনেন। পালাটা বিয়ের পরে হলেও রিহার্সালটা তো আগে থেকে করতে হবে নাকি।’
‘সে করবে।’
‘জাহানারা রাতে করে আমার বাড়িতে রিহার্সালে যাবে। রাজি তো?’
‘কী আর বলি। সর্দার যখন বলে ফেলেছে, আমার আর অরাজির কী আছে।’
‘একটা কথা বলে রাখি চাচা। আমাদের স্বজাতির ঘরের থেকে সাপ বিদায় নিল। এবার বাঁচতে হলে যাত্রা, রঙতামাশা ছাড়া আর পথ নাই।’
বজরুল চাচার নীরবতাতেই মনিরুল ধরে নিল, বরফ গলেছে। ভিতর ঘরের দিকে তাকিয়ে হাঁক দিল মনিরুল, এই জাহানারা। শোন, চাচা বলছে রিহার্সালে যেতে। কাল সন্ধেতে যাবি।
‘বাবা বললে যাব।’
 ঘরের ভিতর থেকে একটা অস্ফুট উত্তর শুনে খুশিতে টগবগ করে বজরুল চাচার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।


 এরপর একদিন জহিরের সঙ্গে জাহানারার বিয়ে হয়ে গেল। বিয়েতে খলাই সর্দার মন্ত্র পড়ল— ঝাপাসে ঝুলিসে লাঠিসে ডাঙ্কাসে হাতাসে হাড়িসে ফানসে নান্ধাসে শিকারসে জয়গুরুকে ফ্যাতে। মন্ত্র তিনবার পাঠ করে চুল্লির মাটি তুলে দিল জহিরের হাতে। জহির সে মাটি জাহানারার কপালে ঘসে দিল।  বিয়ের আসরে অনেক গান গাওয়া হল— জামাই বরণের গান, বরকনের চানের গান, মালাবদলের গান, পাশাখেলার গান, কনে সাজানোর গান। বিয়ের আসরে বেদেপাড়ার সব লোক এসেছিল। সবাই আনন্দ-ফুর্তি করল। ছাতনাতলায় হিন্দু রীতিতে বিয়ে হল। বিয়ের অনুষ্ঠানশেষে মুসলিম রীতিতে নিকাহ করানো হল। পরদিন ভোরে সূর্য উঠার আগে জামাতা জহির জাহানারার কপালে সিঁদুর পরিয়ে দিল।

 বিয়েতে সবাই এল। গরীব বজরুল সবাইকে পাত পেড়ে খাওয়াতে না পারলেও নিজের বাড়িতে খেয়ে পাড়ার সবাই বিয়ের আসরে ভিড় জমাল। বিয়ে অনুষ্ঠানে রেফিউজিরাও বাদ গেল না। তারাও ভেদাভেদ ভুলে বিয়েতে আমোদপ্রমোদ করল। মনিরুলের যাত্রাদলের বাজনাটাই বিয়েতে বেজে উঠল। তাকে অবশ্য বজরুলের কানাকড়িও দিতে হয়নি। তবে বিয়ের আসরেই মনিরুল অদ্ভুত দাবি করে বসল। এ সিজনে যে কটা ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’ যাত্রাপালা’ বায়না ধরা হয়েছে, তাতে কিন্তু নায়কনায়িকার অভিনয় করবে জহির আর জাহানারা। করে দিতেই হবে।
সেকথা শুনে বরকনে কিছু বলল না। শুধু একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে মুচকি হাসল।
  

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন