রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

বিজয়া দেবের গল্প : প্রচ্ছায়া



                            ১
খুব বিচ্ছিরি উৎপাত। শৌভিক আর সহ্য কর‍তে পারছে না। কাল বিকেলে সে অর্ঘ্য দত্তকে মৌলির সাথে দেখেছে। তেমন কিছু নয়, ফুটপাথের উপর দিয়ে দুজন কথা বলতে বলতে যাচ্ছিল। উল্টোদিক থেকে আসছিল শৌভিক। ওদের দুজনকে দূর থেকে দেখতে পেয়ে একটু নিবিষ্ট অবলোকনে নিজের চোখকে স্হিরতায় এনে সে ফস্ করে লাগোয়া বইএর দোকান ‘ প্রজ্ঞা’ তে ঢুকে পড়ল। দু’চারটে ম্যাগাজিনের পাতা উল্টেপাল্টে  কটাক্ষে ফুটপাথের ওপর নজর রাখল এবং নিশ্চিত দৃষ্টিতে দেখতে পেল মৌলি আর অর্ঘ্য দত্ত কথা বলতে বলতে বুকশপটা পেরিয়ে গেল। এবার দু’চার পায়ে প্রায় লাফিয়েই বলা চলে ফুটপাথের উপর উঠে সে দেখল অর্ঘ্য দত্ত ও মৌলি সেনের পেছনের দিকটা। দুজনের কাঁধে ব্যাগ, মাথায় একটু এদিক ওদিক মানে দৈর্ঘ্যে অর্ঘ্য দত্ত আর মৌলি সেনের ফারাকটা খুব মানানসই। একটা তীব্র জ্বালাধরা অনুভূতি পাক খেয়ে গলা অব্দি উঠে এল। ভেতরটা যেন জ্বালামুখী আগ্নেয়গিরি, মুশকিলটা এই যে লাভাটাকে নির্গত করা যাচ্ছে না, তাহলে হয়ত খানিক স্বস্তি মিলত।
-স্যার, কিছু নিলেন না যে?-ভেতর থেকে বইয়ের দোকানের ছেলেটি, নাম তার প্রদীপ, সে ডাকছে।
শৌভিক তার ভেতরের লাভা- উদ্গীরণকারী অবস্থানকে প্রশমিত করার চেষ্টায় রত, কিছু মানুষ তার পাশ দিয়ে এল গেল ছায়ার মতন, তবে প্রদীপের কন্ঠ তার কান এড়িয়ে গেল না, বলল- একটা কাজ পড়ে গেছে প্রদীপ, কাল আসছি। - বলে হাত তুলে গমনপথের দিকে ইঙ্গিত করে সে চলল। বিকেল নেমেছে পথে। শৌভিক অফিস থেকে বাড়ি ফিরছে। যেতে যেতে মনে পড়ল শ্বেতা তাকে হারপিক নিয়ে যাবার জন্যে বলেছে, দু’ বাথরুমের জন্যে দুটো। এ ব্যাপারে শ্বেতা ভারি সতর্ক। শ্বেতাকে মাঝেমাঝে বাথরুম কুইন বলে ঠাট্টা করে সে।
   বাড়ি ফিরল যখন তখন সন্ধ্যা উৎরে রাত নেমেছে। মেয়ে দিয়া পেস্ট্রি ভালবাসে। বাড়ির কাছাকাছি একটা নতুন কেক পেস্ট্রির দোকান হয়েছে। একবাক্স পেস্ট্রি ডানহাতে, বাঁহাতে ক্যারিব্যাগে দুটো হারপিক, কাঁধে অফিসের ঝোলানো ব্যাগ, বাড়ি ফিরল গৃহস্থ শৌভিক। নিজেকে এভাবে কয়েকটা ভাগে ভাগ করে নিয়েছে সে, যেমন, অফিসে পেশাদার শৌভিক, লাঞ্চব্রেকে মৌলি সেনের সাথে অবস্থানের দিনগুলোতে লিবিডোর শৌভিক, দিয়ার সাথে পিতা শৌভিক, বিছানায় শ্বেতার সাথে কামুক শৌভিক,তবে আজ অফিসফেরতা মৌলি সেন ও অর্ঘ্য দত্তের সম্মিলনে দৃশ্যমান বাস্তবে আরও একটি শৌভিকের আবিষ্কৃত হল, আগ্নেয় শৌভিক।
 দিয়া খুশি। চৌদ্দ বছরের মেয়েটি তার খুব আদুরে। তাছাড়া শ্বেতা খুব যত্নশীলা। সেদিক দিয়ে শৌভিকের কোনও অভাব নেই। তাহলে তার এই পোক্ত পরিমন্ডলে কোন ছিদ্রপথ দিয়ে মৌলিসেনদের অনুপ্রবেশ ঘটে যায় লিবিডো জানে।
  সংসারধর্ম ত ঠিকঠাক পালন করছে সে, কোথাও কোনও ত্রুটি নেই, গোছানো স্ত্রী, আদুরে মেয়ে, সে পড়াশোনায়ও ভালো, তবু একটা অন্তহীন কী চাই কী চাই তাড়িয়ে মারছে কেন তাকে? মৌলির আগে ছিল পৌলমী চৌধুরী তার আগে অন্নপূর্ণা গুপ্তা। এরা ঠিক কেন আসে? পৌলমী তার অফিসেই ছিল,তারপর এক প্রবাসী সফল ব্যক্তিকে বিয়ে করে চাকুরি ছেড়ে বর্তমানে বিদেশবাসিনী। অন্নপূর্ণা ছিল ডাকসাইটে সুন্দরী, তার বন্ধু পরমেশ্বর গুপ্তার স্ত্রী, কণ্ঠস্বরে অদ্ভুত মাদকতা, আহা। এখনও ভাবলে ভেতরটা উথালপাথাল হয়ে যায়। শেষ অব্দি পরমেশ্বর বদলি হল দিল্লীতে। অন্নপূর্ণাও চোখের আড়াল হল। একদিক দিয়ে ভালই হল, বলা যায় খানিকটা বেঁচেই গেল সে। নিরন্তর দেখাসাক্ষাৎ হলে কী যে হত শেষ পর্যন্ত। অন্নপূর্ণা খুব সাহসী মহিলা। একদিন ত বলেই ফেলেছিল পরমেশ্বরের সামনেই-যাই বল না কেন তোমার বন্ধুর কিন্তু জহুরির চোখ। -আরো কী বলত কে জানে পরমেশ্বর কাজের অছিলায় তাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল, কথাটা আর এগোয়নি, ক’দিন পর পরমেশ্বর দিল্লীতে ট্রান্সফার। ভালই হল তার জন্যে, একটা অপরাধবোধ এমনিতেই কাজ করছিল ভেতরে ভেতরে। এখন যে ঘটনাবলী স্হিরজলে ঢেউ তুলছে তা হল অর্ঘ্য দত্তের অফিসে জয়েন করা আর মৌলি সেনের সাথে তার অন্তরঙ্গতা। মৌলি এসেছে বদলি হয়ে, কাজে ভাল। একটু বেপরোয়া গোছের। হ্যাঁ, বেপরোয়াদেরই তার পছন্দ, এরা তাকে খুব টানে। বেশ ক’দিন তার সাথে লাঞ্চ করেছে মৌলি। এলোমেলো ভাবনায় একদম ঘুম আসছে না। এপাশ ওপাশ করতে হচ্ছে বারবার।
কি হল? ঘুম আসছে না? কিছু ত হয়েছে আজ! খেতে বসে আনমনা, এখন ঘুম নেই, কি ব্যাপার?
মুহূর্তেই শৌভিক কাঠ হয়ে যায়। কাঠ হয়ে পড়ে থাকে বিছানায়। শোয়াতেও স্বাধীনতা নেই, দূর ছাই! একটু ভেবে নিয়ে একটা হাত আলতোভাবে শ্বেতার দেহে রাখে, শ্বেতাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। কেঠো গলায় শ্বেতা বলে-আজ ভাল লাগছে না, খাটাখাটুনি গেছে, তার চাইতে ভাল, যে ভাবনাটা তখন তখন থেকে ভাবছ, সেটা নিয়ে ভাবতে থাকো,ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত হয়ে পড়ো, ক্লান্ত হতে হতে ঘুমিয়ে পড়ো, ব্যস্।
-তুমি সবসময় মারমুখী হয়ে থাকো কেন বল ত? কেন দুটো হারপিকই ত এনেছি।
- ঈস এমন করে বলা হচ্ছে যেন দুটো মুক্তোর মালা এনেছেন আমার জন্যে...
-মুক্তোর মালার প্রসঙ্গ উঠছে কেন, হারপিক চাইলে হারপিকই ত দেব......
- ও, মুক্তোর মালা চাইলে মুক্তোর মালা দেবে ত! যাক গে যাক, তুমি তোমার ভাবনাতেই ডুবে থাক, কেমন? আমি ঘুমোই। ছটফট করলে আমি দিয়ার কাছে চলে যাই, কেমন ত?
শৌভিক কাঠ হয়ে পড়ে রইল।
                              ২
পরদিন লাঞ্চ ব্রেকে হাসি হাসি মুখ নিয়ে মৌলি সেন এসে হাজির। - মিঃ ভটচার্যি, লাঞ্চ নেবেন এখন?
হঠাৎ একরাশ অভিমান শৌভিকের ভেতরটাকে ছেয়ে ফেলল। কিছু বলার আগেই মৌলি তার হাত ধরে টেনে চেয়ার থেকে উঠিয়েই ফেলল।
-আরে আসুন ত, আপনার সাথে লাঞ্চ করতে আমার খুব ভাল লাগে।
শৌভিক ভাবে, আজ কি অর্ঘ্য দত্ত অফিসে আসেনি? দেখেনি ত। কে জানে!
লাঞ্চে বসে মৌলি বলে, কাল আপনাকে ‘প্রজ্ঞা’ তে দেখলাম। ফুটপাথে আসছেন আসছেন দুম করে প্রজ্ঞা’ তে  ঢুকে পড়লেন। ভাবলাম ডাকব, ত বইএর দোকানে গেছেন, মন দিয়ে নিশ্চয়ই বইপত্র ঘাঁটছেন, থাক।
শৌভিক অবাক, এদের কি তৃতীয় নেত্র রয়েছে!
মৌলির ঠোঁটে মৃদু হাসি। বলল- আজ অর্ঘ্য আসেনি, একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আচ্ছা শৌভিকদা, আপনি রোজ অফিস আসেন? মানে আমি আসা অব্দি একটা দিনও আপনাকে কামাই করতে দেখলাম না।
-অকারণ ফাঁকি দিতে ধাতস্হ নই।
-ভাল ত, খুব ভাল। বউদিও খুব ভাল।
- এরমাঝে বউদির অনুপ্রবেশ কেন? বউদিকে চেনো নাকি?
-না চিনি না। তবে খানিকটা মনে হয় চিনে গেছি।
- মানে?
- এই যে আপনাকে একটাদিনও আবদার করে বলেন না, আজ অফিস যেও না, চলো অন্যকোথাও ঘুরে আসি।
শৌভিকের মুখে একটা তেতো স্বাদ। তবু হাল্কা হাসি ঝুলিয়ে বলল- আবদার করেনি একেবারে সেটা ঠিক নয়,প্রথম প্রথম করত, আমিও কথা রাখতাম। আজকাল অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে।
এটাই ত ব্যাপার-অভ্যেস। মাঝেমাঝে সেটাকে ভেঙ্গেচুরে দিলে বেশ হয়, কি বলেন?
-হ্যাঁ সেটা মন্দ হয় না।
খেতে খেতে শৌভিক বলে- অর্ঘ্য ছেলেটা বেশ।
-হ্যাঁ ঠিক বলেছেন। দেখুন ত, আজ আসেনি মনে হচ্ছে সূর্য ওঠেনি।
শৌভিক খাচ্ছে। মুখটা নিচু। মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেল-এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না ?
একটু যেন অবাক হল মৌলি। বলল- আমার কাছে ঐরকম।
শৌভিক-ও।
এবার মৌলি ফিসফিস করে বলে-রাগ করলেন?
শৌভিক মৌলিকে দেখল কিছুক্ষণ। মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর বলল- না, মনে হল রাগ করেহেন, আপনার ভঙ্গিমা তাই বলছে।
শৌভিক সংক্ষিপ্তে বলে- বেশ বেশ এখন খাও।
এরই মাঝে ফোন বেজে উঠল মৌলির। সে ফোন ধরে বলল- হ্যাঁ অর্ঘ্য, বল।
শৌভিক বুঝতে পারছে তাকে স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে হবে। সে খাচ্ছে, একটু একটু করে। মৌলি কথা বলছে হেসে হেসে, এবার অনুযোগের সুরে বলল- আগামীকালও তোমার ছুটি? ওমা, ধুর ফাঁকিবাজ ছেলে! না, আর কথা বলছি না। ছাড়ো তো, ফোনটা ছাড়ো! না না আর কথা বাড়াব না, একদম না।
  এখন লাঞ্চপর্ব শেষ। চেয়ারে বসে ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে শৌভিক ভাবল এভাবে চলে না, চলতে পারে না। অভ্যেস বদল করতে হবে। এইসব চাপাকষ্ট বেশ দুঃখ দেয়, শান্তিহরণ করে, দু’দিনের স্বপ্ন স্বপ্ন সুখের বিচ্ছিরি বিমর্ষতায় রূপান্তর ঘটে, কাজেই মনের গতিপ্রকৃতিতে শাসনে রাখতে হবে। আচ্ছা, বিয়ে করা বউটাকে কি আর একটু ভালবাসা যায়? ভাবতেই মনে হল, নাহ্ এটা বোধহয় আর সম্ভব নয়। চাল, ডাল, নুন, মেথি, কালোজিরে, হারপিক( নীল ও লাল) এগুলোতে আটকে গেছে শ্বেতা-তার বেশি কিছু বোঝে না। রান্নাটা খুব ভাল করে, দিয়ার দিকে খুব নজর দেয়, পড়াশুনো হচ্ছে কিনা, মেয়ের শরীর স্বাস্থ্য ঠিক আছে কিনা, শ্বেতা তার নিজের দিকে এবং শৌভিকের দিকেও মগ্ন খেয়াল রাখে। সংসারের বৃত্তটা তার কাছে খুব বড়। বস্তুতপক্ষে, শ্বেতাকে সে-ও খুব একটা এলোমেলো হতে দেয় না। শ্বেতা এলোমেলো হলে স্বাচ্ছন্দ্য মার খেয়ে যায়। সে ভারি কষ্ট। শ্বেতার একবার জ্বর হয়েছিল-তাতেই চোখে অন্ধকার দেখেছে সে। না, শ্বেতাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার কিছুই নেই। অত কাছের মানুষ যখন অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়- তখন স্বপ্ন ঠিক আসে না। কিন্তু মৌলিকে নিয়ে আর স্বপ্ন আসবে কি? ওখানে অর্ঘ্য দত্ত ঢুকে গেছে। একটা ধূসর শূন্যতা অফিসটাতে, ফাইলগুলোতে দাঁত খিঁচিয়ে আছে। ধূ ধূ বালিচর। আড়চোখে মৌলির টেবিলের দিকে তাকাল শৌভিক। কি বোর্ডে আঙ্গুল নাচছে ঘাড় কাত করে ফোন চেপে কথা বলছে। স্মিতমুখ। মাঝে মাঝে শরীর কাঁপিয়ে হাসছে। রাগটা উঠছিল মাথায়। খানিকটা মেঝের দিকে তাকিয়ে সামাল দিতে হল। শ্বেতা বলেছিল- শোনো, যদি রাগ উঠছে বোঝো, তাহলে মেঝেতে চোখ রেখো।- যদিও শ্বেতা কখনও এই কাজটি করে না। শ্বেতার খুব সম্ভব ওটা রাগ নয়, স্বভাব। খিটখিটে খ্যাচান স্বভাব। সবসময় নিজের সাথে জড়িয়ে আছে, হাসে কম।
  মৌলির সাথে অর্ঘ্য দত্তের সম্পর্ক মনে হয় আরও মজবুত হচ্ছে। মৌলি মেয়েটি খোলামেলা। ওদের মাঝখানে মাঝেমধ্যেই শৌভিককেও ডেকে নিয়ে যায়। মৌলি ডাকলে আজও শৌভিক না গিয়ে পারে না। তবে সে নিজেকে খুব সতর্ক করে দিয়েছে। এভাবে মন নিয়ে খেলা আর নয়। অনেক হয়েছে। ছোট ছোট রোমাঞ্চবোধ শেষ পর্যন্ত খাদের কাছে টেনে নিয়ে যায়। কেউ দেখতে পায় না, তবে নিজের জন্যে এ বড় ভয়ংকর খাদ। তার চাইতে ভোঁতা অনুভবগুলো ভালো, ওগুলো নিয়ে অত অসুবিধে নেই।
   একদিন ওদের সাথে লাঞ্চ হল। অর্ঘ্য আজ তাকে টেনে নিয়ে গেল। ছেলেটা কথাবার্তায় ভাল। ভদ্র ও মিশুকে। তবু ঈর্ষা হয় বৈকি। একটা জ্বালাধরা অনুভব। মৌলিটা ফাজিল স্বভাবের। ওর বাড়তি কথাগুলো অনেকসময় ভাল লাগে না আজকাল। লাঞ্চ করতে করতেই মৌলি হঠাৎ বলে বসল- আচ্ছা শৌভিকদা, মনে করুন কোথাও গেছেন, ধরুন পার্কে কিংবা শপিং মলে, দেখলেন বউদি একজন পুরুষবন্ধুর সাথে বসে গল্প করছেন, আপনি তৎক্ষণাৎ কী করবেন?
-এটি হবে না, হবার নয়। -বলে সে নিরুচ্চারে বলে ‘ও হারপিকে মজে আছে।’
-এত জোর দিয়ে কি বলা যায় শৌভিকদা, মনে করুন হল, তখন কী করবেন?
- আমি ঐসব মনে করাতে বিশ্বাসী নই।
অর্ঘ্য মিটি মিটি হাসছে। এবারে সে অফিসের কাজকর্ম সংক্রান্ত প্রসঙ্গ তুলে প্রসঙ্গান্তরে নিয়ে গেল। আপাতত স্বস্তি।
                                 ৩
সেদিন অফিস প্রায় খালি হয়ে যাওয়ার পর যখন কাজ করেই চলেছে শৌভিক ( এটি তার নিত্য অভ্যেস) তখন মৌলির সেদিনের কথাগুলো মনে হল। সত্যি যদি এমন হয় কখনো, যদি শ্বেতাকে দেখা যায় এক পুরুষবন্ধুর সাথে তখন তার প্রতিক্রিয়াটি কী হবে? আচ্ছা, সত্যি কী এমনটা হতে পারে? পারেই তো। সম্পর্কের ক্ষেত্রে অসম্ভব বলে কিছুই নেই। যৌনচেতনায় কয়জনের ক্ষেত্রে এথিক্স কাজ করে কে জানে! সাহস সবার থাকে না, কিন্তু মন? মনের ভেতর কি এথিক্স কাজ করে? উহুঁ, এতটুকু নয়। শ্বেতার ভেতরে যদি অন্য কেউ ঢুকে থাকে তাহলে তাকে খুঁজে বের করা তার কর্ম নয়।
    কাজ শেষ করে সে শপিং মলে গেল, শ্বেতারই দেওয়া লিস্টি। এগুলো শ্বেতাই আনতে পারে, কিন্তু না, সে দিয়াকে নিয়ে ব্যস্ত। দিয়া বেশ চটপটে, সব কাজ নিজেই সারতে পারে, করতে চায়ও, কিন্তু না, শ্বেতা ওর সাথে লেগেই আছে। আজ আর ভাল লাগছে না কিছুই, খুব ক্লান্তি আসছে। ঘুমোতে ইচ্ছে হচ্ছে, এবার থেকে শ্বেতাকে এইসব কাজের ভার দিতে হবে, দিয়াকে নিয়ে আসুক। যা যা চাই নিয়ে যাও খুশিমতো। লিস্টি ধরে সে বস্তুগুলো ট্রলিতে রাখছিল। হঠাৎ নারীপুরুষের ফিসফিস শুনে তাকাল। এবার চমকানোর পালা, বেশ দীর্ঘদেহী এক সৌম্যদর্শন পুরুষের সাথে শ্বেতা। শ্বেতা ই শপিং মলে......শ্বেতা এক পুরুষের সাথে...শ্বেতা খুব হেসে হেসে কথা বলছে......বেশ মগ্ন...শৌভিক স্হানু। ন যযৌ ন তস্হৌ। তার কোনও ভুল হচ্ছে না ত, শ্বেতা কি? পাশ থেকে দেখা যাচ্ছে, রগের পাশের সেই দু’চারটে পাকা চুল, হাসলে গালের পাশের সেই ভাঁজ...সেই বাদামি রঙের শাড়িটি। ভদ্রলোকটির নিবিষ্ট চোখ শ্বেতার চোখে...হেসে হেসে কথা বলা চলছে।  তাহলে যখন সে আসবেই তবে তার হাতে এই লিস্টি ধরিয়ে দেওয়া কেন! গিয়ে কি জিজ্ঞেস করবে? সাহস আছে শ্বেতার। মানতেই হবে। জেনেবুঝে শ্বেতা এখানে এসেছে, তার পেছনে কোনও সুদূরপ্রসারী কারণ আছে,এটা নিশ্চিত। মানে ব্যাপারটি লুকোনো নয়, প্রকাশ্যে আনতে চাইছে শ্বেতা। নাহলে দুপুরবেলা আসতো, যখন সে অফিসে মুখ গুঁজে কাজ করে। কিন্তু শ্বেতাহীন জীবন একটুও ভাবা যায় না। মৌলি হয়ত শ্বেতাকে দেখেছে, তাই ঐসব বলছিল। কিন্তু দিয়া? দিয়া ত শ্বেতার চোখের মণি, কাছছাড়া করেনা কখনও, এখন দিয়া কোথায়, এইসময় ত স্যারের বাড়ি থেকে চলে আসে মেয়েটা। স্যারের বাড়ির সামনে পার্ক আছে, ওখানে শ্বেতা বসে থাকে, মশার কামড় খায়, তবু মেয়েকে চোখের আড়াল করে না। কিন্তু কবে থেকে এমন হচ্ছে, সে ত ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। দিয়া ত তার সাথে সব কথা বলে, মাঝে মাঝে তাকে নিয়ে মার বাড়াবাড়ি নিয়েও অনুযোগ করে। তাহলে? একটু ভেবে নিয়ে শৌভিক খুব ঠান্ডা মাথায় কাজ করল একটি। ছবি তুলল উভয়ের মোবাইল ফোন দিয়ে। প্রমাণ রাখতে হবে। কী ঘটতে চলেছে সে জানে না, তবু ঘটবে ত, ঘটনা শুরু হয়ে গেছে যখন তখন অবিলম্বেই ঘটবে, ছবিটা এইবার দেখল, খুব সাফ ছবি, তার ক্যামেরাটি দারুণ, অফিসে ত সবাই এসে তার ফোন নিয়ে ছবি তোলে। দু’দুটো স্ন্যাপ নিয়েছে সে খুব সাবধানে, তার আগে ফোনটাকে সাইলেন্ট মুডে নিতে হল। মাথাটা এখনো বেশ সাফ, দিব্যি কাজ করছে। ট্রলিটা নিয়ে উল্টোদিকে বেরোলো সে, কাউন্টারে পেমেন্ট করে বেরিয়ে এল।
   দরজা খুলে দিল শ্বেতা। এ ত আরেক চমক। এত দ্রুত ফিরল! তবে হতেই পারে। কাউন্টারে বেশ লম্বা কিউ ছিল। এরই মাঝে হয়ত ভদ্রলোক নিজের গাড়িতে করে শ্বেতাকে বাড়ির দরজায় দিয়ে গেছে। সবই সম্ভব। খুব ভাল করে শ্বেতাকে দেখল সে। যেন সদ্য ঘুম থেকে উঠেছে। ‘একই অঙ্গে এত রূপ দেখিনি ত আগে’...সত্যি, এত বিস্ময় তার জন্যে অপেক্ষা করে ছিল! দিয়া বেরিয়ে এল। বাবার হাত থেকে ব্যাগ টেনে নিয়ে বলল-বাবাকে তুমি মা জাস্ট টর্চার করছ, অফিসফেরত এইসব বাজারহাট করা কত কষ্ট! বুঝলে বাবা স্যারের বাড়ি থেকে ফিরে আমি কী ঘুমটাই দিলাম, মা-ও ঘুমিয়েছে। ইচ্ছে করলে মা ও আমি এসব নিয়ে আসতে পারি কি না বল, শুধু পড়াশুনো, মাথা ধরে যায়।- একটু ধাঁধা লাগলো। দিয়া বলছে, মা-ও ঘুমিয়েছে। না কি দিয়াকে ঘুম পাড়িয়ে নিজে সেজেগুজে বেরিয়ে পড়ল। গাড়ি হয়ত অপেক্ষায় ছিল। লোকটার গাড়ি! বাথরুমে ঢুকে খানিকটা ভাবল সে, টিফিনপর্ব শেষ হোক, তারপর প্রমাণ হাতে নিয়ে প্রশ্নপর্বে যাওয়া যাবে। খিদেটা পেটে চাগাড় দিচ্ছে। মাথাটা শান্ত হোক, তারপর ঠাণ্ডা মাথায় ঝাঁপানো যাবে।
  খেতে খেতে শ্বেতার মুখে বেশ ক’বার দেখল শৌভিক। চোখেমুখে দিবানিদ্রার আবেশ আছে। তাহলে? দিয়া খুব কথা বলছে। মাঝে মাঝে হ্যাঁ বাবা , শুনছো বাবা ইত্যাদি তার কান ছুঁয়ে যাচ্ছে শুধু। কিন্তু মূল কথাগুলো ঠিক কানে যাচ্ছে না।
-বাবা, অফিসে কিছু হয়েছে?
শৌভিক চমকিত হয়ে বলে-না না কিছু না।
-তবে খুব ভাবনায় আছো যে বাবা?
-ঐ আর কি!
শ্বেতা বলে- এক্ষুনি এত ভাবলে হবে, সামনে তাহলে করবে কি?
-মানে?
-মানে আর কি? সবে ত কলির সন্ধ্যে!
-কি বলতে চাইছ?
-কিছু না।
কী বলতে চাইছে শ্বেতা?
দিয়া শৌভিকের হাত ধরে বলে-বাবা,শোবে এস।
-পড়তে বস দিয়া।– শ্বেতার কড়া নির্দেশ।
শৌভিক বলে-ঠিক আছে, তুই যা, সময় নষ্ট করিস না। বলে শোবার ঘরে ঢুকে মোবাইল ফোন থেকে ছবি বের করতে যাবে শুধু, দুদ্দাড় করে শ্বেতা এসে ঢুকল।
-তুমি চাল আনোনি? বারবার করে বল্লাম,লিস্টি করে দিলাম।লিস্টি কি হারিয়ে গেল? তাহলে একটা ফোন করলেই ত পারতে!কী করব এখন? চাল নেই। ফোনটা রাখো ত! রাতে নাহয় রুটি, সকাল সকাল দোকানে ছুটবে কে?
-বেশ। একটু বিশ্রাম নিয়ে নি, তারপর নাহয় যাওয়া যাবে মাধুদার দোকানে...
শ্বেতা চলে যায়। ওঘরে গিয়ে গজগজ করে-মাধুদার দোকানে কি ঐ চাল পাওয়া যাবে! দিয়া ত মুখেই তুলতে পারে না ইত্যাদি।
বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে এবার ছবিগুলো ঘাঁটতে শুরু করে শৌভিক। কিছুটা স্বস্তি। আসার পর থেকে হাওয়া টা ছন্দেই বইছে। তবে কলির সন্ধ্যে ইত্যাদি বলে ইঙ্গিত দিয়েছে শ্বেতা। শেষের দুটো ছবিতে এসে ভীষণ চমকে উঠল সে। মলের র‍্যাকগুলো, ড্রাই ফ্রুট সাজানো, দুটো বাচ্ছা মেয়ে ছুটন্ত, কোথায় শ্বেতা আর ওই পুরুষবন্ধুটি? কোথায়? কী দেখল সে? একেবারে স্পষ্ট, স্বচ্ছ, কথা বলার মগ্নতা...তার কি কিছু হয়েছে? অস্থির হাতে অনেক ছবি ঘেঁটে শ্বেতা আর ঐ ভদ্রলোককে খুঁজে বেড়ায় সে-শুধু শেষের দুটো ছবির সময়কাল স্পষ্ট হয়ে চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন