শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২০

পারক গল্পপত্র। আষাঢ়। ১৪২৭। সম্পাদকীয় ও সূচি




এইমাত্র একজন ধীর পায়ে হেঁটে উঠে গেল অ্যাম্বুলেন্সে। একটু আগেই কার যেন শ্বাস ঘন হয়ে উঠেছিল হাসপাতালের বিছানায়। আজ নিঃশব্দে চোখ বুজলো একজন। কোল খালি হল কারও, কারও বা সঙ্গী গেল চলে!

এরকমই শুনছি রোজ। দুর্যোগের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে আরও। সংখ্যা যাচ্ছে বেড়ে। ত্রাণ নিয়ে দুর্নীতি, কর্ম খুইয়ে বেকার মানুষ সব দেখেও রাষ্ট্র 'সুকান্ত' সেজে বসে আছে পাশে। আর আমরা, কিছু ঝাড় খাওয়া পাবলিক, প্রতিরোধের চেষ্টাটুকু শিকেয় তুলে শুধু ঝড় থেমে যাওয়ার প্রতিক্ষায়!

এইরকমই মন খারাপের মাঝে স্বস্তির খবর এল কানে, 'ওষুধ' এসেছে বাজারে। জব্দ হবে 'সে'। কিন্তু এতদিনে কত 'নায়েব-গোমস্তা'কে নাস্তানাবুদ করে ছেড়ে দিয়ে এখন সে কি সত্যিই মাত্র 'ছ' শিশি'র কাছে মাথা নোয়াবে! দেখার সেটাই।

প্রতিকূল এই পরিস্থিতিতে ভালো নেই কেউ। থাকার কথাও নয়। চারদিকে থমথমে, অন্ধকার। হাসতে ভুলে গেছে মানুষ। গাইতে ভুলে গেছে গান।

তবে শুরু যখন হয়েছে, শেষ তো তার আছেই। তাই না?

আর সাহিত্য কি সত্যিই পারে এই গুমোট পরিস্থিতিতে ক্ষণিকের শীতল আমেজ এনে দিতে? কাটা-ঘায়ে 'মলম' লাগাতে? অবশ্যই পারে। কেননা এই কঠোর বাস্তবের সামনে দাঁড়িয়ে 'ঝলসানো রুটি' মনে করাতে গেলেও তো একখানা 'পূর্ণিমা-চাঁদ' আঁকতে হয়! পারকের লেখককুল সেই চেষ্টাই করেছেন। এখন দেখার, পাঠক কি বলেন...




এই সংখ্যার সূচিপত্র
----------------------------

★ সাক্ষাৎকার :  গৌর বৈরাগী
                           অলোক গোস্বামী

★ ক্রোড়পত্র : 'আখ্যানে উত্তরবঙ্গের জনজাতি' ✍
শ্যামল সরকার মোনালিসা রেহমান
সুজয় চক্রবর্তী অমলকৃষ্ণ রায়

প্রবন্ধ
প্রদীপ রায়

★উষাকুমার দাসের অপ্রকাশিত চিঠি : এণাক্ষী মজুমদার

★ অণুগল্প :
কিন্নর রায় তপন বন্দ্যোপাধ্যায় চৈতালী চট্টোপাধ্যায় তন্বী হালদার বীরেন শাসমল সনৎ বসু সুকুমার রুজ রাজেশ ধর কাজল সেন শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিজিৎ রায় সুকুমার সরকার নিখিল পান্ডে মানস সরকার লতিফ হোসেন হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় চিরদীপ সরকার অর্পিতা গোস্বামী চৌধুরী ইন্দ্রাণী সমাদ্দার পারমিতা মন্ডল প্রদ্যুৎ রাজগুরু অভিজিৎ দাশ তরুনার্ক লাহা দীপঙ্কর বেরা রেখা রায় সুদীপ ঘোষাল সত্যম ভট্টাচার্য সুবোধ দে

★ ছোটগল্প :
প্রগতি মাইতি অমিত মুখোপাধ্যায় মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস গৌতম রায় আহসান হাবিব শ্রীকান্ত অধিকারী জয়িতা ভট্টাচার্য রামামৃত সিংহ মহাপাত্র মলয় মজুমদার সুবীর ঘোষ বিজয়া দেব অমিতাভ দাস শাঁওলি দে পার্থসারথি রায় দেবপ্রিয়া সরকার শুভাশিস দাশ দেবযানী কর সিনহা খোকন বর্মন গোপা মুখোপাধ্যায় নবনীতা সান্যাল দিব্যেন্দু সরকার অনুরঞ্জনা ঘোষ নাথ সুমনা ভট্টাচার্য্য দীপালোক ভট্টাচার্য

★ প্রবন্ধ :
মহর্ষি সরকার সংহিতা মিত্র মেহেবুব আলম

★ অনুবাদ গল্প :
বিপ্লব বিশ্বাস রাখি পুরকায়স্থ বাসুদেব দাস

★ গল্প লেখার গল্প : গৌতম দে

★ আঞ্চলিক গল্প : গোবিন্দ তালুকদার

★ রিভিউ : ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় (সোনালি খড়ের বোঝা)


সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২০

চন্দন চক্রবর্তী। পারক গল্পপত্র


'আমি মরে গেছি কিনা বুঝতে পারছি না। টোকা মারলে হার্টটা ধুকপুক করে। অনেকটা কনডেমড সেলের মতো। ছোট কুঠুরিতে বহুদিন পড়ে রয়েছি। একটা ঘুলঘুলির মতো দরজা। মাঝে মাঝে খোলা হয়, একটু খাদ্যর মতো আলো বাতাস পাই। তারপর আবার অন্ধকার। বেশ সেজেগুজে আমি ছিলাম বিদেশে। বলা যায় একটা সুন্দর কাঁচঘরে, আর পাঁচজনের সঙ্গে। সেখানে খদ্দের আসতো। কিনে নিয়ে চলে যেত। আমাকেও কিনে এনেছিলেন এক বাবু। 
বাবু আমাকে ছুঁয়েও দেখলেন না। আমার রংটা যদিও স্লেট রঙের কালচে। তবুও লোকে সুন্দরই বলতো। যাইহোক মালিক ভদ্রলোক বেশ উদার এবং দরদিও ছিলেন। তিনি আমাকে এক প্রিয়জনকে দিয়ে দিলেন। সে তো আমাকে কাছে রাখলো। ব্যবহার করলো। লোকে বললো, 'বাহ! সুন্দর।' আমি বুঝতে পারি না কোনটা সুন্দর, সে না আমি? কিছুদিন পরে সে আমাকে এই বদ্ধ কুঠুরিতে ফেলে রেখে গিয়েছিল। আজও আছি।'

ওই বাবুটি আমার মেজদা। ক'দিন আগে তাঁকে আগুন ঘরে রেখে এসেছি। আলমারির লকারে এক কোণে পড়েছিল ও। গিন্নি খুঁজতে খুঁজতে বার করেছিল। 'সিকো' দম দেওয়া বহু পুরনো জাপানি হাতঘড়ি। পঞ্চাশ বছর আগের। কালো ডায়াল। চকচকে রূপালি কাঁটা। শোরুমের  এককোণে পড়েছিল। বিদেশ থেকে কিনে এনেছিলেন মেজদা। তখন হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেবো। মেজদা উপহার দিয়ে বলেছিলেন, 'এই নে, এটা পরে সময় দেখবি। 

মেজদা আর নেই। ঘড়ির কাঁটাটা দু'ঘর গিয়ে থেমে গেল। 

ঘড়ির কাঁটা সাড়া দিয়ে যেন বলে গেল আমি বেঁচে ছিলাম।


শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২০

মলয় মজুমদার। পারক গল্পপত্র


অনিরুদ্ধ সোমের  জীবনে সব কটা স্বপ্ন যে শুধু স্বপ্ন, তা নয় । বেশির ভাগ স্বপ্নের সাথে জড়িত আছে জীবনের কিছু বাস্তব অতীত । ঘটে যাওয়া এক একটি ঘটনা অদ্ভুতভাবে তার স্বপ্নের সাথে জড়িত হয়ে যায় ।, অতি সামান্য ঘটনাও স্বপ্নের মাঝে খেলা করে কিছুদিন । আবার কোন কোন স্বপ্ন অনেকদিন ধরে চলে, আবার হঠাৎ হারিয়ে যায় । অনিরুদ্ধর জীবনে সুখের স্বপ্ন খুব কম, দঃস্বপ্নের আকারে আসা স্বপ্নগুলোই বেশি ।  অনেকের জীবনে প্রথমে স্বপ্ন আসে, তারপর হয়তো সেটা বাস্তবে রূপ পায় । অনিরুদ্ধর ঠিক উল্টো । স্বপ্নতত্বের বিশ্লেষণে কি দাঁড়ায় জানা নেই তার । চেষ্টা করেনি জানার । এইভাবেই তো জীবনটা কেটে যাচ্ছে অনিরুদ্ধর । 

অনিরুদ্ধর স্বপ্নগুলো তার অতীতের জীবনপনঞ্জী থেকেই আসে । সময়ের সাথে কিছু স্বপ্ন ফিকে হয়ে যায়, হারিয়ে যায় । আবার হয়তো কোন ঘটনা প্রবাহে, সেই স্বপ্ন জীবন্ত হয়ে ফিরে আসে  । হয়তো দু বছর কিমবা তিন বছর অথবা পাঁচ বছর সে স্বপ্নের দেখা পায় না,  অথবা অস্পষ্ট ভাবে কখনো আসে, কিন্তু তার ক্রিয়া মনকে স্পর্শ করে না । আজকাল  একটা স্বপ্ন, যা তার জীবনের রেখাচিত্রকে পরিবর্তন করে দিয়েছে । যে ঘটনা তাকে ছাড়তে বাধ্য করেছে ছোট থেকে বেড়ে ওঠা শহরটাকে । আর সেই ঘটনার জেরে দিনের পর দিন রাতের বিছানায় ভয়ে চমকে উঠেছে । জেগে উঠেছে  ঘুমের মধ্যে ।

 অনেক পূরানো সে ঘটনা । কত আর বয়স হবে, উনিশ কি বিশ । সময়ের সাথে সাথে  যা প্রায় ফিকে হয়ে গিয়েছিল,, সেটা আবার ফিরে এসেছে এক ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে । প্রতিরাতেই আসছে, আসছে আর অনিরুদ্ধর সব অস্তিত্বকে  ক্ষতবিক্ষত করে  জাগিয়ে রাখছে রাতের পর রাত । 

একটা স্বপ্নতো গত এক বছর ধরে চলছিল তার জীবনে । নানা ঘটনার প্রবাহ, তার জীবনকে অনেক ভাবেই কখনো উঠিয়েছে আবার কখনো নামিয়েছে । পরিবর্তন করতে হয়েছে শহর, কোন একটা শহরকে নিজের ভাবে ভাবনার আগেই, হাতে এসে পড়েছে ট্রান্সফার অর্ডার । প্রতিবার শহর ছাড়ার আগেই বহন করেছে স্বপ্নের রসদ । আর শেষ ঘটনার পরিণতি এমন ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছিল যে, স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়া ছাড়া কোন রাস্তা ছিল না । তাই  আটাশ বছরের দাম্পত্য জীবনের একটি সন্তান অনিমেষ । সেই অনিমেষকে একটা সময়ের পরে আর কাছে রাখতে পারেনি । পাঠিয়ে দিয়েছে বোর্ডিঙ স্কুলে, তারপর কলেজ । কলেজ জীবনটাও অনিরুদ্ধর ছেলেকে কাটাতে হয়েছে হোস্টেলে । 

স্ব-ইচ্ছায় অবসর গ্রহণ করার আগে দীর্ঘ যে ঘটনা, আজ আর ভাবতে চায় না । ভাবলে শরীরের মধ্যে রক্তের হিম স্রোত বইতে শুরু করে । রানু ওই ঘটনার কোন কথা তুললে, বুকের মধ্যে কেমন যেন ভয়ের যন্ত্রণা কাঁটা দেয় । রানুর অদ্ভুত ক্ষমতা চোখ দেখেই বুঝতে পারে অনিরুদ্ধর মনের অবস্থা । আর কথা বাড়ায় না । রানু অনিরুদ্ধর আঠাশ বছরের জীবন-সঙ্গিনী । বিয়ের পরে কিছুদিন চাকরী করেছিল একটা এম এন সি তে , কিন্তু বেশি দিন পারেনি । বিয়ের ছ’মাসের মাথায় অনিরুদ্ধর জীবনে তৃতীয় ট্রান্সফার । তারপর আর রানু কোনদিন চাকরি করেনি । ঘরের বউ হয়েই  কাটিয়ে দিয়েছে বাকি জীবনটা, এখনো কাটাচ্ছে । অনিরুদ্ধ জানে, রানুর মধ্যে তাই নিয়ে একটা ক্ষোভ আছে । কিন্তু সেই প্রসঙ্গ উঠলে অনিরুদ্ধ চুপ করে যায় । রানু একা একা অনেক কথা বলে । অনিরুদ্ধ শুধু শুনে যায় ।

দীর্ঘ কর্ম জীবনের ব্যস্ততা থেকে স্ব-ইচ্ছায় অবসর গ্রহণ করে সে ফিরে এসেছে তার পুরানো শহরে । সাথে করে এনেছিল দুঃস্বপ্নের রসদ ।  রাজনীতির জাঁতাকলে পিষে মরার মতো অবস্থা হয়েছিল । মাফিয়া থেকে রাজনৈতিক নেতা, বিরোধী থেকে শাসক । সেইদিন সে আবিস্কার করেছিল মাফিয়া শাসক আর বিরোধীদের মধ্যে সামাজিক ঐক্য - সামান্য একজন প্রথম শ্রেণীর সরকারী অফিসারের বিরুদ্ধে । কিন্তু স্টেশনে নামার পর সেগুলো কেমন যেন হারিয়ে গেলো স্মৃতি থেকে । স্মৃতিকে অতীতের পাতায় ফেলে দেবার জন্যেই তো সে  পালিয়ে এসেছে । কিন্তু ট্রেনে কামরা থেকে প্রথম পা স্টেশনে ফেলতেই, টের পেয়েছিল,স্মৃতির ভয়াবহতা নিয়ে এখানে তার জন্যে অপেক্ষা করছে একটা দগদগে অতীত । হোচট খাবার মতো অনিরুদ্ধর মনকে চমকে দিলো । তারপর  অতীতের সেই ঘটনা বিকশিত হতে থাকলো মনের মধ্যে । আর বিকশিত ডানাগুলো অনিরুদ্ধকে জাপ্টে ধরলো,অবরুদ্ধ হয়ে আসলো অনিরুদ্ধের মানসিক অস্তিত্ব ।

 আর এইভাবেই প্রতিরাতেই ঘুম ভাঙে, জল খায়, একবার ফ্ল্যাটের ব্যালকোনিতে এসে দাঁড়ায়, আকাশের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে, তবে অন্ধকারের দিকে তাকায় না । ভয় করে অনিরুদ্ধর এই সময় অন্ধকার দেখতে । তাই সে সোজা আকাশ দেখে, তারা ও চাঁদের আলো অনিরুদ্ধ মনকে বেশ শান্ত করে দেয় ।  শান্ত মন আকাশের তারা গোনে আর হাবিজাবি কি সব  বিড়বিড় করে, কখনো নিজের সাথে কথা বলে, কখনো চাঁদের সাথে । দেখলে মনে হয় যেন তারাদের সাথে বদল করছে ভাব, ভাষা  ও তার ঘটনা বহুল জীবনের ওঠানামা । 


(২)

ডিসেম্বরের ষোল, অবসর নেবার পাঁচ দিন পর অনিরুদ্ধ এসে নামলো এন জে পি স্টেশনে । রানু ও অনিমেষ দু’জনে আগেই চলে এসেছে । ট্রেন এসে থামলো, তখন রাত আটটা  ।, অনিরুদ্ধ কাছে এটা কোন রাত না, অনিরুদ্ধ যে শহর থেকে এসেছে, সেখানে এই সময়টাতে লোকের ছড়াছড়ি থাকে, পথে, ঘাটে, বাজারে, শপিং মলে,স্টেশন চত্তর তো মানুষে মানুষে ছয়লাপ, মেল ট্রেন, এক্সপ্রেস ট্রেন আর একের পর  একে লোকাল ট্রেন  । এখানে অতো ভিড় নেই । লোকাল ট্রেন খুব কম চলে । শুনেছে যা দু একটা চলে, সেটা দিনের বেলা । শুধু দুরপাল্লার ট্রেনেরই যাত্রীদের ভিড় ।   একেই বলে মহানগর আর নগরের মধ্যে পার্থক্য । এই সব চিন্তা করতে করতে নিজে মনের মধ্যেই হেসে উঠলো । স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখলো বেশ ভিড়, যাত্রীদের থেকে বেশি লোকাল ট্যাক্সি , রিকশাওয়ালা ,টোটো ড্রাইভার আর দালালদের  । এই সময় অনেক গুলো ট্রেন ঢোকে, আবার কিছু ট্রেন এখান থেকে ছেড়ে যায় ।  টোটো, লোকাল ট্যাক্সি কেউ কাছাকাছি দূরত্বে যেতে রাজি না । অগত্যা রিক্সা । রাত হয়ে গেছে, ভাড়া দিগুণ । দেরী না করে একটা রিক্সায় উঠে পড়লো ।

  বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা, বেশ ঢিমে তালে চলছে, রিক্সার গতি খুব মন্থর । তবু টানছে, কিছু একটা সমস্যা আছে বল বিয়ারিঙে, যতটা জোরে প্যাডেল দিচ্ছে ঠিক ততটা জোরে রিক্সার চাকাগুলো ঘুরছে না । রাস্তাও সে রকম মসৃণ না ।, অনেকদিন মনে হয় সারায়নি, কোথাও একটু উঁচু, কোথাও বা ছোট খাটো গর্ত  । এই সব খেয়াল করতে করতে  অনিরুদ্ধ চোখ বুজে  রিক্সায় হেলান দিলো । বহুদিন পরে আসা । মাফিয়া, শাসক ও বিরোধী পক্ষের ঐক্য এমন ভাবে এগিয়েছিল যে, অনিরুদ্ধর পক্ষে কোন কিছু করা সম্ভব ছিল না , হয় চাকরি থেকে বিদায় নতুবা দুর্নীতির কাছে মাথা নোয়ানো । প্রথমটাই অনিরুদ্ধর পছন্দ । কারণ দুর্নীতির কাছে কোনদিন মাথা নোয়াতে পারেনি বলেই তো একের পর এক ট্রান্সফারের চিঠি  জমা হয়েছিল চাকরি জীবনে । রানু এবার আর সহ্য করতে পারেনি । এর আগে সবগুলো ঘটনা ট্রান্সফারের চিঠিতেই শেষ হয়ে যেতো । এবার শেষ হলো না । লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল  সরকারের দূর্নীতি দমন  সংস্থাকে । যত রকম অস্বাভাবিক পরিস্থিতি মানুষকে আতঙ্কিত করা যায়, তার কোনটার থেকেই রেহাই পায়নি অনিরুদ্ধ ।


এলোমেলো চিন্তার মধ্যে দিয়ে রিক্সা এগিয়ে যাচ্ছে ।  কিছুটা আসার পরই অনিরুদ্ধ মনটা কেমন যেন কেঁপে উঠলো । সামনে ইন্ডিয়ান ওয়েলের কোয়াটার । বহু পরিচিত একটি কোয়াটার । ভুলে যাওয়া ফ্ল্যাট নাম্বারটা কিভাবে যেন মাথার মধ্যে এসে গেলো - তেরোর এ  । আর সেই ফ্ল্যাটের একটা ঘরের ছবিটা ভেসে উঠলো চোখের সামনে । এক পাশে সুন্দর করে সাজানো বইয়ের তাক, একটা সুন্দর পড়াশুনার জন্যে টেবিল, আলনা, ড্রেসিং টেবিল, একটা খাট , মিউজিক সিস্টেম, একটা বড়ো ওয়ারড্রব, দেওয়ালের একদিকে পিকাসোর আঁকা ছবি, আর ছড়ানো ছেটানো শ্রাবন্তীর বইপত্র । এক বছরে বহুবার এসেছে সে, কখনো একা, কখনো বন্ধুদের সাথে । কিছুদিনের মধ্যেই কেমন যেন আপন হয়ে উঠেছিল সব কিছু, বাড়ির লোকজন থেকে শুরু করে ঘরের প্রতিটি জিনিস-পত্তর । এমনকি ফ্ল্যাটের পাহারদার আফগান শেপার্ড । খুব কম লোকই সেই পাহারাদারের কাছাকাছি যেতে পারতো । কিন্তু সেও কিভাবে অনিরুদ্ধর আপন হয়ে উঠেছিল ।

 কোয়াটারটা যত এগিয়ে আসছে, অনিরুদ্ধর বুকটা যেন ততটাই কেঁপে উঠছে । প্রায় ছত্রিশ বছর আগের একটা বিকেল, তখন এক বছর হয়েছে কলেজে জীবনে , কলেজের প্রথম পরীক্ষা কিছুদিন পরেই । অন্যদিনের মতোই অনিরুদ্ধ গিয়েছিল শ্রাবন্তীদের ফ্ল্যাটে । আরো কয়েকজনের আসার কথাছিল, কিন্তু গিয়ে দেখলো, কেউ আসেনি । শ্রাবন্তী বিছানায় শুয়ে কি একটা পড়ছে । তারপর অনেকক্ষণ কেটেছে, কিন্তু হঠাৎ শ্রাবন্তী অনিরুদ্ধকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে গাঢ় নিঃশ্বাসে দীর্ঘ চুম্বন করে দু’জন দুজনকে জড়িয়ে বসে থাকলো অনেকক্ষণ । এটা যেন স্বাভাবিক ছিল অনিরুদ্ধর কাছে, শ্রাবন্তীর প্রতি তার আগ্রহ, সেটা অনেকেই জানতো কলেজে, এই নিয়ে কানাঘুষো হতো মেয়েদের মধ্যে । কিন্তু শ্রাবন্তীর হঠাৎ কি হলো, এক ধাক্কায় অনিরুদ্ধকে সরিয়ে শুধু বললো,’তুই এখনই বেরিয়ে যা ঘর থেকে ‘ ।

কিছুটা অবাক হয়ে বেরিয়ে এসেছিল সেদিন । পরের দিন কলেজে দেখা পায়নি শ্রাবন্তী, কিন্তু একটা নীরব  শব্দ যেন সেদিন বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে টের পেয়েছিল, বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে । এক দুবার জিঞ্জাসাও করেছিল, কিন্তু কেউ কিছু বলেনি । প্রশ্ন করলে, সবাই কেমন এড়িয়ে যাচ্ছিল । অনিরুদ্ধ নিজেও অতো বেশি পাত্তা দেয়নি, সেই নীরব রহস্যকে ।, ভেবেছিল হয়তো হয়তো মনের ভুল । পাঁচদিন পর সে নিজেকে যখন আবিষ্কার করলো নার্সিং হোমের বেডে,তখন স্মৃতি তাকে বুঝিয়ে দিলো, কলেজের নীরব রহস্যের কথা ।  চোখ মেলে দেখেছিল, মা-বাবার অসহায়পূর্ণ মুখ, আর পরিচিত মানুষজন, ছিল পুলিশের দল ।  মাথায় মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা ।, সব কিছু এলোমেলো ও আবছায়া । সে জেগে আছে , না ঘুমিয়ে বুঝতেই পারছে না । তারপর আর বাবা মা আত্মীয়রা দেরী করেনি, নার্সিংহোম থেকে সোজা মুম্বাই-এর এক বেসরকারি হাসপাতলে পাঠাতে । সেখানকার  একজন নাম করা ডাক্তার অনিরুদ্ধর কাকা, তারপর আর ফিরে আসেনি । সন্তানহীন কাকা কাকীমার কাছেই থেকে গিয়েছিল ।

বাবু এবার কোন দিকে যাবো ।
ডানদিকে ঢুকে তিন নাম্বার বাড়িটাতে দাঁড়াবি  ।

সেই রাতেই ফিরে এলো, ফিকে হয়ে যাওয়া স্বপ্নটা । মুখোমুখি শ্রাবন্তী ।  চারিদিক অন্ধকার, পৃথিবীর সব অন্ধকার যেন গ্রাস করে ফেলেছে তাকে । শুধু শ্রাবন্তী ও শ্রাবন্তীর পেছনে মুখোশধারী অপরিচিত কিছু মানুষ,যাদের শুধু ঝলসানো চোখ দুটো জ্বল জ্বল করছে । কারো হাতে ধারালো অস্ত্র- যা অন্ধকারেও চকচক করছে । কারো হাতে হকি স্টিক আর  শ্রাবন্তীর মুখে সাফল্যের বিষাক্ত হাসি । সেই হাসির বিষাক্ত গ্যাস অনিরুদ্ধকে কোন এক অতল গহবরে নিয়ে যাচ্ছে , আর অনিরুদ্ধ হারিয়ে ফেলছে তার সমস্ত চেতনা । ঠিক সেই সময়েই অনিরুদ্ধর ঘুম ভেঙে যায় । জেগে ওঠে । পাশে ঘুমন্ত রানু । অনিরুদ্ধ তখন বিছানা থেকে নেমে ব্যালকোনিতে এসে দাঁড়ায়।

(৩)

শীতের এই সকালে অনিরুদ্ধ ফ্ল্যাটের বারান্দায় বসে তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছিল করছিল পাড়া ও পাশে পম্পাদের বাড়ির বাগান । অনিরুদ্ধদেরও সামনে একটা ছোট বাগানছিল ,সেটা অনেক আগের কথা, তখন অনিরুদ্ধ প্রাইমারী থেকে হাই স্কুলের  উঠেছে । তারপর ধীরে ধীরের একদিন  বাগানটা কেমন যেন শুকিয়ে গেলো । পাতাবাহারের গাছ ছাড়া আর কোন গাছ বেড়ে উঠলো না । এখন সেটা ফ্ল্যাট হয়ে গেছে । এই ফ্ল্যাট বাড়ির একটা ফ্ল্যাট পেয়েছে সে  পৈ্ত্রিকসূত্রে । আগে কয়েকবার  রানু এসেছিল কখনো অনিমেষকে সাথে করে , কখনো বা একা । অনিরুদ্ধ এসেছিল মাত্র তিনবার, একবার বাবা মারা যাবার সময়, তারপর  মা মারা যাবার একদিন আগে ।  আর একবার এসেছিল বাড়ির বিষয়ে সই করতে । 

রানু চা দিয়ে গেছে সাথে বাজারের ব্যাগ । মুখটা বেশ গোমড়া, সকাল থেকে উঠেই এটা ওটা কাজ করে যাচ্ছে । এখনো কোন পরিচারিকা জোগাড় করে উঠতে পারেনি । এক-দু জন যারা এসেছিল । তাদের দেমাক দেখে রানুর নিজেরই রাগ হয়েছে । রেগে গিয়ে তো বলেই ফেলেছে ,’দরকার নেই এই সব হতচ্ছাড়া কাজের লোক, আমি নিজেই সব করে নেবো’।  অনিরুদ্ধ জানে ওটা শুধু রাগের ভাষা । কোনদিনই একা বাড়ির কাজ সামলাতে পারেনি । আজো পারে না । অনিরুদ্ধ চায়ের চুমুক দিয়ে পেপারটা উল্টে পাল্টে দেখে রেখে দিল টেবিলের উপর । এক পাশে দাদা ও অন্যপাশে বোনের সংসার ।  মুখ দেখাদেখি এরই মধ্যে বন্ধ হবার জোগাড় । দু’বার ঝগড়া হয়ে গেছে । রানু চুপ করে সহ্য করতে পারে না কিছু । 

চা শেষ করে অনিরুদ্ধ বেড়িয়ে পড়লো বাজারের ব্যাগ নিয়ে । সুভাষপল্লীর বাজার । এই বাজারকে গড়ে উঠতে দেখেছে অনিরুদ্ধ । আগে বাজার করতে যেতে হতো ‘পুরানো বাজারে’ । বাবার সাথে সাইকেল করে যেতো । তখন এই বাজার বেড়ে ওঠেনি । প্রথম যেদিন এই বাজারে এসেছিল, মায়ের হাত ধরে । চারিদিক দোকান পাটগুলো কেমন যেন । ঠিক বাজারের মতো না, একটু খাপছাড়া লেগেছিল । ধীরে ধীরে সেই বাজার একটা পরিণতি পেয়েছে । এখন তো একটা দিক পুরোপুরি কংক্রিটের । বাজার শেষ করে অনিরুদ্ধ , একটা চায়ের দোকানে এসে বসে পড়লো বেঞ্চের উপর । বাজার ভর্তি ব্যাগগুলো পায়ের কাছে রেখে, চা ও সাথে গরম সিঙ্গারা অর্ডার দিয়ে সামনে পড়ে থাকা পেপারটা তুলে নিলো । খবর প্রায় সব একই, কিন্তু এই পেপারে লোকাল অনেক খবর দেখতে পেলো, যা সে বাড়ির খবরের কাগজে পায়নি । বহুদিনের স্মৃতিতে থাকা বিশ্বাসকাকার দোকানের কথা মনে পড়ে গেলো । তবে এই দোকানটা একটু বড়ো ,ভিড় বেশি ।  অনেকটা জায়গা নিয়ে দোকান । অনেকগুলো বেঞ্চ, কিছু টুল আছে, আর একটা জায়গা ঘিরে আছে কিছু প্ল্যাস্টিকের চেয়ার । অনেকেই বাজার করতে এসে একবার ঢুঁ মারে , এক কাপ চা , সাথে কেউ কেউ সিঙ্গারা নিয়ে বসে ।

আচ্ছা আপনি অনিরুদ্ধ সোম না ?

তিন দশক পরে চেনা গলার আওয়াজ অনিরুদ্ধর বুকের ভেতরটা ছলাৎ করে উঠলো । অন্যমনস্ক মনটা হঠাৎ সরে গিয়ে অনিরুদ্ধ যার মুখোমুখি হলো, সে শ্রাবন্তী । হাতে বাজারের ব্যাগ । সুন্দর করে সাজানো চেহারা । কোথাও একবিন্দু খুঁত নেই । অনিরুদ্ধ উঠে দাঁড়ালো । 

হা, আপনি মানে তুই শ্রাবন্তী । তাই না ?
চিনতে পারলি তাহলে ? কবে এলি শহরে ? কেমন আছিস ? এতো বৃদ্ধ লাগছে কেন তোকে ? শরীর অসুস্থ নাকি ?

এক সাথে এতোগুলো প্রশ্ন অনিরুদ্ধ আশা করেনি । শ্রাবন্তীর মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে, কিছু বলার ইচ্ছে হলো না । নিজেকে কিছুটা বোকা আর অথর্ব মনে হলো অনিরুদ্ধর । আশ্চর্য লাগছে, কি সাবলীল ভাবে কথাগুলো বলতে পারছে । কিভাবে পারছে ? সব কিছু কি ভুলে গেছে ? সব স্মৃতি ? মৃত্যুর বিছানা পর্যন্ত যে অনিরুদ্ধকে পৌঁছে দিয়েছিল । সে কিভাবে এতো স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে পারে ? হোক না সে দীর্ঘকাল আগের কথা । সেদিন সাধন মাস্টার তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে না দেখলে, হয়তো অনিরুদ্ধ বাঁচতে পারতো না । সেতো জানতো না, যে শহরের রাজনৈতিক দাদার ভাইয়ের সাথে শ্রাবন্তীর দীর্ঘ প্রেম পর্ব । কেউ তাকে বলেনি । এমনকি শ্রাবন্তী পর্যন্ত কোনদিন ঘুণাক্ষরে জানতে দেয়নি । অনিরুদ্ধ বোঝেনি এমন পরিশীলিত একজন মেয়ে কখনো ওই রকম ক্লাস এইট পাস করা রাজনৈতিক ডাকাবুকোর সাথে দীর্ঘ প্রেমের ইতিহাস থাকতে পারয়ে ।   আজ কি স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে , খোঁজ নিচ্ছে শরীরের । কি বলবে অনিরুদ্ধ ? বুঝতে পারছে না । শরীরটা ঘেমে উঠছে ক্রমশঃ । বুকের ভেতর অদুভত একটা কষ্ট , যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না , সেই অনুভব নিয়ে নিরাকার অস্তিত্বহীন মানুষের মতো চেয়ে আছে , না শ্রাবন্তীর দিকে না । কারো দিকে না । দৃষ্টি স্থির শব্দহীন চোখের ভাষাতে । শুধু শ্রাবন্তীর কিছু কিছু শব্দ তার কানে এসে লাগছে, কিন্তু কোন বিকার নেই তার । এমনভাবে কতটা সময় পার হয়েছে , জানা নেই, শ্রাবন্তীর ধাক্কায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতেই আবার বসে পড়লো চায়ের দোকানের বেঞ্চে । 

কি হয়েছে তোর ? এমন করছিস কেন ? কি হলো ? 

কথাগুলো শুধু শুনলো, কিছু বললো না , পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে চায়ের দাম মিটিয়ে, একটা সিগারেট ধরিয়ে অনিরুদ্ধ হাঁটতে শুরু করলো । অদ্ভুত অস্থিরতা , অদ্ভুত আকারহীন আবেগ, রাগ , মাথার শিরাগুলো দপদপ করছে । এমন ভয়ঙ্কর ক্রোধ অথবা বেদনা সেদিনো অনুভব করেনি, যেদিন মাফিয়া, শাসক ও বিরোধী দলের চক্রান্তে সরকারী দূর্নীতি বিভাগের লোকগুলো এসে তছনছ করেছিল ফ্ল্যাটের সব আসবাব পত্তর। ওকথ্য ভাষায়  তাকিয়ে থাকা চোখগুলোও আজকের মতো অনিরুদ্ধকে আঘাত করেনি ।

  কাঠফাটা রোদে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু সে দাঁড়ালো না, একবার শুধু পেছন ঘুরে দেখলো, শ্রাবন্তী তখনো দাঁড়িয়ে । বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে শুধু এটাই মনে হলো ,শ্রাবন্তী - একটা নাম, একটা ঘটনা , একটা উদ্দেশ্য , একটা বিরামহীন বোঝাপড়া । শহর থেকে উচ্ছেদ করে দেওয়া অনিরুদ্ধর জীবনের ইতিহাস ।


দীপালোক ভট্টাচার্য। পারক গল্পপত্র


১. 
অন্যদিনের চেয়ে আজকের সকালটা আলাদা মনে হচ্ছে কেন? সেই তো একই  মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙা। কিন্তু সেই ডাকটাও মনে হল  অন্যরকম। মোবাইলের অ্যালার্মের মতই  পূর্ব নির্ধারিত সময়ে পূর্বনির্ধারিত কণ্ঠস্বরে পূর্ব নির্ধারিত কম্পাঙ্কে ডেকে ওঠা, ‘বাবু, বাবুরে, উঠবিনা?’ আজ খুব সম্ভবত 'বাবু'র পর 'রে' বলেনি মা। একটা ধ্বনির উচ্চারণ বা অনুচ্চারনে ভাবপ্রকাশটাই কেমন পালটে যায়, তাই না?  অথবা এটাও হতে পারে, পুরোটাই শোনার ভুল।প্রায় সারারাত এপাশ ওপাশ  করার পর ভোরের ঠিক আগে আগে চোখ লেগে যাওয়া একটা মুহূর্ত তৈরী হয়,যখন মনের চেতন, অচেতন আর অবচেতনের ঘরগুলোর দেওয়াল ভেঙে যায়  হঠাৎ করেই, বাস্তব আর স্বপ্নের এক বিচিত্র ককটেলে তৈরী হয়; সেই আবছায়া   ঘোরলাগা মুহূর্তে  মা ঠিক কী বলেছিল সেটার পূর্ণাঙ্গ   প্রতিচ্ছবি তৈরী হয় না মনের সেলুলয়েডে।  আর প্রবল মনখারাপের মুহূর্তে মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই  আহত হতে চায় অবচেতন মনে। এই দুঃখ বিলাসিতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে পারে না বাপী।  

বালিশের তলা থেকে মোবাইল টা বের করে দেখে সাতটা মোবাইল বার্তা। এলো নাকি সেই কাঙ্খিত মেসেজ, যার জন্য এখনো অপেক্ষা করে আছে বাপী? হয়ত স্যাটেলাইট, মোবাইল টাওয়ার অথবা বায়ুমণ্ডলের ট্রপোস্ফিয়ার, স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার এর কোন এক কোনে দিন কয়েক ঘাপটি মেরে থেকে হঠাৎ করে আগমন হয়েছে বাপীর ফোনের ইনবক্সে। না। মোবাইল কোম্পানীর ছাড়ের বিজ্ঞাপন, ব্যাংক থেকে আসা মাসের শেষ সম্বল দুশো টাকা তোলার ট্র্যাঞ্জাকশন বৃত্তান্ত আর সাহানার আকুতিভরা বার্তা – ‘ প্লিজ ফোনটা ধর... এভাবে ভেঙে পরিস না...  আমি আর টেনশন নিতে পারছি না’ ছাড়া আর কিছু নেই।

ধুর!

গেঞ্জিটা গায়ে গলিয়ে যেই বারান্দায় পা দিয়েছে বাপী ওমনি মায়ের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। এই দু দিন ধরে যতটা সম্ভব মায়ের সাথে সরাসরি দৃষ্টিবিনিময় এড়িয়ে চলছে বাপী। চোখাচোখি হলেই মায়ের চোখের ঝাপসা দৃষ্টিতে পড়তে অসুবিধা হয় না একরাশ উৎকণ্ঠা। কিন্তু এ যাত্রায় এড়ানো গেল না।

 -‘বাবুরে, দেখচিস মোবাইলটা?  সকালে জল আনতে গেছিলাম ট্যাপে’, বাপীর মা ভারী বালতিদুটো নিকোনো বারান্দায় রাখতে রাখতে বলল, ‘ঐ যে রবিকাকার বড় পোলা আছে না, আরে ঐযে কি জানি নামখান ভুইলা গেলাম, আরে তপন, তপন। ও কইল দক্ষিন পাড়ার একটা মেয়ে আছে না, আরে তোদের সাথে ডি এড পড়ল, ওর নাকি কাইল রাতে মেসেজ আসচে। সোমবার না মঙ্গল বার ওরে ডাকচে, কোন পেরাইমারিতে চাকরি নিবে ওইটা ঠিক হবে। ওই কইল, মাসিমা বাপীরে কইইয়েন তো মোবাইলটা চেক করতে। আগে কার চাকরি হইলে জানা যাইত। এখন বইয়া থাক তীর্থের কাকের মত। কখন মেসেজ পাঠাব মোবাইলে কর্তারা। অই, তুই হাতমুখ ধুইচিস?’
 -‘এইতো ধুইতেছি’, বাপী একটা বড় হাই তুলে বলল।
 -‘তাড়াতাড়ি কর। তোর ছাত্র-ছাত্রীরা আইয়া বইয়া থাকব। সাতটায় টাইম না টিউশুনির?’, মা তাড়া লাগালো বাপীকে, ‘এত ঢিলামি করতাছিস ক্যান? মুখ ধো। আমি তোর চা দিয়া আসতেছি টেবিলে, ঠিক আছে? মুড়ি খাবি তো? তেল দিয়া একটু মুড়ি মাইখা দেই, বুঝলি?’
 -‘আইজ পড়ামু না মা’, মায়ের দিকে না তাকিয়েই বলল বাপী।
 -‘পড়াইবি না ক্যান শুনি? এমন মন খারাপ কইরা বইয়া থাকস না’, বাপীর মা ছেলের কাছে আসল, ‘দ্যাখ বাবা, তুইও তো কম চ্যাষ্টা করলি না বাবা। দুইবেলা পেরাইভেট পড়ায়, রাত জাইগা পড়লি পেরাইমারির চাকরির লগে। কি আর করবি রে বাবা। কপাল কপাল। আর শুন, এমন তো না যে, এইবার পাইলি না বইলা সারাজীবন তুই বেকার থাকবি। জল আনতে গেলাম না একটু আগে, ওইত্তো, অইহানে গনসার মা কইল সামনে নাকি গুরুপ ডি’র পরীক্ষা আছে। কয় লাখ চাকরি দিব গুরুপ ডি পুষ্টে। তারপর পেরাইমারীতে তো আরো লোক নিবই। দুই বছর পরে হইলেও নিব, তাই না? যা বাবা, দেরী করিস না’।
 -‘কইলাম তো আইজ পড়ামুনা’, বাপী গলায় ঝাঁঝ।

দাঁত মাজা পেষ্টের গন্ধটায় কেমন গা গুলিয়ে উঠল বাপীর। একবার ওয়াক উঠল। কিন্তু বমি হল না। মুখটা কেমন টক হয়ে আছে। রাতে ঠিকমত খতে পারেনি। ঘুমও হচ্ছে না ঠিকঠাক।



২. 
 -‘কিরে বাল উঠবি না। ওঠ। শালা সাড়ে দশটা বাজে, লাটসাহেবের ওঠার নাম নেই’, তন্ময় কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকা বাপীর শরীরে একটা লাথ কষিয়ে বলল।
 বাপী কোনরকমে চোখ মেলল। কিন্তু ঠাহর করতে পারল না কোথায় আছে। বেসিনে মুখ ধুতে গিয়ে বুঝলো, পুরো পাকস্থলী টক হয়ে আছে।
 ওর মনে পড়ল, সন্ধ্যেবেলা সমীরণ এসে বলল, ‘আই বাপী, দেড়শো টা টাকা ছাড়। জলদি’। সেটা ছিল মাসের মাঝামাঝি। তার মানে বাবার টাকা পাঠাতে আরো দিন দশ।  বাপী মনে মনে অঙ্ক কষল, পার্স থেকে দেড়শো টাকা বেরিয়ে গেলে পরে থাকা মাসটায় অসুবিধা হবে কি না।
 ‘আরে না থাকলে বল, আমি দিয়ে দিচ্ছি। পরে দিস এখন’, বাপী বুঝল সমীরণ তাড়া লাগাচ্ছে, ‘আরে কিশলয়ের বোন স্টার পেয়েছে মাধ্যমিকে। ও পাঁচশো ছাড়বে। বাকীটা আমরা শেয়ার করব। যা পার্টি হবে না, ভুলবি না, কথা দিলাম’।
 তারপর পার্স থেকে নোট খুচরো মিলিয়ে দেড়শো টাকা বের করে দেওয়া, রাতে হোস্টেলের মিল অফ করে রুটি তড়কা সহযোগে একের পর এক বীয়ারের বোতল খোলা। এবং প্রথমবারের মত বাপীর আকণ্ঠ বীয়ার পান। সমীরণের ব্লু- টুথ স্পীকারের জোরালো গানের সাথে উদ্যাম নৃত্য।

 কোনোরকমে নাকে মুখে কিছু গুঁজে কলেজে রওনা হবার সময়  বাপীর মনে পড়ল, এস কে ডি স্যারের কাছে লেসন প্ল্যান জমা দেওয়ার ডেড লাইনের কথা। ও ভেবেছিল গতকাল রাতে কভার পেজ টা এঁকে ফেলবে। কিন্তু রাতের হুজ্জুতির কারনে সেটা করে ওঠা হয় নি। আবার কিছু একটা মিথ্যে বলতে হবে স্যারের কাছে। লেখাপড়ার প্রতি একাগ্রতা আর পারিবারিক অবস্থা – এই দুটো কারনে এস কে ডি স্যারের একটা পক্ষপাতিত্ব আছে বাপীর প্রতি সেটা ও ভালোই বুঝতে পারে। স্যারকে কী  বলা যায়? এমনিতে সবাই দোকান থেকে কালার প্রিন্ট করিয়ে নেয় প্রোজেক্ট ওয়ার্ক বা লেসন প্ল্যানের প্রথম পাতা। সেটা একদিকে সুবিধে। কিন্তু বাপী নিজের হাতেই করে। ওর আঁকা এবং লেখা – দুটোর হাতই ভালো। আর যেটা সবাই কে বলা যায় না, নিজের হাতের করলে সময় হয়ত একটু বেশী লাগে, কিন্তু প্রিন্ট করার খরচ টা বেঁচে যায়। স্যারকে কী বলবে, স্কেচ পেন ফুরিয়ে গেছে, কেনা হয় নি? নাকি অন্য কিছু?

 সাহানাকে একটা ফোন করলে কেমন হয়, বাপী ভাবল। সাহানা যে মেয়েদের মেসটায় থাকে, তার পাশেই একটা জেরক্স-প্রিন্টিং এসবের দোকান। যতদূর মনে হয়, এখনো বেরোয় নি ঘর থেকে। এসব দোকানের কম্পিউটারে ফরমাস মত ছবি থাকে, বললেই নাম, রোল নাম্বার, কোন বিষয়ের লেসন প্ল্যান – টাইপ করে ছেপে দেয় মিনিট কয়েকের মধ্যে। পকেট থেকে ফোনটা বের করেও কি মনে করে আবার ঢুকিয়ে রাখল বাপী। একটা দ্বিধা কাজ করছে অবচেতন মনে। আসলে সাহানা কী ভাববে? আবার হয়ত এটাও হতে পারে ও কিছুই ভাবল না। আসলে সাহানা সম্পর্কে হয়ত বেশী কিছু ভেবে ফেলেছে বাপী। মেয়েদের থেকে একটু দূরে দূরেই থাকত ও স্কুলে পড়ার সময়। এখানে প্রথম  সেই সংকোচটা ভাঙায় সাহানা, নিখাদ বন্ধুত্বের আহ্বানে। তারপর থেকে একটা কেমনতর ভালোলাগার জন্ম। কভার পেজের ফরমাশ জানিয়ে একটা ফোন কি এই ভালোলাগায় মালিন্য আনবে? আবার ফোনটা পকেট থেকে বের করে সাহানার নাম্বার ডায়াল করে বাপী।

 বাপী নিজেই বুঝল ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে ও। নিজের কাছে এক এক সময় অচেনা লাগছে নিজেকে। এক এক সময় অপরাধবোধ গ্রাস করছে চেতনা কে।     বাবার জমি বিক্রীর টাকায় বেসরকারি প্রাইমারী টীচার্স ট্রেনিং কোর্সে ভর্তি হয়ে বাবারই ঘামঝরানো পরিশ্রমের অর্থে মদ্যপান, হুল্লোড়, মস্তি।

 কিন্তু যেটা হল, কিছুদিনের মধ্যে এই অপরাধবোধ মনের গহনে লালন করে হুল্লোড়বাজিতে মেতে ওঠার আর্টটা অভিযোজন করে নিতে পেরেছিল বাপী। এটা পেরেছিল বলেই হয়ত হোষ্টেল জীবনে একঘরে হয়ে যায়নি ও বাকীদের মত, যাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান বাপীর মতই। শুধুমাত্র বাবা কষ্ট করে পড়াচ্ছে এই যুক্তিতে ক্লাস শেষে বিকেলের চা সাথে টা, মাঝে মাঝে মুভী দেখা, ফোনের নেটপ্যাক, মাঝে মাঝে দু একটা জামাকাপড় কেনা, কিপ্টেমি করে স্প্রে করলেও দু মাস অন্তর একটা ডিওড্রেন্ট – এ সব কিছুকে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেবার মত সাহস বোধ হয় ছিলনা বাপীর। আর সিনেমায়, সোশাল মিডিয়ায় সদ্য যুবাদের যে রকম ইমেজ তৈরী হয়েছে, ঠিক সেরকম ছাঁচে নিজেকে ঢেলে দেওয়ার একটা সুপ্ত বাসনা কাজ করেছিল বাপীর মধ্যে। বাবার মত সকালে গোয়ালঘর থেকে গরু বের করার বদলে অলস চোখে মোবাইলের নেট অন করাতেই বাপীর বেশী স্বস্তি। মহানগরের কর্পোরেট জীবন না হোক, একটা ছোট চাকরি, গ্রামের বাড়ী ছেড়ে শহরে একটা ছোট আস্তানা, একটা ছোটখাটো পেট্রোল বাহন আর সাহানার সাথে একটা সাজানো গোছানো সংসার – এটুকু স্বপ্ন তো দেখতেই পারে বাপী, বিশেষত যেখানে তাকে এভাবেই ভাবতে শিখিয়েছে ছোটবেলা থেকে সব্বাই। ‘বাপী সত্যি গ্রামের গর্ব’, ‘দেখো এ ছেলে একদিন অনেক বড় হবে, দেখো’, ‘চাষার ছেলে একদিন লাঙলের বদলে চক ধরবে, মাষ্টর হবে, দেখে নিও’ – মাধ্যমিকের পর এসব শুনতে শুনতে কান পচে গেছে বাপীর। আগে ভালো লাগত খুব।  এখন এসব ভাবতে গিয়ে শুধু একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল।




৩.
   -‘ছার, পড়াবেন না আজকে?’
 বাপী চাঁপাকলে মুখ ধুচ্ছিল।  ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে কুদ্দুস এসেছে। সাথে আরো জনা কয়েক ছেলে মেয়ে। এবারের মাধ্যমিকের ব্যাচ। রাস্তার ধারে ওদের ধানীজমিতে দরমার একটা একচালা ঘর করে বাপী সকাল বিকেল ছাত্র পড়ায় ব্যাচে ব্যাচে। প্রায় বছর খানেক ধরে। এর মধ্যেই টিউশন মাষ্টার হিসেবে বেশ নামডাক হয়ে গেছে। আসলে গ্রামে ভালো ছাত্র হিসেবে একটা পরিচিতি ছিলই। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে ভালো নম্বর – প্রাইভেট টিউশনের বাজারে এগুলোই বড় পুঁজি।

   কুদ্দুসকে কী বলবে, ভেবে পেলনা বাপী। কয়েকটা ছেলে-মেয়ে ভোরবেলা সাইকেল চালিয়ে  এসেছে তার কাছে, অনেকে আবার মাসের প্রথম বলে ক’খানা একশো টাকার নোট সমৃদ্ধ  খামও নিয়ে এসেছে সাথে করে। চট করে না বলতে কেমন লাগল বাপীর।

 ‘আজকে কোনটা পড়ানোর কথা ছিল যেন?’, একচালা গুমোট টিনের ঘরে দুটো বেঞ্চে গাদাগাদি করে বসা জনা দশেক ছেলেমেয়ের দিকে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল বাপী।
 ‘প্রাকৃতিক ভূগোলের ঘূর্ণবাত স্যার’,  রত্না জবাব দিল।

 ‘আগের দিন তোদের উচ্চচাপ আর নিম্নচাপের ব্যাপারটা বলেছিলাম, মনে আছে নিশ্চই’, নিবিষ্ট ভঙ্গিতে বলতে শুরু করল বাপী, ‘তো, ধরে নে খুব ছোট জায়গায় খুব গরম পড়ল। তার ফলে অত্যাধিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সেখানে গভীর নিম্নচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হবে। তাহলে বায়ুর সমতা রক্ষার জন্য আশপাশের উচ্চপাপ কেন্দ্র থেকে বাতাস তীব্রভাবে ছুটে আসবে পাক খেতে খেতে’।
হঠাৎ একটা ঘোরের রাজ্যে চলে গেল বাপী। এই একচালা  টিনের ঘর, ওর পড়ার টেবিলের বইখাতা, মা-বাবার হতাশাকে গলায় আঁটকে রেখে ভালো থাকার ভান, পড়শির জিজ্ঞাসু চোখ - এই সবকিছুই যেন তৈরী করেছে এক প্রবল নিম্নচাপ কেন্দ্র।

 ঠিক সেই মুহূর্তে বাপীর পকেট কেঁপে ওঠে। পড়ানোর সময় মোবাইলের আওয়াজ বন্ধ করে রাখে বাপী। বুঝলো একটা মেসেজ এসেছে। চাকরী পাওয়ার সেই কাঙ্ক্ষিত বার্তা এলো কী? নাকি সাহানার হয় এস্পার নয় ওস্পার রকমের মেসেজ। ও বলেছিল, বাড়ী থেকে নাকি বিয়ের কথাবার্তা চলছে। ওর বাবার বন্ধুর ছেলে; বাইরে বড় চাকরী করে, দেখতে আসার কথা। সাহানা কী শেষবারের জন্য কিছু বলতে চাইছে? পকেটে হাত দিয়ে গিয়ে ভাবল, থাক।

ছোট্ট জানালা দিয়ে বাপী দেখলো ছাইরঙা আকাশে ঝলসে উঠছে বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ। শনশনে বাতাস জানালার শার্সিতে জানান দিয়ে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল ঘরে। কড়াৎ করে দূরে কোথাও বাজ পড়ল। বাপী কি পড়াবে বুঝতে পারল না। 

  

তন্বী হালদার। পারক গল্পপত্র


শব্দকোষ সৃষ্টি হয় আমার শিরা উপশিরা ধমনীতে। এরা রক্তে গিয়ে মেশে। এদের সাথে আমার তখন রক্তের সম্পর্ক তৈরী হয়। এই সব শব্দগুলোকে আমি ধারণ করি জঠরে। তারপর লালন পালন করে উগরে দেই অক্ষরমালার কাছে। কালো কালো অক্ষরের কাছে আমার মাতৃ পিতৃ ঋণ জমতে থাকে। যে ঋণ অপরিশোধ্য। আমার ঘোর কাটে না। কেবল এক চেতনা থেকে আর এক চেতনায় আচ্ছন্ন হয়ে যাই। তোমাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছি। এই যাওয়ার মধ্যে একধরনের তর্জনীর যৌন গমনের মতো দিক নির্দেশ আছে। চল্লিশটা ট্র্যাঙ্কুইলিজার অথবা একটা ভেঁড়ীর গল্প হতেই পারতো একটা গল্পের নাম। তার বদলে উঠে এলো চকোবার। বেশ আধুনিক। সেক্সি। লকডাউনে কনডোম কেনা ছিল না আগে থেকে বলে অনেক মহিলা অনিচ্ছাকৃত মা হয়ে গেল। মৃত সৈনিকের পাঠ করতে করতে স্বামীর ভূমিকায় এতদিন পার্ট করতো যারা তাদের হাতে খেলনা বন্দুক দিয়েছে রাষ্ট্র। কে যেন বললো, সবাই কে নিয়ে চলতে শেখো। তার মানে আমি কি হিংসুটে। একাই খেতে চেয়েছিলাম চকোবার! কিন্তু একটা আইসক্রিম ক'জন কেই বা তুমি খাওয়াবে? এরপরের শর্ট ছিল ফ্রীজ হয়ে যাওয়া দৃশ্য। আর ঠিক তখনই কোথায় ঘন্টা বাজলো সেটাই ঘড়ির। ঢং ঢং ঢং ঢং। ছোটো বেলায় দুলে দুলে পড়া ইংরাজি প্রবচন আবার মনে পড়িয়ে দেয় time and tide wait for none. 

শুধু তুলতুলে রেশম লার্ভা পোড়ানোর কটু গন্ধ নাকে আসে। তোমাদের আসে? কি করা যাবে রেশম সিল্কের জন্য এটুকু ত্যাগ তো করতেই হবে ইয়ার। এই তোমার কাজ নেই। রাতে আমার স্বপ্ন দেখো? তাহলে কি আর ঘুমাবো না। জেগে থাকবো। স্বপ্ন দেখার ফ্যান্টাসি বন্ধ করতে। নাকি মহাঘুম!

শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

মাস্টার মহাশয়ের চিঠি অমিয়ভূষণকে : এণাক্ষী মজুমদার। পারক গল্পপত্র


ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে 'কোচবিহারের অমিয়ভূষণ'কে তাঁর মাস্টারমশায় উষাকুমার দাসের লেখা মূল্যবান একটি চিঠি এই প্রথম প্রকাশিত হচ্ছে।

১৩৬৬ সনের ২৫শে বৈশাখ নিও-লিট পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড অমিয়ভূষণের 'দুখিয়ার কুঠি' উপন্যাস প্রকাশ করে। মাস্টারমশায়ের বাড়িতে গিয়ে বইটি তাকে উপহার দিয়ে এসেছিলেন অমিয়ভূষণ। তারপর এই চিঠি।


উষাকুমার দাস
পাটাকুড়া
কোচবিহার

১৯/৬/ ১৯৫৯

কল্যাণীয়েষু,

ম্নেহের গোরা, তোমার “দুখিয়ার কুঠি” পড়ে তৃপ্তি পেয়েছি। ডাকঘরের চাকরিতে শহর থেকে দূরে এখানে ওখানে তোমাকে কাটাতে হয়েছে বহুদিন। অনেকে সেটাকে নির্বাসন বলে মনে করে। আমি বিস্মিত হয়েছি, সেসব জায়গায় ঘুরে দুঃখ তো তুমি পাওই নি, বরং এসব অপরিচিত বা স্বল্প-পরিচিত অঞ্চলের প্রবহমান সহজ জীবন-স্রোতকে প্রাণ দিয়ে অনুভব করেছ, বুদ্ধি দিয়ে বিশ্লেষণ করেছ, তোমার সাহিত্যিক প্রতিভায় এ দিয়ে গড়ে তুলেছ একটি অক্ষয় কথার মালা। সভ্যতা এগিয়ে চলে, যন্ত্রদানবের সাহায্য-পুষ্ট আধুনিক মানুষ প্রকৃতির লীলা-নিকেতনগুলিকে কৃত্রিম নাগরিক সুযোগ-সুবিধায় পাকিয়ে তোলে। প্রাণ-ধারণের মানের উন্নতিই এই সভ্যতার লক্ষ্য। কিন্তু মানুষ পেল কী? বাইরের পালিশের চাকচিক্য---এর স্থায়িত্ব কোথায়? সেকালের প্রকৃতির লীলা-ঘরে মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যে কপটতা ছিল না৷ ভালবাসাও ছিল আবার হিংস্র শত্রুতাও ছিল। কিন্তু দুই-ই খোলাখুলি--স্তালিনের সঙ্গে হিটলারের অনাক্রমণ-চুক্তি বা স্তালিনের সঙ্গে ইঙ্গো-মার্কিন বন্ধুতা তখনকার অশিক্ষিত মানব-মনের চিন্তার অতীত ছিল। ডাঙ্গর আই-এর চরিত্র নিয়ে রংবরের মাথাব্যথা নেই। রংবরের চোখে সে দেবী, হ্েচ্ছায় রংবর তার ক্রীতদাস। ফুলমতীও সহজ ভাবে সংসারে স্থান পেয়েছে। ডাঙ্গর আই বা ফুলমতীর কৃতকর্মের ভালমন্দ, পাপপুণ্য বা ফলাফল তাদের ব্যক্তিগত মনোজগতের ব্যাপার। সমাজ তাদের উপর খড়গ উদ্যত করে নি। সমাজিক উদারতার অভাবে তাই এর কুন্রী দিকটা বড় হয়ে সামাজিক-জীবনে উচ্ছুঙখলতা এনে দেয় নি। জলপরীর সঙ্গে মাতালুর সম্পর্ক বেহিসিবি হলেও অস্বাভাবিক নয়। মাতালু তলিয়ে গেল, কিন্তু তার বংশ যেন থেকে গেল জলপরীর ঘরে। আমাদের সভ্য সমাজ এদের স্বীকার করতে ভয় পায়। কিন্তু অতি-সভ্য সমাজে এ জাতীয় জীবনযাত্রার চল চোখে পড়ে। শুধু পূর্বাহ্নে আইন-আদালতের মাধ্যমে অধিকার কায়েমী করে নিতে হয়। বিচ্ছেদ ও মিলন, মিলন ও বিচ্ছেদ সেখানে পারিবারিক জীবনে হাতধরাধরি করে চলে ক্ষুদ্র স্বার্থচন্তাকে উপলক্ষ্য করে। উপন্যাসের গোড়ার দিকে ইতিহাসের কয়েক পংক্তি কুচবিহারের ইতিহাস আলোচনার পথে আলোকপাত করেছে। কুচবিহারীর কারও কারও মুখে ভুটিয়ার ছাপ অস্বীকার করা যায় না। ভূমিকায় অল্পকথায় ব্যাকরণের যে-মুলসূত্রের সরল ব্যাখ্যা দিয়েছ তাতে কুচবিহারী ভাষা বুঝতে বেগ পেতে হবে না কাউকে। ব্যাকরণ খাটছি অনেক দিন থেকে, কিন্তু কুচবিহারী ভাষা যে বাংলাভাষাই তা জানলেও তাকে ব্যাকরণের সূত্রের ভিতর দিয়ে এত সহজভাবে বুঝবার চেষ্টা করিনি কখনও।

পরিশেষে তুমি সেদিন বলেছিলে, আপনি যা অনুভব করতেন, অথচ লিখতে পারেননি, আপনার ছাত্ররা তা প্রকাশ করবার ভারপ্রাপ্ত। কথাটা সত্য বলে গ্রহণ করেছি। তোমার শুভ কামনা করি। ভগবৎ-চরণে প্রার্থনা জানাই তোমার লেখনীর উৎস-মুখে ভাষা ও ভাবের প্লাবন সংযুক্ত হয়ে সাহিত্য-ক্ষেত্রকে সরস করুক ও নব নব সৃষ্টি-মাধূর্ষে ভরিয়ে তুলুক। স্নেহ নিও।
শুভাকাঙ্ক্ষী,
মাস্টার মশায়।



চিঠির সম্বন্ধে বলার কিছু নেই। কিছু বলা দরকার পত্রলেখক সন্বন্ধে। আর তাঁর সম্বন্ধে কিছু বলতে যাওয়ার মানে অন্য এক কোচবিহারকে ছুঁয়ে আসা।

“আমাদের এই জেনকিন্স স্কুলটা ভালো স্কুল ছিল। ষাট বছর পরেও আমার শিক্ষকদের অনেকেই আমার অনুভূতিতে এখনো জীবিত। তাদের সম্বন্ধে এখনো আমার কৃতজ্ঞতা মেশানো ভালোবাসার ভাব মনে আছে।”-- “নিজের কথা” (লাল নক্ষত্র সেপ্টেম্বর ১৯৮৬) প্রবন্ধে লিখেছিলেন অমিয়ভূষণ।

এইরকম এক শিক্ষকের নাম উষাকুমার দাস। যেরকম শুনেছি, কলকাতার দিকে কোথাও, নাকি খোদ কলকাতাতেই, তাঁর বাড়ি ছিল। জেনকিন্স স্কুলে চাকরি নিয়ে কোচবিহারে এসেছিলেন। কবেকার কথা সেটা? বলা কঠিন। ১৯২৭-২৮-এর আগে তো বটেই। তাঁর সঙ্গে অমিয়ভূষণের প্রথম দেখা ১৯২৭ না ১৯২৮-এ, অঙ্কের ক্লাসে। “অঙ্ক কষাতেন উষাকুমার দাস মশাই। তাঁর মিষ্টি গলা আমাদের ভালো লাগত, কিন্তু প্রথম অঙ্কের পরীক্ষায় আমি পাঁচ পেলাম।”

এই 'মিষ্টি গলা' মৃদু ধীর সুরেলা স্বর শেষজীবন পর্যন্ত ছিল, এরকম বলেছেন অমিয়ভূষণের পুত্রকন্যারা, অপূর্বজ্যোতি ও মীনাক্ষী। বয়সের দরুন তখন হয়তো একটু ভাঙা-ভাঙা শোনাত। (সে হল গত শতকের ছয়ের দশকের কথা।) শ্যামবর্ণ একহারা সুপুরুষ চেহারা ছিল 'উষাবাবু'র, সদাবিন্যস্ত কেশ, যত্নক্ষৌরিত গন্ড। নিষ্কলঙ্ক, সাদা, ধবধবে ধুতি-পাঞ্জাবি তাঁর চিরকালের পোশাক। শৌখিন তাকে বলে না, কিন্তু সবই সুশৃঙ্খল, পরিচ্ছন্ন, যত্নলালিত, আকার-অবয়বে হোক কিংবা চলনে, অথবা চিন্তায়। কতকটা, বলা চলে, বিগত যুগের পিউরিটান ক্রিশ্চানদের মতো মনোভঙ্গি।

উষাবাবু ব্রাহ্ম ছিলেন। তখনকার দিনে সেরকম একটা যেন চল ছিল বলে শুনেছি। কোচবিহারে ব্রাহ্ম ছিল। একাধিক ব্রাম্মসমাজ ছিল। আরো বড় কথা, কোচবিহার রাজ্যের ঘোষিত ধর্ম, রাজার ধর্ম ছিল ব্রাহ্মধর্ম। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের মধ্যেও ব্রাহ্ম ছিলেন। ফলে কলকাতার দিক থেকে অনেক কৃতবিদ্য ব্রাহ্ম কোচবিহারের স্কুল-কলেজে নিযুক্তি পেয়ে এ দেশে আসতেন। সে ধারাটা গত শতকের প্রথম দুই দশক পর্যন্ত বজায় ছিল বলে মনে হয়। ব্রাহ্মদের মধ্যে তখন লেখাপড়া জানা লোক, যোগ্য লোকের অভাব ছিল না৷ অনুমান করি, কিন্তু প্রমাণের অভাবে অনুমানকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে পারি না। ব্রাহ্মদের মধ্যে পরস্পরকে এগিয়ে দেবার একটা প্রবণতা ছিল, যদিও তা যোগ্যতাসাপেক্ষে। এমনও হতে পারে, শুধু জীবিকার নিশ্চয়তাই নয়, কোচবিহার ব্রাহ্ম-রাজ্য হওয়াতে কলকাতা থেকে অনেক দূরে হলেও এ রাজ্যে আসতে তাদের স্বাভাবিক উৎসাহ জন্মিয়ে থাকবে। তাকে হয়তো “রিফর্মিং জীল” বলে। তবে ইতিহাসের বিষয়ে অনুমান নিয়ে বেশিদূর এগোনোটা কাজের কথা নয়। যেরকম শুনেছি, তোর্সা নদীর ধার ঘেঁষে, কেশবাশ্রমের কাছাকাছি 'বিধানপন্লী' নামে ব্রাহ্ম ভদ্রলোকদের এক উপনিবেশ স্থাপিত হয়েছিল পূর্বতন মহারানি সুনীতি দেবীর যত্নে। (এ 'বিধান নববিধান' অনুপ্রেরিত বই তো নয়) পুরনো পারিবারিক শ্রুতির সঙ্গে মিলিয়ে বুঝতে পারি উষাকুমার দাসের চিঠির মাথায় যে “পাটাকুড়া, নামক পল্লীর উল্লেখ, যে পল্লীতে তিনি আমৃত্যু বাস করেছেন, তা সুনীতি দেবীর “বিধানপল্লী” বটে। স্থানিক ইতিহাসের কোনো গবেষক হয়তো একদিন তথ্যের পাকা ভিত দিয়ে “শোনা কথা”র প্রামাণ্যতা যাচাই করবেন।

অন্যদিকে, এরকম পারিবারিক সূত্রে জেনেছি, কোচবিহারের ইতিহাসের এ পর্বটি চিরস্থায়ী তো নয়ই, দীর্ঘস্থায়ীও হয়নি। মহারাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ ভূপ বাহাদুরের রাজতৃকালের (১৯১১-১৯১৩) পরে, বিশেষ করে জিতেন্দ্রনারায়ণ মহারাজার মৃত্যুর পরে রাজমাতা ইন্দিরা দেবী রিজেন্ট মহোদয়ার আমল থেকে, কোচবিহারে ব্রাহ্মদের আনাগোনা এবং প্রতিপত্তিতে লক্ষ্যণীয় বাধার সৃষ্টি হয়।

এটা আশ্চর্যের যে কোচবিহারের সামাজিক ইতিহাসের এই দিকটি কী করে বা গবেষকদের নজরের আড়ালে থেকে যাচ্ছে। “কোচবিহার বিবাহ” নিয়ে এখনো
লেখালেখির, সত্যি কথা বললে রোমন্থনের, অন্ত নেই। কিন্তু কোচবিহার রাজ্যে ব্রাহ্মধর্মের বিস্তার, তার প্রভাব, সে সংক্রান্ত কোনো সামাজিক টানাপোড়েন, অথবা কোচবিহার রাজ্যের ব্রাহ্ম-অতীতের বিলুপ্তি-এমন সব বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

কিন্তু আমরা 'উষাবাবু'র কথাতে ছিলাম।

সেটা ১৯২৯ সালের কথা। তখনকার দিনের ফিফথ্‌ ক্লাসে উঠে, অর্থাৎ ক্লাসে মাস্টারমশাই এলেন।” অঙ্কের ক্লাসের তিনি “মাস্টারমশাই ছিলেন, গুরু নন। “মণিমাল্য” হাতে উষাবাবু আমার গুরু হলেন।”--১৯৬১ সালে জেনকিন্স স্কুলের শতবর্ষ স্মরণিকায় প্রথম পরিচ্ছেদ” প্রবন্ধে লিখেছেন অমিয়ভূষণ। ভাবার মতো বটে। “মণিমাল্য, হাতে উষাবাবু আমার গুরু হলেন'-- এই বাক্যটির কথা বলছি। কারণ এ লেখা অমিয়ভূষণের, শব্দের ব্যবহারে যার সতর্কতা ছিল।

আসলে ব্যাপারটা এই যে সে ভদ্রলোক মাস্টার মাত্র ছিলেন না, সিলেবাস শেষ করিয়ে দেওয়াকেই শিক্ষাদান মনে করতেন না। ক্লাস এইটের শিক্ষাদপ্তর-নিদিষ্ট বাংলা পাঠ্যপুস্তকের নাম ছিল 'সাহিত্যচয়ন'। এই বইয়ের উপরন্তু  উষাকুমার ছাত্রদের জন্য পাঠ্য করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের 'গল্পগচ্ছ' ও 'কথা ও কাহিনী' এই দুই পুস্তক। 'আজকাল বোধহয় এমন বোঝা চাপানোকে cruelty to animals বলা হবে। বালখিল্যদের রবীন্দ্রসাগরের তীরে নিয়ে যাওয়ার এমন আয়োজনকে বুদ্ধিমানেরা নিরর্থক বলবেন হয়তো। কিন্তু উষাবাবু যদি সে নিরর্থক কাজ করে থাকেন তবে D.P.I. তার বিচার করবেন। আমার মনে আছে 'কথা ও কাহিনী'-তে একটা কবিতায় ছিল : মোরে তুমি হে ভিখারী মার কাছ হ'তে টানি / করেছো আপন অনুচর। এরকম একটা ব্যাপার ঘটেছিল।” এত পড়ার ও উষাবাবুর এত পড়ানোর প্রভাব অন্য ছাত্রদের উপরে কী হয়েছিল কে বলবে, কিন্তু অমিয়ভূষণের উপরে তো তাঁর প্রভাব ছিল খুব স্পষ্ট। “রবীন্দ্রনাথের দিকে এভাবে ঠেলে দেওয়া কি ভালো হয়েছে? সেই সাগরে অবগাহন
করছি বটে, নাকানি-চোবানিও কম খেতে হচ্ছে না জীবনে।”

অমিয়ভূষণ লিখেছেন, “আমার ধারণা উষাবাবু D.P.I. বলতে Discretion in Preceptor's Instruction বুঝতেন।” শুধু এই পুস্তক নির্বাচনের ব্যাপারেই নয়। “ক্লাস নাইনের হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষায় বাংলার প্রশ্নপত্র দেখুন। অপঠিত বিষয়ের সারমর্ম লিখতে দিয়েছেন তিনি। এক নম্বরে দেখতে পাচ্ছি “শাজাহান” কবিতার একটি স্তবক অন্যটিতে শ্রীকান্ত চতুর্থ পর্বের বৈষ্ণবী কমললতার চরিত্রবর্ণনা। ছাত্ররা কি উত্তর দিতে পেরেছিল? পরে উষাবাবু আমাকে যা বলেছেন তার সারমর্ম এই : চারাগাছ একহাত উঁচু বলে কি তার জন্য টিনের ছাদ এঁটে আকাশকে তার মাপমতো করে দিতে হবে? “শাজাহান” কবিতার একটি স্তবক, সেই পওক্তিগুলির তাৎপর্য, অমিয়ভূষণ লিখেছেন, “এ নিশ্চয়ই আকাশের উদারতার সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।”

অমিয়ভূষণের স্কুল-জীবন সাঙ্গ হয়েছিল ১৯৩৪-এ। কিন্তু উষাবাবুর সঙ্গে যোগাযোগটা থেকেই গিয়েছিল। (সেটা যদিও রোজকার দেখাসাক্ষাতের মতো ব্যাপার ছিল না) তার একটা কারণ অকৃতদার উষাকুমার অন্য ব্রাহ্মদের মতো চাকরি-জীবনের শেষে কোচবিহার ছেড়ে চলে যাননি। বরং, যেমন শুনেছি, সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরে রামভোলা স্কুলে পড়াতেন তিনি। পড়িয়েছিলেন কিছুদিন। তাঁর মৃত্যুও হয় এই শহরে।

কিন্তু এটা, এই লেখাটা, একটা অসম্পূর্ণ লেখা হল বুঝতে পারছি। আসলে আগ্রহ যখন এল তখন বড় দেরি হয়ে গেছে। সেই অন্য কোচবিহারে যাবার পথটা চিনিয়ে দেবার মতো কেউ তো আর ছিল না!

রবীন্দ্রনাথ
শ্রীউষাকুমার দাস

এ মর্ত্যজগতে প্রচারিলে তুমি
অমর্ত্যলোকের বাণী, হে মরমী কবি;
নন্দনকানন হতে পুণ্য স্বর্গ-ছবি
দিলে আনি, ধুলিময় এ মর্ত্যভূমি
স্নেহময়ী মাতুরূপে দেখা দিল আজ।
গন্ডিবদ্ধ জীবনের শত বিফলতা
ঘুচায়েছ দানে দানে, এই তব কাজ।
বিশ্বের সবার সনে যোগসূত্রখানি
তোমার প্রসাদে আজ মন লয় মানি।
মরণের বিভীষিকা দূরে সরে যায়,
শ্যামরূপ লেখা পড়ে হিয়ার পাতায়
সার্থকজীবনে তব বিচিত্র সম্ভার
রেখে গেছ, হে রবীন্দ্র, লহ নমস্কার।

লুপ্তোদ্ধারও সাহিত্য-পত্রিকার সম্পাদকের কর্তব্য হতে পারে। সে কথা ভেবেই পারিবারিক সংগ্রহ থেকে দেওয়া গেল উষাকুমার দাসের একটি রচনা, যা ছাপা হয়েছিল রামভোলা বিদ্যালয়ের পত্রিকা কল্যাণ-এর “রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী সংখ্যা”য় মে ১৯৬১)। তখন ঢের বয়স হয়েছে “মাস্টারমশায়” উষাকুমার দাসের, কিন্তু রামভোলা বিদ্যালয়ের উৎসবের পরিচালনার ব্যাপারে যেমন, তেমন জেলাস্তরে আয়োজিত সরকারি
অনুষ্ঠানটিতেও, ১৯৫৯-৬০-৬১ সালে, দুই ছাত্র অশনিভূষণ এবং অমিয়ভূষণের পাশে তার ধীর সৌম্য মূর্তিটি সকলের চোখে পড়েছিল।

লেখক হবার, লেখক রূপে প্রতিষ্ঠা লাভের সমস্ত যোগ্যতাই তাঁর ছিল বলে মনে হয়, কিন্তু মনে হয় না সেরকম কিছু তাঁর জীবনে ঘটে উঠেছিল। আর, যদি তা হয়েও থাকে জানতে পারছি কই? অন্তত জেনকিন্স স্কুল-পত্রিকা 'অঞ্জলি'র প্রাচীনতর কালের সংখ্যাগুলি নেড়েচেড়ে কি কিছু পাওয়া যাবে? বলা মুশকিল। সেগুলি কি কোথাও আছে? অতীতের ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের একটা স্বাভাবিক উদাসীন্য আছে, আর তার ফলে এমন অনেক কিছুই হারিয়েছে যা কোচবিহারের সমাজ-ইতিহাসের আকর-উপাদান হতে পারত।

কথাকার গৌর বৈরাগীর মুখোমুখি রাজীব কুমার ঘোষ। পারক গল্পপত্র


(সত্তরের শেষদিক। শাস্ত্র-বিরোধী আন্দোলনের যুগ। যোগ দিয়েছিলেন বলরাম বসাকের ‘মুক্ত গল্পসভা’য়। গল্পকার বন্ধু হিসাবে পাশে পেয়েছিলেন রমানাথ রায়, শেখর বসু, তপন বন্দ্যোপাধ্যায়, আশিস ঘোষ ও আরো অনেককে। এরপর রাধানাথ মন্ডলের ‘গল্পচক্র’তে যাতায়াত শুরু। এর মধ্যে চন্দননগরে ‘গল্পমেলা’ তৈরি, উদ্দেশ্য ছিল গল্পকারদের জন্য একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। সবসময় চেয়েছেন নতুন নতুন গল্পকার উঠে আসুক। তিনি গৌর বৈরাগী, যতটা বড়দের লেখক ততটাই ছোটোদের। ছোটোগল্পের সংখ্যা সাতশোর ওপর, অণুগল্প ধরলে সংখ্যাটা হাজারের ওপর। অসামান্য সংগঠক। চল্লিশ বছর পেরোনো চন্দননগর গল্পমেলার স্থপতি। যে গল্পমেলা অতিক্রম করেছে তিনশোটি গল্পপাঠের আসর। প্রতি রবিবার সকালে যার বাড়িতে বসে গল্পের আড্ডা। কাছে দূরে মিলিয়ে গড়ে উপস্থিত থাকেন পঁচিশ থেকে তিরিশ জন গল্পপাগল লোক। গল্পের সমালোচনায় তিনি কঠিন-কঠোর, এক নির্মম সমালোচক। বড়দের জন্য তার গ্রন্থগুলি হল — গৌর বৈরাগীর গল্প(১৯৯৭), কাঠবাদাম গাছ(২০০৩), অপার্থিব(২০০৪), মূকাভিনয়ের একদিন(২০০৪)। ছোটোদের জন্য গল্পগ্রন্থ — গম্ভীরপুরের রাজামশাই (২০০৬), গুপ্তধন আবিষ্কার ও অন্যান্য গল্প(২০১০), বাঘ মারুনি(২০১১), বদলে গেলেন রাজামশাই(২০১২), তিনু পুলিশের বন্দুক(২০১৯)। ছোটোদের জন্য উপন্যাস — আকাশবাণী মহাদেবপুর(২০০৮), আকাশকুসুমপুরের ডায়েরি (১৪১৭), ভুতুড়ে সাক্ষাৎকার(২০০৯), স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ – প্রথম আলো এবং অন্ধকার (২০০৯)। এছাড়াও রয়েছে অজস্র অগ্রন্থিত গল্প। বানিজ্যিক, অবানিজ্যিক পত্রিকায় অজস্র গল্প প্রকাশ। পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন অগণিত সংস্থা থেকে।)

রাজীব।।  একদা প্রয়াত প্রাবন্ধিক, আলোচক — নৈহাটির পার্থপ্রতীম বন্দ্যোপাধ্যায় আপনার গল্প নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন ‘গৌর বৈরাগীর গল্প’। গৌর বৈরাগীর গল্প নিয়ে চর্চায় এই আলোচনাটির গুরুত্ব অপরিসীম। এই প্রবন্ধে তিনি আপনার গল্প রচনার কিছু বৈশিষ্ট্য  চিহ্নিত করেছিলেন। আজ আপনার গল্প-জীবনের একেবারে পরিণত পর্যায়ে এসে আপনি যদি সমস্ত গল্প-জীবনের দিকে ফিরে তাকান তাহলে কোন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় বা কোন প্রভাবে বা জীবনযাপনের কোন অভিঘাতে এই বৈশিষ্ট্যগুলির আপনার লেখনীতে আত্তীকরণ ঘটেছে সেই উত্তর খুঁজতেই এই সাক্ষাৎকার।

গৌর বৈরাগী।। ১৪১৮ সালে 'এবং মুশায়েরা' পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল।

রাজীব।। আশা করব এই আলোচনা নবীন অক্ষরকর্মীদের সামনে বিস্তৃত পথের ওপর আলো ফেলবে, আরো স্পষ্ট হবে তাদের গন্তব্য। প্রথম যে বৈশিষ্ট্যটি পার্থপ্রতিমবাবু নির্দেশ করেছিলেন তা হল আপনি তুচ্ছ প্রাত্যহিকতাকে  নিয়ে যান এমন এক স্তরে যাতে পাঠক ঢুকে যায় সময়ের গভীরে। এই প্রসঙ্গে এখন আপনি কী বলবেন?

গৌর বৈরাগী।। কথাটা ঠিকই, তুচ্ছর দিকেই আমার নজর থাকে। যা ছোট, যা অবহেলিত, যা সাধারণের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। হয়ত যে ঘটনাটি ব্রাত্য সে কারণেই কীনা কে জানে আমার পক্ষপাত এমন এমন সময়ে ‘ছোটো’ বা ‘তুচ্ছ’র প্রতিই থাকে। আমার কেন যেন মনে হয় তুচ্ছকে তাচ্ছিল্য করার বিষয় নয় মোটেই। প্রাত্যহিকতায় ঘটে যাওয়া তুচ্ছ ঘটনাটি তো একক নয় তা আসলে সংলগ্ন হয়ে থাকে বৃহৎ ঘটনার সঙ্গে। বড় ঘটনার একটা অংশ। লেখক হিসেবে আমার কাজ হল টুকরো অংশকে ধরে সমগ্রে পৌঁছে যাওয়া। এটা একটা পদ্ধতি। একজন অক্ষরকর্মী হিসেবে আমার এমনটাই স্বচ্ছন্দ লাগে। এর মধ্যে আর একটা খুব দামি কথা আছে। ওই যেখানে বলা হচ্ছে – ‘পাঠক ঢুকে যায় সময়ের গভীরে’। এটা শুধু কথা হিসেবে দামি নয়, সময়ের গভীরে পাঠককে পৌঁছে দেওয়ার কাজটা বেশ জটিল একটা প্রক্রিয়া। শুধু কিছু অক্ষর দিয়ে তত্ত্ব দিয়ে, ঘটনার ঘনঘটা দিয়ে এ কাজটা করা যায় না। এটা একটা কৃৎকৌশল, একজন অক্ষরকর্মীকে সারাজীবন ধরে তা আয়ত্ব করতে হয়, তবেই লেখকের প্রার্থিত জায়গায় পাঠককে নিয়ে যাওয়া যায়।

রাজীব।। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হল — আপনি গল্প বলতে বোঝেন ঘটনা ও চরিত্রের মধ্যে একটা থিমকে ক্রমশ নির্মাণ করা। সেই থিমকে গল্পের মূর্ত বাস্তবে নিয়ে আসা এবং ক্রমে ক্রমে এক বহুমাত্রিক স্তরে পৌঁছানো।



গৌর বৈরাগী।। গল্প আসলে কোনো ঘটনা নয়। কিছু চরিত্রের সমাহারও নয়। একটা থিমকে দাঁড় করাতে গেলে যদিও ঘটনা বা চরিত্র অপরিহার্য তবু একটি গল্পের গল্প হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এটা অপরিহার্য নয়। প্রত্যেক লেখকেরই একটা ‘বলার কথা’ থাকে। যাকে মেসেজও বলা যায়। গল্পের ভেতর যার কিছু খুব প্রচ্ছন্ন ভাবে থাকার কথা। সব নয়, কোনো কোনো ঘটনা, দৃশ্য বা চকিত চমক লেখকের মনোজগতে আলোড়ন তোলে। ঘটনার ঘাত ব্যক্তি পরিচয় ছাড়িয়ে দাবি করে সামগ্রিকতায় পৌঁছাতে। লেখক তখন নিরুপায়। পাঠকের সামনে হাজির হওয়া ছাড়া তার আর অন্য উপায় থাকে না। আবার শুধু গল্প কিংবা ঘটনার বিবৃতি দেওয়াটাই তো লেখার উদ্দেশ্য নয়, তেমন হলে লেখা হবে একমাত্রিক। লেখকের মনন জগতে একজন শিল্পী সতর্ক পাহারায় থাকেন। তিনি একমাত্রিকতায় তুষ্ট হবেন কেন! ওই যে বলা হল গল্প কোনো স্থূল ঘটনার বর্ণনা নয়। গল্পে কোনো বহুমুখী চরিত্রেরও উপস্থিতি নয়। এগুলি বাইরের পোষাক। গল্প থাকে নিঃশব্দ গোপন এক অন্তরালে এবং তা অবশ্যই একমাত্রিকতায় থাকে না।

রাজীব।। তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি হল আপনি বর্তমান সময়কে ব্যবচ্ছেদ করেন। আপনার শ্রেণীকে বা ‘ক্লাস’কে ব্যবচ্ছেদ করেন।

গৌর বৈরাগী।। একজন শিল্পীমানুষ কখনও অনুভূতিশূণ্য হতে পারে না। আনন্দে উচ্ছ্বসিত হন, দুঃখে দীর্ণ হন, প্রতিদিন ধ্বস্ত হতে হতে এক সময় আগুন হতে ইচ্ছে হয়। অন্যের কথা বলতে পারিনা। কিন্তু আমার গায়ে জোর নেই, মুষ্ঠিবদ্ধ হাতকে প্রতিবাদী করার মত সাহসও নেই। শুধু হাতে একটি নির্বিষ কলম আছে। সেটাই আমার আয়ুধ। তা দিয়ে যথাসম্ভব সময়কে নির্মাণ করি এবং বলতে কী আমাকেও নির্মাণ করি। এ সেই ‘আমি’ যাকে আগুনের আঁচ থেকে রক্ষা করার বদলে আগুনেই নিক্ষেপ করি। একজন শিল্পীকে এভাবেই ব্যবচ্ছেদ করতে হয়। সমাজকে তো বটেই, নিজেকেও।

রাজীব।। আপনার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল — আপনি শুধু আশার কথা শোনান না বা জোর করে আশার নামে মরীচিকার আলো দেখান না অন্ধকারে শব ব্যবচ্ছেদ-ও করেন। যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

গৌর বৈরাগী।। এ ব্যাপারে আমি একটু পুরনো পন্থী। আমি মানুষটা অত্যন্ত আশাবাদী। সব গল্পই আসলে জীবনের গল্প। বাস্তবে মানুষের হেরে যাওয়া আছে, হতাশা আছে। হতাশ মানুষের সামনে মৃত্যুভাবনার গহীন অন্ধকার আছে। এগুলো বাস্তব। কিন্তু কেন জানিনা এই চাক্ষুষ বাস্তব আমাকে শান্তি দেয় না। এই ঘোর বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। পৌঁছতে চাই অন্তরের বাস্তবতায়। কলমকে আঁকড়ে ধরার পেছনে এটাও একটা কারণ। সব যুবকের মতো আমিও একদিন সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিলুম। সত্তরদশকের আঁচ গায়ে লেগেছিল। লাগার কথাই। সে আঁচে ঝলসে যেতে পারতুম। পারিনি সেও একজন হেরো মানুষের কথা ভেবে। তেমন একজন মানুষ আমার বাবা। অন্যজন আমার মা। বাবা শ্যামনগর নর্থ জুট মিলের চোদ্দ টাকা বারো আনা হপ্তার কল মিস্ত্রি। তার জীবনে দুটি প্রিয় আকাঙ্খা ছিল। প্রথমটি মিল ফেরত সন্ধ্যাকালীন হরিসভায় গিয়ে নামগান, অন্যটি ছিল প্রায় প্রতিরাতে মায়ের ক্লান্ত শরীরে তার রাগের মোচন। তাই আমরা ভাইবোন মিলিয়ে এগারো জন। এই অপরিকল্পিত যাপনে দারিদ্র আর কৃচ্ছতা যে নিত্যসঙ্গী হবে এ কথা বলাই বাহুল্য। এই অবস্থায় শৈশব কৈশোর পেরিয়ে একদিন যুবক হলুম। সেই যুবক বেলায় চাকরিও জুটে গেল একটা। প্রথম পোস্টিং ছিল শান্তিনিকেতনে। তখন সেই ১৯৭০-৭১ সালে শান্তিনিকেতনে রাজনীতির আঁচ ছিল গনগনে। অফিস কাছারিতে মুহূর্মুহু স্লোগান উঠছে তখন। গোপন মিটিং অ্যাটেন্ড করছি। উত্তেজনায় টগবগ করছে শরীর। ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরা’র আগুনে আহ্বানে পা বাড়াবার অপেক্ষা শুধু। তখনই একদিন মাস মাইনে হাতে করে বাড়ি গেছি। মাইনের প্রথম টাকাটি বাবার হাতে আর জীবনে এই প্রথম মায়ের হাতে একটি দশ টাকার নোট আলাদা করে। দীর্ঘ রোগভোগের পর তাদের দুজনার হাতে সামান্য পথ্য। সেইদিন বাবার রাগি চোখ দুটো দেখেছিলুম শান্ত, নম্র, বিভোর। মায়ের চোখ বাধা মানে নি। এই হল তুচ্ছ প্রাত্যহিকতা। এর তুলনায় ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরা’র স্লোগানই সমস্ত তুচ্ছতার বিরুদ্ধে আহ্বান। কিন্তু সত্যি কথা হল সেই দিন আমি তুচ্ছতাকে তাচ্ছিল্য করতে পারিনি। ঘরকেই গৃহকোণকেই মর্যাদা দিয়ে ফেলেছিলুম। এর মধ্যেই যে কত অন্ধকার। খাঁজে খাঁজে কত যে পাপ। শুধু এই পাপকেই তুলে আনা নয় আমি এর মধ্যে আলোর সন্ধানও করি। ওই যে বলা হচ্ছে ‘অন্ধকারের শব ব্যবচ্ছেদ’ সত্যি বলতে কী শব ব্যবচ্ছেদ করি বইকি। তবে সেই ব্যবচ্ছেদে পুঁজ রক্ত ক্লেদ তুলে আনিনা। আমি তুলে আনতে চেষ্টা করি আত্মাকে।

 রাজীব।। পার্থপ্রতিমবাবু বলেছিলেন আপনার লেখায় আপনি বর্তমান সময়ের অনন্বয়, চরিত্রহীনতা, সার্বিক ভাঙনের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েক যুগ পার করে আজ আপনার কী মনে হয়?

গৌর বৈরাগী।। এই যে সার্বিক ভাঙনের বিপ্রতীপে দাঁড়াবার কথা বলা হচ্ছে এটা যেকোনো শিল্পীর ক্ষেত্রেই সত্যি। তিনি যে মাধ্যমেই কাজ করুন না কেন, তিনি চিত্রশিল্পী হোন, অভিনেতা, গায়ক, লেখক – সবার ক্ষেত্রেই কথাটা খাটে। একজন শিল্পী হলেন সমাজের মুখ। সামাজিক অবক্ষয় আর চরিত্রহীনতার কারণে সচেতন শিল্পী মাত্রেই দীর্ণ হন। গলা তুলতে হয় এর বিরুদ্ধে। এই গলাটা একজন চিত্রশিল্পীর ক্ষেত্রে রঙ তুলি। গায়কের কন্ঠ এবং সুর, অভিনেতার অভিনয়, কবি সাহিত্যিকের কলম। সমাজে সার্বিক ভাঙনের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দী হয়ে ওঠাটাই একজন যথার্থ শিল্পীর দায়।

রাজীব।। পার্থপ্রতিমবাবুর মতে গল্পের ছোটো পরিসরেই আপনি সফলভাবে বহুস্বরিক হয়ে উঠেছেন। যে বহুস্বরিকতা সাধারণত উপন্যাসের ধর্ম। আপনি কী মনে করেন?

গৌর বৈরাগী।। এটা বুঝি আমারই কথা। ছোটোগল্প আমার প্রিয় বিষয়। আবার ‘পরিসর’ শব্দটিও এখানে যথোপযুক্ত অন্তত আমার ক্ষেত্রে। চল্লিশ বছর ধরে লেখালেখি করতে করতে ছোটোগল্প এবং ছোটোদের গল্প লেখা হয়ে গেল অজস্র। উপন্যাস বলতে যা বোঝায়, অন্তত বর্তমানে যে মাপের উপন্যাস লেখালেখি হচ্ছে তা হয়ত হাজার পঞ্চাশ শব্দের, তেমন উপন্যাস একটিও লিখিনি। প্রথম কথা উপন্যাস আমি লিখতে পারিনা। এর কৃৎকৌশল আমার অধিগত নয়। ছোটোগল্পেই আমি স্বচ্ছন্দ এবং সাবলীল। আসলে আমি কম কথার মানুষ। কম বলে কত বেশি বলা যায় তারই অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছি এখনও। আমার অধিকাংশ গল্প আকারে খুবই ছোটো। লিখতে গিয়ে দেখেছি এক দেড় হাজার অথবা বড়জোর দু’হাজার শব্দের মধ্যে যা বলার তা বলা হয়ে যায়। আরও বড় করার অর্থ গল্পকে টেনে বাড়ানো। তার মানেই গল্পের শরীরে মেদ বাহুল্য। আমার মনে হয় ব্যবহৃত হতে হতে শব্দের নিজস্ব একটা ওজন তৈরি হয়। শব্দের ধার আছে, ভারও আছে। এটা এমনি এমনি হয় না। জনজীবনে ব্যবহৃত হতে হতে মৃতপ্রায় কোনো শব্দ জীবন্ত হয়ে ওঠে। তখন তার ধার তৈরি হয়, ধারালোও হয়। শব্দের চরিত্র নির্মাণে নিঃশব্দে এগুলো কাজ করে। আবার নতুন শব্দও প্রতিদিন তৈরি হয় সমাজ সংগঠনে। পুরনো নতুন মিলিয়ে এইসব শব্দই হল একজন অক্ষরকর্মীর কাঁচামাল, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রথমেই আসবে বাক্যের কথা। বাক্য হল শব্দের সমষ্টি। যেমন তেমন করে শব্দ জোড়া লাগিয়ে বাক্য হয়ত একটা তৈরি হল কিন্তু শব্দের সংস্থাপনে যদি গলদ থাকে তা সে বাক্য উৎরোবে না। গদ্যেরও একটা ছন্দ আছে। সে ছন্দকে কবিতার ছন্দের মতো সংজ্ঞায়িত করা যায় না বটে কিন্তু কান ঠিক টের পায়। তখন কান ঘাড় ধরে মনকেও টেনে আনে গদ্যের জঞ্জাল থেকে।ঠিক ঠিক শব্দ সাজিয়ে বিষয়ানুযায়ী যদি একটি ছন্দিত বাক্য তৈরি হয় তবে তা বিদ্ধ করতে পারে পাঠকের হৃদয়। সে সময় বেশি কথা বলার দরকারই হয় না। স্বল্প পরিসরে বলার কথা বলে ফেলা যায়। আমার লেখায় বরাবর সে চেষ্টাই আছে। পুরোপুরি সফল হয়েছি এমন দাবি কখনোই করি না। গল্পের শ্রেষ্ঠত্ব তার আয়তনের ওপর মোটেই নির্ভর করে না। স্বল্পায়তনের অনেক গল্পই যে সাহিত্যে অমর হয়ে আছে তার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যেও। বর্তমানে সময়ের দাবি মেনে ছোটোগল্প আরও ছোটো হচ্ছে যার শব্দ সংখ্যা ২০০/২৫০/৩০০ এবং তার নাম অণুগল্প। এই গল্পই এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পত্র পত্রিকার পাতা থেকে ফেসবুক, হোয়াটস্‌ অ্যাপের পাতাতেও। যদিও এই গল্প ছোটোগল্পের থেকে চেহারা চরিত্রে একদম আলাদা। কিন্তু একটা কথা হল পরিসর। স্বল্পায়তনেও যে বলার কথাটা বলা যায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ অণুগল্প। এখানেও বহুস্বরিক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে পরিসর কোনো অন্তরায় নয়।

রাজীব।। বর্তমানে কিশোর থেকে শুরু করে কলেজ পড়ুয়া বা যিনি সদ্য গল্প লেখা শুরু করেছেন তাদের উদ্দেশ্যে আপনি কী বলবেন?



গৌর বৈরাগী।। আসল যেটা বলার হলো, বিষয়টাতো প্রত্যেকেই জানে যে কোন বিষয়ের ওপর তারা লিখবে কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আরো লেখা আর কী, আরো আরো লিখে যাওয়া। লিখতে লিখতে যেটা হয় এফিসিয়েন্সি তৈরি হয়, পারফেকশন তৈরি হয়। শব্দের, বাক্যের যে গঠন কম কথায় অনেক বেশি বলা যায়, যেটা আমি আগেও বলেছি, সেটা কিন্তু একমাত্র চর্চার ভেতর দিয়ে — চর্চা, চর্চা, চর্চা, আরো চর্চা তার ভেতর দিয়ে আরো পারফেক্ট হয়ে ওঠে। এই সময়ের লেখকদের কাছে আমার বলা, তারা তো চোখ-কান খুলেই লিখছে, সেটা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই যে এই বর্তমান সময়টা যেন তাদের লেখার মধ্যে আসে। আসবেই। কিন্তু শুধু তো তাই নয়, তাকে লেখা তৈরি করতে গেলে এবং শিল্পীত প্রয়াস হতে গেলে, শুধু তো বিষয় নয়। বিষয়ের পরেও গল্প হয়ে ওঠার জন্য যে রসায়নটা, সেটা শব্দ, বাক্যের এমন গঠন যাতে করে সেটা অন্তত বাক্যটা যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই জায়গাটা, এটার জন্য কিন্তু চর্চা দরকার। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত চর্চাটা দরকার।

রাজীব।। বর্তমানে এই যে করোনা পরিস্থিতি, লকডাউন পরিস্থিতি। এই সময়ে এই পরিস্থিতিকে নিয়ে কিছু না কিছু গল্প নিশ্চয়ই আপনি শুনেছেন বা পড়েছেন ডিজিটাল মাধ্যমে। যদিও আমি জানি আপনি ডিজিটাল মাধ্যমে অতটা সরগড় নন, তবুও নিশ্চয়ই কিছু গল্প অবশ্যই পড়েছেন। এই পরিস্থিতিকে নিয়ে লেখা সেইসব গল্প নিয়ে বা লেখকদের অভিমুখ নিয়ে আপনার মতামত কী? আপনার কেমন লেগেছে বা আপনার কী মনে হচ্ছে কোন দিকটা ঘাটতি থেকে যাচ্ছে?

গৌর বৈরাগী।। খুব যে বেশি পড়েছি তা নয়, প্রিন্ট মিডিয়া তো হাতে তখন বিশেষ পাইনি, তবুও যা পড়েছি তাতে করে মনে হয়েছে তারা বিষয়টা দেখছে এবং তারা বিষয়টার ওপর ওপর দেখছে না কিন্তু। এই যে সমস্যা তার গভীরে চলে যাচ্ছে, কারো কারো লেখায় আমি দেখেছি। তারা গভীরে যাবার চেষ্টা করছে। মানুষের মূল্যবোধের যে সংকট, মানুষের নিজস্ব পারস্পরিক মিলনের যে সংকট এবং এই সময়ের যে আত্মিক সংকট এটাকে ধরে বেশ কয়েকটা লেখা আমি দেখেছি। প্রিন্ট মিডিয়ায় নয় কিন্তু ওই অনলাইনে যেগুলো দেখেছি। সঠিকভাবেই এসেছে।

রাজীব।। দীর্ঘকাল আপনি ছোটোদের জন্য গল্প লিখেছেন, ওয়ার্কশপ করেছেন। এখন লকডাউন পরস্থিতিতে যখন প্রিন্ট মিডিয়া আর সেভাবে ছোটোদের কাছে পৌঁছোচ্ছে না, তখন একমাত্র অবলম্বন হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে যে সমস্ত পত্রিকা আছে সেগুলোই। যেমন অনলাইনে ছোটোদের অন্যতম একটি পত্রিকা ‘জয়ঢাক’ যা বাংলায় প্রথম ছোটোদের ওয়েবজিন এবং অন্যান্য ওয়েব পত্রিকাগুলি। এই পরিস্থিতিতে আপনি অভিভাবকদের কী বলবেন?



গৌর বৈরাগী।। এখন যারা ছোটোরা, যদি স্কুল পড়ুয়া ধরি তারা তো অন-লাইনটা মোটামুটি সরগড় হয়ে যাচ্ছে। অনেক সরগড় হয়েছে আরো দু’তিন মাসে আরো হবে। তার মানে এই জায়গাটায় তারা প্রিন্ট মিডিয়া থেকে একটু সরে এসেছে। এইখানেই কিন্তু একটা সুযোগ, বড় সুযোগ এই সমস্ত অনলাইন বা অনান্য ছোটোদের পত্রিকাগুলির এদের দিকে একটু নজর ফেরানোর। ছোটোরা নিজেরা পারবে না যারা অভিভাবক তারা যদি অন্তত এইটাকে তাদের সামনে উন্মোচন করেন এবং একটু সময় দেন, সময়টা দিতে হবে। ওইখানে একটা অন্য জগত তৈরি হয়েছে এটা ঘটনা। সেই জগতটাতে যাওয়া দরকার, মানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে বদলানো দরকার। আধুনিক যেটা হয়েছে সেটাতে যেতে আমার কষ্ট হলেও সেখানে যেতে হবে। যেতে যেতে সেটা স্বাভাবিক হবে।

রাজীব।। আপনি কি মনে করেন এই সময়, এই পরিস্থিতিতে অন-লাইনে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ছোটোদের জন্য যারা লেখেন তাদের ছোটোদের সামনে আসা উচিত? তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা উচিত বা তারা লিখতে আগ্রহী হলে সেই নিয়ে ওয়ার্কশপ – এগুলো আমাদের সংখ্যায় বাড়ানো উচিত?

গৌর বৈরাগী।। অবশ্যই। যত ইন্টার‍্যাকশন হবে তত লেখকের দিক থেকেও মঙ্গল। লেখকরা জানতে পারবে ছেলেরা কী চাইছে। যারা ছোটোরা তারাও বুঝবে আমাদের কোন লেখা পড়া দরকার কোন লেখাকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া দরকার। আসলে শেষ কথা তো যতোই মেশিন আসুক, যতোই কম্পিউটার আসুক, এই নেট দুনিয়া কিন্তু আসল নেট দুনিয়া তো ভেতরে। প্রত্যেকের ভেতরে। এই জায়গার উন্মোচনটা কিন্তু দরকার। সেটা এই নেটের মাধ্যমে হোক বা প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে হোক, এই মানবিক জায়গাটা যদি আমরা তাকে না দিতে পারি, শিশুর যে জায়গাটা এবং সেটা শিশু জন্মগতভাবে আয়ত্ত করে নেয় বা এটা থাকে তাদের। সেটা যে মানবিক জায়গাটা। অর্থাৎ একটা লোক হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে তাকে কিন্তু একটা শিশু না জেনেই তুলতে যায়। অবধারিতভাবে তুলতে যাবে। তাকে কিন্তু কেউ বলে দেয়নি যে অসহায় মানুষটির হাত ধরে তুমি তোলো। সে কিন্তু এগিয়ে যাবে। অর্থাৎ এর ভেতরে কিন্তু বীজটা প্রকৃতি দিয়ে দেয়। সহজাত প্রেরণা। আজকে বাইরের যে শক্তিটা অর্থাৎ ব্যবসায়িক যে শক্তিটা সেটা তো আমাদের এই বৃত্তিগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়ার, নষ্ট করে দেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত ছক কষছে। একমাত্র এখানেই সাহিত্য, শিল্পের বলার জায়গাটা — বলা তোমার মানবিক চৈতন্যের যে উন্মোচন, তোমার ভেতরে যে সহজাত প্রেরণা রয়েছে সেটাকে তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। মানুষের হাত ধরো। পড়ে যাওয়া মানুষকে টেনে তোলো। একটু তাকে শুশ্রুষা করো, তাকে ছায়া দাও। এই জায়গাটা কিন্তু তাকে বার বার বলতে হবে। সেটার জন্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে এইধরণের অনুষ্ঠান যদি করো তোমরা তাহলে সেটা খুব ভালো হয়। আগামী দিনের পাঠকদের কাছাকাছি পৌঁছানো যাবে। খুব পজিটিভ চিন্তা।

রাজীব।। পারক অন-লাইন পত্রিকার পক্ষ থেকে আপনাকে অজস্র ধন্যবাদ। আশা রাখি ভবিষ্যতেও পারকের পাশে আপনাকে আমরা পাবো।







কিন্নর রায় । পারক গল্পপত্র


অন্ধকারের ভিতর আরো একটা অন্ধকার থাকে। বাষট্টির তিমির, তিমির কান্তি দাস বুঝতে পারেনি খুব ভোরে আলোর ভিতর একটা আলোও থাকে। অন্ধকার এবং আলোর এই কাটাকুটি দেখতে দেখতে কখনো কখনো সে পৌঁছে যায় তার বাল্যকাল, শৈশব, কৈশোর, যৌবন বেলায়। যখন পাখিরা তাদের ঠোঁটে করে নিয়ে আসে নির্নিমেষ অন্ধকার অথবা আলোর কোনো পরিযায়ী দরবারির জানালা, তিমির একা একা নিঃসঙ্গ গভীর গোপন অসুখের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে আবিষ্কার করে পৃথিবীর চতুর্দিকে এখন প্রবল করোনাবেলা। তার বাড়িটা, বাড়ি না বলে ফ্ল্যাট বলাই ভালো সেটাও যেন একটা কোয়ারেন্টাইনে---- একক, নির্জন বাস।

তিমির একাই থাকে, তার বিবাহবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সহজীবনের মানুষটি চলে গেছে আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে। জীবনানন্দের সেই অতি চর্চিত লাইন,
'জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার ' তিমিরের মনে থাকে না, কারণ সে তো আর কবিতা পড়ে না।  কিন্তু তিমিরের ফ্ল্যাটের বাতাস কখনো কখনো এসব লাইনগুলো শোনাতে চায় তিমিরকে। সকালে ঘুম থেকে উঠে একটু  হালকা এক্সাসাইজ, তারপর চুপ করে খবরের কাগজ, দুঃসংবাদ ইত্যাদির  অপেক্ষা করা। সমস্ত পৃথিবীর গভীর করোনাবেলায় ---- কোভিড নাইন্টিন বা করোনা ভাইরাস পৃথিবীকে খেয়ে ফেলার জায়গায় নিয়ে গেছে।  ব্যতিক্রম কেউ নেই ---- চীন, আমেরিকা, ইটালি, ফ্র্যান্স,ইংল্যান্ড, জাপান, জার্মানি, কানাডা, ইরাক প্রায় সব দেশই প্রবলভাবে করোনামারিতে আক্রান্ত। তিমির জানে না এই করোনা ভাইরাস কবে পৃথিবী থেকে হাত গুটোবে কিংবা আদ্য গুটোবে কি না। সে অতীতে নানা রকম মারি আক্রমণের কথা শুনেছে। কোনোটার নাম স্প্যানিস ফ্লু, কোনোটার নাম এশিয়াটিক কলেরা, কোনোটার নাম বুরবনিক প্লেগ। পরে পরে ইবোলা, সার্স, অ্যানথ্রাক্স সহ সমস্ত মারি আক্রান্ত দেশ, পৃথিবীর কথা তিমিরের জানা আছে খবরের কাগজ এবং টিভি পড়তে পড়তে। ইদানিং আর টিভি দেখতে ভালো লাগে না। ----- এই টিভি শো গুলোকে অধিকাংশই  সার্কাস মনে হয় তিমিরের কাছে।

তার বন্ধু সুশান্ত মাঝে মাঝে মোবাইলে ফোন করে জানতে চায় তিমির ঠিক কেমন আছে। তিমির তখন তার বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালবাওয়া টিকটিকিটার দিকে তাকায়। সেই টিকটিকি একটি পোকার প্রত্যাশা করে। শিকার, শিকার ---- তিমির কি টিকটিকি না পোকা? না-কি সে টিউবলাইট ----যাকে ঘিরে অজস্র আলো পোকাদল এবং একটি ডাইনোসরের বংশধর কখনো কখনো ঘুরে বেড়ায়। করোনাবেলায় টিকটিকির কোনো সমস্যা নেই। সে দিব্যি আছে। খাচ্ছেদাচ্ছে। নাদুস হচ্ছে।

দক্ষিণের জানলা খুলে দিলে তিমির এখন দেখে এই কোয়ারান্টাইন বেলায় কোলকাতার আকাশ আশ্চর্য পরিচ্ছন্ন হয়ে গেছে। দশতলার উপর তার ফ্ল্যাটের জানলায় কখনো কখনো হয়তো বা উড়ে আসে সিন্থেটিক প্রজাপতি। সেই প্রজাপতির ডানার রং, বাষট্টি ছোঁয়া তিমিরের গালে একটু একটু করে লেগে যায়। সকালে একটা মৃত্যু ছিল, দুপুরে অনেকগুলো মৃত্যু, রাত্রে মৃত্যুর হাহাকার যাপন! তবু তিমির জীবনের রঙিন যাত্রায়, ধূসরিমা তাড়িয়ে ভাবে পৃথিবী থেকে আমি খসে গেলেই কী বা এমন ক্ষতি হবে? আমার মতোন মানুষ যার কেউ নেই, কোনো ঠিকানা নেই, ব্যাঙ্কে কিছু জমানো টাকা আছে, অফিসের পেনশন আছে, খানিকটা নিশ্চিন্ত, নিরুপদ্রব, নিরুদ্বেগের জীবন সে মরে গেলে পৃথিবীর কারুর কিছু ক্ষতি হবে না। তবু যখন দশতলার ফ্ল্যাটে হঠাৎ হঠাৎ সেই মায়া-প্রজাপতি তার সিন্থেটিক ডানার রং ছড়াতে ছড়াতে একটি রং কোম্পানির আস্ত বিজ্ঞাপন হয়ে যায়, তখন তিমির বুঝতে পারে কোলকাতার এত উঁচুতে প্রজাপতি আসা সম্ভব নয়। এমনকি লকডাউন হওয়ার পর পৃথিবী খানিকটা দূষণ-মুক্ত, পরিশুদ্ধ হয়ে গেলে যখন বলা হচ্ছে ভেনিসে নাকি নেমে এসেছে বুনো হাঁসেরা, হাতিরা নেমে এসেছে অনেক দূরে, ময়ূর দেখা যাচ্ছে ব্যারাকপুরে, কিন্তু তিমির কোনো কিছুই দেখতে পায় না। ওই প্রজাপতির হলুদ রং, লাল রং, কালো রং তার গালে অবলীলায় মেখে যেতে থাকে।

তিমির ঠিক করেছে সে এবার ভালোবাসবে, সে এবার প্রেমে পড়বে।  কিন্তু প্রেমে পড়বে ভাবলেই তো প্রেমে পড়া যায় না। তার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বউয়ের কথাও কখনো কখনো তার মনে পড়ে। সে এক অদ্ভুত টানাপোড়েনে থাকে এবং এক গভীর রজনীতে যখন পৃথিবী ঘুমোয় তখন দশতলার ফ্ল্যাটে একা ফোর-জি মোবাইল হাতে তিমির আর তার না পোষা টিকটিকিটি জেগে থাকে।




কথাকার অলোক গোস্বামীর মুখোমুখি দেবায়ন চৌধুরী ও পুরুষোত্তম সিংহ। পারক গল্পপত্র




(কথাকার অলোক গোস্বামী এসময়ের একজন ব্যতিক্রমী কথাকার। আখ্যান ভাবনায় তিনি স্বতন্ত্রতার দাবিদার। জন্মসূত্রে উত্তরবঙ্গের মানুষ হলেও বর্তমানে কলকাতায় থাকেন। দুটি উপন্যাস ‘বাতিল নিশ্বাসের স্বর’, ‘অদ্ভুত আঁধার’ এর পাশাপাশি অনেকগুলি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে – ‘সময়গ্রন্থি’, ‘জলছবি’, ‘আগুনের স্বাদ’, ‘কথা কিংবা কাহিনি’ ‘দশটি গল্প’, ‘১৫টি গল্প’। সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে নয় আখ্যান নির্মাণের ভাবনা থেকেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ কথাকার হয়ে ওঠেন। ‘গল্পবিশ্ব’ পত্রিকার সম্পাদনার পাশাপাশি, উত্তরবঙ্গের লেখকদের নিয়ে সম্পাদনা করেছেন ‘উত্তরায়ণ’। পারক-ই ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে এ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল করোনার ভয়াবহ দিনগুলিতে।)

পুরুষোত্তম : প্রথম থেকেই প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা করে এসেছেন। তা আজও বর্তমান। আবার বিরোধীতার মধ্যেও দেখেছেন কারো কারো হাত ধরে এগিয়ে যাবার প্রচেষ্টা। অথচ আপনি অটল। এই যে অনমণীয় মানসিকতা এর ভিত্তিমূল কোথায় ?

অলোক গোস্বামী :-হাতধরা হাতছাড়া, এসব অভ্যেস ব্যক্তি চরিত্রে লুকিয়ে থাকে। আমি বরাবরই সোজা-সাপ্টা কথায় অভ্যস্ত। তাবলে কাউকে কখনও তোষামোদের যে চেষ্টা করিনি তেমনটা নয়। করেছি কিন্তু মুসকিলটা হলো যাকে তুষ্ট করতে চেয়েছি তিনি সেই তোষামোদে আস্থা তো রাখেনইনি উল্টে সন্দেহের চোখে দেখেছেন। শীগ্রি বুঝে গিয়েছি শুধু কথা দিয়ে কাউকে তুষ্ট করা যায় না, তার জন্য প্রয়োজন হয় চোখেমুখেও ভিখিরিপণা ফুটিয়ে তোলা। সেটা আমি চাইলেও আমার চোখ মুখ ভাবভঙ্গী বিদ্রোহ করবে। সুতরাং ওপথে আর হাঁটিনি। তবে স্পষ্ট কথা যখন কারো পক্ষে গিয়েছে তখন সে এসে হাত ধরার চেষ্টা করেছে কিন্তু পরবর্তী লক্ষ্য সে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাত ছেড়ে দিয়েছে। আমার কিছু এসে যায়নি। ভবিষ্যতেও যাবে না বলে মনে হয়।

পুরুষোত্তম : ‘হলফনামা’ শীর্ষক জবানবন্দিতে আপনি লিখেছেন ‘আমি বামপন্থায় যতটা আস্থাবান, বামফ্রন্টের তো ততটা নই’, তবে আপনাকে যতদিন ধরে চিনি মনে হয়েছে বামমনস্ক। আমার ধারণা ভুলও হতে পারে ! আশা করি সে ধারণা ভেঙে দেবেন। কিন্তু আপনি গল্প উপন্যাসে বামপ্রন্থী রাজনীতির নঞর্থক দিক, শুধু বামপ্রন্থী নয় যেকোন রাজনৈতিক দলের তুলধনা করেন- কোন চেতনা থেকে এই কলম তুলে নেন ?

অলোক গোস্বামী :- কারণ বামপন্থা মানে মার্কসবাদই একমাত্র নীতি যেখানে সমাজ পরিকাঠামোর পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। শ্রেণী বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে শ্রেণী সংগ্রাম বিনা মানুষের মুক্তি নেই। এবং এগুলো কোনোটাই বিড়লা বাড়িতে ঘাঁটি গেড়ে, ছাগলের দুধ খেয়ে স্বকপোলকল্পিত ধারণা নয়। এর জন্য সারা পৃথিবীর ইতিহাস, বিজ্ঞান ঘাঁটতে হয়েছে। যেহেতু মেহনতি মানুষের কথা বলা হয়েছে তাই সারা পৃথিবীর মেহনতি মানুষ আস্থা রেখেছে মার্কসবাদে। অর্থাৎ বুঝতেই পারছো, মার্কসবাদীদের কাছে কোনো বিচ্যূতি কিংবা শ্রমিক বিরোধী আচরণ আশা করা যায় না। সমালোচনা করতে হলে একমাত্র ওদেরই করা যায় কারণ আস্থাটা ওদের প্রতিই আছে। এ প্রসঙ্গে আমার মায়ের কথা বলি। প্রতিবার ভোটের আগে মা আতঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞেস করতো, ওরা ক্ষমতায় আসবে না তো!
ওরা মানে কংগ্রেস। মা তৃণমূল দেখে যেতে পারেনি। বেঁচে থাকলে হয়ত ওদের নিয়েও আতঙ্কিত হোত। কিন্তু মা কেন বামফ্রন্টকে চাইতো। মা তো মার্কসবাদ বুঝত না! আসলে মা, ফারাকটা বুঝতো। বুঝত, কারা মানুষের ভালো চায়। সুতরাং বুঝতেই পারছ আমি কেন বামপন্থীদের দিকে আঙুল তুলি।

পুরুষোত্তম : যে সময়ে বেশির ভাগ লেখক ক্ষমতার পাশে থেকে নিজের সুনাম যশ অর্জন করতে চাইছে তখন আপনি সচেতন ভাবেই রাজনৈতিক দলগুলির নঞর্থক দিকগুলি নিয়ে ব্যঙ্গ করেন। সে তুলধনা আবার সরাসরি নাম স্পষ্ট করে দিয়ে। রাজনীতির প্রতি বিতৃষ্ণা না আস্থাভঙ্গ – সৃষ্টিমূলে কোন প্রেরণা কাজ করে ?

অলোক গোস্বামী : বিতৃষ্ণার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ ওটাই শাসকদের স্ট্র্যাটেজি। ওরা চায় সাধারণ মানুষকে রাজনীতি নিরপেক্ষ রাখতে। চায়, মানুষ শুধু ভোটাধিকার প্রয়োগ করেই সন্তুষ্ট থাকুক। সেজন্যই বিনোদনের এত অঢেল বন্দোবস্ত। একটা উদাহরণ দিই, বাজার চালু সিনেমায় দেখবে রাজনৈতিক নেতা/মন্ত্রীকে ভিলেন হিসেবে দেখানো হয়। কখনও ভেবে দেখেছ সেন্সরবোর্ড কেন এটাকে অনুমোদন দেয়? এ কারণেই দেয় যাতে মানুষ রাজনীতির প্রতি বীতস্পৃহ হয়ে ওঠে। যাতে স্মার্টনেস বলতে বোঝে, রাজনীতি বিষয়ে অজ্ঞ থাকা। আমি একজন সচেতন মানুষ এবং লেখক হিসেবে সেই ফাঁদে পড়ি কিভাবে!

পুরুষোত্তম : আপনার আখ্যানগুলিকে আমরা রাজনৈতিক আখ্যান বলতে পারিনা। যেমন ভাবে ‘জাগরী’ বা অন্যকোন উপন্যাসকে দাগিয়ে দিতে পারি রাজনৈতিক উপন্যাস বা গল্প। কিন্তু আপনার আখ্যানের চোরাস্রোতে প্রবল ভাবে রাজনীতি উঠে আসে। সমান্তরাল ভাবে কাহিনির পাশাপাশি রাজনীতি সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠতে দেখি – যদি কিছু বলেন।

অলোক গোস্বামী : যে কোনো আখ্যানই গড়ে ওঠে সময়ের দাবী মেনে। জাগরীও তাই। শুধু জাগরী কেন, ঢোঁড়াইচরিত মানস-এও আখ্যানের পাশাপাশি তৎকালীন রাজনীতি ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে। আমার পছন্দ দ্বিতীয় ধারাটি। কারণ সতীনাথ প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। খুব কাছ থেকে দেখেছেন রাজনীতির ত্রুটি এবং সীমাবদ্ধতাগুলি। আমি তো বাইরের মানুষ। আমি রাজনৈতিক উপন্যাস লিখতে গেলে সেটা সমরেশ মজুমদার মার্কা হয়ে ওঠাটা স্বাভাবিক ছিল, মানে নকশাল আন্দোলনকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে প্রেম কহানি বেচে খাওয়া কেস, ওরকমই কিছু হোতো হয়ত। সেই ভয়েই...

দেবায়ন : অলোকদা, ‘উত্তরায়ণ’ নামে ‘উত্তরবঙ্গবাসী লেখকদের গল্প-সংকলন’  করেছিলেন আপনি, ২০০৬ সালে বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। তার ভূমিকায় আপনি স্পষ্টত বলেছিলেন –‘বাসভূমির বিচারে পাঠক বিভক্তিকরণের স্পর্ধা কারো নেই।‘ খবু জানতে ইচ্ছে করে সাম্প্রতিক উত্তরের লেখালেখি নিয়ে আপনি কীভাবে ভাবছেন ?

অলোক গোস্বামী : কিচ্ছু ভাবছি না। ভাবানোর মতো কোনো উপাদান পেলে তো ভাববো? তুমিও তো উত্তরবঙ্গেরই মানুষ, তুমিই বলো না কি ভাবছ?

পুরুষোত্তম : আপনার গল্প উপন্যাসে যেটা বিশেষ ভাবে লক্ষ করেছি তা হল আপনি একটি ঘটনা সম্পর্কে বিশ্লেষণে জোড় দেন। একটি ঘটনাকে সামনে রেখে একাধিক মতবাদ, পক্ষ-বিপক্ষে মত রেখে একটি সত্যে পৌঁছে যান। কাহিনি চরিত্রের হাতে গেলেও নিজেই যেন ঘটনা নিয়ন্ত্রক হিসেবে সর্বক্ষণ উপস্থিত থেকে কাহিনিকে ধরে রাখেন – কীভাবে এই নির্মাণ প্রক্রিয়া গড়ে তোলেন ?

অলোক গোস্বামী : কারণ আমি জানি সত্য বহুমাত্রিক। এক একটা ঘটনার সত্য মানুষ ভেদে বদলে যায়। তাছাড়া সত্য এক নিষ্ঠুর বিকৃতিও বটে। পান থেকে চুন খসলে অর্থ বদলে যায়। বরং মিথ্যা পরম সুন্দর এক আবিষ্কার। মানুষ মিথ্যে বলতে, ভাবতে শিখেছিল জন্যই এত সুন্দর একটা সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছে। অন্য জীবকুলের সঙ্গে তার ফারাকটাও এখানেই, এই মিথ্যেটুকু। মিথ্যের জন্য সৃষ্টিশীলতা প্রয়োজন হয়, প্রয়োজন হয় কল্পনাশক্তির। সত্য আকাট। নির্মম। মানুষকে বিমর্ষ করে। বরং মিথ্যে বেঁচে থাকতে প্রণোদনা জোগায়। মিথ্যেটাই শিল্প।

পুরুষোত্তম : অন্যান্য লেখকরা যখন শেকড়চ্যুত মানুষের কথা বলতে অভ্যস্ত তখনই আপনি ‘অদ্ভুত আঁধার’ এ বলে বসলেন –মানুষের মতো শেকড়বাজ আর কোন প্রাণী নেই। যদিও এ উপন্যাস শেকড়চ্যুত মানুষেরই বৃত্তান্ত, কিন্তু এই যে আখ্যানের বিপ্রতীপ স্বর, শুধু এ উপন্যাস নয় বহু গল্পেও তা বর্তমান –কীভাবে এই বিপ্রতীপ আখ্যান নির্মাণ করেন।

অলোক গোস্বামী : মানুষ কি স্বেচ্ছায় শেকড়চ্যুত হোতে চায়? যতদিন পারে জুড়ে থাকার চেষ্টা করে। দুয়েকটা ছিঁড়লেও বাদবাকিটুকুর ওপর ভরসা রেখে চেষ্টা করে থিতু হওয়ার। ততদিন, যতদিন না তার মূল শেকড়টাকেও উপড়ে ফেলা হয়। শেকড়চ্যুত হওয়া সত্বেও মানুষ যে ফের চেষ্টা করে মূল মাটিতে ফিরে যাবার তার জ্বলন্ত উদাহরণ ইজরায়েল রাষ্ট্র। ফিরে গিয়ে অন্য মানুষকে বাস্তুচ্যুত করার চেষ্টা। যে ঘমাসান লড়াই প্যালেস্টাইন এবং ইজরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলছে জানোই তো তার কথা।

পুরুষোত্তম : ‘অদ্ভুত  আঁধার’ উপন্যাসে কলোনির মানুষের সংলাপে বা বহু গল্পেও চরিত্রের সংলাপে খিস্তি খেউড় নিয়ে উপস্থিত হন। এ উপন্যাসে তো  সামান্য খিস্তির জন্য একটি ছেলের পড়াশোনার সমাপ্তি ঘটে গেল, যদিও উপন্যাসের চিত্রে তা অত্যন্ত বাস্তব, আপনার কথাসাহিত্যে ব্যবহৃত অশ্লীলতার প্রয়োগ নিয়ে যদি কিছু বলেন।

অলোক গোস্বামী : দ্যাখো, খিস্তি ব্যাপারটা অনেকটা একজস্ট পাইপের মতো। ব্যর্থ, পরাজিত মানুষের ক্ষোভ নিঃসরণের একমাত্র উপায়। খিস্তি ব্যাপারটা না থাকলে হয়ত মানুষ আরও বেশী খুন করতো কিংবা আত্মহত্যা করতো। যত বড় ইন্টেলেকচুয়ালই হোন, তীব্র অপমানবোধ থেকে কখনো মনে মনে কাউকে দু-চার অক্ষর উপহার দেয়নি এটা মানতে পারবো না। খিস্তি যে সব সময় অপরের ওপরে প্রয়োগ হয়, তা নয়, মানুষ নিজের ওপরে বিরক্ত হলেও নিজেকে দেয়। অদ্ভুত আঁধার উপন্যাসটার মূল কুশীলব যারা আমি তাদের খুব কাছের থেকে দেখেছি। মিশেছি। বলতে পারো প্রায় ঘরের লোকের মতো। সুতরাং ওদের কথাবার্তার ধরণ আমার ভালোই জানা, তাই ব্যবহার করেছি। তবে খেয়াল কোরো, মূল চরিত্র বিজু কিন্তু কোনো খিস্তি পারতপক্ষে দেয়নি। ওর ভেতরে খানিকটা হলেও রুচি-অরুচি বোধ ছিল। সেজন্যই বেচারির এত দুর্গতি।

দেবায়ন : সম্প্রতি দেবেশ রায় প্রয়াত হলেন। তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন প্রবন্ধ, গদ্য, স্মৃতিচারণমূলক লেখা প্রকাশিত হচ্ছে ; কিন্তু সেখানে তাঁর রাজনৈতিক ভাবার বদল নিয়ে বিস্তারিত কথা পাচ্ছি না। আমাদের ভুলও হতে পারে, যাইহোক, ধ্রুপদি আধারে আখ্যানকে বিন্যস্ত করতে গিয়ে মনে হয় না তিনি মাঝেমাঝেই পাঠকের ধৈযচ্যুতি ঘটিয়েছেন, নাকি পাঠককেও তিনি নতুন অভ্যাসে জারিত করতে চেয়েছিলেন ? আপনার মতামত জানতে চাই। একজন লেখক আরেকজন মহান স্রষ্টাকে কীভাবে দেখছেন।

অলোক গোস্বামী : এর উত্তর ভাই দেবেশ রায়ই দিতে পারতেন। অবশ্য দিতেন কিনা জানি না কারণ একবার আমি সরাসরি ওঁর ওসব প্যাঁচ পয়জার নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলাম। উত্তর পাইনি। হয়ত নাদান পাঠক ভেবে উপেক্ষা করেছেন। সে যা হোক, ভাষা যার যার তার তার। নিজস্ব চিন্তা চেতনা থেকে গড়ে ওঠে। বঙ্কিমচন্দ্র পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ যখন লিখতে এলেন তখন কিন্তু সহজ সরল ভঙ্গীতেই ভাবনার প্রকাশ ঘটিযেছেন। শুধু গল্প কিংবা উপন্যাসে নয়, প্রবন্ধেও। ওঁর আসল সম্পদটা ছিল দর্শনে, গদ্যের মারপ্যাঁচে নয়। আমি যেভাবে কথা বলি সেভাবেই লেখার চেষ্টা করি। কেউ কেউ পছন্দ করেন কেউ বা আবার মুখ বাঁকিয়ে সুনীল গাঙ্গুলি স্টাইল বলেন। বলুক গে। সুনীলবাবুর মতো ঝরঝরে ভাষায় লিখতে পারলে আমার কিন্তু ভালোই লাগবে।

পুরুষোত্তম : বিজু, বকাই সেন, ইরফানরা (অদ্ভুত আঁধার ) মৃত্যু অনিবার্য জেনেও সে পথেই এগিয়ে গিয়েছিল, আবার বেশকিছু গল্পে দেখি মৃত্যুর প্রেক্ষাপট ,পটভূমি ( ইছামতী, শেষ প্রশ্ন, হৃদয় জোছনা, সহ একাধিক গল্প ) তৈরি করেও মৃত্যু ঘটেনা। মৃত্যু সম্পর্কে আপনার কোন বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে না কাহিনির অবধারিত পরিণতি হিসেবে উপস্থিত হয়েছে।

অলোক গোস্বামী : মৃত্যু আমাকে ভাবায়। এ এক অনিবার্য পরিণতি অথচ কী আশ্চর্যময়! প্রতি রাতে ঘুমোতে যাবার সময়ও জানি না পরের দিনটা দেখব কিনা। জেগে ওঠার বিশ্বাস নিয়ে ঘুমোই। আবার কত মানুষ নিজেই নিজেকে শেষ করে ফেলে। মনস্ততঃ ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখবে জানি না তবে আমার কাছে বিস্ময়কর লাগে। জীবনানন্দ এটাকেই বিপন্ন বিস্ময় বলেছিলেন হয়ত। আরও একটা বিষয় আমাকে কৌতূহলী করে, সেটা হলো যৌনতা। ট্যাবুমুক্ত কিংবা ট্যাবুবাদী দেশেও কিন্তু যৌনতাকে কেন্দ্র করে প্রায় একই ধরণের ঘটনা ঘটে। যেমন ধরো ধর্ষন। কেন ঘটে? যৌনতা তো অনেকদেশে সহজলভ্য! বুঝি না!
আমার লেখায় চেষ্টা করি যৌনতা এবং মৃত্যুকে ছোঁয়ার। তবে ব্যাপারটা অত সহজ নয়। লেখককে একটা তারের ওপরে ব্যালেন্স বজায় রেখে হেঁটে যেতে হয়। মৃত্যুর দিকে বেশী ঝুঁকলে মর্বিড লেখা হয়ে যাবে। যৌনতার দিকে অধিক ঝুঁকলে অশ্লীলতা হয়ে যাবে।
চেষ্টা করি। পারি কিনা জানি না।

পুরুষোত্তম : সমস্ত লেখক যখন লেখেন – কোন চরিত্রের সঙ্গে বাস্তবের মিল খুঁজে পাওয়া গেলে তা অনিচ্ছাকৃত, আপনি তখন ‘অদ্ভুত আঁধার’ এর পশ্চাদ অংশে উপন্যাস পরিচয়ে লিখলেন –‘স্থান-কাল-পাত্রের সঙ্গে বাস্তবের মিল খুঁজে পাওয়া গেলে সেটা আদৌ কাকতালীয় নয়, বরং ইচ্ছাকৃত।‘ – এই যে আখ্যানকে বিপ্রতীপ স্বরে নিয়ে যাওয়া, এমনকি সে প্রচেষ্টা একেবারে লেখক জীবনের প্রথম থেকেই সচেতন ভাবে। প্রথম থেকে ঠিক করেই কি শুরু করেছিলেন কোন পথে যাবে আপনার সাহিত্যচিন্তা, না লিখতে লিখতে হয়ে গেছে ?

অলোক গোস্বামী : যাহা বলিব সত্য বলিব? লিখতে লিখতে হয়ে গিয়েছে। যখন ভেবে পাচ্ছিলাম না বিজুকে নিয়ে শেষ অবধি কী করবো তখনই মাথায় চিন্তাটা উঁকি মেরেছিল।হয়ত সত্য ঘটনাটা মাথার ভেতরে ঘাপটি মেরে লুকিয়েছিল। সুযোগ পেয়ে ফুঁড়ে বেরিয়েছে। তবে যেটাই হোক, ব্যাপারটা বোধহয় ভালো হয়নি। অনেকেই আপত্তি জানিয়েছে। বিশেষ করে যারা সত্য ঘটনাটার ঘাতে প্রচন্ড আহত হয়েছিলেন তারা আমার সাফাইগুলোকে ভালো ভাবে মেনে নেয়নি। সে না-ই বা নিলো। আমি তো সেই ধনঞ্জয়ের বায়োগ্রাফি লিখিনি। আমার প্রধান চরিত্র এক উদ্বাস্তু সন্তান যে কিনা উত্তরবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিল।

পুরুষোত্তম : ‘আগুনের স্বাদ’ গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন সোমেন চন্দ স্মৃতি পুরস্কার ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে। অথচ সেখানে বেশ কিছু গল্পে ( অফুরান রক্তের তিমির, আপাতত কোন সতর্কবার্তা নেই ) বামফন্টের রাজনীতিকে ব্যঙ্গ করেন। সে দল সম্পর্কে আপনার সমস্ত অভিপ্রায় কী ভেঙে গিয়েছেল ? কবে থেকে ধীরে ধীরে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হল।

অলোক গোস্বামী : বামফ্রন্ট যখন ক্ষমতায় আসে আমার বয়স পনের/ষোল। কলেজ জীবনে এস.এফ. আই এবং চাকরি জীবনে বামপন্থী ইউনিয়ন করতে গিয়ে অভিজ্ঞতা হয়েছে। মনে হয়েছে, এসবের অর্থ কী! কেন এসব? তবে বিরূপ ধারনা হলেও চক্ষুশূল হয়নি। আজও আমি বামপন্থী ভোটার।

পুরুষোত্তম : ‘কথা কিংবা কাহিনি’ গল্প সংকলনে পাই –‘যদিও মানুষ বিনা সময়ের মূল্য কেই বা কবে বুঝতে পেরেছে ! অতেব লেখকের পাশাপাশি খানিকটা দায় পাঠকের কাঁধেও রইল।‘ – উত্তর আধুনিকতা পাঠককে কিছুটা পরিসর দান করে। আপনি কী মনে করেন পাঠক বৃত্তকে ঘিরেই এ গল্পগুলি সম্পূর্ণ না অন্যকিছু ?

অলোক গোস্বামী : দ্যাখো, যিনি বলেন পাঠকের জন্য লেখেন না, আমার মনে হয় তিনি মিথ্যে বলেন। আরে বাবা, উপভোক্তা বিনা কোনো বস্তু উৎপাদন হয় নাকি! তাহলে তো লেখাগুলো খাতায় ফেলে রাখলেই হয়, ছাপতে দেয়া কেন? কাউকে পড়ানোর জনই তো? এখন কথা হলো পাঠককে আমি কতটা গুরুত্ব দেব? নিশ্চয়ই আমার যাতে বিশ্বাস নেই তাতে পাঠকের আস্থা থাকলেও লিখতে যাবো না! বরং উল্টোটা, আমার বিশ্বাসটাকেই পাঠকের ভেতরে চারিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবো। সোজা কথা হলো, আগামীকাল কী লিখবো জানি না কিন্তু কী লিখবো না সেটা জানি। সেটা পাঠকের প্রিয় বিষয় হলেও লিখবো না।

দেবায়ন : কিছুদিন হল আপনি ফেসবুকে ধারাবাহিকভাবে খণ্ডে খণ্ডে লিখছেন ‘মেমরি লোকাল’। স্মৃতির সূত্রে এক অন্য ইতিহাস উঠে আসছে। অরুণেশ ঘোষ, হাংরি আন্দোলন, আপনাদের স্বপ্নময় সাহিত্যজীবনের কথা বন্ধুদের ভালো লাগছে। সম্পাদক অলোক গোস্বামীর কথা জানতে চাই। ‘গল্পবিশ্ব’ প্রকাশের সম্বন্ধে যদি কিছু বলেন ....

অলোক গোস্বামী : কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প পর্ব চুকেবুকে যাবার পর গল্প লিখতে শুরু করি। প্রকাশ করি, ‘ক্রমশ’ নামে একটি পত্রিকা। সে পর্বও চুকিয়ে দিয়ে প্রকাশ করি, ‘গল্পবিশ্ব’। ছোটগল্প এবং ছোটগল্প সংক্রান্ত পত্রিকা। বেশ সাড়া পেয়েছিলাম। ওরকম পত্রিকা তো উত্তরবঙ্গে ছিলই না, দুই বঙ্গেও কম ছিল। কয়েকটা সংখ্যার পর নিতান্ত ব্যক্তিগত অসুবিধের কারণে বন্ধ করতে বাধ্য হই। আজও অনেকে জানতে চান কেন গল্পবিশ্ব ফের শুরু করছি না। হাসি। ভাবি। কে জানে হয়ত ফের শুরু করবো!

পুরুষোত্তম : আপনার গ্রন্থের নামে একটা সময়ের চিহ্ন থাকে ( সময়গ্রন্থি, অদ্ভুত আঁধার, বাতিল নিঃশ্বাসের স্বর ) সময় বৃত্তান্ত নিয়েই কী আপনার যাবতীয় ভাবনা ? যদিও সময় সমাজই আপনার আখ্যানের মূল কথা। এমনকি সেই সময় সমাজ সম্পর্কে আপনার দৃষ্টি প্রধান। সময় বৃত্তান্ত নিয়ে আপনার অভিমত যদি জানান।

অলোক গোস্বামী : সময় হলো এক অমোঘ সত্য। কালচেতনা বিনা শিল্প-সংস্কৃতি বৃথা। সাহিত্য নীরবে সময়ের সাক্ষী হয়ে থাকে। প্রাচীন সাহিত্য থেকে আমরা পুরোন সময় বিষয়ে ধারণা করে নিতে পারি। যেমন রামায়ণের কথাই ধরো। আমরা সবাই জানি, রামায়ণও এক সংহিতা। বিভিন্ন কবি বিভিন্ন সময়ে নিজেদের সৃষ্টিকে এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ফলে কাহিনিরও পরিবর্তন ঘটেছে। আমরা সেসব থেকে জানতে পেরেছি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মূল্যবোধ, সামাজিক অনুশাসন কিভাবে বদলে গিয়েছে। এটাও তো সাহিত্য থেকে এক পরম প্রাপ্তি।

পুরুষোত্তম : আমরা ‘বাতিল নিশ্বাসের স্বর’ হিসেবে বর্তমানে যে উপন্যাসটা পড়ছি তা প্রথম সংস্করণের পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ। নিজেই লিখেছেন –‘ফুটো টিনের চালটাকে এমন ভাবে মেরামত করে দিলাম যাতে অবুঝ জল ঢুকে না যায়।‘’ – আগের ভাবনাবলয়কে পুনরায় কীভাবে নির্মাণ করলেন ? পড়তে গিয়ে কোথায় কী মনে হয়েছিল বেশকিছু অংশের প্রয়োজন নেই, তাই কিছু বর্জন, সংযোজন করলেন ?

অলোক গোস্বামী : প্রতিটা লেখা ছাপা হওয়ার পর চেষ্টা করি এড়িয়ে চলার। কেননা পড়তে বসলেই অজস্র ভুল চোখে পড়ে। নিজের ওপরে ক্রোধ জাগে, কেন এই ভুলগুলো করলাম! ইচ্ছে হয় সংশোধন করে ফের ছাপতে দিই। সব সময় সুযোগ মেলে না। তবে সুযোগ পেলে কিন্তু আজও বদলাই। কোনো পুরোন গল্প যদি ফের তোমার চোখে পড়ে তাহলে পড়ে দেখো, হুবহু পাবে না। বদল পাবেই। তবুও কি অতৃপ্তি ঘোচে? না। আসলে একটানে শ্রেষ্ট লেখাটা লিখে ফেলার মতো প্রতিভাবান আমি নই। তাই আমাকে সাহিত্যিক নয়, অক্ষরকর্মী বলা উচিৎ।

দেবায়ন : ‘’উদ্বাস্তুর সন্তানের জন্য চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থাকতে নেই। আমার নিয়তি শুধু একটার পর একটা সীমানা পেরিয়ে যাওয়া।‘’ – ‘বিদায় অভিশাপ’ গল্পে দিবাকরের না বলা কথাগুলো কি আপনার সম্বন্ধে প্রযোজ্য ? শিলিগুড়ি থেকে কলকাতায় পাকাপাকিভাবে চলে আসার সিদ্ধান্তে নিজের লেখালেখিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে বলে আপনি মনে করেন ?

অলোক গোস্বামী : প্রথম কথা হলো, ছোট শহরে জীবন একমাত্রিক হয়ে থাকে। প্রায় একই ধরণের মানুষ, একই ধরনের জীবন যাপন দেখে যেতে হয়। লেখালিখির পক্ষে সেটা খুব একটা সুখকর নয়। তবে সেটা নিতান্তই আমার ধারণা। কেউ কেউ হয়ত গোষ্পদেও বিশ্বরূপ দর্শন করতে পারেন। আমার ততটা ক্ষমতা নেই।
দ্বিতীয় কথা হলো, ভালো করে দেখার জন্য একটা দূরত্বের প্রয়োজন হয়।এটা বিজ্ঞান। তাতে নিরপেক্ষতাও আসে। কোলকাতায় চলে আসার যা কিছু লিখেছি প্রায় সবকটারই পটভূমি উত্তরবঙ্গ, চরিত্রগুলোও ওখানকার। হয়ত ছেড়ে না এলে এতটা মমতার সঙ্গে লিখতে পারতাম না!

পুরুষোত্তম : ‘বাতিল নিশ্বাসের স্বর’ উপন্যাসের সূচনায় লিখেছেন –‘’আমি মনে করি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখা সেটাই যা কিনা অদ্যাবধি লেখাই হয়নি।‘’ লেখক হিসেবে কোন লেখা লিখতে চান ? আপনার কী মনে হয় আপনি এখনো নিজের শ্রেষ্ঠ লেখাটা লিখে উঠতে পারেননি ?

অলোক গোস্বামী : চিন্তাভাবনার কতটুকু অংশ লেখায় প্রতিফলিত হয়, বলো তো! আমার ক্ষেত্রে তো ১০% হলেই নিজেকে সফল ভাবতে পারি। হয় কোথায়? কারও ক্ষেত্রে হয়তো ১০% এর চে অনেক বেশী হয় তাবলে ১০০% কখনোই নয়। তাহলে সব লেখাতেই কিছু না কিছু ত্রুটি থাকত না। তাই বলেছিলাম, শ্রেষ্ঠ লেখা সেটাই যেটা অদ্যাবধি প্রকাশিত হয়নি। লেখকের মগজেই বাসা বেঁধে আছে।

পুরুষোত্তম : ‘বাতিল নিশ্বাসের স্বর’ উপন্যাসে ‘আসর বন্দনা’ অংশ উত্তর আধুনিক দৃষ্টি নিয়ে পাঠককে সঙ্গে নেন, পাঠককে উপন্যাসের ভিতর প্রবেশের চেষ্টা করেন, কিন্তু পরক্ষণেই জানান এই রহস্য থেকে পাঠক বেরতে পারবেনা, পাঠককের মুক্তি নেই। উত্তর আধুনিকতা তো পাঠককে একটা পরিসর দান করে – বিষয়টি কীভাবে দেখবেন ?

অলোক গোস্বামী : আমি ভাই অত তত্ত্ব বুঝি না। জীবনের জটিল গোলকধাঁধার কথা বলতে চেয়েছি ওই উপন্যাসে। দেখাতে চাইছি, সমাজ যাদের অক্ষম বাতিল মনে করে তাদের কী অবস্থা হয়। এই অক্ষমতার মানও নির্ধারণ করে দেয় সমাজই। কিন্তু তারপর? কোথায় যায় মানুষগুলো? আমি দেখিয়েছি সেই মানুষগুলো একটা জনপদ গড়ে তুলেছে, যা শুধু বাতিল মানুষদেরই জন্যই নির্দিষ্ট। পূর্বের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে  তারা ভাষা বদলে ফেলেছে, নিজেদের মধ্যেকার সম্পর্ক, রীতি নীতি, আচার আচরণ নতুন করে নির্ধারণ করে নিয়েছে। ওরা জানে, তবুও সভ্যতার আগ্রাসন থেকে রেহাই পাবে না ওরা। এই স্থানও একদিন সফল মানুষরাই দখল করবে। আবার হটে যেতে হবে ওদের। এসবই আর কী!

পুরুষোত্তম : ‘বাতিল নিশ্বাসের স্বর’ উপন্যাস শুরু হচ্ছে তপুর হাঁটার মধ্য দিয়ে। তাঁর যাত্রাকে আখ্যানের সূচনাও বলছেন না, আবার সমাপ্তিকে আখ্যানের শেষও বলছেন না। ‘শেষ কথা বলবে কেডা’ পরিচ্ছেদে পেলাম –‘’যে দৃশ্যটার মারফৎ আমরা এই আখ্যান শুরু করছি সেটা যেমন আদৌ শুরু নয়, তেমনই যে দৃশ্যটাকে আমরা আখ্যানের শেষ ভাববো সেটাও আদৌ শেষ হবেনা। হয়তো শুরুও বলা যেতে পারে !’’ – এই শুরু কী পাঠকের ভাবনা বলয়ের শুরু না অন্য কিছু ? উপন্যাসের উপস্থাপন কৌশল সম্পর্কে যদি কিছু বলেন ।

অলোক গোস্বামী : আসলে শুরু কোনটাকে বলা যেতে পারে? সময় তো অনন্ত। তার শুরু কিংবা শেষ আমরা জীবনের নিরীখে মাপি কিন্তু সময় তো স্বাধীন। নিজের মতো চলে। পৃথিবীর কিংবা জীবনের সৃষ্টির ইতিহাস যদি দেখ, ওখানে লক্ষ লক্ষ বছর কিংবা কোটি কোটি বছর কোনো ব্যাপারই নয়। আসলে যে যখন জেগে ওঠে তখনই তার শুরু।

দেবায়ন : আপনার জন্মদিন ২৯ মে, আপনার গল্পের চরিত্র নিশিকান্তেরও তাই। ‘কেবলই দৃশ্যের জন্ম’ আখ্যান শুধু নয় আমাদের মনে হয়েছে আপনি অস্তিত্ববাদী। আর মানবিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আপনি পূর্বনির্ধারিত যেকোন ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করতে প্রস্তুত। যেখানে প্রত্যাখ্যানের মধ্যেও মায়া জড়িয়ে আছে, যদি কিছু বলেন ।

অলোক গোস্বামী : খানিকটা ঠিকই বলেছ। মানুষের মৃত্যু হলেও মানব রয়ে যায়। অদ্ভুত আঁধার উপন্যাসের শেষে তেমনই একটা ইঙ্গিতও রেখেছি।

পুরুষোত্তম : ‘বাতিল নিশ্বাসের স্বর’ উপন্যাসে আখ্যানের আঙ্গিক নিয়ে সচেতন হলেও গল্পের ক্ষেত্রে দেখি বিশ্লেষণে বেশি নজর দেন, সেখানে আঙ্গিক সচেতনতা বিশেষ চোখে পড়েনা। আপনি কি মনে করেন গল্পে আঙ্গিক সচেতনতা বিশেষ জরুরি ?

অলোক গোস্বামী : উপন্যাসের পরিধি তো অনেক বড় তাই ওখানে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা যায়। পাঠক যখন উপন্যাস পড়েন তখন একটা মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই শুরু করেন। কিন্তু গল্পের ক্ষেত্রে সেটাকে অ্যালাও করেন না। মোদ্দা কথাটা জেনে নিতে চান। সুতরাং উপন্যাসে যে স্বাধীনতা থাকে গল্পে সেটা থাকে না। লেখকের শক্তিমত্তার পরিচয়ও বহন করে একমাত্র উপন্যাসই। ছোটগল্প চালাকি দিয়েও দান মেরে দেয়া যায়, উপন্যাসে সেটা হয় না।

পুরুষোত্তম : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আপনার প্রিয় লেখক । মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা কোথাও কি প্রভাবিত হয়েছেন ? ‘বাতিল নিশ্বাসের স্বর’ পড়তে গিয়ে তেমন একটা প্রশ্ন উঁকি দিয়েছিল। পাঠক হিসেবে সে আমাদের ভুল ধারণাও হতে পারে, যদি কিছু বলেন ।

অলোক গোস্বামী : মানিকবাবুর একটা উপন্যাসই আমাকে আজও আচ্ছন্ন করে রেখেছে, সেটা হলো দিবারাত্রির কাব্য। মানিকবাবুর যৌনতা নিয়ে একটা ট্যাবু ছিল। কুসুমকে মন সর্বস্ব হওয়ার জন্য উপদেশও দিয়েছেন। কুবের কপিলাকেও সংযম দান করেছেন। একমাত্র এই উপন্যাসটাতেই কোনো বাধা নিষেধ মানেননি। অনেকে বলেন এই উপন্যাসটা ওর প্রাক কমিউনিস্ট পর্বের লেখা তাই অন্য রকম। মানি না সেকথা। কেননা প্রকাশিত হয়েছে অনেক পরে। মানিকবাবু তাহলে উপন্যাসটা প্রকাশ করতে দিতেন না। সে কথা থাক, দিবারাত্রির কাব্য দ্বারা প্রভাবিত হোতে যথেষ্ট এলেমদার হোতে হয়। আমি ততটা নই। বরং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আমাকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছেন। জীবনে একটাই দুঃখ, ওঁর মুখোমুখি বসে দুটো কথাবার্তা বলার সুযোগ পেলাম না। সুযোগ পেলাম না প্রভাবের মাত্রাটা আরও খানিকটা বাড়িয়ে নেয়ার।

পুরুষোত্তম : আপনাকে যতটা জেনেছি তাঁতে আপনি গ্রন্থের নাম, প্রচ্ছদ নিয়ে খুব সচেতন। কিছুদিন আগে ‘১০টি গল্প’ ‘১৫টি গল্প’ নাম দিয়ে গ্রন্থ প্রকাশ করলেন। এই যে সংখ্যা দ্বারা গল্পগ্রন্থের নামকরণ – এটা কী নিছকই না কোন বিশেষ বক্তব্য থেকে ?

অলোক গোস্বামী : দ্যাখো, শ্রেষ্ট গল্প, সেরা গল্প, বাছাই গল্প--এধরণের নামকরণ আমার কাছে পাঠক ঠকানোর খেলা মনে হয়। সবটাই বাণিজ্যিক কালোয়াতি। দেখবে, বাজারে রবীন্দ্রনাথেরও শ্রেষ্ঠ গল্প পাওয়া যায়। কী হাস্যকর! আমার কাছে সব গল্পই সমান। হয় সেগুলো গল্প হয়েছে অথবা হয়নি। তাবলে সেরাফেরা বলতে পারবো না। তবু এতদিন যে কোনো একটি গল্পের নাম থেকে সংকলনের নামকরণ করছিলাম, পরে ভেবে দেখলাম সেক্ষেত্রেও সেই গল্পটাকে বিশেষ প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। তাই ওই দশ, পনের ইত্যাদি ইত্যাদি।

পুরুষোত্তম : বর্তমানে মফস্‌সলের সাংবাদিকদের নিয়ে একটি উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেছেন। সে উপন্যাস পাঠকের কৌতূ্হলে যদি কিছু বলেন ।

অলোক গোস্বামী : মফস্বলে বাস করার সুবাদে এরকম কিছু সাংবাদিককে দেখেছি। মানুষগুলো সংবাদ অন্ত প্রাণ অথচ হাউস তাদের প্রাপ্য সম্মান দেয় না। দেবে কেন? কোলকাতার সংবাদ জগতের কাছে কোলকাতার বাইরে যে একটা বৃহৎ বাংলা রয়েছে সে ব্যাপারে কোনো মাথাব্যথাই নেই। যদি না বড় কোনো ম্যাসাকার ঘটে যায়। এখন তো ইন্টারনেটের যুগে বাজার বেড়েছে, মফঃস্বল থেকে ভিন্ন সংস্করণও বের হচ্ছে। আমাদের সময়ে স্থানীয় সংবাদ প্রকাশিতই হোত না। বেচারি সাংবাদিক শুধু দৌড়ে বেড়াতো। এসব নিয়েই উপন্যাসটা লিখেছি। নাম রেখেছি, ‘আদিম হাওয়ার দিনলিপি।’

পুরুষোত্তম : বাঃ, বেশ। অনেক ধন্যবাদ দাদা আপনাকে। ভালো থাকবেন।

অলোক গোস্বামী : তোমরাও ভালো থেকো।